ভীষণ অরণ্য - রকিব হাসান (তিন গোয়েন্দা - ২০) || পর্ব - ০১


অ-     অ+


প্রথম প্ৰকাশ : আগস্ট, ১৯৮৮
টাইপ করেছেন : যুবাইর আহমেদ


এক

“হ্যাঁ, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নদী দেখবে,” গল্প করছে কুইটো হোটেলের মালিক ডেবিটো ফেরিও। “দেখবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জঙ্গল। বেশিরভাগ জায়গাতেই এখনও সভ্য মানুষের পায়ের ছাপ পড়েনি। খাবারের গুদাম বলা চলে ওটাকে। একদিন সারা দুনিয়াকে খাওয়াবে ওই আমাজন…”
লোকটার বকবক ভালো লাগছে না কিশোর পাশার। তাকে থামানোর জন্যে স্টাফ করা মস্ত এক কুমির দেখিয়ে বলল, “এত বড় কুমির সত্যি আছে আমাজনে? আমি তো জানতাম…”
“এর চেয়ে বড়ও আছে। জানোয়ার চাও তো? পাবে। এত আছে ওখানে, নিয়ে কূল করতে পারবে না। পৃথিবীর অন্য সব জানোয়ার এক করলেও এত রকমের হবে না। ভুল বললাম, মিস্টার আমান?” মুসার বাবাকে সাক্ষী মানল ফেরিও।
জন্তু-জানোয়ার সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান মিস্টার আমানের। ভালো শিকারী। হলিউডে এক সিনেমা কোম্পানিতে খুব উঁচু দরের টেকনিশিয়ানের কাজ করেন। কিন্তু সুযোগ পেলেই অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে পড়েন— চলে যান শিকারে, কিংবা সাগর, হ্রদে মাছ ধরতে। কি শিকার করেননি তিনি? মেক্সিকোর কলোরাডোতে পার্বত্য সিংহ, আলাস্কায় গ্রিজলি ভালুক, এমনকি একবার তিমি শিকারীদের সঙ্গে গিয়ে তিমিও ধরেছেন। আফ্রিকার হাতি-মোষ আর চিতা-সিংহ তো মেরেছেনই।
“কেউ জানে না,” ঘুরিয়ে বললেন তিনি, “কত রকমের জানোয়ার আছে ওখানে। ওই যে বললেন, বেশিরভাগ জায়গাতে এখনও যেতে পারেনি সভ্য মানুষ। তাই ঠিক করেছি, নতুন জায়গায় যাব আমরা। যেখানে আগে কেউ যায়নি। প্যাসটাজা নদীর কথাই ধরুন।”
“প্যাসটাজা!” আঁতকে উঠল ফেরিও। “বলেন কি, সাহেব? মারা পড়বেন, মারা পড়বেন। অ্যানডোয়াজের ওধারেই যেতে পারেনি কেউ। গত বছর দু’জন শ্বেতাঙ্গ চেষ্টা করেছিল। পারেনি। ইন্ডিয়ানরা ধরতে পারলে,” হাত তুলে একটা জিনিস দেখালো সে। “ওরকম করে ছেড়ে দেবে।”
হোটেলের লবিতে বসে কথা হচ্ছে। ফায়ারপ্লেসের ওপরে তাকে রাখা আছে অদ্ভুত জিনিসটা। মানুষের একটা সঙ্কুচিত মাথা, কমলার সমান।
কাছে গিয়ে জিনিসটা ভালোমতো দেখল মুসা আমান। ছোঁয়ার সাহস হলো না। “জিভারো ইন্ডিয়ানদের কাজ?”
“হ্যাঁ,” মাথা নোয়াল ফেরিও। “তবে তোমরা যেখানে গিয়েছিলে, ওখানকার জিভারো নয়, ওরা অনেক ভদ্র। ফাঁকিফুঁকি দিয়ে ছুটে এসেছ। এখন যেখানে যেতে চাইছ, ওরা ধরতে পারলে…”
“ছাড়বে না বলছেন?” একটা রেফারেন্স বই পড়ছিল রবিন মিলফোর্ড, মুখ তুলল। “কিন্তু আমি যদ্দূর জানি, আজকাল আর বিদেশিদের মাথা কেটে ট্রফি বানায় না ওরা। শুধু শত্ৰু আর আত্মীয় যারা মারা যায়…”
জোরে জোরে মাথা নাড়ল ফেরিও। “জিভারো ব্যাটাদের আমি বিশ্বাস করি না। তোমাদেরকেই যদি শত্রু ভেবে বসে?”
অকাট্য যুক্তি। চুপ হয়ে গেল রবিন।
