নাইটফল - আইজ্যাক আসিমভ

সারো ভার্সিটির ডিরেক্টর অ্যাটন ৭৭-এর ক্রুদ্ধ মূর্তি দেখেও কোনো ভাবান্তর ঘটল না সাংবাদিক থেরেমন ৭৬২-র। পেশার খাতিরেই এসবে অভ্যস্ত সে। তার ওপর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা হয় বেশি খেয়ালি, কাজেই আমল দিল না। গত দু মাস ধরে লোকটার অদ্ভুত কথাবার্তার ভেতরের সার জানতে হবে, তাই তার ইন্টারভিউ নিতে এসেছে থেরেমন ৭৬২। এখন তার মেজাজ-মর্জির দিকে তাকাবার সময় নেই।
    ‘স্যার,’ ডিরেক্টর বললেন, ‘আপনি আপনার যে শয়তানি মতলব নিয়ে এসেছেন, তার...’
    অবজার্ভেটরির টেলিফটোগ্রাফার বীনে ২৫ বাধা দিল, ‘স্যার, শত হলেও...’
    ‘কথার মধ্যে বাধা দেবে না,’ একদিকের সাদা ভুরু উঁচু করে তাকে দেখলেন অ্যাটন ৭৭। ‘তুমি এঁকে নিয়ে এসেছ, ঠিক আছে, আমি মেনে নিয়েছি। কিন্তু অবাধ্যতা গোছের কিছু করতে যেয়ো না, সেটা সহ্য করব না।’
    থেরেমন ভাবল মুখ খোলার এটাই সময়, ‘ডিরেক্টর অ্যাটন, আপনি যদি আমার বক্তব্য শেষ করার অনুমতি দেন...’
    ‘আপনার কোনো কথার মূল্য নেই এখন, ইয়ংম্যান। আপনি পত্রিকায় যে কলাম লেখেন, গত দু মাসের ঘটনাবলির সঙ্গে তার কোনো তুলনাই হয় না। আমার এবং আমার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে বলতে গেলে রীতিমতো প্রচারণা যুদ্ধে নেমেছেন আপনি, কিন্তু যে ভীতি দূর করতে জনগণকে সংঘবদ্ধ করতে চেয়েছেন, তা ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের হাসির পাত্র করে তুলতে চেয়েছেন।’
    টেবিল থেকে এক কপি ‘সারো সিটি ক্রনিকল’ তুলে নিয়ে ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে ঝাঁকালেন। ‘আজ যা ছাপা হয়েছে, তাতে আপনার মতো নির্লজ্জেরও উচিত ছিল এখানে আসতে দ্বিধা করার। আপনারা, সব সাংবাদিকের।’
    পত্রিকা মেঝেতে ফেলে দিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। ‘আপনি যেতে পারেন,’ বলে গম্ভীর চেহারায় তাকিয়ে থাকলেন এ গ্রহের ছয় সূর্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল অস্তমিত গামার দিকে। দিগন্তের হালকা কুয়াশার ছোঁয়ায় হলুদ হয়ে গেছে ওটার আলো। অ্যাটন জানেন, আর কোনদিন ওটাকে দেখতে পাবেন না তিনি। অন্তত মানুষ হিসেবে।
    দ্রুত ঘুরলেন তিনি, ‘না, দাঁড়ান। যাবেন না। আসুন, আপনি যা জানতে চান বলছি।’
    যাওয়ার কোন লক্ষণই ছিল না সাংবাদিকের মধ্যে, ধীরপায়ে বৃদ্ধের দিকে এগোল সে। বাইরের দিকে ইঙ্গিত করলেন তিনি, ‘ছয় সূর্যের মধ্যে কেবল বেটা আছে আকাশে, দেখলেন তো?’
    অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন থেরেমন অবশ্যই দেখতে পাচ্ছে। একদম মাথার ওপর রয়েছে বেটা, টকটকে লাল আলো ছড়াচ্ছে। আজ ওটাকে বেশ ছোট দেখাচ্ছে, এত ছোট কখনো দেখেনি থেরেমন। যদিও ওটাই এখন লাগাশের একচ্ছত্র শাসক। লাগাশের নিজস্ব সূর্য আলফা। তাকে কেন্দ্র করে ঘোরে লাগাশ। ওটা রয়েছে উল্টোদিকে। তার দূরাগত অন্য দুই সঙ্গীও থাকে ওদিকে। বেটার অবস্থান অন্যখানে।
    সাংবাদিকের দিকে ঘুরলেন অ্যাটন। ‘আর মাত্র চার ঘণ্টা, তারপর সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে। ছেপে দিন খবরটা, যদিও তা পড়ার কেউ থাকবে না সকালে।’
    ‘কিন্তু যদি তা না হয়?’ বলল থেরেমন।
    ‘অবশ্যই হবে!’
    ‘শুনছি। তারপরও যদি না হয়?’
    দ্বিতীয়বারের মতো কথা বলে উঠল বীনে। ‘স্যার, ওর কথা আপনার শোনা উচিত।’
    ‘ভোটাভুটি হলে কেমন হয়?’ থেরেমন প্রস্তাব দিল।
    অবজার্ভেটরির অপেক্ষমান অন্য পাঁচ স্টাফ অস্বস্তির সাথে নড়েচড়ে বসল। নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছে তারা, এখনো কারো পক্ষ নেয়নি।
    ‘আমার দরকার নেই,’ জবাব দিলেন অ্যাটন, ‘তবে আপনার বন্ধু যখন বলছে, তখন পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি আপনাকে। বলুন, কী বলার আছে।’
    ‘বেশ,’ বলল থেরেমন, ‘চার ঘণ্টা পর যা-ই ঘটুক, আমি যদি এখানে বসে তা দেখতে চাই আপনি আপত্তি করবেন? কিছু ঘটলে তো ঘটলই, আমি কিছু ছাপানোর সুযোগ পাব না, কিন্তু যদি না ঘটে, তা হলে পাব। অবশ্য সেক্ষেত্রে যা-ই লিখি, তা বন্ধুত্বপূর্ণ হবে। আপনাকে ঠাট্টার পাত্র করে তোলার মতো কিছু হবে না।’
    ‘গুরুত্বপূর্ণ?’
    ‘নিশ্চয়ই।’ চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসল সাংবাদিক, ‘আমার লেখার ধরন একটু কঠোর হতে পারে, কিন্তু যাকে নিয়ে লেখা, সব সময় তাকে বেনিফিট অব ডাউট দিয়ে থাকি আমি। আপনাকে বুঝতে হবে মানুষ এখন আর বুক অব রেভিলেশনের কথা বিশ্বাস করে না। এবং তারা এটাও চায় না যে বিজ্ঞানীরা তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিক, ধর্মবিরোধীদের কথা বিশ্বাস করুক।’
    ‘বিষয়টা সেরকম নয়। ওরা ওদের তথ্য দিয়েছে, আমরা দিয়েছি আমাদের। আমাদের গুলোয় ধর্মবিশ্বাসীদের মতো অতীন্দ্রিয় গোছের কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নেই। সত্যি চিরদিনই সত্যি। সত্যি কথা বলে আমরা ওদের ক্ষেপিয়ে তুলেছি। এখন আপনাদের চেয়ে ওরাই আমাদের বেশি ঘৃণা করে।’
    ‘আমি আপনাদের ঘৃণা করি না। শুধু বলতে চাইছি মানুষের মধ্যে নানা গুজব চলছে। জনতা ক্ষেপে আছে।’
    ‘থাকতে দিন।’
    ‘কিন্তু কালকের...’
