জংবাহাদুর - মুহম্মদ জাফর ইকবাল

সদরঘাটে পুরানো লোহা-লক্কড়ের দোকানে সফদর আলীর সাথে আমার দেখা, মোটা লোহার হাতলের মতো দেখতে বিদঘুটে একটা জিনিস দরদাম করছিলেন। এরকম একটা জিনিস মানুষের কোনো কাজে লাগতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস হয় না। কাছে গিয়ে তাঁর কাঁধে হাত রাখতেই তিনি ভীষণ চমকে ঘুরে তাকালেন, আমাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ও আপনি! আমি আরো ভাবলাম—’
    ‘কী ভাবলেন?’
    সফদর আলী কথা শেষ না করে সন্দেহের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থেমে গেলেন, বললেন, ‘নাহ্‌, কিছু না।’
    সফদর আলী তাঁর অভ্যাসমতো কথাটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছেন দেখে আমি আর ঘাঁটালাম না। তাঁকে কেমন জানি একটু উদভ্ৰান্তের মতো দেখাচ্ছে, চেহারায় কেমন একটু উড়ো উড়ো ভাব, ভালো করে তাকিয়ে দেখি বাম হাতের বুড়ো আঙুলে একটা ব্যান্ডেজ। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার আঙুলে কী হল?’
    ‘আর বলবেন না, কিকুলমুকাসের স্ক্রু লাগাচ্ছিলাম, এমন সময় একটা মশা কামড় দিল ঘাড়ে, একটু নড়তেই ডালাটা খুলে এসে বুড়ো আঙুলটাকে থেঁতলে দিয়েছে।’
    কিকুলমুকাস কী জিনিস জিজ্ঞেস করব কি না ভাবছিলাম, তার আগেই সফদর আলী আমাকে হাতলটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কুড়ি টাকা চাইছে, নিয়ে নেব নাকি, কী বলেন আপনি?’
    আমি আঁৎকে উঠে বললাম, ‘মাথা খারাপ আপনার? কুড়ি টাকা এই বিদঘুটে হাতলটার জন্যে? আমাকে তো কেউ বিনে পয়সায় দিলেও এটা নেব না! চলেন, চলেন এখান থেকে—’ আমি তাঁকে সেখান থেকে টেনে সরিয়ে নেবার চেষ্টা করি।
    দোকানি আমার কথায় একটু মনঃক্ষুণ্ণ হল বলে মনে হল; বলল, ‘কী বলেন স্যার, খাঁটি আমেরিকান স্টিল, ডাণ্ডা মারলেও কিছু হবে না। ফাইটিং প্লেনের পার্টস, কেনা দামে দিয়ে দিচ্ছিলাম। নেন, না হয় আরো দুই টাকা কম দেবেন।’
    সফদর আলী চোখ ছোট করে গলা নামিয়ে দোকানিকে বললেন, ‘ফাইটিং প্লেন কেউ কখনো লোহা দিয়ে বানায়? অ্যালুমিনিয়াম, ক্যাডমিয়াম আর টাংস্টেন, জিনিসটা হালকা করতে হবে না? সেন্টার অব গ্র্যাভিটি যদি ঠিক না থাকে জিনিসটার ব্যালেন্স হবে কীভাবে?’
    দোকানি কিছু না বুঝে একটু অপ্ৰস্তুতের মতো হাসল। সফদর আলী আরো কী বলতে চাইছিলেন, আমি কোনোমতে তাঁকে টেনে সরিয়ে আনি। সদরঘাটের ভিড় বাঁচিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সফদর আলী কী যেন চিন্তা করতে থাকেন, আমি তাঁকে বিরক্ত করলাম না। খানিকক্ষণ কোনো কথাবার্তা নেই, হঠাৎ একসময় ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মানুষের ডিজাইনটা আসলে ঠিক হয় নি।’
    আমি কিছু না বুঝে বললাম, ‘কি বললেন?’
    ‘মানুষের ডিজাইন, খুবই দায়সারা ডিজাইন।’
    ‘মানে?’
    ‘যেমন ধরেন এই হাতের ব্যাপারটা, মোটে দুইটা হাতে কি কিছু হয়? একটা মানুষের অন্তত চারটা হাত থাকা উচিত ছিল।’
    ‘চারটা হাত?’
    ‘হ্যাঁ। দুইটা হাতে কিছুই হয় না।’
    আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, ‘চারটা হাতের কী দরকার? আমার তো দুইটা হাতেই বেশ চলে যাচ্ছে। ছেলেবেলায় একবার নাটক করতে স্টেজে উঠেছিলাম—বিবেকের পার্ট, তখন দুই হাত নিয়েই কী মুশকিল, কোথায় নিয়ে লুকাই, কী করি! চার হাত হলে যে কী সর্বনাশ হত!’
