কালু ডাকাতের নবজন্ম - পুণ্ডরীক চক্রবর্তী

আমায় তুমি ডেকেছ বাবা?

হ্যাঁ, বসো। তোমার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা আছে।

রাম একটু আশ্চর্য হল। হঠাৎ কী এমন জরুরি কথা এই সন্ধেবেলায়। মনে মনে একটা চাপা উত্তেজনা বোধ করে। শুধু উত্তেজনাই নয়, কিছুটা ভয়ও পেল। রাম শুধু তার বাবাকে ভয় পায়, তা নয়। ভয় পায় এলাকার সব মানুষজন।

এলাকার কুকুরগুলো পর্যন্ত লেজ গুটিয়ে বসে থাকে। আসলে কালুডাকাতের যেমন বাজখাই গলা তেমনি মেদবহুল স্বাস্থ্য। রঙটাও যদি ফর্সা হত। অন্য কথা ছিল। মোষের চামড়া কেটে বসানো। তার ওপরে চোখ দুটাে জবা ফুলের মতো টকটকে লাল। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল। রাতের বেলা দেখলে তো কথাই নেই। দিনের বেলা দেখলেই বুক কাঁপে। লোকে বলে অসুর। অবশ্য তা আড়ালে।

পাড়ার মানুষজনও সমীহ করে কথা বলে। সমীহ না করে উপায় কী? কালুডাকাত যে গরীব মানুষদের কাছে দেবতা। আর ধনী ব্যক্তিদের কাছে সাক্ষাৎ যম। এই সম্মান ও ভয় পাশাপাশি হাঁটে কালুডাকাতের জীবনে।

দরজাটা ভেতর তেকে ভেজিয়ে দিয়ে চাপা গলায় কালুডাকাত বলল, এখন তুমি বড় হয়েছ। তুমি আমার একমাত্ৰ সন্তান। আমার অর্জিত ধনদৌলত, সম্পত্তি সবই উত্তরাধিকার সূত্ৰে তুমি তার মালিক হবে। আমিও তাই ঠিক করেছি এখন থেকে আমার সঙ্গে থাকবে। আমার বয়েস হচ্ছে, আস্তে আস্তে কাজ দেখাশোনা, দল পরিচালনার দায়িত্ব তোমাকেই বুঝে নিতে হবে।

কী বলছি বাবা। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

কালুডাকাত গভীর স্বরে বলল, আমি কি করি নিশ্চয়ই তুমি তা জানাে।

রাম মাথা নিচু করে নেয়। বাবা কি করে সে আজ জানে বৈকি।

তখন ও কত ছোট। ফিসফিসানি কথায় ঘুম ভেঙে যেত। রাতে, ওর কৌতুহল হত। কান পাতত। কী বলছে বাবা, নিশুতি রাতে চাপা গলায় মাকে! সে বুঝতে পারত বাবা যেন কোথাও যেতে চায়। মা প্রাণপণ বাধা দিচ্ছে। আবার অনেকদিন ঘুম ভেঙে দেখেছে। বাবার বিছানা খালি। মা, মাঝরাতে জানলার রড ধরে উদ্বিগ্ন হয়ে কখনো দাঁড়িয়ে, কখনও বা ঘরবার পায়চারি খাচ্ছে। আবার সকালে উঠে দেখত বাবা বিছানায় শুয়ে রয়েছে। এই গোলকধাঁধার রহস্য বোঝার বয়েস তখন হয় নি।

এও দেখত রাম, হঠাৎ কাকভোরে পুলিশ ঘিরে ফেলেছে তাদের বাড়িটাকে। পুলিশ দেখে রামের বুক কাঁপত। প্রশ্ন জাগত, তাদের বাড়িতে এত পুলিশ কেন ? পাড়াপড়শিরা উঁকি ঝুঁকি দিত। বাবাকে কেন জানে না পুলিশে থানায়  ধরে নিয়ে যায়। বাবাকে ধরে নিয়ে যায় কেন ? সরাসরি মাকে প্রশ্ন।

মা নিশাচুপ। পাথর।

বলো না মা, চুপ করে আছো কেন ?

মা চোখের জল মুছত। এড়িয়ে যেত। ব্যাপারটা কৌতুহল ও রহস্যে ঘেরা থাকত রামের কাছে। একটু বড় হতে ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করেছে, বাবা তোমাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যায় কেন?

