কাকাতুয়া রহস্য - পর্ব : ৩

গল্পটির আগের অংশ পড়তে এখানে যাও: পর্ব : ২

আর ইঞ্চিখানেক এদিক ওদিক হলেই লেগে যেত একটার সঙ্গে আরেকটা, রোলস-রয়েসের চাকচিক্য তো বটেই, বডির মসৃণতাও নষ্ট হত অনেকখানি।
    দরজা খুলে ভারিক্কি চালে নেমে গেল হ্যানসন। সেডানের ড্রাইভিং সীটে বসা ছোট্ট মানুষটার মুখোমুখি হলো। কড়া দৃষ্টি লোকটার। দোষ তো করেছেই, উল্টে নেমে এসে কৈফিয়ত চেয়ে বসল, হ্যানসন কিছু বলার আগেই।
    ‘দেখেশুনে চালাতে পারো না, গরিলা কোথাকার?’ চেঁচিয়ে উঠল তীক্ষ্ণচোখো। হ্যানসনের ছয় ফুট দুই ইঞ্চির কাছে তাকে এতটুকু মনে হচ্ছে। তা-ও কি দাপট!
    ‘দেখো, বাপু,’ সম্ভ্রান্ত ইংরেজের মত কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব নিচু রাখল হ্যানসন, ‘দোষটা আমার নয়, তোমার। এত স্পীডে গাড়ি ঘোরায় কেউ? গেট দিয়ে ঢুকতে চায়? আরেকটু হলেই তো দিয়েছিলে দুটো গাড়িকেই নষ্ট করে।’
    ‘দেখো,’ গর্জে ওঠার আগে এক পা পিছিয়ে গেল লোকটা, বেশি সামনে থেকে গালমন্দ করার সাহস হচ্ছে না বোধহয়, ‘চাকরের মুখ থেকে উপদেশ শুনতে চাই না।’
    ‘ভদ্রভাবে কথা বলো,’ শান্ত কণ্ঠে বলল হ্যানসন। ‘নইলে ভদ্রতা শিখিয়ে দেব। এক চড়ে ফেলে দেব বত্রিশটা দাঁত।’
    রাগে ঘুসি পাকিয়ে এগিয়ে এল তীক্ষ্ণচোখো।
    আলগোছে তার হাতটা ধরে ফেলল হ্যানসন, আরেক হাতে কলার চেপে ধরে শূন্যে তুলে ফেলল। হাস্যকর ভঙ্গিতে ছটফট করতে লাগল লোকটা, করুণ হয়ে উঠেছে মুখচোখ।
    সেডানের পেছনের দরজা খুলে নামল আরেকজন লোক। দামী বেশভূষা। ধমক দিল, ‘টমাস। গাড়িতে যাও।’ বেশ ভারি গলা, আদেশ দিতে অভ্যস্ত, বোঝা গেল কণ্ঠস্বরেই। কথায় ফরাসী টান। সরু গোঁফ, ঠোঁটের কোণে একটা বড় তিল।
    হাত থেকে টমাসকে ছেড়ে দিল হ্যানসন।
    পড়ে যেতে যেতে কোনমতে সামলে নিল টমাস। দ্বিধা করল। ফিরে গেল গাড়িতে। পেছনে আরেকজন বসে আছে, হোঁতকা, কুৎসিত চেহারা। দেখছে।
    ‘সরি,’ হ্যানসনকে বলল দ্বিতীয় যে লোকটা বেরিয়ে এসেছে সে, ‘খুব বাজে কাজ করেছে আমার ড্রাইভার।’ রোলস-রয়েসটার দিকে চোখের ইশারা করে বলল, ‘খুব সুন্দর গাড়ি। রঙ-টঙ নষ্ট হলে আমারই খারাপ লাগত। তা, তোমার মালিক কে? আমার সঙ্গে একটু কথা বলবেন?’
    একে একে এত দ্রুত ঘটনাগুলো ঘটে গেছে, বাধা দেয়ার বা কিছু করার সুযোগই পায়নি কিশোর। এখন নেমে এল।
    ‘আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতে চান?’
