বাঁশের ফাঁদ - কাজী আনোয়ার হোসেন

‘চিঠি!’
পিঙ্গল একটা হাত এগিয়ে দিল চিঠিটা। খামের এপিঠ-ওপিঠ বিদেশী ডাকঘরের অসংখ্য ছাপছোপ আর ময়লা হাতে নাড়াচাড়ার চিহ্নে মলিন। দূরে কুল-কুল শব্দ তুলে বয়ে চলেছে ক্যানক্যান নদী—পড়বে গিয়ে গুয়াইয়াকুইল উপসাগর হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে।
পাখির চামড়াটা নামিয়ে রেখে সাগ্রহে হাত বাড়াল জন মেথার। বাইরের পৃথিবী থেকে এই জঙ্গলের তাঁবুতে কোনও চিঠি আসা এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর ব্যাপার। বিশেষ করে সে চিঠি যদি কয়েক পৃষ্ঠাব্যাপী বাড়ির খবরাখবরে ঠাসা চিঠির মত মোটাসোটা দেখায়। চিঠিটা খুলে ফেলল সে চট্পট্। চামড়া ছাড়াবার যন্ত্রপাতি, তুলো আর নমুনার লেবেলগুলো একপাশে সরিয়ে ভাঁজ খুলে কাগজ কয়টা সোজা করে রাখল টেবিলের ওপর। তারপর ডুবে গেল চিঠির পাতায়। শেষ পৃষ্ঠায় এসেই চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল ওর।
‘হায়, হায়!’ বিড়বিড় করে বলল মেথার। ‘সেরেছে রে! এ বছর বাড়িতে আর ক্রিসমাস করা গেল না। যেই কাজ শেষ করে দেশের পথে স্টীমার ধরব ঠিক করেছি, ব্যস, দিল চাপিয়ে কাঁধের ওপর। দেখা যাক কি লিখেছে ব্যাটা।’
আপন মনে কথাগুলো বলল মেথার। জীবনের অধিকাংশ সময় সভ্য জগৎ থেকে বহুদূরে একা একা জঙ্গলে জঙ্গলে কাটাতে হয় বলে এই অভ্যাসটা গজিয়েছে ওর। অর্ধস্ফুট কণ্ঠে পড়ল সে চিঠির শেষের অংশটা:
‘আমাদের এন্টমোলজি ডিপার্টমেন্ট গোটা কতক কুয়াব্যান্ডান মাকড়সা সংগ্রহে অত্যন্ত আগ্ৰহী। এগুলো হলেই অ্যান্ডেস থেকে পাওয়া কীট-পতঙ্গের সংগ্রহ পূর্ণাঙ্গ হয়। বর্তমানে যে ক’টা মাকড়সা আছে সেগুলো এমন খারাপ অবস্থায় পাওয়া গেছে যে ঠিকমত মাউন্ট করা যায়নি।
‘তাছাড়া শিকাগোর ইন্টারন্যাশনাল মিউজিয়ম থেকে চিঠি এসেছে—ওঁরা গুয়াতেমালার চমৎকার গোটাকতক হামিং বার্ডের চামড়া আমাদের এই মাকড়সার সঙ্গে বদল করতে চান। তুমি তো জান, আমাদের ঐ পাখির সংগ্ৰহ কত অসম্পূর্ণ। কাজেই নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছ ডক্টর হাস্টনের কাছ থেকে ওগুলো পাওয়ার জন্যে কতখানি অস্থির হয়ে উঠেছি আমি। অন্তত এক ডজন কুয়াব্যান্ডান মাকড়সা চাই-ই চাই। স্ত্রী-পুরুষ দুরকমই—আর সেই সাথে ডজন দুয়েক বাচ্চা।
‘চুকুইপাতা পর্বতের ঢালু এলাকায় নয় হাজার থেকে বারো হাজার ফুটের মধ্যে খুব সম্ভব এই মাকড়সা পাবে। অবশ্য এদের বাসস্থান সম্পর্কে ঠিক নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনও জানা যায়নি। তবে এগুলো অত্যন্ত বিরল এবং দুর্লভ—আকারে অস্বাভাবিক রকম বড় এবং মাংসাশী—মাঝে মাঝে ছোট ছোট পাখি পর্যন্ত ধরে খায়। ব্যস, এর বেশি আর কিছুই বলা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ধরতে গেলে আজ পর্যন্ত কিছুই জানা যায়নি এদের সম্পর্কে। আমি চাই তুমি নমুনা তো আনবেই, বেশ কিছুদিন ঐ এলাকায় থেকে এদের জীবনযাত্রা সম্পর্কেও মোটামুটি তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে আসবে।
‘তোমাকে এই নতুন কাজের ভার দিতে হচ্ছে বলে আমি সত্যিই আন্তরিক দুঃখিত। কারণ তোমার গত চিঠি পড়েই বুঝতে পেরেছি পর্বতমালার পশ্চিম দিকের কাজ শেষ করে এখন বাড়ি ফিরবার জন্য উদ্গ্ৰীব হয়ে আছ তুমি। কিন্তু আমার বিশ্বাস তুমিও নিশ্চয়ই আমার অবস্থাটা বুঝতে পারবে এবং এক্ষুণি রওনা না হয়ে কয়েক সপ্তাহ চুকুইপাতায় কাটিয়ে আসবে।
‘আমার এবং অন্যান্য সহকর্মীদের শুভেচ্ছা জেনো।
ইতি—
ইলিয়ট এ. রোজারস্
অর্নিথলজি কিউরেটর।’

চিন্তান্বিত মুখে চিঠিটা ভাঁজ করে ফ্ল্যানেল শার্টের পকেটে রেখে দিল মেথার। ধাতস্থ নমুনা সংগ্ৰাহক সে এক জাদুঘরের। কর্তব্যটাই সবসময় তার কাছে আগে—ব্যক্তিগত সুখ পরে। বিরক্তি ঝেড়ে ফেলল সে মন থেকে জোর করে। রেড ইন্ডিয়ান গাইড এবং একমাত্ৰ সহকারী পেদ্রোকে হাঁক ছেড়ে একটা ডাক দিয়ে আবার অর্ধেক ছাল ছাড়ানো পাখিটা তুলে নিল।
‘এই যে আসছি,’ চুলোর সামনে থেকে উঠে এল পেদ্রো। বেঁটে খাটো শক্ত-সমর্থ চেহারা। একটু কুঁজো। চোখে বিনয়ী দৃষ্টি—অনেকটা বেত খাওয়া কুকুরের মত।