কালু ডাকাত আর গোপন করেনি তার ছেলের কাছে। একদিন ডেকে বলল, শোন তাহলে, তোমার বাবার পেশা একরকম ডাকাতি করা। আরও জেনে রাখো তোমার ঠাকুরদার পেশাও ছিল ডাকাতি করা। আমার হাতে খড়ি তার কাছেই।

সে কী? ডাকাতি করা কারো পেশা হয় নাকি?

বাবার মুখে একথা শুনে দুপা পিছিয়ে গেছিল রাম। বলেছিল সে তো খুব মন্দ কাজ। ছিছিছি। বাবার প্রতি সব সন্তানেরই যে উচ্চ ধারণার বেলুন থাকে সেটা চুপসে গেল মুহূর্তে।

কালুডাকাত বলল, হ্যাঁ, মন্দ কাজ বৈকি। তুমি ঠিকই বলেছ। কিন্তু আমি ভাল কাজের জন্য মন্দ কাজ করি। আর তাই ডাকাতি করাতে আমার লজ্জা নেই। বরং গর্ব বোধ করি। আর একটু বড় হলে তা জানতে পারবে। এর বেশি। আর কোনদিন কিছু জানতে চেও না।

রাম এরপর থেকে আর কোনদিন কখনো বাবার কোন ব্যাপারে কৌতুহল প্রকাশ করেনি। বরং আহত মন নিয়ে যেটুকু জেনেছে, দেখেছে। বাবাকে বস্তির মানুষগুলো কত আদর যত্ন খাতির করে। গরীব মানুষেরা বাবার নামে কপালে হাত ঠেকায়। বাবাকেও সে দেখেছে তাদের সুখ দুঃখের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে। কার মেয়ের বিয়ে হচ্ছেনা, কার ছেলের চোখ অপারেশন। কোথায় কোন গ্রামে কল নেই। পাকা রাস্তা নেই, বিদ্যুৎ আসছে না, এই সব ঝামেলায় বাবা আপনা থেকে এগিয়ে যায়। সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করে। অদ্ভুত মানুষ এই বাবা! তাই ভালো না বেসে শুধু অপরাধী করা যায় না।

শোন রাম, সামনের দিন থেকে তুমি আমার সঙ্গে থাকবে।

না বাবা, আমার দ্বারা ও কাজ হবে না।

কী! বাবার মুখের ওপর কথা। খুব যে সাহস দেখছি তোমার!

রাম মাথা নিচু করে বলল, খেতে পাই না পাই ও পথে আমি যাব না। দরকার হলে কুলিমজুরের কাজ নেব।

হাঃ. হাঃ হাঃ হাঃ । কালুডাকাতের ছেলে হয়ে তুমি কুলি মজুরের কাজ নেবে।

হ্যাঁ, বাবা। অসৎভাবে উপার্জন করা টাকায় পরমান্ন খাওয়ার চেয়ে সৎভাবে খুদকুড়ো খাওয়া ভালো।

কোনটা সৎ আর কোনটা অসৎ বুঝে গেছ দেখছি। কালু ডাকাত বাজখাই গলায় বলল।

রাম আজ বাবার মুখের ওপর এই প্রথম মাথা উঁচু করে বলল, হতে পারে দলিত এক শ্রেণীর মানুষের মঙ্গলের জন্য তোমার উপার্জনের ধনসম্পদ বিলিয়ে দাও। কিন্তু তা বলে ডাকাতি করা, লুঠতরাজ করা সেটা কী সৎকাজ বলে মনে করে নিতে হবে ?

কালুডাকাত গর্জন ছাড়ল, ডাকাত! ডাকাত! ডাকাত! ডাকাত কে না ? উকিল, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ওরা ডাকাত নয়? ডাকাত সবাই। তাহলে ?

রাম ঠাণ্ডাভাবে বাবাকে বোঝাতে চায়, তোমার ওই যুক্তিতর্কের সত্যতা এখানে খাটে না বাবা। একটু ভেবে দ্যাখো বুঝতে পারবে।

কালুডাকাত রক্তবর্ণ চােখে বলল, থাক, আর জ্ঞান দিতে হবে না। আমার কথার অবাধ্য হলে কী শাস্তি হয় জানো ?

