রূপালী মাকড়সা - পর্ব : ১

প্রথম প্ৰকাশঃ নভেম্বর, ১৯৮৫

‘আরে, আরে! হ্যানসন!’ চেঁচিয়ে উঠল রবিন মিলফোর্ড।
    ‘আরে লাগল...লেগে গেল তো...!’ প্ৰায় একই সঙ্গে বলে উঠল মুসা আমান।
    বনবন স্টিয়ারিং ঘোরাল হ্যানসন, ব্রেক কষল ঘ্যাঁচ করে। পেছনের সিটে উল্টে পড়ল তিন গোয়েন্দা। টায়ারের কৰ্কশ আওয়াজ তুলে চকচকে একটা লিমোসিনের কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে পড়ল বিশাল রোলস রয়েস।
    চোখের পলকে লিমোসিন থেকে বেরিয়ে এল কয়েকজন লোক। ড্রাইভিং সিট থেকে সবে নামছে হ্যানসন। তাকে এসে ঘিরে ফেলল। আঙুল তুলে শাসানোর ভঙ্গি করছে, উত্তেজিত। কথা বলছে অদ্ভুত ভাষায়।
    লোকগুলোকে পাশ কাটিয়ে গেল হ্যানসন। গাড়িতেই বসে আছে লিমোসিনের শোফার। লাল পোশাক, কাঁধ আর হাতার কাছে সোনালি কাজ করা।
    ‘এই যে মিস্টার,’ বলল হ্যানসন, ‘এটা কি করলে? দিয়েছিলে তো মেরে!’
    ‘আমি ঠিকই চালাচ্ছিলাম!’ উদ্ধত কণ্ঠ লোকটার। ‘দোষ তোমার! সামনে পড়লে কেন? প্রিন্স দিমিত্রির গাড়ি দেখেছ, সরে যেতে পারনি?’
    ইতিমধ্যে সামলে নিয়েছে তিন গোয়েন্দা। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে লোকগুলোর দিকে। উত্তেজিত হয়ে প্রায় আস্ফালন শুরু করেছে হ্যানসনকে ঘিরে। ওদের মাঝে সবচেয়ে লম্বা লোকটা ইংরেজিতে বলে উঠল, ‘বুদ্ধু কোথাকার! দিয়েছিলে তো প্রিন্সকে শেষ করে! সর্বনাশ করে দিয়েছিলে আরেকটু হলেই! তোমার শাস্তি হওয়া দরকার!’
    ‘আমি ঠিকই মেনেছি, আপনাদের ড্রাইভারই ট্রাফিক আইন মানেনি,’ দৃঢ় গলায় বলল হ্যানসন। ‘পুরোপুরি ওর দোষ।’
    ‘কি প্রিন্স প্রিন্স করছে ওরা!’ রবিনের কানের কাছে বিড়বিড় করল মুসা। দু’জনেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে এক জানালার ওপর।
    ‘খবরের কাগজ পড় নাকি?’ নিচু গলায় বলে উঠল রবিন। ‘ইউরোপের ভ্যারানিয়া থেকে এসেছে। পৃথিবীর সব চেয়ে ছোট সাতটা দেশের একটা। আমেরিকা দেখতে এসেছে।’
    ‘খাইছে!’ কিশোরের মুখে শোনা বাঙালী বুলি ঝাড়ল মুসা। ‘আরেকটু হলেই তো গেছিল!’
