অবিশ্বাস্য - নিমাই ভট্টাচার্য

শনিবারের বারবেলায় বেরুতে অনেকেই বারণ করেছিল। কিন্তু সকলের কথা অগ্রাহ্য করে বড়বাজার থেকে কেনাকাটা সেরে যখন শিয়ালদা স্টেশনে পৌছলাম তখন আর মাত্র পাঁচ-সাত মিঃ বাকি আছে গাড়ি ছাড়তে। তাই তাড়াতাড়ি বোলপুরের একটি টিকিট কিনে দৌড়লাম, সেখানে গয়া প্যাসেঞ্জার দাঁড়িয়ে আছে। কুলি দুজন সব মালপত্র বাঙ্কের উপর গুছিয়ে রেখে তাদের প্রাপ্য বুঝে নিয়ে চলে গেল। ট্রেন ধরার তাগিদে খেয়ালই হয়নি। যখন খেয়াল হল তখন ট্রেন ছাড়ার ঘণ্টা দিয়ে দিয়েছে। একটা বড় বগীতে একমাত্র যাত্রী বলতে আমিই। মনটা খারাপ হয়ে গেল— যখন মনে হল চুরি, রাহাজানি ও ছিনতাইয়ের জন্য এই গাড়িটার যথেষ্ট নামডাক আছে। একটা মাত্র আলো শিবরাত্রির সলতের মতন জ্বলছে। সারা বগীটার মধ্যে যেন একটা আলো-আঁধারির খেলা চলছে। নিজেকে কি রকম যেন অসহায় মনে হতে লাগল। দুর্গা নাম স্মরণ করে, সাহসে ভর দিয়ে দরজার ছিটকিনিগুলো লাগিয়ে দিয়ে এবং মালপত্রগুলো গোছগাছ করে বসে পড়লাম। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। চিন্তা করছিলাম ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীর কথা, এখন তারা কি করছে? আর এইসব ঝামেলা আমার মাথার উপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য মনে মনে স্ত্রীকে খুব গালিগালাজ করছিলাম। আমি যেখানটায় বসেছিলাম সেখান থেকে ওপাশের বাথরুমটা পরিষ্কারই দেখা যায়। একমনে চিন্তা করছি, ঠিক সেই সময় বোলপুরের কিঙ্করবাবু বাথরুম থেকে হাসতে হাসতে আমারই সামনে বসে পড়লেন। কিঙ্করবাবুকে দেখামাত্র কেমন যেন হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ, তবে এই চলতি গাড়িতে এলেন কেমন করে? এইসব যখন চিন্তা করছি কিঙ্করবাবুই তার সমাধান করে দিলেন। বললেন—ভায়ার কি শ্বশুরালয়ে যাওয়া হচ্ছে?

আজ্ঞে হ্যাঁ। কিন্তু আপনি? আর জিজ্ঞাসা করতে হল না। উনিই বললেন–জানি ভায়া তোমার মনের মধ্যে এই প্রশ্নটাই তোলপাড় করে তুলেছে। আরে ভায়া তুমি আসবার একটু আগেই বাথরুমে গিয়েছিলাম। ক’দিন ধরে পেটটা বড় গোলমাল শুরু করেছে। তা তোমাকে দেখতে পাব আমিও আশা করিনি। যাক ভালোই হয়েছে ভায়া তোমাকে পেয়ে, বেশ গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে কি বলো?

যুক্তিটা মনে মনে মেনে নিলাম। জিজ্ঞাসা করলাম—তা আপনি হঠাৎ এ সময়ে এখানে? আপনি তো কোথাও বড় একটা বার হন না শুনেছি।

আর বলো কেন ভায়া, আত্মীয়স্বজনে ভরতি বাড়ি, যেন গমগম করছে, তা সত্ত্বেও বড় বৌমার জন্য মনটা খারাপ হওয়ায় বাধ্য হয়েই সবাইকে রেখে বেলা ২টার সময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি বৌমার বাড়ির উদ্দেশ্যে। শিবপুরে এসে যখন পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা হব হব। এসেই শুনি বৌমার একটি পুত্রসন্তান হয়েছে ঠিক বেলা ২টার সময়। তাই আর দেরি না করে, এই রাত্রের ট্রেনে যাওয়াই স্থির করে সেই শুভ সংবাদ বয়ে নিয়ে চলেছি। তুমি তো জানো বড় ভাগ্নের বিয়ে আমি নিজে দেখে দিয়েছি। বড় বৌমা আমার ঘরের লক্ষ্মী। আমি কি না এসে থাকতে পারি?

