রহস্যভেদী - রকিব হাসান

গল্পটি শেয়ার করেছেন : নাজমুস সাকিব

‘সত্যি, জায়গাটা ভারি সুন্দর! ঠিক কাজই করেছি এসে!’

গাঁয়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে আবেগভরা কণ্ঠে বললো পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের ইন্সপেক্টর জহির আলম। ভোরের বিশুদ্ধ বাতাস টেনে নিলো বুক ভরে। মুগ্ধ চোখে তাকালো প্রকৃতির দিকে। সূর্য উঠছে। পাখি ডাকছে।

জহির শখের গোয়েন্দা নাসের পাশার বন্ধু। সেই সুবাদে আমারও বন্ধু। জায়গাটা আমারও খুব ভালো লাগছে। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে নাসেরেরও খারাপ লাগছে না।

সাভারের ছোট্ট একটা সুন্দর গ্রাম হরিপুর। বনের ভিতর লুকানো। টুরিস্ট স্পট। ঘরে বসে থেকে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। কোনো কেস ছিল না নাসেরের হাতে। জহিরও কয়েক দিনের ছুটি নিয়েছে। প্রস্তাব দিলো, ‘হরিপুরে যাওয়া যাক।’

বউ-বাচ্চা কারোরই নেই আমাদের। এক ঘণ্টার নোটিশে বেরিয়ে পড়লাম হরিপুরের উদ্দেশ্যে। গতকাল সন্ধ্যায় পৌঁছেছি। উঠেছি একটা পাবলিক রেস্ট হাউসে। ‘কাজ নেই, কর্ম নেই,’ জহির বললো, ‘কয়েকটা দিন শান্তিতে কাটাতে পারবো।’

কিন্তু ওর ধারণা যে ভুল, কয়েক মিনিট পরেই সেটা বোঝা গেল। একজন পুলিশ অফিসারকে হনহন করে হেঁটে আসতে দেখা গেলো উল্টোদিক থেকে। কাছে এসে জহিরকে দেখে থমকে দাঁড়ালো ইউনিফর্ম পরা সাব-ইন্সপেক্টর। স্যালুট করে বললো, ‘আরে, স্যার, আপনি!’

‘আরে, মশিউর!’ জহির বললো, ‘আমারও তো সেই একই প্রশ্ন, তুমি এখানে?’

জানা গেল, সাব-ইন্সপেক্টর মশিউর পনেরো মাইল দূরের আরেক থানা থেকে বদলি হয়ে এসেছে। সে এখন হরিপুর থানার সেকেণ্ড অফিসার। একটা কেসের তদন্ত করতে গিয়ে জহিরের সঙ্গে ওর পরিচয়। বিষ খাইয়ে খুন করা হয়েছিল এক লোককে। সেই কেসটা সমাধান করেছিল জহির। ওকে সহযোগিতা করেছিল মশিউর। আবার সালাম দিয়ে চলে গেল সাব-ইন্সপেক্টর।

খিদে পেয়েছে। নাস্তা করতে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। পরোটা আর মাংসের অর্ডার দিলো জহির। ভালো মিষ্টিও পাওয়া যায় এখানে। বড়ো বড়ো রসগোল্লা।

‘খুব ভাল লাগছে,’ খেতে খেতে জহির বললো। ‘আমি ঠিক করেছি, রিটায়ার করে সোজা গ্রামের বাড়িতে চলে যাবো। অপরাধ থেকে অনেক অনেক দূরে কোনো নির্ঝঞ্ঝাট জায়গায়।’

‘তাই ভাবছো বন্ধু!’ সুরেলা গলায় রহস্যময় ভঙ্গিতে বললো নাসের। জানালার পাল্লায় বসে কিচির-মিচির করছে একটা চড়ুই, সেদিকে তাকিয়ে আছে সে।

দেখতে দেখতে প্লেটগুলো খালি করে ফেললাম আমি আর জহির। ‘আরও দুটো করে রসগোল্লা নিলে মন্দ হয় না, কি বলো?’ জহির বললো।

‘ঠিক বলেছো,’ খুশি হলাম। ‘তুমি আর নেবে নাকি, নাসের?’ মাথা নাড়লো নাসের।

‘নাহ্‌। পেট ভারি হয়ে গেলে মগজ ভোঁতা হয়ে যায়। কাজ করতে চায় না ঠিকমতো।’

‘হোক ভোঁতা। এখানে তো আর মাথা খাটাতে আসিনি আমরা,’ হাসলো জহির। ‘তা ছাড়া তোমার তুলনায় আমার পেট অনেক বড়, জায়গাও বেশি। এই ছেলে,’ বয়কে ডেকে বললো ও, ‘আরও দুটো করে রসগোল্লা দে তো, বাবা। তারপর চা দিস।’

