ড্রাকুলা - ব্রাম স্টোকার (রূপান্তর : রকিব হাসান) || পর্ব-০১

এক


জোনাথন হারকারের ডায়েরি থেকে
৩ মে, বিসট্রিজ।
মিউনিক ছেড়েছিলাম পয়লা মে, রাত আটটা পঁয়তিরিশে। সারা রাত একটানা চলেও পরদিন ভোরে ভিয়েনায় পৌঁছে দেখা গেল এক ঘণ্টা লেট করে ফেলেছে ট্রেন। আবার একটানা চলা। ট্রেনের কামরা থেকে এক নজর দেখে অপূর্ব লাগল বুদাপেস্ট। দানিয়ুব নদীর ওপর তুরস্কীয় কায়দায় গড়া পাশ্চাত্যের সবচে’ সুরম্য চওড়া ব্রিজটা পেরুবার সময়ই টের পেলাম পশ্চিম ইউরোপ ছেড়ে পুবের দিকে পাড়ি জমিয়েছি আমরা। বুদাপেস্টে নেমে খানিকক্ষণ ঘুরে ফিরে দেখলাম শহরটা। স্টেশন ছেড়ে বেশি দূর যেতে সাহস পেলাম না, কি জানি যদি ট্রেনটা আবার আমাকে ফেলে রেখেই চলে যায়। স্টেশনে ফিরে দেখলাম ট্রেন ছাড়ে ছাড়ে। আর কয়েক মিনিট দেরি হলেই মিস করতাম ট্রেন। যথাসময়েই অর্থাৎ সন্ধ্যের পরপরই ক্লাসেনবার্গে পৌঁছে গেল ট্রেন। রাত কাটাবার জন্যে স্টেশনের কাছেই একটা হোটেলে উঠলাম। কার্পেথিয়ানদের জাতীয় খাদ্য প্যাপরিকা— সাংঘাতিক ঝাল দেয়া মুরগির মাংস দিয়ে রাতের খাওয়া সেরেই শুয়ে পড়লাম। তুলতুলে নরম পালকের বিছানায় শুয়েও কিন্তু ঘুম এলো না। গত কয়েক দিনের কথা একসঙ্গে এসে ভিড় জমাল মনে। একটা বিশেষ কাজে কার্পেথিয়ান পর্বতমালার ঠিক হৃৎপিণ্ডে অবস্থিত ইউরোপের সবচেয়ে অখ্যাত আর দুর্গম এক জায়গায় চলেছি আমি। লন্ডন ছাড়ার আগেই ব্রিটিশ মিউজিয়ামে খুঁজে-পেতে এ পর্যন্ত ট্রানসিলভেনিয়া সম্পর্কে যে সমস্ত বই বা মানচিত্র বেরিয়েছে তা জোগাড় করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তেমন কিছু পাইনি। দেশটা সম্পর্কে বাইরের লোকে বিশেষ কিছু জানে না দেখে একটু অবাকই হয়েছিলাম। অনেক খোঁজ-খবর করে শুধু এটুকুই জানতে পেরেছিলাম, কাউন্ট ড্রাকুলার দুর্গ, অর্থাৎ যেখানে চলেছি আমি, সে জায়গাটা ট্রানসিলভেনিয়ার একেবারে পুব প্রান্তে। কোনো মানচিত্র বা বইপত্রের কোথাও কাউন্ট ড্রাকুলার দুর্গের কোনো উল্লেখই নেই। দু’একজন প্রাচীন লোকের মুখে জায়গাটার শুধু নামটা শুনেছি আমি।
ক্লাসেনবার্গে পৌঁছে দেখলাম কাউন্ট ড্রাকুলার পূর্বপুরুষদের আমলে প্রতিষ্ঠিত শহর বিসট্রিজ এখানকার লোকদের বেশ পরিচিত, কিন্তু কাউন্ট ড্রাকুলা সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে চায় না, কেন বুঝলাম না। এসব ভাবতে ভাবতেই একটু তন্দ্ৰা মতো এলো। কিন্তু অদ্ভুত সব দুঃস্বপ্ন দেখে সে তন্দ্ৰাও ছুটে গেল বার বার। গ্লাসের পর গ্লাস পানি খেয়েও তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারলাম না। পিপাসা যেন মিটছেই না। ভোর রাতের দিকে বোধহয় একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ঘুম ভাঙল কড়া নাড়ার তীক্ষ্ণ শব্দে। লাফ দিয়ে উঠে দরজা খুলে দিতেই পরিচারক জানালো আমার যাত্রার সময় হয়ে এসেছে।
হাত-মুখ ধুয়ে নাস্তা খেয়ে স্টেশনে পৌঁছতে পৌঁছতে সাতটা বেজে গেল। কিন্তু স্টেশনে এসে দেখলাম তখনও ট্রেন আসেনি, অর্থাৎ এ লাইনের যা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার— ট্রেন লেট। টের পাচ্ছি, যতই পুবে এগোচ্ছি ততই গড়বড় হয়ে যাচ্ছে ট্রেনের সময়-সূচী।
শেষ পর্যন্ত এলো ট্রেন, ছাড়লও এক সময়। জানালা দিয়ে বাইরের অপূর্ব দৃশ্যপট দেখতে দেখতে চললাম। কখনও চোখে পড়ল প্রাচীন চিত্রকরদের আঁকা ছবির মতো পাহাড়চূড়ায় ছোট্ট শহর কিংবা দুর্গ, কখনও দু’কূল ভাসিয়ে দিয়ে প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে চলা তীব্র স্রোতা পাহাড়ি নদী। চলার পথে প্রত্যেকটি স্টেশনে দেখলাম বিচিত্ৰ পোশাক পরা মানুষের ভিড়। অধিকাংশই গেঁয়ো চাষী। পুরুষদের পরনে খাটো কোর্তা আর ঘরে তৈরি পাজামা। মাথায় বিশাল ব্যাঙের ছাতার আকৃতির গোল টুপি। মেয়েদের কাপড়গুলো কিন্তু ভারি সুন্দর। পুরো-হাতা ঝলমলে সাদা পোশাক আর ঘেরওয়ালা লুটানো ঘাঘরা পরা মেয়েদেরকে দেখতে প্ৰাচীন থিয়েটারের নর্তকীর মতো মনে হলো।
সবচেয়ে আশ্চর্য হলাম স্লোভাকদের দেখে। বলতে কি, মনে মনে কিছুটা ভয়ও হলো। গরুর গাড়ির চাকার সাইজের বিশাল বারান্দাওয়ালা লোকগুলোর টুপি, ঢলঢলে নোংরা পাজামা, সাদা কোর্তা, আগাগোড়া পিতলের পেরেক আঁটা বিঘতখানেক চওড়া চামড়ার বেল্ট আর উঁচু বুট। ওদের কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা কোঁকড়ানো কালো চুল আর সেই সাথে পাল্লা দেয়া বিরাট গোঁফ দেখে প্রথম দর্শনেই ডাকাত বলে ভুল হয়। অথচ পাশের লোককে জিজ্ঞেস করে জানলাম এ এলাকার লোকদের মধ্যে নাকি ওরাই সবচেয়ে নিরীহ।
এত সব আশ্চর্য আর নতুন নতুন জিনিস দেখতে দেখতে দিনটা কিভাবে ফুরিয়ে গেল টেরই পেলাম না। সন্ধ্যার একটু আগে বিসট্রিজে এসে পৌঁছুলাম। গোধূলির স্নান আলোয় বুদাপেস্টের চেয়ে অনেক, অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হলো শহরটাকে। ট্রানসিলভেনিয়ার শেষ সীমান্তে, পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বিসট্রিজ। বোৰ্গো গিরিপথটা এখান থেকেই সোজা চলে গেছে বুকোভিনা পর্যন্ত। বিসট্রিজ শহরের চেহারা দেখলেই বোঝা যায় অতীতে বহু যুদ্ধের প্রচণ্ড ঝড় ঝাপটা বয়ে গেছে এর ওপর দিয়ে। শোনা যায় সপ্তদশ শতকের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঁচ পাঁচবার যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলার প্রকোপে পড়ে নিশ্চিহ্ন হতে হতে কোনো রকমে বেঁচে যায় বিসট্রিজ। প্রথম যুদ্ধের প্রথম তিন সপ্তাহেই মারা যায় প্রায় তেরো হাজার মানুষ, এছাড়া দুৰ্ভিক্ষ আর মড়ক তো আছেই। এ থেকেই অনুমান করা যায় পরের যুদ্ধগুলোতে কত লোক প্ৰাণ হারিয়েছিল।
গোল্ডেন ক্রোন হোটেলে ওঠার নির্দেশ দিয়েছিলেন আমাকে কাউন্ট ড্রাকুলা। প্রাচীন হোটেলটা দেখেই পছন্দ হলো আমার, যেন এটাকেই খুঁজছিলাম মনে মনে। হোটেলের সদর দরজার কাছে একজন মাঝবয়সী সুন্দরী মহিলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। জায়গায় জায়গায় সাদা কাপড়ের ঝালর দেয়া আঁটসাঁট রঙিন পোশাক পরা মহিলার আর একটু কাছাকাছি পৌঁছতেই আমার দিকে এগিয়ে এলেন তিনি। জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু মনে করবেন না, আপনি ইংল্যান্ড থেকে আসছেন তো?”
“হ্যাঁ,’ উত্তর দিলাম, “আমি জোনাথন পারকার।”
মৃদু হেসে পাশ ফিরলেন ভদ্রমহিলা। সাথের ভদ্রলোককে মৃদুস্বরে কি যেন বললেন, বুঝতে পারলাম না। মাথা ঝাঁকিয়ে চলে গেলেন ভদ্রলোক, একটু পরই আবার ফিরে এলেন। হাতে একটা চিঠি। ওঁর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে খুলে পড়তে শুরু করলাম।
বন্ধু,
কার্পেথিয়ানে স্বাগত জানাচ্ছি আপনাকে। বুঝতেই পারছেন, আপনার সাথে সাক্ষাতের আশায় অধীর হয়ে দিন গুনছি আমি। আজ রাতটা কোনোমতে হোটেলেই কাটিয়ে দিন। আগামীকাল তিনটের দিকে আবার যাত্রা শুরু হবে আপনার। একটা ভাড়াটে ঘোড়ার গাড়িতে আপনার জন্যে আসন সংরক্ষিত করা আছে। আগামীকাল তিনটায় বুকোভিনার উদ্দেশে রওনা দেবে গাড়িটা। নির্দ্বিধায় উঠে বসবেন তাতে। বোৰ্গো গিরিপথের কোনো এক জায়গায় ওই ঘোড়ার গাড়ি থেকে আপনাকে তুলে নেবে আমার নিজস্ব টমটম, পৌঁছে যাবেন আমার প্রাসাদ-দুর্গে। আশা করছি আপনার সাথে আমার নিঃসঙ্গ জীবনের ক’টা দিন অত্যন্ত আনন্দেই কাটবে।
প্রীতি ও শুভেচ্ছান্তে।
আপনার বন্ধু—
‘ড্রাকুলা।’
৪ মে।
হোটেলের মালিক অর্থাৎ যিনি আমাকে চিঠিটা পৌঁছে দিয়েছেন, তাকেও একটা চিঠি দিয়েছেন কাউন্ট ড্রাকুলা। আমার যাতে কোনো প্রকার অসুবিধা না হয় সেদিকে কড়া নজর রাখার নির্দেশ আছে সে চিঠিতে। হোটেলের মালিক বলতে গেলে কথা প্রায় বলেনই না। আমি স্থানীয় লোকদের কাছে শুনেছিলাম তিনি জার্মান ভাষা জানেন না। কিন্তু তাঁর সাথে কথা বলার পর বুঝলাম তার সম্বন্ধে স্থানীয় লোকদের ধারণাটা ভুল। কারণ তিনি এবং তাঁর স্ত্রী— সেই সুন্দরী ভদ্রমহিলা, আমার দু’একটা ছাড়া, বাকি সব প্রশ্নের উত্তরই যথাযথভাবে দিয়েছিলেন। তবে আমাকে দেখলেই কেমন একটা চাপা উত্তেজনা আর আশঙ্কার ছায়া পড়েছে ওঁদের চোখে-মুখে। প্রশ্ন করে জানলাম আমার রাহা খরচের টাকা আগেই ডাকযোগে হোটেলের মালিকের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন কাউন্ট ড্রাকুলা। কাউন্ট ড্রাকুলা আর তার প্রাসাদ-দুর্গ সম্পর্কে কি জানেন জিজ্ঞেস করতেই চমকে উঠে বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকলেন স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই। মুখে যদিও বললেন সে সম্পর্কে ওঁরা কিছু জানেন না, কিন্তু আমার মনে হলো ইচ্ছে করেই কিছু গোপন করছেন তারা। দ্রুত এগিয়ে আসছে রওনা দেবার সময়। আর কারও সাথে পরিচিত হয়ে কাউন্ট ড্রাকুলা সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই যাত্রার সময় হয়ে গেল। মনে মনে একটা তীব্ৰ অস্বস্তি নিয়ে হোটেলের কামরা থেকে বেরোতে যাব, এমন সময় ঘরে এসে ঢুকলেন সুন্দরী ভদ্রমহিলা। কয়েক মুহূর্ত দ্বিধা করে শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেসই করে ফেললেন, “সত্যিই আপনি যাচ্ছেন তাহলে?”
