রাজার বাগান - মণিপুরী রূপকথা

    কোন এক রাজ্যে এক রাজা ছিল। সেই রাজ্যের রাজার ছিল একটি সুন্দর ফুলের বাগান। স্বর্গের পারিজাত ফুল থেকে শুরু করে এমন কোন ফুল নেই যে রাজার বাগানে ফুটে না। গোলাপ, চামেলী, সূর্যমুখী আর চাঁপা ফুলের সুগন্ধের বাহার। রজনীগন্ধার মাঝে নিত্য ভ্রমর খেলা করত। আর মধু আহরণ করে বেড়াত। রাজা ভ্রমরের মৌ মৌ রবে নিজে গুনগুনিয়ে মনের অজান্তে গান গেয়ে উঠত। রাজ্যের হাজার কাজের মাঝেও এমন কোন দিন নেই যে রাজা বাগানে বেড়াতে যেত না। সুস্থ সুঠামদেহী পাহাড়াদার দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা বাগান তদারক করে থাকে। বাগানের মাঝখানে থাকত একটি আরাম কেদারা। রাজা মাঝে মধ্যে পরিশ্রান্ত হলে এখানে বিশ্রাম নিত। আর বাগানে ফুলের সৌন্দর্য অবলোকন করত। আলোর ঝলমল আভায় চোখ ধাঁধা লেগে যেত। হাজার হােক রাজার বাগান তো।
    কিছুদিন হল রাজার মনটা বিষম খারাপ। কারণ রাজার বাগানে আগের মত রং বেরঙের ফুল ফুটে না। ফুলের কুড়ি দেখা যায় কিন্তু ফুল দেখা যায় না। রাজা পাহারাদারকে ডেকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করল। কিন্তু পাহাড়াদার ফুল না ফোটার কোন কারণ বলতে পারে না। রাজ জ্যোতিষীর ডাক পড়ল। সেও কিছুই বলতে পারল না। রাজা পাহারােদরকে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করল। নুতন পাহারাদার নিয়োগ করল। তবুও বাগানে ফুল ফুটল না। প্রজারা ও সবাই চিন্তিত হল। ফুলের কুড়ি দেখা যায় কিন্তু ফুল ফোটে না। সারাদেশ জুড়ে একই কথা রাজার বাগানে ফুল ফোটে না কেন?
    একদিন প্রতিবেশী রাজ্যের এক রাজকুমার রাজপরিবারের কলহ ও অন্তর্দ্বন্দ্বে রাজ্য ছেড়ে ছদ্মবেশে বের হয়েছিল। সে এই রাজ্যে এসে পৌছল। এই সুঠামদেহী বলিষ্ঠ যুবকটিকে দেখে রাজা উপযুক্ত মনে করল আর তাকে পাহারাদার নিয়োগ করল । রাজা বলল, “এই বাগানে যদি তুমি ফুল ফুটাতে পারো, তাহলে তোমাকে অর্ধেক রাজ্য দেওয়া হবে।”
    ছদ্মবেশী রাজকুমার খুশিমনে পাহারাদারের দায়িত্ব নিল। একদিন রাত্ৰিতে সে পাহারা দিচ্ছিল। রাত বারোটার পর বাগানে ফুল ফুটতে শুরু করল। বাগানটি ফুলে ফুলে ভরে উঠল। পাহারাদারের আনন্দ দেখে কে? সে অর্ধেক রাজ্য পাবার আশায় মনে আহাদিত হয়ে উঠল। কিন্তু কপালে না থাকলে দেবে কে? শেষরাতে পাহাড়াদার একটুখানি ঘুমাল।
    তখনই সর্বনাশটা ঘটল । ঘুম থেকে জেগে দেখতে পেল কোথাও ফুল নেই, চারিদিকে তাকিয়ে দেখল। কিন্তু কোথাও কাকে খুঁজে পেল না। মনের দুঃখে সে কারণ খুঁজতে খুঁজতে মহাভাবনায় পড়ল।
    রাজা তাকে জিজ্ঞাসা করল, “কিহে যুবক! ফুল কোথায়? চারিদিকে শুধু কুড়ি আর কুড়ি দেখছি।”
    পাহারাদার বলল, “গভীর রাতে দু’একটি ফুল ফুটেছিল। রাত পােহাবার সাথে সাথে তা অদৃশ্য হয়ে গেল। আমাকে আর একটি দিন সময় দিন, মহারাজ।” রাজা তাকে একদিন সময় দিল ।
    পরদিন পাহারাদার চােখে তৈল মেখে নিল যাতে ঘুম না আসে।
    গভীর রাত। চারিদিক নিস্তব্ধ নিঝুম। ধীরে ধীরে বাগানে কুড়িগুলি ফুটে ফুলে পরিণত হল। ঝলমলে আলোয় রঙিন ফুলের বাহারে এক স্বর্গের শোভা বর্ষিত হল। পাহারাদারের পরীক্ষা এবার সার্থক হবার পথে ।