জানি বাবা ।

বাবার এই নিষ্ঠুর মস্তব্যে রামের মনে মোচড় লাগে। সংসারে সবচেয়ে প্রিয়জন মা। যার আঁচলে সকল দুঃখকষ্ট ক্লান্তি মুছে ফেলা যায়। সেই মাকে তার আজ মনে পড়ছে। মা কি কম চেষ্টা করেছিল বাবাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু পারে নি।

সেই ভয়ানক দিনটির কথা মনে পড়লে আজও বুক কেঁপে ওঠে। চোখ ফেটে জল আসে।

ঘুম ভেঙে গেছে। মাঝরাত। বাবা আর মায়েতে চলছে প্রচণ্ড বাকবিতণ্ডা। মা কিছুতেই বাবাকে সে রাতে ঘরের বাইরে যেতে দেবে না। বাবা সে বাধা ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে চায়। মাও সেদিন মরিয়া। মার কথা শুনতে পেলাম লজ্জা করে নী তোমার? একমাত্র সন্তান রামের সামনে পিতৃপরিচয় নিয়ে দাঁড়াতে?

না লজ্জা করে না।

তা করবে কেন? স্কুলের ছেলেরা ওকে কী বলে জানো?

কি বলে? কালু ডাকাত জানতে চায়।

বলে, তোর বাবা নিশাচর। তোর বাবা ডাকত।

আমি তার জিঁব ছিড়ে নেব। কালু ডাকাত হুঙ্কার ছাড়ল।

মা বলল, শুনতে অপ্রিয় হলেও তারা তো মিথ্যে বলেনি।

মুখ সামলে কথা বলো। বাবাকে দেখে মনে হল ক্ষ্যাপা সিংহ।

মা আরও বলল, শাকভাত খেয়ে থাকব। তবু ও পথ তোমায় ছেড়ে দিতে হবে। ও পথ ভয়ঙ্কর। রামের গায়ে কালি লাগতে শুরু করেছে। রামের গায়ে আমি আর নতুন কালি লাগতে দেব না।

বাবা যেন আর সময় নষ্ট করতে চাইল না। বোধ হয় দেরি হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎই এক হাঁচকা মেরে বাবা মাকে ছুড়ে দিল দূরে। মা গিয়ে পড়ল ঘরের কোণে ছিটকে আনাজকাটা বঁটির ওপর। বঁটির ওপর পড়ে কিছুক্ষণ ছটফট করে চিরদিনের মতো চুপ করে গেল মা।

মায়ের অকালমৃত্যুতেও বাবার হুঁশ ফিরল না। রাম শেষবারের মতো মাথা নিচু করে আগুনে জলে ঢালার ভঙ্গিমায় বলল, বাবা, তুমি আমায় এতদিন দেখছ, কোনদিন কি তোমার কোন কাজে অবাধ্যতা করেছি?

না, তা করনি বটে। তাহলে খামোকা আমার ওপর তুমি চটছে কেন? পায়ে পড়ি বাবা, আমাকে ও পথে টেনো না। আর তুমিও ও পথ ছেড়ে দাও।

ডাকাতি ছেড়ে কী ভিক্ষে করে খাব?

চুরি করা ধনরত্নে কাজ নেই বাবা।

বলিহারি স্পর্ধা তোমার। আবার আমায় জ্ঞান দিচ্ছ। আবার বলছি আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গেলে ফল ভাল হবে না। বেশ আমি দু-একদিন তোমায় ভাবতে সময় দিলাম। এই বলে কালু ডাকাত ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বার হয়ে গেল।

থানায় নতুন বড়বাবু এসেছেন। খুব কড়া। রাশভারি। কালুডাকাতের নাম তিনি শুনেছেন। কিন্তু হাতে নাতে ধরা না পড়লে তো কাউকে ধরা বা শাস্তি দেওয়া যায় না। তাছাড়া সাধারণ মানুষজন কালুডাকাতকে যেভাবে আগলে রাখে তাতে করে কিছু একটা করা মানে পাবলিকের বিরুদ্ধে যাওয়া। আজকাল পাবলিকের বিরুদ্ধে যাওয়া মানে বোকামি। রাতারাতি বদলির নির্দেশ অথবা লাশ হতে হবে।

