চ্যালেঞ্জ! - রকিব হাসান

গল্পটি শেয়ার করেছেন : নাজমুস সাকিব

উত্তরায় নাসেরের অফিসে বসে আছি আমি আর নাসের।

নাসের পাশা। বিখ্যাত শখের গোয়েন্দা। আমার বন্ধু।

কাঁটায় কাঁটায় এগারোটায় অফিসে ঢুকল ইরফানা থানম ইনা। আগের দিন ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছে নাসেরের সঙ্গে। সকাল এগারোটায় দেখা করার কথা।

মেয়েটার সময়জ্ঞান দেখে অবাক হলাম। আমাদের দেশে সময় নিয়ে মাথা ঘামায় না বেশিরভাগ মানুষ, এগারোটা বললে বারোটায় আসে, কিংবা আরো পরে। আর সে যদি ইরার মত সুন্দরী তরুণী হয়, তাহলে তো কথায় নেই। রূপ নিয়েও বোধহয় কোন অহঙ্কার নেই মেয়েটার, সাদামাটা শাড়ি পরে এসেছে। মুখেও তেমন মেকাপ নেই। গালে সামান্য একটু পাউডার, আর ঠোঁটে লিপস্টিক।

‘আমার কেসটা একটু অদ্ভুত, নাসের সাহেব,’ একটা চেয়ারে বসতে বসতে বলল ইরা। ‘গোড়া থেকেই বলি কি বলেন?’

‘আমি শুধু ইরা, ম্যাডাম শুনতে ভাল লাগে না।’ ভূমিকা না করে সরাসরি কাজের কথায় এল ইরা। ‘সাভারের এক সাধারণ কৃষক ছিলেন আমার দাদা। তাঁর দুই ছেলে। বড় ছেলে, মানে আমার চাচা আকবর হোসেন ছোটবেলায়ই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। চিটাগাঙে গিয়ে এক ব্যবসায়ীর কাছে কাজ নিয়েছিলেন। তারপর নিজের বুদ্ধি আর পরিশ্রমের জোরে প্রচুর টাকা কামিয়ে মস্ত ধনী হয়েছিলেন। তাঁর ছোট ভাই, আমার বাবা মেট্রিক পাশ করে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে কেরানীর চাকরি নিয়েছিলেন। বিয়ে করলেন তাঁরই মত এক গরীব ঘরের মেয়েকে। আমার ছয় বছর বয়েসে বাবা মারা গেলেন, চোদ্দ বছর বয়েসে মা। এই সময় চিটাগাং থেকে ব্যবসা গুটিয়ে ফিরে এলেন চাচা। ঢাকায় ব্যবসা শুরু করলেন। সাভারে, নিজের জন্মস্থানে মস্ত বাড়ি করলেন। নাম দিলেন হোসেন মঞ্জিল। বিয়ে করেননি। আমাকে নিজের কাছে রেখে মেয়ের মত মানুষ করতে লাগলেন।’

থেমে দম নিয়ে আবার বলল ইরা, ‘নিজে লেখাপড়া বিশেষ করেননি, টাকা ছাড়া কিছু বুঝতেন না। মেয়েদের মানুষ করার ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব একটা মতামত ছিল। তিনি বলতেন, মেয়েরা লেখাপড়া শিখে কী করবে? তারচেয়ে ঘরের কাজ, রান্নাবান্না, বাচ্চা-কাচ্চা পালন শেখাটাই বেশি জরুরি। শুধু মেয়েরাই না, পুরুষদের ব্যাপারেও তাঁর মতামত প্রায় একই রকম ছিল। প্রায়ই বলতেন, বইয়ের বিদ্যা শিখে কোন লাভ নেই। হাতেকলমে শেখাটাই আসল শেখা।’ আমাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল ইরা, ‘আপনাদের বিরক্তি লাগছে?’