    রাত দ্বিপ্রহরে ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা । সেই নিস্তব্ধ প্রহরে স্বর্গের দেবতা ইন্দ্রের (সরালোল) সাতটি কন্যা হুড়মুড়িয়ে এসে নামল। আর তাড়াহুড়ো করে বাগানে প্রবেশ করল। পরীরা কার আগে কে ঝুড়ি পূর্ণ ঝুড়িতে ভরে নিল। পাহারাদার যুবতী কন্যাদের রূপের মাধুর্য দেখে চমকে উঠল। তার জীবনে এমন সুন্দরী অন্সরী আর কোনদিন দেখা মিলে নাই। পরীরা সমস্ত ফুল ছিড়ে নিয়ে ছুটে পালাচ্ছে।
    রাজার কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা পাহারাদারের মনে হল । এবার যে তার গর্দান যাবে। সে দৌড়ে স্বর্গের কন্যাদের কাছে গেল। সকলেই তার নাগালের বাইরে ।
    সবচেয়ে ছোট কন্যাটি বেশি ফুল ছিঁড়েছিল। তাই তার জলে যেতে একটু দেরি হল। একে একে ছয়টি কন্যা পালাবার পর পাহারাদার সপ্তম কন্যাকে ধরতে সমর্থ হল। সে উড়নার এক অংশ ধরে টান মারল। আর অমনি স্বর্গের কন্যা কোমল সুরে গেয়ে উঠল,

থাম দিদিরা, থাম
ধরার মানব ছুঁয়েছে মোরে
ওড়না ফেলে কি যাব!

    পাহারাদার কিছুতেই ছাড়ার পাত্র নয়। আরও জোরে সে উড়না ধরে কন্যাটিকে টান দিল। স্বর্গের কন্যা বলল, “আমাকে ছেড়ে দাও, আমার দেরি হয়ে যাবে। আমি আমার হবু বরের জন্য ফুলের মালা গাঁথতে এসেছি।”
    কন্যার কথা শুনে পাহারাদার আরও উৎসুক হয়ে টান দিল ওড়নায়। আর বলল, “তুমি কে? কি তোমার পরিচয়, আগে আমাকে বল?”
    মেয়েটি বলল, “আমি স্বর্গের দেবতা ইন্দ্ৰ (সরালোল) রাজার মেয়ে। রাজ্যের আর এক উত্তম রাজপুত্রকে আমরা প্রতিদিন ফুলের মালা উপহার দিয়ে থাকি! এইজন্যে এই মনোহর বাগানে আসা। সবচেয়ে উত্তম উপহার যে দিতে পারবে রাজপুত্র তাকেই বিবাহ করবে। আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে। আমাকে ছেড়ে দাও।”
    “তাহলে বাগানের সমস্ত ফুল তুমি ফুটিয়ে দাও।” পাহারাদার বলল ।
    রাজকন্যা ধীরে ধীরে তার কোমল হাত দিয়ে ফুলের বাগানটি স্পর্শ করল। সাথে সাখে সমস্ত বাগান ফুলে ফুলে ভরে উঠল। পাহারাদারের মন খুশিতে ভরে উঠল। কিন্তু রাজকন্যার মনে ভয় শঙ্কা দেখা দিল। মর্ত্যের মানুষ যখন তাকে স্পর্শ করেছে তখন স্বর্গের রাজপুত্র তাকে হয়ত গ্ৰহণ করবে না। সেজন্য সে পাহারাদারকে বিবাহ করার জন্য অনুরোধ করল। পাহারাদার হাতে পূর্ণিমার চাঁদ পেল। সে স্বর্গের কন্যাকে বিবাহ করল।
    রাজকন্যা এবার বলল, “বিয়ে তো হল। কিন্তু বাবা-মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসার জন্য আমাকে স্বৰ্গে একবার ফিরে যেতে হবে ।”
    পাহারাদার বলল, “তুমি চলে গেলে আমি কীভাবে থাকব! তোমাকে দেখার ইচ্ছা হলে কী করব! মর্তের মানুষ আমি স্বর্গে তো যেতে পারব না।”
    রাজকুমারী তাকে ছোট্ট একটি যাদুর বাঁশি দিয়ে বলল, “যেখানেই থাকি না কেন এই যাদুর বাঁশিতে ফুঁ দিলেই আমি তোমার কাছে চলে আসব।” এই কথা বলে রাজকন্যা স্বৰ্গে চলে গেল ।
    কিছুদূর যেতেই পাহারাদার বাঁশিতে ফাুঁ দির। রাজকন্যা তাড়াতাড়ি নেমে এল। স্বামীকে কিছু সান্তুনা দিয়ে চলে গেল।
    আবার গিয়ে স্বর্গে পৌঁছাবার মুহুর্তে সে যাদুর বঁশিতে ফুঁ দিল। রাজকন্যা তাড়াতাড়ি নেমে পড়ল। এসে জিজ্ঞাসা করল, “কেন তুমি আবার ডাকালে?”
