বিচারক ভবন - ব্রাম স্টোকার

পরীক্ষা যতোই কাছে আসতে লাগলো, চিন্তা তত বাড়তে লাগলো ম্যালকমসনের। বন্ধুবান্ধবের জ্বালায় পড়ালেখা শিকেয় উঠেছে একেবারে। পড়াশোনার জন্যে এমন একটা জায়গা তার দরকার, যেখানে কেউ বিরক্ত করবে না। এ ব্যাপারে অন্য কারো পরামর্শ নেয়ার ইচ্ছাও তার হলো না। জায়গাটা সে নিজেই খুঁজে বের করবে। খুব ছোট কোনো শহর হলেই ভালো। একদিন দরকারি বইপত্রগুলো এবং কিছু কাপড়-চোপড় একটা পোর্ট ম্যান্টোতে ভরে বেরিয়ে পড়লো সে। তারপর টাইম-টেবিল খুলে সর্বপ্রথম যে জায়গার নাম চোখে পড়লো সে জায়গার টিকেট কেটে চেপে বসলো ট্রেনে।
   ঘণ্টা তিনেক পর বেনচার্চ নামের ছোট একটা স্টেশনে নেমে পড়লো সে। এখন কেউ তার টিকিটিরও নাগাল পাবে না ভেবে মনে মনে খুব খুশি। এখানকার একমাত্র সরাইখানা ‘দি গুড ট্রাভেলার’-এ উঠলো সে।
   গঞ্জমতো একটা জায়গা বেনচার্চ। হাটের দিনে লোকের আনাগোনা হয় খুব, কিন্তু অন্যান্য সময় প্রায় মরুভূমির মতো অবস্থা।
   সরাইখানাটা যথেষ্ট শান্ত। কোনো হৈ চৈ নেই। তবু মনটা খুঁতখুঁত করতে লাগলো ম্যালকমসনের। এর চেয়ে শান্ত জায়গা দরকার।
   শেষমেষ একটা জায়গা পছন্দ হলো তার। বিশাল দরজা-জানালাওয়ালা, চারদিক প্রাচীর ঘেরা দুর্গের মতো একটা বাড়ি। এ মুহূর্তে ওখানে কেউ থাকে না জেনে তার আনন্দ আরো বাড়লো। ঠিক এরকম একটা জায়গা-ই মনে মনে খুঁজছিলো ও।
   পোস্ট অফিসে খোঁজ নিয়ে জানলো, স্থানীয় এক আইনজীবী, মিঃ কার্নফোর্ড বাড়িটার দেখাশোনা করেন। দেরি না করে তাঁর সাথে দেখা করলো ম্যালকমসন। বাড়িটাতে সে থাকতে চায় শুনে যুগপৎ আশ্চর্য এবং খুশি হলেন মিঃ কার্নফোর্ড। বললেন, ‘আপনি এখানে থাকবেন জেনে খুব খুশি হলাম। কোনো ভাড়া দিতে হবে না আপনাকে। আমি চাই লোকজন দেখুক, এখানেও মানুষ বাস করতে পারে।’ ধূর্ত একটা চাহনী হানলেন তিনি। ‘বাড়িটা সম্বন্ধে অমূলক কিছু গল্প চালু আছে এখানে।’
   তবু ম্যালকমসন তিন মাসের ভাড়া আগাম দিয়ে বাড়ির চাবি নিলো। অমূলক গল্পগুলো সম্পর্কে কোনো আগ্রহ দেখালো না। তার টুকটাক কাজ করে দেওয়ার জন্যে মিসেস ডেম্পস্টার নামক এক মহিলাকে ঠিক করে দিলেন মিঃ কার্নফোর্ড।
   সরাইখানায় ফিরে মালিকের সাথে দেখা করলো ম্যালকমসন। বললো সবকিছু, শুনে চমকে উঠলো মহিলা।
   ‘বুঝেছি। বিচারক ভবনে,’ ফ্যাকাশে মুখে বললো সে।
   ‘বাড়িটার কি হয়েছে বলুন তো?’ জিজ্ঞেস করলো ম্যালকমসন। ‘নামটাই বা “বিচারক ভবন” কেন?’