    বাচ্চা ছেলেদের কথা শুনে বড়রা যেভাবে হাসে, সফদর আলী সেভাবে একটু হেসে বললেন, ‘কী যে আপনি বলেন! কখনো সল্ডারিং করেছেন?’
    ‘না।’
    ‘করলে বুঝবেন। সল্ডার করার সময় এক হাতে জিনিসটা ধরতে হয়, আরেক হাতে সল্ডারিং আয়রন। ব্যস, দুই হাতই শেষ, সল্ডার ধরবেন কী দিয়ে? যদি চারটা হাত থাকত তা হলে তিন নম্বর হাত দিয়ে সল্ডার ধরা যেত।’
    ‘কিন্তু আপনি তো চারটা হাতের কথা বলছেন।’
    ‘হ্যাঁ, চার নম্বর হাত হচ্ছে চুলকানোর জন্যে। লক্ষ করে দেখেছেন, যখন কোনো কাজে দুই হাতই ব্যস্ত থাকে তখন সবসময় নাকের ডগা চুলকাতে থাকে?’
    আমাকে স্বীকার করতেই হল যে ব্যাপারটি সত্যি এবং চুলকানোর জন্যে একটা বাড়তি হাত থাকা আসলে মন্দ ব্যবস্থা নয়।
    সফদর আলী তাঁর ব্যান্ডেজ বাঁধা বুড়ো আঙুলটি দেখিয়ে বললেন, ‘যদি আমার চারটা হাত থাকত, তাহলে আমি তিন নম্বর হাত দিয়ে কিকুলমুকাসের ডালাটা ধরে রাখতে পারতাম। যখন মশাটা এসে কামড় দিল তখন চার নম্বর হাত দিয়ে কষে দিতে পারতাম একটা থাবড়া।’
    সফদর আলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, মশার জন্যে, না চার নম্বর হাত নেই সেই দুঃখে ঠিক বুঝতে পারলাম না।
    আমি চার হাতের একটা মানুষ কল্পনা করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ব্যাপারটা খুব সহজ হল না, খানিকক্ষণ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়ে সফদর আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাকি দুটো হাত থাকবে কোথায় সফদর সাহেব?’
    ‘কেন, বগল থেকে বেরিয়ে আসবে।’
    আমি কল্পনা করলাম আমার বগল থেকে আরো দুটো হাত বেরিয়ে আসছে, কিন্তু ব্যাপারটা চিন্তা করেই আমার গায়ে কেমন জানি কাঁটা দিয়ে ওঠে।
    ‘বাড়তি হাত দুটোতে যে পাঁচটা করে আঙুল থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই,’ সফদর আলী গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘দুটো করে থাকলেই হয়, নখ কাটতে তাহলে বেশি সময় নষ্ট হবে না।’
    যখন নিজেকে মোটামুটি বিশ্বাস করিয়ে এনেছি যে সত্যি মানুষের চারটা হাতের দরকার, তখন হঠাৎ আমার অন্য একটা সম্ভাবনার কথা মনে হল, একটু ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘কথাটা আপনি হয়তো ঠিকই বলেছেন, কিন্তু—’
    ‘দুই আঙুলের কথা তো, আমি—’
    ‘না, আমি চার হাতের কথা বলছিলাম। আপনার কথা ঠিক, চার হাত হলে কাজকর্মে অনেক সুবিধে, কিন্তু চারটা হাতই যে একজন মানুষের হতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই।’
    ‘মানে?’
    ‘আপনি খুঁজে পেতে একটা সহকারী নিয়ে নেন, তাহলেই আপনাদের দু’জনের মিলে চারটা হাত হয়ে যাবে।’
    ‘ঠিক বলেছেন,’ সফদর আলীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, কিন্তু মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্যে। হঠাৎ কী একটা মনে পড়ে যায় আর তিনি গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়তে থাকেন।
    আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হল?’
    ‘সহকারী নেয়া যাবে না।’
    ‘কেন?’
    সফদর আলী গলা এত নামিয়ে আনলেন যে কথা প্ৰায় শোনা যায় না, ফিসফিস করে বললেন, ‘অনেক গোপন জিনিসের উপর গবেষণা করি তো, জানাজানি হয়ে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। এই যে কিকুলমুকাসের কথা বলছি, সেটা যদি কেউ জেনে ফেলে, কী সর্বনাশ হবে আপনি জানেন?’