‘বলে যান,’ নাসের বলল।

‘আমার স্কুলে আসা-যাওয়াটাকে মোটেও ভাল চোখে দেখলেন না চাচা। এস এস সি পর্যন্ত কোনমতে সহ্য করলেন। সমস্যা দেখা দিল যখন ঢাকায় গিয়ে হোস্টেলে থেকে পড়তে চাইলাম। কিন্তু আমার জেদের কাছে হার মানলেন চাচা, ভীষণ ভালবাসতেন তো আমাকে। এটা নয় বছর আগের ঘটনা।

‘তারপর চাচার টাকায় হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করতে লাগলাম। এস এস সিতে খুব ভাল রেজাল্ট করে এম বি এ-তে ভর্তি হলাম। সব খবরই রাখলেন চাচা, কিন্তু আমার পাশের কথা শুনে কোনরকম মন্তব্য করলেন না, অভিনন্দন জানালেন না। হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লেন চাচা, হার্ট অ্যাটাক। স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে লাগল।’ চুপ করল ইরা।

এরপর কী বলে শোনার অপেক্ষায় আছি। আগ্রহ, কৌতূহল, দুটোই তৈরি হয়ে গেছে এতক্ষণে। খুব গুছিয়ে সুন্দর করে কথা বলে ইরা।

‘আপনার কাছে কেন এলাম,’ নাসেরের দিকে তাকিয়ে বলল ইরা, ‘বলি এবার। মাসখানেক আগে আমার চাচা মারা গেছেন। উইল করে গেছেন, হোসেন মঞ্জিল সহ তাঁর বিরাট সম্পত্তির মালিক হব আমি। তবে এক শর্তে। উইলটা হোসেন মঞ্জিলেই লুকানো আছে, চাচার মৃত্যুর পর এক বছরের মধ্যে আমাকে খুঁজে বের করতে হবে। যদি না পারি, সব সম্পত্তি দান করে দেয়া হবে কোনও এতিমখানাকে। উকিলকে সে-রকম নির্দেশই দেয়া আছে।’

‘আপনার প্রতি খুব  সদয় ব্যবহার করেননি আপনার চাচা,’ মন্তব্য করল নাসের।

‘আমি কিন্তু সেভাবে দেখছি না ব্যাপারটাকে। চাচার ইচ্ছেয় চলিনি আমি, নিজের ইচ্ছেকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছি বরাবর। এটুকু সদয় যে হয়েছেন, সেটাই বেশি। অন্তত একটা সুযোগ তো দিয়েছেন আমাকে।’

‘উইল লিখেছে কে? কোনও উকিল?’

‘না। সাদা কাগজে চাচা নিজেই লিখেছেন। দুজন সাক্ষীকে দিয়ে সই করিয়েছেন।’

‘যতদূর জানি, সাদা কাগজে লেখা এ ধরনের উইলকে আদালত ইচ্ছে করলে বাতিল করতে পারে। এক বছর পর আদালতে প্রতিবাদ জানাতে পারেন আপনি।’

‘না, আমি তা করব না। ওই সম্পত্তিতে আমার কোন লোভ নেই।’

‘তারমানে ব্যাপারটাকে চাচার বিরুদ্ধে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘উইলের কথা জানলেন কী করে?’ চিন্তিত দেখাচ্ছে নাসেরকে। ‘নিশ্চয় আপনার নামে চিঠি লিখে রেখে গেছেন আপনার চাচা, আর বছরখানেক চলার মত টাকা?’

‘হ্যাঁ। বুঝতে পারছি, ঠিক জায়গাতেই এসেছি আমি,’ ইরা বলল। ‘আপনি সত্যিই বুদ্ধিমান লোক, নাসের সাহেব।’

জবাবে মৃদু হাসল নাসের।

‘আমাকে সাহায্য করবেন তো?’

‘করব। চমৎকার কেস। মগজ খাটাতে ভালই লাগবে আমার। তো, ইরা, আপনি খোঁজাখুঁজি করেননি?’