ঠিক এই সময় দরজায় দেখা দিলো আবার মশিউর। ‘আপনাকে বিরক্ত করতে এসেছি, স্যার,’ কাছে এসে জহিরের দিকে তাকিয়ে বললো সে। ‘মাপ চেয়ে নিচ্ছি আগেই।’

‘আমিও আগেই বলে দিচ্ছি,’ তাড়াতাড়ি বলে উঠল জহির, ‘আমি এখন ছুটিতে। কোনো কেসটেস আমার ঘাড়ে চাপানোর চিন্তা করে লাভ হবে না।’

‘শিকদার ভিলায় এক ভদ্রলোক গুলি করেছে নিজেকে,’ মশিউর বলল। ‘খুলি ফুটো হয়ে গেছে।’

‘ওই আর কি,’ নিরাসক্ত কণ্ঠে বললো জহির, ‘ঋণ শোধ করতে পারছিল না, কিংবা মেয়েঘটিত ব্যাপার।’

‘কিন্তু কথা হলো, স্যার,’ বললো মশিউর, ‘লোকটা নিজেকে গুলি করেনি। অন্তত ডাক্তার মতিনের তাই ধারণা।’

হাতের কাপটা নামিয়ে রাখলো জহির। ‘গুলি করেনি! কি বলতে চাও?’

‘ডাক্তার মতিন বলেছে,’ বললো মশিউর, ‘ব্যাপারটা একেবারেই অসম্ভব! রীতিমত অবাক হয়েছে ডাক্তার। ঘরের দরজা ভিতর থেকে তালা দেয়া, জানালা বন্ধ, ভিতর থেকে ছিটকানি তোলা, দেখে মনে হয় আত্মহত্যা। কিন্তু ডাক্তার বলেছে আত্মহত্যা হতে পারে না।’

ইঙ্গিতে বয়কে খাবার আনতে নিষেধ করল জহির। বুঝতে পারছি, মুখটাকে নির্বিকার করে রাখলেও মনে মনে হাসছে মশিউর। মিনিট দুই পরে নিজেদেরকে গাঁয়ের পথে আবিষ্কার করলাম। ছুটে চলেছি শিকদার ভিলার দিকে। হাঁটতে হাঁটতেই কথা বলছে মশিউর। যে লোকটা মারা গেছে তার নাম তরিকুল ইসলাম। মাঝবয়েসী। ছন্নছাড়া। আট বছর আগে হরিপুরে এসেছিল। শিকদার ভিলাটা কিনে নিয়েছিল। দোতলার এক কোণের একটা ঘরে বাস করতো সে। ওই বাড়িতে বাস করে আর একজন মাত্র মানুষ, শিকদারের দূর সম্পর্কের ফুপু। বৃদ্ধা, বাড়ির সব কাজ-কর্মের দায়িত্ব তার ওপর। নাম রহিমা বেগম। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহারের জন্য সুখ্যাতি আছে গাঁয়ে। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তরিকুলের পরিচিত জনৈক রহমান দম্পতি বেড়াতে এসে শিকদার ভিলায় উঠেছে। ঘটনার দিন সকালে অনেক বেলায়ও তরিকুলের সাড়া না পেয়ে তার ঘরের দরজায় ঠেলা দেয় রহমান। সাড়া না পেয়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। চেঁচামেচি শুনে এসে হাজির হয় রহিমা বেগম। সে-ও ডাকাডাকি করে। কিন্তু দরজা খোলে না। ভিতর থেকে বন্ধ। শঙ্কিত হয়ে ওঠে ওরা। শেষে দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখে মরে পড়ে আছে তরিকুল। মেঝেতে পড়ে আছে লাশ। গুলি লেগেছে মাথায়। লাশের ডান হাতে রয়েছে পিস্তলটা। দেখলেই মনে হয় আত্মহত্যা। লাশ পরীক্ষা করে দেখেন ডাক্তার মতিন। মশিউরকে একান্তে ডেকে নিয়ে বলেন, ব্যাপারটা সন্দেহজনক। এটা খুন। ব্যস, আর কিছু শোনার দরকার মনে করেনি মশিউর। ছুটে এসেছে জহিরের কাছে।