    সফদর আলী এত গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়তে থাকেন যে দেখে আমিও ঘাবড়ে যাই। এরপর আর কথাবার্তা জমল না, তিনি গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ছেন, আমি পিছু-পিছু হাঁটছি—এরকম আর কতক্ষণ চলতে পারে? নবাবপুরের মোড়ে এসে আমি একটা বাস নিয়ে নিলাম, সফদর আলী যাত্রাবাড়ির দিকে রওনা দিলেন, সেখানে তাঁর নাকি কি দরকার।
    দু’দিন পরের কথা। বিকেলে বাসায় এসে শুনি আমার নাকি একটা টেলিগ্রাম এসেছে। টেলিগ্রামে জরুরি কিছু আছে ভেবে ভয়ের চোটে তাড়াতাড়ি সবাই মিলে সেটা খুলে ফেলেছে, কিন্তু পড়ে এখন কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। বুঝতে পারার কথা নয়। কারণ টেলিগ্রামে লেখা:
    ‘চার হাতের প্রয়োজন নাই। দুই হাত এবং দুই হাত যথেষ্ট। আপনি ঠিক। কিন্তু সহকারী নয়। সহজ সমাধান। কাওরান বাজার। সন্ধ্যা সাতটা।’
    নিচে কোনো নাম লেখা নেই, কিন্তু বুঝতে কোনো অসুবিধে হল না এটা কার কাজ। টেলিগ্রাম করতে তাঁকে বাসে কিংবা রিকশায় যত দূর যেতে হয়েছে, বাসার দূরত্ব তার অর্ধেকও নয়, কিন্তু তাঁকে সেটা কে বোঝাবে? বাসার সবাই জানতে চাইল ব্যাপারটা কি, আমি বোঝালাম আমার এক বন্ধুর রসিকতা। আমার বন্ধুদের সম্পর্কে বাসার সবার খুব উচ্চ ধারণা আছে সেরকম দাবি করব না, কাজেই ব্যাপারটা বিশ্বাস করাতে বেশি বেগ পেতে হল না।
    সাতটার সময় কাওরান বাজারে চায়ের দোকানে হাজির হয়ে দেখি সফদর সাহেব টেবিলে একটা কাগজ বিছিয়ে সেখানে কী যেন একটা আঁকিজুকি করছেন। আমাকে দেখে তাড়াতাড়ি সেটা ভাঁজ করে পকেটে লুকিয়ে ফেললেন। আমি পাশে গিয়ে বসতেই গলা নামিয়ে বললেন, ‘বানর, বানর হচ্ছে সমাধান!’
    ‘কী বললেন?’
    ‘বললাম বানর।’
    ‘বানর? কিসের বানর?’
    ‘কিসের আবার হবে,’ সফদর আলী একটু অসহিষ্ণু স্বরে বললেন, ‘আমার একটা বানর দরকার।’
    আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বানর দিয়ে কী করবেন?’
    ‘আপনি বলছিলেন না সহকারীর কথা? বানর হবে আমার সহকারী। আগে শুধু একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে।’
    ‘বানরকে শিখিয়ে পড়িয়ে নেবেন?’ আমি উচ্চস্বরে হাসতে গিয়ে থেমে গেলাম, আমার হঠাৎ গিনিপিগকে দিয়ে কাচ্চি বিরিয়ানি রান্না করার কথা মনে পড়ে গেল। সফদর আলী যদি গিনিপিগকে দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করিয়ে নিতে পারেন, কে জানে সত্যিই হয়তো বানরকে শিখিয়ে পড়িয়ে সহকারী বানিয়েও নিতে পারবেন। তবু ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না, একটু কেশে বললাম, ‘বানরকে দিয়ে কী কী কাজ করানোর কথা ভাবছেন?’
    ‘কঠিন কিছু নয়, সহজ কাজ। এই সকালে দু’টি রুটি টোস্ট করে এককাপ চা তৈরি করে দেবে, ঘরদোর একটু পরিষ্কার করবে, দুপুরে চিঠিপত্রগুলো আনবে—এইসব ছোটখাট কাজ।’
    আমি কল্পনা করার চেষ্টা করলাম, ‘সফদর আলী বসে আছেন আর একটা বানর তাঁর জন্যে কড়া লিকারের চা তৈরি করছে!
    ‘আসল কাজ অবশ্যি আমার গবেষণা,’ সফদর আলী চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘বানরকে দরকার সেজন্যে।’
    ‘বানরের উপর গবেষণা?’
    ‘না না, বানরের উপর আর নতুন কী গবেষণা হবে, সে তো প্রায় শেষ। আমি আমার নিজের গবেষণার কথা বলছি। বানর আমার গবেষণায় সাহায্য করবে, সে হবে আমার বাড়তি দুই হাত। মনে করেন কিকুলমুকাসটা খুলতে চাই, বলব, বান্দর আলী, স্ক্রু-ড্রাইভারটা নিয়ে এস তো—’
    ‘বান্দর আলী?’