পাখা দুটো গোড়া থেকে কেটে ফেলল মেথার কাঁচি দিয়ে। ছাল ছাড়াতে আরম্ভ করল সে গলা থেকে। নিপুণ হাতে সারাটা দেহ ছাড়িয়ে মাথার কাছে চোখ পর্যন্ত এসে থামল। তারপর কাঁচি দিয়ে গলাটা কেটে ফেলল ঘ্যাঁচ করে। ছাল ছাড়ানো দেহটা একপাশে সরিয়ে রেখে খুলির ভেতর থেকে মগজ বের করে ফেলল মেথার খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে।
‘চুকুইপাতা চেন না, পেদ্রো?’ কাজের ফাঁকে একবার চোখ তুলে জিজ্ঞেস করল মেথার।
‘হুম্ম্,’ মাথা ঝাঁকাল পেদ্রো। মেথারের সামনে বেশি কথা বলে না সে। ঠিক যে ভয়—তা নয়। চার শতাব্দী ধরে স্প্যানিশদের ক্রীতদাসত্ব করে সাদা চামড়ার প্রতি একটা ভয় মিশ্ৰিত ভক্তি বংশানুক্রমে এদের মজ্জাগত হয়ে গেছে।
‘কঠিন জায়গা, তাই না?’
আবার মাথা নাড়ল পেদ্রো। তারপর বলল, ‘ওখানে যাচ্ছেন নাকি, হুজুর?’
চামড়াটা পরিষ্কার করে ভিতরের দিকটায় আর্সেনিক আর অ্যালাম পাউডার ছড়িয়ে দিল মেথার। এর ফলে নষ্ট হবে না চামড়া।
‘হ্যাঁ। তিনদিনের মধ্যেই আমরা রওনা হচ্ছি চুকুইপাতা পর্বতের দিকে।’ ঝাড়া দিয়ে এলোমেলো পাখাগুলো ঠিক করে নিল মেথার। তারপর তুলো ভরতে থাকল চামড়ার ভেতর। ‘কালই গ্রামে গিয়ে কুলি জোগাড় করে নিয়ে আসবে তুমি। জনা চারেক লোক হলেই হবে। যদি গোটা দুই ঘোড়া পাও, তাহলে আর লোক এনো না। দেখো, যা পাওয়া যায়।’
হাতের ইশারায় যেতে বলল সে পেদ্রোকে। তারপর নমুনাটার পায়ের সাথে একটা লেবেল বেঁধে দিল। এবার খুব যত্নের সাথে সবুজ আর হলুদ রঙের ছোট্ট পাখিটা তুলো দিয়ে জড়িয়ে বাক্সের মধ্যে ট্রে-র ওপর রাখা সারি সারি মমির পাশে সাজিয়ে রাখল।
একটা খাতায় নম্বর দিয়ে টুকে রাখল সে নমুনার নাম-ধাম, বংশ-পরিচয়। তারপর আপন মনে বিড়বিড় করতে থাকল:
‘এই নিয়ে মোট আটশো হলো এই এলাকা থেকে। তিন মাস পরিশ্রমের তুলনায় নেহাত কম না। যা আবহাওয়াটা গেল—সেই তুলনায় তো যথেষ্ট। এবারের পুরো ট্রিপে মোট দাঁড়াল তাহলে প্রায় দু’হাজার। এর মধ্যে কয়েকটা জাত তো একেবারে আনকোরা। যাক, এই-ই থাক এবার, এখন রওনা হতে হবে চুকুইপাতার দিকে। একটা পুরো দিন তো লেগে যাবে কেবল আশপাশের জঙ্গল থেকে ফাঁদগুলো তুলে আনতেই।’

দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর অ্যান্ডেসের পূর্ব এবং পশ্চিম কৰ্ডিলেরার মাঝখানে রয়েছে টানা তিনশো মাইল বিস্তৃত প্রায়-শুষ্ক এক মালভূমি। এরই দক্ষিণ প্রান্তে হচ্ছে চুকুইপাতা পর্বত। কবে কত হাজার বছর আগে যে ভয়ঙ্কর আগ্নেয়গিরি অগ্নি উদ্গার করেছিল, তপ্ত লাভা আর ভস্মে তৈরি হয়েছিল দুই মাইল উঁচু এই পর্বতমালা তা মানুষের হিসেবে লেখাজোখা নেই। তারপর শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে গেছে। মনুষ্যবাসের অনুপযোগী এই এলাকাটাকে প্রকৃতি নিজ খেয়াল খুশি মতো সাজিয়েছে। উঁচু আগ্নেয়গিরির শিখর, থরে থরে সাজানো ছোট ছোট টিলা, পাহাড়; আবার উঁচু পর্বত, পাশেই গভীর খাদ—কোনখানে আবার ছোট্ট ঝরনা। চারদিকে একটা স্থির, গম্ভীর, সৌম্য, সমাহিত ভাব।
এই আকাশ-উঁচু নির্জন অঞ্চলে উঠে এল জন মেথার। মাথার ওপর আকাশটা স্বচ্ছ পরিষ্কার। কিন্তু পায়ের তলায় মাটি এবড়োখেবড়ো, ধূলিময়। এগিয়ে চলল ছোট্ট দলটা পৰ্বতের গা বেয়ে সবুজ জঙ্গল ছেড়ে আরও, আরও অনেক উঁচুতে। মনে হচ্ছে একটা পাথরের চাঁই বেয়ে এক সারি পিঁপড়ে চলেছে যেন।
তিন দিকে পাহাড়ের দেয়াল দিয়ে ঘেরা একটা জায়গা বেছে নিয়ে তাঁবু ফেলল মেথার। একটা ঝরনা বয়ে চলেছে অল্প দূর দিয়ে। ছোট ছোট ঝোপঝাড় আর সবুজ ঘাস তার দুই কূলে। পৰ্বতের মাথাটা আর দেখা যাচ্ছে না—মনে হচ্ছে যেন মেঘের টুপি পরেছে মাথায়।
কুলিদের বিদায় করে দিল মেথার। কতদিন এখন এই মাকড়সা খুঁজতে লাগবে কে জানে। শুধু শুধু এদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানোর কি দরকার? প্রয়োজন হলেই আবার লোক জোগাড় করে নিয়ে আসবে পেদ্রো।
তাঁবু গোছগাছ করতেই দুপুর হয়ে গেল। চারপাশটা একটু ঘুরেফিরে দেখবার জন্যে বেরোল মেথার। গিরি সঙ্কটের একধারে দাঁড়িয়ে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়েই দমে গেল সে। অসম্ভব! একগাদা খড়কুটোর মধ্যে হারানো একটা সূঁচ খোঁজার মত অবস্থা! পাখি হলে উড়ত, জন্তু জানোয়ার হলে দৌড়াত, চোখে পড়বার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু মাকড়সা? এর মধ্যে মাকড়সা খুঁজবে কি করে সে?