“মানে?” অবাক হলাম আমি।
“না গেলেই কি নয়?”
“কেন যাব না? তাছাড়া খামোকা বেড়াতে তো আর সেখানে যাচ্ছি না আমি। অফিস থেকে রীতিমতো কাজ নিয়ে দেখা করতে যাচ্ছি কাউন্টের সাথে।”
“তা যান,” একটু যেন হতাশ হলেন ভদ্রমহিলা, “আমি বলছিলাম আজকের দিনে... জানেন না আজ চৌঠা মে?”
“জানব না কেন? আজ চৌঠা মে তো হয়েছে কি?”
“হয়নি, কিন্তু হবে। আজ সেন্ট জর্জ দিবস। মাঝ রাতের ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর যেখানে যত প্ৰেতাত্মারা আছে, সব জেগে উঠবে আজ। তাছাড়া, জানেন কার কাছে যাচ্ছেন?”
ব্যাপার কি? এবারে সত্যিই আশ্চর্য হলাম আমি। বোধহয় আমাকে কিছুটা টলিয়ে দিতে পেরেছেন ভেবে আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন ভদ্রমহিলা। হাত জোড় করে বললেন, “আমি আপনার কেউ না, আপনাকে জোর করতে পারি না আমি। তবু মিনতি করছি, আরও দুটো দিন অন্তত আপনি এ হোটেল ছেড়ে বেরোবেন না।”
এবারে দ্বিধায় পড়লাম। ভাবছি কি করা যায়। যাব, না থাকব। অনিশ্চয়তার দোলায় দুলতে দুলতে নিজের ওপরই খেপে গেলাম, এ কি ছেলেমানুষী হচ্ছে! এসব দুর্বোধ্য কথাবার্তা আর হেঁয়ালি শুনে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়? ওদিকে কত কাজ পড়ে আছে। কথাটা মনে হতেই গম্ভীর হয়ে গেলাম। ভদ্রমহিলাকে বললাম, “মাফ করবেন। কাজটা অত্যন্ত জরুরি, আপনার অনুরোধ রাখতে পারছি না বলে দুঃখিত।”
আমাকে ঠেকানোর কোনো উপায় নেই বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়ালেন ভদ্রমহিলা। নিজের গলায় ঝোলানো ক্রুশটা খুলে নিয়ে জোর করে গুঁজে দিলেন আমার হাতে। ধর্মের প্রতি কোনোদিনই আমার তেমন বিশ্বাস-টিশ্বাস নেই। কাজেই একবার ভাবলাম ফিরিয়ে দিই ওটা, কিন্তু ভদ্রমহিলার মুখের দিকে চেয়ে তা আর পারলাম না, আসলে মমতাময়ী ওই মহিলাকে আঘাত দিতে ইচ্ছে করল না আমার। মনে মনে ঠিক করলাম, মহিলা চোখের আড়াল হলেই টুপ করে ফেলে দেব কোথাও। বোধহয় আমার মনোভাব বুঝতে পেরে মৃদু হাসলেন মহিলা, তারপর আমার হাত থেকে ক্রুশটা নিয়ে আমার গলায় পরিয়ে দিতে দিতে বললেন, “যদি আপনার মা এটা গলায় পরিয়ে দিতেন, তাহলে কি ফেলে দিতে পারতেন?”
কথাটা বলেই ঘুরে দাঁড়িয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা। কি জানি, আমার মনের ভুলও হতে পারে, ঘুরে দাঁড়ানোর আগে ভদ্রমহিলার চোখে অশ্রু টলমল করতে দেখেছিলাম।
গলা থেকে খুলে ফেলতে পারলাম না ক্রুশটা। চিন্তিতভাবে হোটেলের কামরা থেকে বেরিয়ে অপেক্ষমাণ গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। একটু পর চলতে শুরু করল গাড়ি। মিনা, তখনও কি জানতাম কতটা ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছি আমি!
৫ মে, প্রাসাদ-দুর্গ।
পুব আকাশে উঠি উঠি করছে সূৰ্য। ভোরের সূৰ্য আমার দারুণ ভালো লাগে, তা তো তুমি জানোই, মিনা, কিন্তু আজ ভালো লাগল না। কেমন যে রোগাটে মলিন দেখাচ্ছে সূৰ্যটাকে। বিছানায় বার দুয়েক গড়াগড়ি করে উঠে পড়লাম, ডায়েরিটা লিখে ফেলতে হবে।
গতকাল আমি গাড়িতে উঠে বসার পরও গাড়ি ছাড়তে কিছুক্ষণ দেরি করল কোচোয়ান। হোটেলের মালিকের সাথে উত্তেজিতভাবে কিছু বলছে সে, আর বার বার তাকাচ্ছে আমার দিকে। বুঝলাম কথা হচ্ছে আমার সম্পর্কেই। এতক্ষণ আশপাশে ঘোরাফেরা করছিল হোটেলের কয়েকজন বয় বেয়ারা। আস্তে আস্তে ওরাও হোটেলের মালিক আর কোচোয়ানের সাথে তর্কে যোগ দিল। ওরা কি বলছে ভালোমতো শুনতে পেলাম না। তবে যে কয়েকটা শব্দ শোনা গেল সেগুলোর মানে জানার জন্যে তাড়াতাড়ি ওই দেশি অভিধানটা বের করলাম। কয়েকটা শব্দের মানে সত্যি রহস্যজনক। যেমন— শয়তান, নরক, ডাইনী ইত্যাদি। আর দুটো শব্দ তো রীতিমতো অবাক করল আমাকে। শব্দ দুটো হলো নেকড়ে আর রক্ত চোষা বাদুড়। মনে মনে ঠিক করলাম, কাউন্টকে জিজ্ঞেস করে শব্দগুলোর তাৎপর্য জেনে নেব।
আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর গাড়িতে এসে উঠল কোচোয়ান। ততক্ষণে ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গেছে হোটেলের গেটের সামনে। আমার দিকে করুণার দৃষ্টিতে চাইতে চাইতে বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকছে সবাই। পাশের সহযাত্রীর দিকে ঝুঁকে মৃদুস্বরে জানতে চাইলাম, এসব কি হচ্ছে? প্রথমে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল সে। আমার পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত জানাল, অশুভ আত্মার দৃষ্টি থেকে আমাকে বাঁচাবার উদ্দেশ্যেই অমন করছে ওরা। সম্পূর্ণ অজানা জায়গায় ঠিক তেমনি অচেনা একজন লোকের সাথে দেখা করতে যাবার আগে এ ধরনের কাজ কারবার দেখে মনটা ঘাবড়ে গেল আমার।
ঝাঁকড়া, সবুজ পাতাওয়ালা বাতাবি আর কমলালেবুর গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে হোটেল প্রাঙ্গণের ঠিক মাঝখানটায়। তার আশপাশে দাঁড়ানো লোকগুলো আমার মতো অচেনা একজন বিদেশির জন্যে আন্তরিক আশঙ্কা প্ৰকাশ করে যে হৃদ্যতা দেখাল তা জীবনে ভুলব না আমি।
কোনো রকম জানান না দিয়েই হঠাৎ ছুটতে শুরু করল গাড়ি। সহযাত্রীদের ভাষা আমার বোধগম্যের বাইরে বলে তাদের সাথে আলাপে অংশগ্রহণ করতে পারছি না। কিন্তু চারপাশের অপূর্ব প্রাকৃতিক শোভা দেখতে দেখতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওদের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেলাম। বড় বড় গাছে আচ্ছন্ন হয়ে আছে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া পাহাড়ের গা। বনের ওপারে সবুজ ঘাসে ছাওয়া তেপান্তর, তারপরেই আবার চলে গেছে পাহাড়ের সারি। এখানে ওখানে জন্মে আছে অজস্র আপেল, পাম, নাশপাতি আর চেরিফলের গাছ। সব ক’টা গাছের গায়েই ভাবী সন্তানের আগমনের ইঙ্গিত, অর্থাৎ ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে গাছগুলো। সন্তান বরণ করার জন্যেই বোধহয় ওগুলোর গোড়ায় জন্মানো সবুজ ঘাসের ঘন জঙ্গলের ওপর আলপনা এঁকেছে ঝরা ফুলের পাপড়ি। পাশের সহযাত্রীকে জিজ্ঞেস করে জানলাম অপূর্ব এই জায়গাটার নাম ‘মিটেল ল্যান্ড’।
পাহাড়ের গা ঘুরে এঁকেবেঁকে নামতে নামতে হঠাৎ করেই মনে হবে দেবদারু বনের মাঝে গিয়েই শেষ হয়ে গেছে বুঝি পথটা, কিন্তু আসলে শেষ হচ্ছে না। পথটা অল্পবিস্তর অসমান, তবু ঢালু পথে ঝড়ের বেগে ছুটছে আমাদের গাড়ি। মুহূর্ত মাত্র সময় নষ্ট না করে বোৰ্গো গিরিপথে পৌঁছানোর জন্যে যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে কোচোয়ান। কারণ বুঝতে পারলাম না। সহযাত্রীকে জিজ্ঞেস করেও সন্তোষজনক উত্তর পেলাম না।
আরও সামনে এগিয়ে, মিটেল ল্যান্ডের সবুজ উপত্যকা পেছনে ফেলে কার্পেথিয়ানের বিশাল প্রান্তরের প্রান্তে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া অরণ্যের কাছে এসে পৌঁছুলাম। আমার ডাইনে-বাঁয়ে তখন শুধু ছোট বড় পাহাড়ের সারি। ওদিকে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। অস্তগামী সূর্যের আলোয় দূরে পাহাড় চূড়াগুলোকে দেখাচ্ছে গাঢ় নীল, আর কাছেরগুলো কমলা। ঘাস প্রান্তর আর পাহাড়ের গোড়ার সঙ্গম স্থলের কোথাও সবুজ, কোথাও বাদামী। আর বহু দূরে, দিগন্তের একেবারে কাছাকাছি তুষার ছাওয়া চূড়াগুলোর সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
একটু পরই পাহাড়ের গা থেকে নেমে আসা ছোট ছোট ঝর্ণার দেখা পেলাম। বিদায়ী সূর্যের সোনালী আলো এসে পড়েছে ওগুলোর ওপর। এখন আর পানির ঝর্ণা বলে মনে হচ্ছে না ওগুলোকে। ঝিরঝির শব্দে পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে আসছে যেন তরল সোনা।