    ‘দোষটা হ্যানসনের নয়!’ এই প্রথম কথা বলল কিশোর পাশা। ‘চল নামি। সত্যিই কার দোষ, ওদেরকে বুঝিয়ে দেয়া দরকার।’
    তাড়াহুড়া করে নেমে এল তিন গোয়েন্দা। তাদের পর পরই লিমোসিনের পেছনের সিট থেকে নেমে এল আরেক কিশোর। রবিনের চেয়ে সামান্য লম্বা। কুচকুচে কালো চুল, লম্বা করে ইউরোপিয়ান ছাঁদে কাটা। বছর দুয়েকের বড় হবে। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ।
    ‘থাম তোমরা!’ নিজের লোকদের ধমক লাগাল সে। সঙ্গে সঙ্গেই চুপ হয়ে গেল লোকগুলো। হাত নাড়তেই ঝটপট পেছনে সরে গেল ওরা। হ্যানসনের কাছে এগিয়ে এল ছেলেটা। ‘ওদের হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি,’ চমৎকার শুদ্ধ ইংরেজি। ‘আমার শোফারেরই দোষ।’
    ‘কিন্তু, ইয়োর হাইনেস...’ বলতে গিয়েও বাধা পেয়ে থেমে গেল লম্বা লোকটা। হাত নেড়ে থামিয়ে দিয়েছে তাকে প্রিন্স দিমিত্রি। ফিরে চাইল তিন গোয়েন্দার দিকে।
    ‘কাজটা খুব খারাপ হয়ে গেছে,’ বলল প্রিন্স। ‘দুঃখিত। তোমাদের ড্রাইভার খুব ভাল, তাই রক্ষে। নইলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যেত!...বাহ্, গাড়িটা তো খুব সুন্দর!’ রোলস রয়েসটা দেখিয়ে বলল। কিশোরের দিকে তাকাল। ‘মালিক কে? তুমি?’
    ‘ঠিক মালিক নই,’ বলল কিশোর। ‘তবে মাঝেমধ্যে মালিকের মতই ব্যবহার করি।’ রোলস রয়েস কি করে পেয়েছে ওরা, কতদিনের জন্য, সব কিছু ব্যাখ্যা করে বলার সময় এটা নয়।
    কঙ্কাল দ্বীপ অভিযানের রিপোর্ট দিতে গিয়েছিল তিন গোয়েন্দা মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফারের অফিসে। ওখান থেকে ফেরার পথেই এই অঘটন।
    ‘আমি দিমিত্রি দামিয়ানি, ভ্যারানিয়া থেকে এসেছি,’ নিজের পরিচয় দিল রাজকুমার। ‘এখনও প্রিন্স পদবী পাইনি। তবে আগামী মাসেই অভিষেক অনুষ্ঠান হবে। আমার লোকেরা জানে, আগে হোক পরে হোক, প্রিন্স আমিই হব, তাই ছোটবেলা থেকেই ওই নামে ডাকে। তোমরা কি পুরোদস্তুর আমেরিকান?’
    ‘পুরোদস্তুর’ বলে কি বোঝাতে চাইছে দিমিত্রি, বুঝতে পারল না রবিন আর মুসা। চুপ করে রইল।
    জবাব দিল কিশোর। ‘ওরা দু’জন আমেরিকান,’ দুই বন্ধুকে দেখিয়ে বলল সে। ‘এখন আমিও তাই। বাবা এখানকার ন্যাশন্যালিটি পেয়ে গিয়েছিল। তবে, আসলে আমি বাঙালী, বাংলাদেশী।’
    পরস্পরের দিকে চেয়ে হাসল রবিন আর মুসা। জীবনে কখনও চোখেও দেখেনি, তবু বাংলাদেশকে কতখানি ভালবাসে কিশোর পাশা, জানা আছে তাদের। তাই তার কথায় আহত হল না। আর তাছাড়া তেমন আহত হবার কোন কারণও নেই। ওরাও পুরোপুরি আমেরিকান নয়। একজনের রক্তে রয়েছে আইরিশ রক্তের মিশ্রণ, আরেকজনের দাদার বাবা ছিল খাঁটি আফ্রিকান।
    পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে বাড়িয়ে ধরল কিশোর। ‘আমাদের পরিচয়।’
    কার্ডটা নিল দিমিত্রি।
‘তিন গোয়েন্দা’
???