এতগুলো কথা একসঙ্গে বলে একটা বিড়ি ধরিয়ে চুপচাপ টানতে লাগলেন। আজ যেন কিঙ্করবাবুকে কেমন কেমন মনে হতে লাগল। দেখে মনে হয় ওঁর যথাসর্বস্ব কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। চুলগুলো কেমন এলোমেলো, চোখ দুটো যেন কোটরের মধ্যে ঢুকে আগুনের ভাটার মতো জ্বলছে, গলার স্বরটাও যেন ক্ষীণ শোনাচ্ছে। মনে হচ্ছে বহু দূর থেকে কে যেন কথা বলছে। সে চেহারায়ও যেন সেই সুন্দরতা আর নেই। মনে হয় সারা শরীর কে ঝলসে দিয়েছে। কাপড়টা ছেঁড়া, এক পা ধুলো ভরতি। আজকের কিঙ্করবাবু আর সেদিনের কিঙ্করবাবু আকাশপাতাল তফাৎ। অথচ বোলপুরে একে চেনে না এমন লোক বোধহয় খুব কমই আছে। বিরাট অবস্থা, নিজের ছেলেমেয়ে বলতে কেউ নেই। ঐ ভাগ্নে দুজনকে নিজের কাছে রেখে মানুষ করেছেন, তাদের বিয়ে-থা দিয়েছেন, এখন তারাই এনার সব। তারাই এনার ব্যবসাপত্তর, জমিজমা, সব দেখাশুনা করে। শখের মধ্যে যার দু’বেলা ইন্ত্রি করা জামাকাপড় না হলে চলে না সে কিনা এই ছেঁড়া পোশাকে আমারই সামনে এই অবস্থায় ট্রেনে যাচ্ছে! কিন্তু কেন?

হঠাৎই কিঙ্করবাবু বললেন—ভায়া তো অনেক রকম বাজার করেছ দেখছি, তা গীতার বিয়ে তাহলে বেশ ভালোভাবেই হচ্ছে?

বললাম—সবই আপনাদের আশীর্বাদ।

আমাদের আশীৰ্বাদ সব সময়ই আছে ভায়া। তা ছেলেটি বেশ ভালোই, যেমন সুন্দর চেহারা তেমনি সুন্দর মন। সর্বদাই হাসিখুশি। জান ভায়া একবার জিগ্যেস করেছিলাম—হ্যাঁরে, বিয়েতে কি কি পাচ্ছিস? তাতে কি বললে জানো। কি হবে ঐ সামান্য যৌতুক নিয়ে। যাকে নিয়ে সারাজীবন ঘর করতে হবে তার মধ্যে ঐ সামান্য যৌতুক যে সব সময় মনে করিয়ে দেবে নিজের অক্ষমতা। তাই তো বলে দিয়েছি আমার কোনো দাবিই নেই। ভাব তো—এই রকম চিন্তা যদি সব ছেলেদের মধ্যে থাকত, তাহলে আর মেয়ের বাপেরা সর্বস্বাস্ত হত না। লোভকে কতখানি দমন করতে পারলে, এই ধরনের কথা বলা যায়। তাই তো আশীৰ্বাদ করছি ভায়া ওদের বিয়ে সার্থক হোক, ওরা সুখী হোক। প্রসঙ্গটা পালটে হঠাৎ বলে উঠলেন—ভায়া, আমার এই ঘড়িটা ও টাকাগুলো তোমার ঐ তরকারির বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখো তো। শুনেছি এই ট্রেনটা ভালো না। একটা কাগজে মুড়ে গোটা কতক টাকা ও ঘড়িটা আমার হাতে দিলেন।