পথটা হঠাৎ তীক্ষ্ণ একটা বাঁক নিতেই হুমড়ি খেয়ে আমার গায়ের উপর এসে পড়লেন পাশের সহযাত্রী। আঙুল দিয়ে বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকতে আঁকতে চোখের ইঙ্গিতে আমাকে দেখালেন, “ওই, ও-ই-ই যে, ওখানেই বাস করেন ঈশ্বর।” কথাটার মানে বুঝতে পারলাম না। আঁকাবাঁকা সর্পিল পথে আমাদের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটন্ত সূৰ্য ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল বহু আগেই, এখন একেবারে ঝিমিয়ে পড়েছে। পাহাড়ের ওপারে ডুবছে এখন সে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সম্পূৰ্ণ চোখের আড়ালে চলে গেল সূর্য। এতক্ষণ সাহস পায়নি, কিন্তু সূর্য ডুবে যাওয়া মাত্র এদিক ওদিক চাইতে চাইতে মন্থর পায়ে এগিয়ে আসতে থাকল অন্ধকার। সূর্যের চিহ্নমাত্র দেখা যাচ্ছে না, অথচ আশ্চৰ্য, তুষার ছাওয়া পাহাড়গুলো তখনও সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। একটা সূর্য ডুবে গেছে, কিন্তু তুষার ছাওয়া চূড়াগুলো অসংখ্য সূৰ্য হয়ে আলো ছড়াচ্ছে চারদিকে। সেই আলোয় চোখে পড়ল রাস্তার দুধারে ঘাসে ছাওয়া জমির বুক ভেদ করে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য ক্রুশ। যতবার চোখে পড়ছে ক্ৰুশগুলো, ততবার বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকছে আমার সহযাত্রীরা। কখনও কখনও দু’একটা ক্রুশের সামনে নতজানু হয়ে বসে প্রার্থনা করছে কিষাণী বধূ। বোধহয় অকালে হারিয়ে যাওয়া স্বামীর উদ্দেশ্যে জানাচ্ছে তার ব্যথা ভরা বুকের গোপন হাহাকার। এতই তন্ময় হয়ে বসে আছে যে আমাদের দিকে একবারের জন্যেও মুখ তুলে তাকাচ্ছে না। যেন আমরা নেই।
গিরিমুখে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে গোধূলির শেষ আলোটুকুও মিলিয়ে গেল। সাঁঝ ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বাড়তে লাগল ঠান্ডা। গাঢ় কুয়াশা নেমে আসতে লাগল বার্চের অরণ্যের উপর। হালকা তুষারের পটভূমিকায় দাঁড়িয়ে আছে পাতাবাহারের কালো কালো ঝোপ। ঢাল বেয়ে দ্রুত নামার সময় মনে হচ্ছে এই বুঝি দেবদারুর গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে গাড়ি। সে ঢালটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের গা বেয়ে আবার খাড়া উঠে গেছে পথটা। অতি ধীরে গাড়িটাকে টেনে টেনে এখন এগোতে হচ্ছে ঘোড়াগুলোকে। ওগুলোর পেছন পেছন হেঁটে যাব ভেবে কোচোয়ানকে বললাম কথাটা। সাথে সাথেই দারুণ চমকে উঠে আমাকে বাধা দিয়ে বলল সে, “বলছেন কি, সাহেব? এখানে নামামাত্রই ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে নেবে আপনাকে হিংস্ৰ কুকুরের দল।” আশপাশে তাকিয়ে একটা কুকুরও চোখে পড়ল না আমার। কানে এলো না কুকুরের একটা ডাকও। “কোথায় কুকুর?” কোচোয়ানকে জিজ্ঞেস করতেই অদ্ভুত ভাবে হাসল সে, কোনো উত্তর দিল না।
অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসতেই আলো জ্বালবার জন্যে কয়েক সেকেন্ড থামল কোচোয়ান। হোটেল ছাড়ার পর এই প্ৰথমবারের জন্যে থামল সে। আঁধার হবার পরপরই কেন যেন একটু উত্তেজিত মনে হলো যাত্রীদের। বার বার কোচোয়ানকে আরও জোরে গাড়ি চালাবার জন্যে ধমকাতে লাগল ওরা। আর ওদের কথার প্রত্যুত্তরেই যেন নির্মম ভাবে হিশিয়ে উঠতে থাকল কোচোয়ানের চাবুক, জান বাজি রেখে ছুটে চলল ঘোড়াগুলো।
জমাট অন্ধকারে প্রায় অন্ধের মতো ছুটছে আমাদের গাড়ি। এবড়োখেবড়ো আর আঁকাবাঁকা পথে লাফাতে লাফাতে ছুটছে, স্থির হয়ে বসে থাকা যাচ্ছে না কিছুতেই। একটু পরই অপেক্ষাকৃত মসৃণ হয়ে এলো রাস্তা, সাথে সাথে দু’পাশ থেকে চেপে এসে আমাদের গিলে চাইল পাহাড়ের সারি। বুঝলাম, বোৰ্গো গিরিপথে প্রবেশ করেছি আমরা।
গিরিপথে প্রবেশ করতেই একটা স্বস্তির ভাব ফুটে উঠল সহযাত্রীদের মধ্যে, যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু আর একটু এগিয়ে যেতেই হঠাৎ কেন যেন আবার গম্ভীর হয়ে গেল ওরা। যেন ভয়ঙ্কর কিছু ঘটার অপেক্ষা করছে। কারণ জিজ্ঞেস করা সত্ত্বেও আমাকে কিছু জানাল না কেউ। উত্তেজিত নীরবতায় থমথম করছে গাড়ির ভিতরটা। গাড়ি আরও এগোতেই পুব দিকে খাঁড়ির মুখটা চোখে পড়ল। আবহাওয়ার পরিবর্তনও টের পেলাম। একে গাঢ় অন্ধকার, তার ওপর আকাশে মেঘ জমায় কালিগোলা অন্ধকারে ছেয়ে গেল চারদিক। থমথমে বাতাসে ঝড়ের সংকেত।
আর একটু এগোতেই দেখা গেল রাস্তাটা দু’ভাগ হয়ে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে দু’দিকে চলে গেছে। ডান পাশের পথটা বেছে নিল কোচোয়ান। বাঁ দিকের পথটা কোথায় গেছে জানতে চেয়েও উত্তর পেলাম না কারও কাছ থেকে। ইচ্ছে করেই আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল সহযাত্রীরা। ক্ৰমেই বাড়ছে বাতাসের বেগ।
এদিকেরই কোনো এক জায়গা থেকে কাউন্টের টমটমে আমাকে তুলে নেবার কথা। উৎকণ্ঠিত ভাবে এদিক ওদিক চেয়ে তার খোঁজ করতে লাগলাম। প্রতি মুহূর্তে আশা করতে লাগলাম এখনই অন্ধকারের বুক চিরে দেখা দেবে কোনো লণ্ঠনের আলো। কিন্তু দুর্ভেদ্য অন্ধকারে আমাদের গাড়ির লন্ঠনের কাঁপা কাঁপা আবছা ভৌতিক আলো ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। সে আলোয় ধাবমান ক্লান্ত ঘোড়াগুলোকে কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে।
বালি বিছানো পথ বেয়ে দ্রুত সামনে এগিয়ে চললাম। এখনও চোখে পড়ছে না কাউন্টের টমটম। তবে কি ওটা আসবে না? যাত্রীদের অস্বস্তি আর উত্তেজিত ভাবটা যেন একটু কমে আসছে। আরও কিছু পর হাতঘড়ি দেখে সবচেয়ে কাছের যাত্রীকে নিচু গলায় কি যেন বলল কোচোয়ান। তেমনি নিচু গলায় উত্তর দিল যাত্রী ভদ্রলোক, “ঘণ্টাখানেক বাকি আছে এখনও।” কিসের ঘণ্টাখানেক বাকি আছে? সবটা ব্যাপারই কেমন অদ্ভুত আর রহস্যময় ঠেকল আমার কাছে।
আরও কিছুক্ষণ কেটে যাবার পর আমার দিকে ফিরে ভাঙা ভাঙা জার্মানিতে কোচোয়ান বলল, “আজ বোধহয় আর আসবে না কাউন্টের টমটম। তার চেয়ে এক কাজ করুন না, অযথা এই বুনো পথে টমটমের অপেক্ষা না করে আমাদের সাথে বুকোভিনায় চলুন। সেখান থেকে কাল, না-না, পরশু ফিরে আসবেন।”
কোচোয়ানের কথা শেষ হবার আগেই তীক্ষ্ণ হ্রেষা ধ্বনিতে চমকে উঠলাম। ভয়ঙ্কর কোনো কিছুর গন্ধ পেয়েছে বোধহয় আমাদের ঘোড়াগুলো। থমকে থেমে দাঁড়িয়ে, নাক তুলে বাতাসে কি যেন শুঁকছে আর চেঁচাচ্ছে ওগুলো। কোনো অজানা আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠতে গিয়ে থেমে গেল দু’একজন যাত্রী।
ঠিক সেই সময় গাড়ির চাকা আর ঘোড়ার খুরের শব্দে পিছন ফিরে চাইলাম। যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হয়েছে চার ঘোড়ায় টানা সুন্দর একটা ফিটন। আমাদের লণ্ঠনের আলোয় দেখলাম চারটে ঘোড়াই কুচকুচে কালো রঙের, আর আশ্চর্য বলিষ্ঠ এবং সুন্দর। ফিটনটা থেমে দাঁড়াতেই চালকের আসন থেকে নেমে এলো লম্বামতো একজন লোক। বাদামী দাড়িতে ঢাকা লোকটার মুখ মাথার বিশাল কালো টুপিটা সামনের দিকে টেনে দেয়া, তাতে মুখের প্রায় সবটাই ঢাকা পড়ে গেছে। সোজা আমার দিকে এগিয়ে এলো আগন্তুক। মুখ তুলে চাইতেই লণ্ঠনের আলোয় এক পলকের জন্যে দেখলাম লোকটার টকটকে লাল দুটো চোখ। কোচোয়ানের দিকে ফিরে ধরা গলায়, অনেকটা শাসনের সুরে বলল আগন্তুক, “আজ এত তাড়া কেন, গলায় কাঁটা আটকেছে নাকি?”
যেন ভয়ঙ্কর কোনো অপরাধ করে ধরা পড়ে গেছে, তাই দোষ ঢাকার চেষ্টা করছে এমন ভাবে উত্তর দিল কোচোয়ান, “না না, কি যে বলেন। আসলে ওই বিদেশি ভদ্রলোক দ্রুত চালাবার জন্যে কেবলই তাড়া লাগাচ্ছিলেন কিনা, তাই...”