মশিউরের কথা শেষ হলো। আমরাও শিকদার ভিলায় পৌঁছুলাম। ইঁট বেরোনো, ধ্বংস হয়ে আসা বহু পুরানো একটা মস্ত বাড়ি ।এখন পোড়ো বললেও চলে। চারদিকে আগাছার জঙ্গল। দেয়াল ঢেকে ফেলেছে বুনোলতা। কতদিন পরিষ্কার করা হয় না, কে জানে! বাগানেও ফুল গাছের চেয়ে আগাছা বেশি। বাগান বলে আর ঠিক চেনা যায় না ওটাকে। সদর দরজা খোলা। ভিতরে ঢুকলাম আমরা। মশিউরের পিছু পিছু হলরুম পেরিয়ে ছোট একটা বসার ঘরে পৌঁছুলাম। চারজন লোক রয়েছে ঘরে। পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা মোটাসোটা একজন লোকের ওপর চোখ পড়লো প্রথমেই, আর প্রথম দর্শনেই তাকে অপছন্দ করলাম আমি। প্রায় একই ধরনের একজন মহিলা রয়েছে তার পাশে, তবে পুরুষটির তুলনায় মহিলার চেহারা অনেক ভালো।

দুজনের কাছ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধা। হালকা-পাতলাদেহ। মাথার বেশির ভাগ চুলই সাদা। শান্ত, ধীরস্থির ভঙ্গি। পরনে সাদা ধুতি। চেহারায় এমনকিছু রয়েছে, যা শ্রদ্ধা জাগায়। বলে দিতে হলো না, এই মহিলাই রহিমা বেগম।

ঘরের চতুর্থ লোকটি বেশ লম্বা। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ।

‘ডাক্তার মতিন,’ লম্বা লোকটির উদ্দেশ্যে বলল মশিউর, ‘ইনি পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের ইন্সপেক্টর জহির আলম। এঁরা তাঁর দুই বন্ধু। ইনি নাসের পাশা, শখের গোয়েন্দা। আর ইনি তাঁর সহকারী ইমরান চৌধুরি।’

এগিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে হাত মেলালেন ডাক্তার। রহমান দম্পতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তারপর দোতলায় নিয়ে চললেন আমাদের। মশিউরকে নিচে থাকতে বললো জহির। চারদিকে কড়া নজর রাখতে বললো। সরু একটা বারান্দা পেরিয়ে একটা ভাঙা দরজার সামনে থামলেন ডাক্তার। কব্জায় আটকে আছে দরজার কাঠের টুকরো। ঘরের ভিতর পড়ে আছে পাল্লাটা।

ঘরে ঢুকলাম আমরা। পড়ে আছে লাশটা। তরিকুলের মুখভর্তি দাড়ি, চাঁদির চুল ধূসর। এগিয়ে গিয়ে লাশের পাশে বসে পড়লো জহির।

‘ঠিক যেভাবে ছিল, সেভাবেই রেখে দিলেন না কেন?’ ডাক্তারকে বললো ও।

কাঁধ ঝাঁকালেন ডাক্তার। ‘প্রথমে আত্মহত্যা ভেবেছিলাম।’

‘হুঁ!’ মাথা দোলাল জহির। ‘বাঁ কানের পাশ দিয়ে মাথায় ঢুকেছে বুলেট।’

‘ঠিক,’ মাথা ঝাঁকালেন ডাক্তার। ‘নিজের হাতে ওই জায়গাটায় গুলি করা তার জন্য অসম্ভব ছিল। ডান হাতে পিস্তল ধরে বাঁ কানের পাশে গুলি করতে হাতটাকে কতখানি ঘোরাতে হবে, ভাবুন? নাহ্‌, অসম্ভব!’

‘ডান হাতে পিস্তল পেয়েছেন? ধরা অবস্থায়? কোথায় ওটা?’

টেবিলের দিকে ইঙ্গিত করলেন ডাক্তার। তারপর বললেন, ‘হাতে ধরা অবস্থায় পাইনি, হাতে রাখা ছিল বললেই ঠিক বলা হবে।’

‘পরে রাখা হয়েছে,’ জহির বললো, ‘পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।’ পিস্তলটা তুলে নিয়ে ম্যাগাজিন পরীক্ষা করে দেখতে লাগলো সে। ‘একটা গুলি খরচ করা হয়েছে। আঙুলের ছাপের জন্য পরে পরীক্ষা করতে হবে। তবে আপনার ছাড়া আর কারও ছাপ পাব কি না সন্দেহ আছে যথেষ্ঠ। কতোক্ষণ আগে মারা গেছে?’