    সফদর আলী লাজুকভাবে হেসে বললেন, ‘নামটা খারাপ হল?’
    ‘না না, খারাপ হবে কেন, চমৎকার নাম!’ আমি হাসি গোপন করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পশুপাখিকে এভাবে কাজকর্ম শেখানো কি খুব কঠিন নাকি?’
    ‘সেটা নির্ভর করে কী ধরনের পশু তার উপর,’ সফদর আলী একটা লম্বা বক্তৃতা দেয়ার জন্যে প্রস্তুত হলেন, ‘যদি ম্যামেল বা স্তন্যপায়ী প্রাণী হয়, তা হলে খুবই সহজ। ম্যামেলদের ভেতরে বানরের বুদ্ধি আবার অন্যদের থেকে বেশি, কাজেই বানরকে শেখানো একেবারে পানিভাত। পদ্ধতিটা হচ্ছে পুরস্কার পদ্ধতি, ট্রেনিং দেবার সময়ে যখনি একটা কাজ ঠিকভাবে করে তখনি পুরস্কার দিতে হয়। মনে করেন আপনি একটা বানর, আমি আপনাকে বললাম, বান্দর আলী, স্ক্রু-ড্রাইভারটা নিয়ে এস তো। আপনি তখন আমার কথা কিছু না বুঝে লাফ-ঝাঁপ দেয়া শুরু করবেন। আমি তখন চেষ্টা করব আপনাকে স্ক্রু-ড্রাইভারের কাছে নিয়ে যেতে। লাফ-ঝাঁপ দিতে দিতে হঠাৎ যদি ভুলে স্ক্রু-ড্রাইভারটা ছুঁয়ে ফেলেন, সাথে সাথে আপনাকে পুরস্কার হিসাবে একটা কলা দেব। এরকম কয়েকবার যদি করি তখন আস্তে আস্তে আপনি বুঝতে পারবেন স্ক্রু-ড্রাইভার কথাটা শুনে আপনি যদি স্ক্রু-ড্রাইভারটা গিয়ে ধরেন, তাহলে আপনি একটা কলা পাবেন। কলার লোভে এরপরে যখনই আমি বলব স্ক্রু-ড্রাইভার, আপনি ছুটে যাবেন স্ক্রু-ড্রাইভারটা ধরতে। এভাবে আস্তে-আস্তে অগ্রসর হতে হয়। প্রথমে স্ক্রু-ড্রাইভারটা ধরলেই আপনাকে একটা কলা দেব, কিন্তু পরে কলা পেতে হলে আপনাকে স্ক্রু-ড্রাইভারটা আমার কাছে নিয়ে আসতে হবে। বুঝতে পারলেন তো ব্যাপারটা?’
    ‘হুঁ, তা বুঝেছি। নিজেকে একটা বানর ধরে নিলে বুঝতে ভারি সুবিধে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে এভাবে শেখাতে অনেক দিন লেগে যাবে না?’
    ‘না না, অনেক দিন লাগবে কেন, দু’সপ্তাহে হয়ে যাবে। তা ছাড়া আমার একটা মনোযোগ বাড়ানোর ওষুধ আছে, সেটা খাইয়ে দিলে তো কোনো কথাই নেই।’ সফদর আলী মাথা চুলকে বললেন, ‘কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অন্য জায়গায়।’
    ‘কোন জায়গায়?’
    ‘একটা বানর কোথায় পাই?’
    ‘বানর পাচ্ছেন না?’
    ‘নাহ্‌, অনেক খুঁজলাম কয়দিন ধরে, কোথাও বানর নেই। পুরানো ঢাকায় একজন বলল, এক কাঁদি সাগর কলা আর একটা গরম সোয়েটার হলে সে নাকি ধরে দেবে। আমি তাকে এনে দিলাম, কিন্তু সেই থেকে তার আর দেখা নেই।’
    আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, ‘সাগর কলা না হয় বুঝলাম, কিন্তু বানর ধরার জন্যে সোয়েটার কী জন্যে?’
    সফদর আলী মাথা চুলকে বললেন, ‘কী জানি! জিজ্ঞেস করেছিলাম, তা বলল, এখন শীত পড়ে গেছে, তাই বানরেরা নাকি সোয়েটারের জন্যে খুব ব্যস্ত। লোকটা বানর ধরতে গিয়ে কোনো ঝামেলায় পড়ল কি না কে জানে! বানরেরা খুব দুষ্টু হয় জানেন তো, বিশেষ করে চ্যাংড়া বানরেরা। ঠিকানাও রাখি নি যে একটু খোঁজ নিই।’
    আমি আর কিছু বললাম না, বিজ্ঞানী মানুষেরা যদি বোকা না হয়, তাহলে বোকা কারা?