“তাই তাকে বুকোভিনায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলে?” কোচোয়ানের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ধমকে উঠল আগন্তুক, “ফের আমার সঙ্গে চালাকির চেষ্টা করলে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব। জানো না আমার শক্তি সম্পর্কে? আমার ওই ঘোড়ার সাথে দৌড়ে পারবে তোমার ঘোড়াগুলো?”
একটু অবাক হয়েই আগন্তুকের কথা শুনছি। লণ্ঠনের আবছা আলো এসে পড়েছে ওর চোখে মুখে। সে আলোয় দেখলাম রুক্ষ কঠিন লোকটার মুখ। কড়া করে লিপস্টিক লাগানো লাল টুকটুকে ঠোঁটের মতো দুটো ঠোঁটের ভেতর ঝিকমিক করছে মুক্তোর মতো সাদা তীক্ষ্ণ দাঁত। আগন্তুক কোচোয়ানকে শেষ প্রশ্নটা করতেই আমার কানের কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল পাশের সহযাত্রী, “তা বটে, মৃত্যুর ঘোড়া একটু জোরেই ছোটে।”
এত আস্তে কথা বলল সহযাত্রী যে কোনো রকমে কথাটার মানে বুঝলাম আমি। কিন্তু চকিতে ঘাড় ফিরিয়ে আমাদের দিকে চাইল আগন্তুক। আমার মনে হলো কথাটা শুনতে পেয়েছে সে। কিন্তু কি করে শুনল? তার শ্রবণশক্তি কি এতই প্রখর? আমার পাশের সহযাত্রীর দিকে চেয়ে মুচকি হাসল আগন্তুক। সাথে সাথে চমকে বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকল সহযাত্রী। পাত্তা দিল না আগন্তুক। সহযাত্রীর দিকে হাত বাড়িয়ে আমাকে দেখিয়ে বলল, “ভদ্রলোকের জিনিসপত্রগুলো দিন।”
সঙ্গে এনেছি শুধু একটা সুটকেস। সেটাই নিয়ে ফিটনে তুলে রাখল আগন্তুক। তারপর ফিরে এসে আমাকে নামার ইঙ্গিত করল। গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে ফিটনে উঠলাম আমি। ফিটনে উঠতে আমাকে সাহায্য করল আগন্তুক। তার হাতের ছোঁয়া লাগতেই যেন শির শির করে উঠল আমার গা। ইস্পাতের মতো কঠিন আগন্তুকের হাতের আঙুলগুলো। এ থেকেই লোকটার শরীরের আসুরিক শক্তি সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা হয়ে গেল আমার।
আমি ফিটনে উঠে বসতেই চালকের আসনে উঠে বসল আগন্তুক। সাপের মতো হিস হিস করে উঠল তার হাতের চাবুক। বিদ্যুতের মতো লাফিয়ে উঠে একপাক ঘুরে অন্ধকার গিরিপথের দিকে ছুটে চলল ঘোড়াগুলো। ফিটনটা ঘোরার সময়ই আগের গাড়িটার দিকে চোখ পড়েছিল আমার। প্রচণ্ড ভয়ে থর থর করে কাঁপছে ঘোড়াগুলো। আর সমানে বুকে ক্রুশ এঁকে চলেছে যাত্রীরা। ফিটনটা ঘুরে যেতেই ঘোড়ার পিঠে চাবুক মারল আগের গাড়ির কোচোয়ান। মুহূর্তে প্ৰাণ ফিরে পেল যেন ঘোড়াগুলো। বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে চলল বুকোভিনার পথ ধরে।
গাড়িটা অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই একটা একাকীত্ব আর অস্বন্তি চেপে বসল আমার বুকে। প্রচণ্ড শীতে কাঁটা দিচ্ছে গায়ে। অথচ আগের মতোই গায়ে গরম কোট আর গলা থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত গরম কম্বলে জড়ানো। কি করে যেন আমার শীত লাগার ব্যাপারটা টের পেল আগন্তুক। পরিষ্কার জার্মানিতে বলল, “প্ৰচণ্ড শীত পড়েছে আজ। কাউন্ট ড্রাকুলা আপনার সমস্ত সুখ-সুবিধের খেয়াল রাখতে বার বার আদেশ দিয়ে দিয়েছেন আমাকে। আপনার সিটের তলায় একটা দেশি মদের বোতল রাখা আছে, প্রয়োজন মনে করলে বের করে নিয়ে শরীরটা একটু গরম করতে পারেন।”
প্রয়োজন মনে করলাম না। তবু ওটা আছে জেনে মনে মনে খুশি হয়ে উঠলাম। আসলে ভয় করছে না আমার, কিন্তু তবু কেমন যেন একটা অস্বস্তির মতো ভাব থেকে থেকেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে মনের ভেতর। অত্যন্ত জরুরি কাজ না থাকলে ঝড়ের রাতে এভাবে অজানা বুনো পথে পাড়ি দেয়ার চেয়ে হোটেলের আরামদায়ক কামরায় নিজেকে আটকে রাখতেই বেশি পছন্দ করতাম আমি।
প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে ফিটন। একটু এগিয়ে যাবার পরই মোড় ঘুরে আর একটা পাহাড়ি পথে গাড়ি ছোটাল আগন্তুক। হঠাৎ একটা অদ্ভুত সন্দেহ জাগল আমার মনে। বাঁকের পর বাঁক ঘুরে মনে হলো একই পথে বার বার ঘুরে বেড়াচ্ছে গাড়িটা। সন্দেহটা জাগতেই সতর্ক হলাম। আবার বাঁক ঘুরতেই সেটার কয়েকটা বিশেষ চিহ্ন মনে গেঁথে নিলাম। একটু পরই আমার সন্দেহের নিরসন হলো, যা ভেবেছিলাম তাই, একই পথে বার বার ঘুরছে গাড়িটা। কেন? একবার ভাবলাম, ব্যাপারটা আগন্তুককে জিজ্ঞেস করে দেখি। কিন্তু পরক্ষণেই বাতিল করে দিলাম চিন্তাটা।
কোনো কারণে হয়তো ইচ্ছে করেই দেরি করছে সে। তাই যদি হয়, তাহলে জিজ্ঞেস করলেও সদুত্তর পাব না। পকেট থেকে দেশলাই বের করে জ্বেলে ঘড়ি দেখলাম। সময় দেখেই একটা কুসংস্কারের কথা মনে পড়ল। নিজের অজান্তেই ধক করে উঠল হৃদপিণ্ডটা। মাঝ রাত হতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। মাঝ রাতের পরপরই নাকি জেগে ওঠে সমস্ত অশুভ প্ৰেতাত্মা আর পিশাচেরা। একটু যে ভয় পেলাম না তা নয়, তবু যুক্তি তর্ক দিয়ে জোর করে ভয়টা তাড়াবার চেষ্টা করলাম।
আরও কয়েক মিনিট পরই দূরে কোথাও আর্তস্বরে ডেকে উঠল একটা কুকুর। সেটার প্রত্যুত্তরে আর একটা, তারপর আর একটা। হঠাৎ করেই জীবন্ত হয়ে উঠল যেন বুনো পাহাড়ি এলাকা। শত শত কুকুরের ক্রুদ্ধ চিৎকারে খান খান হয়ে ভেঙে গেল আশপাশের নিস্তব্ধতা। পাহাড়ে পাহাড়ে ধ্বনিত প্ৰতিধ্বনিত হয়ে শতগুণ বেড়ে গেল সেই শব্দ ঝংকার।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ফিটনের ঘোড়াগুলো। আগন্তুকের শত আশ্বাস সত্ত্বেও আর এক পা এগোল না ওগুলো। মনে হলো প্ৰচণ্ড ভয় পেয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে বাঁধন ছিঁড়ে গাড়ি ফেলে পালাতে পারে। হঠাৎ থেমে গেল কুকুরের ডাক। তার পরিবর্তে শোনা গেল হাজার হাজার নেকড়ের রক্ত পানি করা চাপা গর্জন। ঘোড়াগুলোকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, আমারই ইচ্ছে করতে লাগল গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে ছুটে পালাই। কিন্তু পালাব কোথায়? ডাক শুনে মনে হচ্ছে আমাদেরকে ঘিরে এগিয়ে আসছে নেকড়ের দল। ঘোড়াগুলোকে আয়ত্তে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল আগন্তুক। ধীরে ধীরে একটু শান্ত হয়ে এলো ঘোড়াগুলো, কিন্তু শরীরের কাঁপুনি বন্ধ হলো না। ওগুলোর। লাফ দিয়ে চালকের আসন থেকে নেমে এলো আগন্তুক, ঘোড়াগুলোর কানে কানে কি যেন বলল। সাথে সাথেই স্বাভাবিক হয়ে এলো ঘোড়াগুলো। আবার চালকের আসনে উঠে বসে গাড়ি ছেড়ে দিল আগন্তুক।
আগের মতো আর একই জায়গায় ঘুরছে না এখন গাড়িটা। দ্রুত গিরিপথটা পার হয়ে এসে হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ মোড় নিলো ডাইনে। একটা অত্যন্ত সংকীর্ণ পথে এসে পড়ল গাড়িটা। দু’পাশ থেকে পথের ওপর এসে ঝুঁকে পড়েছে ঝাঁকড়া গাছ। গায়ে গায়ে লেগে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো, আর ওগুলোর ডালপালা এমন ভাবে এসে পড়েছে রাস্তার ওপর, মনে হলো সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে এগোচ্ছি। ডালপালার ফাঁক ফোকর দিয়ে মাঝে মধ্যে চোখে পড়ছে এক আধটা পাহাড়ের চূড়ার আবছা অবয়ব। বাইরে তখন প্রচণ্ড বেগে ফুঁসছে ঝড়, আর প্রচণ্ড বেগেই পরস্পরের গায়ে বাড়ি খাচ্ছে গাছের ডালপালাগুলো। শীতের তীব্ৰতা আরও বেড়ে গেছে, তার ওপর কুয়াশার মতো হালকা তুষারপাতও শুরু হয়েছে। তুষারের চাদরে ঢাকা পড়ে আরও অন্ধকার হয়ে গেছে রাত। হিমেল হাওয়ায় ভয় করে বহু দূর থেকে ভেসে আসছে কুকুরের আর্ত চিৎকার। হঠাৎ আবার শোনা গেল নেকড়ের চাপা গোঙানি। ভেবেছিলাম চলে গেছে নেকড়েগুলো। কিন্তু যায়নি, বরং আমাদেরকে ঘিরে আরও কাছিয়ে এসেছে। প্ৰচণ্ড ভয় পেলাম এবার। কিন্তু বিন্দুমাত্র ভয় পেল না আগন্তুক। বোধহয় রোজ রাতেই নেকড়ের ডাক শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে।
ঠিক এমনি সময় ঘটল ঘটনাটা। আমার বাঁ দিকে দূরে দপ করে জ্বলে উঠল একটা নীলচে আলোর শিখা। আলোটা দেখেই রাশ টেনে ঘোড়া থামাল আগন্তুক। লাফ দিয়ে চালকের আসন থেকে নেমেই মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল সে গভীর অন্ধকারে। কোনদিকে যে গেল বুঝতে পারলাম না। ওদিকে ক্ৰমেই এগিয়ে আসছে নেকড়ের গর্জন।