প্রধানঃ কিশোর পাশা
সহকারীঃ মুসা আমান
নথি গবেষকঃ রবিন মিলফোর্ড
    অপেক্ষা করে রইল তিন গোয়েন্দা। কার্ড দেখে নতুন সবাই যা করে, তাই হয়ত করবে দিমিত্রি। প্রথমেই প্রশ্ন করবে, প্রশ্নবোধকগুলোর মানে কি।
    ‘ব্রোজাস!’ বলে উঠল দিমিত্রি। হাসল। সুন্দর করে হাসে রাজকুমার। ঝকঝকে সাদা দাঁত, মুসার মত। তবে মাড়ি বাদামী নয়, টুকটুকে লাল, ঠোঁটও তাই। ‘ও, শব্দটার মানে বোঝনি? ভ্যারানিয়ান ভাষায় এর মানে, চমৎকার। তা, এই প্ৰশ্নবোধকগুলো নিশ্চয় তোমাদের প্রতীক চিহ্ন?’
    নতুন চোখে রাজকুমারের দিকে তাকাল তিন গোয়েন্দা। না, যা ভেবেছিল, তা নয়। অনেক বেশি বুদ্ধিমান। দিমিত্রির প্রতি শ্ৰদ্ধা বাড়ল ওদের।
    পকেট থেকে কার্ড বের করল দিমিত্রি। বাড়িয়ে দিল তিন গোয়েন্দার দিকে। ‘এটা আমার কার্ড।’
    কার্ডটা নিল কিশোর। দু’পাশ থেকে তার গা ঘেঁষে এল রবিন আর মুসা, দেখার জন্যে। ধবধবে সাদা, চকচকে মসৃণ কার্ডটায় কালো কালিতে ছাপাঃ দিমিত্রি দামিয়ানি। নামের ওপরে একটা ছবি, উজ্জ্বল রঙে ছাপা। সোনালি জালের মাঝখানে বসে আছে একটা রূপালী মাকড়সা, এক পায়ে ধরে রেখেছে তলোয়ার। ছোট্ট ছবিতে এতগুলো ব্যাপার নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা খুব মুশকিল, তবু যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে শিল্পী।
    ‘রূপালী মাকড়সা,’ বলল রাজকুমার। ‘আমার, মানে ভ্যারানিয়ান রাজবংশেরই প্রতীক চিহ্ন এটা। নিশ্চয় অবাক হচ্ছ, একটা মাকড়সা কি করে এত সম্মান পায়? সে অনেক লম্বা চওড়া কাহিনী, এখন বলার সময় নেই।’ একে একে তিন গোয়েন্দার সঙ্গে হাত মেলাল দিমিত্রি। ‘তোমাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব খুশি হয়েছি।’
    লিমোসিনের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে একটা কালো গাড়ি, প্রায় নিঃশব্দে। উত্তেজনা আর গোলমালে খেয়ালই করেনি তিন গোয়েন্দা। ওটা থেকে নামল এক তরুণ। হালকা-পাতলা, সুন্দর চেহারা। চোখে সদাসতর্কতা। ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল সে। এতক্ষণে দেখতে পেল তিন গোয়েন্দা, আমেরিকান যুবককে।
    ‘মাফ করবেন, ইয়োর হাইনেস,’ বলল যুবক। ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের। এখনও অনেক কিছুই দেখা বাকি।’
    ‘হোক বাকি,’ বলল দিমিত্রি। ‘এদের সঙ্গে কথা বলতেই বেশি ভাল লাগছে আমার। এই প্রথম আমেরিকান ছেলেদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি।’
    তিন গোয়েন্দার দিকে ফিরল আবার রাজকুমার। ‘আচ্ছা, শুনেছি, ডিজনিল্যান্ড নাকি এক আজব জায়গা! দেখার অনেক কিছু আছে। ওখানে যাবার খুব ইচ্ছে আমার। তোমরা কি বল?’