   ‘একশো বছর কি তারও আগে ওখানে নাকি অত্যন্ত নিষ্ঠুর এক বিচারক বাস করতো। তুচ্ছ অপরাধেও ভয়ঙ্কর সব শাস্তির বিধান করতো লোকটা। তবে বাড়িটার দুর্নাম কেন সেটা আপনাকে পরিষ্কার করে বলতে পারবো না। অনেককে জিজ্ঞেস করেছি আমি, কিন্তু সদুত্তর দিতে পারে নি কেউ। শুধু বলে, ওখানে রহস্যময় কিছু আছে। যা হোক, ড্রিঙ্কওয়াটার ব্যাঙ্কের সমস্ত টাকা দিলেও আমি ওখানে এক ঘণ্টা থাকতে রাজি হবো না।’
   ‘মিসেস উইদাম, আমি অঙ্কের ছাত্র। এতো জটিল ব্যাপারে মাথা ঘামাতে হয় যে অন্য কিছুর দিকে খেয়াল দেয়ার অবসর পাই না। তাছাড়া আমার অঙ্কগুলোও ওই বাড়ির সেই “রহস্যময় জিনিস”-এর চেয়ে কম রহস্যময় নয়।’
   বাড়িটা ঘুরে ফিরে দেখে বিরাট ডাইনিং রুমটাতেই থাকবে বলে ঠিক করলো ম্যালকমসন। সরাইখানা থেকে জিনিসপত্র এনে ফেললো। মিসেস উইদাম ডেকে আনলো মিসেস ডেম্পস্টারকে। এই মহিলার কথাই বলেছিলেন মিঃ কার্নফোর্ড। রান্না-বান্নার জিনিসপত্র থেকে শুরু করে যাবতীয় টুকিটাকি জিনিস এনে দিলো মিসেস ডেম্পস্টার।
   ‘এই ঘরে থাকলে আমার খালি মনে হবে, চারপাশ থেকে কেউ যেন দেখছে আমাকে। আপনি থাকুন, আমি চললাম।’
   চলে গেল মিসেস উইদাম।
   মিসেস ডেম্পস্টার সাহসী মহিলা। বললেন, ‘এই বাড়ি সম্পর্কে নানা রকম গাঁজাখুরি গল্প চালু আছে। আমি ওসব বিশ্বাস করি না। এখানে ইঁদুর আছে, আছে জং ধরা কবজাগুলোর খচমচ শব্দ। শতাব্দীর পুরোনো এই বাড়ি। এতো পুরোনো একটা বাড়িতে কি ইঁদুর থাকবে না? আপনি নিঃসন্দেহে থাকুন। কোনো ভয় নেই।’
   রাতের খাবার সেরে বই খুলে বসলো ম্যালকমসন। রাত এগারোটা পর্যন্ত একটানা পড়ার পর চা খাবার জন্যে উঠলো। গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে খেয়াল করলো ইঁদুরের কিচমিচ। আর কোনো শব্দ নেই কোথাও। মিসেস ডেম্পস্টার ঠিকই বলেছে, ইঁদুর ছাড়া অন্য কিছু নেই এখানে। আরেকবার বসার আগে বাতি হাতে ঘরটা ঘুরে এলো ম্যালকমসন। সারা দেয়াল জুড়ে ওক কাঠের অভিজাত রুচির কারুকাজ। এতো সুন্দর একটা বাড়ি এতোকাল অমন অবহেলিতভাবে পড়েছিলো ভেবে আশ্চর্য হলো সে। দেয়ালে পুরোনো কিছু ছবি টানানো। ছবিগুলোর ওপরে এমন পুরু হয়ে ধুলো জমেছে যে, কার ছবি বোঝা যায় না। ফায়ারপ্লেসের ডান দিকে ছাতের বড়ো ঘণ্টাটার সাথে লাগানো ভারি, মোটা রশিটা তার নজর কাড়লো সবচেয়ে বেশি।
   পিঠ উঁচু বিশাল ওক কাঠের চেয়ারটাতে বসে আরেক কাপ চা খেলো সে। তারপর ফায়ারপ্লেসে নতুন কাঠ গুঁজে দিয়ে টেবিলে এসে বসলো।
