কাকাতুয়া রহস্য - পর্ব : ২

গল্পটির আগের অংশ পড়তে এখানে যাও: পর্ব : ১

নয়টা ব্লক নিঃশব্দে পেরিয়ে এল বিশাল রোলস-রয়েস।
    মিস্টার ফোর্ডের গেট দিয়ে ছোট আরেকটা গাড়ি বেরোচ্ছে, মোড় নিয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করল এদিকেই। গতি বাড়ছে, সাঁ করে চলে গেল পাশ দিয়ে। পলকের জন্যে ড্রাইভারকে চোখে পড়ল। মোটাসোটা, চোখে চশমা। অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে।
    ‘মিস্টার ফোর্ড যাচ্ছেন,’ চেঁচিয়ে বলল মুসা।
    ‘ভুল,’ শুধরে দিল কিশোর, ‘ও মিস্টার ফোর্ড নয়। হ্যানসন, পিছু নিন।’
    ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল শোফার। বন বন করে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে মুখ ফেরাল আবার গাড়ির।
    মোড়ের কাছে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে কালো গাড়িটা।
    ‘ধরতে পারলে কি করব?’ প্রশ্ন করল মুসা। ‘ওর বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ নেই। বরং আসল ফোর্ডের অবস্থা গিয়ে দেখা উচিত। সাহায্য লাগতে পারে।’
    দ্বিধা করছে কিশোর। মাথা ঝাঁকাল। ‘ঠিকই বলেছ। আগে মিস্টার ফোর্ডকে দেখা দরকার, কি অবস্থায় রয়েছেন কে জানে। সরি, হ্যানসন, আবার ঘোরান।’
    এবার আর বাইরে নয়, কিশোরের নির্দেশে গেটের ভেতরে গাড়ি ঢোকাল হ্যানসন, গাড়িপথ ধরে এগোল।
    সরু পথ, এতবড় গাড়ির উপযুক্ত নয়। দুপাশের ঝোপঝাড়ের পাতা, লতার ডগা আর পামের পাতা ঘষা খাচ্ছে গাড়ির গায়ে।
    অবশেষে পুরানো বাড়ির গাড়িবারান্দায় এসে থামল গাড়ি, খানিকক্ষণ আগে এখানেই আরেকবার এসেছিল দুই গোয়েন্দা।
    ‘মুসা,’ শান্ত কণ্ঠে বলল কিশোর, ‘যে গাড়িটা বেরিয়ে গেল, ওটার বিশেষ কিছু চোখে পড়েছে?’
    ‘টু-ডোর, স্পোর্টস মডেল রেঞ্জার, খুব ভাল ইংলিশ কার,’ বলল মুসা। ‘নতুন ক্যালিফোর্নিয়ার নাম্বার, পুরোটা বলতে পারব না, তবে শেষ দুটো নাম্বার ওয়ান থ্রী।’
    ‘হ্যানসন, আপনি দেখেছেন নম্বরটা?’
    ‘না। গাড়ি চালানোয় ব্যস্ত ছিলাম। নজর পথের ওপর। তবে রেঞ্জার ঠিকই। লাল চামড়ার গদি।’
    ‘যাক, কিছু তথ্য জানা থাকল,’ বলল কিশোর। ‘পরে মোটা লোকটা আর তার গাড়ি খুঁজে বের করব।’ দরজা খুলে নামল সে। ‘এখন দেখি মিস্টার ফোর্ডের কি অবস্থা।’
    কিশোরকে অনুসরণ করল মুসা। বুঝতে পারছে না, কিভাবে পরে লোকটা আর তার গাড়ি খুঁজে বের করবে গোয়েন্দাপ্রধান, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার লাখ লাখ গাড়ির ভেতর থেকে।
    তবে বলেছে যখন, উপায় একটা করবেই কিশোর, তাতে কোন সন্দেহ নেই মুসার।
    হঠাৎ থমকে গেল ওরা। বিষণ্ণ বাড়িটা থেকে আবার শোনা গেল সাহায্যের আবেদন, ‘বাঁচাও!...শুনছ কেউ?...প্লীজ, আমাকে ছাড়াও...’
