আপুলিয়াসের আশ্চর্য অভিযান (প্রথম পর্ব)


মূল : লুসিয়াস আপুলিয়াস
অনুবাদ : শিবব্রত বর্মন

আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে লেখা হয়েছিল এই উপন্যাসটি। তখন লোকে গল্প-কাহিনি গদ্যে কমই লিখত। সবই লিখত পদ্যে আর সেগুলোকে বলা হত মহাকাব্য। সেই হিসেবে এটা দুনিয়ার প্রথম উপন্যাসগুলোর একটি। আপুলিয়াস এটা লিখেছিলেন প্রাচীন রোমান ভাষায়। বহু পুরোনো হলেও এর কাহিনি এত মজার সব ঘটনায় ঠাসা যে যেকোনো যুগের পাঠককে তা চুম্বকের মতো টানবে। মূল উপন্যাসের নাম দ্য গোল্ডেন অ্যাস বা সোনার গাধা। এখানে তোমাদের উপযোগী করে সেটি ধারাবাহিকভাবে ছাপা শুরু হলো। পড়তে শুরু করো, শেষ না করে আর উঠতে পারবে না।

প্রথম অধ্যায়
আরিস্তোমেনিসের গল্প
কাজের সূত্রে একবার আমাকে থেসালি যেতে হয়েছিল। আমার মায়ের পূর্বপুরুষদের ভিটা সেখানে। সকালবেলা উঁচু পাহাড়ের চড়াই বেয়ে ওঠার পর উতরাই বেয়ে নেমে আসছি। পিচ্ছিল রাস্তা নেমে গেছে নিচে একটা উপত্যকায়। দু’পাশে শিশিরভেজা চারণভূমি আর প্যাঁচপেঁচে চষাখেত। যেতে যেতে আমার সাদা ঘোড়াটা হাঁপাতে লাগল, হাঁটার গতিও ঝিমিয়ে আসছে। ওটার পিঠে জিনের ওপর একটানা জবুথবু বসে আছি। আমারও হাতে-পায়ে খিল ধরে গেছে। লাফিয়ে নেমে পড়লাম। লতাপাতা দিয়ে যত্ন করে ঘষে ঘোড়াটার কপালের ঘাম মুছে দিলাম, কান মলে দিলাম খানিকটা, রাশের দড়ি ছেড়ে দিলাম, তারপর সেটার পাশে পাশে হাঁটতে লাগলাম, যাতে দম ফিরে পায় পশুটা। নাশতা হিসেবে দুই পাশের ঘাসবিচালি চিবাতে চিবাতে এগোচ্ছে ঘোড়া। মাঠের মধ্য দিয়ে ঘুরে ঘুরে নেমে গেছে রাস্তা। দেখি একটু সামনে দুটি লোক ক্লান্ত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে, গভীর আলাপে মগ্ন। কী নিয়ে কথা বলছে ওরা— কান পাততে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। কাছাকাছি যেতেই তাদের একজন উচ্চ স্বরে হেসে উঠে অন্যজনকে বলল, “থাম, থাম! অনেক হয়েছে! আর একটা কথা বলবি না। তোর এসব উদ্ভট গুলতানি আর নিতে পারছি না।”
আমি গল্পের গন্ধ পেলাম। গল্পবাজ লোকটাকে বললাম, “দয়া করে আমাকে উটকো উৎপাত যদি না ভাবেন তো বলি, সবকিছু থেকে শিক্ষা গ্রহণের বাতিক আছে আমার। হেন জিনিস নেই, যাতে আমার কৌতূহল নেই। আপনার গল্পটা যদি আবার গোড়া থেকে শুরু করেন, আমি ঋণী থাকব। আন্দাজ করছি সামনের খাড়া পাহাড় বেয়ে ওঠার ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবে এ কাহিনি।”
সঙ্গে যে লোকটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসেছিল, সে বাগড়া দিয়ে বসল। “এইসব আজগুবি কথা আমি আর শুনব না। তুমি তো এও বলে বসবে যে জাদুমন্ত্রবলে নদীর স্রোত উল্টো দিকে ছোটানো সম্ভব, সাগরের পানিকে বানিয়ে দেওয়া সম্ভব বরফ, জাদুবলে বায়ুপ্রবাহও থামিয়ে দেওয়া যায়। তুমি বলবে, জাদুটোনা করে সূর্যকে তার মাঝপথে আটকে দেওয়া যায়, চাঁদের গা থেকে ঝরানো সম্ভব বিষাক্ত শিশির, আর গ্রহ-নক্ষত্রদের দিয়ে সম্ভব মানুষজনের অনিষ্ট সাধন। তুমি তো এও দাবি করবে যে জাদুমন্ত্রে দিনের আলো মুছে দিয়ে অনন্ত রাত নামিয়ে আনা সম্ভব।”
আমি গোঁ ধরলাম। বললাম, “হাল ছাড়বেন না তো, ভাই। গল্পটা শেষ করুন।” তারপর অন্য সঙ্গীর দিকে ফিরে বললাম, “আপনার বন্ধুর কথা বিশ্বাস করতে আপনি যে কিছুতেই রাজি নন, সেটা কি বিশ্বাস করতে বাধছে বলে, নাকি আপনি বিশ্বাস না করার গোঁ ধরে আছেন বলে? একটা ঘটনা খুব বিরল আর ব্যতিক্রমী হলে কিংবা বোধবুদ্ধিতে সেটার কূলকিনারা করা কঠিন হয়ে গেলে সেটাকে গুলতানি বলে উড়িয়ে দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ না মোটেই। খুব ধীরস্থির মনে চিন্তা করলে দেখা যাবে, এ রকম