একদিন রাম দেখল তার বাবা ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে। গণধোলাই চলছে। চড়, কিল, ঘুঁসি মুখে বুকে পড়ছে বৃষ্টির মতো। কেউ বলছে পা ভেঙে দে। কেউ বলছে হাতদুটাে ভেঙে দে। কেউ বলছে চোখ দুটাে উপড়ে নে।

মাটিতে গড়িয়ে পড়ে কী ভয়ানক মার তার বাবা খাচ্ছে। চোখে দেখা যায় না। এরি মধ্যে কে একজন বলল, থানায় দিলে পুলিশে হিস্যে নিয়ে ছেড়ে দেবে। তার চেয়ে মেরে ফ্যাল। মর্গে পাঠিয়ে দে।

বাবা, বাবা করে ধড়মড় করে উঠে বসিল বিছানায় রাম।

ভাগ্যিস স্বপ্ন। সত্যি হলে রাম হার্টফেল করত। দুঃস্বপ্নের ভেতর রাম আগাম সর্বনাশের গন্ধ পেয়ে সময় নষ্ট করতে চাইল না। অনেকদিন ধরেই টানাপোড়েন চলছিল তার মনে। এবার একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে তাকে।

 

ভেতরে আসতে পারি স্যার ?

থানার বড়বাবু মুখ তুলে তাকালেন। একজন নব্য যুবক।

আসুন। কি চাই ?

একটা খবর ছিল স্যার।

খবর শব্দটা শোনামাত্র দারোগাবাবু নড়ে বসলেন।

বলুন, কিসের খবর? চােখ ছোট করে শিকারির ভঙ্গিমায় দারোগাবাবু জানতে চাইলেন।

রাম বসল না। এদিক, ওদিক তাকিয়ে দেখল ঘরে দারোগীবাবু একাই আছেন। তার সুবিধেই হল। রাম কাঁপা ঠোঁটে ভয়ে ভয়ে বলল, যদি অভয় দেন। তো বলি।

দারোগাবাবু মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, দিলাম, বলুন কী খবর?

রামের ঠোঁট পুনরায় জড়িয়ে গেল। স্যার যদি.........দারোগীবাবু সাহস দিয়ে বলেন, ভয় নেই বলে ফেলুন। প্রয়োজনে আমার কাছ থেকে সব রকমের সাহায্য পাবেন বলুন- ।

রাম বলল, আজ রাতে কুসুমগঞ্জে অমল দত্তর বাড়িতে ডাকাত পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দারোগীবাবু শিউরে উঠলেন, সে কী! ভাবলেন নতুন কোন ইনফরম্যার। পরিচয় হয়নি। তা কাদের দল তাও জানা আছে নিশ্চয় ?

আছে বৈকি স্যার।

রামের গলা বুজে আসছিল চাপা কান্নায়, তা হােক, বলতে তাকে হবে। কালুডাকাতের দল।

কালুডাকাত! কালুডাকাত!

আস্তে স্যার, খবরটা জানাজানি হলে বিপদ আছে।

হ্যাঁ, তা আছে বৈকি। যাইহােক খবরটা পাকা হলে বকশিস পেয়ে যাবেন।

রাম আর দাঁড়ায় না। হন হন করে বেরিয়ে এসে রাস্তায় মিশে গেল। দারোগাবাবু মনে মনে ভাবলেন, খবরটা যদি পাকা হয় তাহলে এ মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। নিশ্চিছদ্রভাবে কালুডাকাতকে ধরার ছক কষলেন তিনি।

শোনা কথা, কালুডাকাত সে নাকি ঘোষণা করেছে এবারে হাতেনাতে ধরা পড়লে ডাকাতি ছেড়ে দেবে। দেখাই যাক।

আধা বিশ্বাস আধা অবিশ্বাসে দরোগাবাবু লম্বা সিগারেট ধরালেন।

খবরটা পাকাই ছিল।

অমাবস্যার ঘাঢ় অন্ধকারে স্বয়ং কালুডাকাত তার দলবল নিয়ে বসেমাত্র হাজির হয়েছিল দত্তদের নির্জন আমবাগানে আর অমনি বিনা মেঘে বাজ পড়ার মতো একটা জিপ এসে থামল ভেতরের রাস্তায় ।