কয়েক সেকেন্ড পরই আবার ফিরে এলো আগন্তুক। কোনো কথা না বলে চালকের আসনে উঠে বসে গাড়ি ছেড়ে দিল। একবার মনে হলো, ঘুমের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখছি না তো? গায়ে চিমটি কেটে দেখলাম, না ঠিকই তো আছি! হঠাৎ আবার দেখা গেল সেই নীলচে আলোটা। এবার একেবারে গাড়ির পাশেই। তীব্র উজ্জ্বল আলোয় পরিষ্কার দেখা গেল চালক আর ঘোড়াগুলোকে। মুহূর্তে গাড়ি থেকে নেমে কয়েকটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে আলোটাকে তাড়া লাগাল আগন্তুক।
যে কোনো প্রকার আলোর সামনে কোনো মানুষ দাঁড়ালে তা তার শরীরের আড়ালে ঢাকা পড়ে যেতে বাধ্য, অথচ আশ্চৰ্য, এ ক্ষেত্রে কিন্তু তা ঘটল না। নীল আলোটার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল আগন্তুক, কিন্তু তার শরীরের আড়ালে ঢাকা পড়ল না আলোর শিখা। আগন্তুকের এপাশে বসে আগের মতোই পরিষ্কার আলোর শিখাটা চোখে পড়ছে আমার। আগন্তুক যেন রক্ত-মাংসের মানুষ না, হালকা কাঁচের তৈরি। এমন অদ্ভুত ব্যাপার দেখা তো দূরের কথা, কখনও কল্পনাও করিনি আমি। একটা শিরশিরে আতঙ্কে নিজের অজান্তেই শিউরে উঠলাম।
কয়েক সেকেন্ড পরই দপ করে নিভে গেল নীল আগুনের শিখা, আর জ্বলল না। ফিরে এসে গাড়ি ছেড়ে দিল আগন্তুক। ওদিকে চারদিক ঘিরে আরও এগিয়ে এসেছে নেকড়ের গর্জন। বেশ কিছুক্ষণ একভাবে চলার পর গাড়ি থেকে নেমে কোথায় যেন চলে গেল আগন্তুক। সে চলে যেতেই আতঙ্কে থর থর করে কাঁপতে লাগল ঘোড়াগুলো। কারণটা বুঝতে পারলাম না।
হঠাৎ খেয়াল করলাম নেকড়ের ডাক থেমে গেছে। দেবদারুর বন আর পাহাড়ের মাথার ওপরের কালো মেঘের ফাঁক থেকে হঠাৎ করেই বেরিয়ে এলো চাঁদ। জীবনে চাঁদের বহু রূপ দেখেছি, কিন্তু সেদিনের রূপের সাথে সম্পূর্ণ অপরিচিত আমি। অদ্ভুত এক ছায়া ছায়া ভৌতিক আলো ছড়িয়ে পড়েছে দেবদারুর মাথায় আর পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায়। সেই আবছা চাঁদের আলোতেই চোখে পড়ল জানোয়ারগুলো। ধূসর লোমশ শরীর, ঝকঝকে সাদা দাঁতের ফাঁক থেকে বেরিয়ে আসা টকটকে লাল জিভ আর পেশল শরীর নিয়ে আমাদের চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার নেকড়ে। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো, যে কোনো মুহূর্তে আক্রমণ করে বসতে পারে ওরা। সত্যি কথা বলতে কি, জীবনে এত ভয় পাইনি আমি কখনও।
হঠাৎ কানে তালা লাগানো শব্দ করে একসঙ্গে ডেকে উঠল সব ক’টা নেকড়ে। আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল ঘোড়াগুলো। বহু আগেই গাড়ি ফেলে যে যেদিকে পারত ছুট লাগাত ঘোড়াগুলো, কিন্তু চারপাশ থেকে ঘিরে আছে নেকড়ের দল। কোনো দিকে যাবার পথ নেই, তাই যেতে পারছে না।
পাগলের মতো চেঁচিয়ে আগন্তুককে ডাকতে শুরু করলাম আমি। হঠাৎ রাস্তার একপাশে চোখ পড়তেই দেখলাম সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আগন্তুক। কোনো ভাবান্তর নেই তার মধ্যে। আরও কয়েক মুহূর্ত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল আগন্তুক, তারপর দু’হাত সামনে বাড়িয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে নাড়াতে লাগল, বোধহয় দূর হয়ে যেতে বলছে হতচ্ছাড়া নেকড়েগুলোকে। চোখের সামনে দেখলাম লোকটার হাতের ইশারায় গর্জাতে গর্জাতেই পিছিয়ে যাচ্ছে নেকড়ের দল। আর ওদের সাথে তাল রেখেই বোধহয় যেমনি আচমকা বেরিয়ে এসেছিল তেমনি আবার মেঘের ফাঁকে ঢুকে গেল চাঁদ। আবার নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল চারদিক।
টের পেলাম গাড়িতে উঠে বসেছে আগন্তুক। চলতে শুরু করল গাড়ি। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ আগের অদ্ভুত ঘটনাটা মন থেকে তাড়াতে পারলাম না কিছুতেই। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে বুকের ছাতি। আতঙ্কে ঠক ঠক করে কাঁপছে হাত-পা। বিমূঢ়ের মতো বসে বসে আকাশ পাতাল ভাবতে থাকলাম।
এভাবে কতক্ষণ কেটে গেল বলতে পারি না। হঠাৎ গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়তেই চমক ভাঙল। বিশাল এক প্রাসাদ-দুর্গের আঙিনায় এসে দাঁড়িয়েছে গাড়ি। বিশাল প্রাসাদের তেমনি বিশাল সব জানালার কোথাও আলোর চিহ্নমাত্র চোখে পড়ল না। কখন যে আবার মেঘের ফাঁক থেকে বেরিয়ে এসেছে চাঁদ, খেয়াল করিনি। সেই চাঁদের আলোয় দুর্গের মাথায় প্রাচীন কামান বসানোর খাঁজ-কাটা ভাঙা ফোকরগুলো চোখে পড়ছে। কাউন্ট ড্রাকুলার প্রাসাদ-দুর্গে এসে পৌঁছুলাম শেষ পর্যন্ত।

বিশাল প্রাঙ্গণে এসে গাড়ি থামতেই লাফিয়ে নিচে নামল আগন্তুক। গাড়ির দরজা খুলে হাত ধরে আমাকে নামতে সাহায্য করল সে। দ্বিতীয় বারের মতো সেদিন অনুভব করলাম তার হাতের ইস্পাত কঠিন আঙুলের শক্তি। সুটকেসটা গাড়ি থেকে নামিয়ে আনল সে। তীক্ষ্ণ লোহার পেরেক গাঁথা ভারি প্রকাণ্ড দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে কালের কষাঘাতে জর্জরিত রুক্ষ পাথরের দেয়ালগুলো দেখতে লাগলাম। সুটকেসটা আমার পাশে নামিয়ে রেখে আবার গিয়ে গাড়িতে উঠল আগন্তুক, তারপর গাড়িটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকেই।
আবছা অন্ধকারে বিশাল এক ভৌতিক বাড়ির প্রাঙ্গণে ভূতের মতোই দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি। কি করব বুঝতে পারছি না। ঘণ্টা জাতীয় কিছু নেই দরজায়, থাকলে তা বাজিয়ে লোকদের ডাকা যেত। চেঁচিয়েও লাভ নেই, কারণ সারা জীবন এখানে দাঁড়িয়ে চেঁচালেও এই নিরেট পাথরের দেয়াল ভেদ করে আমার কণ্ঠস্বর ওপারে গিয়ে পৌঁছুবে না। ক্রমেই নানা রকম সন্দেহ আর ভয় বাসা বাঁধতে শুরু করেছে মনে। এ কোথায় এসে পড়লাম? কি দরকার ছিল এই সৃষ্টিছাড়া অভিযানের? একজন আইনজীবীর অধীনস্থ কেরানির পক্ষে বহু দূরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বাস করা একজন বিদেশির কাছে লন্ডনের সম্পত্তি কেনার ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করতে আসা কি একটু বাড়াবাড়ি নয়? আসলে আমার এই কেরানিগিরিটাকে মিনা কোনোদিনই ভালো চোখে দেখতে পারেনি। প্রায় জোর করে আমাকে দিয়ে এল. এল. বি. পরীক্ষাটা দিইয়েছিল মিনা, এখানে আসার ঠিক আগের দিন জানতে পেরেছি ভালোমতোই পাস করেছি পরীক্ষায়। ইচ্ছে আছে, এখান থেকে ফিরে গিয়ে পুরোদস্তুর উকিল হয়ে বসব। কিন্তু যে ভূতুড়ে এলাকায় এসে ঢুকেছি, আদৌ কোনোদিন লন্ডনে ফিরে যেতে পারব কি না কে জানে।
কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাত পাঁচ ভাবছিলাম জানি না। হঠাৎ দরজার ওপারে কার ভারি পায়ের শব্দে চমকে উঠে বাস্তবে ফিরে এলাম। কপাটের ফাঁক দিয়ে আসা অস্পষ্ট আলোও চোখে পড়ছে এখন। দু’এক সেকেন্ড পরই কপাটের ওপারে লোহার ভারি খিল খোলার শব্দ শোনা গেল। তারপর বহুদিনের না খোলা মরচে ধরা তালা খোলার শব্দ। পরক্ষণেই বিশ্ৰী ঘড় ঘড় আওয়াজ করে খুলে গেল ভারি লোহার পাল্লা।
গলা থেকে পা পর্যন্ত কালো আলখাল্লায় ঢেকে দাঁড়িয়ে আছেন একজন দীর্ঘকায় বৃদ্ধ। হাতে ধরা প্রাচীন আমলের চিমনিবিহীন রূপোর বাতিদানে বসানো মোমের আলোয় প্রথমেই চোখে পড়ল তাঁর নাকের নিচের ধবধবে সাদা পুরু গোঁফ আর পরিষ্কার কামানো চিবুক। ডান হাতটা সামনে বাড়িয়ে আন্তরিকতার সুরে পরিষ্কার ইংরেজিতে আমায় আমন্ত্রণ জানালেন বৃদ্ধ, “আপনার জন্যে সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি আমি। আসুন।”
সুটকেসটা তুলে নিয়ে এগিয়ে গেলাম। জোর করে আমার হাত থেকে সুটকেসটা নিয়ে নিলেন বৃদ্ধ, তারপর ইঙ্গিতে এগিয়ে যেতে বললেন। বলেই কি মনে করে, বোধহয় এতক্ষণ হাত মেলাতে মনে ছিল না বলে একটু লজ্জিত ভাবেই আমার ডান হাতটা চেপে ধরলেন তিনি। চমকে উঠলাম। বহুক্ষণ আগে মরে যাওয়া মানুষের মতো ঠান্ডা ওঁর হাত। আমার চমকে ওঠাটা বৃদ্ধের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। মৃদু হেসে বললেন তিনি, “দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। ওপরে চলুন।”
আমার হাত চেপে ধরা আর ঝাঁকুনি দেয়ার ভঙ্গি দেখে চকিতে আগন্তুকের কথা মনে পড়ে গেল আমার। সেই আগন্তুক ভদ্রলোক আর এই বৃদ্ধ একই লোক নয়তো? কথাটা কেন মনে এলো বুঝতে পারলাম না, কিন্তু কেন যেন মনে হতে লাগল দু’জন একই লোক। হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলাম, “আপনি কি কাউন্ট ড্রাকুলা?”