    না, আর ডাকব না। রাজকন্যা চলে গেল ।
    ভোর হল। রাজা এসে দেখতে পেল ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে তার সখের বাগান। সে পাহাড়াদারের প্রতি প্ৰসন্ন হল। রাজা অর্ধেক বাগান পাহারাদারকে দিল। তার সঙ্গে রাজার একমাত্র কন্যা লেহাউসেনাকে বিবাহ দিল। লেহাউসেনা অপরূপ সুন্দরী। প্রাসাদের অদূরে তাদের জন্য রাজা একটি বাড়ি তৈরি করে দিতে বলল। তাতে সে রাজী হল না। সে বলল যে সেও এক রাজকুমার। সমস্ত ঘটনা খুলে বলায় রাজা খুশি হল এবং রাজকন্যাকে নিয়ে নিজ রাজ্যে ফিরে গেল ।
    এদিকে স্বর্গের রাজকন্যা দেরিতে পৌছার কারণে ফুল উপহার দিতে পারল না। তাছাড়া পৃথিবীর মাটি ও মানুষের স্পর্শমাখা গন্ধে স্বর্গের দেবতারা তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। দুঃখে অপমানে রাজকন্যা কাঁদতে লাগল ।
    একদিন রাজকুমার ভুলক্রমে বালিশের নিচে যাদুর বঁশিটি রেখে ভ্ৰমণে বেরিয়েছিল। তার স্ত্রী বাঁশিটি পেয়ে নেড়েচেড়ে কিছু সময় দেখল। তারপর বাঁশিটিতে ফুঁ দিল। বাঁশিতে ফু দেওয়া মাত্রই স্বর্গের কন্যা নেমে আসল। স্বর্গের কন্যা মর্ত্যে নেমে বুঝতে পারল সে সতীনের ঘরে এসেছে। সে সতীনের গালে দুটাে চড় বসিয়ে দেওয়া মাত্রই সে পড়ে মরে রইল। স্বর্গের কন্যা স্বৰ্গে চলে গেল ।
    কিছুক্ষণ পর রাজকুমার এসে দেখল এক অমূলক ঘটনা ঘটে গেছে। পাশে পড়ে থাকা বাঁশিটা দেখে বুঝতে পারল যে, স্বৰ্গকন্যা এসেছিল। সে বঁশিতে ফুঁ দিল ।
    স্বর্গের কন্যা নেমে এলে সে এই মৃত্যুর ঘটনা জানতে চাইল। কন্যা ক্ষেপে গিয়ে উত্তর দিল, “একটি সাধারণ মেয়ে বঁশিতে ফুঁ দিয়ে তাকে ডাকবে কেন? এইজন্য তাকে মেরেছি। ”
    রাজকুমার নিজের ভুল স্বীকার করল। সে স্বর্গের কন্যাকে মৃতাকে জীবন্ত করে দেবার অনুরোধ করল।
    স্বর্গের কন্যা তাকে স্পর্শ করল ।
    মৃতদেহে প্ৰাণের সঞ্চার হল। রাজকন্যা জেগে উঠল। দু'রাজকন্যা নিয়ে রাজকুমার সুখের সংসার গড়ল ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য