প্ৰথম শিক্ষক - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

পৃথিবীর প্রয়োজনীয় জ্ঞানের আমার প্রথম শিক্ষক ছিল রফিক। রফিক ছিল আমাদের বাসার কাজের ছেলেটি, তার গায়ের রং ছিল কুচকুচে কালো। রফিককে দেখে ছেলেবেলায় আমি ধরে নিয়েছিলাম যে যাদের গায়ের রং কুচকুচে কালো শুধু তাদেরই নাম হবে রফিক—তাই যখন একজন রফিককে পেয়েছিলাম যার গায়ের রং কালো নয়, আমি এত অবাক হয়েছিলাম সেটি বলার নয়।
       রফিক আমাদের নানা ধরনের জ্ঞান দান করত। তার প্রথম জ্ঞান ছিল মাকড়সা নিয়ে, সে আমাদের শিখিয়েছিল যে মাকড়সার পেটের ভিতরে সূতা থাকে এবং যথেষ্ট ধৈর্য থাকলে সেই সূতা টেনে বের করে নেয়া যায়। তার কথা যে সত্যি সেটা প্রমাণ করার জন্যে সে বাসার পিছনের গাছ থেকে বড় বড় মাকড়সা ধরে আনত। এই এলাকায় এক রকম মাকড়সা দেখা যায় যেগুলি আটটি পা কে দুটি দুটি করে চার ভাগ করে ইংরেজী এক্স অক্ষরের মত করে জালের মাঝে বসে থাকে। শুধু তাই নয়, মাকড়সার পিঠের নক্সা দেখে মনে হয় বড় বড় দুটি চোখে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। এই মাকড়সাগুলি ভাল খেয়ে দেয়ে বিশাল আকার নিয়ে নিত—তবে রফিকের অত্যাচারে তাদের জীবন মোটামুটি ভাবে দুর্বিষহ হয়ে পড়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।
       যারা মাকড়সার পেট থেকে সূতা বের করার চেষ্টা করেছে (আমার কেন জানি মনে হয় সেরকম মানুষের সংখ্যা বেশি নেই) তারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছে কাজটা খুব সহজ নয়। মাকড়সাগুলি কাজটা পছন্দ করে না এবং আটটি পায়ের সবগুলি ব্যবহার করে প্ৰাণপণে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে। তখন মাকড়সাটিকে খুব কায়দা করে ধরে রাখতে হয় এবং পেছনের কোন একটা সূক্ষ্ম ফুটো থেকে সূতোর প্রথম অংশটা বের করে নিতে হয়। একবার সেটা পেয়ে গেলে পরের অংশটা সহজ, টেনে টেনে বের করে হাতের আংগুলে পেঁচিয়ে নেওয়া। রফিকের বক্তব্য অনুযায়ী মাকড়সার পেটে এক রকম সূতার গুটি থাকে এবং বাইরে থেকে সূতা টানতে থাকলে ভিতরে গুটি ঘুরতে ঘুরতে সূতাটুকু বের হয়ে আসে। একটা মাকড়সার পেটের ভিতর থেকে সমস্ত সূতা বের করে আংগুলে পেঁচিয়ে নিয়ে রফিক মাকড়সাগুলিকে ছেড়ে দিত। সূতা বের করে নেওয়া ছাড়া রফিক কখনো কোন মাকড়সার অন্য ক্ষতি করে নি—কারণ সে আমাদের বলেছিল মাকড়সা মারা হচ্ছে কবিরা গুনাহ। মাকড়সা না মারলেও তার ভিতর থেকে সূতোটুকু বের করে নেবার পর মাকড়সাগুলিকে খুব নিরুৎসাহিত দেখা যেতো। আমার ধারণা, পুরো ব্যাপারটাকে মাকড়সারা নিশ্চয়ই একটা বড় ধরণের অপমান হিসেবে বিবেচনা করত।
       রফিক আমাদের দ্বিতীয় জ্ঞানটি দিয়েছিল রক্তচোষা নিয়ে। রক্তচোষা এক ধরনের ছোট গিরগিটি, গাছপালায় পাতার সাথে মিশে লুকিয়ে থাকে। রফিকের কাছে আমরা জেনেছিলাম মানুষের রক্ত খেয়ে ফেলতে পারে বলে এর নাম রক্তচোষা। শুধু তাই নয়, সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে মানুষের রক্ত চুষে খাবার জন্যে এটাকে কারো কাছেও আসার প্রয়োজন হয় না। দূর থেকে সেটা কারো দিকে তাকিয়েই তার রক্ত চুষে খেয়ে ফেলতে পারে। রফিকের কথা অবিশ্বাস করার কোন কারণ নেই, প্রথম যেদিন আমরা গাছের ডালে একটা রক্তচোষা দেখতে পেলাম সেটা আমাদের রক্ত খেয়ে কিছুক্ষণের মাঝেই তার গলাটা টকটকে লাল করে ফেলল। সব রক্ত খেয়ে ফেলছিল বলে আমাদের দুর্বল লাগতে থাকে এবং আমাদের হাঁটুতে কোন জোর ছিল না—মনে হচ্ছিল এই বুঝি আমরা হাঁটু ভেঙ্গে পড়ে যাব। সেই ভয়ংকর বিপদের মুখে রফিক এতটুকু না ঘাবড়িয়ে মাথা ঠাণ্ডা রেখে আমাদের সবার প্রাণ রক্ষা করেছিল। সে চীৎকার করে সবাইকে বলল, “রক্ত খেয়ে ফেলছে, সাবধান! কেনে আঙুল মুখের মাঝে।”
       আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “কেনে আঙুল মুখে দিলে কি হয়?”