    ‘কাল বলে কিছু আসবে না।’
    ‘সে তো আগেই মেনে নিয়েছি,’ থেরেমন বলল, ‘কিন্তু তারপরও যদি আপনার হিসেবে ভুল হয়ে থাকে, কী ঘটতে পারে ভেবে দেখেছেন? গত দু মাস থেকে ব্যবসাপত্ৰ সব প্রায় স্থবির হয়ে আছে। কেউ আপনার ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বাস করে না, আবার পুঁজি খাটানোর ঝুঁকিও নেয় না। তাই সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান হওয়ার অপেক্ষায় আছে তারা। যদি কিছু না-ই ঘটে, আপনার চামড়া তুলতে আসবে জনতা। তাদের কথা হচ্ছে, কোনো উন্মাদ যদি যখন খুশি ভয়ঙ্কর একটা কিছু বলে দেশের অর্থনীতির চাকা আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে তা হলে তাকে মেরামত করা অবশ্যই প্রয়োজন।’
    ‘আপনি আসলে কী প্রস্তাব করতে চাইছেন?’ ক্রুদ্ধ চোখে তাকে দেখলেন ডিরেক্টর।
    হাসি ফুটল সাংবাদিকের মুখে, ‘আমি প্রচারণার দায়িত্ব নিতে চাই। আপনাদের প্রত্যেককে নির্বোধ, বাচাল প্রমাণ করতে চাই। তা হলে দেখবেন, মানুষ রাগ ভুলে যাবে। নির্বোধের ওপর কেউ রাগলেও তা স্থায়ী হয় না।’
    বীনে মাথা দোলাল, অন্যরাও বিড়বিড় করে সমর্থন জানাল থেরেমনকে। তাই দেখে ব্যাপারটাকে আর অগ্রাহ্য করতে পারলেন না অ্যাটন, বললেন, ‘বেশ, থাকুন আপনি। দেখুন, কী ঘটে। তবে আমাদের কোনো কাজে বাধা দেবেন না দয়া করে। আমি এখানকার ইন-চার্জ...’
    ‘হ্যালো, হ্যালো!’ ভেতরে ঢুকে চড়া গলায় বলে উঠল কেউ একজন। ‘মর্গের মতো নীরব কেন রুমটা? সবাই বহাল আছেন তো?’
    ‘শীরিন, তুমি এখানে কেন?’ ডিরেক্টর প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার না হাইডআউটে থাকার কথা?’
    ‘ওখানে ভালো লাগছিল না, তাই চলে এলাম এখানে কী ঘটে দেখতে। তা ছাড়া বাইরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, বেটার তাপ কোনো কাজেই আসছে না।’
    ‘বাইরেই বা কেন গিয়েছিলে শুনি?’
    ‘কিসের হাইডআউট?’ থেরেমন প্রশ্ন করল।
    চোখ কুঁচকে তাকে দেখল শীরিন। ‘আপনি কে?’
    ‘সাংবাদিক থেরেমন ৭৬২,’ অ্যাটন বললেন, ‘ওঁর নাম নিশ্চয়ই শুনেছ তুমি?’
    কাছে এসে হাত বাড়াল সাংবাদিক। ‘এবং আপনি সারো ভার্সিটির শীরিন ৫০১ সাইকোলজিস্ট। আপনার কথা শুনেছি আমি। হাইডআউট কী, স্যার?’
    ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য শ তিনেক নারী-পুরুষ-শিশুকে বিশেষ এক জায়গায় সরিয়ে রাখা হয়েছে,’ বলল ৫০১। ‘কেয়ামত... আই মিন, আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হলে ওরা যাতে অন্তত কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারে, সে জন্য আর কি!’
    ‘আই সি! অন্ধকার এবং তারার আলো পৌঁছতে না পারে, এমন জায়গা নিশ্চয়ই?’
    ‘হ্যাঁ। যদি তেমন কিছু ঘটেই যায়, তা হলে মানুষগুলো বাঁচবে না হয়তো। তবু খাবার, পানি ইত্যাদি আছে ওদের সাথে।’
    ‘ওসবের সাথে আরো কিছু আছে,’ অ্যাটন বললেন, ‘আমাদের সংগৃহীত যাবতীয় রেকর্ডস আছে ওর মধ্যে। আর সব যায় যাক, ওগুলো রক্ষা করতেই হবে।’
    উপস্থিত সবাইকে দেখল সাংবাদিক, প্রত্যেকে তাদের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে দেখে নিচু গলায় বলল, ‘আর কোথাও গিয়ে বসলে ভালো হয়। কিছু প্রশ্ন আছে আমার।’
    ‘অ্যাঁ? ও, পাশের রুমে চলুন তা হলে।’
    রুমটা বেশ বড়ই। মেঝেতে মেরুন কার্পেট বিছানো, তার ওপর কিছু গদিমোড়া চেয়ার। জানালায় পুরু পরদা। বেটার আলোয় রক্তের রং ধারণ করেছে ভেতরটা। মুখোমুখি বসল তিনজন।
    শিউরে উঠল সাংবাদিক। ‘সেকেন্ডের জন্য হলেও এক ফোঁটা সাদা আলোর বিনিময়ে আমি অনেক কিছুই বিলিয়ে দিতে পারি এখন। গামা অথবা ডেলটা যদি থাকত আকাশে।’
    ‘কী জানতে চান, বলুন,’ অ্যাটন বললেন, ‘আমার হাতে সময় খুব অল্প।’
    কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল থেরেমন, ‘ওয়েল, গোটা বিষয়টা কী নিয়ে খুলে বলবেন দয়া করে?’