    অবাক হলো বিশালদেহী লোকটা। ‘তুমি...মানে...আপনি এটার মালিক?’
    ‘তুমি বললে কিছু মনে করব না,’ বলল কিশোর। ‘হ্যাঁ, আপাতত আমিই মালিক। পরে কি হবে জানি না।’
    ‘অ।’ দ্বিধা করছে লোকটা। ‘তুমি...মানে, মিস্টার ফোর্ডের সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলাম। তুমি কি তার কিছু হও?’
    ‘তা, বন্ধু বলতে পারেন। এই তো, আমরাও কথা বলে বেরোলাম।’
    ‘তাহলে হয়তো বলতে পারবে। আচ্ছা, তাঁর বিলি শেকসপীয়ারের কি অবস্থা?’
    ‘পাওয়া যায়নি এখনও। খুব মনের কষ্টে আছেন বেচারা।’
    ‘এখনও পাওয়া যায়নি,’ লোকটার মুখ দেখে বোঝা গেল না কিছু, ভাবান্তর হয়নি চেহারায়। ‘সত্যি খুব খারাপ কথা। কোন খবরই নেই?’
    ‘না পুলিশের কাছেই যাচ্ছি, কতদূর কি করল, জানতে। আপনার কথা বলব? সাহায্য-টাহায্য করতে চান নাকি?’
    ‘না না,’ তাড়াতাড়ি দু-হাত নাড়ল লোকটা, ‘আমার কথা বলার দরকার নেই। আমি মিস্টার ফোর্ডের বন্ধু। এ-পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম, খোঁজটা নিয়েই যাই। তোমার কাছেই খবর পাওয়া গেল যখন, এখন আর যাচ্ছি না। তাড়া আছে আমার, অন্য সময় আসব। যাই।’
    নাম-ধাম কিছুই বলল না লোকটা, দ্রুত গিয়ে গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বলল, ‘টমাস, গাড়ি ছাড়ো। হোটেলে চলো।’
    ‘ইয়েস, স্যার,’ ঘোঁৎ ঘোঁৎ করল তীক্ষ্ণচোখো ড্রাইভার। হ্যানসনের দিকে আরেকবার দৃষ্টির আগুন হেনে গাড়ি পিছাতে শুরু করল। ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল।
    ‘খুব চমৎকার সামলেছেন, স্যার,’ প্রশংসা করল হ্যানসন। ‘আপনার চাকরি করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি,’ কিশোরের বার বার নিষেধ সত্ত্বেও অতিবিনয় প্রকাশ করে ফেলে সে মাঝেমাঝে, দীর্ঘ দিনের স্বভাব বদলাতে পারে না।
    ‘থ্যাংক ইউ,’ বলে গাড়িতে উঠল কিশোর।
    ‘কিশোর,’ কৌতূহলে ফেটে পড়ছে মুসা, লোকটার সঙ্গে কিশোরের কি কথা হয়েছে শুনতে পায়নি, ‘এত সহজে তাড়ালে কি করে? মনে তো হলো খুব শক্তপাল্লা। ওসব লোককে চিনি আমি, অন্ধকার গলিপথে সামনে পড়লে ঝেড়ে দৌড় দেব। মনে হলো, তুমিই ওকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ?’
    চেপে রাখা নিঃশ্বাস ফোঁস করে ছাড়ল কিশোর। হেলান দিল গদিতে। ‘তেমন কিছু না। শুধু পুলিশের নাম বলেছিলাম।’
    ‘আজকাল পুলিশ এত ভয় দেখাতে শুরু করেছে লোককে,’ গাড়ি পিছিয়ে আবার রাস্তায় তুলছে হ্যানসন, সেদিকে চেয়ে বলল মুসা। ‘আগে জানতাম শুধু বদ লোকেরাই ভয় পায়...’