    বানর কী ভাবে জোগাড় করা যায় সফদর আলী সেটা নিয়ে আমার সাথে পরামর্শ করতে বসলেন। বানরটা বেশি ছোট হলে অসুবিধে, কাজকর্ম করতে পারবে না। বনজঙ্গল খুঁজে একটা ধাড়ি বানর ধরে আনতেও সফদর আলীর আপত্তি, তাহলে নাকি পোষ মানাতেই অনেক দিন লেগে যাবে। তাঁর একটি পোষ মানানোর ওষুধ আছে, কিন্তু সেটা একটু কম-বেশি হয়ে গেলে পোষ মানার বদলে নাকি অল্প-অল্প দাড়ি গজিয়ে যায়! সফদর আলীর ইচ্ছা একটা পোষা বানর জোগাড় করা। আমি ভেবেচিন্তে তাকে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে বুদ্ধি দিলাম। একটু ইতস্তত করে সফদর আলী শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলেন। নিজের ঠিকানা জানাতে চান না, তাই একটা পোস্ট অফিস বক্স খুলে নেয়ার কথা বললাম। বিজ্ঞাপনটা আমাকে লিখে দিতে বললেন, লেখালেখি তাঁর নাকি ভালো আসে না। কিন্তু আমি যেটাই লিখি তাঁর পছন্দ হয় না। ভাষাটা নাকি ঠিক জোরালো হচ্ছে না। ঘণ্টাখানেক পরিশ্রম করে যেটা তাঁর পছন্দ হল সেটা এরকম:
    ‘সন্ধান চাই! সন্ধান চাই!! সন্ধান চাই!!! পোষা বানরের সন্ধান চাই! উপযুক্ত মূল্যে কিনিয়া লইব!! যোগাযোগ করুন!!!’
    সফদর আলী বিজ্ঞাপন লেখা কাগজটি নিয়ে তখন-তখনি খবরের কাগজের অফিসের দিকে রওনা দিলেন, পরবর্তী এক সপ্তাহ সেটি ছাপা হবে।
    বিজ্ঞাপনটি ছাপা হবার সাথে সাথে সফদর আলী বানরের সন্ধান পেতে থাকবেন, আমার ঠিক সেরকম বিশ্বাস ছিল না। সপ্তাহ দুয়েক পার হবার পর হয়তো একটা-দুইটা চিঠি পাবেন, আমি অন্তত তাই ভেবেছিলাম, তাই সপ্তাহ শেষ হবার আগেই আবার যখন টেলিগ্রাম এসে হাজির, আমি একটু অবাক না হয়ে পারলাম না। টেলিগ্রামটা পড়ে অবশ্যি অবাক থেকে বেশি শঙ্কিত হয়ে উঠি, কারণ তাতে মাত্র দু’টি শব্দ লেখা:
    ‘বিজ্ঞাপন ব্যুমেরাং।’
    টেলিগ্রামের অর্থ না বোঝার কোনো কারণ নেই, সফদর আলী বলতে চাইছেন, বিজ্ঞাপনটি দেয়ার ফলে কোনো লাভ না হয়ে বরং উল্টো ঝামেলার সৃষ্টি হয়েছে। সেটি ঠিক কীভাবে হতে পারে আমি কিছুতেই ভেবে পেলাম না। সে রাতে আমার আবার এক জায়গায় খাবার দাওয়াত, বড়লোক আত্মীয়, তাদের টাকা পয়সার গল্পে ঠিক জুত করতে পারি না। তাই টেলিগ্রামের অজুহাত দেখিয়ে বাসার সবাইকে আত্মীয়ের বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমি কাওরান বাজারে সেই চায়ের দোকানে হাজির হলাম। আমার কপাল ভালো। সফদর আলী সেখানে বসে আছেন, তাঁকে দেখে চেনা যায় না। চোখের কোণে কালি, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মনে হয় বয়স দশ বৎসর বেড়ে গিয়েছে! আমি ভয়ে-ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সফদর সাহেব, কী হয়েছে?’
    ‘কী হয়েছে? আপনার বুদ্ধি শুনেই তো এখন আমার এই অবস্থা।’
    ‘কী হয়েছে আগে বলবেন তো!’
    সফদর আলী কোনো কথা না বলে তাঁর বিরাট পকেট থেকে এক বান্ডিল চিঠি বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই দেখেন।’
    আমি মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে বললাম, ‘বাহ্‌, অনেক চিঠি পেয়েছেন তো!’