খুব ধৈর্যের সাথে কয়েকদিন ধরে কঠোর পরিশ্রম করল মেথার। ঘাস, ঝোপঝাড়, পাথরের চাঁই, আগ্নেয়গিরির ভস্মস্তূপ—কিছুই বাদ দিল না, তন্ন তন্ন করে খুঁজল সে কুয়াব্যান্ডান মাকড়সা। ভাবল, এতই যদি সহজ হবে তাহলে একটা স্থানীয় লোকও এর খোঁজ দিতে পারল না কেন? কেউ দেখেইনি ওরা এমন মাকড়সা।
এমনিভাবে দিনের পর দিন সন্ধ্যার সময় তাঁবুতে ফিরে আসে ক্লান্ত মেথার খালিহাতে। মাঝে মাঝে এক আধটা পাহাড়ী পার্ট্ৰিজ বা কবুতর মেরে আনে। মাঝে মাঝে আবার গোটাকতক নতুন পাখি নিয়ে ফেরে। কিন্তু কোথায়? কুয়াব্যান্ডান মাকড়সার কোনও সন্ধানই মেলে না।
ক্যাম্প থেকে অনেক দূরে পাহাড় থেকে উত্তর দিকে নেমে যাওয়া একটা ঝরনার ধারে বসে রুটি খেয়ে নিচ্ছে ক্লান্ত মেথার আর আপন মনে বিড়বিড় করছে। ‘এদের অভ্যাস সম্পর্কে যদি কোনও রকমের কোনও তথ্য জানা থাকত তাহলে আর এত কষ্ট হত না। আসলে এরা দিনের বেলায় শিকার ধরতে বেরোয়, না রাতে, তাও জানি না। তবে এটা ঠিক, দক্ষিণে খুঁজে আর কোনও লাভ নেই। ওদিকে নেই। এই উত্তর দিকটায় সরিয়ে আনতে হবে তাঁবু। এদিকের গাছপালা অনেকটা আলাদা ধরনের। অনেক ঘন আর সবুজ। বোধহয় এদিকটায় এরা বৃষ্টি পায় বেশি। কিছুদূর নেমে দেখে আসব নাকি ঐ জঙ্গলটার ধারে তাঁবু ফেলার মত কোনও জায়গা পাওয়া যায় কিনা?’
বন্দুকটা তুলে ঢালু পর্বত বেয়ে নামতে আরম্ভ করল মেথার। খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে ছোট ঝোপঝাড় কিংবা শক্ত ঘাসের গুচ্ছ ধরে নামতে হচ্ছে। পা ফসকালেই একেবারে অনেক নিচে গড়িয়ে পড়বে। যা খাড়াভাবে নেমে গেছে পাহাড়টা! অনেক নিচে সমান জায়গায় গাছপালাগুলো এখান থেকে সবুজ কার্পেটের মত লাগছে দেখতে।
আধঘণ্টাখানেক নামার পর ঢালটা হঠাৎ কমে গেল। মেথার চেয়ে দেখল পাহাড়ের সারাটা গায়ে বিছিয়ে আছে লতানো বাঁশ। ডাইনে বাঁয়ে সামনে যতটা দেখা যায় উপত্যকা পর্যন্ত কেবল ফুট তিনেক উঁচু বাঁশের কঞ্চি আর বাঁশ-পাতায় ছাওয়া। কোথাও এতটুকু গা দেখা যাচ্ছে না পাহাড়ের।
‘এর ভেতর দিয়ে এগোনো তো মহা মুশকিল হয়ে যাবে দেখছি! ভেবেছিলাম ওপাশ দিয়ে ঘুরে ক্যাম্পে ফিরব। এখন উপায়!’
যে রাস্তা দিয়ে নেমেছে সেদিকে চাইল একবার জন মেথার। ‘ওরেব্বাপরে বাপ! অসম্ভব। এদিক দিয়ে ওপরে ওঠার সাধ্য নেই আমার। বাঁশবনের ধার দিয়ে যে এগোব তারও উপায় নেই—ঐ চুড়োটা আটকে বসে আছে পথ। দুই ঘণ্টা বিশ্ৰী খাটনির ফেরে পড়ে গেলাম দেখছি!’