অনেক ঘটনা ঘটা শুধু যে সম্ভব তা-ই না, ঘটারই কথা। এই যেমন ধরুন কিনা মাত্র গতকালই রাতে খাবারের টেবিলে কে কত বেশি খেতে পারে, সেই প্রতিযোগিতায় নামতে হয়েছিল আমাকে। ঢাউস সাইজের একটা পলেন্তা পনির মুখে পুরে গিলতে গিয়ে আটকে গেল গলায়। না পারি গিলতে, না পারি ওগরাতে। শ্বাসনালি বন্ধটন্ধ হয়ে সে যে কী ভীষণ কাণ্ড। দম আটকে মরেই গেছিলাম আর কি। অথচ মাত্র ক’দিন আগে অ্যাথেন্সের সদর বাজারের মোড়ে এক কসরত পালোয়ানকে দেখলাম ধারালো একটা তরবারি উল্টো করে ধরে কোঁত করে গিলে ফেলল। আমাদের দাঁড়ানো দর্শকদের কাছ থেকে কিছু পয়সাটয়সা চেয়ে নিল। তারপর লোকটা করল কী, একটা শিকারি বর্শা গিলে ফেলল একইভাবে। তাক লেগে গেলাম। দেখলাম, মাথাটা উল্টো দিকে কাত করে আছে লোকটা, আর বর্শার হাতল খাড়া হয়ে বেরিয়ে আছে মুখ থেকে। আর বিশ্বাস করবেন কি না, দেখি একটা সুন্দরমতন ছেলে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে সেই হাতল বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে, যেন জলপাইগাছের ডাল বেয়ে উঠছে একটা সাপ; ছেলেটার গায়ে হাড়গোড় কিছু আছে বলে মনে হলো না। কী বলবেন এটাকে!” এটুকু বলে আমি আবার সঙ্গী গল্পবাজ লোকটার দিকে ফিরে বললাম, “এবার বলুন ভাই, ঝেড়ে দিন আপনার গল্প। আপনার বন্ধু করুক না করুক, আমি আপনার কাহিনি খুব বিশ্বাস করব। শুধু বিশ্বাসই করব না, আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে সামনের সরাইখানায় আপনাকে ভোজ খাওয়াব।”
“জ্বি, আপনার প্রস্তাবের জন্য ধন্যবাদ,” বলল লোকটা। “নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার বিনিময়ে আমি কোনো উপঢৌকন চাই না। সূর্য সাক্ষী, যা বলব, প্রত্যেক বর্ণ সত্য। আর বিকেল নাগাদ থেসালির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর হাইপাতায় গিয়ে পৌঁছালে তখন নিজে থেকেই টের পাবেন সত্যি বলছি কি না। ওখানে সবাই জানে আমার ঘটনাটা কী ঘটেছিল। বুঝবেন, এগুলো সবার সামনে ঘটেছে। আমার নাম-পরিচয় দিয়ে নিই আগে। আমি ইজিনেতা দ্বীপের অধিবাসী, সওদাগরি কারবার করি। থেসালি, ইতোলিয়া, বোয়েতিয়া— এসব এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত আমার। মধু, পনির— এসব হাবিজাবি জিনিস কিনি। নাম আমার আরিস্তোমেনিস। একবার হলো কী, হাইপাতা থেকে খবর পেলাম, উঁচু মানের বিপুল পরিমাণ পনির ওখানে পানির দরে বিক্রি হবে। দে ছুট। আমাদের কারবারই তো এমন। খবর পেয়েছ কী, ছুট লাগাও। কিন্তু সেবার কপাল মন্দ। শহরে পা দিয়ে শুনি লুপাস নামে এক জাঁদরেল সওদাগর আগের দিন সব হাত করে ফেলেছে। পড়িমরি ছুটে এসে এমন ঠনঠন কপাল! ভীষণ মনমরা হয়ে সন্ধ্যাবেলা গেলাম গণগোসলখানা বা আম-হাম্মামখানায়। সেখানে গিয়ে দেখি কী, আরে আমার পুরোনো বন্ধু সোক্রাতেস যে! তাকে দেখে চেনা ভার, এমন হাড় জিরজিরে মলিনমুখো হয়ে গেছে। একটা নোংরা, শতছিন্ন পুরোনো চাদরে কোনোরকমে শরীর আধখানা মুড়ে মাটিতে বসে আছে, ভিখারিদের মতো। আগে খুব দহরম-মহরম ছিল আমাদের মধ্যে। কিন্তু তবু চট করে তাকে সম্ভাষণ জানাতে কেমন একটু বাধল যেন। শেষে বলেই ফেললাম, ‘কী ব্যাপার, সোক্রাতেস! এসবের মানে কী? এমন বিতিকিচ্ছি অবস্থায় এখানে বসে আছিস কেন? কোনো অপরাধটপরাধ করিসনি তো? জানিস, খাতায়-কলমে তোকে মৃত ঘোষণা করা হয়ে গেছে? তোর পরিবার তোর জন্য শোক পালন করে কুলখানিও সেরে ফেলেছে? তোর সন্তানেরা এখন আদালতের পোষ্য। আর তোর হতভাগা বউ, সে তো কাঁদতে কাঁদতে চোখ প্রায় অন্ধ করে ফেলেছে। তাকে আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চাপাচাপি করছে সবাই। আর এখানে তুই বসে আছিস ভূতের মতো! তুই তো আচ্ছা গাড়ল একটা!’