    জোর নেই তেমন গলায়।
    ‘মারা যাচ্ছে নাকি?’ তাড়াতাড়ি বলল মুসা, ‘চলো তো, দেখি।’
    পেছন দিক থেকে এসেছে আওয়াজ, ওদিকে ছুটল দুই গোয়েন্দা। একটা দরজা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে, ওখান দিয়েই বোধহয় বেরিয়ে গেছে মোটা লোকটা, তাড়াহুড়োয় খেয়াল করেনি ভালমত লাগল কি-না।
    ঢুকে পড়ল দুজনে। আবছা অন্ধকার। মিটমিট করে চোখে সইয়ে নিল স্বল্প আলো।
    কান পেতে শুনছে। নীরব। কোথায় যেন পুরানো তক্তায় চাপ লাগার মৃদু খচখচ আওয়াজ হলো।
    ‘ওই যে, ওই হলটায় ঢুকেছিলাম তখন,’ হাত তুলে দেখাল কিশোর। ‘চলো, উল্টো দিকের ঘরটায় ঢুকি। ওই যে দরজা।’
    ঠেলা দিতেই খুলে গেল দরজাটা। বড় একটা লিভিং রুম। ঘুলঘুলি লাগানো মস্ত জানালা আছে একটা।
    ‘কে...কে ওখানে?’ দুর্বল কণ্ঠে বলে উঠল কেউ জানালাটার কাছ থেকে। জানালার নিচে বিশাল এক ফুলের টব, লাল একটা ফুল ফুটে আছে। মুসার মনে হলো, ফুলটাই যেন কথা বলেছে।
    ‘কেউ...কেউ এসেছ?’ গুঙিয়ে উঠল যেন ফুলটা।
    টবের ছড়ানো পাতার ওপাশে একটা নড়াচড়া চোখে পড়ল মুসার। বড় বড় পাতাগুলো প্রায় ঢেকে রেখেছে শরীরটা।
    ‘ওই যে,’ চেঁচিয়ে উঠল মুসা।
    কাত হয়ে পড়ে আছে রোগা পাতলা একটা দেহ, হাত-পা বাঁধা।
    বাঁধন খুলে মিস্টার ফোর্ডকে ধরে ধরে এনে একটা সোফায় বসিয়ে দিল মুসা আর কিশোর। ক্লান্তিতে এলিয়ে পড়লেন তিনি। ফিসফিস করে ধন্যবাদ দিলেন ছেলেদের।
    একটা চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসল কিশোর। ‘পুলিশকে খবর দিচ্ছি।’
    ‘না না,’ আঁতকে উঠলেন ফোর্ড। ‘ফোনও নেই। খবর দেয়া যাবে না।’
    ‘আমাদের গাড়িতে ওয়্যারলেস টেলিফোন আছে।’
    ‘না,’ গড়িয়ে পড়লেন তিনি, কনুইয়ে ভর দিয়ে আধশোয়া হয়ে তাকালেন কিশোরের দিকে। ‘তুমি কে? এখানে এলে কিভাবে?’
    একটা কার্ড বের করে দিল কিশোর। মিস্টার ক্রিস্টোফার তাদেরকে পাঠিয়েছে, জানাল।
    ‘ডেভিসের কাছে আমি ঋণী হয়ে গেলাম।’
    ‘সত্যি বলছেন পুলিশ ডাকব না? আপনাকে জোর করে বেঁধে ফেলে রেখে গেল, এটা অপরাধ...’
    ‘না। তোমরা গোয়েন্দা, তোমরাই আমার কাকাতুয়াকে খুঁজে দাও। পুলিশকে আর ডাকছি না আমি। জানিয়েছিলাম ওদের। প্রথমে বলল, হয়তো উড়ে চলে গেছে। আমি চাপাচাপি করায় শেষে বলল, পাবলিসিটির জন্যে নাকি আমি এমন করছি।’
    ‘হুঁ, বুঝলাম। এখন ডাকলে আবার বলবে, পাবলিসিটির নতুন ফন্দি করেছেন।’
    ‘হ্যাঁ, বুঝেছ। তাহলে কোন পুলিশ নয়, কথা দাও?’