মাথা নাড়ল মেথার। তারপর বন্দুক থেকে টোটা দুটো বের করে রেখে ঝুলিয়ে নিল সেটা কাঁধে। দুই হাতই ব্যবহার করতে হবে। এবার যেদিকটায় বাঁশবন একটু হাল্কা মনে হল সেদিকেই নামতে আরম্ভ করল সে ধীরে ধীরে।
সতরঞ্চির মত বিছিয়ে আছে লতানো বাঁশ। হামাগুড়ি দিয়ে কিছুদূর বাঁশের ওপর দিয়ে এগিয়ে একটু ফাঁক পেলেই মাটিতে নেমে পড়ছে মেথার। তারপর আবার চলছে কিছুদূর বাঁশের তলা দিয়ে বুকে হেঁটে। এভাবে অর্ধেক পথ আসতেই ঘেমে একেবারে নেয়ে উঠল সে। ক্লান্তিতে অবশ হয়ে এল হাত-পা। আর এগোনো যায় না। কিন্তু এগোতেই হবে। এখন আর ফেরার কথা ভাবাও উচিত নয়। সমস্ত মনোবল একত্রিত করে আবার এগিয়ে চলল সে সামনে।
সূৰ্য অস্ত যাচ্ছে। অনেকক্ষণ চলবার পর এবার মোটামুটি সমান জায়গা পেল মেথার। আর অল্পদূর গিয়েই পাহাড়টা হঠাৎ খাড়াভাবে নেমে গেছে অনেকখানি। এই জায়গায় বাঁশগুলো অনেক ঘন। ওর ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোল মেথার। আর মাত্র কয়েক গজ আছে। তারপরেই প্ৰায় খাড়া ঢাল। হঠাৎ মট্ করে একটা শব্দ হল। ভার সহ্য করতে না পেরে ভেঙে গেল পায়ের তলায় একটা বাঁশ। মেথার আশা করেছিল পায়ে মাটি ঠেকবে, কিন্তু কোথায়? ক্রমেই নেমে চলেছে। চারদিকটা অন্ধকার আর ভ্যাপসা গরম। দড়াম করে আছড়ে পড়ল সে অনেক নিচে মাটির ওপর। পরমুহূর্তে জ্ঞান হারাল।
জ্ঞান ফিরে পেয়ে মেথার বুঝতে পারল না কতক্ষণ ধরে সে পড়ে আছে সেখানে। নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ হবে। কারণ কব্জির কাছে একটা ক্ষত থেকে যে রক্ত বেরিয়েছিল সেটা এখন শুকিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে মাথার মধ্যে কে যেন কয়েকটা ছোট ছোট হাতুড়ি দিয়ে ঘা দিচ্ছে। প্রতিটি আঘাত তীব্ৰ বেদনার অনুভূতি সৃষ্টি করছে। উঠে বসবার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। চিৎ হয়ে শুয়ে শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা করতে থাকল সে।
অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে উঠে বসল মেথার। দেখল, একটা কূপের মত গর্তে পড়ে গেছে সে। প্রায় আঠারো ফুট নিচে পড়েছে সে বাঁশের ছাউনি ভেদ করে। গোল কূপটার নিচের দিকের ব্যাস হবে বোধহয় বারো-তেরো গজ মত। ওপর দিকে ছোট একটা ফাঁকা জায়গা দিয়ে সামান্য আলো আসছে ভেতরে। খুবই কম আলো, কিন্তু তাতেই পরিষ্কার দেখা গেল মাটি আর পাথরে মেশানো এবড়োখেবড়ো দেয়ালটা।
‘ঐ ফাঁকটা দিয়ে পড়েছি আমি!’ বিড়বিড় করল সে। ‘হ্যাঁ। ঐ ফাঁক দিয়েই পড়েছি। আর বেরোতেও হবে ঐ ফাঁকটা দিয়েই।’
উঠে দাঁড়াল মেথার। মাথাটা ঘুরে উঠল। সামলে নিয়ে টলমল পায়ে এগোল দেয়ালের দিকে। পাথরের চাঁইয়ে বেধে যাচ্ছে পা। বিশ্ৰী একটা গন্ধ গুহার মধ্যে। দেয়াল ধরে ধরে দুইবার ঘুরে এল সে গুহার পুরোটা বেড়। কিন্তু কোথাও ওপরে বেয়ে ওঠার মতন কিছু পেল না। সারাটা দেয়ালেই পাতলা পাতলা লতা-পাতার শিকড় আছে—টান দিলেই খসে আসছে দেয়াল থেকে।
‘সর্বনাশ! ওপরে ওঠার দেখছি কোনও উপায় নেই!’
কথাটা বুঝতে পেরেই ধক্ করে উঠল ওর বুকের ভেতরটা। এখন উপায়? আতঙ্ক দূর করে মাথাটা স্থির রাখার চেষ্টা করল মেথার। এই অবস্থায় বুদ্ধি হারালে চলবে না। বসে পড়ল সে মাটিতে।
‘কোন্ দিকে যেন যাচ্ছিলাম? ও হ্যাঁ, পর্বত থেকে নামছিলাম পশ্চিম দিকে। আর একটু সামনে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্ৰী কোণ করে নেমে গিয়েছিল পাহাড়টা বিশ ফুট। এই গর্তের নিচের দিকটা প্রায় চল্লিশ ফুট চওড়া। তাহলে এর পশ্চিম দিকে হয়ত ফুট পাঁচেক দূরেই সেই ঢালের গা।’
কথাটা মনে আসতেই উৎসাহের আতিশয্যে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল মেথার। বেল্টের সাথে ঝোলান ছোরাটার ওপর হাত পড়ল ওর। এটা দিয়েই মাটি খুঁড়তে হবে। টান দিয়ে ছোরাটা বের করেই একটা কথা মনে হয়ে ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেল ওর সমস্ত উৎসাহ।
‘কোনখানটায় শুরু করব? কোন দিকটা পশ্চিম?’