‘গতরাতের কোনো একসময়। এই কম-বেশি বারো ঘণ্টা হবে।’ চুপ করে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে নাসের। তদন্তে অংশ নেয়নি। মাঝেমাঝে নাক কুঁচকে শুধু গন্ধ নিচ্ছে বাতাসে, কি যেন বোঝার চেষ্টা করছে। ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে, অবাক হয়েছে সে। নাসেরের দেখাদেখি আমিও গন্ধ শুঁকলাম বাতাসে। কিন্তু কোনো গন্ধই নাকে ঢুকছে না আমার। অথচ থেকে থেকেই নাক কুঁচকে ঘ্রাণ নিচ্ছে নাসের। কি জানি, কোনো একটা গন্ধ নিশ্চয় নাকে ঢুকছে ওর, আমার ঘ্রাণশক্তি যেখানে ব্যর্থ।

লাশের কাছ থেকে সরে এলো জহির। এইবার এগিয়ে গেল নাসের। লাশের পাশে ঝুঁকে বসলো। গুলির ক্ষতটার দিকে কোনো আগ্রহ নেই তার। ভাবলাম, লাশের ডান হাতের আঙুল পরীক্ষা করছে সে। কিন্তু না। শার্টের হাতার ভিতর থেকে বেরিয়ে থাকা একটা রুমালের কোণার দিকে তার নজর। লাল ডোরাকাটা একটা শার্ট তরিকুলের গায়ে। উঠে দাঁড়ালো নাসের, কিন্তু রুমালটার ওপর থেকে চোখ সরছে না। অবাক হয়েছে বোঝা যায়।

দরজার কাছ থেকে ডাকলো জহির। পাল্লাটা তুলতে সাহায্যের অনুরোধ করল নাসেরকে।

সুযোগ পেয়ে এবার আমি গিয়ে বসলাম লাশের পাশে। হাতের ভিতর থেকে টেনে বের করে আনলাম রুমালটা। খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। কিন্তু দেখার মতো কিছুই নেই। সাদা রঙের একটা অতি সাধারণ রুমাল। কোনো ধরনের দাগ নেই, কোনো চিহ্ন নেই। আবার আগের জায়গায় রুমালটা রেখে দিতে দিতে আপনমনেই মাথা নাড়লাম। বুঝতে পারলাম না কিছুই। তিনজনে মিলে তুলে ফেলেছে দরজার পাল্লা। বুঝতে পারছি, চাবি খুঁজছে ওরা। কিন্তু বৃথা খোঁজা, পেল না।

‘বুঝেছি,’ শেষে জহির বলল। ‘জানালার পাল্লা বন্ধ, ছিটকিনি লাগানো। তারমানে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেছে খুনী, তালা লাগিয়ে দিয়ে চাবি নিয়ে গেছে সঙ্গে করে। বোঝাতে চেয়েছে দরজা জানালা বন্ধ করে আত্মহত্যা করেছে তরিকুল। চাবিটা খুঁজবে পুলিশ, ভাবতেই পারেনি। তাই না, নাসের?’

‘হয়তো। কিন্তু দরজার এপাশে চাবিটা ফেলে রাখাটাই কি সহজ হতো না? পুলিশকে বোঝানো যেত, তালায়ই লাগানো ছিল চাবিটা। দরজা ভেঙে পড়ায় সেটা খুলে মেঝেতে পড়ে গেছে।’

‘তা হতো। কিন্তু সবার বুদ্ধি তো আর তোমার মত ধারালো নয়। ভাগ্য ভালো, অপরাধী ধরায় আত্মনিয়োগ করেছ, নিজে অপরাধী হয়ে বসোনি। তাহলে তোমাকে ধরার সাধ্য কারো হতো না।’

কিন্তু জহিরের কথায় কান নেই নাসেরের। ভাবভঙ্গি দেখে আমার মনে হচ্ছে, কি যেন হারিয়ে ফেলেছে সে, কিংবা খাপে খাপে মেলাতে পারছে না। বার বার ঘরের চারদিকে নজর বোলাচ্ছে। একসময় আস্তে করে বললো, ‘লোকটা খুব বেশি সিগারেট খেত।’

সত্যিই। জানালার নিচে পড়ে আছে পোড়া সিগারেট। একটা অ্যাশট্রে ভরেও উপচে পড়ছে পোড়া টুকরো। বিরাট একটা আর্মচেয়ারের পাশে ছোট্ট টেবিলে রয়েছে অ্যাশট্রেটা।

‘গতরাতে অন্তত গোটা কুড়ি সিগারেট টেনেছিল সে,’ জহির বললো। ঝুঁকে জানালার নিচে পড়ে থাকা টুকরোগুলো দেখল। তারপর ফিরলো অ্যাশট্রের দিকে। ‘একই ব্র্যাণ্ডেরসিগারেট।’ ঘোষণা করলো সে। ‘এবং একই লোকে টেনেছে। বিশেষ কিছুই নেই এতে, নাসের।’