    ‘যারা পালাল, তারাও বদলোক,’ মুসার কথার পিঠে বলল কিশোর। ‘ড্রাইভারের কোটের তলায় নিশ্চয় শোল্ডার-হোলস্টার আছে। খেয়াল করোনি, হ্যানসন যখন ওকে ধরেছে, বগলের তলায় হাত দিতে যাচ্ছিল? খুন খারাপি অপছন্দ করে না সে।’
    ‘পিস্তল?’ ঢোক গিলল মুসা। ‘ব্যবহার করে?’
    ‘আরেকটু হলেই আজও করে ফেলেছিল। মনিবের জন্যে পারল না। তার মনিব খুব উঁচুদরের লোক, বোঝাই যায়। এমন একজন মানুষ বন্দুকবাজ ড্রাইভার রেখেছে কেন?’
    প্রায় নিঃশব্দে, মসৃণ গতিতে আবার চলতে শুরু করেছে রোলস-রয়েস।
    ‘ভাবছি,’ গাল চুলকাল মুসা, ‘এসব লোকের সঙ্গে জড়াচ্ছি কেন? একটা সাধারণ কাকাতুয়া খুঁজতে বেরিয়েছিলাম আমরা।’
    ‘তা বেরিয়েছিলাম,’ স্বীকার করল কিশোর।
    ‘তাহলে? আজব এক মোটা লোকের পাল্লায় পড়লাম শুরুতেই। তারপর আরেক লোক, পোশাক-আশাকে ভদ্রলোক, কিন্তু বন্দুকবাজ পোষে। রহস্যময় এক মেকসিকান ফেরিওলার কথাও শুনলাম। সবাই পাখিটার ব্যাপারে আগ্রহী।’
    ‘মেকসিকান ফেরিওয়ালা বাদে,’ শুধরে দিল কিশোর। ‘পাখিটা বেচে দিয়ে গেছে, ব্যস। আর আসেনি।’
    ‘কিন্তু কেন? তোতলা একটা কাকাতুয়া এমন কি দামী জিনিস, চুরি করার জন্যে, হাতে পাওয়ার জন্যে খেপে উঠেছে সবাই?’
    ‘তদন্ত করলে জবাব মিলবে। এ-মুহূর্তে তোমার মতই অন্ধকারে আছি আমি।’
    ‘থাকার দরকারটা কি?’ গজগজ করল মুসা। ‘আমি বলি কি, শোনো...’
    হঠাৎ গতি কমে গেল রোলস-রয়েসের।
    ‘কি হয়েছে, হ্যানসন?’ জিজ্ঞেস করল কিশোর।
    ‘এক মহিলা। রাস্তায় এসে উঠেছেন। কিছু হারিয়েছেন বোধহয়।’
    জানালা দিয়ে মুখ বের করল দুই গোয়েন্দা। ততক্ষণে ব্রেক কষে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফেলেছে হ্যানসন।
    বেঁটে, গোলগাল এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার ওপর, গাড়ি-ঘোড়া আসছে কিনা খেয়ালই নেই। ঝোপের দিকে চেয়ে কাকে জানি ডাকছেন। ‘এসো, লক্ষ্মী, এসো, জলদি এসো। দেখো কি এনেছি। খুব ভাল সূর্যমুখীর বীচি।’
    ‘বোধহয় কিছু গণ্ডগোল হয়েছে,’ গাড়ি থেকে নামতে শুরু করল কিশোর। ‘চলো তো, দেখি।’
    মহিলার দিকে হাঁটতে শুরু করল দুই গোয়েন্দা। কিন্তু কোন খেয়ালই নেই মহিলার। ঝোপের দিকে চেয়ে মুঠো খুলে দেখালেন, কত ভাল লোভনীয় বীচি এনেছেন।
    ‘মাপ করবেন,’ কাছে এসে বলল কিশোর। ‘কিছু হারিয়েছেন বুঝি?’
    ‘অ্যাঁ...হ্যাঁ,’ পাখির মত মাথা একপাশে কাত করে অনেকটা পক্ষীকণ্ঠেই বললেন মহিলা। ‘এই দেখো না, লিটল বো-পীপকে খুঁজে পাচ্ছি না। কোথায় যে গেছে কে জানে? তোমরা নিশ্চয় দেখোনি, না? লিটল বো-পীপকে?’