       “মুখে দিয়ে দিয়ে কেনে আঙুল চুষতে থাকেন।”
       “কি হবে চুষলে?”
       “রক্তচোষা একদিক দিয়ে চুষবে, আপনি অন্যদিক দিয়ে চুষবেন। রক্ত তাহলে শরীর থেকে বের হতে পারবে না।”
       জান বাঁচানোর এত বড় একটা পথ বাতলে দেওয়ায় রফিকের উপর আমাদের কৃতজ্ঞতার কোন শেষ ছিল না। সবাই নিজেদের কেনে আঙুল মুখে ঢুকিয়ে আঙুলটাকে চুষতে চুষতে সেটাকে প্রায় ছিবড়ের মত করে ফেললাম। রক্তচোষাকে তার কোন রক্ত চুষতে না দিয়ে উল্টো নিজেদের খানিকটা রক্ত চুষে শরীরে ফেরৎ নিয়ে, কোন মতে আমরা প্ৰাণ নিয়ে বাসায় ফিরে এসেছিলাম।
       প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের নানারকম জ্ঞান দান করলেও যে বিষয়ে রফিক আমার জীবনে অবদান রাখার চেষ্টা করেছিল তা হচ্ছে সাহিত্য। ব্যাপারটা মনে হয় আরেকটু খুলে বলা দরকার।
       আমরা ভাইবোনেরা যখনই মুখ ফুটে কথা বলতে শুরু করেছি ঠিক তখন আমাদের বাবা আমাদের সবাইকে একটা করে কবিতা শিখিয়েছিলেন। কবিতাগুলি রবীন্দ্ৰনাথ নামক একজন মানুষের কবিতা। প্রথমে ধারণা ছিল মানুষটি আমাদের কোন একজন আত্মীয়; কারণ বাইরের ঘরে মানুষটির ছবি টানোনো আছে। মানুষটা দেখতে আমার দাদার মত—মুখে লম্বা দাড়ি, গায়ে লম্বা আলখাল্লা এবং আমার দাদার মতই লম্বা। পরে জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনেছি মানুষটি আমাদের আত্মীয় নন, তিনি একজন কবি।
       আমার বাবা এই কবির লেখা ‘প্রশ্ন’ নামের যে কবিতাটি আমাকে শিখিয়েছিলেন, তার প্রথম লাইনটি ছিল এরকম;
       “ভগবান তুমি যুগে যুগে দূত পাঠিয়েছ বার বার—”
       আমি তখনো পড়তে শিখি নি কাজেই পুরো কবিতাটি আমাকে শিখতে হল মুখে মুখে। কবিতাটিতে অনেক শব্দ আছে যার অর্থ আমি জানি না, নিজে নিজে ভেবে ভেবে আমি সেই সব শব্দের অর্থ বের করে নিলাম। যেরকম ‘দূত’ শব্দটি আমি তখনো জানি না, কাজেই আমি ধরে নিলাম শব্দটি হবে ‘দুধ’। ‘ভগবান’ শব্দটিও তখনো আমি জানি না কিন্তু যেহেতু দুধ পাঠাচ্ছে, মানুষটি যে একজন গোয়ালা সেটা ভেবে বের করতে এতটুকু দেরী হল না।
       গোয়ালার দুধ দিয়ে যাওয়ার এই কবিতাটি কীভাবে হাত পা নেড়ে আবৃত্তি করতে হবে সেটা আমার বাবা আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। কেন মুখ গম্ভীর করে হাত পা নেড়ে এই কবিতাটা এভাবে বলতে হবে সেটা নিয়ে আমার মনে নানরকম প্রশ্ন ছিল, কিন্তু ছোট অবস্থায় একটা জিনিস শিখেছি, সেটা হচ্ছে বেশীর ভাগ প্রশ্নেরই উত্তর নেই। কিংবা যদি উত্তর থাকে সেই উত্তরটা প্রশ্ন থেকেও কঠিন। কাজেই কোন সমস্যা হলে প্রশ্ন না করে ভেবে ভেবেই আমি উত্তরটা বের করে ফেলার চেষ্টা করি।
       কবিতাটি শিখে নেবার পর আমি একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম। যদিও কবিতাটার অর্থ ভাল করে বুঝি না তবুও যখন আশেপাশে কেউ থাকে না হাত পা নেড়ে সেটা আবৃত্তি করতে এক ধরনের রোমাঞ্চ হয়। আমি বাসার পিছনে কাঁঠাল গাছগুলিকে নিয়মিত ভাবে আমার কবিতা শুনিয়ে যেতাম। শ্রোতা হিসাবে কাঁঠাল গাছ থেকে ভাল আর কিছু আছে বলে আমার জানা নেই।
       কাঁঠাল গাছের সাথে শ্রোতা হিসেবে আমি একদিন রফিককে পেয়ে গেলাম। রফিক গম্ভীর হয়ে পুরো কবিতাটা শুনে মাথা নেড়ে বলল, “কবিতাটা মন্দ না, তবে কিছু সমস্যা আছে।”
       “কি সমস্যা?”