   অঙ্ক কষতে কষতে টের পেলো চারপাশে ইঁদুরগুলোর আনাগোনা। পাত্তা দিলে না সে। ইঁদুর? ফুঃ।
   হঠাৎ মুখ তুললো ম্যালকমসন। আশ্চর্য! একদম থেমে গেছে ইঁদুরের শব্দ। অখণ্ড নিস্তব্ধতা চারপাশে। ওর মনে হলো, আচমকা থেমে গেছে ইঁদুরের শব্দ, এবং সে কারণেই ব্যাপারটা খেয়াল করেছে ও। ফায়ারপ্লেসের আগুন আবার কমে আসছে। কাঠ দেয়া দরকার। উঠলো ম্যালকমসন।
   ওক কাঠের চেয়ারটাতে একটা ইঁদুর বসে আছে। বিরাট। জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। হাত তুলে এমন একটা ভঙ্গি করলো ম্যালকমসন, যাতে পালায় ওটা। নড়াচড়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না ইঁদুরটার মধ্যে। এবার পাথর ছোঁড়ার ভঙ্গিতে হাত ওঠালো। পাত্তা দিলো না ইঁদুরটা। হিংস্রভাবে সাদা ঝকঝকে দাঁত বের করলো। যেন ভয় দেখালো ম্যালকমসনকে।
   একটু অবাক হলো সে। একটা ডাণ্ডা নিয়ে ছুটে গেল মারার জন্য। চেয়ারের ওপর থেকে লাফ দিলো ইঁদুরটা। সোজা রশি বেয়ে উঠে অদৃশ্য হয়ে গেল। প্রায় সাথে সাথে ইঁদুর পালের কোলাহল শুরু হয়ে গেলো আবার। এবার বেশ জোরে-শোরে।
   প্রথম ভোরের মোরগের ডাক, সম্বিত ফিরিয়ে আনলো ম্যালকমসনের। সোজা বিছানা। ঘুম।
   এমন গভীর ঘুম ঘুমালো যে, মিসেস ডেম্পস্টার এসে সমস্ত ঘর সাফ-সুতরো করে টেবিলে নাস্তা না দেয়া পর্যন্ত জাগলো না সে। ওঠার পরও ক্লান্তি গেল না। গতরাতে পরিশ্রমটা বেশি হয়ে গেছে। কড়া এক কাপ চা অবশ্য অনেকটা অবসাদ দূর করে দিলো।
   নাস্তার পর গোটাকয়েক স্যান্ডউইচ আর বই নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোলো সে। শহরের বাইরে সুন্দর নিরিবিলি একটা জায়গা পেয়ে গেল। চারপাশে বিশাল সব এল্ম্ গাছ। সেখানে বসে কিছুক্ষণ লেখাপড়া করার পর উঠলো। এবার ফিরতে হয়। ফেরার পথে সরাইখানায় গিয়ে দেখা করলো মিসেস ইউদামের সাথে। ওকে দেখে খুব আনন্দিত হলো মিসেস ইউদাম।
   ‘এতোটা খাটুনি কিন্তু শরীরের পক্ষে ভালো নয় স্যার। এক রাতেই কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছেন আপনি। যাই হোক, আশা করি ভালোভাবেই কেটেছে রাতটা। মিসেস ডেম্পস্টার যখন বললো আপনাকে গভীরভাবে ঘুমাতে দেখেছে, আমি তো অবাক।’
   ‘হ্যাঁ, ভালোই কেটেছে রাতটা,’ একটু হেসে উত্তর দিলো ম্যালকমসন। ‘রহস্যময় কিছু দেখতে পাইনি অবশ্য। তবে হ্যাঁ, সারা দেশের ইঁদুরের অর্ধেকটা বুঝি আছে ওখানে। একটা বুড়ো শয়তান আছে। চেয়ারের ওপর বসে ছিলো। আমি ডাণ্ডা নিয়ে মারতে যেতেই রশি বেয়ে পালিয়েছে।’