“সোক্রাতেস বলল, ‘শোন আরিস্তোমেনিস, ভাগ্য যে একটা লোককে নিয়ে কত ছিনিমিনি খেলতে পারে, তুই যদি একবার শুনতি, এভাবে বলতে পারতি না।’ বলে লজ্জায় রক্তিম হয়ে চাদরে মুখ ঢাকল সোক্রাতেস। সেটা করতে গিয়ে তার শরীরের নিচের অংশ বেরিয়ে পড়ল।
“আর থাকতে পারলাম না। তাকে ধরে মাটি থেকে তোলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু জেদি ভঙ্গিতে গাঁইগুঁই করল সে। ‘আমাকে ছেড়ে দে! বিধিলিপি যা খুশি, আমাকে নিয়ে তা-ই করতে থাকুক, যতক্ষণ খুশি, যেভাবে খুশি।’
“জোরাজুরির একপর্যায়ে সে উঠে আসতে রাজি হলো। আমার দুটো চাদরের একটা খুলে তাকে দিলাম। দ্রুত ঠেলে ঢুকিয়ে দিলাম একটা খাস হাম্মামঘরে। ব্যাপক ঘষে আর দলাইমলাই করে গা থেকে কয়েক স্তরের ময়লা সাফ করে দিলাম। তারপর তাকে নিয়ে এলাম আমার সরাইখানায়। একটা তোশকে বসিয়ে খাবারদাবার আর পানীয় খেতে দিলাম। বাড়ির খবরাখবর জানালাম তাকে। পেটে দানাপানি পড়ায় একটু চাঙা হলো সোক্রাতেস। টুকটাক ঠাট্টা-তামাশাও করতে শুরু করল। মাঝেমধ্যে হেসে উঠছে শব্দ করে। তারপর হঠাৎ ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপাল চাপড়ে বলে উঠল, ‘কী যে পোড়া কপাল আমার। লারিসায় গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই দেখতে গিয়েই বিপত্তির শুরু। মাসিদোনিয়ায় গিয়েছিলাম বাণিজ্যের কাজে। সেখানে কিছু টাকাপয়সা কামিয়ে ১০ মাস পর বাসায় ফিরছি। লারিসা শহরে ঢোকার মুখে একটা বন্য উপত্যকায় পড়লাম ডাকাতের খপ্পরে। বলতে গেলে সবকিছুই নিয়ে গেল ডাকাত দল। শুধু প্রাণটুকু নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে কোনোক্রমে পৌঁছালাম শহরে। শহরে একটা সরাইখানায় গিয়ে উঠলাম। সেটা চালায় মেরো নামের এক মেয়েলোক। আমি তাকে ঘটনা সব খুলে বললাম। মনে হলো, আমার জন্য সহমর্মী হয়েছে মহিলা। জম্পেশ রাতের খাবার রেঁধে দিল বিনা পয়সায়। কিন্তু সে আসলে এক কুহকিনী। আমাকে জাদুটোনা করে তার দাস বানিয়ে ফেলল। তার কারণেই আজ আমার এই দুর্দশা।’
“আমি রেগে গিয়ে বললাম, যে লোক ঘরগেরস্ত ফেলে এ রকম বিদেশবিভূঁই এক কুহকিনীর দাস হয়ে পড়ে থাকতে পারে, তার এমন পরিণতিই হওয়া উচিত।
“সোক্রাতেস ঠোঁটে আঙুল চাপা দিয়ে বলল, ‘শ্‌শ্...! ওই ডাকিনীর বিরুদ্ধে কিছু বলিস না দোস্ত। শুনে ফেললে সর্বনাশের অন্ত থাকবে না।’
“‘তাই নাকি? জাদুটোনায় খুব পাকা বলছিস? খুব এলেমদার?’
“‘কসম কেটে বলছি, জাদুটোনায় মেরোর চেয়ে এলেমদার কেউ নেই। ও চাইলে আকাশকে মাটিতে নামিয়ে আনতে পারে, মাটিকে তুলে দিতে পারে আকাশে। ও যদি চায় নদীর স্রোত থেমে যাবে, চোখের নিমেষে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে পাহাড়। মৃত লোককে পায়ের ওপর দাঁড় করিয়ে দিতে পারে ও, দেবতাদের ফেলে দিতে পারে সিংহাসন থেকে। ইচ্ছা করলে ও নক্ষত্রদেরও নিভিয়ে দিতে পারে।’
“‘আরে রাখ এইসব জারিজুরি। ও মহিলা মায়াজালে তোকে বশ করেছে বলে তোর এমন মনে হচ্ছে। আসলে তো সব বুজরুকি।’
“‘না রে দোস্ত। বুজরুকি না। আমি নিজে দেখেছি। শুধু গ্রিক না, ভারতীয়, মিসরীয় নানা জাতের লোকজনকে দাস বানিয়ে রেখেছে সে। একবার এক দাস তাকে ঠকানোর চেষ্টা করেছিল। কী এক মন্ত্র পড়ল শুধু, সেই লোক উদ্বিড়ালে পরিণত হলো। প্রতিবেশী আরেক সরাইখানার মালিক ছিল তার ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী। রেগে গিয়ে তাকে একটা ব্যাঙ বানিয়ে দিল এই মহিলা। এখন সেই লোক নিজের সরাইখানায় নিজের বানানো চৌবাচ্চায় সাঁতার কেটে বেড়ায়। একবার ডাকিনী-যোগিনী হওয়ার অভিযোগে আদালতে মামলা ঠুকে দিয়েছিল কেউ তার বিরুদ্ধে। সেখানে যে উকিল তার বিরুদ্ধে আদালতে ওকালতি করেছে, তাকে সে ভেড়া বানিয়ে রেখেছে। আদালত চত্বরে গেলেই তাকে দেখতে পাবি। ঘুরে বেড়াচ্ছে আর ব্যা ব্যা করছে। আরেকবার তারই এক দাসের বউ তাকে তুমুল গালিগালাজ করেছিল। রেগে গিয়ে মেরো তাকে এমন অভিশাপ দিয়েছে, সেই মহিলার শরীর ফুলতে ফুলতে এখন হাতির সমান হয়ে গেছে।’
“‘সবাই যেদিন এসব জানবে, সেদিন কী হবে?’