‘করেছি। চাচার তীক্ষ্ণবুদ্ধির ওপর যথেষ্ট শ্রদ্ধা রেখেই করেছি। জানতাম পাব না, তবু চেষ্টা করেছি।’

‘হু,’ মাথা ঝাঁকাল নাসের। ‘আপনাকে লেখা চিঠিটা আছে সঙ্গে? দেখাতে পারেন?’

হাতব্যাগ খুলে ভাঁজ করা একটা কাগজ বের করল ইরা। টেবিলে রেখে ঠেলে দিল নাসেরের দিকে।

মন দিয়ে চিঠিটা পড়ল নাসের। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘তিন বছর আগে লেখা। মার্চের পঁচিশ তারিখ। সকাল এগারোটা ত্রিশ মিনিট। কাজ অনেকখানি কমে গেল আমার। চিঠি পড়েই বোঝা যাচ্ছে, ওই দিনই লেখা হয়েছে উইলটাও। উইল করার পর পরই এই চিঠিটা লেখা হয়েছে। ভাল এক সমস্যা নিয়ে এসেছেন আপনি, ইরা। প্রচুর বুদ্ধির খেলা আছে এতে। আনন্দই পাব কাজটা করে।’ এতক্ষণে আমার সঙ্গে ইরার পরিচয় করিয়ে দেয়ার কথা মনে পড়ল ওর, ‘ইরা, ও আমার সহকারী। ইমরান চৌধুরি। আজ তো আর সময় নেই, ওকে নিয়ে কাল সকালেই যাব হোসেন মঞ্জিলে। এখন কে কে আছে হোসেন মঞ্জিলে?’

‘হারিস মিয়া ও তার স্ত্রী। বাড়ি দেখাশোনা করে। এতবড় বাড়িতে ওই দুজনই থাকে। আর কেউ নেই।’

***

পরদিন সকালেই আমরা হোসেন মঞ্জিলে পৌঁছলাম। কয়েক বিঘা জায়গা দেয়াল দিয়ে ঘেরা। একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে প্রাসাদের মত বাড়িটা। লম্বা গাড়িপথ ধরে এগিয়ে গিয়ে বাড়ির সদর দরজার কাছে থামল আমাদের ট্যাক্সি।

শব্দ শুনে বেরিয়ে এল ইরা। আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। সাজানো গোছান ড্রইং রুমে নিয়ে বসাল আমাদের। হারিস মিয়া ও তার স্ত্রীকে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দিল।

লম্বা, রোগাটে, মাঝবয়েসী লোক হারিস মিয়া। বেগম তার ঠিক উল্টো। বেঁটে, মোটা। দেখতেও ভাল না। কিন্তু মুখে হাসিটা লেগেই আছে। চা দিতে চাইল। নাসের বলল, কাজ সেরে খাবে।

দেরি না করে কাজ শুরু করতে চাইল ও। পুরো বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাল আমাদেরকে ইরা। সবশেষে নিয়ে এল আকবর সাহেবের শোবার ঘরে। এই ঘরটাও সুন্দর করে সাজানো-গোছান। একদিকের দেয়াল ঘেঁষে রাখা অনেক বড় একটা টেবিল। সেগুন কাঠে তৈরি। চকচকে পালিশ করা। কিছু কাগজ ও ফাইল টেবিলে, নিশ্চয় ব্যবসায়ের কাগজপত্র। টেবিলের সামনে রয়েছে বড় আর্ম-চেয়ার, চামড়ায় মোড়া গদি। উল্টো দিকের দেয়াল ঘেঁষে রাখা একটা লম্বা সোফা। নরম, মোলায়েম কাপড়ের আচ্ছাদন দেয়া গদি। জানালায়ও একই কাপড়ের পর্দা। রঙ মলিন হয়ে এসেছে। পরিষ্কার, কিন্তু সব কিছুই কেমন পুরানো ধাঁচের।

‘পুরো বাড়িটাই তো ঘুরলাম। মনে হচ্ছে এ ঘর থেকেই কাজ শুরু করতে হবে আমাদের,’ নাসের বলল। ‘আমার ধারণা, এই ঘরটাতেই আছে যা খুঁজছি।’ ইরার দিকে তাকাল। ‘এখানে খুঁজেছেন?’