যুক্তিটা ভালোই মনে করে আমিও আমার ঘড়ি, আংটি ও কিছু টাকা একটা রুমালে বেঁধে তরকারির বস্তার মাঝামাঝি জায়গায় রেখে দিলাম। কিঙ্করবাবুর উপস্থিতিটা আমার খুব অস্বস্তি লাগছিল, তাই বার বার বগীটার ওপাশে গিয়ে ধূমপান করতে হচ্ছিল। কিঙ্করবাবু বোধহয় আমার মনের কথাটা টের পেয়েছিলেন, তাই একটা বিড়ি বাড়িয়ে ধরলেন আমার সামনে। আমি ইতস্তত করছি দেখে, হাসতে হাসতে বললেন—ভায়া ছেলেরা বড় হলে তাকে ঠিক বন্ধুর মতন করে নিতে হয়। এতে লজ্জা পাবার কিছু নেই, অসঙ্কোচে ধরিয়ে ফেল।

আমিও আর দ্বিরুক্তি না করে বিড়িটার সৎগতি করলাম। কিঙ্করবাবু চোখ বুজে বিড়ি টেনে চলেছেন দেখে আমিও জানলার বাহিরে দূরে বহু দূরে ঘুমন্ত গ্রামগুলির দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যাই কোনো এক অজানা স্বপ্নপুরীর উদ্দেশ্যে। তাকিয়ে থাকি জ্যোৎস্নায় স্নাত মাঠ, ঘাট, বন, প্রান্তরের দিকে। সম্ভবত আজ পূর্ণিমা। পূর্ণিমার পূর্ণ আলোয় সারা পৃথিবী যেন অবগাহন স্নান করছে। ঠিক যেন একটা স্বপ্নলোকের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের যন্ত্রদানবটা। দানবটার গর্জনে আকাশবাতাস কেঁপে উঠছে। সেই ভয়ে শিশুরা সব মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে চুপটি করে শুয়ে আছে। গাছগুলোও সব ভয়ে পিছন দিকে ছুটে পালাচ্ছে। তারই মধ্যে দিয়ে দানবটা গর্জন করতে করতে ছুটে চলেছে সামনের দিকে। আরও একজন সমান তালে ছুটে চলেছে তার হাসিমুখ নিয়ে। দেখে মনে হয় দুজনেরই চলার শেষ নেই।—হঠাৎ কল্পলোক থেকে ফিরে এলাম পাশ দিয়ে চলে যাওয়া বিকট আর এক দানবের গর্জনের আওয়াজে। ঘুরে দেখি—কিঙ্করবাবু চোখ দুটো খোলা রেখে, মুখটা হা করে ঘুমুচ্ছেন। যেন একটা মরা মানুষকে কেউ বসিয়ে রেখে দিয়েছে। বগীর ভেতর অল্প আলোয় কিঙ্করবাবুর মুখটা দেখে বেশ ভয় ভয় করতে লাগল। আবার একটা সিগারেট ধরিয়ে বাহিরের দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম। রাত এগারোটা হবে, এইবার গাড়ি ব্যান্ডেলে পৌছবে। নানান ধরনের চিন্তার মধ্যে দিয়ে এক সময় খেয়াল হল গাড়ি প্লাটফর্মে ঢুকছে—কিঙ্করবাবু সেইভাবেই ঘুমিয়ে আছেন। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে একটা চা-ওয়ালাকে ডেকে দুভাঁড় চা নিয়ে কিঙ্করবাবুকে ডেকে তুললাম। চা খেতে খেতে দুজনে গল্প করতে থাকি। এক সময় কিঙ্করবাবুই বললেন—ভায়া এবার তুমি একটু গড়াগড়ি দিয়ে নাও। আমি তো অনেকক্ষণ ঘুমোলাম।

সুযোগ পেয়ে শুয়ে পড়লাম। একটু তন্দ্রার মতন এসেছিল হঠাৎ একটা চিৎকারে ঘুমটা ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখি কিঙ্করবাবু নেই। বুকটার মধ্যে ছ্যাঁৎ করে উঠল। উঠে গিয়ে দেখি কিঙ্করবাবু দরজাটা খুলে ঝুঁকে পড়ে কি যেন দেখছেন পেছন দিকে। হয়তো আমারই পায়ের শব্দ শুনে আস্তে আস্তে ঘুরে নিজের সিটের দিকে চলে গেলেন। কিছু কথা জিগ্যেস করবার সাহস হল না। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আমি আমার জায়গায় এসে বসলাম।