    পলকে চেহারা বিগড়ে গেল বিজ্ঞানীর। প্রায় ফেটে পড়লেন তিনি, ‘অর্থাৎ আপনি ভেতরে খবর না জেনেই এতদিন আমাদের বিরুদ্ধে কলমবাজি করেছেন?’
    ‘না, স্যার। একেবারে কিছুই জানি না বললে ভুল হবে। জানি। কথা হল, আপনি বলছেন যে আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গোটা বিশ্ব অন্ধকারে ডুবে যাবে, মানুষ সব উন্মাদ হয়ে যাবে, এর পিছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী, তাই জানতে চাইছি আমি।’
    ‘সে প্রশ্ন অ্যাটনকে করে লাভ নেই,’ শীরিন বলে উঠল, ‘ও তা হলে একগাদা ফিগার গ্রাফ দেখাবে। আমাকে প্রশ্ন করুন, আমি পারব মুখে জবাবটা দিতে।’
    ‘বেশ, আপনাকেই করছি প্রশ্নটা।’
    মাথা দোলাল সাইকোলজিস্ট। ‘আপনি বোধহয় জানেন, আমাদের লাগাশের সভ্যতার আবর্তনশীল চরিত্র আছে?’
    ‘জানি, বর্তমান আর্কিওলজিক্যাল থিওরি তাই বলে। আসলেই কি ব্যাপারটা সত্যি? আই মিন প্রতিষ্ঠিত সত্যি?’
    ‘প্ৰায়। ব্যাপারটা গভীর রহস্যময় অবশ্য। এরকম নয়টা সভ্যতার খোঁজ আমরা পেয়েছি, সবগুলোই যার যার শিখরে পৌঁছতে পেরেছিল, এবং সবগুলোই আগুনে ধ্বংস হয়ে গেছে। কেউ জানে না কেন। সেসব সভ্যতার সংস্কৃতির কণামাত্রও অবশিষ্ট নেই। অগ্নিকাণ্ডের কিছু কিছু ব্যাখ্যা অবশ্য পাওয়া গেছে। যেমন কেউ কেউ বলে, তখন মাঝেমধ্যে ঝড়-বৃষ্টি হত, অথবা লাগাশ নির্দিষ্ট সময় পরপর এক প্রকাণ্ড সূর্যের মধ্য দিয়ে যেত। এ ছাড়া আরো ভয়াবহ সমস্ত সম্ভাবনার কথাও কেউ কেউ বলেছে। তবে এ ব্যাপারে একটা থিওরি হচ্ছে...’
    ‘আমি জানি,’ বাধা দিল সাংবাদিক। ‘ধর্মবিশ্বাসীদের বুক অব রেভিলেশনের নক্ষত্র সম্পর্কিত পৌরাণিক কাহিনীর কথা বলছেন আপনি।’
    ‘ঠিক। ওদের মতে প্রতি দু হাজার পঞ্চাশ বছর পরপর বিশাল এক গুহায় ঢোকে লাগাশ, তার ফলে সমস্ত সূর্য উধাও হয়ে যায় আকাশ থেকে, গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায় পৃথিবী। এরপর নাকি ‘নক্ষত্ৰ’ দেখা দেয়, ওগুলোর প্রভাবেই মানুষ উন্মাদ হয়ে যায়, সভ্যতা ধ্বংস হয় ইত্যাদি।’
    আলোচনায় ছিলেন না ডিরেক্টর, জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি, বিরক্তিসূচক শব্দ করে বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে।
    ‘ব্যাপারটা কী?’ প্রশ্ন করল থেরেমন।
    ‘তেমন কিছু না, ওঁর দুই সহকারীর আসার কথা ছিল। ওদের দেরি দেখে অস্থির হয়ে আছেন ডিরেক্টর।’
    ‘কোত্থেকে আসবে তারা?’