    ডিজনিল্যান্ড সত্যিই একটা দেখার মত জায়গা, একবাক্যে স্বীকার করল তিন গোয়েন্দা। ওটা না দেখলে মস্ত ভুল করবে দিমিত্রি এটাও জানাল।
    ‘বডিগার্ডেরা সারাক্ষণ ঘিরে আছে, মোটেই ভাল লাগে না আমার,’ বলল রাজকুমার। ‘খুব বেশি বাড়াবাড়ি করে ডিউক রোজার, আমার গার্জেন, ভ্যারানিয়ার রিজেন্ট এখন। আমাকে চোখে চোখে রাখার নির্দেশ দিয়ে দিয়েছে গার্ডদের। যেন, অন্য কেউ আমার কাছে ঘেঁষলেই সর্দি লেগে মরে যাব! যত্তসব!...লোকের যেন আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, খালি আমাকে মারার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে! ভ্যারানিয়ার কোন শত্ৰু নেই, তারমানে আমারও নেই। কে আমাকে মারতে আসবে? খামোকা ঝামেলা!’
    ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক কথা বলে ফেলল দিমিত্ৰি। চুপ করে গেল হঠাৎ। নীরবে দেখল তিন গোয়েন্দাকে। এক মুহূর্ত ভাবল কি যেন! তারপর বলল, ‘তোমরা, ডিজনিল্যান্ড যাবে আমার সঙ্গে? তোমাদের তো সব চেনা, দেখাবে আমাকে? খুব খুশি হব। বডিগার্ডের বদলে বন্ধুরা সঙ্গে থাকলে দেখেও মজা পাব অনেক বেশি। চল না!’
    দিমিত্রির হঠাৎ এই অনুরোধে অবাক হল তিন গোয়েন্দা। দ্রুত আলোচনা করে নিল নিজেদের মাঝে। সারাটা দিন পড়ে আছে সামনে, কিছুই করার নেই তেমন। দিমিত্রির অনুরোধ রক্ষা করা যায় সহজেই। বরং ভালই লাগবে ওদের।
    রোলস রয়েসে টেলিফোন রয়েছে। স্যালভেজ ইয়ার্ডে মেরি চাচীকে ফোন করল কিশোর। জানাল, ওর ফিরতে দেরি হবে। সোনালি রিসিভারটা ক্ৰেডলে রেখে ফিরে চাইল। অবাক চোখে তাকিয়ে আছে দিমিত্রি।
    লিমোসিনে গিয়ে উঠে বসল দিমিত্ৰি। বন্ধুদের ডাকল।
    রাজকুমারের গাড়িতেই যেতে পারবে তিন গোয়েন্দা। হ্যানসনকে রোলস রয়েস নিয়ে চলে যেতে বলল কিশোর। তারপর গিয়ে উঠে বসল লিমোসিনে। মুসা আর রবিনও উঠল। সামনে শোফারের পাশে বসেছে লম্বা লোকটা।
    কালো গাড়িটায় উঠল অন্যরা। গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে বসতে হল। গাড়িটা আমেরিকান সরকারের। প্রিন্সের গাড়িকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে সঙ্গে দেয়া হয়েছে।
    ‘খুব রাগ করবেন, ডিউক রোজার,’ মুখ গোমড়া করে রেখেছে লম্বা লোকটা। ‘ঝুঁকি নিতে নিষেধ করেছেন তিনি।’
    ‘কোন ঝুঁকি নিইনি, লুথার,’ কড়া গলায় বলল দিমিত্রি। ‘তাছাড়া ডিউক রোজারের আদেশ মানতে আমি বাধ্য নই। আমার আদেশ মেনে চলার সময় এসে গেছে তার। আর মাস দুয়েক পরই রাজ্য শাসন করব আমি। আমার কথাই তখন আইন, তার নয়।’ শোফারকে বলল, ‘রিগো, খুব সাবধানে চালাবে। এটা তোমার ভ্যারানিয়া নয়, যে প্রিন্সের গাড়ি দেখলেই রাস্তা ছেড়ে দেবে লোকে। ট্রাফিক আইন মেনে চলবে পুরোপুরি। আর কোনরকম অঘটন চাই না আমি!’