এই কিঙ্করবাবুর সঙ্গে আমার বছর খানেক দেখা-সাক্ষাৎ নেই। প্রায় এক বছর পর আমি শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি। তবে আগে যতবার গেছি এর সঙ্গে দেখা না করে আসিনি। এনার অমায়িক ব্যবহার যেন বার বার হাতছানি দিয়ে ডাকে। কিন্তু আজ কেবলই মনে হচ্ছে এই কিঙ্করবাবুর মধ্যে কোথায় যেন একটা বিরাট তফাৎ উঁকি মারছে।

শক্তিগড় বহুক্ষণ পার হয়ে এসেছি। বর্ধমান আসতে আর বেশি দেরি নেই, তাই আর না ঘুমিয়ে জেগে বসে রইলাম। ওদিকে কিঙ্করবাবুও চোখ বন্ধ করে চুপচাপ বসে আছেন। রাত্রি এখন প্রায় দুটো হবে, ঠান্ডাটাও বেশ জাঁকিয়ে পড়াতে শীত শীত করছে।

এক সময় বর্ধমানে গাড়ি থামতে কিঙ্করবাবু উঠে পড়লেন। বললেন—একটু বোস ভায়া আমি আসছি, বলেই এমন করে চলে গেলেন মনে হল যেন হাওয়ায় মিশে গেলেন। তার ঠিক একটু পরেই একজন চেকার গাড়িতে উঠলেন টিকিট চেক করতে। আমাকে একা দেখে বেশ আশ্চর্য হয়েই প্রশ্ন করলেন।—এত বড় কামরায় এত মাল নিয়ে এই রাত্রের গাড়িতে যাওয়া মোটেই উচিত হয়নি আপনার। একটু আগেই শক্তিগড়ের কাছে একজন নামকরা গুন্ডা গাড়ি থেকে পড়ে মারা গেছে। এই বলে ভদ্রলোক চলে গেলেন এবং যাবার সময় সাবধানে থাকতে বলে গেলেন আমাকে। ভদ্রলোকের কথা শুনে চিন্তার ঝড় বয়ে চলে মনের মধ্যে—শক্তিগড়ের কাছাকাছিই তো কিঙ্করবাবু দরজা খুলে বাইরে কি যেন দেখছিলেন, একটা চিৎকারেই তো আমার ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল। তবে কি…

আর চিন্তা করতে পারলাম না। কিন্তু একি! গাড়ি তো চলতে শুরু করেছে অনেকক্ষণ, কিঙ্করবাবু কোথায়? একটা অজানা আশঙ্কায় বুকের ভেতর দুরদুর করতে লাগল। জানলা থেকে, পেছনে ফেলে আসা অন্ধকারে আচ্ছন্ন প্লাটফর্মের দিকে তাকিয়ে কিঙ্করবাবুকে খোঁজবার চেষ্টা করছি। এমন সময় একখানা হাত আমার কাঁধের উপর পড়ায় আঁতকে উঠে ফিরেই দেখি, বিরাট এক ঠোঙা খাবার হাতে নিয়ে কিঙ্করবাবু সেই প্রাণ কাঁপানো হাসি হেসে চলেছেন। আমার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেই অকস্মাৎ বলে উঠলেন—দরজায় দাঁড়িয়ে চাঁদের লুকোচুরি খেলা দেখছিলাম, তাই খেয়ালই ছিল না তোমার কথা। এস খাওয়া যাক, ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছে, বলে নিজেই দুটো জায়গা করে খাবার ভাগ করলেন। খাবারের পরিমাণ দেখে আমার চোখ তো ছানাবড়া—এত খাবার জীবনে কোনোদিনই খাইনি, বিশেষ করে মিষ্টি তো খেতেই পারি না। তাই ওরই মধ্যে সামান্য কিছু নিয়ে বাকিটা কিঙ্করবাবুর পাতে তুলে দিই। তাই দেখে কিঙ্করবাবুর হাসি আর ধরে না, বললেন—ভায়া তোমাদের বয়সে আমরা কবজি ডুবিয়ে খেতাম আর পাহাড় ভেঙে বেড়াতাম। আর তোমরা?— মানে আজকের এই যুবসম্প্রদায় সে তুলনায় খেতেই পারো না। অবশ্য এর জন্য তোমাদেরই বা দায়ী করি কি করে। দেশের এমনই সমাজ-ব্যবস্থা, যার ফলে এই সম্প্রদায় না খেতে পেয়ে শুকিয়ে শুকিয়ে দেশলাইয়ের কাঠির মতন হয়ে উঠেছে। জান, আমার যদি ক্ষমতা থাকত, তাহলে ঐ শুকিয়ে যাওয়া কাঠিগুলোর মাথায় এমন একটা বারুদের খোল দিয়ে ঘষা দিতাম যার ফলে সব কাঠিগুলো একসঙ্গে জ্বলে উঠত—আর সেই আগুনে সব জ্বলিয়ে-পুড়িয়ে আসল সোনার রং ধরিয়ে দিতাম বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে।—তাই তো বলি ভায়া, কবজি ডুবিয়ে খাবে, পাহাড় ভেঙে বেড়াবে, আর মনকে করবে নির্ভীক। দেখবে সেখানে থাকবে না কোনো ভয়। নাও নাও আরম্ভ কর.....।