“ঠিক ধরেছেন,” বিনয়ে বিগলিত ভঙ্গিতে মাথা নোয়ালেন বৃদ্ধ, “আমিই কাউন্ট ড্রাকুলা।” বলেই সচকিত হয়ে উঠলেন কাউন্ট, “এখন চলুন তো। বাইরে এই প্ৰচণ্ড ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে না থেকে ঘরে চলুন, সেখানেই আপনার সব প্রশ্নের জবাব পাবেন। তাছাড়া পথশ্রমে নিশ্চয়ই আপনি ক্লান্ত। খাওয়া এবং বিশ্রামেরও দরকার আছে আপনার।”
বলতে বলতেই পাশের দেয়ালের তাকে বাতিদানটা রেখে দিয়ে চওড়া ঘোরানো সিড়ি বেয়ে তর তর করে ওপরে উঠতে শুরু করলেন কাউন্ট। কয়েক তলা উঠে লম্বা টানা বারান্দা। নিঝুম নিস্তব্ধ বারান্দায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আমাদের পায়ের ভারি শব্দ। বারান্দার শেষ প্রান্তে একটা ভারি দরজা ঠেলে খুলে আমাকে ভেতরে ঢুকতে আহ্বান জানালেন কাউন্ট। ঘরের ভেতরে ঢুকেই খুশি হয়ে উঠল মনটা। আলোয় ঝলমল করছে বিশাল কক্ষটা। বিশাল একটা ডাইনিং টেবিল রাখা আছে ঘরের মাঝখানে। ঘরের কোণের বিরাট ফায়ারপ্লেসে জ্বলছে গনগনে আগুন।
আমি ঢুকতেই সুটকেসটা নামিয়ে রেখে দরজা বন্ধ করে দিলেন কাউন্ট। এগিয়ে গিয়ে ঘরের অন্য পাশের দরজাটা খুললেন। দরজা খুলতেই চোখে পড়ল জানালাশূন্য ছোট্ট একটা আটকোনা ঘর, একটি মাত্র মোমবাতি জ্বলছে সে ঘরে। সে ঘরটাও পেরিয়ে গিয়ে অন্যপাশের দরজাটা খুললেন কাউন্ট, তারপর ইঙ্গিতে ডাকলেন আমাকে। তৃতীয় ঘরটায় গিয়ে ঢুকলাম। চমৎকার করে সাজানো ঘরটা। খাট, ফায়ারপ্লেস ইত্যাদি বেশ কায়দা করে জায়গামতো রাখা হয়েছে। নিজে গিয়ে প্ৰথম ঘরটা থেকে আমার সুটকেসটা বয়ে আনলেন কাউন্ট। সেটা জায়গামতো রাখতে রাখতে বললেন, “বাথরুমে গিয়ে ভালোমতো হাত-মুখ ধুয়ে নিন, চাইলে গোসলও সেরে নিতে পারেন। গরম পানি আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে ওখানে। কাজ শেষ করে সোজা ডাইনিং রূমে চলে আসুন। আমি অপেক্ষা করব সেখানে,” বলেই দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে চলে গেলেন কাউন্ট।
কাউন্টের ব্যবহারে সন্দেহ ও আশঙ্কার আর লেশমাত্র থাকল না আমার মনে। মনটা স্বাভাবিক হয়ে আসতেই চেগিয়ে উঠল খিদে। তাড়াতাড়ি কাপড় বদলে হাত-মুখ ধুয়ে ডাইনিং রূমে গিয়ে ঢুকলাম। ফায়ারপ্লেসের একপাশে পাথরের দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কাউন্ট। আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই রাশি রাশি খাবার সাজানো ডাইনিং টেবিলের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “নিশ্চয়ই খেদে পেয়েছে খুব? আপনি আসার আগেই খেয়ে নিয়েছি আমি। সুতরাং অযথা দেরি না করে বসে পড়ুন।”
খাওয়ার টেবিলে বসে পড়ে প্রথমে মিস্টার হকিন্সের কাছ থেকে নিয়ে আসা চিঠিটা পকেট থেকে বের করে কাউন্টের দিকে বাড়িয়ে ধরলাম আমি। চিঠিটা আমার হাত থেকে নিয়ে খুলে পড়তে শুরু করলেন কাউন্ট। পড়া শেষ হতেই নিঃশব্দ হাসিতে ভরে গেল কাউন্টের মুখ। চিঠিটা পড়ে দেখার জন্যে আমার দিকে এগিয়ে এলেন তিনি। চিঠির শেষের খানিকটা পড়ে আমার মনটাও অত্যন্ত খুশি হয়ে উঠল। হকিন্স লিখেছেন, “...হঠাৎ বাতে আক্রান্ত হয়ে পড়ায় আমি নিজে আপনার সাহায্যে হাজির হতে পারলাম না বলে দুঃখিত। কিন্তু যাকে পাঠাচ্ছি তাকেও নির্দ্বিধায় আমার আসনে স্থান দিতে পারেন। আমার কাজের জন্যে ওর মতো যোগ্য লোক আর খুঁজে পাইনি আমি। আপনার প্রাসাদে থাকাকালীন আপনার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার নির্দেশ আমি দিয়ে দিয়েছি ওকে, অতএব কাজ উদ্ধারের ব্যাপারে যেভাবে খুশি ব্যবহার করতে পারেন...”
আমার পড়া শেষ হতেই এগিয়ে এসে প্লেটের ঢাকনা তুলে দিয়ে আমাকে খেতে তাড়া লাগালেন কাউন্ট। চমৎকার রান্না করা মুরগির রোস্ট, সালাদ, পনির আর এক বোতল পুরানো টোকয় মদ দিয়ে খাওয়া সেরে নিলাম। খাওয়ার পর আমার সাথে গল্প করতে বসলেন কাউন্ট। কাউন্টের অনুরোধেই চেয়ারটা ফায়ারপ্লেসের সামনে টেনে এনে তার মুখোমুখি বসলাম আমি। পকেট থেকে চুরুটের বাক্স বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলেন কাউন্ট। আমি একটা টেনে নিতেই বাক্সটা বন্ধ করে পুরো বাক্সটাই আমাকে দিয়ে দিলেন তিনি। আমি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চাইতেই মৃদু হেসে জানালেন ধূমপানে অভ্যস্ত নন কাউন্ট। তাঁর মেহমানদারীতে সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমি। অতিথির আদর আপ্যায়নে কোনো দিকেই ত্রুটি রাখেননি তিনি।
চুরুটে টান দিতে দিতে কাউন্টের চেহারা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম আমি। সম্ভ্রান্ত চেহারা, দেখলেই বোঝা যায় কাউন্ট হবার সম্পূর্ণ যোগ্যতা আছে এ লোকের। ভরাট মুখে রাজ্যের গাম্ভীৰ্য, বলিষ্ঠ চিবুক, ঈগলের ঠোঁটের মতো বাঁকানো নাক, চওড়া ঢালু কপাল যেন পাথর কুঁদে বের করে আনা হয়েছে। আশ্চর্য ঘন কালো ভুরু, আব মাথায় ঝাঁকড়া চুল। চুল আর ভুরু ঘন কালো অথচ গোঁফ সম্পূর্ণ সাদা, ভারি অদ্ভুত ব্যাপার তো!
টুকটুকে লাল ঠোঁটের প্রান্ত ঠেলে একটু সামনের দিকে বেরিয়ে এসেছে ঝকঝকে সাদা তীক্ষ্ণ দাঁত, এটাও কেমন যেন বেখাপ্পা লাগল আমার কাছে। পাতলা কানের আগাদুটো ছুঁচালো হয়ে উঠে গেছে। সব মিলিয়ে আমার মনে হলো এ পৃথিবীর মানুষ নন কাউন্ট, এখানে বাস করা যেন তাঁর সাজে না। কথাটা কেন মনে হলো বুঝতে পারলাম না।
হাঁটুর ওপর রাখা কাউন্টের হাতের বেঁটে রুক্ষ আঙুলগুলোর দীর্ঘ নখগুলো দু’পাশ থেকে কেটে তীক্ষ্ণ করা। হঠাৎ তাঁর হাতের তালু দুটো উল্টাতেই একটা জিনিস দেখে চমকে উঠলাম, দু’হাতের তালুতেই কয়েক গোছা করে চুল। ভারি অদ্ভুত তো! কথা বলার জন্যে আমার দিকে একটু ঝুঁকে আসতেই ওঁর দিক থেকে মুখ সরিয়ে নিলাম আমি। নিঃশ্বাসে ওঁর বোঁটকা পচা গন্ধ। কোনো মানুষের নিঃশ্বাসে অমন পচা গন্ধ থাকতে পারে ভাবিনি কখনও। আমার মুখ বাঁকানো দেখে মুচকে হাসলেন কাউন্ট। হাসার সময় স্পষ্ট দেখা গেল দু’পাশের ঠেলে বেরিয়ে আসা দাঁত।
হঠাৎ চারদিকের নিঃসীমা নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিয়ে উপত্যকার দিক থেকে ভেসে এলো হাজারো নেকড়ের চাপা হিংস্র গর্জন। নিজের অজান্তেই শিউরে উঠে জানালার দিকে চাইতেই দেখলাম বাইরে শেষ হয়ে আসছে রাত। ইতিমধ্যেই ফিকে হতে শুরু করেছে নিকষ কালো অন্ধকার। নেকড়ের গর্জন শুনে চাপা উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করে উঠল কাউন্টের দু’চোখ। আবেগ জড়িত গলায় বললেন তিনি, “শুনেছেন কেমন সুন্দর গান গাইছে ওরা? গাইবেই তো, আসলে ওরা যে আঁধারের সন্তান।”
তাঁর কথায় আমার চোখে মুখে বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠতেই মৃদু হেসে বললেন কাউন্ট, “আসলে সবাই সব কিছু বোঝে না। তাছাড়া আপনারা শহুরে মানুষ, কিসে শিকারীর আনন্দ তা আপনাদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব।” বলেই উঠে দাঁড়ালেন তিনি, “ভোর হয়ে আসছে। ভুলেই গিয়েছিলাম পথশ্রমে আপনি ক্লান্ত। যান, আর দেরি না করে, শুয়ে পড়ুনগে। একটা বিশেষ কাজে বাইরে যেতে হচ্ছে আমাকে। তাই সাঁঝের আগে দেখা পাবেন না আমার।” নিজেই এগিয়ে গিয়ে আমার শোবার ঘরের দরজা মেলে ধরলেন কাউন্ট। আমি ঘরে ঢুকতেই দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন তিনি। হঠাৎ নিঃসীম একাকীত্বে পেয়ে বসল আমাকে। অকারণেই ছমছম করে উঠল গা। মন বলছে ভয়ঙ্কর কোনো ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছি আমি।
