কালী ডাকাত - নির্মলেন্দু গৌতম



সেই যে ডাকাত সর্দার, যার নাম কালী ডাকাত, তার মুখ কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ দেখতে পায়নি। না পাবার কারণও আছে।

সে যখন ডাকাতি করতে আসে, তখন তার পুরো মুখ ঢাকা থাকে কালো কাপড়ে। শুধু আগুনের গোলার মতো তার চােখ দু’টাে দেখা যায়। সেই চােখের দিকে তাকালে হিম হয়ে যায় শরীর। মুখ দেখার কথাটা তখন কারও ভাবনার মধ্যেই আসে না।

গ্রামের শেষে বন। সেই বনের মধ্য দিয়ে পায়ে চলা একটা পথ অনেক দূর চলে গেছে। যেখানে গিয়ে শেষ হয়ে যায় পথটা, সেখানে মস্ত একটা কালী মন্দির। সবাই জানে, সেই কালমিন্দিরে অমাব্যষার রাতে কালী ডাকাত আসে তার দলবল নিয়ে। পুজো দেয় মন্দিরে। গভীর রাত পর্যন্ত ডাকাতদের আনাগোনা চলে সেখানে। তাদের হইহল্লা অনেক সময় শোনা যায় গ্রাম থেকেও।

না, অমাবস্যার রাতে গ্রামের কেউ সেই মন্দিরে পুজো দিতে যাবার কথা ভাবেও না। কার সাহস আছে যাবার। সবাই জানে, সে মন্দির শুধু কালী ডাকাতের ।

অন্য দিনগুলোয় গ্রামের লোকজন কিন্তু মন্দিরে যায়। সেই মন্দিরে পুজো দিলে মনের ইচ্ছে নাকি পূর্ণ হয়। কতজনেরই তো পূর্ণ হয়েছে। পুরোহিত ঠাকুরের হাতে পুজোর জিনিসপত্র দিয়ে শুধু মনের কথাটা বলতে হয়। পুরোহিত ঠাকুর পুজো করতে করতে মা কালীকে শুধু সেই কথাগুলোই বলতে থাকেন। ব্যস, দু-চার দিনের মধ্যেই পূর্ণ হয়ে যায় মনের ইচ্ছেটা। গ্রামের কারও ছেলের অসুখ, কিন্তু ডাক্তার দেখাবার ক্ষমতা নেই—অথচ কেউ জানে না কেন, ডাক্তারবাবু এসে যাবেন। একটা পয়সাও নেবেন না তিনি। কারও মেয়ের বিয়ের গয়না দরকার। গয়না না হলে বিয়েই হবে না-ভোরবেলা দরজা খুলতেই গয়নার একটা বাক্স দেখতে পাবে মেয়ের বাবা। বর্ষায় ভাঙা ঘরে থাকা সম্ভব নয় কিছুতেই। সকালবেলা উঠেই সেই ভাঙা ঘরের মালিক দেখতে পাবে বাড়ি বানাবার জিনিসপত্র সব বাইরে জড়ো করা।

আবার তারা যায় কালীমন্দিরে। পুজো দেয়। পুরোহিত ঠাকুরকে বলে, সত্যি, তোমার কথা মা শোনে।

পুরোহিত ঠাকুর শুধু হাসে। কোন উত্তর দেয় না। সত্যিই, পুরোহিত ঠাকুরের চেহারাটাও দেখবার মতো। মস্ত লম্বা চওড়া চেহারা। একমাথা চুল। মস্ত বড় দুটাে চোখ। তাকালেই যেন মনে হয়। সবার জন্য তার চোখ দু’টাে মমতায় ভরে আছে।

যখন পুজো করতে বসেন পুরোহিত ঠাকুর তখন বুঝি তার কোনোদিকে খেয়াল থাকে না। মন্ত্র পড়তে থাকেন। যখন, তখন মন্দিরটা ভরে ওঠে তার গলার স্বরে। জীবন্ত মনে হয় মা কালীকে। ঠিক যেন পুজো নিচ্ছেন পুরোহিত ঠাকুরের।

যারা পুজো দিতে আসে, তারা সেই পুজো দেখতে দেখতে বুঝি নিজেদের ভুলে যায়।

এখন যে পুরোহিত ঠাকুর, তিনি কেন অমাবস্যার রাতে ডাকাতদের মন্দিরে পুজো করতে দেন, সেকথা ভেবে গ্রামের লোকেরা কিন্তু অবাক হয়।

কেউ কখনও তা নিয়ে প্রশ্ন করলে পুরোহিক ঠাকুর হাসেন। বলেন, মা কালীর মন্দিরে, যে কেউ পুজো দিতে আসতে পারে।

তাই বলে ডাকাতরা আসবে?