    সফদর আলী মেঘস্বরে বললেন, ‘আগে পড়ে দেখেন।’
    আমি একটা পোস্ট কার্ড তুলে নিই। সেখানে গোটা গোটা হাতে একটা কবিতা লেখা:
    ‘সফদর আলী মিয়া, সদরঘাটে গিয়া, বান্দরের গেঞ্জি কেনে চাইর টাকা দিয়া!’
    আমি কোনোমতে হাসি চেপে রেখে পরের চিঠিটা খুলি। সেটি শুরু হয়েছে এভাবে:
    ‘জনাব, আপনি বানরের সন্ধান চান? আমার মধ্যম পুত্র (বয়স এগার) এত পাজি যে তার স্বভাব আর বানরের স্বভাবের মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই। আপনার আপত্তি না থাকিলে তাহাকে আপনার কাছে নিয়া আসিতে চাই.....’
    এরপরে মধ্যম পুত্রের বিভিন্ন কাজকর্মের নমুনা দেয়া আছে, পড়ে আমারও কোনো সন্দেহ থাকে না যে, তার স্বভাবের সাথে বানরের স্বভাবের বিশেষ পার্থক্য নেই। আমি আরেকটা চিঠি তুলে নিই, এটা ঝকঝকে কাগজে লেখা, উপরে একটা ফার্মের নাম আর টেলিফোন নাম্বার। টাইপ করা চিঠি। শুরু হয়েছে এভাবে:
    ‘জনাব সফদর আলী, বানরের জন্য আপনি যে বিজ্ঞাপন দিয়াছেন, তাহা আমাদের দৃষ্টিগোচর হইয়াছে। আমরা পাইকারি বানর বিক্রেতা, দেশ ও বিদেশে আমরা বানরের চালান দিয়া থাকি। ব্যবসার কারণে আমরা খুচরা বিক্রয় করিতে অসমর্থ। আপনি যদি দুই শতের অধিক বানর ক্রয় করিতে চান অবিলম্বে যোগাযোগ করুন। আমাদের বানর সুস্থ সবল এবং মিষ্ট স্বভাববিশিষ্ট।.....’
    এরপরে বানরের আকার-আকৃতি এবং স্বভাবের সুদীর্ঘ বর্ণনা রয়েছে। সফদর আলী আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, আমার হাসি গোপন করার চেষ্টা তাঁর চোখে পড়ে গেল। তিনি কেন জানি হঠাৎ আমার উপর রেগে উঠলেন, মুখ কালো করে বললেন, ‘আপনার চিঠি পড়ে হাসি পাচ্ছে? ঠিক আছে, এইটা পড়ে দেখেন হাসি পায় কি না।’
    সফদর আলী চিঠির বান্ডিল থেকে একটা খাম বের করে দিলেন, ভেতরের চিঠিটা শুরু হয়েছে এভাবে:
    ‘শালা, তোমাদের আমি চিনি। তোমরা আমাদের দেশের বানর বিদেশে পাঠাও তার উপর অত্যাচার করার জন্যে। ভেবেছ আমি তোমাকে খুঁজে পাব না? ঠিকই আমি তোমাকে খুঁজে বের করব, তারপর কিলিয়ে তোমাকে আমি সিধে করব। তোমাদের মতো মানুষের চামড়া জ্যান্ত ছিলিয়ে সেই চামড়া দিয়ে জুতো বানানো দরকার। —আকরম খান।’
    এই চিঠিটা পড়ে আমি সত্যিই একটু ঘাবড়ে যাই, ভরসার কথা, যারা সামনাসামনি কথা না বলে এরকম উড়ো চিঠি পাঠায়, ব্যক্তিগত জীবনে তারা আসলে কাপুরুষ হয়। বানরের ওপর অত্যাচারের যে কথাটা লিখেছে সেটা অবশ্যি পুরোপুরি অমূলক নয়, পাশ্চাত্য দেশে যুদ্ধের সময় শক্রদেশের উপর ব্যবহার করার জন্যে যেসব বিষাক্ত রাসায়নিক তৈরি করা হয় সেগুলো বিভিন্ন পশুপাখি, বিশেষ করে বানরের উপর নাকি পরীক্ষা করে দেখা হয়। কিন্তু আমাদের নিরীহ সফদর আলীকে সেজন্যে দায়ী করার কী মানে থাকতে পারে?
    আমি সফদর আলীকে সাহস দেয়ার জন্যে তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করি। সফদর আলী সেটা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে বললেন, ‘মানুষের চামড়া দিয়ে জুতো হয় কখনো? মানুষের চামড়ার কোনো ইলাস্টিসিটি আছে? আছে?’