মাথা ঝাঁকাল ইরা। ‘নিশ্চয়ই।’

আপনমনে বিড়বিড় করে যেন নিজেকেই বোঝাল নাসের, ‘ওই কাগজপত্রের স্তুপে নেই ওটা। ওখানে থাকলে আপনি পেয়ে যেতেন। তাহলে? কোথায়?’ আমার দিকে তাকাল ও। ‘হারিস মিয়াকে ডাকো তো।’

‘আমিই ডাকছি,’ ইরা বলল।

হারিস মিয়ার আসার অপেক্ষা করছি। পায়চারি শুরু করল নাসের। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজর বোলাচ্ছে ঘরের জিনিসপত্রগুলোর ওপর। আনমনে বিড়বিড় করছে, ‘গোছানো স্বভাবের লোক। কেমন সাজিয়ে রেখেছেন কাগজগুলো। ড্রয়ারের প্রতিটি চাবি তালায় লাগানো। কেবিনেটের চাবিগুলোও ঝুলছে জায়গামত। যাতে কোনটা কোন তালার চাবি খুঁজে বের করতে অসুবিধা না হয়। যদিও এভাবে চাবি রাখে না কেউ। যাই হোক, কেবিনেটের ভিতরেও সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে চিনামাটির জিনিসপত্র। নাহ্‌, হতাশই করল দেখছি। দেখে খটকা লাগে এমন কিছুই...’

হঠাৎ থেমে গেল নাসের। বড় টেবিলটার এক পাশের একটা ড্রয়ারের তালায় ঢোকানো চাবির সঙ্গে ময়লা ছোট একটা খাম বেঁধে রাখা হয়েছে মোটা সুতো দিয়ে, সেটা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ওর। এগিয়ে গিয়ে দ্রুতহাতে চাবিটা খুলে আনল। মুখ খোলা খামের এককোণে লেখা আছে: এই ড্রয়ারের চাবি। হাতের লেখা খুব খারাপ। কোনরকমে পড়া যায়। খামের ভিতরে কোন কাগজপত্র নেই।

‘তারমানে এই ড্রয়ারে নেই উইলটা,’ ভুরু কুঁচকে বলল নাসের। ‘তাহলে এভাবে চিহ্নিত করে রাখতেন না? কিন্তু এভাবে চাবিতে খাম বেঁধে লিখে রাখারই বা কী মানে? এটা যে একটা সূত্র, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।’

এই সময় দরজা খুলে ভিতরে উঁকি দিল হারিস মিয়া।

‘আপনার স্ত্রীকেও একবার আসতে বলবেন?’ অনুরোধ করল নাসের। ‘কয়েকটা প্রশ্নের জবাব চাই।’

চলে গেল হারিস মিয়া। শীঘ্রি ফিরে এল স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে। শাড়ির আঁচলে হাত মুছছে মহিলা। হাসিতে উদ্ভাসিত মুখ।

কী উদ্দেশ্যে এ বাড়িতে এসেছি আমরা, আগেই ওদেরকে জানিয়ে রেখেছে ইরা। এখন বলল, ‘নাসের সাহেব তোমাদের কিছু প্রশ্ন করবেন। ঠিক ঠিক জবাব দেবে।’

‘জ্বে, আপা,’ মাথা কাত করে বলল হারিস মিয়া। স্ত্রীর দিকে তাকাল, ‘আরিফা বেগম, ভাল কইরা ভাইবা-চিন্তা সাহেবের কথার জবাব দিবা।’

‘তা তো দিমুই,’ জবাব দিল আরিফা। ‘এই সম্পত্তি ইরা আপারই পাওন উচিত। অন্যেরে দিয়া কী লাভ?’