‘আছে এ কথা তো বলিনি আমি,’ বিড়বিড় করে বললো নাসের।

‘আরে!’ ভুরু কুঁচকে গেছে জহিরের। ‘ওটা কি?’ লাশের কাছে এক জায়গায় পড়ে থাকা উজ্জ্বল একটা জিনিসের দিকে চেয়ে আছে। ‘ভাঙা কাফ-লিংক। কার ওটা? ডাক্তার সাহেব, দয়া করে নিচে গিয়ে একটু রহিমা বেগমকে পাঠাবেন?’

‘রহমানদের ব্যাপারে কি করা হবে?’ ঘর ছাড়তে রীতিমত ব্যগ্র মনে হলো ডাক্তারকে। কি একটা জরুরি কাজে নাকি ঢাকায় যেতে হবে তাঁকে।

‘ওকে ছাড়াই চলবে আপাতত। তবে, যতো জরুরি কাজই থাক, বাড়ি থেকে বেরোতে পারবে না এখন ওরা। দয়া করে আপনি আর মশিউর মিলে ঠেকিয়ে রাখবেন ওদের। এখন রহিমা বেগমকে দরকার আমাদের। ও, ভালো কথা, আজ সকালে রহমানদের কেউ কিংবা রহিমা বেগম কি এ ঘরে এসেছিল?’

মাথা নাড়লেন ডাক্তার। ‘না। আমি আর মশিউর ঢুকেছি। ওরা বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল।’

‘আপনি শিওর?’

‘শিওর।’

চলে গেলেন ডাক্তার।

‘ভালো লোক,’ জহির বললো। ‘কিন্তু ভেবে অবাক হচ্ছি, তরিকুলকে খুন করলো কে? রহমান দম্পতি আর রহিমা বেগমের ওপরই সন্দেহটা পড়ে। কিন্তু ওই বৃদ্ধাকে সন্দেহ করার কোনো মানে হয় না। আট বছর ধরে তরিকুলের সঙ্গে আছে সে। খুন করার ইচ্ছে থাকলে আরও আগেই করতে পারতো। বাকি রইল রহমান দম্পতি। কারা ওরা? দেখে তো খুব সুবিধের মনে হলো না দুজনের একজনকেও।’

হাজির হলো রহিমা বেগম।

একের পর প্রশ্ন করে গেল জহির। নির্দ্বিধায় সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিল বৃদ্ধা। জানা গেল, আট বছর নয়, চোদ্দ বছর ধরে তরিকুলের সঙ্গে আছেসে। বললো, খুব ভদ্র আর বিবেচক লোক ছিল তার ভাইপো। না, এর আগে কখনও রহমান দম্পতিকে দেখেনি সে। তিন দিন আগে এসে হঠাৎ উদয় হয়েছে ওরা। তার ধারণা, ওদেরকে দেখে খুব একটা খুশি হয়নি বৃদ্ধার ভাইপো। কাফ-লিংকটা দেখালো জহির। রহিমা বেগম জানাল, ওটা তরিকুলের নয়। পিস্তলের কথায় জানালো, তার ভাইপোর একটা পিস্তল আছে। ড্রয়ারে তালা দিয়ে রাখতো। কয়েক বছর আগে একবার দেখেছে। অস্ত্র সম্পর্কে তার কোনো পরিষ্কার ধারণা নেই, কাজেই এখন দেখে মনে করতে পারলো না এটাই আগে দেখেছিল কি না। গতরাতে গুলির আওয়াজ শোনেনি সে। এতো বড়ো বাড়ির এক প্রান্তের দরজা-জানালা বন্ধ করা কোনো ঘরে পিস্তলের গুলি ফুটলে তার আওয়াজ অন্য প্রান্তের কোনো ঘর থেকে শোনা যাবার সম্ভাবনা খুবই কম। তা ছাড়া রাতে প্রচুর গানবাজনা হয়েছে, পাশে এক বাড়িতে বিয়ে হচ্ছিলো। এতোই হট্টগোল হচ্ছিল, বজ্রপাতের শব্দশোনাও কঠিন, আর পিস্তলের গুলির সামান্য শব্দ তো কানের কাছে ফুটলেও শোনা যেত না- বৃদ্ধার মন্তব্য! তরিকুল কখন শুতে গেছে, জানে না সে। রহিমা বেগম কাজকর্ম শেষ করে সাড়ে ন’টায় নিজের ঘরে শুতে যাবার আগে তরিকুলকে জেগে থাকতে দেখেছে। তবে এতে বিশেষ কিছু বোঝা যায় না। কারণ, এতো তাড়াতাড়ি কখনও ঘুমোতে যায় না তরিকুল। মাঝরাত অবধি জেগে থেকে বই পড়ার অভ্যাস। আর পড়ার সময় একনাগাড়ে সিগারেট টানতো।

কথার মাঝেই প্রশ্ন করে বসলো নাসের, ‘আচ্ছা, আপনার ভাইপো কি বরাবর জানালা বন্ধ করে ঘুমাতেন, না খুলে?’