“‘কী আর হবে! শোন বলি, একবার বিচার-সালিস বসেছিল তার বিরুদ্ধে। পরদিন তাকে পাথর নিক্ষেপ করে মেরে ফেলা হবে, সাব্যস্ত হলো। একটা দিন হাতে পাওয়াই যথেষ্ট মেরোর জন্য। রাতের বেলা নিজের কক্ষে একটা গর্ত খুঁড়ে তার সামনে নানা রকম সাধন-ভজন করল সে। তারপর হাইপাতা শহরের সবার দরজায় এমন এক বাণ মেরে দিল, পরদিন কারও দরজা আর খোলে না। খোলে না তো খোলেই না, সাতটা হাতি দিয়ে টানাটানি করলেও না। আটচল্লিশ ঘণ্টায় কেউ বাড়ির বাইরে পা রাখতে পারল না। এমনকি দেয়ালের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ কাটার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। শেষে জানালাপথে সবাই মেরোর উদ্দেশ্যে সে কী কাকুতি-মিনতি। সবাই কসম কেটে বলল, এ যাত্রা তাদের ছেড়ে দিলে তারা কেউ আর তাকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবে না। বরং তার যাতে কোনো অনিষ্ট কেউ করতে না পারে, এখন থেকে সেটাই হবে তাদের প্রধান দায়িত্ব। তখন মেরোর মন গলল, জাদুর প্রভাব সরিয়ে নিল সে। তবে সালিস সভার মাতবর লোকটাকে সে ছাড়ল না। মাঝরাতে এমন এক বাণ মারল, জানালা-কপাট, দেয়াল-দস্তুরসহ পুরো বাড়িটা তার উড়ে গিয়ে পড়ল ১০০ মাইল দূরের আরেকটা শহরে। সেই শহর এক পাহাড়ের চূড়ায়। পানিটানি নেই। বৃষ্টির পানি সম্বল। শহরের সব বাড়ি এমন গা-ঘেঁষাঘেঁষি যে, এই মাতবরের বাড়ির জন্য কোনো জায়গা সেখানে ছিল না। ফলে তার বাড়িটা শহরের মূল ফটকের বাইরে পাহাড়ের ঢালে কাত হয়ে ঝুলে রইল।’
“আমি বললাম, ‘দ্যাখ, যা শোনাচ্ছিস, ভয়ংকর লাগছে। একটু একটু যে ভয় পেতে শুরু করেছি, সেটা অস্বীকার করব না। একটু কী, ভীষণ ভয়ই লাগছে আসলে। ধর যে, তার পোষা প্রেতাত্মা-টেতাত্মারা যদি কোনোভাবে শুনে ফেলে আমাদের এসব কথাবার্তা, আর গিয়ে মেরোর কানে দেয়, কী হবে? তার চেয়ে চল দোস্ত, কথা না বাড়িয়ে শুয়ে পড়ি। রাত এখনো বাড়েনি। কাল ভোরে উঠেই চম্পট দেব। পা চালিয়ে এ শহর থেকে যত দূরে সরে পড়া যায়, যাব। এখানে আর এক দণ্ড না।’
“আমি কথা শেষ করেছি কি করিনি, দেখি সোক্রাতেস নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। বুঝলাম, ক্লান্ত শরীরে ভরপেট খানাদানার ফল। শোয়ার ঘরের দরজা ভালো করে খিল এঁটে দিলাম। আমার খাট টেনে এনে দরজায় পাল্লার বিপরীতে ঠেস লাগিয়ে দিলাম। তোশক ঝেড়েটেড়ে শুয়ে পড়লাম তার ওপর। কিন্তু ঘুম তো আসে না। সোক্রাতেসের গল্প খালি মাথায় ঘুরছে। মাঝরাতের দিকে একটু তন্দ্রামতন লেগেছে, বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। দড়াম করে খুলে গেল দরজার পাল্লা। একদল ডাকু একসঙ্গে ধাক্কা দিলেও এত জোরে খোলা সম্ভব ছিল না দরজা। ছিটকিনি, কব্জা, খিল, হুড়কা সব খুলে ছিটকে গেল, এমনকি আমার খাটিয়াটাও। এমনিতেই ঘুণে ধরা খাটিয়া, একটা পা নড়বড়ে, সেটা শূন্যে উঠে উল্টো হয়ে পড়ল আমারই গায়ের ওপর। আমি নিচে, আমার ওপরে খাটিয়া।
“মানুষের মন বড় বিচিত্র কাণ্ড করে। ওই দুর্যোগের মধ্যেও কী মনে করে আমি মশকরা করলাম। নিজেকে বললাম, ‘দ্যাখ বাবা আরিস্তোমেনিস, তুই কেমন কচ্ছপে পরিণত হয়েছিস!’ মেঝেতে চিতপটাং খাটিয়াচাপা হয়ে আছি বটে, কিন্তু টের পেলাম, এতে কিছুটা বরং নিরাপদেই আছি আমি। কচ্ছপ যেমন নিজের খোলসের মধ্যে নিরাপদ থেকে কেবল মাথাটা বের করে, সেভাবে খাটিয়ার খোলসের ভেতর থেকে মাথা বের করে উঁকি দিলাম। দেখি বিকট দর্শন দুই বুড়ি মহিলা ঢুকল ঘরের ভেতর। তাদের একজনের হাতে জ্বলন্ত মশাল। আরেকজনের এক হাতে এক টুকরো স্পঞ্জ, আরেক হাতে খোলা তরবারি। তারা দু’জন গিয়ে দাঁড়াল ঘুমন্ত সোক্রাতেসের সামনে। এক বুড়ি আরেক বুড়িকে বলল, ‘দ্যাখ বোন পানথিয়া, এই সেই বিশ্বাসঘাতক। একে আমি খাইয়ে-পরিয়ে কত যত্নে রেখেছিলাম, কিন্তু এ দিন-রাত আমার সঙ্গে চালাকি করেছে। কৃতজ্ঞতার কোনো ছিটেফোঁটা তো নে-ই এর মধ্যে, এখন উল্টো শহরজুড়ে আমার নামে বদনাম করে বেড়াচ্ছে। পালিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করছে আমার কাছ থেকে। কী ভেবেছে, পালিয়ে গেলে আমি ওর জন্য কান্নাকাটি করব?’ এই বলে বুড়ি আমার দিকে ফিরল। ‘আর ওই যে ওখানে খাটিয়ার তলা থেকে উঁকি দিচ্ছে, এই পাজিটা হলো আরিস্তোমেনিস। ও-ই ফুঁসলেছে আমার সোক্রাতেসকে। এরা দু’জন যদি ভেবে থাকে, আমার নাগপাশ কেটে পালিয়ে যেতে পারবে, এর চেয়ে গর্দভ আর হয় না। আজ রাতে আমাকে নিয়ে কী সব বাজে বাজে কথাই না বলেছে এটা। দেখব, কেমন সন্তাপ করে মরে এ পাজি।’
“আমার শরীরজুড়ে শীতল ঘাম ছুটতে শুরু করল। ভয়ে এমন থরহরি কাঁপতে লাগলাম যে খটাখট আওয়াজ তুলে খাটটা আমার ওপর নাচতে লাগল।
“ততক্ষণে বুঝে গেছি, এই দুই বুড়ির একজন যদি পানথিয়া হয়, তো আরেক বুড়ি মেরো ছাড়া আর কেউ নয়। পানথিয়া মেরোকে বলল, ‘বোন, একে কি এখনই কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলব, নাকি বেঁধে করাতকলে উঠিয়ে দেব, যাতে ধীরে ধীরে শরীর কেটে দুই টুকরো হওয়া তারিয়ে তারিয়ে দেখতে পারি?’
“‘কিছু করতে হবে না। পাজিটাকে রেখে দে। কাল সোক্রাতেসের কবর খোঁড়ার জন্য একজন তো লাগবে।’
“এই বলে ঘ্যাঁচ করে ঘুমন্ত সোক্রাতেলের গলায় তরবারি চালিয়ে দিল মেরো। একটা মৃদু আওয়াজ তুলেই আমার বন্ধু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
“গলা দিয়ে ফিনকির মতো রক্ত ছুটছে। স্পঞ্জ দিয়ে রক্ত মুছে ফেলল সিনথিয়া। তারপর কেটে যাওয়া ক্ষতের ভেতরে স্পঞ্জটা ঢুকিয়ে দিতে দিতে মন্ত্র পড়ল :
‘স্পঞ্জ রে স্পঞ্জ, বলি তোকে, লোনা সাগর জল
না যেন মেশে নদীর জলে, সাবধানে তুই চল’
“এবার দুই বুড়ি আমার কাছে এলো। খাটিয়া সরিয়ে দু’জনে আমার বুকের ওপর বসল। তীব্র চোখে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ আমার দিকে। তারপর উঠে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। তারা বেরোনোমাত্র দরজার পাল্লা আপনাআপনি মেঝে থেকে উঠে চৌকাঠের সঙ্গে লেগে গেল; কব্জা, হুড়কা, ছিটকিনি সব যে যার জায়গায় টুপটুপ করে বসে গেল আগের মতো।
“মেঝেতে চিত হয়ে পড়ে আছি। ঠাণ্ডায় জমে গেছে শরীর। বেঁচে আছি বটে, কিন্তু এর চেয়ে তো মরে যাওয়াই ভালো। কাল সকালে সবাই যখন সোক্রাতেসের মৃতদেহ আবিষ্কার করবে, আর দেখবে ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, তখন সবাই ধরে নেবে আমিই হত্যাকারী। কেউ কি বিশ্বাস করবে আমার ব্যাখ্যা? সবাই বলবে, দুটো অবলা মেয়েমানুষের সঙ্গে পেরে উঠতে পারেননি তো, বীরের মতো সাহায্যের জন্য চিৎকার-চেঁচামেচি করেননি কেন? অনেকে বলবে, আপনি এমন সোমত্থ, সুঠামদেহী একটা লোক, দুটি বুড়ি আপনার বন্ধুর গলা কাটছে, আর আপনি একটা টুঁ-শব্দও করলেন না? সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত অন্যরা বলবে, তো আপনার বন্ধুকে ওরা মেরে ফেলল, কিন্তু আপনার গায়ে আঁচড়টিও কাটল না, বিষয়টা কী? আপনাকে ওরা বাঁচিয়ে রাখল কেন? হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী রেখে দেওয়ার জন্য?