    ‘না, ম্যাডাম,’ জবাব দিল কিশোর। ‘লিটল বো-পীপ কি কোন কাকাতুয়া?’
    ‘নিশ্চয়ই,’ বিস্ময় ফুটল মহিলার চোখে। ‘তুমি জানলে কি ভাবে?’
    পকেট থেকে কার্ড বের করে দিল কিশোর। ‘আমরা গোয়েন্দা। বুঝতে পারছি, কাকাতুয়াই খুঁজছেন আপনি। ওই যে, ঘাসের ওপর খাঁচাটা ফেলে রেখেছেন। হাতে সূর্যমুখীর বীচি, ডাকাডাকি করছেন ঝোপের দিকে চেয়ে। কাকাতুয়া ছাড়া আর কি?’
    আরও বেশি অবাক হলেন মহিলা। ‘বাহ্, বেশ বুদ্ধি তো।’
    তারপর আরও কয়েকবার ডাকাডাকি করে হতাশ হয়ে দুই গোয়েন্দাকে নিয়ে রওনা হলেন বাড়ির দিকে, লিটল বো-পীপের নিখোঁজের ব্যাপারে খুলে বলবেন।
    ‘হ্যানসন, আপনি এখানেই থাকুন,’ ডেকে বলল কিশোর।
    ইট বিছানো পথ ধরে মহিলার পিছু পিছু চলল দুই গোয়েন্দা। সামনে অনেকগুলো কলা-ঝাড়ের ওপাশে একটা বাংলো।
    ছোট লিভিং রুমে দুই গোয়েন্দাকে বসালেন মহিলা, নিজেও বসলেন।
    ‘মিস বোরো,’ বলল কিশোর, ‘কয়েক হপ্তা আগে এক মেকসিকান ফেরিওলার কাছ থেকে কাকাতুয়াটা কিনেছিলেন, না?’
    ‘হ্যাঁ,’ চোখ বড় বড় হয়ে গেল তাঁর। ‘আমার নামও জানো দেখছি? তুমি তো খুব ভাল গোয়েন্দা।’
    ‘আগে থেকেই তথ্য জানা থাকলে ওগুলো বলা শক্ত কিছু না।’ কিশোর জানাল, ‘মিস্টার ফোর্ড আপনার কথা বলেছেন।’
    ‘তথ্য জানা থাকলেও অনেকেই বলতে পারে না,’ বললেন মিস বোরো। ‘আর তথ্য জোগাড় করতেও বুদ্ধি লাগে। যাই হোক, মিস্টার ফোর্ড নিশ্চয় বিলিকে খুঁজে পেয়েছেন।’
    ‘না, পাননি,’ মুসা বলল। ‘ওকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছি আমরা। আপনারটা হারাল কি করে, বলবেন, প্লীজ?’
    ‘দোকানে গিয়েছিলাম,’ মুখ বাঁকালেন মিস বোরো। ‘বীচি ফুরিয়ে গিয়েছিল। সূর্যমুখীর বীচি খুব পছন্দ করে বো-পীপ। গেট দিয়ে বেরিয়েই মরতে বসেছিলাম, প্রায় চাপা দিয়ে গিয়েছিল আমাকে কালো একটা গাড়ি। বিদেশী গাড়ি। আজকাল লোকে যা বেখেয়ালে চালায় না।’
    একে অন্যের দিকে তাকাল কিশোর আর মুসা। গাড়িটা কার অনুমান করতে কষ্ট হলো না কারোই।
    ‘থামতে বললাম, থামল না,’ বলে গেলেন মিস বোরো। ‘কি আর করার আছে? ভয় পেয়ে পালিয়েছে যখন? দোকানে গিয়ে বীচি কিনলাম। কোন্ বীচি ভাল, কোন্‌টা খারাপ, খানিকক্ষণ আলোচনা করলাম দোকানের মেয়েটার সঙ্গে। ফিরে এসে দেখি বো-পীপের খাঁচার দরজা খোলা। সে নেই। বোধহয় দরজা খোলাই রেখে গিয়েছিলাম, এই ফাঁকে বেরিয়ে গেছে। ভাবলাম, কোন ঝোপঝাড়ে গিয়ে লুকিয়েছে। খুঁজতে খুঁজতে চলে গেলাম রাস্তায়...তারপর তো তোমাদের সঙ্গে দেখা।’
    ‘কালো গাড়িটাকে পরে আর দেখেছেন?’ জিজ্ঞেস করল কিশোর।
    ‘না,’ মাথা নাড়লেন মিস বোরো। ‘সাঁ করে গিয়ে মোড় নিয়ে হারিয়ে গেল। গাছপালা ঝোপঝাড় বেশি, মোড় নিলে আর দেখা যায় না।’ ভুরু কোঁচকালেন। ‘ওই মোটা লোকটাই চুরি করেছে বলছ নাকি?’