   পৃথিবীতে রাতের পরে আসে দিন। দিনের পিছু পিছু আসে রাত। বেনচার্চেও তার ব্যতিক্রম হলো না।
   ইঁদুরের গণ্ডগোলটা শুরু হলো সন্ধ্যার পর পরই। গত রাতের চেয়ে বেশি আজ। সাহস বেড়েছে যেন। আনাচে-কানাচে অন্ধকারের মধ্যে ক্ষুদে তারার মতো জ্বল জ্বল করে জ্বলছে ওদের চোখ। ম্যালকমসন আর ইঁদুর পালের মধ্যে যেন বেশ একটা খেলা শুরু হয়ে গেছে। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে হুশ, হুশ করে ইঁদুর তাড়ালো সে। রাতের প্রথম ভাগটা কাটলো এভাবেই।
   পড়তে পড়তে হঠাৎ খেয়াল করলো ম্যালকমসন, থেমে গেছে ইঁদুরের কিচমিচ। কোথাও কোনো শব্দ নেই। যাদুমন্ত্রে যেন উধাও হয়ে গেছে ইঁদুরগুলো।
   হঠাৎ করে গত রাতের কথা মনে পড়লো ম্যালকমসনের। সোজা তাকালো ফায়ারপ্লেসের পাশে বিশাল পিঠ উঁচু চেয়ারটার দিকে।
   সেই ধাড়ি ইঁদুরটা বসে আছে। তেমনি জ্বলজ্বল করছে চোখ।
   হাতের কাছে লগারিদমের একটা বই পেয়ে সেটাই ছুঁড়ে মারলো। লক্ষ্যভ্রষ্ট। গা করলো না ইঁদুরটা। যেমন ছিলো তেমন বসে রইল। অতএব আবার সেই ডাণ্ডা হাতে দাবড়ি, মেঝেতে লাফ দিয়ে পড়ে ধাড়িটার রশিপথে অদৃশ্য হওয়া এবং সাথে সাথে আবার শুরু, থেমে যাওয়া ইঁদুর বাহিনীর কোলাহল। গতরাতের প্রত্যেকটা ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটলো আজও।
   ঘড়ি দেখলো ম্যালকমসন। পৌনে বারোটা বাজে। যথেষ্ট কাজ হয়েছে। একটা সিগারেট ধরানো যাক এবার। আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে তাবৎ বইগুলো এক জায়গায় জড়ো করলো সে। তারপর রশিটা টেবিলের ওপর এনে রাখলো। এবার ইঁদুরটা এলে কেমন করে দড়ি বেয়ে ওঠে দেখা যাবে।
   আবার কিছুক্ষণ পড়ার পর মনে হলো, অস্বস্তিকর কিছু একটা ঘটছে। কবরের মতো নিস্তব্ধতা? না। তাহলে? খেয়াল করে দেখলো রশিটা একটু একটু নড়ছে। তাকাতেই দেখে, আবার ফিরে এসেছে বদমাশটা। রশি বেয়ে কিছুটা নামার পর এক লাফে সেই ওক কাঠের চেয়ারটায় গিয়ে বসলো। তাকালো জ্বলন্ত চোখে।
   একের পর এক বইগুলো ছোঁড়া শুরু করলো ম্যালকমসন। প্রত্যেকটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। ইঁদুরটাও দিব্যি বসে রইলো। শেষমেষ মোটা একটা বই নিয়ে তাড়া করতে, একটু ভয় পেলো যেন। একলাফে মেঝেতে পড়লো ইঁদুরটা। মেঝে ঘুরে এসে উঠলো পড়ার টেবিলে। আরেক লাফে পড়লো রশিতে, সড়সড় করে উঠে অদৃশ্য হয়ে গেলো দেয়ালের একটা ছবির পেছনে। ম্যালকমসন খেয়াল করলো, ফায়ারপ্লেসের ডান হাতি তৃতীয় ছবিটার পেছনে লুকালো ইঁদুরটা।