    বিদেশী ভাষায় একনাগাড়ে কথা বলে গেল ডিউক লুথার। মুখচোখ কালো। মাথা ঝোঁকাল শোফার। গাড়ি ছেড়ে দিল।
    মসৃণ গতিতে এগিয়ে চলেছে লিমোসিন, গতি মাঝারি। কোনরকম গোলমাল করল না আর শোফার। ঠিকঠাক মেনে চলল সব ট্রাফিক আইন। খুব সর্তক।
    পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগল ডিজনিল্যান্ডে পৌঁছাতে। সারাটা পথ তিন গোয়েন্দাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে এসেছে দিমিত্রি। আমেরিকা, বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া সম্পর্কে জেনেছে অনেক কিছু। কখনও বাংলাদেশে আসেনি রাজকুমার। প্রায় কিছুই জানে না দেশটা সম্পর্কে। কিশোরের কাছে জানল অনেক কিছু। মুগ্ধ হয়ে গেল রাজকুমার। বলল, সুযোগ আর সময় পেলেই বাংলাদেশে ঘুরে যাবে সে। দেখবে ধানের খেত, মেঘনার চর, পদ্মার ঢেউ...শুনবে সন্ধ্যায় চৈতী, শালিকের কিচির মিচির, বাঁশ বনের ছায়ায় দোয়েলের শিস, চাঁদনী রাতে শেয়ালের হুক্কাহুয়া...
    গাড়ি পার্ক করল শোফার। নেমে পড়ল ছেলেরা। কালো গাড়ি থেকে প্রহরীরা নেমে পড়েছে আগেই।
    ছেলেদের সঙ্গে সঙ্গে চলল ডিউক আর তার দলবল।
    একটা জায়গায় এসে একটু পিছিয়ে পড়ল ডিউক, কিশোরের একেবারে গা ঘেঁষে এল দিমিত্রি। ফিসফিস করে বলল, ‘ওদের ফাঁকি দিতে হবে। গায়ের ওপর থেকে খসাতে হবে!’
    আস্তে করে মাথা ঝোঁকাল কিশোর।
    পুরো পার্ক চক্কর দিচ্ছে ছোট ট্রেন, বিচিত্র রঙের ইঞ্জিন, কামরা। খুদে স্টেশনে লোকের ভিড়। ওখানে এসে দাঁড়াল চার কিশোর। স্টেশনে এসে থামল একটা ট্রেন। পিলপিল করে নেমে এল যাত্রীরা, বেশির ভাগই বাচ্চা ছেলেমেয়ে। ওদের ভিড়ে মিশে গেল চারজনে। নতুন যাত্রী উঠল ট্রেনে। হুইসেল বাজিয়ে ছেড়ে দেবার আগের মুহূর্তে লাফিয়ে একটা বগিতে উঠে বসল চার কিশোর। ডিউককে দেখতে পেল ওরা। প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে ছেলেমেয়েদের মাঝে খুঁজছে দিমিত্রিকে। সরে চলে এল ট্রেন।
    ট্রেনে বসেই পার্কের অনেক কিছু চোখে পড়ে। দেখল দিমিত্রি। কোনটা কি, বুঝিয়ে দিল তিন গোয়েন্দা। বেশ আনন্দেই কাটল সময়টা। পুরো পার্ক একবার চক্কর দিয়ে আবার স্টেশনে এসে থামল গাড়ি। দাঁড়িয়ে আছে ডিউক লুথার। তাকে ঘিরে রয়েছে দেহরক্ষীরা। মুখচোখ কালো। নিশ্চয় প্রচুর বকাঝকা খেতে হয়েছে ডিউকের কাছে।
    ট্রেন থামতেই চার কিশোরকে দেখে ফেলল ওরা। ছুটে এসে দাঁড়াল বগির সামনে।
    মুখ গোমড়া করে ট্রেন থেকে নামল দিমিত্রি। ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল, ‘আমার সঙ্গে থাকনি তোমরা! ডিউটি ফাঁকি দিয়েছ। রিপোর্ট করব আমি ডিউক রোজারের কাছে।’
    ‘কিন্তু... আ-আমি...,’ তোতলাতে শুরু করল লুথার।
    ‘থাম!’ ধমকে উঠল দিমিত্রি। তিন গোয়েন্দার দিকে ফিরে বলল, ‘চল, যাই। ইস্‌স্, আরও সময় হাতে নিয়ে আসা উচিত ছিল! কত কিছু দেখার আছে আমেরিকায়!’