“শুয়ে আছি আর এসব সাতপাঁচ চিন্তা মাথায় ঘুরছে।
“রাত ফুরিয়ে আসছে। সাব্যস্ত করলাম, ভোরের আলো ফোটার আগেই গোপনে সটকে পড়তে হবে সরাইখানা থেকে।
“বাক্সপেটরা গুছিয়ে নিলাম। দরজার হুড়কা নামিয়ে রাখলাম। কিন্তু খানিক আগেও যে দরজা শত্রুদের ঢোকার জন্য অমন হাট হয়ে খুলে গিয়েছিল, এখন সেটা আমাকে বেরোতে দিতে রাজি না। তালায় চাবি ঢুকিয়ে এদিক ঘোরাই, ওদিক ঘোরাই, কাজ হয় না। অনেক কায়দা-কসরত, ঝাঁকাঝাঁকির পর তালা খুলল।
“বাইরের উঠানে পা রেখে হাঁক দিলাম, ‘বেয়ারা, এই বেয়ারা, কোথায় গেলি? গেট খুলে দে। ভোরের আগেই আমাকে বের হতে হবে।’
“গেটের গোড়ায় গুটিসুটি ঘুমিয়ে ছিল বেয়ারা। হাঁকডাকে আধজাগনা হলো সে। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলল, ‘কে? এই রাতের বেলা গেট খুলতে কে বলছেন? জানেন না বাইরে চোর-ডাকাত, বাটপার থিকথিক করছে? জানের মায়া আপনার না থাকতে পারে, বা কোনো অপকর্ম করে সটকে পড়ার ইচ্ছা আপনার থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু আপনার জন্য আমি নিজের জানটা এভাবে কোরবান করার ঝুঁকি নেব কেন? আমি দরজা খুলি আর ডাকুরা দলেবলে ঢুকে পড়ুক আরকি!’
“আমি ঝামটে উঠলাম, ‘ভোর হয়ে এসেছে, বুরবক কোথাকার! আর ডাকুরা তোর কী ক্ষতিটা করবে? তোর আছেটা কী? এত ভয় পাওয়ার কী হলো রে ডরপুক!’
“ঘুমের মধ্যে পাশ ফিরে শুলো বেয়ারা। বিড়বিড় করে বলল, ‘আমি কী করে বুঝব যে, ঘরের মধ্যে আপনি আপনার বন্ধুকে খুনটুন করে এখন রাতের অন্ধকারে সটকে পড়ার পাঁয়তারা করছেন না?’
“ঘুমন্ত বেয়ারার মুখে এ কথা শুনে আমি পাথর হয়ে গেলাম। চর্মচক্ষে নরকের ভেতরটা দেখতে পেলাম। দেখলাম, একটা ক্ষুধার্ত তিন মাথাওয়ালা কুকুর মুখ হাঁ করে আছে। আর সন্দেহ রইল না, মেরো আমাকে হত্যা না করে ছেড়ে দিয়েছে আরও বড় সাজা দেওয়ার জন্য। আমাকে ক্রুশে ঝোলানোর ফাঁদ পেতেছে সে।
“মেরোর পরিকল্পনা বানচাল করার একটাই উপায়।
“আমি আমার ঘরে ফিরে এলাম। গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়ব, যা থাকে কপালে!
“কিন্তু দড়ি পাই কোথায়? নিজের ভাঙা খাটখানার দিকে তাকালাম। ওটার উদ্দেশ্যে বললাম, ‘শোন খাট-খটাশ আমার, এই ত্রিভুবনে একমাত্র তুই-ই আমার আসল বন্ধু, আমার মতো তোকেও আজ নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। আমি যে নিষ্পাপ, তার একমাত্র সাক্ষী তুই। একটু দয়া কর। একটা কিছু দে, যেটা দিয়ে আমি আমার ভবলীলা সাঙ্গ করতে পারি। আমি আর বেঁচে থাকতে চাই না, খাট-খটাশ। এ জীবন রেখে আর কী হবে?’
“খাটিয়ার জবাব নিজে নিজে কল্পনা করে নিলাম। তারপর টেনে বের করলাম সেটার গাঁথুনির একটা দড়ি। এক প্রান্তে একটা ফাঁস বানিয়ে অপর প্রান্তে একটা হুঁকের মতো তৈরি করলাম। সেই প্রান্তটা জানালার শিকে আটকে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম খাটের ওপর। দড়ির ফাঁস গলিয়ে দিলাম গলায়। লাথি কষে সরিয়ে দিলাম খাটিয়া।
“আমার আত্মহত্যার চেষ্টা সফল হয়নি। দড়িটা ছিল পুরোনো আর ঝুরঝুরে। আমার দেহের ভারে সেটা পট করে ছিঁড়ে গেল। দড়াম করে আছড়ে পড়লাম মেঝেতে। কাশতে কাশতে গড়িয়ে গেলাম বন্ধু সোক্রাতেসের লাশের ওপর। কাছেই তোশকের ওপর ছিল তার লাশ।
“ঠিক সেই মুহূর্তে দারোয়ান ঢুকে পড়ল ঘরে। ঢুকেই চিৎকার, ‘এই যে আপনি! একটু আগে না আপনি চলে যাওয়ার তাড়া দেখাচ্ছিলেন খুব। এখানে কী করছেন আপনি? তোশকের ওপর ওভাবে গড়াগড়ি করে শূকরের মতো ঘোঁত ঘোঁত করছেন কেন?’