   আবার এসে টেবিলে বসলো সে। ইঁদুরগুলোর আনাগোনা টের পাওয়া যাচ্ছে। হঠাৎ করে তার মনে হলো: বিশাল এই বাড়িতে সে একা, ইঁদুরগুলো যেন তার সাথী। এ ধরনের চিন্তা করে খুশি হতে চেষ্টা করলো সে। কিন্তু দূর হলো না অস্বস্তিকর অনুভূতিটা।
   ভোরের আলো জানালা দিয়ে ঢুকে পড়তে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো ম্যালকমসন। ঘুম নেমে এলো প্রায় সাথে সাথেই। ঘুমের মধ্যেও অস্বস্তির হাত থেকে রেহাই পেলো না। স্বপ্ন দেখলো একের পর এক। উদ্ভট সব স্বপ্ন। কোনোটারই মাথামুণ্ডু নেই।
   অনেক বেলায় মিসেস ডেম্পস্টার ঘুম থেকে ডেকে তুললো ম্যালকমসনকে। ভীষণ অসুস্থ লাগছে শরীরটা। কেমন একটা ঘোর ঘোর ভাব মাথার ভেতর। ‘মিসেস ডেম্পস্টার,’ বললো সে, ‘দেয়ালের বড়ো ছবিগুলো একটু ধুয়ে মুছে সাফ করবেন। বিশেষ করে ফায়ারপ্লেসের ডান হাতি তৃতীয় ছবিটা। ছবিগুলো কার, আমি দেখবো।’
   বিকেলের দিকে মাথা পরিষ্কার হয়ে গেল ম্যালকমসনের। গত দু’দিনে যে অঙ্কগুলো করতে পারেনি সেগুলো পানির মতো করে ফেললো। পরীক্ষাটা তাহলে ভালোমতোই দেয়া যাবে, ভাবলো সে।
   সন্ধ্যার আগে আগে মিসেস উইদামের সাথে দেখা করতে গেল সরাইখানায়। আরেকজন ভদ্রলোক বসে আছেন তার সাথে। নিজের পরিচয় দিলেন—ডাঃ থর্নহিল।
   একের পর এক অনেক প্রশ্ন করলেন ডাঃ থর্নহিল। কোনো উত্তর না দিয়ে মুচকি হাসলো ম্যালকমসন, ‘আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দেবো, যদি আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দেন।’
   ‘বলুন।’
   ‘আপনাকে নিশ্চয়ই মিসেস উইদাম ডেকে এনেছে?’
   ‘হ্যাঁ।’ ধরা পড়ে বোকার মতো মাপা হাসলেন তিনি, ‘মিসেস উইদাম অবশ্য আপনার ভালো চায় বলেই আমাকে ডেকেছে। আপনি নাকি খুব বেশি রাত জাগেন আর ভীষণ কড়া চা খান। এতো রাত জাগা কি শরীরের পক্ষে ভালো?’
   ‘ঠিক আছে, আজ থেকে আমি আর রাত জাগবো না।’
   ‘আপনি যুবক। শরীরের রক্ত গরম। গত দু’রাতে কি কিছুই ঘটে নি?’
   সংক্ষেপে গত দু’রাতের ঘটনা বর্ণনা করলো ম্যালকমসন।
   ‘ইঁদুরটা প্রতিবার রশি বেয়ে ওঠে। আপনি কি জানেন, ওটা কিসের রশি?’
   ‘নাহ্!’
   ‘জজের কঠোরতম আদেশ বাস্তবায়নে ওটার দরকার পড়ে।’
   ‘আপনি বলতে চাইছেন, ফাঁসির?’