কেউ হয়ত প্রশ্ন করে সঙ্গে সঙ্গে। পুরোহিত ঠাকুর বলেন, ডাকাতরা তো ডাকাতি করতে আসে না। পুজো দিতে আসে। কেউ পুজো দিতে এলে আমি কেন বাধা দেব?

কথাটা যে ঠিক, গ্রামের লোকেরা তা বোঝে। তবু কেউ কেউ বলে, ডাকাতরা এলে তোমার ভয়-টয় করে না ?

ভয় করবে। কেন ? তারা তো আর ডাকাতি করতে আসে না। আসে পুজো দিতে। পুরোহিত ঠাকুর উত্তর দেন।

না, আর কিছু বলার থাকে না গ্রামের লোকদের। সেদিন অমাবস্যা ছিল। গ্রামের লোকেরা সেদিন শুনতে পেল কালীমন্দির থেকে ভেসে আসা দারুণ শোরগােলের শব্দ। ঢাক আর ঘণ্টার শব্দও ভেসে এল সেই সঙ্গে।

এ রকম শব্দ শোনা গেলে বোঝা যায়, কোথাও ডাকাতি করতে যাবে ডাকাতরা ।

গ্রামের লোকেরা তাই ঠিক বুঝতে পারল, কোথাও আজ ডাকাতি হবে।

কিন্তু কোথায় ডাকাতি হবে?

না, সেটা বোঝা সম্ভব নয়।

তবে এটা যে কালী ডাকাতের দল, সেটা বুঝতে কারো অসুবিধা হলো না। কারণ মন্দির থেকে এ রকম দারুণ শব্দ ভেসে আসে যেদিন, সেদিন কালী ডাকাতের দল আসে। আর যেদিন কালী ডাকাতের দল আসে, সেদিনই কোথাও না কোথাও গভীর রাতে ডাকাতি হয়।

না, কালী ডাকাতকে গ্রামবাসীরা ভয় পায় না। ভয় না পাবার কারণ কালী ডাকাত কখনও অন্যায়ভাবে মানুষের ক্ষতি করে না। যেখানে অন্যায়, অত্যাচার, কালী ডাকাত সেখানেই তার দলবল নিয়ে যায়। আর যেখানে কালী ডাকাত যায়, সেখানে কেউ তাকে বাধা দেয় না। দেওয়ার ক্ষমতা থাকে না।

কালী ডাকাত যে কোথায় থাকে, কিভাবে থাকে, সেটা কেউ কিন্তু জানে না। মন্দিরে পুজো দিতে আসে কোন পথে, তাও কেউ জানে না।

মন্দিরের পুরোহিত ঠাকুরকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে, সে কোথায় থাকে, কোন পথে আসে, তা আমি কি করে জানব? সে আসে, পুজো দেয়, তারপর দলবল নিয়ে চলে যায়।

তার মনের ইচ্ছেটা তোমায় বলে না কখনও ?

কেউ যখন একথা জিজ্ঞেস করে, তখন পুরোহিত ঠাকুর বলেন, নিশ্চয়ই বলে।

কেউ তখন প্রশ্ন করে, তার মনের ইচ্ছেটা কী?

তার মনের ইচ্ছে সবার দুঃখ দূর হােক। পুরোহিত ঠাকুর বলেন।

গ্রামের সবাই তাই জানে, কালী ডাকাত সাধারণ ডাকাত নয়। তাই তার ডাকাতির খবর যখন আসে, তখন কিন্তু সবাই বুঝতে পারে, কালী ডাকাত ডাকাতি করলেও খারাপ কিছু করেনি।

সেদিনও মধ্যরাতে ডাকাতদের পুজোর হৈ-হট্টগোল থেমে গেল। গ্রামের যারা জেগেছিল, তারা বুঝতে পারল, কালী ডাকাত এবার বেরিয়েছে ডাকাতি করতে। কাল সকালেই খবর আসবে, কোথায় তারা ডাকাতি করতে গিয়েছিল!