    ‘হাইডআউট থেকে। সে যা হোক, প্রায় চার শ বছর আগে জেনোভি ৪১ আবিষ্কার করেন লাগাশ সূর্যের চারদিকে ঘোরে। ছ’টারই। তা প্রমাণ করতে অনেক দীর্ঘ সময় লেগেছে আমাদের। এবং মাত্র বিশ বছর আগে আমরা তাতে সফল হয়েছি। তবে, গত দশকে ইউনিভার্সাল গ্র্যাভিটেশনের থিওরি অনুযায়ী আলফাকে কেন্দ্র করে লাগাশের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে দেখা গেছে আগের হিসাব মিলছে না।’
    থেরেমনও কিছু বুঝতে পারছে না, সব জটিল মনে হচ্ছে। উঠে জানালা দিয়ে কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকল সে, অন্যমনস্ক। ওদিকে শীরিন বলে চলেছে, ‘...পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। অন্ধকার। মানুষ তখন আলোর জন্য আগুন জ্বালাতে বাধ্য হবে।’
    ‘কী বললেন, আগুন?’
    ‘নিশ্চয়ই! কিছু না পোড়ালে আলো হবে কেন? আগুন শুধু তাপ দেয় না, আলোও দেয়।’
    ‘অর্থাৎ কাঠ পোড়াবে মানুষ?’ প্রশ্ন করল থেরেমন।
    ‘শুধু কাঠ কেন, যা পাবে তাই পোড়াবে।’

ডেডলাইনের আর আধঘণ্টা বাকি।
    পরের ঘটনা খুব দ্রুত ঘটল। ওপরের অবজার্ভেটরির গম্বুজ থেকে ঘণ্টাধ্বনির মতো ঢং ঢং শব্দ ভেসে আসতে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল বীনে। ‘কী হচ্ছে ওপরে?’ বলে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে এগোল। অন্যরা অনুসরণ করল তাকে।
    ওপরে উঠে থমকে গেল বীনে। অসংখ্য ফটোগ্রাফিক্স প্লেট ভেঙে ছড়িয়ে আছে মেঝেতে, এক লোক ঝুঁকে দেখছে সেগুলো। তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল বীনে, মেঝেতে ফেলে দিয়ে গলা চেপে ধরল লোকটার। তার সাথে আরো কয়েকজন স্টাফ যোগ দিল।
    সবার শেষে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠলেন অ্যাটন, ‘ছেড়ে দাও ওকে।’
    গলা ছেড়ে কলার ধরে লোকটাকে টেনে তুলল বীনে, জোর এক ঝাঁকি দিয়ে ভাঙা প্লেট দেখিয়ে বলল, ‘এসবের অর্থ কী?’
    ‘আমি ইচ্ছে করে ভাঙি নি,’ লোকটা বলল, ‘দুর্ঘটনাবশত...’
    ‘তুমি লাটিমার না?’ বাধা দিয়ে বলে উঠলেন অ্যাটন, ‘ক্যাল্টিস্ট!’
    ‘হ্যাঁ,’ বো করল সে। ‘হিজ সেরেনিটি সর ৫-এর অ্যাডজুটেন্ট।’
    ‘বেশ। কিন্তু এখানে কেন এসেছ তুমি, তিনি পাঠিয়েছেন?’
    ‘এ প্রশ্নের জবাব আমি দেব না।’
    অধৈর্য হয়ে উঠলেন ডিরেক্টর। ‘কেন, কী চান তোমাদের নেতা? আমি তো তাঁকে ‘ফ্যাক্টস’ জানিয়েই দিয়েছি, আর কী চাই?’
    চাউনি সরু হয়ে উঠল লাটিমারের। ‘ওসব ভুয়া, বানানো।’
    ‘কী করে বুঝলে তুমি?’
