গণঐক্য ও কচু পাতা - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ছেলেবেলায় আমার সবচেয়ে অপছন্দের কাজ ছিল স্কুলে যাওয়া। স্কুলে না যাওয়ার জন্যে এমন কোন কাজ নেই যেটা চেষ্টা করে দেখি নি। দোয়া দরুদ পড়ে দেখেছি—সেগুলি বেশি কাজে আসত না। অসুখ বিসুখ বাধানোর চেষ্টা করে দেখেছি সেটাও লাভ হয় নি। ঠিক যখন স্কুলে যাবার সময় হত ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে দেখেছি সেটাও ভাল কাজ করে নি। এক দুইদিন পর যখন ব্যাপারটা সবাই বুঝে ফেলল, আমাকে ঘুম থেকে তুলে ঠেলে স্কুলে পাঠানো শুরু করে দিল।

খুব ছেলেবেলায় আমি মোটেও স্কুলে যেতে চাইতাম না, না গেলে যে খুব ক্ষতি হত সেটা মনে হয় সত্যি নয়। স্কুলে গিয়ে কিছু শিখেছি বলে মনে হয় নি। যতক্ষণ ক্লাস হত দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বসে থাকতাম—স্কুলের ছুটির ঘণ্টা বাজলে এক ছুটে বাসায় ফিরে এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচতাম।

স্কুলে গিয়ে আমি যে একেবারে কিছুই শিখি নি তা নয়, দুটি জিনিস শিখেছিলাম, একটা হচ্ছে গণঐক্য এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে কচুপাতার উপকারিতা। ঘটনাটা তাহলে খুলে বলা যাক।

একদিন স্কুলে গিয়ে দেখি রাত্রে বৃষ্টি হয়ে চারিদিকে পানি থৈ থৈ করছে। স্কুলের মেঝে পর্যন্ত পানিতে ভিজে চুপচুপে। তবে আমাদের কপাল খারাপ—বৃষ্টির ঝাপটা বেঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে নি, সেগুলি শুকনো খটখটে। যদি বৃষ্টিতে বেঞ্চগুলিও ভিজে যেতো আজকে আর ক্লাস করতে হত না। আমরা যখন লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাগ্যকে মেনে নিচ্ছিলাম তখন একজনের মাথায় হঠাৎ লাখ টাকার বুদ্ধি খেলে গেল। সে বলল, “চল আমরা বেঞ্চি গুলি ভিজিয়ে দিই।”

“কি ভাবে ভিজাবি?”

“সোজা! ঐ দেখ কচু পাতা। কচু পাতায় করে পানি এনে বেঞ্চের উপরে ঢেলে দেব।”

যেই কথা সেই কাজ। ক্লাসের সবাই কচুপাতা করে পানি এনে বেঞ্চের মাঝে ঢালতে লাগল, আমি যে বড় হাবাগোবা নিরীহ গোবেচারা মানুষ, আমার মাঝেও কাজ করার উৎসাহ একেবারে বান ডাকতে লাগল। আমি ছুটে ছুটে কচুপাতায় করে পানি আনতে লাগলাম। কিছুক্ষণের মাঝেই ক্লাসঘর আর প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে কোন পার্থক্য রইল না। একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করার যে কী আনন্দ সেই প্ৰথমবার আমি টের পেলাম। স্যার ক্লাসে এসে ক্লাসের অবস্থা দেখে সাথে সাথে ছুটি দিয়ে দিলেন। গণ ঐক্য এবং কচুপাতায় কী রকম বিপ্লব করে ফেলা যায় দেখে আমি একবারে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম।


কচুপাতা এর পরেও আমি খুব উপকারী একটা জিনিস হিসেবে আবিষ্কার করেছিলাম। আমার এক দুষ্টু বন্ধু সেটা ব্যবহার করেছিল নচ্ছাড় এক বন্ধুকে শায়েস্তা করতে। একদিন সে একটা কচুপাতা নিয়ে এসে বলল, “একটা ম্যাজিক দেখবি?”

“কি ম্যাজিক?”

“তিনজন এই কচুপাতায় থুতু ফেললে দেখবি থুতুর রং হয়ে যাবে নীল।”

“সত্যি?”

“বিশ্বাস না হলে দেখ—” বলে বন্ধুটি নিজে থুতু ফেলে কচুপাতাটি আমার দিকে এগিয়ে দিল। কচুপাতায় পানি সব সময় টলটল করতে থাকে, সেখানে তার থুতুও টলটল করছে। আমি সাবধানে থুতু ফেললাম। দুষ্টু বন্ধু তখন কচুপাতাটি এগিয়ে দিল নচ্ছাড় বন্ধুটি দিকে, নচ্ছাড় বন্ধু যেই মুখ এগিয়ে এসেছে থুতু ফেলার জন্যে—দুষ্ট বন্ধুটি তখন কচুপাতার থুতুটুকু ছুঁড়ে দিয়েছে তার মুখে। হতচকিত নচ্ছাড় বন্ধুটি যখন বোঝার চেষ্টা করছে কি হচ্ছে ততক্ষণে দুষ্টু বন্ধুটি ছুটতে ছুটতে পালিয়ে একেবারে দেশ ছাড়া হয়ে গেছে।

কেউ অস্বীকার করবে না কাজটা ছিল একেবারে নিচু স্তরের কাজ, কিন্তু আমরা যারা ঘটনাটি দেখেছিলাম তারা একেবারে উঁচু স্তরের আনন্দ পেয়েছিলাম। ছোট হওয়ার মজাই হচ্ছে এটা!

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য