সকালের অপেক্ষায় সময় কাটাতে থাকলে তারা ।

সকালবেলা সত্যি সত্যি খবর এল। কালী ডাকাতের ডাকাতির। জমিদার রামনারায়ণ একদল লেঠেল নিয়ে খাজনা আদায়ে বেরিয়েছিলেন দিন কয়েক আগে। গোটা কয়েক গ্রামে খাজনা আদায়ের নামে প্রায় লুঠতরাজ করে ফিরেছিলেন। কান্না-কাটিতে ভরে উঠেছিল গ্রামগুলি।

গ্রামবাসীদের কিছু করার ছিল না। একে জমিদার, তাতে দশাসই চেহারার সব লেঠেল। সেই লেঠেলদের হাতের লাঠি ভারী নির্মম। যেখানে সেটা নামে, সেখানেই নির্মমভাবেই নামে। সেই লাঠির বিরুদ্ধে মাথা তোলার সাহস কারো নেই। তাই গ্রামবাসীরা অসহায়ভাবে মার খেয়েছে লেঠেলদের হাতে।

সেই খবর এসেছিল কালী ডাকাতের কাছে।

কালী ডাকাত এর শোধ নেবার জন্য বেরিয়েছিল জমিদার রামনারায়ণের বাড়িতে ডাকাতি করতে।

গভীর রাতে জমিদার বাড়িতে যখন দলবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কালী ডাকাত, তখন লেঠেলরাই লাঠি নিয়ে বাধা দিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

কিন্তু কালী ডাকাতের দলের সঙ্গে তারা পারবে কী করে? সবার সামনে ছিল কালী ডাকাত । সে একাই পঞ্চাশজন লেঠেলের সামনে দাঁড়িয়েছিল তার হাতের লাঠি তুলে।

না, বেশি সময় লাগেনি। বলতে গেলে চোখের পলকেই পঞ্চাশজনের হাতের লাঠি ছিটকে পড়েছিল দূরে। মাটির ওপর আছড়েও পড়েছিল অনেকেই। বাকিরা পালাতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পালাতে পারেনি কেউ। কালী ডাকাতের দলের ডাকাতরা তাদের পালাতে দেয়নি।

কালী ডাকাত নিজের হাতেই লেঠেলদের হাতগুলো এমনভাবে ভেঙে দিয়েছে যাতে তারা আর কোনদিন লাঠি ধরতে না পারে। না, জমিদার রামনারায়ণকে তারা প্ৰাণে মারেনি। তার হাত-পা বেঁধে মস্ত গেটে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। তার আগে অবশ্য তার গলার ওপর মস্ত রামদাখানা চেপে ধরে বলে দিয়েছে, আর যদি খাজনা আদায় করতে কেউ সেই গ্রামগুলোতে যায়, তাহলে সেখান থেকে কেউ আর ফিরবে না।

খাজনার সঙ্গে যা যা লুঠপাট করে নিয়ে এসেছে লেঠেলরা, তার দশগুণ জিনিস বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ফেরার সময় সেই সব গ্রামে রেখে এসেছে কালী ডাকাতের দলের লোকেরা।

এতসব করতে গিয়ে কালী ডাকাত নাকি এবার মাথায় আঘাত পেয়েছে। জমিদার বাড়ির কয়েকজন প্রাণের ভয়ে লুকিয়েছিল। তারা দেখেছে, কপাল দিয়ে রক্ত ঝরছে কালী ডাকাতের।

কালী ডাকাতের মাথায় আঘাত লাগার কথাটা শুনে অবশ্য গাঁয়ের সবাই দুঃখ পেল। এমন যে ডাকাত, তার আঘাত পাবার কথায় দুঃখ পাওয়াই তো উচিত।

সারাদিন ধরে এই গল্প গ্রামের রাস্তায়, মাঠে-ঘাটে পুকুরপাড়ে চলল। সবাই জানে, নতুন কোন ঘটনা যতক্ষণ না ঘটবে, ততক্ষণ এই গল্পই চলবে গ্রামে।

এমন খুশির গল্প আর কী হতে পারে!