প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে গেল নাসের। জানতে পারল, উইলটা দেখেছে হারিস মিয়া ও তার স্ত্রী। পড়েছে। সাক্ষী হিসেবে উইলে সইও দিয়েছে দুজনে।

‘সই যখন দিয়েছেন, তখন কয়টা বেজেছিল মনে আছে?’ জানতে চাইল নাসের।

মাথা চুলকাল হারিস মিয়া। মনে করার চেষ্টা করছে।

‘আমার মনে আছে,’ তার স্ত্রী বলল। ‘চুলায় দুধের পাতিল বসানো আছিল।’ স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সই দিয়া ফিরা গিয়া দেখলাম দুধ পুইড়া গেছে, মনে নাই? আমার ত সময়ডাও মনে আছে। তুমি ভুললা ক্যান? এগারোটা বাজে তখন।’

‘দিন না রাত?’ জানতে চাইল নাসের।

‘দিন।’

‘তারপর?’

‘বাড়ি থেইক্যা বাইর অইয়া গেলেন সাহেব। সাভারের একটা কেমিক্যাল কোম্পানিতে গেছিলেন। ওই কোম্পানি সাহেবের কারখানায় মাল সাপ্লাই দিত।’

নাসের কী বুঝল জানি না, তবে আমি কোন আশার আলো দেখতে পেলাম না।

চাবিতে আটকানো খামের লেখাটা হারিস মিয়াকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এই হাতের লেখা আপনার সাহেবের?’

‘হ, স্যার,’ জবাব দিল হারিস মিয়া।

ইরাকেও দেখাল নাসের। ইরাও একই জবাব দিল।

‘আচ্ছা, গত তিন বছরে আপনার ইরা আপা ছাড়া আর কে কে এসেছিল এ বাড়িতে?’

‘কেউ না।’

‘কেউ না?’

‘না।’

‘জলিল মিয়ার কথা ভুইলা গেছ তুমি,’ স্বামীকে মনে করিয়ে দিল আরিফা বেগম।

‘জলিল?’ চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল নাসের।

‘রাজমিস্ত্রি।’

আরিফা বেগম জানাল, আড়াই বছর আগে এ বাড়িতে এসেছিল জলিল। বাড়িতে ছোটখাট কয়েকটা মেরামতের কাজ করেছিল। কী মেরামত, জানে না। সাহেবের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে কাজ করেছিল। সে-সময় ঘরে জলিলের সঙ্গে ছিলেন সাহেব। সাহেবের পড়ার ঘরেও কাজ করেছে জলিল। তা-ও দরজা বন্ধ করে।

‘জলিলকে কোথায় পাওয়া যাবে?’ জিজ্ঞেস করল নাসের।

বলতে পারল না হারিস মিয়া, কারণ ওই রাজমিস্ত্রিকে আকবর সাহেব নিজে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। তবে বড় বাজারের একটা রড-সিমেন্টের দোকানে জিজ্ঞেস করলে ওরা হয়তো খোঁজ দিতে পারবে, হারিস মিয়া বলল।

আমার দিকে ফিরল নাসের। ‘কাজ এগোচ্ছে, ইমরান। চলো, বড় বাজারে। জলিলকে খুঁজে বের করতে হবে। এ বাড়ির কোন কোন জায়গা মেরামত করেছে সে, মনে করতে পারবে হয়তো।’