    কথা দিল কিশোর, পুলিশকে কিছু বলবে না। হারানো কাকাতুয়ার ব্যাপারে সব খুলে বলার অনুরোধ জানাল।
    ‘বিলিকে খুব ভালবেসে ফেলেছি,’ বললেন ফোর্ড। ‘ওর পুরো নাম বিলি শেকসপীয়ার। উইলিয়াম শেকসপীয়ার কে ছিলেন, নিশ্চয় জানো।’
    ‘জানি। দুনিয়ার সেরা নাট্যকারদের একজন। পনেরোশো চৌষট্টি সালে ইংল্যান্ডে জন্মেছিলেন, মারা গেছেন ষোলোশো ষোলো সালে। তাঁর নাটকগুলো এখনও মঞ্চস্থ হয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। বেশি জনপ্রিয় নাটকটা বোধহয় ‘হ্যামলেট’।’
    ‘বহুবার অভিনয় করেছি আমি হ্যামলেটে,’ উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলেন ফোর্ড। ‘দর্শকরা বলত, খুব ভাল অভিনয় করি।’ সোজা হয়ে বসে এক হাত রাখলেন বুকে, আরেক হাত সোজা করে নাটকীয় ভঙ্গিতে ভরাট গলায় বললেন, ‘টু বি, অর নট টু বি, দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশচেন।’ ছেলেদের দিকে ফিরে বললেন, ‘হ্যামলেটের একটা ডায়লগ। সম্ভবত শেকসপীয়ারের লেখার সবচেয়ে পরিচিত লাইন। আমার কাকাতুয়াটাও শিখেছিল, বার বার আউরাতো।’
    ‘শেকসপীয়ারের ডায়লগ বলত?’ মুসা বলল। ‘খুব শিক্ষিত পাখি তো।’
    ‘তা বলতে পারো। কথায় ব্রিটিশ টান ছিল। একটা মাত্র জন্মদোষ ছিল পাখিটার।’
    ‘জন্মদোষ?’ জিজ্ঞেস করল কিশোর।
    ‘হ্যাঁ, তোতলামি। সে বলতঃ টু-টু-টু বি অর নট টু-টু-টু বি, দ্যাট ইজ দা কোয়েশচেন।’
    আগ্রহে উজ্জ্বল হলো কিশোরের চোখ। ‘শুনলে, মুসা? কাকাতুয়া তোতলায়, এই প্রথম শুনলাম। বোঝা যাচ্ছে, দারুণ একখান কেস পেয়েছি।’
    মুসারও তাই মনে হলো। তবে কিশোরের মত খুশি হলো না, শঙ্কিত হলো।
    বিশ্রাম নিয়ে শক্তি ফিরে পেয়েছেন আবার মিস্টার ফোর্ড। খুলে বললেন সব। তিন হপ্তা আগে পাখিটা কিনেছেন তিনি, এক ফেরিওলার কাছ থেকে। ছোটখাট একজন লোক, কথায় জোরালো মেকসিকান টান, গাধায় টানা ছোট একটা গাড়িতে করে এসেছিল।
    ‘এক মিনিট স্যার,’ হাত তুলল কিশোর। ‘আপনার বাড়িতে এল কি করে সে?’
    ‘ও, মিস জলি বোরো পাঠিয়েছে, আমার পাশের ব্লকটায়ই থাকে। সে-ও একটা কাকাতুয়া কিনেছে। যখন শুনল, শেকসপীয়ারের ডায়লগ বলে বিলি, ভাবল, আমি ইনটারেসটেড হব। তাই পাঠাল।’
    ‘তাই?’ নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল কিশোর। ‘সব সময়ই কাকাতুয়া ফেরি করে নাকি লোকটা? পাখিই শুধু বিক্রি করে?’
    ‘তা-তো জানি না,’ চোখ মিটমিট করলেন ফোর্ড। ‘আমার কাছে যখন এল, সঙ্গে মাত্র দুটো খাঁচা। একটায় বিলি। আরেকটায় অদ্ভুত একটা কালচে পাখি, দেখে মনে হয়েছে বারোমেসে রোগী। ফেরিওলা জানাল, ওটা দুর্লভ কালো কাকাতুয়া। কিন্তু ওরকম কোন পাখি আছে বলে শুনিনি। লোকটা বলল, পাখিটার রোগা চেহারা দেখে কেউ কিনতে চায় না।’
    ‘ফেরিওলার নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন? কিংবা গাড়িটার কোন নাম ছিল?’
    ‘না,’ মাথা নাড়লেন অভিনেতা। ‘পুরানো মলিন কাপড়চোপড় পরনে ছিল, কাশছিল বারে বারে। কাকাতুয়াটা বিক্রি করতে পারলে যেন বেঁচে যায়, এমন ভাবসাব। জিজ্ঞেস করায় বলল, তোতলা বলে নাকি কিনতে চায় না কেউ।’
    ‘গাড়িটা সাধারণ দু-চাকার গাড়ি, না?’
    ‘হ্যাঁ। কবে যে রঙ করেছে কে জানে। গাধাটার স্বাস্থ্যও বিশেষ সুবিধের না। ডিংগো বলে ডাকছিল।’
    ‘কিশোর,’ মুসা বলল, ‘কাকাতুয়াটা চুরি করে আনেনি তো?’
    ‘মনে হয় না। খোলাখুলি রাস্তায় নিয়ে বেরোনোর সাহস করত না তাহলে।’ চিন্তিত দেখাচ্ছে কিশোরকে। ‘তবে একটা ব্যাপার পরিষ্কার, বিলির আসল মালিক নয় সে, বুলিও সে শেখায়নি।’
    ‘কি করে বুঝলে?’