খাওয়ার শেষে ওয়াটার বোতল থেকে খানিকটা করে দুজনে জল খেয়ে, একটা সিগারেট ধরালাম। কিঙ্করবাবু নিজে একটা বিড়ি ধরিয়ে চোখ বুজে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বসে রইলেন। সারাদিনের ক্লান্তিতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।—হঠাৎ কিঙ্করবাবুর ডাকে ধড়মড় করে উঠে বসি।—অজয় নদী পার হচ্ছে ভায়া, মালপত্তর সব ঠিক করে নাও। বাইরে চাঁদের আলোটা কেমন যেন একটা ঘুমন্ত স্বপ্নপুরির মতন দেখাচ্ছিল। আস্তে আস্তে প্লাটফর্মে গাড়িটা দাঁড়াতে, কিঙ্করবাবু আর আমি মালপত্তর সব ধরাধরি করে প্লাটফর্মের একটা গাছতলায় জড়ো করে রাখলাম।—ঠান্ডাটাও বেশ পড়েছে, হিমশীতল জ্যোৎস্না আলোকিত প্লাটফর্মে আমরাই মাত্র দুজন যাত্রী। একজন স্বপ্নলোকের মধ্যে আকুলিবিকুলি হয়ে কি যেন দেখার চেষ্টা করছে, তার ঐ চাহনির মধ্যে কাকে যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে।

ভায়া কি এই রাত্রেই বাড়ি যাবে, না বাকি রাতটুকু এইখানে কাটিয়ে ভোরবেলায় যাবে?

তাইতো ভাবছি, আর মাত্র ঘণ্টা দুই রাত আছে, এত মালপত্তর নিয়ে যাওয়া কি ঠিক হবে?

তাহলে এক কাজ করো, এসো ভায়া, বাকি রাতটুকু দুজনে গল্প করে কাটিয়ে দিই।

অগত্যা দুজনে গাছতলার বাধানো জায়গায় বসে পড়লাম। চারিদিকে নিস্তব্ধ। দূরের লাইটগুলো যেন এক একটা প্রদীপের মতন টিমটিম করে জ্বলছে। চাঁদের আলোটা অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। লাইনের ওপাশে দুটো কুকুরের মারামারির চিৎকার ভেসে আসছে দূর থেকে। এক সময় কিঙ্করবাবু উঠে চলে গেলেন বুকিং অফিসের দিকে।

একা একা বসে আছি আর ভাবছি...আজ থেকে ১৫ বছর আগে ঠিক এমনি একটা রাত, সেদিনও সম্ভবত আকাশে এই জ্যোৎস্নাই মুখরিত করে দিয়েছিল। তবে সেদিন সঙ্গে ছিল আমার স্ত্রী। পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের তীর্থভূমির সঙ্গে, লালমাটির এই দেশ আম্রকুঞ্জের ছায়ায় স্থাপিত শান্তিনিকেতনের সঙ্গে। আজ তার কত পরিবর্তন। হঠাৎ চমক ভাঙল একটা মালগাড়ির আওয়াজে। তারই পিছনের লাল আলোটা ধীরে ধীরে দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল কোন এক নামনা-জানা দেশের উদ্দেশ্যে। ফিরে দেখি, একজন পাহারাদার ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে আমার দিকে।

বাবুসাহাব কি কলকাত্তাসে আসলেন? কোথা যাবেন?