    ‘আমি জানি।’
    রাগে লাল হয়ে উঠল ডিরেক্টরের চেহারা। ‘আশ্চর্য।’
    ‘মোটেই আশ্চর্য নয়। আপনার কার্যকলাপ এর মধ্যেই যথেষ্ট ক্ষতি করে ফেলেছে। তাই আমরা চাই এই শয়তানি যন্ত্রের কাজ বন্ধ করতে। এসব আমরা জানি না, আমরা জানি শুধু নক্ষত্রের নির্দেশ। দুঃখ যে এগুলো ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়েছি আমি।’
    ‘সফল হলেও কোনো লাভ হত না,’ অ্যাটন বললেন, ‘আমাদের প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য এর মধ্যেই পেয়ে গেছি আমরা। বাকি কেবল প্রত্যক্ষ প্রমাণ যোগাড়ের কাজটা। কিন্তু তাই বলে ভেবো না তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে,’ পিছনের লোকগুলোর দিকে ফিরলেন, ‘কেউ খবর দাও পুলিশে।’
    বিরক্তিতে চেঁচিয়ে উঠল শীরিন, ‘এখন ওসবের সময় নেই, অ্যাটন। ওকে আমার হাতে ছেড়ে দিন, আমি দেখছি! বেটার গ্রহণ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি, এখন শহর থেকে পুলিশ আসবে কি না সন্দেহ। তা ছাড়া এ যখন নিজের অপরাধ স্বীকার করছে, তখন নিজেরাই কেন মেরামত করি না একে?’
    ‘যা খুশি করতে পারেন,’ দ্রুত জবাব দিল লোকটা, ‘তবে এ-ও বলে রাখছি, সুযোগ পেলেই আমি আমার আসল কাজ শেষ করব।’
    ‘তাই?’ ক্রূর হাসি ফুটল শীরিনের মুখে। ‘আর একটু পর সূর্যগ্রহণ লাগবে, রাখ, তখন অন্ধকারে মজা দেখাব আমি তোমাকে।’
    ‘ওসবে আমি ভয় পাই না,’ বলল সে, ‘পেলে এ কাজে আসতাম না। তবে এটাও জেনে রাখুন এ জন্য পস্তাতে হবে আপনাদেরকে।’ দরজার কাছের এক উঁচু টুলে বসে পড়ল লোকটা।
    এদিকে থেরেমন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল, হঠাৎ চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে উঠল তার। এক হাত তুলে আকাশ দেখাল, ‘ওই দেখুন।’
    ঘুরে তাকাল উপস্থিত প্রত্যেকে, নানারকম বিস্ময় ধ্বনি উঠল। দেখা গেল বেটার এক দিক ঢাকা পড়ে গেছে।
    ‘প্রথম কন্টাক্ট নিশ্চয়ই পনের মিনিট আগে ঘটেছে,’ ক্রুদ্ধ গলায় বলল শীরিন, ‘এই ব্যাটার দিকে খেয়াল দিতে গিয়ে মিস করেছি আমরা।’ সাংবাদিকের দিকে ফিরল। ‘অ্যাটন ক্ষেপে ব্যোম হয়ে আছে, এখন কোনো প্রশ্ন করতে যাবেন না দয়া করে। ঘাড় ধরে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেবে তা হলে।’
    কেউ বিড়বিড় করে কিছু বলছে শুনে ঘুরে তাকাল সাইকোলজিস্ট। দেখল লোকটা ক্যাল্টিস্ট লাটিমার। জানালা দিয়ে চোখ বড় বড় করে বেটার দিকে তাকিয়ে কী সব বলছে যেন।
    ‘কি বলে লোকটা?’ থেরেমন প্রশ্ন করল।
    ‘বুক অব রেভিলেশনের মুখস্থবিদ্যা ঝাড়ছে মনে হয়, শুনুন।’
    ‘...এবং সেই অন্ধকারের মধ্যে উদয় হল নক্ষত্ৰ, অসংখ্য। আকাশের সেই অপরূপ শোভা দেখে...’
    আকাশের দিকে তাকাল সাইকোলজিস্ট ও সাংবাদিক। বেটার এক-তৃতীয়াংশ ঢাকা পড়ে গেছে দেখে শিউরে উঠল দুজনেই।
    ‘আমি একটা কথা ভাবছি,’ থেরেমন বলল, ‘সভ্যতার একের পর এক বিলীন হয়ে গেলেও বুক অব রেভিলেশনের অস্তিত্ব এখনো টিকে আছে কী করে? তা ছাড়া ওটা কার লেখা? এর মধ্যে কি রহস্য লুকিয়ে আছে? নাকি...’ আচমকা থেমে গেল সে। ডিরেক্টরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছে?’