    ‘সহজ। মিস্টার ফোর্ড বলছেন, কাকাতুয়াটার কথায় ব্রিটিশ টান ছিল। অথচ ফেরিওলার কথায় মেকসিকান টান।’
    ‘বিষ খেয়ে মরা উচিত আমার,’ কি শাস্তি হওয়া উচিত তার সে-ব্যাপারে বিন্দুমাত্র স্বজনপ্রীতি দেখাল না মুসা, মনে মনে বলল। ‘এই সহজ কথাটা বুঝলাম না? আমি গোয়েন্দাগিরির অযোগ্য।’
    ‘মিস্টার ফোর্ড,’ বলল কিশোর, ‘পাখিটা হারালো কিভাবে খুলে বলুন তো।’
    ‘বলছি,’ ছোট্ট কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিলেন অভিনেতা। ‘দিন তিনেক আগে বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। দরজায় তালা লাগাইনি, জানালাও খোলা ছিল। ফিরে এসে দেখলাম বিলি নেই। ড্রাইভওয়েতে গাড়ির চাকার দাগ। আমার নিজের কোন গাড়ি নেই। অনুমান করতে অসুবিধে হলো না, গাড়ি করে এসেছিল, বিলিকে চুরি করে নিয়ে গেছে।’ ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘অথচ পুলিশের বক্তব্য, বিলি উড়ে চলে গেছে। আচ্ছা তুমিই বলো, খাঁচা নিয়ে উড়ে যায় কি করে কাকাতুয়া? সম্ভব? এই হলোগে আমাদের পুলিশ সাহেবদের বুদ্ধি।’
    ‘না, তা সম্ভব নয়,’ একমত হলো কিশোর। ‘আজকের কথা বলুন। কি কি ঘটেছিল? কেন এসেছিল মোটা লোকটা? কেনই বা আপনাকে বেঁধে ফেলে গেল?’
    ‘ওই শয়তানটা!’ জ্বলে উঠলেন ফোর্ড। ‘প্রথমে এসে বলল, তার নাম হাইমাস, পুলিশের লোক। ভাবলাম, বুঝি মত পালটেছে পুলিশ, আমার পাখিটার ব্যাপারে তদন্ত করতে এসেছে। ডেকে এনে বসালাম ঘরে। নানা রকম প্রশ্ন শুরু করল কাকাতুয়া সম্পর্কে। ফেরিওলার কাছ থেকে আমার প্রতিবেশি কেউ আর কোন কাকাতুয়া কিনেছে কিনা জানতে চাইল। মিস জলি বোরোর কথা বললাম।
    ‘শুনে খুব উৎসাহী হয়ে উঠল ব্যাটা। জিজ্ঞেস করল, আমার কাকাতুয়াটা কি বুলি আউরায়। বললাম, সে কথা পুলিশকে আগেই বলেছি। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল লোকটা। আরেকবার বলার জন্যে অনুরোধ করল। নিছক রুটিন-চেকের খাতিরেই নাকি শুনতে চায়। বললামঃ মাই নেইম ইজ বিলি শেকসপীয়ার। টু বি অর নট টু বি দ্যাট ইজ দা কোয়েশচেন।
    ‘শুনে খুব উত্তেজিত হয়ে উঠল সে। নোট বই বের করে লিখে নিল।’
    ‘পাখিটা যে তোতলায় বলেননি তাকে?’ মুসা জিজ্ঞেস করল।
    ‘না,’ কপালে হাত বোলালেন অভিনেতা। ‘বললে পুলিশ হাসবে মনে করে বলিনি। সোজা কথাই বিশ্বাস করে না, আর তোতলা কাকাতুয়ার কথা করবে।’
    ‘অথচ, মিস্টার হাইমাস খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ল,’ বলল কিশোর, ঠিক প্রশ্ন নয়। ‘আর কিছু জানাতে পারেন?’
    ‘না, আর তেমন কিছু...’ মাথা নাড়তে গিয়েও নাড়লেন না অভিনেতা, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। হাইমাস জিজ্ঞেস করেছে, ফেরিওলার কাছে বিক্রি করার মত আর কোন কাকাতুয়া ছিল কিনা। কালো পাখিটার কথা জানালাম। বলতেই এমন উত্তেজিত হয়ে পড়ল!