অসহায় দৃষ্টিতে চারদিকে চাইল সে একবার। এ যেন বন্দীশালা। এর ডাইনে অথবা বাঁয়ে, সামনে অথবা পিছনে একটা জায়গা আছে যেখান থেকে মাত্ৰ পাঁচ ফুট দূরে ওর মুক্তি। কিন্তু ও বুঝবে কি করে কোনটা সেই ঢালু দিকটা? বুঝতে পারলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বেরিয়ে যেতে পারত মুক্ত আকাশের নিচে। কিন্তু যদি এখন ভুল করে উল্টো দিকে খুঁড়তে আরম্ভ করে, তাহলে? তাহলে পর্বতের আরও গভীরে ঢুকবে সে। অথচ শক্তি, সামর্থ্য এবং সময়—সবকিছুর দাম এখন অনেক। ভুল হলে আর উপায় নেই। ঠিক দিকটা যদি বুঝতে পারত সে এখন কোনও উপায়ে!
‘আছে তো! হায় হায় কি বোকা আমি! কম্পাসই তো আছে পকেটে। ছি, ছি, এই কথাটা আমি ভুলে গেলাম কি করে? নিশ্চিত প্ৰমাণ রয়েছে আমার পকেটে। ঘাবড়ে গেলে মানুষের বুদ্ধিটা ঘোলা হয়ে যায়।’
খুশি হয়ে উঠল মেথারের মন। পকেট হাতড়ে বের করল সে ঘড়ির মত দেখতে যন্ত্রটা। তারপর হতবাক হয়ে দেখল, ওর পতনের ফলে গুঁড়ো হয়ে গেছে কাঁচটা—বাঁকা হয়ে একেবারে অকেজো হয়ে গেছে যন্ত্র। বারবার বিরূপ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মুখটা একটু কঠিন হয়ে গেল মেথারের। আঙুল দিয়ে নেড়ে দেখল যন্ত্রটা। ঠিক করবার চেষ্টা করা বৃথা।
‘তাহলে?’ তিক্ত কণ্ঠে বলল মেথার। ‘এখন? এখন আর কোনও উপায় নেই। যে জায়গাটা নরম পাওয়া যায় খুঁড়তে আরম্ভ করে দিই। সময় নষ্ট করে লাভ আছে কিছু? কপালে যা আছে তা হবেই।’
একটা জায়গা বেছে নিয়ে আরম্ভ করল মেথার। কয়েক ইঞ্চি গিয়েই বেধে গেল পাথরে। পাথরের গা বাঁচিয়ে কিছুক্ষণ খোঁড়ার পর ঢিলে ছোট ছোট আলগা পাথর পাওয়া গেল। বড় পাথরটা ওখান থেকে সরানো যাবে ঠিকই, কিন্তু বুঝতে পারল সে, এতবড় পাথর যদি ওখান থেকে খসিয়ে ফেলে তাহলে পুরো দেয়ালটা ধসে পড়বে এদিকে। জ্যান্ত কবর হয়ে যাবে তার। এদিকটা ছেড়ে অন্যদিকে চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু পুরো একটা ঘণ্টা ততক্ষণে বৃথাই নষ্ট হয়ে গেছে।
দ্বিতীয় জায়গাটা আরও খারাপ, কিন্তু তৃতীয়টা খুঁড়তে গিয়ে কিছুটা আশান্বিত হল মেথার। প্ৰাণপণে খুঁড়ে চলল সে। কাঁচের মত ধার পাথরের চিলতে বিঁধে আঙুল কেটে রক্ত পড়তে থাকল। পেশীগুলো ব্যথা হয়ে গেছে এতক্ষণ ধরে একটানা অক্লান্ত পরিশ্রমে। দুই ফুট, তিন ফুট—এই হারে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বেরিয়ে যেতে পারবে সে, যদি না ভুল দিকে এগিয়ে থাকে। দ্বিগুণ উৎসাহে খুঁড়ে চলল সে। এই আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব থেকে যত তাড়াতাড়ি মুক্তি পাওয়া যায় ততই ভাল। কিন্তু আর কয়েক ইঞ্চি গিয়েই একটা মস্ত পাথরে ঠেকে গেল সে। গ্যাঁট্ হয়ে বসে আছে চৌকো পাথর—নড়বে না কিছুতেই।
ঘেমে নেয়ে উঠেছে ওর সারা দেহ। পরিশ্রান্ত মেথার সুড়ঙ্গ মুখ থেকে বেরিয়ে এসে শুয়ে পড়ল গুহার মেঝেতে লম্বা হয়ে। পিঠটা একটু সোজা করে নিয়ে আবার লাগবে কাজে। মাত্র কয়েক মিনিট বিশ্রাম নেবে সে।
তারপর?