জমিদার রামনারায়ণের বাড়িতে ডাকাতির দু’দিন পর গ্রামের দু'জন ভোরভোর সময় কালী মন্দিরে পুজো দেবার জন্য রওনা হল।

জঙ্গলের পথ পেরিয়ে যখন তারা এসে পৌছুল কালীমন্দিরে, তখন সকালের রোদে ভোরে উঠেছে চারদিকে।

ধূপধুনোর গন্ধে ভরে উঠেছে মন্দির প্রাঙ্গণ।

তারা এসে দাঁড়াল মা কালীর সামনে। গড় হয়ে প্ৰণাম করল।

প্ৰণাম করে উঠেই ঘুরে দাঁড়াল, পুরোহিত ঠাকুর দাঁড়িয়ে। মাথায় তার মস্ত একটা ফেট্টি। ফেট্টির একটা জায়গা রক্তে ভেজা।

চমকে উঠল দু'জন।

মাথা ফাটলো কী করে পুরোহিত ঠাকুরের ?

একজন কথাটা জিজ্ঞেস করলো পুরোহিত ঠাকুরকে। হাসলেন পুরোহিত ঠাকুর। বললেন, ‘জেনে কী হবে?’ দুজন দু’জনের দিকে তাকাল।

কী ভাবিছ? পুরোহিত ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন এবার। ফের দু'জন তাকাল পুরোহিত ঠাকুরের দিকে।

কালী ডাকাত মাথায় ফেট্টি বেঁধে মুখ ঢেকে ডাকাতি করতে আসে। শুধু দু’টাে চােখ ছাড়া তার মুখ কখনও কেউ দেখেনি।

সেই কালী ডাকাতের মাথা ফেটেছে জমিদার রামনারায়ণের বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে। পুরোহিত ঠাকুরের মাথাও ফেটেছে। একই ঘটনা একই সঙ্গে দু’জনের ঘটেছে।

পুরোহিত ঠাকুরের কাছে মা কালীকে বলার জন্য মনের ইচ্ছেটা বললেই পূৰ্ণ হয়।

কালী ডাকাতের চেহারার যে বর্ণনা শুনেছে সবাই পুরোহিত ঠাকুরের চেহারার সঙ্গে তার মিলও তো আছে। সেই মস্ত লম্বা চওড়া চেহারা! সেই গলার স্বর--

পুরোহিত ঠাকুর এবার হাসলেন দু’জনের দিকে তাকিয়ে। তারপর বললেন, জানি, আমায় তোমরা কালী ডাকাত বলে ভেবে ফেলেছে। সত্যিই আমি কালী ডাকাত।

দু'জন কিছু বলতে পারল না। ভয়ে, উত্তেজনায় দু’পা পিছিয়ে গেল তারা।

পুরোহিত ঠাকুর বলল, শোন, তোমরা তোমাদের মনের ইচ্ছেটা বলে চলে যাও। আমি তোমাদের নামে মা কালীর কাছে পুজো দিয়ে দেব।

কোন রকমে মনের ইচ্ছেটা বলে দু’জন সেই যে ঘুরে ছুটি দিল গ্রামের দিকে, একবারের জন্যও আর পেছন ফিরল না।

দিন কয়েক পর অনেক ভেবে, সাহস করে যখন গ্রামের কয়েকজন সেই বনের ভেতরের রাস্তা পেরিয়ে কালী মন্দিরের সামনে এসে পৌছুল, তখন অবাক হলো সবাই।

মন্দিরের দরজা খোলা! মা কালীর মূর্তি নেই সেখানে! চারদিক নির্জনতায় থমথম করছে।

কারো আর বুঝতে অসুবিধা হলো না, কালী ডাকাত মন্দির ছেড়ে চলে গেছে। সত্যিই, সবাই যখন জেনে গেছে সেই কালী ডাকাত, তখন কি আর তার থাকা চলে মন্দিরে ?

কিন্তু কালী ডাকাত তো তাদের কাছে পুরোহিত ঠাকুর। সে সবার ইচ্ছে পূর্ণ করে মা কালীর নামে। কি জানে, আর কখনও সে ফিরে আসবে কিনা। নির্জন মন্দিরে গ্রামের লোকেরা নিঃশব্দে দাঁড়িয়েই রইল।

Previous
Next Post »
2 মন্তব্য
avatar

Apnader app ti te sudhu boi guli ache.kintu ei Galpo gulo nei.ei galpo gulo ki download kora jabe.jodi kora jay tahole kibhabe korbo please bola hok...

Balas
avatar

এই গল্পগুলো শুধু পড়ার জন্য। তবে আমরা নতুন করে সাইট সাজানোর কাজ করছি। আশাকরছি তখন বিশেষ কিছু সুবিধা দিতে পারব।
ধন্যবাদ

Balas