যাব শুড়িপাড়ায়। শ্বশুরমশায়ের নাম বলাতে বুঝলাম শ্বশুরমশাইকে চেনে।

হাসতে হাসতে পাহারাদার বলল—আরে উনকে তো হামি বহুত চিনে। পরশুরোজ উনকা ছোট লেড়কির সাদি আছে, হামার ভি নিমন্ত্রণ আছে। তা হাপনি বুঝি উসব বাজার করিয়ে আনলেন। আচ্ছা বাবুজি হামি চল্লো, পরশুরোজ ফিন দেখা হোবে।

চলে গেল একটা দেশওয়ালি সুর ভাজতে ভাজতে। কিঙ্করবাবু দুভাঁড় চা নিয়ে হাজির। ভোর ৩ ৪টার সময় চা কোথায় পেলেন চিন্তা করছি। এমন সময় উনিই হাসতে হাসতে বললেন—একজনকে ডেকে তুলে চা করিয়ে নিয়ে আসতে হল।

চা খেতে খেতে গল্প করছি। এক সময় বললাম—আপনি বরং বাড়ি চলে যান। মিছিমিছি আমার জন্য এই ঠান্ডায় কষ্ট পাচ্ছেন।

হাসতে হাসতে কিঙ্করবাবু বললেন—বুঝলে ভায়া সবই মায়া, আর এই মায়া আছে বলেই মানুষ বারবার পৃথিবীতে জন্ম নেয়। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবকে তাই মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে থাকতে চায়। অহেতুক উতলা হয়ো না, একসঙ্গেই যাওয়া যাবে।

অগত্যা বসে বসে গল্প করতে লাগলাম। এক সময় পূর্ব গগনে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা ধীরে ধীরে তার মিষ্টি আলোর ধারা ছড়িয়ে দিতে লাগল এই মর্ত্যের পৃথিবীতে। হঠাৎ কিঙ্করবাবু কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠলেন। দুটো বিড়ি বার করে, একটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন—ভায়া, একটু বসো, আমি ঐ মাঠটা দিয়ে ঘুরে আসি একবার। বলে, উত্তর দিকের মাঠটায় আলো-আঁধারির মধ্যে মিশে গেলেন।

আলোর রেখাটা ধীরে ধীরে বড় থেকে বড় হয়ে ভরিয়ে তুলেছে আলোর বন্যায়। সেই আলোর পরশে পাখিরা সব গান ধরেছে, দিনমণির আগমনের অপেক্ষায়। দু’একজন করে লোক চলতে শুরু করেছে, কিন্তু কিঙ্করবাবুর আর আসার নাম নেই! যেন হারিয়ে গেছে লোকটা। অনেকক্ষণ বসে আছি, চলে যাব কিনা ভাবছি এমন সময় আমারই বড় শালা শুড়িপাড়া থেকে বেরিয়ে লাইন পার হয়ে দোকান খোলার উদ্দেশ্যে এদিকেই আসছে। আমাকে ঐ অবস্থায় দেখে প্রশ্ন করল—কি ব্যাপার এখানে বসে? রিকশা পাননি বুঝি?