    ‘তাই তো মনে হয়, ম্যাডাম,’ বলল কিশোর। ‘আমার ধারণা, বিলিকেও সে-ই চুরি করেছে।’
    ‘সর্বনাশ!’ অসহায় মনে হচ্ছে মহিলাকে। ‘তাহলে তো আর তাকে পাব না। কি নিষ্ঠুর গো। লোকের মনে কষ্ট দেয়। কিন্তু দুটো কাকাতুয়া চুরি করতে যাবে কেন? ইচ্ছে করলে তো কিনেই নিতে পারে।’
    এই প্রশ্নটার জবাব মুসারও খুব জানতে ইচ্ছে করছে।
    কিন্তু জবাব জানা নেই গোয়েন্দাপ্রধানের। ‘আপাতত এটা রহস্য,’ বলল সে। ‘আচ্ছা, মিস বোরো, আপনার লিটল বো-পীপ কি কথা বলতে পারে?’
    ‘নিশ্চয় পারে। লিটল বো-পীপ বলে তার ভেড়াটা হারিয়েছে। কোথায় হারিয়েছে, জানে না। খুঁজে দেয়ার জন্যে ডাকাডাকি করে শারলক হোমসকে। অদ্ভুত কথা, তাই না? কাকাতুয়াকে আরও কত রকম বুলিই তো শেখানো যায়।’
    ‘তা যায়,’ নোট বই বের করল কিশোর। ‘ঠিক কি কি বলত বলুন তো?’
    ‘লিটল বো-পীপ হ্যাজ লস্ট হার শীপ অ্যান্ড ডাজ্‌ন্‌ট্ নো হোয়্যার টু ফাইন্ড ইট। কল অন শারলক হোমস।’
    দ্রুত লিখে নিয়ে বলল কিশোর, ‘কথায় ব্রিটিশ টান আছে?’
    ‘আছে। মনে হয়, খুব যত্ন করে শিখিয়েছে কোন উচ্চ শিক্ষিত ইংরেজ ভদ্রলোক।’
    ‘হুঁ। মিস বোরো, যা মনে হচ্ছে আপনার বো-পীপকে হাইমাসই মানে, মোটা লোকটাই চুরি করেছে। পুলিশকে ফোন করে জানান।’
    ‘পুলিশ? ও, মাই গুডনেস!’ আঁতকে উঠলেন মহিলা। ‘ফোন নেই আমার। তাছাড়া পুলিশের ঝামেলায় যাব না। এত দূরে শহরে গিয়ে ওদের সাহায্য চাইতে বলছ? যাক, লাগবে না আমার।’ অনুরোধ করলেন, ‘প্লীজ, তোমরাই খুঁজে দাও। দেবে?’
    ‘তা দিতে পারি,’ বলল কিশোর। ‘একই সঙ্গে দুটো তদন্ত চালানো এমন কিছু কঠিন না, তাছাড়া চোর যখন একজন।’
    ‘প্লীজ। তোমার কথা চিরদিন মনে রাখব তাহলে। দেবে শুনেই যা ভাল্লাগছে না।’
    ‘আরেকটা প্রশ্ন, মিস বোরো,’ তর্জনী তুলল কিশোর। ‘মেকসিকান ফেরিওয়ালা দুই চাকার একটা গাধায় টানা গাড়িতে করে এসেছিল, না?’