    ‘হাইডআউটের প্রাইভেট লাইনে কথা বললাম এইমাত্র,’ বৃদ্ধ বললেন, ‘ওরা সিল করে দিয়েছে হাইডআউট। পরশু সকাল পর্যন্ত ওর মধ্যে থাকবে সবাই। কিন্তু...’
    ‘কী?’
    নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছু ভাবলেন ডিরেক্টর। ‘ক্যাল্টিস্টরা শহরের মানুষকে সংগঠিত করে আমাদের অবজার্ভেটরি ধ্বংস করতে আসছে।’
    কেউ কিছু বলল না। বেশ কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভঙ্গ করল সাইকোলজিস্ট শীরিন। ‘নিশ্বাসে সমস্যা হচ্ছে?’ প্রশ্ন করল সাংবাদিককে।
    ‘না, কেন?’
    ‘আমার হচ্ছে। ক্লাসট্রোকোবিক অ্যাটকের লক্ষণ এটা। জানালা দিয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকার ফল।’
    ‘আমার লাগছে ঠাণ্ডা,’ থেরেমন বলল, ‘জুতোর মধ্যে আঙ্গুল সব জমে গেছে মনে হচ্ছে।’
    বাইরের আলো আরো দ্রুত কমে আসছে। ভেতরের প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তারপর...হঠাৎ হলুদ আলোয় ঘর ভরে উঠল। বিস্ময়ে ঘুরে তাকাল সবাই, দেখল অ্যাটনের হাতে আজব ধরনের একটা আলো জ্বলছে। এক ফুট লম্বা, এক ইঞ্চি ডায়ার একটা রড ধরে আছেন বৃদ্ধ, ওটার মাথায় জ্বলছে আগুন। একই রকম আরো কিছু রড দেখা গেল তার অন্য হাতে।
    শীরিন এগিয়ে গেল তার দিকে, বাকি রডগুলোর কয়েকটা জ্বালাতে সাহায্য করল। দেওয়ালে ঝোলানো মেটাল হোল্ডারে রেখে দেওয়া হল ওগুলো। আলোয় ভরে উঠল ঘর।
    ‘আর্টিফিশিয়াল লাইট মেকানিজম,’ ব্যাখ্যা করল সে, ‘এরকম কয়েক শ তৈরি করেছি আমরা।’
    ‘কী দিয়ে তৈরি?’ থেরেমন প্রশ্ন করল।
    ‘পানির খাগড়া। ভালো করে রোদে শুকিয়ে পশুর চর্বিতে ডুবিয়ে ফের শুকানো হয়েছে। একেকটা অন্তত আধঘণ্টা জ্বলে।’
    আবার নীরব হয়ে পড়ল গম্বুজ। নিজের টুল নিয়ে একটা আলোর নিচে এসে বসল লাটিমার, পড়া চালিয়ে যেতে লাগল। এই সুযোগে থেরেমনও কাজে লেগে পড়ল। কালকের সারো সিটি ক্রনিকলের জন্য বিশেষ রিপোর্ট লিখতে শুরু করে দিল।
    ক্ৰমে ঘন হয়ে উঠতে লাগল ঘরের বাতাস। বাইরের ধুলো ঢুকছে ভেতরে, হলুদ আলোর সামনে ধূসর পরদার মতো ভাসছে, রড পুড়ছে মৃদু চড়চড় শব্দ তুলে। কর্মচারীদের কেউ কেউ নিজের টেবিলে মুখ গুঁজে কাজ করছে, কেউ বা হাঁটাহাঁটি করছে ধীর, দ্বিধান্বিত পায়ে।
    আওয়াজটা প্রথম কানে এল সাংবাদিক থেরেমনের। নিচের বন্ধ লোহার দরজায় দুম্ দুম্ শব্দ উঠছে, বাইরে থেকে আঘাত করা হচ্ছে। এক মুহূর্ত পর অন্যরাও শুনল, সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে উঠল সবাই।
    ‘ওরা এসে পড়েছে।’ তড়াক করে উঠে দাঁড়াল সাংবাদিক, ‘দাঁড়িয়ে আছেন কেন, আসুন সবাই! টেবিল চেয়ার দিয়ে দরজা ঠেকা দিতে হবে, কুইক।’
    হুড়োহুড়ি পড়ে গেল ভেতরে, যত চেয়ার-টেবিল আছে, সব স্তূপ করে ব্যারিকেড তৈরি করা হল। ওদিকে দুম্ দুম্ আওয়াজ বাড়ছে, জনতার ক্রুদ্ধ হুংকারও। বাইরে তখন ঘোর অন্ধকার।
    কাজ শেষ করে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘুরে দাঁড়াল শীরিন। ‘কী অন্ধকার।’ চাপা গলায় বলল, ‘অ্যাটন। কোথায় আপনি?’ ঘন ধুলোর মধ্য দিয়ে সামনেটা দেখার চেষ্টা করল। ‘অ্যাটন।’
    একজোড়া কাঁপা হাত স্পর্শ করল তাকে, ‘শীরিন?’