   উত্তরে কিছু বললেন না ডাক্তার। এমন জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে থাকলেন, যার পর আর ‘হ্যাঁ’ বলতে হয় না।
   ‘কলেজে পড়ার সময় আমি খুব ভালো ছাত্র ছিলাম। পরীক্ষার পড়ার জন্যে কেমন পরিবেশের দরকার তা আমি জানি। দু’রাত থাকলেন, যথেষ্ট হয়েছে। কাছেই আমার বাড়ি। চলুন সেখানে। যে ক’দিন ইচ্ছা থাকবেন, চেষ্টা করবো, কেউ যেন আপনার পড়াশুনায় কোনোরকম ব্যাঘাত না ঘটায়।’
   ‘অনেক ধন্যবাদ। আমি ওখানেই ভালো আছি। তেমন ভূতপ্রেত কিছু দেখলে, রশির সাথে একটা ঘণ্টা তো বাঁধাই আছে। ঘণ্টা বাজিয়ে আপনাদের জানাবো।’ হো হো করে হেসে উঠলো সে।
   ম্যালকমসনের অট্টহাসি ডাক্তারের অটল গাম্ভীর্যে একটুও ফাটল ধরাতে পারলো না। কোনো কথা না বলে চলে গেলেন তিনি।
   রাতে ঘণ্টাখানেক পড়ার পর বাতাসের ফিসফিসানি শুরু হলো। ক্রমে তা রূপান্তরিত হলো দাপাদাপিতে। যদিও বাড়িটা যথেষ্ট মজবুত তবু সমস্ত বাড়ি থরথরিয়ে কাঁপতে লাগলো ঝড়ের দাপটে। চারদিকে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ কেমন একটা অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি করলো। রাশিটা মেঝেতে সট সট করে শব্দ করছে, পাকাচ্ছে সাপের মতো। ওটাতে যেন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
   হঠাৎ দেখলো ম্যালকমসন, রশি বেয়ে কিছুদূর নেমে এসেছে সেই ধাড়ি ইঁদুরটা। গা ছমছম করে উঠলো তার। জ্বলন্ত চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে আবার রশি বেয়ে উঠে অদৃশ্য হয়ে গেল ইঁদুরটা। মনে পড়লো, ফায়ারপ্লেসের ডান হাতি তৃতীয় ছবি।
   ঘরে দু’টো বাতি আছে। একটা শেড দেয়া, একটা শেড ছাড়া। শেড ছাড়া বাতিটা হাতে নিয়ে দু’টো চেয়ার জোড়া দিয়ে উঠে পড়লো ম্যালকমসন। সবগুলো ছবিই এখন পরিষ্কার। তৃতীয় ছবিটার সামনে বাতি ধরতেই আঁতকে উঠে পিছিয়ে এলো সে।
   আরেকটু হলেই বাতিটা পড়ে যাচ্ছিলো হাত থেকে। ছবির কোণ থেকে ঠিক এই সময় উঁকি দিলো ইঁদুরটা। মুহূর্তের মধ্যে সারা গা ঘেমে উঠলো তার। ম্যালকমসন যুবক। ভয় কাটিয়ে উঠলো দ্রুত। একটু থেমে, আবার দেখতে লাগলো ছবিটা।
   ছবিটা একজন বিচারকের। বেজির চামড়ার লাল টকটকে রোব পরে বসে আছেন। দৃঢ় চোয়াল। দয়ামায়াহীন, ধূর্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ চেহারা। দেখলেই মনে হয় কামুক। শিকারী পাখির মতো বাঁকানো লালাভ নাক। চোখ দু’টো অদ্ভুত ঝকঝকে, ভয়ঙ্কর চাহনি তাতে। চোখের দিকে তাকানোর সাথে সাথে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এলো ম্যালকমসনের। চোখের মণি দুটো ঠিক সেই ধাড়ি ইঁদুরটার মতো।
   পাথরের ফায়ারপ্লেসের ধারে বিশাল পিঠ উঁচু ওক কাঠের চেয়ারে বসে আছে বিচারক। ছাত থেকে মোটা একটা রশি নেমে মেঝেতে জড়িয়ে আছে। এই ঘরেরই ছবি।
   আতঙ্কিত অবস্থায় চেয়ারটার দিকে তাকাতেই হাত থেকে বাতি পড়ে গেল তার। চেয়ারে বসে আছে ধাড়ি ইঁদুরটা। জ্বলছে চোখ দুটো।
   মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না ম্যালকমসন। ইঁদুরটা ওখানে গেল কি করে? সে তো সবসময় তাকিয়ে ছিলো ছবিটার দিকে!