    ‘নিশ্চয় ব্ল্যাকবিয়ার্ড, চেঁচিয়ে উঠল সে। হ্যাঁ, নিশ্চয় ব্ল্যাকবিয়ার্ড। তার এই ভাবভঙ্গি দেখে সন্দেহ হলো আমার। শিওর হয়ে গেলাম, হাইমাস পুলিশের লোক নয়।’
    নোট নিতে নিতে মুখ তুলল কিশোর, ‘মিস্টার ফোর্ড, আপনার কাকাতুয়া কেমন তা-ই জিজ্ঞেস করা হয়নি। কি জাতের? নানারকম প্রজাতি আছে, জানেনই তো।’
    ‘সরি, জানি না। তবে বিলি খুব সুন্দর, মাথা আর বুক হলুদ রঙের।’
    ‘হ্যাঁ, তারপর? হাইমাস বুঝল, আপনি সন্দেহ করেছেন?’
    ‘বুঝবে কি? আমিই তো বলছি। রেগে গিয়ে বলেছি,’ কিভাবে বলেছেন, অভিনয় করে দেখালেন, ‘তুমি পুলিশের লোক নও। তুমি একটা ভণ্ড, প্রতারক, চোর, আমার বিলিকে চুরি করেছ। জলদি ওকে ফিরিয়ে দাও, নইলে মজা বুঝিয়ে ছাড়ব।’
    ‘তারপর?’ জিজ্ঞেস করল কিশোর।
    ‘তারপর, বাইরে একটা শব্দ শুনলাম। লাফ দিয়ে উঠে জানালার কাছে চলে গেল হাইমাস। গাড়িপথ ধরে তোমাদেরকে আসতে দেখল। ভাবল, পুলিশ নিয়ে এসেছ। আমাকে কাবু করে হাত-পা বেঁধে ফেলল। মুখে রুমাল গুঁজে দিল, তার আগে কয়েকবার চেঁচাতে পেরেছি। তা নইলে তোমাদের ডাকতে পারতাম না।’ হাত নাড়লেন ফোর্ড। ‘কিন্তু কেন কি হচ্ছে, কিছুই মাথায় ঢুকছে না। আমি তো কারও কোন ক্ষতি করিনি। আমারই পাখি চুরি করেছে, আমার ওপরই যত...যাকগে, এখন আমার বিলিকে ফেরত পেলেই হলো। তোমরা সাহায্য করবে?’
    ‘সাধ্যমত করব স্যার,’ কথা দিল কিশোর।
    মিস্টার ফোর্ডের কাছে আর কিছু জানার নেই। তাঁকে ধন্যবাদ আর বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে এল দুই গোয়েন্দা।
    ডলে ডলে গাড়িটাকে আরও চকচকে করে তুলছে হ্যানসন, ছেলেদেরকে দেখে থেমে গেল। ‘এবার কোথায় যাব, মাস্টার পাশা?’
    ‘বাড়ি চলুন।’
    আঁকাবাঁকা লম্বা গাড়িপথ পেরোচ্ছে রোলস রয়েস। মুসার দিকে ফিরল কিশোর। ‘মনে হয়, হাইমাসই বিলিকে চুরি করেছে। আরও তথ্য জানার জন্যেই ফিরে এসেছে, মিস্টার ফোর্ডের সঙ্গে কথা বলেছে। আমাদের পয়লা কাজ, ওকে খুঁজে বের করা।’
    ‘আমি ভরসা পাচ্ছি না,’ সত্য কথাই বলল মুসা। ‘খুব বাজে লোক। তখন সিগারেট লাইটার বের করে ভয় দেখিয়েছে। ঠেকায় পড়লে আসল পিস্তল বের করে গুলিও করে বসতে পারে, ওকে বিশ্বাস নেই। তাছাড়া, কি সূত্র আছে আমাদের হাতে? খুঁজে বের করব কিভাবে?’
    ‘সেটাই ভাবছি। কোন উপায় নিশ্চয়...হ্যানসন, লাগল লাগল!’
    সতর্ক করার দরকার ছিল না। কিশোরের আগেই ধূসর সেডানটাকে দেখে ফেলেছে হ্যানসন। সাঁই করে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে নিয়েছে রোলস রয়েসকে। পুরানো, অবহেলিত একটা ফুলের বিছানা মাড়িয়ে একেবারে নষ্ট করে দিল। আর কিছু করারও ছিল না।
    বেখেয়ালে গাড়ি চালাচ্ছে সেডানের ড্রাইভার। দুর্ঘটনা যে এড়ানো গেছে, এই যথেষ্ট, তা-ও হ্যানসন সতর্ক থাকায়।

গল্পটির পরের অংশ পড়তে এখানে যাও: পর্ব : ৩
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য