    ‘হ্যাঁ, অ্যাটন। বাইরের চিন্তা করতে হবে না, ওদের ঠেকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছি।’
    ওদিকে ক্যামেরার সামনে প্ৰস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছে বীনে, আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। বেটার অন্তিম আলোয় জ্বলছে তার চোখমুখ। অন্যদিকে ক্যাল্টিস্ট লাটিমার উঠে পড়ল বসা থেকে দু হাত মুঠো পাকিয়ে, এগোল। ব্যাপারটা চোখে পড়তে বাধা দিতে এগিয়ে এল থেরেমন।
    ‘কোথায় যাচ্ছ...’
    তলপেটে ক্যাল্টিস্টের হাঁটুর গুঁতো খেয়ে গুঙিয়ে উঠল সে। কোনোমতে বলল, ‘হারামজাদা বিশ্বাসঘাতক।’
    একই মুহূর্তে ধূসর পরদার আড়াল থেকে বীনে চেঁচিয়ে উঠল, ‘বয়েজ! সময় হয়েছে, ধীরে ধীরে ক্যামেরার পিছনে যাও, ছবি তোল!’
    একযোগে অনেকগুলো ‘ক্লিক’ শোনা গেল। তার একটু পর বেটার সুতোর মতো শেষ রশ্মিটুকু উধাও হয়ে গেল। একই মুহূর্তে বাইরের ক্রুদ্ধ জনতাও নীরব হয়ে গেল।
    কবরের নীরবতা চারদিকে। বাইরে রক্ত-হিম-করা অন্ধকার।
    ধড়মড় করে উঠে বসল থেরেমন। দম আটকে গেছে গলায়। আতঙ্কে কাঁপছে সে থরথর করে। উঠে পা বাড়াল সে অন্ধের মতো। হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে থাকা কারো সাথে হোঁচট খেয়ে আবার পড়ে গেল।
    ‘আলো!’ চেঁচিয়ে উঠল ভাঙা গলায়, ‘কেউ আলো জ্বেলে দাও।’
    এদিকে অ্যাটনও চেঁচাচ্ছে, আতঙ্কিত, সন্ত্রস্ত শিশুর মতো কী সব বকে চলেছে একনাগাড়ে। কেউ একজন দেয়াল থেকে জ্বলন্ত একটা রড তুলে নিল, কিন্তু ধরে রাখতে পারল না শেষ পর্যন্ত। মেঝেতে পড়ে নিবে গেল ওটা। লাটিমারের গলা দিয়ে একটা জান্তব গোঙানি বেরিয়ে এল। ফেনা দেখা দিল মুখের দুই কষায়।
    ওদিকে আঁধার ফুঁড়ে তারা ফুটেছে আকাশে। একটা দুটো নয়, অসংখ্য অজস্র।
    অন্যদিকে সারো শহরের দিকে দিগন্তে টকটকে লাল আলো ফুটতে শুরু করেছে। উজ্জ্বলতা ক্রমে বাড়ছে তার। সূর্যের আলো নয়।
    দীর্ঘরাত এসেছে আবার।
রূপান্তর: ফারহান সিদ্দিক
Previous
Next Post »
2 মন্তব্য