৭ মে।
জানালার দিকে চাইতেই দেখলাম অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করেছে। ব্যাপার কি? একদিনে দু’বার ভোর হতে পারে না। হঠাৎ বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা। এক কাক ভোরে ঘুমিয়ে আরেক কাক ভোরে জেগে উঠেছি আমি। মাঝখানে পার হয়ে গেছে পুরো একটা দিন আর রাত। বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম। কাপড় জামা পাল্টে নিয়ে ডাইনিং রূমে এসে ঢুকতেই টেবিলে সাজানো নাস্তার দিকে চোখ পড়ল। এক পাশে ঢাকা দেয়া কফির পাত্র। এগিয়ে গিয়ে ঢাকনা খুলতেই বাষ্প বেরিয়ে এলো কফির পাত্র থেকে। বোধহয় মিনিট খানেকও হয়নি পাত্রটা রেখে গেছে কেউ। টেবিলে রাখা বাতিদানে মোমবাতি জ্বলছে। তার একপাশে পেপার ওয়েট দিয়ে চেপে রাখা এক টুকরো কাগজের দিকে চোখ পড়ল। তাতে কি যেন লেখা। এগিয়ে গিয়ে কাগজটা তুলে নিয়ে পড়লাম : “জরুরি কাজে বাইরে যেতে হচ্ছে আমাকে। আপনাকে একা একা নাস্তা সারতে হচ্ছে বলে দুঃখিত। —ড্রাকুলা।”
একা একাই নাস্তা সেরে নিলাম। একটা ব্যাপার বড় আশ্চর্য লাগল। এত বড় বাড়িটা এত নিঝুম কেন? চাকর-বাকর বা অন্য কোনো লোকজন নেই নাকি? চাকরদের ডাকার জন্যে ঘণ্টী-টন্টি জাতীয় কিছু পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে শুরু করলাম, কিন্তু সে রকম কিছুই চোখে পড়ল না।
খুঁজতে খুঁজতে বাড়িটার অফুরন্ত প্রাচুর্য চোখে পড়ল। টেবিলে রাখা প্ৰত্যেকটা বাসন পেয়ালা খাঁটি সোনার তৈরি। এত সুন্দর কারুকাজ করা তৈজসপত্র আজকের দিনে দুর্লভ। আমার বেডরুমের দরজা জানালার পর্দা আর সোফার কভারগুলো অপূর্ব সুন্দর আর দুর্লভ মখমলের তৈরি। দেখেই বোঝা যায় কয়েক শতাব্দী আগে তৈরি হয়েছে এসব, অথচ এখনও কি আশ্চর্য সুন্দর আর ঝলমলে। ঘরের কোথাও আয়না জাতীয় কিছু চোখে পড়ল না। এটাও আশ্চর্য। এত বড় বাড়ি আর প্রাচুর্যের মধ্যে চাকর-বাকর না থাকার মতোই কাঁচ না থাকাও কেমন যেন বেমানান।
এখনও ভালো করে ভোরের আলো ফোটেনি। এসময় বাইরে বেরোনো যাবে না, আর কাউন্টের বিনা অনুমতিতে বাইরে বেরোনো উচিত হবে না।
পড়ার মতো বই-টই পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে শুরু করলাম। ছোট্ট আটকোনা ঘরের তৃতীয় দরজা ঠেলা দিতেই খুলে গেল। দরজার ওপাশে বেশ বড় একটা ঘর। হ্যাঁ, পড়ার ঘরই। দেয়াল-জোড়া ব্লক-কেসগুলো চামড়ায় বাঁধানো অজস্র বইয়ে ঠাসা। প্ৰায় সব বিষয়ের ওপরেই বই আছে সেখানে। অধিকাংশই ইংরেজি। আর আছে আইনের বই। বইগুলো দেখে খুশি হয়ে উঠল মনটা। ডুবে গেলাম বইগুলোর মধ্যে। বাড়ছে বেলা।
গভীর মনোযোগের সাথে বইগুলো দেখছি, এমন সময় দরজা ঠেলে ঘরে এসে ঢুকলেন কাউন্ট। বইয়ের প্রতি আমার আগ্রহ দেখে বললেন, “চমৎকার, মি. হারকার। আপনিও দেখছি আমার মতোই বইয়ের পোকা।” একটু থেমে আবার বললেন, “একটা জিনিস খেয়াল করেছেন? বইগুলোর বেশিরভাগই ইংরেজি। আসলে ইংরেজি আর ইংরেজদের আমার দারুণ ভালো লাগে। আমার জীবনের একটা বড় ইচ্ছা লন্ডনে বাড়ি করে স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করব, তাই ইংরেজিটা মোটামুটি ভালোই আয়ত্ত করে নিয়েছি...”
বাধা দিয়ে বললাম, “মোটামুটি বলছেন কি, কাউন্ট? আপনি তো ইংরেজদের মতোই ইংরেজি বলতে পারেন।”
“আসলে বাড়িয়ে বলছেন আপনি। তবে হ্যাঁ, গ্রামারটা ভালো মতোই আয়ত্ত করে নিয়েছি। আর কাজ চালানো যায় এমন কিছু ইংরেজি শব্দও জানা আছে আমার।”
“খামোকা বিনয় দেখাচ্ছেন, কাউন্ট। আমার মতো যে কেউই বলবে চমৎকার ইংরেজি জানেন আপনি।”
“তবুও আপনার কাছে ভাষাটা আর একটু ঝালিয়ে নিতে চাই আমি।”
“অবশ্যই, আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব আমি। তবে শেখার বাকি নেই খুব একটা।” বিষয়টাকে চাপা দেবার জন্যেই বললাম, “আচ্ছা, কাউন্ট, আপনার প্রাসাদের ঘরগুলো দেখতে কোনো অসুবিধে আছে কি?”
“অসুবিধে! কিসের অসুবিধে? স্বচ্ছন্দে প্রাসাদের ভেতরে যেখানে আপনার খুশি যেতে পারেন আপনি। তবে একটা কথা, তালা দেয়া ঘরগুলোতে ভুলেও ঢোকার চেষ্টা করবেন না। কারণটা ঠিক বোঝাতে পারব না আপনাকে। তবে এটুকু বলছি, অহেতুক কৌতূহল প্রকাশ করবেন না।”
মনে মনে আশ্চর্য হলেও মুখে বললাম, “তা আপনি যা বলেন।”
“আমার কথায় অবাক হবেন না। ট্রানসিলভেনিয়ায় যখন এসেছেন নতুন অনেক কিছুই দেখতে পাবেন, জানতে পারবেন। অবশ্য ইতিমধ্যেই অদ্ভুত অনেক কিছু নিশ্চয়ই দেখে ফেলেছেন আপনি।”
আরও আশ্চর্য হলাম। ইতিমধ্যেই কিছু দেখেছি তা কাউন্ট জানলেন কি করে? একটানা বকবক করে চললেন কাউন্ট। প্রাসাদ-দুর্গ এবং আশেপাশের এলাকা সম্পর্কে তাকে কিছু প্রশ্ন করলাম, অনেক প্রশ্নের জবাবই কৌশলে এড়িয়ে গেলেন তিনি। দ্বিধায় ভুগতে ভুগতে এক সময় জিজ্ঞেসই করে ফেললাম, “একটা কথা কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারছি না, কাউন্ট। সেদিন রাতে ঘোড়ার গাড়িতে করে আসার সময় একটা অদ্ভুত নীল আলো চোখে পড়েছিল আমার। এ সম্পর্কে আপনার কিছু জানা আছে কি?”
“আছে,” মুচকি হাসলেন কাউন্ট, “এখানকার লোকদের ধারণা বছরের বিশেষ একটা দিনে মাঝ রাতের পর সমস্ত প্ৰেতাত্মারা জেগে ওঠে। ধন-রত্নের পাহারাদার প্ৰেতাত্মারা যেখানে থাকে সেখানে জ্বলতে শুরু করে ওই অদ্ভুত নীল আলো। আসলে ওদের গা থেকেই বেরোয় ওই আলোর ছটা।”
“আশ্চর্য!”
“হ্যাঁ, তাই। গতকালই গেছে সেই বিশেষ দিনটি। যেসব এলাকা পার হয়ে এসেছেন আপনি, সেসব এলাকার মাটির নিচে প্রাচীন ধন ভাণ্ডার চাপা পড়ে থাকা খুবই স্বাভাবিক। যুদ্ধের আগে ট্রানসিলভেনিয়ার সমস্ত ধনী ব্যক্তিরা ওই এলাকার পাশেই বসবাস করত।”
“ওই নীল আলো সম্পর্কে এখানকার লোকেরা জানে, বোধহয় দেখেও থাকবে কেউ কেউ। তা সত্ত্বেও ওই গুপ্তধন এতদিন অনাবিষ্কৃত থাকল কি করে?”
জোরে শব্দ করে হাসলেন কাউন্ট। আলোর ছটা ঝিক করে উঠল দু’পাশের তীক্ষ্ণধার দাঁত দুটোয়। হাসিটা স্তিমিত হয়ে এলে বললেন, “আগেই বলেছি, নীলচে আলো দেখা যায় শুধু বছরের বিশেষ একটা রাতে। ওই রাতে দরজায় শক্ত করে খিল এঁটে ঘরে বসে ইষ্ট নাম জপ করতে থাকে এ এলাকার ভীত গেঁয়ে মানুষের দল। ভুলেও ঘরের বাইরে পা বাড়াতে সাহস করে না ওরা। আর যদি ঘরের ফাঁক ফোকর দিয়ে কেউ দেখেও ফেলে ওই আলো তাহলেও চোখের ভুল বলে ভুলে যেতে চেষ্টা করে। আসলে আলো দেখা যাওয়া জায়গার ত্রিসীমানায় দিনের বেলাতেও ঘেঁষতে চায় না কেউ।”
“বুঝলাম।”
প্রসঙ্গ বদলে অন্য কথায় চলে গেলেন কাউন্ট। বললেন, “যে জন্যে আপনার এখানে আসা সে সম্পর্কেই তো এখন জানা হলো না কিছু। আমার কেনার জন্যে নির্দিষ্ট করা বাড়িটা সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?”