   বাইরে ঝড়ের তাণ্ডব চলছেই। সেই সাথে শুরু হলো বৃষ্টি। মুষলধারে। জানালার ওপারে বৃষ্টির সাদা ঘন পর্দা যেন বেনচার্চ থেকে আলাদা করে দিলো এই বিচারক ভবনকে।
   খুব শক্ত ধাতুর তৈরি বলে মেঝেতে পড়েও বাতিটা ভাঙেনি বা আলো নিভে যায় নি।
   না, না, এসব চলবে না। নিজেকেই নিজে শাসন করলো ম্যালকমসন। এসব চলতে দিলে সে পাগল হয়ে যাবে শিগগির। হতে পারে তার এক মুহূর্তের অমনোযোগের সুযোগ নিয়ে নেমে গেছে ইঁদুরটা। তাতে এত ভয় পাওয়ার কি আছে?
   কিছুটা ধাতস্থ হলো ম্যালকমসন। আবার পড়াশোনা। ঘণ্টাখানেক পর মাথা তুললো। ঝড়ের শব্দ থেমে গেছে। বৃষ্টিরও। হঠাৎ মৃদু একটা শব্দ শুনতে পেলো সে। কান পাতলো। মনে হচ্ছে বড় ঘণ্টাটা বাতাসে নড়ছে, ফলে রশিটাও নড়ে সরসর শব্দ করছে মেঝেতে। ওপর দিকে তাকিয়ে দেখলো, ধাড়ি ইঁদুরটা রশির গোড়া কেটে দিচ্ছে। কাটা প্রায় শেষ। একটু পরেই ঘণ্টা থেকে খসে পড়লো ভারি রশিটা। আরেকটা আতঙ্ক পেয়ে বসলো ওকে। বাইরের সাথে ওর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল পুরোপুরি। ঘণ্টা বাজিয়ে কাউকে ডাকা আর সম্ভব নয়।
   সমস্ত রাগ গিয়ে পড়লো ইঁদুরটার ওপর। একটা বই নিয়ে তেড়ে গেল ম্যালকমসন। পালালো ওটা। মিশে গেল ঘরের অন্ধকার কোণে।
   একটা মাত্র ইঁদুর ক’দিন থেকে তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে চিন্তা করতেও খারাপ লাগলো ম্যালকমসনের। আজকের মতো যথেষ্ট হয়েছে। এখন ঘুম দেয়া যাক। ঘরের এখানে-সেখানে ছোপ ছোপ অন্ধকার। শেড দেয়া বাতিটার শেড খুলে নিতেই আলোয় ভরে গেল সারাঘর। দেয়ালের ছবিগুলোও স্পষ্ট হয়ে উঠলো। ফায়ারপ্লেসের ডান হাতি তৃতীয় ছবিটার দিকে চোখ পড়লো ম্যালকমসনের। আশ্চর্য হয়ে চোখ মুছলো একবার। মাথার পেছনে সরসর করে দাঁড়িয়ে গেল সব ক’টা চুল।
   ছবিটার বাদামী কাপড় ঝকঝক করছে, প্রায় নতুনের মতো। ব্যাকগ্রাউন্ডে চেয়ার, রশি, সবই আছে। কিন্তু বিচারকের দেহটি অদৃশ্য।
   আতঙ্কের চোটে কণ্ঠ তালু শুকিয়ে গেলো। মাথার ভেতর দপ দপ, বুকের খাঁচা ছেড়ে এখনি যেন বেরিয়ে যাবে দম, চিন্তাশক্তিও লোপ পেলো। শুধু শ্রুতি এবং দৃষ্টি কাজ করছে। আস্তে আস্তে পেছন দিকে মাথা ঘোরালো ম্যালকমসন।
   সেই পিঠ উঁচু চেয়ারটিতে বসে আছে বিচারক। কুটিল, প্রতিহিংসাপরায়ণ জ্বলন্ত চোখ। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। বিজয়ীর। হাতে একটা কুচকুচে কালো টুপি।