ঘাসের ওপর দিয়ে সাপ চললে যেমন শব্দ হয় তেমনি একটা খশ-খশ শব্দ এল মেথারের কানে। কান পেতে শুনতে চেষ্টা করল সে শব্দটা। ডান চোখটা অর্ধেক বুজে গেছে শ্রবণশক্তি বাড়াবার চেষ্টায়। শব্দটা আরও কাছে চলে এল। ওর চারপাশেই ঐ শব্দ, সারাটা গুহা ভরে গেছে সেই ভীতিকর ফিস্ফিস্ শব্দে। হঠাৎ কাছেই কি যেন দেখতে পেল মেথার। একটা লোমশ দেহের স্পর্শ পেল সে ঘাড়ে। এক ঝট্কায় উঠে দাঁড়াল সে। ভয়ে বিস্ফারিত দুই চোখ।
গুহার ভেতর আলো কমে এসেছে—সেই অস্পষ্ট আলোয় দেখল মেথার, দেয়ালগুলো সজীব হয়ে উঠেছে প্ৰকাণ্ড বড় বড় ভয়ঙ্কর-দর্শন মাকড়সায়। মোটা মোটা লোমশ পা। চড়ুই পাখির সমান একেকটার দেহ—কিন্তু আট হাত-পা নিয়ে মস্ত লাগছে দেখতে। কোনও কোনওটা কালো, আর বেশির ভাগই টকটকে লাল। নেমে আসছে ওরা নিচের দিকে ওপরের ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে। অনেকগুলো মেঝেতে পৌঁছে গেছে—আরও অনেক নেমে আসছে আট হাত-পায়ের সাহায্যে, ওদের চলার গা শিউরানো ভঙ্গিতে। আরও শত শত মাকড়সা গুহামুখে পছন্দসই লতা বা শিকড় খুঁজছে নেমে আসার জন্যে।
শিউরে উঠল মেথার! বুঝল, এই অন্ধকার গুহাটা হচ্ছে কুয়াব্যান্ডান মাকড়সার রাতের আশ্রয়। সারাদিন পাহাড়ের গায়ে বাঁশের জঙ্গলে শিকার করে সন্ধে হলেই চারদিক থেকে ফিরে আসে ওরা এই গুহায় বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে। জমা হচ্ছে ওরা এখন। আসছে, আসছে তো আসছেই—আর সেই সাথে নারকীয় খশ্ খশ্ শব্দ! এই মাকড়সাই খুঁজছিল সে এতদিন পাগলের মত।
‘জিসাস্!’ কেঁপে উঠল ওর গলাটা।
রাত এল। জন মেথারের জন্যে অনন্ত দুঃস্বপ্নের নির্যাতন নিয়ে এল রাতের অন্ধকার। লোমশ দেহগুলো দলে দলে উঠে আসতে চাইছে ওর গা বেয়ে। হাত দিয়ে, গায়ের কোট দিয়ে, টুপি দিয়ে বাড়ি মেরে ঝেড়ে ফেলবার চেষ্টা করছে সে পাগলের মত। কিন্তু একটা মারা পড়লে সে জায়গায় দুটো এসে হাজির হচ্ছে। অসংখ্য। এদের সংখ্যার কি শেষ নেই! দেহের যেখানেই একটু খোলা পাচ্ছে, বাঁকানো চোয়াল গেঁথে আঁকড়ে ধরছে চামড়া। সূচীভেদ্য অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না মেথার। কিন্তু এদের গায়ের একটা বোটকা গন্ধ থেকে বুঝতে পারছে, কয়েকদিন আগের শিকার করা প্রাণীর পচে ওঠা মাংসের টুকরো এখনও ঝুলিয়ে রেখেছে ওরা দেহের সাথে জালে জড়িয়ে। রক্তে বিষ ঢুকছে এই ভীতি পেয়ে বসল মেথারকে। ঘৃণা এবং ভয়ের শিহরণের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যুদ্ধ করে চলল সে। মাঝে মাঝে ক্লান্তিতে অবশ হয়ে ঢলে পড়ছে সে ঘুমে। সে শুধু কয়েক মিনিটের জন্যে। আবার জেগে উঠে নাক মুখের ওপর থেকে ঝেড়ে ফেলছে লোমশ দেহগুলো। শির-শির করে দৌড়াদৌড়ি করছে ওগুলো ওর দেহের ওপর দিয়ে ওর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করবার জন্যে। শিউরে শিউরে উঠছে মেথারের দেহ। চুলগুলো খাড়া হয়ে উঠছে ঘাড়ের কাছে লোমশ স্পর্শে।
অবশেষে অন্ধকার ফিকে হয়ে এল। ভোর এল পর্বত ডিঙিয়ে। আলো একটু বাড়তেই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল মাকড়সাগুলো। উঠে যেতে আরম্ভ করল শিকড় আর লতা বেয়ে ওপরে। দলে দলে চলে গেল ওরা সারির পর সারি। যখন আর একটিও অবশিষ্ট থাকল না গুহার মধ্যে, তখন দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল মেথার। মাথাটা ঠিক রাখার চেষ্টা করল সে প্ৰাণপণে। বেলা তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে।
নিজেকে স্থির করে কিছু খাবার খেয়ে নিল মেথার ওর সঙ্গের ইমার্জেন্সি রেশন থেকে। বন্দুক আর প্রজাপতি ধরার জালের সাথে সাথে কিছু খাবারও রাখতে হয় তাকে সাথে। খেয়ে নিয়ে একটু চাঙ্গা বোধ করল সে। ওপরের ফুটো বরাবর এসে বাঁশের ছাউনির ফাঁক দিয়ে মেঘের গতি বুঝবার চেষ্টা করল মেথার। কিন্তু না, সারাটা আকাশই মেঘে আচ্ছন্ন, কিছুই বোঝা গেল না। মেঘের গতি বুঝতে পারলে দিক নির্ণয় করা ওর পক্ষে কঠিন হত না মোটেই, কারণ ও জানে উঁচু আসমানে এ সময় পুবদিক থেকে বাতাস বয়। অগত্যা ফিরে গেল সে গর্ত খুঁড়বার কাজে। বিড়বিড় করে বলল, ‘এটাই একমাত্র ভরসা। এই বাঁশ বনের মধ্যেকার গুহা থেকে আমাকে উদ্ধার করা পেদ্রোর পক্ষে অসম্ভব। তা ছাড়া আমি বলেও আসিনি কোন্ দিকে যাচ্ছি।’