    তিন বন্ধুকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল দিমিত্রি। পেছনের প্রহরী-গাড়িতে করে আসার আদেশ দিল ডিউক লুথারকে। শোফার ইংরেজি জানে না। রকি বীচে ফেরার পথে মন খুলে কথা বলতে পারল চারজনে।
    অনেক কিছু জানতে চাইল রাজকুমার। খুলে বলল সব তিন গোয়েন্দা। কি করে একসঙ্গে হয়েছে ওরা, কি করে গোয়েন্দা হওয়ার শখ জেগেছে, কি করে দেখা করেছে বিখ্যাত চিত্র পরিচালক মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফারের সঙ্গে, সব জানাল। সংক্ষেপে বলল ‘ভূতুড়ে দুৰ্গ’ আর ‘কঙ্কাল দ্বীপ’ অভিযানের কাহিনী।
    ‘ব্রোজাস!’ শুনতে শুনতে এক সময় চেঁচিয়ে উঠল দিমিত্রি। ‘কি আনন্দ! একেই বলে জীবন! আহা, আমেরিকান ছেলেরা কত স্বাধীন! ইস্‌স্, কেন যে রাজকুমার হয়ে জন্মালাম! আর ক’দিন পরেই কাঁধে চাপবে মস্ত দায়িত্ব। রাজ্য শাসন...আরিব্বাপরে! ভাবলেই হাত-পা হিম হয়ে আসে!...স্বাধীন হব, হুঁহু! বাড়ি থেকেই বেরোতে দেয়া হয় না আমাকে! জীবনে কোনদিন স্কুলের মুখ দেখিনি! বাড়িতে শিক্ষক রেখে পড়াশোনা করিয়েছে! হাতে গোনা কয়েকজন বন্ধু আছে আমার, দেশে।...সত্যি বলছি, জীবনে এই প্রথম কয়েক ঘণ্টা আনন্দে কাটালাম! আজকের দিনটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে আমার জীবনে!’
    খানিকক্ষণ নীরবতা। ‘তোমরা আমার বন্ধু হবে?’ অযাচিত ভাবে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল দিমিত্রি। ‘খুব খুশি হব!’
    ‘আমরাও খুব খুশি হব,’ বলল মুসা।
    ‘থ্যাংক ইউ!’ হাসল রাজকুমার। ‘তোমরা জান না, জীবনে আজই প্রথম তর্ক করেছি ডিউক লুথারের সঙ্গে। তোমাদের সঙ্গে মিশেছি, এটা মোটেই ভাল লাগছে না তার। জানি, ফিরে গিয়ে সব লাগাবে রিজেন্টের কাছে। ব্যাপারটা মোটেই ভাল ভাবে নেবে না রোজার। না নিক। আর মাত্র দু’য়েকটা মাস। তারপর ওদের পরোয়া কে করে!’
    ‘প্রিন্সের কথা নিশ্চয় না মেনে পারবে না ডিউক রোজার,’ বলল রবিন।
    ‘না, পারবে না,’ বলল দিমিত্রি। ‘সময় আসুক। বেশ কয়েকটা আঘাত অপেক্ষা করছে তার জন্যে!’ রহস্যময় শোনাল রাজকুমারের গলা।
    রকি বীচে পৌঁছে গেল গাড়ি। দিমিত্রিকে বলে গেল কিশোর, কোন পথে যেতে হবে। দিমিত্রি তার ভাষায় বলল শোফারকে।
    পাশা স্যালভেজ ইয়ার্ডের বিশাল লোহার গেটের সামনে পৌঁছে গেল গাড়ি।
    দিমিত্রিকে নামতে অনুরোধ করল কিশোর। ওদের হেডকোয়ার্টার দেখাবে।
    বিষণ্ন ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল দিমিত্রি। ‘না রে, ভাই, সময় নেই। আজ রাতে এক জায়গায় ডিনারের দাওয়াত আছে। আগামীকাল সকালেই ফিরে যাব ভ্যারানিয়ায়।’
    ‘রাজধানীতেই থাক নিশ্চয়?’ জানতে চাইল কিশোর। ‘নাম কি?’