সামান্য খোঁজ করতেই জলিলকে পাওয়া গেল। হোসেন মঞ্জিলে কোথায় কোথায় মেরামত করেছে সে, মনে আছে তার। টুকটাক মেরামত ছাড়াও ওকে দিয়ে একটা অদ্ভুত কাজ করিয়েছেন আকবর হোসেন। রান্নাঘর থেকে সবাইকে বের করে দিয়ে দরজা লাগিয়ে চুলার ওপরে দেয়াল থেকে দুটো ইট খুলতে বলেছেন। জলিল ইট খোলার পর ওকেও বের করে দিয়েছেন কয়েক মিনিটের জন্য। কিছুক্ষণ পর আকবর সাহেব ডাকলে ফিরে এসে ইট দুটো আবার আগের জায়গায় বসিয়ে দিয়েছে জলিল। যতটা সম্ভব নিখুঁতভাবে বসানোর চেষ্টা করেছে। তবু ভাল করে লক্ষ করলে, ইট দুটো খোলা হয়েছিল বোঝা যাবেই।

আর কিছু জানার নেই। আবার হোসেন মঞ্জিলে ফিরে এলাম।

কোন ইট দুটো খোলা হয়েছিল, একবার চোখ বুলিয়েই বের করে ফেলল নাসের। তারপর হারিস মিয়াকে দিয়ে ছেনি আর হাতুড়ি আনিয়ে আমাকে ইট দুটো খুলতে বলল।

আমি কাজ করছি, নাসের আর ইরা পিছনে দাঁড়িয়ে দেখছে।

বেশি কষ্ট করতে হলো না, খুলে আনলাম ইট দুটো। ভিতরে ছোট একটা ফোকর।

আমাকে সরিয়ে ফোকরে হাত ঢুকিয়ে দিল নাসের। কয়েক মুহূর্ত খোঁজাখুঁজি করল। পাল্টে যাচ্ছে মুখের ভাব। ধীরে ধীরে বের করে আনল হাতটা। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল হাতের দিকে। কালিঝুলি আর কাগজ পোড়া ছাই লেগে আছে হাতে। দুই আঙুলে টিপে ধরে রেখেছে ছোট এক টুকরো কাগজ। চারধার পোড়া। হারিস মিয়া ও তার স্ত্রীর সই আছে কাগজটাতে। উইলের বাকি অংশ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

হতাশ হয়ে চেয়ারে বসল নাসের। তিক্তকণ্ঠে বলল, ‘কেউ নষ্ট করে ফেলেছে কাগজটা!’

বললাম, ‘চুলার আগুনে পোড়েনি তো?’

‘ইট-সিমেন্টের গাঁথুনির ভিতর আগুন ঢুকল কী করে? আমাদের আগেই কেউ হাত দিয়েছিল ওখানটায়। কাগজটা বের করে পুড়িয়েছে।’

‘হারিস মিয়া ও তার স্ত্রী?’

‘মনে হয় না। এ বাড়ি এতিমখানার দখলে গেলে ওদের কোন লাভ নেই। বরং ভাল এই চাকরিটা হারানোর ভয় আছে।’

‘তাহলে হয়তো আকবর সাহেবই কোন কারণে মত পাল্টে কাগজটা বের করে পুড়িয়ে পোড়া অংশটা আবার আগের জায়গায় রেখে দিয়েছেন।’

‘হতে পারে, যদিও কেন এ কাজ করলেন বুঝতে পারছি না!’ চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল নাসের। প্যান্টের হাঁটুতে লেগে যাওয়া সিমেন্টের গুঁড়ো ঝাড়ল। বেসিনের কলে হাত ধুয়ে ফিরে এসে আমাকে বলল, ‘চলো, যাই।’

‘চলে যাবেন?’ জিজ্ঞেস করল উদ্বিগ্ন ইরা।

‘উইল তো বের করে দিলাম,’ নাসের বলল। ‘এখানে আর কিছু করার নেই আমাদের। সরি।’

হাসল ইরা। ‘আপনার দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। এই সম্পত্তির ওপর আমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই। তবে একটা বিশেষ ইচ্ছে ছিল, সেটা পূরণ করতে পারলাম না, এজন্যে একটু দুঃখ হচ্ছে।’