বললাম—আরে, না হে। তোমাদের কিঙ্করবাবু আমাকে বসতে বলে, সেই যে গেলেন ঐ মাঠটার দিকে এখনো পর্যন্ত তার ফেরার নাম নেই।

শালাবাবু কিছুক্ষণ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি একটা রিকশা ডেকে মালপত্তর তুলে শুড়িপাড়ার দিকে রওনা হল আমাকে নিয়ে। পথে যেতে যেতে যতবারই কিঙ্করবাবুর কথা তুলি, ততবারই অন্য প্রসঙ্গে চলে যায় শালাবাবু। তবে কি কিঙ্করবাবুদের সঙ্গে এদের কথা বন্ধ নাকি! হয়তো সেই কারণে শুনতে চাইছে না কিঙ্করবাবুর কথা, তাই হয়তো বার বার অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছে। মনে মনে বিরক্তি বোধ হতে লাগল বড় শালাটির উপর। রিকশা চৌমাথা হয়ে সোজা উত্তরে উকিলপট্টির দিকে চলতে লাগল। আর সামান্য পথই বাকি আছে।

এক সময়ে শ্বশুরবাড়ির দরজার সামনে এসে রিকশা দাঁড়ায়। আমাকে দেখে স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ি ও আত্মীয়স্বজন সবাই বেরিয়ে সদরে এল। চেয়ে দেখি, পাশেই কিঙ্করবাবুদের বাড়িটা তখনো ঘুমে অচেতন।

শাশুড়ি ঠাকুরন দাওয়ায় একটা মাদুর পেতে দিলেন। হাত-মুখ ধুয়ে এসে বেশ আরাম করে বসলাম। সঙ্গে সঙ্গে ছোট শালীটি এককাপ গরম চা এনে দিল এবং বেশ আমেজ করেই খেতে লাগলাম। আদর-আপ্যায়নের বহরে সমস্ত ক্লান্তি যেন সরে যেতে লাগল। হাজার হোক বড় জামাই তো!

আমার মাল নাবাতেই ব্যস্ত, বড় শালাকে দেখেই মনে পড়ে গেল কিঙ্করবাবুর কথা। জিজ্ঞাসা করলাম—হ্যাঁ হে, কিঙ্করবাবু ফিরেছে কিনা একবার খোঁজ নিয়েছ, না, আমার জন্য তিনি আবার স্টেশনে দৌড়োদৌড়ি করছেন? কি ভাববেন ভদ্রলোক! সারারাত একসঙ্গে এলাম, আমাকে কত খাওয়ালেন, আদর-যত্ন করলেন, আর আমি কিনা তাকে রেখেই চলে এলাম! একসঙ্গে এতগুলো কথা বলে তাকিয়ে দেখি বাড়িসুদ্ধ সবাই হা করে চেয়ে আছে আমার দিকে। ওদের চাউনিতে নিজেকে কেমন বোকা বোকা মনে হতে লাগল।

হঠাৎ শাশুড়ি ঠাকুরন প্রশ্ন করলেন—তুমি কার কথা বলছ বাবা? তুমি কি সত্যি বলছ যে, কিঙ্করবাবু গত রাত থেকে তোমার সঙ্গে ছিলেন? বললাম—হ্যাঁ মা, আমি মিথ্যে বলব কেন ব্যস্ আমার উত্তর পেয়েই, এ আমার কি হল রে.....বলে চেঁচিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন শাশুড়ি। সামনে বড় শালাকে দেখে বললেন—ওরে বাবলু, যা তো বাবুর বড় ভাগ্নেকে তাড়াতাড়ি একবার ডেকে আন ।

এবার বিস্ময়ের পালা আমার। মাথাটা কেমন যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। এদের সব কাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে আমি এবার কেঁদে ফেলব। বিস্ময়ের পর বিস্ময়! কিছুক্ষণের মধ্যেই কিঙ্করবাবুর দুই ভাগ্নে আমার সামনে এসে হাজির। তাকে দেখামাত্র শাশুড়ি ঠাকুরন বলতে লাগলেন—বাবা ধীরেন, আমার বড় জামাই তোমার মামার সম্বন্ধে কি বলছে শোন। ছোট শালীটিও দেখি তার মায়ের সঙ্গে সুর মিলিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে সবাই একই সুরে সুর মিলিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। শ্বশুরমশাই মাথায় হাত দিয়ে একপাশে চুপটি করে বসে আছেন। মোটের উপর সবাই অনেকটা তফাতে সরে আমার দিকে কেমন যেন ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে রয়েছে। চোখের উপর এই দৃশ্য দেখে কেমন যেন অস্থিরতার মধ্যে ছটফট করতে থাকি। মনে হচ্ছে এবার আমি পাগল হয়ে যাব। এমন সময় ধীরেন আমার পাশে বসে জিজ্ঞাসা করল—কি হয়েছে জামাইবাবু, আমাকে সব খুলে বলুন তো?