    আমি তাড়াতাড়ি কিছু না বুঝেই বললাম, ‘নেই, একেবারেই নেই। কোত্থেকে থাকবে?’
    ‘তাহলে?’
    আমাকে স্বীকার করতেই হল আকরম খান মানুষের চামড়া দিয়ে জুতো বানানোর কথা বলে খুবই অবিবেচকের মতো কথা বলেছেন। সফদর আলী খানিকক্ষণ গম্ভীর হয়ে বসে থেকে বললেন, ‘আমি এর মাঝে নেই, আপনি যা ইচ্ছা হয় করতে পারেন।’
    আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম, ‘আপনি কিছু ভাববেন না, এখন থেকে সব দায়িত্ব আমার। আজ থেকে আমি পোস্ট অফিসে গিয়ে চিঠিগুলো আনব, খুলে পড়ে দেখব, যদি কোনো কাজের খবর থাকে, আমি খোঁজ নিয়ে দেখব। আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন।’
    সফদর আলী একটু শান্ত হলেন বলে মনে হল। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘একটা জিনিস যদি না টেকে সেটা বানিয়ে লাভ আছে?’
    আমি থতমত খেয়ে বললাম, ‘কিসের কথা বলছেন?’
    ‘জুতোর কথা। মানুষের চামড়া কত পাতলা, সেই জুতো কি এক সপ্তাহের বেশি টিকবে? ভিনিগারে এক সপ্তাহ ভিজিয়ে রেখে, আলট্রাভায়োলেট রে দিয়ে ঘণ্টাখানেক যদি শুকানো যায়—’
    আমি চা খেতে গিয়ে বিষম খেলাম, এই নাহলে আর বিজ্ঞানী!
    সফদর আলীর বানরের সন্ধান চেয়ে বিজ্ঞাপনের উত্তরে যেসব চিঠি এল সেগুলো পড়ে আমি মানুষের চরিত্রের একটা নতুন দিক আবিষ্কার করলাম, মানুষ গাঁটের পয়সা খরচ করে শুধুমাত্র ঠাট্টা করার জন্যে চিঠি লিখতে ভারি পছন্দ করে। অসংখ্য চিঠিতে সফদর আলী এবং বানরকে নিয়ে কবিতা, কয়েকটি বেশ ভালো, ছন্দজ্ঞান প্রশংসা করার মতো। ঠিকানা দেয়া থাকলে আমি দেখা করে কবিতা লেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্যে উৎসাহ দিয়ে আসতাম। অনেকে চিঠিতে কৌতূহলী হয়ে জানতে চেয়েছেন, বানরকে দিয়ে কী করা হবে; অনেকে লিখেছে উপযুক্ত পারিশ্রমিক পেলে তারা বানর ধরে দেবে, কয়েকজন আবার আকরম খানের মতো ক্ষেপে বানরের ব্যবসা থেকে সরে পড়ার উপদেশ দিয়েছেন। আমি যখন আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছি তখন হঠাৎ একটা চিঠি এসে হাজির। চিঠিতে শান্তিনগর থেকে এক ভদ্রলোক লিখেছেন, তাঁর একটি বানর আছে, বানরটিকে যত্ন করে রাখার প্রতিশ্রুতি দিলে তিনি বানরটি দিয়ে দিতে পারেন। চিঠি পড়ে আমার খুশি দেখে কে! সফদর আলীর সেই চেহারা অনেক দিন থেকে ভুলতে পারছি না। সবচেয়ে বড় কথা, চিঠিটা ঢাকা থেকে লেখা, ইচ্ছা করলে আমি এখনই গিয়ে খোঁজ নিতে পারি। আমি আর দেরি করলাম না, বাসায় কেউ একজন এসে সন্ধ্যাটা মাটি করার আগেই আমি বের হয়ে পড়লাম।
    শান্তিনগরে ভদ্রলোকের বাসা খুঁজে বের করে শুনি তিনি নেই, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আসবেন। আমি সময় কাটানোর জন্যে খানিকক্ষণ এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ালাম। একটা চায়ের দোকানে এককাপ বিস্বাদ চা খেয়ে, একটা পানের দোকানে খানকয়েক আধুনিক গান শুনে, রাস্তার মোড়ে ঘাড় ব্যথা এবং মালিশের ওষুধের উপর একটা নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা শুনে ঘণ্টাখানেক পরে আবার ভদ্রলোকের বাসায় এসে হাজির হই। এবারে ভদ্রলোক বাসায় আছেন, খবর পাঠাতেই বের হয়ে এলেন, মোটাসোটা হাসিখুশি চেহারা। আমি বললাম, ‘আপনার সাথে একটু কাজ ছিল।’
    ‘আমার সাথে? কাজ?’ ভদ্রলোক অবাক হবার ভান করে বললেন, ‘আমি এত অকাজের মানুষ, আমার সাথে আবার কারো কাজ থাকতে পারে নাকি!’ তারপর চিৎকার করে ভেতরে বললেন, ‘এই, চা দে বাইরে।’
    আমি পকেট থেকে সফদর আলীকে লেখা তাঁর চিঠিটা বের করে বললাম, ‘আপনি এই চিঠিতে লিখেছিলেন—’
    ‘ও! আপনিই সফদর আলী!’ ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আপনি আরো অনেক মোটা হবেন, ভুঁড়ি থাকবে, মাথায় টাক থাকবে আর গায়ের রংটা একটু ফর্সা হবে! বুঝলেন কি না, মানুষের নাম শুনলেই আমার চোখের সামনে তার চেহারাটা ভেসে ওঠে।’
    আমি বললাম, ‘আমি সফদর আলী না, সফদর আলী আরেকজন, আমি তার হয়ে এসেছি।’
    ভদ্রলোকের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, ‘আসল সফদর আলীর ভুঁড়ি আছে? মাথায় টাক?’