‘কী ইচ্ছা?’ কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলাম।

‘এই বাড়িতে একটা হেল্পলেস চাইল্ডকেয়ার হোম খোলার ইচ্ছে ছিল আমার। এতিম শিশুদের থাকা-খাওয়া, পড়াশোনার ব্যবস্থা করতাম এখানে। একটা হাই স্কুল করতাম। যাকগে, আমার ইচ্ছেটা পূরণ না হলেও চাচার ইচ্ছে তো পূরণ হলো। চাইল্ড কেয়ার হোম আর এতিমখানা একই কথা, এভাবে ভাবলেই আর কোন দুঃখ থাকবে না আমার।’

***

ভাড়া করা ট্যাক্সিতে ঢাকায় ফিরে চলেছি আমি ও নাসের।

একেবারে চুপচাপ হয়ে গেছে ও। ভাবসাব দেখেই বুঝতে পারছি, সন্তুষ্ট হতে পারছে না। ওর মনে কিছু একটা খটকা রয়ে গেছে, কিন্তু খটকাটা কী বলল না আমাকে।

মীরপুরের গাবতলী ছাড়িয়েছে আমাদের গাড়ি, হঠাৎ চেঁচিয়ে ড্রাইভারকে বলল নাসের, ‘গাড়ি ঘোরাও! জলদি!’

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’

আমার কথার জবাব দিল না ও, যেন শুনতেই পায়নি। আনমনে মাথা দোলাতে দোলাতে বিড়বিড় করছে, ‘আমি একটা গাধা! রামছাগল! আর মগজটাও বেইমানি করল আমার সঙ্গে।’

‘কী বলছ তুমি, কিছুই বুঝতে পারছি না!’

আমার কথায় কান দিল না নাসের। বিড়বিড় করেই যাচ্ছে, ‘কেমিক্যাল কোম্পানি, কেমিক্যাল কোম্পানির কথাটা কেন যে ভুললাম! ধূর্ত আকবর হোসেনকে আন্ডার-এস্টিমেট করাটা মোটেও উচিত হয়নি। আরও আগেই বোঝা উচিত ছিল...’

‘কী বোঝা উচিত ছিল?’

‘ইচ্ছে করেই উইলটা পুড়িয়ে রেখেছে আকবর হোসেন,’ জবাব দিল নাসের। ‘যে খুঁজবে তাকে ধোঁকায় ফেলার জন্যে! তা ছাড়া গোলমালটা রয়েছে কালিতে...’ বলতে বলতে থেমে গেল নাসের। এতক্ষণে যেন খেয়াল করল, ট্যাক্সিতে আমি ছাড়াও ড্রাইভার রয়েছে। ‘ইমরান, আবার সাভারে ফিরে যেতে হবে আমাদের। উইলটা কোথায় আছে, জানি এখন। জলদি করো, ভাই!’

কিন্তু শত চেষ্টা করেও তাড়াতাড়ি যেতে পারল না ড্রাইভার। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম। ইঞ্চি ইঞ্চি করে গাড়ি এগোচ্ছে। হোসেন মঞ্জিলে যখন ফিরে এলাম, মাঝরাত পেরিয়ে গেছে তখন। আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে অনেক আগেই। দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে হারিস মিয়া ও তার স্ত্রীকে জাগালাম। অবাক চোখে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে ওরা।

নাসের জিজ্ঞেস করল, ‘ইরা কোথায়?’

‘আপা তো রাতেই ঢাকা ফিরা গেছেন,’ হারিস মিয়া জানাল।

‘খবর দিতে হবে। সকালে দিলেও চলবে।’ বলে গটমট করে সোজা এগোল নাসের। সিঁড়ি বেয়ে উঠে আকবর সাহেবের শোবার ঘরে ঢুকল।

ডেস্কের ড্রয়ারে ঢোকানো চাবিটা খুলে এনে খামটা খুলে নিল। সাবধানে আঠা খুলে খামের কাগজটা ছড়াল। হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছি। চারকোণা কাগজটা টেবিলে বিছিয়ে হাত দিয়ে চেপে চেপে যতটা সম্ভব সমান করে নিল ও। হারিস মিয়াকে মোম আনতে বলল। মোম জ্বেলে তার শিখার ওপর ধরল খামটা। ধীরে ধীরে অক্ষর ফুটতে শুরু করল কাগজে।