ধীরে ধীরে গত রাত্রের সমস্ত ঘটনাগুলো ধীরেনকে বললাম। আর এও বললাম—তোমার মামা

যে আমাকে বললেন গতকাল বেলা দুটার সময় তোমার একটি পুত্রসস্তান হয়েছে। তাছাড়া, আরও বললেন, তার ক্যাশবাক্সের কোন এক গোপন স্থানে রেখেছেন একছড়া সোনার হার হিরের লকেট সমেত তোমার ছেলের অর্থাৎ তার ভাবী নাতির জন্য। লক্ষ করলাম, আমার কথা শেষ হতে না হতে ধীরেনের ছোট ভাই এক দৌড় মারল তাদের বাড়ির দিকে। আমি বলে চললাম—তাছাড়া, এই দেখ না আমার তরকারির বস্তার মধ্যে রাখা তোমার মামার ঘড়ি ও কিছু টাকা—বলে তাড়াতাড়ি সকলের সামনে তরকারির বস্তাটা খুলে ঢেলে ফেললাম। সকলেই অবাক হয়ে আমার কার্যকলাপ দেখছিল। তৎক্ষণাৎ তরকারির ভেতর থেকে রুমালে বাঁধা জিনিসটা টেনে নিয়ে খুলে ফেললাম সকলের সামনে। কিন্তু এ কি? কি করে সম্ভব? আমার জিনিস ছাড়া আর কিছু নেই দেখে মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গেল। অথচ আমি নিজের হাতে যা বেঁধে রেখেছি তাহলে—। আমার অবস্থা দেখে সকলে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। শাশুড়ি ঠাকুরন তো আবার গলা ছেড়ে ভৈরবী রাগে সুর ধরেছেন। অন্যরাও ধরব ধরব করছে। আমার তখন ত্রিশঙ্কুর মতন মনের অবস্থা। ধীরেন অসহায় ভাবে সকলকে বোঝাবার চেষ্টা করছে।

ঠিক এমন সময় ধীরেনের ছোট ভাই বাইরে থেকে ঐ পরিস্থিতিতে এসে ঢুকল। হাতে তার একছড়া সোনার হার হিরের লকেট সমেত ।

হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে থাকে—দাদা, এইমাত্র শিবপুর থেকে ট্রাঙ্ককল এসেছিল যে, গতকাল দুপুর দুটির সময় তোমার একটি পুত্রসন্তান হয়েছে। এই বলে ধীরেনের ভাই চুপ করে। দেখি ধীরেন অবাক নেত্রে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সকলের মুখের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে আছি আর ভাবছি, এ কোথায় এলাম রে বাবা! আমি পাগল না, এরা সব পাগল! আসল ব্যাপারটা যে কি, বুঝতে না পেরে কাঁদব না হাসব কিছুই ঠিক করতে পাচ্ছি না। এক সময় ধীরেনই সমস্যার সমাধান করে দেয়, বলে—জামাইবাবু, আপনি আমায় যে অবস্থায় দেখছেন, এটা মামার শেষ কাজ আমি করেছি বলে। মামা গতকাল দুপুর দুটায় দেহ রেখেছেন।

ধীরেনের কথা শুনে, সারা শরীরের মধ্যে রক্তের স্রোত যেন হাজার গুণ বেড়ে গেল। নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ভয়ে সারা শরীর ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল ধীরেনের মুখে ঐ একটি কথা শুনে। সকলে মিলে আমাকে ধরে শুইয়ে দিল। কিরকম একটা গোলকধাঁধার মধ্যে পড়ে ছটফট করতে থাকি। তবে কি আমি সব ভুল দেখলাম! কিন্তু তা কি করে সম্ভব!— ঐ লকেট দেওয়া হার? ট্রাঙ্ককলের ঐ বার্তা? সে তো মিথ্যে নয়!

 

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য