       “আপনার কবিতার মাঝে মিল নাই। সুর নাই। কোন কাহিনী নাই। বাজারে একজন কবিতা বিক্রি করে, এক কবিতা এক আনা করে দাম, সেই কবিতা শুনলে আপনার মাথা খারাপ হয়ে যাবে।”
       “তার কবিতা রবীন্দ্ৰনাথের কবিতা থেকেও ভাল?”
       রফিক তার কুচকুচে কাল মুখে ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে হেসে বলল, “কী বলেন আপনি, কিসের সাথে কিসের তুলনা! আপনার কবিতা সেই কবিতার পায়ের নখের যুগ্যিও না!”
       যে কবির বিশাল ছবি আমাদের বাসার দেওয়ালে টাংগানো আছে তার থেকেও বড় একজন কবির খোঁজ পেয়ে আমি রীতিমত চমকে উঠলাম। রফিক গলা নামিয়ে বলল, “আপনি যদি চান, আপনাকে নিয়ে যাব।”
       “নিয়ে যাবে?”
       “হ্যাঁ। এক আনা করে কবিতার দাম, ইচ্ছে করলে কিনতে পারেন।”
       “কিন্তু”—আমি ইতস্তত করে বললাম, “আমি তো পড়তে পারি না।”
       রফিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমিও পারি না।” কিন্তু সে নিরুৎসাহিত হল না, বলল, “আপনাকে নিয়ে যাব। পড়তে না পারলে কি হয়? শুনে আসবেন। এক নম্বুরী কবিতা। শুনতেও ভাল। আপনার বড়ীন্দ্ৰনাথ থেকে হাজার গুণ ভাল।”
       “বড়ীন্দ্রনাথ না, রবীন্দ্রনাথ।”
       “ওই একই কথা।”
       রফিকের প্রচন্ড উৎসাহ সে আমাকে এক নম্বুরী কবিতা শোনাবে। একদিন বাজার করতে যাওয়ার সময় আমার মা’কে বলে সে সাথে আমাকে নিল। দীর্ঘ পথ রফিকের হাতে ধরে গুটি গুটি যাচ্ছি। বাজারের কাছে এসে দেখা গেল এক জায়গার মানুষের ভীড়। সাথে সাথে রফিকের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে, “ঐ যে কবিতা!”
       সে ভীড় ঠেলে আমাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে যায়। আমাকে ঠেলে ঠুলে সামনে নিয়ে বসিয়ে দিল, মাঝখানে একজন মানুষ, চোখে চশমা। উশখু খুশকু চুল। পান খাওয়া লাল দাঁত, হাতে একটা নিউজপ্রিন্টের হ্যান্ডবিলের মত জিনিস ধরে সেটা দেখে দেখে উচ্চস্বরে কবিতা পড়ছে। ভাবের আবেগে তার মুখ থেকে থুতু ছিটে যাচ্ছে, চোখের তারা ঘুরে যাচ্ছে, গলার স্বর ওপরে উঠে যাচ্ছে, আবার নিচে নেমে আসছে। সে হাত নাড়ছে, পা নাড়ছে, মাথা নাড়ছে। সুর করে কবিতা পড়তে পড়তে ঘুরে যাচ্ছে, আবার নেচে নেচে আসছে। তার গলার স্বরে কখনো রাগ, কখনো আনন্দ, কখনো যন্ত্রণা, কখনো চিৎকার আবার কখনো গলা নামিয়ে ফিস ফিস শব্দ। চারপাশে লোকজন মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছে, রফিক আমার পিঠে খোঁচা দিয়ে বলল, “কি? বলেছিলাম না, এক নম্বুরী কবিতা?”
       আমি মাথা নাড়লাম।
       “আপনার বড়ীন্দ্রনাথ কি এর ধারে কাছে আসবে?”
       “বড়ীন্দ্ৰনাথ না রবীন্দ্ৰনাথ।”
       “ঐ একই কথা। লাগে এর ধারে কাছে?”
       আমি উপস্থিত কবি আর মন্ত্ৰমুগ্ধ দর্শকদের দেখে রফিকের কথা প্ৰায় মেনেই নিচ্ছলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কি হল জানি না, মত পরিবর্তন করে বললাম, “উহুঁ, রবীন্দ্রনাথই ভাল।”
       রফিক অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। সাহিত্যের মূল্য বিচার সম্পর্কে সেটা ছিল আমার প্রথম বক্তব্য।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য