“আসছি,” বলে সোজা নিজের ঘরে চলে এলাম। সুটকেস থেকে প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্ৰ বের করে নিয়ে আবার পড়ার ঘরে এসে ঢুকলাম। ছোট্ট টেবিলটার সামনের সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে এখন ব্রাডসর গাইডের পাতা উল্টাচ্ছেন কাউন্ট। তার পাশে একটা সোফায় বসে পড়ে দলিলের নকল, টাকার হিসেব-পত্র সব বুঝিয়ে বললাম। বাড়ির পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং প্রতিবেশীদের সম্পর্কে আমাকে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করলেন তিনি। মনে হলো সব শুনে সন্তুষ্ট হয়েছেন কাউন্ট। স্পষ্টই বোঝা গেল চারধারে উঁচু পাথরের দেয়াল দিয়ে ঘেরা কুড়ি একর জমির ওপর গাছপালায় ছাওয়া আর গির্জাওয়ালা বহু পুরানো লন্ডনের ওই নির্জন বাড়িটা কিনতে পেরে খুশি হয়েছেন তিনি। কাউন্টের কথায় মনে হলো নিৰ্জনতা আর ছায়া ছায়া অন্ধকারে একা বসে বসে ভাবতে ভালো লাগে ওঁর। কারণটা কি? সাংঘাতিক কোনো মানসিক আঘাত পেয়েছেন জীবনে? কাউন্টকে দেখার পর থেকে ওঁর কথা বলার ধরন-ধারণ মোটেই ভালো লাগছে না আমার, আর ওঁকে হাসতে দেখলেই চমকে উঠি, কেমন যেন ভয়ঙ্কর মনে হয় হাসিটা। বুঝতে পারছি না কিসের সাথে এর তুলনা করা চলে।
কি মনে হতেই হঠাৎ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন কাউন্ট, যাবার আগে পেছন থেকে টেনে দরজা বন্ধ করে দিয়ে গেলেন। সেদিকে একবার চেয়ে আবার বইগুলোর দিকে মনোনিবেশ করলাম আমি। একটা পাতলা কিন্তু বড় আকারের বইয়ের দিকে হঠাৎ চোখ পড়ল আমার। দেখে মনে হলো গত কিছুদিন ধরে বইটা বড় বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। তাক থেকে টেনে নিলাম বইটা। একটা ওয়ার্ল্ড ম্যাপ। বইয়ের এক জায়গায় পাখির পালক গুঁজে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। পালক গোঁজা পাতাটা খুলে দেখলাম সেটা ইংল্যান্ডের মানচিত্র। মানচিত্রের গায়ে কয়েকটা জায়গায় লাল-নীল পেন্সিল দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম জায়গাগুলো। লন্ডনের পুবদিকে যেখানে ওঁর নতুন বাড়িটা কেনার কথাবার্তা চলছে তার কাছাকাছিই একটা জায়গা চিহ্নিত করা। দ্বিতীয়টা এগজিটার এবং তৃতীয়টা ইয়র্কশায়ার উপকূলের হুইটবি এলাকার কাছাকাছি কোনো এক জায়গায়।
কয়েক ঘণ্টা পর আবার ফিরে এলেন কাউন্ট। বললেন, “সেরেছে, সারা রাত এভাবেই কাটাবেন নাকি! কখন রাত হয়ে গেছে খেয়াল নেই বুঝি? খেতে যেতে হবে না? আসুন, জলদি খেয়ে নিন।’
কাউন্টকে অনুসরণ করে ডাইনিং রূমে এসে ঢুকলাম। হাত ধরে ডাইনিং টেবিলের সামনে একটা চেয়ারে আমাকে বসিয়ে দিয়ে ফায়ারপ্লেসের কাছের চেয়ারটায় বসলেন কাউন্ট। বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, “আজও একাই খেতে হচ্ছে আপনাকে। আমি বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি।”
আমার খাওয়া শেষ হলে গত রাতের মতোই একটানা বকবক করে চললেন কাউন্ট। সময় সম্পর্কে আমাদের কারোরই কোনো খেয়াল থাকল না। হঠাৎ হিমেল হাওয়ায় ভর করে দূরের কোথাও থেকে ভেসে এলো মোরগের ডাক। ভোর হয়ে আসছে তার জানান দিচ্ছে ওরা। রীতিমতো চমকে উঠলেন কাউন্ট। লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ছিঃ ছিঃ, ভোর হয়ে গেছে। সারাটা রাত আপনাকে আটকে রাখা আমার সত্যিই অন্যায় হয়েছে। আসলে ইংল্যান্ডের কথা এসে পড়ায়ই এমনটা ঘটল। ইংল্যান্ড সম্পর্কে আলোচনা করতে দারুণ ভালো লাগে আমার। যান, আর দেরি না করে শুয়ে পড়ুনগে,” বলেই দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন কাউন্ট।
নিজের ঘরে ফিরে এলাম। জানালার ভারি পর্দাটা সরিয়ে ফেলতেই খোলা আকাশের দিকে চোখ পড়ল। দ্রুত রং বদলাচ্ছে রাতের আকাশ। ইতিমধ্যেই আঁধার কেটে গিয়ে ধূসর হতে শুরু করেছে চারদিক। সারাটা রাত কেটে গেল অথচ এখনও ঘুমের লেশমাত্র নেই আমার চোখে। তাই আবার পর্দাটা টেনে দিয়ে এসে লিখতে বসলাম।
৮ মে।
কাউন্টের প্রাসাদ-দুর্গের কিছু কিছু জিনিস অত্যন্ত রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে আমার। প্রাসাদে পৌঁছে কাউন্টের সৌজন্যতায় প্রথমে মনে হয়েছিল এখানে আমি নিরাপদ, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তা নয়। সারাটা প্রাসাদে একমাত্র কাউন্ট ছাড়া এ পর্যন্ত অন্য কোনো মানুষের ছায়াও চোখে পড়েনি আমার। কাউন্টের ব্যবহারও কেমন যেন অদ্ভুত। দিনের বেলায় ভুলেও দেখা পাওয়া যায় না তাঁর। কোথায় যান, কি করেন বুঝতে পারছি না।
অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটেছে আজ। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। সন্ধ্যার পর ঘুম থেকে উঠে সঙ্গে করে আনা ছোট আয়নাটা আর দাড়ি কামাবার সরঞ্জাম বের করে নিয়ে জানালার সামনে বসে দাড়ি কামাবার জোগাড় করছি। সবে কামাতে শুরু করেছি এমন সময় কাঁধের ওপর কারও হাতের কঠিন চাপ অনুভব করলাম। ঘুরে তাকাতে যাব এমন সময় কনের কাছে বেজে উঠল কাউন্টের ভারি গলার আওয়াজ, “গুড ইভনিং, মি. হারকার।”
ঠিক আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন কাউন্ট, অথচ আয়নায় তার প্রতিবিম্ব দেখতে পাচ্ছি না আমি। ঘরে ঢোকার সময় তার পায়ের শব্দও আমার কানে যায়নি। ব্যাপারটা কি করে সম্ভব?
আয়নায় কাউকে দেখতে না পেয়ে ফিরে চাইলাম। যা ভেবেছিলাম, ঠিক আমার পেছনেই দাঁড়িয়ে আছেন কাউন্ট। সারাটা ঘর এবং ঘরের সমস্ত জিনিসপত্রের প্রতিবিম্ব পড়েছে আয়নায়, অথচ আমার পেছনে দাঁড়ানো কাউন্টকে দেখা যাচ্ছে না কেন? এমন অদ্ভুত কথা তো শুনিনি কখনও! একটা প্ৰচণ্ড অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। বুঝতে পারলাম না অস্বস্তিটা কিসের, কিন্তু খেয়াল করেছি, কাউন্ট যখনই আমার খুব কাছাকাছি আসেন তখনি এমন বোধ করতে থাকি আমি।
হঠাৎ এমন একটা কাণ্ড করলেন কাউন্ট যে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম আমি। কাউন্ট আমার কাঁধে হাত রাখার পর চমকে উঠে হাত ফসকে গিয়ে গালের খানিকটা জায়গা কেটে গেল আমার। সেখান থেকে বেরিয়ে গাল বেয়ে নিচের দিকে নেমে আসছে রক্ত, টের পাচ্ছি। ক্ষুরটা হাত থেকে নামিয়ে রেখে সেটা মুছতে যাব এমন সময় কাউন্টের চোখের দিকে চোখ পড়ল আমার। নিজের অজান্তেই শিউরে উঠলাম। অস্বাভাবিক ভাবে জ্বলছে কাউন্টের দুটো চোখ। কয়েক মুহূর্ত একভাবে রক্তের দিকে চেয়ে থেকে আচমকা আমার গলাটা চেপে ধরলেন কাউন্ট, মুখটা নিয়ে এলেন চিবুকের খুব কাছে, যেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সেখানে। কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো লাফ দিয়ে পিছিয়ে এলাম। গলা থেকে কাউন্টের হাতটা সরে গিয়ে আমার বুকের ওপর ঝোলানো ক্রুশটায় ঘষা লাগল। এক লাফে তিন হাত পিছিয়ে গেলেন কাউন্ট। চোখের পলকে আবার স্বাভাবিক হয়ে এলো ওঁর অবস্থা।
মৃদু হেসে সাফাই গাইবার সুরে বললেন কাউন্ট, “দেখুন তো, গারের কতটা কেটে ফেলেছেন! এত অন্যমনস্ক হলে কি চলে?” বলেই দাড়ি কামাবার ছোট আয়নাটা তুলে নিলেন তিনি। “এসব আজেবাজে জিনিস রাখার কোনো মানে হয়? ফেলে দিন এটা,” বলে আমার অপেক্ষা না করে নিজেই খোলা জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন ওটা। এরপর আর একটাও কথা না বলে দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
মনে মনে দারুণ রেগে গেলাম কাউন্টের ওপর। আয়না ছাড়া দাড়ি কামাব কি করে? শেষ পর্যন্ত পিতলের তৈরি ঝকঝকে ক্ষুরের বাক্সের পিঠেই কোনোমতে মুখ দেখে দাড়ি কামানোটা সারলাম। দাড়ি কামিয়ে, বাথরুম সেরে কাপড় পাল্টে নিয়ে ডাইনিংরূমে এসে ঢুকলাম। টেবিলে যথারীতি খাবার সাজানো রয়েছে, কিন্তু কাউন্ট নেই। অতএব একাই খাওয়া সেরে নিলাম। এখানে আসা অবধি কাউন্টকে কিছু খেতে দেখিনি। খাওয়ার পর একা একা এক জায়গায় ঠায় বসে না থেকে বাতিদান সহ মোমবাতি নিয়ে প্রাসাদটা একটু ঘুরে দেখতে চললাম।
সিঁড়ি বেয়ে অল্পক্ষণেই দক্ষিণমুখো একটা ঘরে এসে পৌঁছুলাম। এ ঘরের জানালার কাছে দাঁড়ালে বাইরের প্রকৃতির অপূর্ব সব দৃশ্য চোখে পড়ে। ওদিকে চাঁদ উঠেছে। জানালার কাছে চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে বাইরের সেই দৃশ্যই দেখতে লাগলাম।
প্রায় খাড়া একটা পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে কাউন্টের প্রাসাদ-দুর্গ। এই জানালা থেকে কোনো কিছু ফেললে কোনো জায়গায় ঠেকা না খেয়েই পড়বে গিয়ে হাজার ফুট নিচের পাথুরে উপত্যকায়। তারপর থেকে যদ্দূর চোখ যায় বন আর বন। চাঁদের আলোয় ওই বনকে মনে হলো ঢেউ খেলানো উত্তাল সাগর। আসলে অত ওপর আর দূর থেকে ছোট বড় গাছের মাথাগুলোকেই ওরকম দেখাচ্ছে। ওই অদ্ভুত, ধূসর গাছের সাগরের বুক চিরে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে চকচকে রূপালি ফিতে। ওগুলো পাহাড়ি নদী। চাঁদের আলোয় ওদের সৌন্দৰ্য বেড়ে গেছে শতগুণ। সে সৌন্দৰ্য ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
বেশ কিছুক্ষণ সে দৃশ্য দেখে জানালার কাছ থেকে সরে এসে অন্যান্য কক্ষগুলো ঘুরে দেখতে লগলাম। প্রাসাদ-দুর্গের ভেতরে অজস্র ঘর আর তার দরজা। প্রায় সব ক’টা ঘরের দরজাতেই তালা মারা। জানালাগুলোতে গরাদ নেই, কিন্তু এমন জায়গায় যে তা গলে বাইরে বেরিয়ে নিচে নামা যাবে না। আর অত ওপর থেকে নিচে নামাটাও সম্পূর্ণ অসম্ভব। হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম লোকালয় থেকে বহু দূরে, নির্জন এক রহস্যময় প্রাসাদ-দুর্গে আসলে বন্দী করে রাখা হয়েছে আমাকে। মিনা, সত্যি বলতে কি, ভয় পেয়েছি আমি, টের পাচ্ছি ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে আমাকে ঘিরে।

E-Book Created By
---> Md. Ashiqur Rahman <---
Latest
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য