গতকালের খোঁড়া গর্তে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে আবার কাজে মন দিল মেথার। পাথরটা সরাতে হবে। কাজে লেগে গিয়ে একটু জোর পেল সে মনের মধ্যে। আর একটি রাত যে বিভীষিকা নিয়ে আসছে ওর জন্যে তার আতঙ্ক থেকে আংশিক মুক্তি পেল সে শারীরিক পরিশ্রম করে। এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করলে হয়ত অন্ধকার হয়ে আসার আগেই বেরিয়ে পড়তে পারবে সে এই দুঃস্বপ্নের বন্দীশালা থেকে, যত ক্ষীণই হোক, এই আশা ওর কাজের উৎসাহ বাড়িয়ে তুলল অনেকখানি।
অমানুষিক চেষ্টায় মস্ত পাথরটা শেষ পর্যন্ত খসিয়ে ফেলল সে। বের করে আনল ওটাকে গুহার মধ্যে, তারপর আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল ছুরি হাতে সুড়ঙ্গ পথে। এবার অনেক সহজে মাটি খুঁড়ে এগিয়ে চলল মেথার। সারা শরীরে দরদর করে ঘাম ছুটছে। যতই সে এগিয়ে যাচ্ছে ততই যেন গরম হয়ে উঠছে বাতাস। শ্বাস নিতে রীতিমত কষ্ট হচ্ছে ওর। একটা কটু গন্ধ হাল্কা ভাবে বেশ কিছুক্ষণ ধরেই নাকে আসছিল, এবার যেন গন্ধটা একটু বেশি মনে হল।
হঠাৎ আর একটা বড় পাথরে হাত লাগতেই চমকে উঠল মেথার। অসম্ভব গরম পাথরটা—ছ্যাঁকা লেগে গেল হাতে। ব্যাপার কি? চুপচাপ পড়ে থাকল মেথার কিছুক্ষণ। ভাবতে চেষ্টা করছে সে। জোর শ্বাস-প্ৰশ্বাসে ফুলে ফুলে উঠছে ওর বুক।
বুঝতে পারল ও। আর বুঝতে পেরে দমে গেল। এতক্ষণ ধরে ও পাহাড়ের ভেতর দিকে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে চলেছে। সোজা আর কিছুদূর গেলেই প্রবেশ করা যাবে সেই কেপ হর্ন থেকে পানামা পর্যন্ত মেরুদণ্ডের মত একটানা এই গলিত লাভা আর বাষ্পের নরকে। পর্বতের বাইরের খোলস ভেদ করে অনেকদূর পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে বলে গরম ভাপ এসে লাগছে ওর গায়ে, সেই সাথে গন্ধকের কটু গন্ধ।
এত পরিশ্রম সব বৃথাই গেল ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল মেথারের। পর মুহূর্তেই আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল ওর মনের মধ্যে। এই বিফলতাই তাকে টেনে নিয়ে যাবে সুনিশ্চিত সাফল্যের পথে। কারণ এতক্ষণ যদি সে পর্বতের ভেতর দিকে গিয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই এর ঠিক উল্টো দিকেই আছে আলো, জীবন আর মুক্তির পথ!
সুড়ঙ্গ পথ থেকে ধীরে ধীরে পিছিয়ে বেরিয়ে আসতে থাকল মেথার গুহার মধ্যে। সুড়ঙ্গ-মুখের কাছে এসে বুক ভরে ঠাণ্ডা বাতাস গ্রহণ করল সে। আর তিন ফুট গেলেই বেরিয়ে আসবে সুড়ঙ্গ থেকে। এমন সময় ওর হাঁটুর নিচে নরম থলথলে কি যেন পড়েই পিষে গেল চাপ খেয়ে। তারপরই ডান হাত বেয়ে একটা মোটা খশ্খশে জিনিস উঠে এল, একটু থামল, কুট করে কি যেন বিঁধল হাতে। শিউরে উঠে হাত-ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল মেথার বস্তুটি। ফিরে এসেছে মাকড়সার দল।
বিভীষিকাময় দ্বিতীয় রাতের প্রতিটি মুহূর্ত জন মেথার দুটি চিন্তাকে আঁকড়ে ধরে থাকল—জলে ডোবা মানুষ যেমন মরিয়া হয়ে খড়কুটো ধরে, তেমনি ভাবে। দিন হলেই এই নির্যাতনের অবসান হবে এবং আরেকটা রাত আসার আগেই সে উল্টোদিকের দেয়াল ভেদ করে বেরিয়ে যেতে পারবে। কঠিন সংকল্প আর ইচ্ছা শক্তির প্রতিটি অণু-পরমাণু কাজে লাগাল সে এই কথা দুটো মনে রাখার জন্যে—তা নইলে পাগল হয়ে যাবে সে।
শেষ পর্যন্ত জয় হল ওর। সমস্ত শরীর যখন কাঁপছে ওর টেনে ছেড়ে দেয়া তারের মত থরথর করে, ঠিক দেখল না ও, উপলব্ধি করল, চলে গেছে বীভৎস নারকীয় কীটগুলো।
এইবার! পাগলের মত লাল চোখ মেলে চাইল সে একবার চারদিকে। তারপর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে ঝাঁপিয়ে পড়ল কাজে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শক্ত মাটিতে গর্ত খুঁড়তে আরম্ভ করল সে ছুরি দিয়ে, গতদিন যেখানটায় খুঁড়েছিল, ঠিক তার উল্টো দিকে। কিছুদূর গিয়ে দুটো পাথরের মাঝখানে আটকে গেল ছুরিটা। বের করার চেষ্টা করতেই মট্ করে গেল ভেঙে। হাঁপাতে হাঁপাতে অভিসম্পাত দিল সে ছুরিটাকে, তারপর শুধু বাঁট দিয়েই খুঁড়ে চলল মাটি।
‘বেরোতেই হবে!’ চেঁচিয়ে উঠল মেথার পাগলের মত। ‘আজই বেরোতে হবে এখান থেকে! পাগল হয়ে যাব, নইলে ঠিক পাগল হয়ে যাব বলে দিচ্ছি!’
ইঞ্চির পর ইঞ্চি, এক ফুট, দুই ফুট, তিন ফুট—এগিয়ে চলল সে সুড়ঙ্গের অন্ধকারে। হাত দুটোর ওপর কোনও মায়া-দরদ করল না। এই দেয়ালের বাইরে কোথাও মুক্ত বাতাস আছে। অবারিত শান্তির দেশ সেটা। আর পিছনে অবৰ্ণনীয় বিষাদ আর নির্যাতন—মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর। যেতেই হবে, যেতেই হবে ওকে এগিয়ে!