এতরাতে জিপগাড়ি। কালুডাকাত ও তার দলবলের বুঝতে এতটুকু অসুবিধে হয় না, পুলিশের গাড়ি। দলের কেউ নিশ্চয়ই তার সঙ্গে বেইমানি করেছে। কে করল এই বেইমানি? চােয়াল শক্ত করে ভাবে কালুডাকাত! কুলকিনারা পায় না।

আত্মরক্ষাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ।

কালুডাকাতের ইশারায় দলের লোকেরা পালাবার পথ খোঁজে।

বাঘা দারোগাবাবু! পালাতে দেবে কেন ? শেষপর্যন্ত পুলিশের তাড়া খেয়ে কালুডাকাতের দল ছত্ৰাখান হয়ে গেল। যেদিকে পারল দৌড়ে পালাল।

কালুডাকাত তীরের মতো গোপন পথে দৌড়াতে থাকে। কিন্তু পালাবে কোথায় ?

দুচারটে বোমা ফাটল। বন্দুকের আওয়াজ উঠল। তারপর দলবলেরা সব এদিক ওদিক হাওয়া। কালুডাকাত সেই শুধু ধরা পড়ে গেল দারোগাবাবুর প্রায় মুখোমুখি। খবরদার কালু, পালাবার চেষ্টা কর না। আমি কিন্তু গুলি করে দেব। দারোগাবাবুর কণ্ঠে নিষ্ঠুরতার স্বর। চ্যালেঞ্জ জানায় কালুডাকাতকে।

ওই অন্ধকারে বিপজ্জনক মুহুর্তে হঠাৎ আর্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেল। প্রায় হাউমাউ করে সে কেঁদে বলল, দোহাই স্যার, গুলি করবেন না। উনি আমার বাবা। দারোগাবাবু মুখে টর্চের আলো মেরে দেখেন, সেই নব্য যুবকটি, যে থানায় নিজে গিয়ে দারোগাবাবুকে গোপন খবরটি দিয়ে এসেছিল।

দারোগাবাবু আকাশ থেকে পড়েন। চােখ কপালে তুলে বললেন, তাই নাকি?

হাঁ স্যার, উনি আমার বাবা। আশ্চর্য দারোগাবাবুর কয়েক মুহুর্তের জন্য সব গোলমাল ঠেকে। চাকরি জীবনে অনেক ঘটনার সাক্ষী তিনি। কিন্তু এমন ঘটনার মুখোমুখি তিনি আগে কখনো হন নি!

ওদিকে কালুডাকাত দূর থেকে শুনতে পেয়েছে রামের কণ্ঠস্বর। চেঁচিয়ে বলল, ওরে বিশ্বাসঘাতক, ছেলে হয়ে তুই বাবাকে ধরিয়ে দিলি। এই ছিল তোর মনে? দারোগাবাবু কালুডাকাতকে নিয়ে তুলল। জিপ গাড়িতে। পাশে বসিয়ে নিল রামকে ।

রাম নিজেকে সামলাতে পারে না। প্রচণ্ড অভিমানে ভেঙে মুচড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে গড়িয়ে পড়ল বাবার পায়ের কাছে।

যে কান্না গিয়ে স্পর্শ করে পিতৃস্নেহকে।

দারোগাবাবু রামের পিঠ চাপড়ে বললেন, ভেঙে পড়বেন না। আমি তো আছি। এমন সৎ ও সাহসী যুবক সত্যি ইতিপূর্বে আমি আর দেখিনি। আপনাদের মতো সৎ ও নির্ভীক যুবক আজ বড় প্রয়োজন।

ওদিকে কালুডাকােতও মনে মনে বেশ অনুতপ্ত। যেন বলতে চাইল, মন খারাপ করো না রাম। আমাকে আজ ধরিয়ে দিয়ে পুলিশের হাতে বরং নতুন করে জীবন শুরু করার একটা মুহুর্ত এনে দিলে। বাকি জীবন আমিও সৎভাবেই বেঁচে থাকতে চাই।

রাতের অন্ধকারে পুলিশের জিপ-গাড়িটা ছুটতে থাকে থানার দিকে।

 

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য