“আমি জবাব দেওয়ার জন্য মুখ খুলতে যাব, তড়াক করে উঠে বসল সোক্রাতেস। সেটা আমার দেহের চাপে, নাকি দারোয়ানের কর্কশ চিল্লানির চোটে, কে জানে। তবে সে যেন ঘুম ভেঙে এইমাত্র জেগে উঠেছে। আর আমাকে অবাক করে কড়া গলায় কথা বলে উঠল সোক্রাতেস। বলল, ‘শুনেছি মুসাফিররা গালিগালাজ করে সরাইখানার বেয়ারাদের। সেটা যে এমনি এমনি করে না, দেখতেই পাচ্ছি। ক্লান্ত শরীরে একটু ঘুমিয়েছি কি ঘুমাইনি, এই বেয়ারা দ্যাখো, দুমদাম শব্দে ঘরে ঢুকে পড়েছে। আর কী ভীষণ চিল্লাচ্ছে, দ্যাখো, ভেবেছে আমাদের নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে ঘর থেকে জিনিসপত্র হাতিয়ে নেবে। কয়েক মাসে প্রথম একটু ঘুমানোর মতো করে ঘুমিয়েছিলাম, পাজিটা আমার ঘুম নষ্ট করল।’
“সোক্রাতেসের গলার আওয়াজ শুনে আমি খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম। বেয়ারাকে বললাম, ‘আরে না, না! তুমি হলে দুনিয়ার সেরা বেয়ারা। তোমার মতো সৎ লোক হয়-ই না। কিন্তু এই যে ভালো করে তাকিয়ে দেখো, এ-ই আমার সেই বন্ধু, যাকে হত্যার ইলজাম তুমি লাগাতে চেষ্টা করছিলে আমার বিরুদ্ধে। দ্যাখো, দ্যাখো, এ-ই আমার বন্ধু, যাকে আমি নিজের বাপ-ভাইদের চেয়েও বেশি ভালোবাসি।’
“আনন্দের চোটে আমি সোক্রাতেসকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলাম। সোক্রাতেস ঝটকা মেরে আমাকে সরিয়ে দিল। বলল, ‘এহ! ছ্যা! তোর গা থেকে এমন বিশ্রী গন্ধ বেরোচ্ছে কেন রে? মনে হচ্ছে নর্দমার মধ্যে থেকে উঠে এসেছিস!’
“আমি তার হাত চেপে ধরে বললাম, ‘এখন আর কিসের জন্য অপেক্ষা? চল, এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ি। বাইরে ভোরের কী তাজা বাতাস।’
“‘নয়, কেন,’ বলে উঠে পড়ল সোক্রাতেস।
“আমার বাক্সপেটরা আরেক দফা পিঠে চাপালাম। সরাইখানার ভাড়া মিটিয়ে দিলাম বেয়ারাকে। দেখতে না দেখতে সোক্রাতেস আর আমি সদর রাস্তায় হাঁটছি।
“শহর ছাড়িয়ে কিছু দূর গেলাম। ভোরের আলোয় পল্লি গ্রাম উদ্ভাসিত হচ্ছে আমাদের চোখের সামনে। তখন প্রথমবারের মতো ভালো করে তাকালাম সোক্রাতেসের দিকে। বিশেষ করে নজর বোলালাম তার গলায়। তরবারির কোপটা কোথায় লেগেছিল বোঝার চেষ্টা করলাম। আঘাতের কোনো ক্ষতচিহ্নই নেই। না কোনো কাটা দাগ, না কোনো স্পঞ্জ উঁকি মারছে। ভাবলাম, কী ভয়ানক দুঃস্বপ্ন রে বাবা! নিশ্চয়ই বেশি মদ পান করে ফেলেছি বলেই এই বিপত্তি। শব্দ করে বলে উঠলাম, ‘ডাক্তাররা কী আর এমনি এমনি বলে, রাতে ভরপেট খেয়ে শুরা পান কোরো না, দুঃস্বপ্নের চোটে ঘাম ছুটে যাবে। উফ্! কী ভীষণ স্বপ্নই না দেখলাম কাল রাতে। দেখি সারা গা রক্ত মাখামাখি।’
“সোক্রাতেস হেসে উঠল। ‘রক্তের কথা বলছিস! আমিও রাতে ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখলাম। তুই বলার পর এখন মনে পড়ছে : স্বপ্নে দেখলাম যে, কেউ আমার গলা কেটে ফেলেছে। কাটা জায়গাটায় ভীষণ ব্যথাও অনুভব করছিলাম। তারপর কেউ আমার হৃৎপিণ্ডটা টেনে বের করে ফেলল। সেটা এমন অবর্ণনীয় এক অনুভূতি, এখন চিন্তা করলেও কেমন অস্বস্তি লাগছে, হাঁটু কাঁপছে, মনে হচ্ছে যেন এখনই বসে পড়ি পথের ওপর। তোর কাছে খাবারদাবার কিছু থাকলে দে, দোস্ত।’
“পিঠের ঝোলা খুলে রুটি আর পনির বের করলাম। ‘ওই বড় বটগাছটার নিচে গিয়ে নাশতা সারি, চল।’