‘দেখলে তো!’ আনন্দে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল নাসের।

খুব কম লিখে ভাইঝিকে তার বিশাল সম্পত্তি দিয়ে গেছেন জনাব আকবর হোসেন। তারিখ: ২৫শে মার্চ, বেলা ১২টা ৩০ মিনিট। উইলের সাক্ষী হারিস মিয়া ও আরিফা বেগম।

‘ব্যাপারটা কি আইনসম্মত?’ বোকার মত প্রশ্ন করলাম।

‘যদ্দূর জানি, অদৃশ্য কালিতে সাধারণ কাগজে উইল লেখাটা বেআইনী নয়। লেখা স্পষ্ট, সাক্ষীর সই স্পষ্ট, আদালত নাকচ করে দিতে পারবে না। কিন্তু যা-ই বলো, চালাক ছিলেন ভদ্রলোক। কল্পনায় পরিষ্কার দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁর ভাইঝি কোথায় কোথায় খুঁজবে। সেসব জায়গায় রাখেননি। আর আমি হাঁদা গোয়েন্দা হয়েও ঠিক ওইসব জায়গায়ই খুঁজেছি। প্রথমে একটা উইল লিখে তাতে হারিস মিয়া ও আরিফা বেগমকে দিয়ে সই করিয়েছেন। মাস ছয়েক পরে কাগজটা পুড়িয়ে শুধু সইয়ের জায়গাটা বাদ রেখে চুলার ওপরের ইটের নীচে লুকিয়েছেন। ইরা যদি পায়, তাহলে মনে করবে, কোন কারণে উইলটা পুড়ে গেছে। আর খুঁজবে না। আর না খুঁজলেই জিতে গেলেন আকবর হোসেন।’

‘আসল উইলটা তিনি লিখেছেন এই খামে, ক্যামিকেল কোম্পানি থেকে আনা অদৃশ্য কালি দিয়ে। নিজের সই কোনখানে আছে লক্ষ রেখেছেন। লেখা অদৃশ্য হয়ে যাবার পর নিজের সইয়ের নীচে অন্য কিছু বলে আবার হারিস মিয়া ও তার স্ত্রীর সই নিয়েছেন।’

‘কিন্তু এই খামে উইল লেখা হয়েছে, কিছুতেই বুঝতে পারত না ইরা,’ আমি বললাম। ‘তারমানে তার চাচাই জিতেছেন ধরে নেয়া যায়।’

‘না, ইমরান, ইরাই জিতেছে। ও বুদ্ধিমতী। বুঝতে পেরেছিল, কাকে দিয়ে কাজটা করালে সফল হতে পারবে। যে যে বিষয়ে পারদর্শী, প্রয়োজনের সময় তাকে দিয়ে কাজ করানোর কথা বেশির ভাগ মানুষই ভাবে না। অতএব, আমার হিসেবে এই চ্যালেঞ্জে ইরাই জিতল। আকবর সাহেব লিখেছেন: এক বছরের মধ্যে ইরা উইলটা খুঁজে বের করতে না পারলে সম্পত্তি ওর হাতছাড়া হবে। অন্য কাউকে দিয়ে খোঁজাতে পারবে না, ইরাকেই খুঁজে বের করতে হবে, এ ধরনের কোনও শর্ত কিন্তু তিনি দেননি।’

যাই হোক, এ নিয়ে আর বেশি তর্ক করলাম না। ইরা যে সম্পত্তিটা পেয়েছে, অসহায় এতিম শিশুদের জায়গা দিতে পারবে, এতেই আমি খুশি। আকবর সাহেবও নিশ্চয় খুশি হতেন। কে জানে!

(সমাপ্ত)

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য