   ম্যালকমসনের সমস্ত রক্ত যেন শুষে নিয়েছে কেউ। কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ। ঘড়ির দিকে তাকালো সে। বারোটা বাজতে এক মিনিট বাকি।
   বারোটা বাজলো। কালো টুপিটা মাথায় চাপালো বিচারক। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো। মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিলো রশিটা। এমনভাবে ধরলো যেন সেটা তার সবচেয়ে পছন্দের জিনিস। ধীরে ধীরে রশিটার একপাশ গেরো দিয়ে ফাঁস তৈরি করলো বিচারক। পা তুলে দিয়ে টেনে দেখলো, কতটা শক্ত হয়েছে। খুশি হয়ে এবার এগোল ম্যালকমসনের দিকে। চোখে চোখ রেখে পাশ কাটালো। দাঁড়ালো দরজার সামনে। বুঝতে বাকি রইলো না ম্যালকমসনের, ফাঁদে পড়ে গেছে সে। হঠাৎ করেই ম্যালকমসনের কণ্ঠ লক্ষ্য করে রশির ফাঁস ছুঁড়ে দিলো বিচারক।
   তড়িৎ গতিতে মাথা সরিয়ে নিলো ম্যালকমসন। শব্দ করে মেঝের ওপর পড়লো ফাঁসটা। আবার চেষ্টা করলো বিচারক। আবার মাথা সরিয়ে নিলো ম্যালকমসন। এই রকম চললো আরো অনেকবার। প্রত্যেকবারই এঁকেবেঁকে রক্ষা পেলো ম্যালকমসন। কিন্তু বার বার পরাজিত হয়েও হাল ছাড়লো না বিচারক। এই সময় ম্যালকমসন দেখলো: দেয়াল, ঘণ্টার আশেপাশে, ঘরের আনাচে-কানাচে হাজার হাজার, লাখ লাখ ইঁদুর।
   এবার বিচারকের চোখে ভর করলো নারকীয় দৃষ্টি। মণি দু’টো জ্বলতে লাগলো গনগনে কয়লার মতো। ম্যালকমসনের মনে হলো, তার পায়ে শেকড় গজিয়েছে। বিচারক এলো। ধীরে সুস্থে ফাঁস পরালো তার গলায়। ছোট্ট একটা শিশুর মতো ম্যালকমসনকে তুলে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করলো ওকে কাঠের চেয়ারটার ওপর। তারপর হাত তুলে ঘণ্টার সঙ্গে বেঁধে দিলো রশিটা। হাত তোলার সাথে সাথে অদৃশ্য হলো সব ক’টা ইঁদুর। গলায় ফাঁসটা আরো আঁটো সাটো করে পায়ের নিচে থেকে ঠেলে সরিয়ে দিলো চেয়ারটা।

***

তারস্বরে বিচারক ভবনের অ্যালার্ম বেল বেজে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল লোক হাজির। বিভিন্ন রকমের আলো তাদের হাতে। দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিয়েও কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে দরজা ভেঙে ফেললো তারা। পিল পিল করে ঢুকলো সবাই। সবার সামনে ডাক্তার সাহেব। মিসেস উইদামকেও দেখা গেলো। সবাই দেখলো রশির প্রান্তে, ঘণ্টার গোড়ায় ঝুলছে হতভাগ্য ছাত্রটির দেহ।
   দেয়ালে বিচারকের ছবিটি তেমনি আছে। মুখে লেপটে আছে এক টুকরো ক্রুর হাসি। বিজয়ীর।

( সমাপ্ত )

রূপান্তর : খসরু চৌধুরী
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য