    ‘হ্যাঁ। ডেনজো। কখনও গেলে দেখবে, কত বড় বাড়িতে থাকি! কয়েকশো বছর আগে তৈরি হয়েছিল বিশাল দুর্গের মত বাড়িটা। তিনশো কামরা। বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে গেছে। ছোট রাজ্য। আয় খুবই কম। বাড়ি মেরামত করারও পয়সা নেই আমাদের। অথচ রাজা!...নাহ্ আর দেরি করতে পারছি না। চলি। আবার হয়ত কখনও দেখা হবে, মাই ফ্ৰেন্ডস!’
    বন্ধুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গিয়ে লিমোসিনে উঠল দিমিত্রি। রাজকুমারের গা ঘেঁষে বসল লুথার। দেহরক্ষীরা উঠল।
    ছেড়ে দিল গাড়ি। প্রতিটি জানালায় শুধু দেহরক্ষীর মুখ। লিমোসিনের পেছনে কালো এসকর্ট কার।
    গাড়ি দুটো মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে যাবার পরেও অনেকক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল তিন গোয়েন্দা।
    ‘একজন রাজকুমার এত ভাল হতে পারে, জানতাম না!’ কথা বলল মুসা। ‘কিশোর, কি ভাবছ? নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে শুরু করেছ...’
    চোখ মিটমিট করে তাকাল কিশোর। ঠোঁট থেকে সরিয়ে নিল আঙুল। ‘ভাবছি...নাহ্, সত্যি আশ্চর্য।’
    ‘কি?’
    ‘সকালের ব্যাপারটা! অ্যাক্সিডেন্ট হয়েই যাচ্ছিল! হ্যানসন ঠিক সময়ে গাড়ি না থামালে...কেন, আশ্চর্য লাগেনি তোমাদের কাছে? কোনরকম খটকা লাগেনি?’
    ‘আশ্চর্য! খটকা!’ মুসার মতই বিস্মিত হল রবিন। ‘কপাল ভাল, অ্যাক্সিডেন্ট হয়নি! এতে আশ্চর্যের কি আছে?’
    ‘আসলে কি বলতে চাইছ, বলে ফেল তো!’ বলল মুসা।
    ‘রিগো, মানে দিমিত্রির শোফার,’ বলল কিশোর। ‘পাশের রাস্তা থেকে বেরিয়ে এসে সামনে পড়ল। রোলস রয়েসটাকে দেখতে পায়নি, বললে মোটেই বিশ্বাস করব না। নিশ্চয় দেখেছে। ইচ্ছে করলেই গতি বাড়িয়ে আমাদের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারত। বরং ব্রেক কষেছে ঘ্যাঁচ করে। সময় মত হ্যানসন পাশ কাটাতে না পারলে সোজা গিয়ে লিমোসিনের গায়ে বাড়ি মারত রোলস রয়েস। দিমিত্রি যেখানে বসেছিল ঠিক সেখানে। মারাই যেত সে!’
    ‘দুর্ঘটনার আগে হুঁশজ্ঞান হারিয়ে ফেলে মানুষ,’ বলল মুসা। ‘রিগোরও সেরকম কিছু হয়েছিল!’
    ‘বিশ্বাস করতে পারছি না।’ এদিক ওদিক মাথা নাড়ল কিশোর। ‘কেন যেন মনে হচ্ছে, কোথাও কিছু একটা ঘাপলা রয়েছে।...যাকগে, এস যাই। চাচী হয়ত ভাবছে...’

গল্পটির পরের অংশ পড়তে এখানে যাও: পর্ব : ২
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য