কি যেন ভাবলো রহিমা বেগম। ‘খুলেই তো ঘুমাতো। বিশেষ করে ওপরের দিকের পাল্লা।’

‘অথচ গতরাতে জানালা বন্ধ করা হয়েছিল। কেন, বলতে পারেন?’

‘ঠিক জানি না। হয়তো ঠাণ্ডা লাগছিল, বন্ধ করে দিয়েছে।’

আরও কয়েকটা প্রশ্ন করল জহির। তারপর যেতে বললো রহিমা বেগমকে।

এরপর রহমান দম্পতির সঙ্গে কথা বললো জহির, আলাদা আলাদা ভাবে। কথা বলতে বলতে প্রায় কেঁদেই ফেললো মিসেস রহমান, পানি চলে এলো চোখে। ভুলভাল হয়ে গেল অনেক কথা। মুখ গোমড়া করে রাখলো জনাব রহমান। যথেষ্ট রাগ-ঝাল দেখালো। কাফ-লিংকটা তার নয় বলে সরাসরি অস্বীকার করল। কিন্তু পার পেল না। কারণ, ওটা তার স্বামীর বলে আগেই সনাক্ত করে গেছে মিসেস। রহমান আরও একটা কথা মিথ্যে বললো বলে মনে হলো- আগের রাতে নাকি একবারও তরিকুলের ঘরে যায়নি সে। রহমানের জন্য একটা ওয়ারেণ্ট ইস্যুর আবেদন করা যায়, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো জহির।

বাড়ির দায়িত্বে মশিউরকে রেখে আমি আর নাসের ফিরে এলাম রেস্ট হাউসে। আর জহির হরিপুরথানায় গেল রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করাতে।

‘খুব চুপচাপ হয়ে আছো তুমি,’ নাসেরকে বললাম। ‘ঘটনাটায় মোটেও আগ্রহী মনে হচ্ছে না তোমাকে।’

‘ঠিক উল্টো। আসলে, খুব বেশি আশ্চর্য করে দিয়েছে আমাকে ঘটনাটা।’

‘খুব জোরালো কোনো মোটিভ এখনও পাওয়া যায়নি,’ চিন্তিতভাবে বললাম। ‘তবে রহমান লোক সুবিধের নয়। কেসটা ওর বিরুদ্ধেই যাচ্ছে, কিন্তু কোনো মোটিভ নেই। তবে মনে হয়, ধরে ধোলাই দিলে গড়গড় করে বলে দেবে সব।’

পিটিয়ে মানুষের মুখ থেকে কথা আদায়ে কখনও আগ্রহী হয় না নাসের। তার ধারণা, মার খেয়েও সবসময় সত্যি কথা বলে না মানুষ। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এমন বিশেষ কিছুই কি নজরে পড়েনি তোমার, যেটা জহিরের চোখ এড়িয়ে গেছে?’

আগ্রহী হয়ে নাসেরের দিকে তাকালাম। ‘তোমার চোখে পড়েছে?’

‘লাশের কোটের হাতার ভিতরে কি ছিল?’

‘একটা রুমাল।’

‘হ্যাঁ। ওটাই ঝেড়ে ফেলতে পারছি না মন থেকে।’

‘আমি ভাবছি, রুমালটা ডানহাতের আস্তিনে ঢোকানো কেন? থাকার তো কথা বাঁ হাতে, যাতে সহজেই ডান হাত দিয়ে বের করতে পারে,’ আমি বললাম।

‘চমৎকার! এই তো বুঝেছ। আরও একটা ব্যাপারে খটকা আছে।’

‘কি?’