    ‘হ্যাঁ। খুব কাশছিল। মনে হচ্ছিল, ভারি অসুখ। বেচারাকে দেখে খারাপই লাগছিল।’
    ‘কাকাতুয়া বিক্রি করে রসিদ-টসিদ দিয়েছে কিছু?’
    ‘না-তো। ইস্, বড্ড ভুল হয়ে গেছে,’ শূন্য দৃষ্টিতে তাকালেন মিস বোরো। ‘চাওয়ার কথা মনেই ছিল না।’
    ‘গাড়ির গায়ে কোন নাম বা কিছু লেখা ছিল?’
    মাথা নাড়লেন মিস বোরো। আর কোন তথ্য দিতে পারলেন না তিনি।
    মহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এল দুই গোয়েন্দা।
    বাইরে বেরিয়েই কিশোরের বাহু খামচে ধরল মুসা। ‘কিশোর, কাকাতুয়া দুটোকে কিভাবে খুঁজে বের করবে? কোথায় আছে ওরা কিছুই তো জানি না। একজন শেকসপীয়ার জানে, আরেকজন মাদার গুজ। কিন্তু জঙ্গল থেকে ধরে এনে ওই বুলি তো যে কোন কাকাতুয়াকে শেখানো যায়। অযথা সময় নষ্ট করছি, বুঝলে?’
    চিন্তিত দেখাচ্ছে কিশোরকে। ‘হাইমাসকে দেখে কি মনে হয়েছে তোমার? ছেলেমানুষী করার লোক?’
    ‘মোটেই না,’ জোরে মাথা নাড়ল মুসা। ‘পিস্তল-চেহারার লাইটার দেখিয়ে যে রসিকতা করতে পারে, সে ছেলেমানুষী করার লোক নয়।’
    ‘এক্কেবারে ঠিক। অথচ সেই লোকই দুই রকম বুলি আউরায় এমন দুটো কাকাতুয়া চুরি করল কি কারণে? জোরাল কোন যুক্তি নিশ্চয় আছে, এখন বুঝতে পারছি না।’
    ‘কিন্তু তাকেই বা খুঁজে পাব কি করে?’
    ‘আমরা গোয়েন্দা, বুদ্ধির খেলা খেলি। কোনভাবে...সরো সরো!’ ঝাঁপিয়ে এসে পড়ল মুসার ওপর, নিয়ে পড়ল মাটিতে।
    খানিক আগে মুসার মাথা যেখানে ছিল, শিস কেটে ঠিক সে-পথে উড়ে চলে গেল কি যেন একটা। ঘাসে ঢাকা নরম মাটিতে গিয়ে গাঁথল।
    ‘সরো...ওহ্, সরো!’ ঠেলে গায়ের ওপর থেকে কিশোরকে সরাল মুসা, ‘শ্বাস নিতে পারছি না।’
    উঠে দাঁড়াল কিশোর।
    মুসাও উঠল। জোরে জোরে শ্বাস নিল কয়েকবার।
    নিচু হয়ে জিনিসটা তুলছে কিশোর। লাল টালির একটা টুকরো, মিস বোরোর বাংলোর ছাতে যে-ধরনের টালি, ওখান থেকেই ভেঙে নেয়া হয়েছে কিনা কে জানে।
    ‘এটা মাথায় লাগলে না মরলেও বেহুঁশ হয়ে থাকতে কয়েক ঘণ্টা,’ কিশোর বলল। ‘ভাগ্যিস ঝোপের দিকে চোখ পড়েছিল।’
    ‘থ্যা-থ্যাংকস,’ কাঁপছে মুসার গলা। ‘ছুড়ল কে?’
    ‘দেখিনি। হুঁশিয়ার করল। ও চায় না আমরা বিলি কিংবা বো-পীপকে খুঁজি।’

গল্পটির পরের অংশ পড়তে এখানে যাও: পর্ব : ৪
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য