কিশোর তাকিয়ে আছে মাথাটার দিকে। জিভারোরা ধরতে পারলে কি করবে, আপাতত সেসব নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই, সে ভাবছে অন্য কথা। রকি বিচ মিউজিয়ামে ওই জিনিস নেই। ওটা পেলে ভালো দাম দেবে ওরা। ব্যবসা করতে যখন নেমেছে, সব কিছুকেই ব্যবসায়ীর চোখে দেখা উচিত। জন্তু-জানোয়ার ধরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করবে চিড়িয়াখানা, সার্কাস পার্টি আর জানোয়ার পোষে এমন সব সংগঠনে। সেই সঙ্গে দু-চারটে অন্য জিনিস— যেগুলোতে টাকা আসবে— নিতে ক্ষতি কি? “ওটা বিক্রি করবেন?”
দ্বিধায় পড়ে গেল ফেরিও।
তাড়াতাড়ি বললেন মিস্টার আমান, “যা বলেছ বলেছ, আর মুখেও এনো না। ওরকম একটা অফার দিয়েছ শুনলেই ধরে নিয়ে গিয়ে জেলে ভরবে পুলিশ। মাথা বেচাকেনার ব্যাপারে আইনের খুব কড়াকড়ি চলছে এখানে। যারা আগে নিয়ে ফেলেছে, ফেলেছে। তবে ছাগল কিংবা ঘোড়ার চামড়ায় তৈরি নকল জিনিস নিতে পারো।”
রহস্যময় হাসি হাসল ফেরিও। “আমি কিন্তু বলে দিতে পারি, আসল মাথা কোথায় পাবে।”
“কোথায়?” সামনে ঝুঁকল কিশোর।
“জিভারো ইন্ডিয়ানদের কাছে।”
“ওদের কাছ থেকে আনলে আইন কিছু বলবে না?”
“না। যদি মাথাটা ইন্ডিয়ানদের কারও হয়।”
“হুঁ, অনেক আইনেই গলদ থাকে,” বিড়বিড় করল কিশোর। “যাকগে, মাথা পাওয়া দিয়ে কথা আমার, পেলেই হলো, যেখান থেকেই হোক।”
“ওখানে না গেলেই কি নয়?” হাত নাড়ল মুসা, অস্বস্তি বোধ করছে। “বাবা, আমাদের তো যাওয়ার কথা ছিল আমাজনে। প্যাসটাজায় কেন আবার?”
জবাবটা দিল রবিন, “প্যাসটাজা নদী আমাজনের প্রধান পানির উৎসগুলোর একটা। আমাজন কোনো মূল নদী নয়, অনেকগুলো জলধারার মিশ্রণ। ওগুলোর জন্ম হয়েছে আবার অ্যান্ডিজ পর্বতমালার বরফগলা পানি থেকে। প্যাসটাজা তারই একটা। এবং এটার ব্যাপারে ভৌগোলিকদের আগ্রহও খুব। কারণ এর বেশিরভাগ অঞ্চলই ম্যাপে নেই, চার্ট করা যায়নি।”
“কাজেই এমন একটা জায়গা দেখার লোভ ছাড়ি কি করে?” যোগ করলেন মিস্টার আমান। “কেন, তোমার ভয় করছে?” ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন।
“ভয়?” ট্রফিটার দিকে আরেকবার তাকাল মুসা। “তা তো করবেই। মাথাটা আলাদা করে দিলে তো গেলাম।”
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল হোটেলের একজন কর্মচারী। হাতে একটা খাম। বাড়িয়ে দিল।
খামটা নিয়ে ছিঁড়লেন মিস্টার আমান। ভাঁজ করা ছোট এক টুকরো কাগজ বের করলেন। টেলিগ্ৰাম। পড়তে পড়তে ভুরু কুঁচকে গেল। বিশ্বাস করতে পারছেন না যেন। দু’বার, তিনবার পড়লেন লেখাটা।
“কি?” এগিয়ে এলো কিশোর। “খারাপ খবর?”
“অ্যাঁ? না,” হঠাৎ হেসে ফেললেন তিনি। “আমাদের সঙ্গে রসিকতা করছে কেউ।”
“দেখি তো।” কাগজটা নিয়ে পড়ল কিশোর। লেখা রয়েছে :
রাফাত আমান,
কুইটো হোটেল,
কুইটো,
ইকোয়াডর।
“আমাজন খুব খারাপ জায়গা, দূরে থাকলেই ভালো করবেন। বাড়ির অবস্থা ভালো নয়, জলদি ফিরে যান।”
কে পাঠিয়েছে নাম নেই।
টেলিগ্রামটা এসেছে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে।

Latest
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য