‘সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ।’

‘আমি কোনো গন্ধই পাইনি!’ অবাক হয়ে বললাম।

‘আমিও পাইনি,’ নাসের বলল। হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম নাসেরের দিকে। ও যে কখন রসিকতা করে, আর কখন করে না, বোঝা কঠিন।

***

দুপুরে জহির ফিরে এলে ওর কাছে জানতে পারলাম, পুলিশ আরও কিছু তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করেছে, যেগুলো সব রহমানের বিরুদ্ধে। শিকদার ভিলার বাগানের এক কোণে মালির ঘর আছে, প্রায় ধ্বংস হয়ে এসেছে। ওটাতে এখন বাস করে এক ভবঘুরে। তরিকুল যে রাতে মারা গেছে, সে রাতে দেয়াল টপকে বাগানে ঢুকেছিল লোকটা, মালির ঘরে রাত কাটানোর উদ্দেশ্যে। ও জানায়, রাত বারোটায় দুজন লোককে ঝগড়া করতে শুনেছে সে। জোরে জোরে কথা কাটাকাটির আওয়াজ আসছিল দোতলার তরিকুলের ঘর থেকে। একজন টাকা চাইছিল, আরেকজন রাগের সঙ্গে বলছিল, দিতে পারবে না। ঝোপের ভিতর লুকিয়ে থেকে ভবঘুরে দেখেছিল, জানালার সামনে বার বার আসছে- যাচ্ছে দুজন লোক। একজন তরিকুল, আরেকজন রহমান। ভবঘুরের কথা শুনে বোঝা গেল, শিকদার ভিলায় রহমান গিয়েছিল তরিকুলকে ব্ল্যাকমেল করতে। শুরু হলো খোঁজ-খবর। জানা গেল, ছদ্মবেশে ছিল তরিকুল, তার নাম আসলে সরফরাজ। ব্যাংকে চাকরি করতো। ও একটা শাখার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার থাকার সময় তাতে ডাকাতি হয়। এরপর থেকে গা ঢাকা দেয়। নাম গোপন করে লুকিয়ে ছিল শিকদার ভিলায়।

অনুমান করা হলো, ব্যাপারটা প্রথম থেকে জানে রহমান। সরফরাজকে ব্ল্যাকমেল করতে থাকে। টাকা দিতে দিতে নিশ্চয় অধৈর্য হয়ে উঠেছিল সরফরাজ। আর দিতে অস্বীকার করে। এক কথা দু’কথায় শুরু হয় বচসা। শেষে মেজাজ ঠিক রাখতে পারেনি আর তরিকুল। ড্রয়ার থেকে পিস্তল বেরকরে রহমানকে গুলি করতে যায়। তার হাত থেকে পিস্তলটা ছিনিয়ে নিয়ে উল্টে সরফরাজকেই গুলি করে বসে রহমান। পরে ওটাকে আত্মহত্যার মতো করে সাজায়।

***

দুপুরের খাবার খেয়ে তাড়াহুড়া করে আবার বেরিয়ে গেল জহির। বারান্দায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছি আমি আর নাসের। ঝিম ধরা দুপুর। চমৎকার বাগানের দিকে তাকিয়ে তন্দ্রালু হয়ে এলো চোখ।

হঠাৎ চোখের পাতা খুলে গেল নাসেরের কথায়, ‘হুঁ, তা-ই হবে! নিশ্চয় তাই! আর দেরি করা যায় না!’

রেস্ট হাউসের দারোয়ানকে ডেকে একটা মুখ বন্ধ খাম দিয়ে বললো, ‘চিঠিটা এই ঠিকানায় দিয়ে এসো।’

আমি দূরে বসে থাকায় ঠিকানাটা দেখতে পেলাম না।

এরপর ঘণ্টাখানেক পেরিয়ে গেল। ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে নাসের। পায়চারি করছে। বার বার তাকাচ্ছে গেটের দিকে। ‘এতোক্ষণ তো লাগার কথা নয়!’ বলল সে। ‘এটা হতেই পারে না। না, আমি ভুল করতে পারি না।’ তারপর হাসি ফুটলো মুখে। ‘ওই যে, এসে পড়েছে সে।’

মিনিটখানেক পরেই অবাক হয়ে দেখলাম, দারোয়ানের সঙ্গে গেট দিয়ে ঢুকছে রহিমা বেগম। কিছুটা অস্থির, যেটা তার স্বভাববিরুদ্ধ। হাঁপাচ্ছে। চিঠি পেয়ে ছুটতে ছুটতে এসেছে বোঝা যায়।

বারান্দায় উঠল বৃদ্ধা। তাকালো নাসেরের দিকে। ভয়ের ছায়া দেখলাম সে-চোখে।

‘বসুন,’ গলায় সহানুভূতি ঢাললো নাসের। ‘আমার অনুমান ঠিক, তাই না?’