“দু’জনে খেতে বসার পর লক্ষ করলাম, সোক্ৰাতেসের মধ্যে আগের তরতাজা ভাব ততটা নেই। কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে ওকে। গোগ্রাসে খাচ্ছে বটে, কিন্তু তার মুখমণ্ডল ক্রমেই বর্ণহীন হয়ে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে আমার চেহারাতেও নিশ্চয়ই ও রকমই ফ্যাকাশে ভাব ছড়িয়ে পড়েছে, কেননা ওই দুই ভয়ংকর বুড়ির চেহারা ভেসে উঠছে আমার মনের মধ্যে। গত রাতের সব আতঙ্ক হঠাৎ গ্রাস করল আমাকে। এক টুকরো রুটি ছিঁড়ে মুখে দিতে সেটা গলায় আটকে গেল। গিলতে পারি না, ওগরাতেও পারি না। ধীরে ধীরে উদ্বেগে ছেয়ে যাচ্ছে মন। সোক্রাতেস কি বাঁচবে? বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোকজনের চলাফেরা শুরু হয়েছে। তারা যখন দেখবে, একসঙ্গে হেঁটে যেতে যেতে একটা লোক রহস্যজনকভাবে মারা গেল, তখন স্বাভাবিকভাবেই অপর সঙ্গীর প্রতি সন্দেহ জাগবে তাদের। গোগ্রাসে খেয়ে রুটি আর পনির একাই সাবাড় করল সোজাতেস। তারপর বলল, খুব তেষ্টা পেয়েছে তার। কয়েক গজ দূরে একটা নালা বয়ে গেছে। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ তার নিস্তরঙ্গ পানি। রাস্তা থেকে দেখা যায় না নালাটা। আমি ডাকলাম, ‘এখানে আয় সোক্রাতেস। দ্যাখ, দুধের চেয়েও সুস্বাদু পানি। চল, খেয়ে নেই।’ জায়গা থেকে উঠে দাড়াল সে। হেঁটে এলো খালের পাড়ে। একটা জুতসই জায়গা খুঁজে উবু হয়ে বসে গপগপ করে খেতে লাগল পানি। কিন্তু পানি খাওয়ামাত্র তার গলার কাঁটা ক্ষত আবার খুলে গেল, সেখান দিয়ে বেরিয়ে এলো সেই স্পঞ্জ, টুপ করে সেটা পড়ল খালের পানিতে। টপটপ করে পানিতে পড়তে লাগল রক্তের ফোঁটা। আমি ছুটে এসে ওর একটা পা ধরে না ফেললে সোক্রাতেস গড়িয়ে পানিতে পড়ে যেত। টেনে তাকে ডাঙায় তুললাম। ততক্ষণে মরে পাথর হয়ে গেছে সোক্রাতেস।

“তড়িঘড়ি অন্ত্যেষ্টি সারলাম। বালুময় মাটি হাত দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে গর্ত করলাম একটা। সেখানে খালের পাড়ে চিরনিদ্রায় শায়িত করলাম বন্ধুকে। তারপর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে, ঘামতে ঘামতে মাঠের মধ্য দিয়ে ছুটতে থাকলাম। বারবার দিক বদলাচ্ছি আর ছুটছি, হোঁচট খেয়ে পড়ছি, উঠে আবার ছুটছি, থামছি না একবারও। ছুটছি জনহীন প্রান্তরের সন্ধানে, আমাকে কেউ যেন খুঁজে না পায়।
“ইজিনা দ্বীপে নিজের বাস্তুভিটায় আর ফিরিনি আমি। নিজেকে বন্ধুর হত্যাকারী মনে হয় আমার। বিবেক দংশনে আমি আমার জন্মভূমি পরিত্যাগ করেছি, চিরতরে ছেড়ে গেছি আমার ব্যবসা-বাণিজ্য, আমার স্ত্রী, আমার সন্তানকে। ইতোলিয়ায় নির্বাসিত জীবন বেছে নিয়েছি আমি। সেখানেই বিয়েথা করেছি।”

আরিস্তোমেনিসের গল্প শেষ হলো। তার সঙ্গী যে লোকটা আগে এই গল্প একবর্ণও বিশ্বাস করেনি, সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি আমার গোটা জীবনে একসঙ্গে এত উদ্ভট বাকোয়াজি শুনিনি। এর চেয়ে গাঁজাখুরি কাহিনি কারও পক্ষে বলা সম্ভব নয়। পোশাক-আশাকে আপনাকে তো শিক্ষিত লোক বলেই মনে হয়। তা ভাই, আপনি নিশ্চয়ই এ গল্প সত্যি বলে বিশ্বাস করেননি, তাই না?”
আমি বললাম, “বলতে কী, এই দুনিয়ায় অসম্ভব বলে কিছু আছে, সেটা আমি মানি না। আমাদের জীবনে এমন ঘটনা মাঝেমধ্যে ঘটে, যেগুলো এত মাথামুণ্ডুহীন, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। সাধারণ লোকে সেটাকে আজগুবি বলে উড়িয়ে দিতে পারে বটে। সত্যি বলতে, আরিস্তোমেনিসের গল্প আমি বিশ্বাস করছি। গল্প বলে আমার পথচলার সময়টা আনন্দে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। তার গল্পে বিভোর ছিলাম বলে বুঝতেই পারিনি, পাহাড়ের এমন খাড়া চড়াই বেয়ে কখন উঠে পড়েছি। ওই যে দেখুন, ওটা নিশ্চয়ই শহরে ঢোকার প্রধান ফটক। ঘোড়ার না চেপে শুধু পায়ে হেঁটে এত পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছি, বিশ্বাস করাই কঠিন। আমার ঘোড়াও নিশ্চয়ই আপনাদের ধন্যবাদ জানাবে। আরিস্তোমেনিস তার খাটুনি কমিয়ে দিয়েছে।”
একটু যেতেই আমাদের পথ আলাদা হয়ে গেল। বাঁ দিকের রাস্তা নিল লোক দুটো, কিছু দূর গিয়ে একটা লোকালয়ে মিশেছে রাস্তাটা। সোজা হাঁটতে থাকলাম হাইপাতা শহরের দিকে— আরিস্তোমেনিসের গল্প বিশ্বাস করলে, এ শহরেই বসবাস ভয়ংকর সেই ডাকিনীর।

ওসিআর ও প্রুফরিড : মোঃ আশিকুর রহমান

Latest
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য