দুপুরের দিকে থামল মেথার। আর পারা যায় না। কয়েক মিনিট বিশ্রাম নেবে বলে বেরিয়ে এল সে সুড়ঙ্গ থেকে। চারদিক অন্ধকার দেখে ওর মনে হল বুঝি আরেকটা রাত আসছে। চমকে আকাশের দিকে চাইল সে। না। কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। লুটোপুটি খাচ্ছে মেঘগুলো প্ৰচণ্ড হাওয়ার বেগে। গুড়গুড় করে উঠল আকাশটা। ঝিক্ করে চমকে উঠল বিদ্যুৎ, তারপরই কানে তালা লাগিয়ে দিয়ে বাজ পড়ল কাছে কোথাও। দ্রুত হাত উঠিয়ে চোখটা আড়াল করল মেথার বিদ্যুতের আলো থেকে। তারপরই কি দেখল? হাজার হাজার লোমশ মাকড়সা সড়সড় করে নেমে আসছে ওপরের খোলা পথ দিয়ে তুফান থেকে আত্মরক্ষা করবার জন্যে।
এবার বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেল। একটু পরেই রাজ্যের কাদামাটি নিয়ে ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে প্ৰবল ধারায় পানি এসে পড়তে আরম্ভ করল গুহার মধ্যে। একটা মস্ত বালতির মত গুহার মধ্যে পানি জমতে আরম্ভ করল। অল্পক্ষণেই মেথারের পায়ের গোড়ালি, হাঁটু, এমন কি কোমর পর্যন্ত উঠে এল পানি। মাকড়সাগুলো এরই মধ্যে দেয়াল আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করতে থাকল, আর ঝপাং করে একেকবারে বারো-চোদ্দটা করে পানিতে পড়তে থাকল। মেথারের গায়ে উঠতে আরম্ভ করল ওরা দলে দলে—নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে কে মাথায় থাকবে তাই নিয়ে। ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল ওগুলোকে মেথার, ডুবিয়ে মারার চেষ্টা করল। কিন্তু আঁকড়ে ধরে থাকল ওরা ওকে।
বুক পর্যন্ত উঠে এল পানি। একটু পরেই সাঁতরাতে আরম্ভ করল সে। মাথার ওপর এক বোঝা মাকড়সা। দম বন্ধ হয়ে মারা যাবার দশা হল ওর। দুর্বল শরীর। অনেকক্ষণ চেষ্টা করল সে ভেসে থাকতে। আর পারা যায় না। মানুষের ক্ষমতার একটা সীমা আছে। পরিষ্কার বুঝতে পারল ডুবে মরাই লেখা আছে ওর কপালে। মৃত্যুর চিন্তা আসতেই দুর্বলভাবে আরও দু-একবার হাত-পা নাড়ল সে ভেসে থাকবার ব্যর্থ চেষ্টায়। আর একবার শেষ চেষ্টা করল সে মাথার ওপর থেকে প্রাণভয়ে ভীত মাকড়সাগুলোকে তাড়াতে।
ঠিক সেই সময়ে মাটি এবং পাথর ধসে পড়ার একটা প্ৰবল শব্দ হল। মনে হল যেন টেনে নিচ্ছে কেউ সব পানি। একটু পরেই মাটিতে পা ঠেকল ওর। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল মেথার অসমান জায়গা থেকে সরে গিয়ে। দুই হাতে মাথার ওপর থেকে ঘৃণিত কীটগুলোকে বাড়ি মেরে চুরমার করে সরিয়ে দিল সে। তারপর দেখল কোমর পর্যন্ত নেমে গেছে পানি, দ্রুত নেমে যাচ্ছে আরও। বিদ্যুতের আলোয় দেখল মেথার, যেখানটায় ও এতক্ষণ সুড়ঙ্গ তৈরি করছিল ঠিক সেইখানেই ঘূর্ণিপাক। ভেতরের চাপে দেয়ালটা খসে গিয়ে পানি বেরিয়ে যাচ্ছে ওখান দিয়ে। সব পানি বেরিয়ে যেতেই মাথা নিচু করে সুড়ঙ্গ পথে দিনের আলো দেখতে পেল মেথার। হামাগুড়ি দিয়ে সুড়ঙ্গ পথে বেরিয়ে এল সে বাইরে পাহাড়ের গায়ে। বৃষ্টি থেমে গেছে। দ্রুত চলে যাচ্ছে ঝড় দূরে। চারদিকে শান্ত, সমাহিত একটা ভাব।
কয়েক মিনিট চুপচাপ শুয়ে থাকল মেথার। মুক্তির আস্বাদ গ্ৰহণ করল মনপ্ৰাণ ভরে। দু’ফোঁটা গরম পানি বেরিয়ে এল ওর চোখ থেকে। ভিজে স্যাঁতসেঁতে দেহটা কাঁপছে। অর্থহীন দৃষ্টিতে দূরের পানে চেয়ে রইল সে। ধীরে ধীরে সেই দৃষ্টি থেকে সরে যাচ্ছে বিভীষিকার দুঃস্বপ্ন। উঠে বসল সে। তারপর উঠে দাঁড়াল। একটা মস্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেথার। সামনের ঢালু জায়গাটায় চোখ পড়ল ওর। অসংখ্য মৃত মাকড়সা বিছিয়ে আছে মাটিতে।
‘এখানে যত আছে নিয়ে যেতে পারলে পৃথিবীর সমস্ত জাদুঘরের পক্ষে যথেষ্ট। বেশ নামজাদা লোক হয়ে যাব মনে হচ্ছে!’
ফুলে ওঠা ক্ষতবিক্ষত হাতে তুলে এনে একটা পাথরের পাশে সাজাতে আরম্ভ করল সে নোংরা মৃতদেহগুলো।
(সমাপ্ত)
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য