জবাবে কেঁদে ফেললো মহিলা।

‘কেন করলেন কাজটা?’ কোমলগলায় জিজ্ঞেস করলো নাসের।

‘খুব বেশি ভালবাসতাম ওকে আমি,’ কেঁদে ফেললো রহিমা বেগম। ‘ছোটবেলা থেকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি। আমার জন্য কিছু করুন, প্লিজ।’

‘আমার সাধ্যমত অবশ্যই করবো,’ নাসের বললো। ‘কিন্তু একটা নিরপরাধ লোক শাস্তি- পাক, এটা কিছুতেই চাই না আমি। হোক সে খারাপ।’

উঠে দাঁড়ালো রহিমা বেগম। মৃদুস্বরে বললো, ‘শেষ পর্যন্ত হয়তো আমিও চাইতাম না। ঠিক আছে, যা ভালো বোঝেন, করুন।’

আর একটা কথাও বললো না রহিমা বেগম। উঠে চলে গেল।

‘ওই মহিলা গুলি করেছে লোকটাকে?’ ভীষণ অবাক হলাম।

হাসলো নাসের। মাথা নাড়লো।

‘তরিকুল নিজেই নিজেকে গুলি করেছে। মনে আছে, রুমালটা ওর বাঁ হাতের হাতায় ছিল না, ছিল ডান হাতে? তাতেই বুঝেছি, সরফরাজ আসলে বাঁইয়া। রহমানের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটির পর ধরেই নিলো সরফরাজ, রহমান সব কথা ফাঁস করে দেবে। আর তাই কোনো উপায় না দেখে আত্মহত্যা করলো সে।

সকালে ঘুম ভাঙার পর অন্যদিনের মতই ভাইপোর ঘরে ঢোকে রহিমা বেগম। লাশটা দেখে রাগে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে রহমান দম্পতির ওপর। পরোক্ষভাবে ওদেরকেই সরফরাজের মৃত্যুর জন্য দায়ী করে সে।

এই সময় আইডিয়াটা মাথায় আসে তার, রহমানকে ফাঁসানোর। একমাত্র রহিমা বেগমই জানে, তার ভাইপো বাঁইয়া। পিস্তলটা নিয়ে লাশের ডান হাতে রেখে দিল সে। জানালা লাগিয়ে ছিটকিনি তুলে দেয়। রহমানের একটা কাফ-লিংক ফেলে রাখে লাশের পাশে। তারপর বাইরে থেকে তালা আটকে চাবি নিয়ে চলে যায়।’

‘নাসের,’ অনেকবারের মতো আরও একবার বন্ধুর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা না করে পারলাম না। ‘সত্যিই তোমার তুলনা হয় না। সামান্য একটা রুমালের সূত্র ধরে জটিল এক রহস্যের সমাধান করে ফেললে!’

‘শুধু রুমাল নয়, সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ না থাকাটাও একটা বড় সূত্র। ঘরের সব দরজা-জানালা বন্ধ দেখেছি। তাহলে এতোগুলো সিগারেটের ধোঁয়া গেল কোথায়? সামান্য গন্ধও ছিল না ঘরে। বুঝতে অসুবিধে হলো না, আসলে ধোঁয়া আর গন্ধ বেরিয়ে যাবার পর জানালা বন্ধ করা হয়েছে। আর এখানেই ভুলটা করেছে রহিমা বেগম। জানালা খোলা থাকলেই বরং রহস্যটার সমাধান করা কঠিন হয়ে যেত। আমরা ধরে নিতাম, খুন করে জানালা দিয়ে পালিয়েছে খুনী। কিন্তু রহিমা বেগম বোঝাতে চেয়েছে, দরজা দিয়ে পালিয়েছে। চাবি নিয়ে গেছে সঙ্গে করে। তাহলে ঘরে সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ নেই কেন? বুঝলাম, সারা রাতই খোলা ছিল জানালা, ভোরের দিকে বন্ধ করা হয়েছে। ব্যাপারটাকে আরও পরিষ্কার করে দিল ভবঘুরে লোকটার সাক্ষ্য। জানালায় লোক দেখেছে সে। আরও একটা ব্যাপার, জানালা যদি না-ই খোলা থাকতো, রহমান আর সরফরাজের ঝগড়া-ঝাঁটিও কানে আসত না তার।’

‘দারুণ, দারুণ!’ পিঠ চাপড়ে দিলাম নাসেরের। ‘এখন এক কাপ চা খেলে কেমন হয়?’

‘খুব ভাল হয়,’ নাসের বললো। ‘এখন আমার রসগোল্লাও খেতে ইচ্ছে করছে।’

উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম, ‘তাহলে আর দেরি কিসের? চলো না এখুনি যাই!’

(সমাপ্ত)

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য