    ভদ্রলোককে নিরাশ করতে আমার একটু খারাপই লাগে, কিন্তু কী করব, বলতেই হয় সফদর আলীর ভুঁড়ি নেই, টাক নেই—বেমানান গোঁফ আছে, কিন্তু সেটা তো আর নাম শুনে চোখের সামনে ভেসে ওঠে নি।
    মানুষের নাম এবং চেহারার মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে খানিকক্ষণ কথাবার্তা হল। সুযোগ পেয়ে একসময় আমি বানরের কথাটা তুলে আনি। আমি খোলাখুলিভাবে বললাম বানরটার কেন প্রয়োজন, সফদর আলী তাকে কাজকর্ম শিখিয়ে সহকারী বানাবেন। আমি ভদ্রলোককে সফদর আলী সম্পর্কে বললাম, তিনি একজন শখের বিজ্ঞানী এবং লোকজনের ধারণা, তাঁর মাথায় ছিট আছে, আমার নিজেরও সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু তিনি নেহায়েতই এক জন ভালোমানুষ। বানরটিকে তিনি নানারকম জিনিস শেখাবেন, কিন্তু কখনোই তিনি কোনোরকম কষ্ট দেবেন না। আমার ধারণা তিনি কষ্ট দেয়ার ব্যাপারটি ভালো বোঝেন না।
    ভদ্রলোক এককথায় বানরটি দিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেলেন, আমি একটু কায়দা করে টাকার প্রসঙ্গটা তুলতেই ভদ্রলোক হা হা করে উঠলেন, বললেন, ‘জংবাহাদুর আমার ছেলের মতো, আমি তাকে বিক্রি করতে পারি?’
    ‘জংবাহাদুর?’
    ‘হ্যাঁ, জংবাহাদুর আমার বানরটার নাম। কেউ তাকে যত্ন করে রাখলে এমনিই দিয়ে দেব, কিন্তু বিক্রি আমি করতে পারব না। মাঝেমধ্যে গিয়ে দেখে আসব, কিন্তু টাকা আমি কীভাবে নিই?’
    এবারে আমি উল্টো লজ্জা পেয়ে যাই। একটু থতমত খেয়ে বললাম, ‘আপনার এত শখের বানর দিয়ে দিচ্ছেন কেন, রেখে দিন।’
    ভদ্রলোক খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে গলা নামিয়ে বললেন, ‘আপনাকে তাহলে বলি, আগে কাউকে বলি নি। আমার একটা ছেলে আছে, এক বছর বয়স, জংবাহাদুরকে তার ভারি পছন্দ! আমি বাবা, আমার কাছে আসতে চায় না, দিনরাত্রি জংবাহাদুরের পিছনে ঘুরঘুর করে। যত দিন যাচ্ছে ততই আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, বাবা হয়ে আমি সেটা কেমন করে সহজভাবে নিই? বুঝতেই পারেন জংবাহাদুর যেরকম খেলা দেখাতে পারে, আমি কি আর সেরকম খেলা দেখাতে পারি? ছেলের কী দোষ? সে আমাকে পছন্দ করবে কেন? এক বছরের ছেলে কি আর এত কিছু বোঝে?’
    আমাকে স্বীকার করতেই হল বানরের সাথে খেলা দেখানো নিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা খুব সহজ ব্যাপার নয়। ভদ্রলোকের সাথে আরো খানিকক্ষণ গল্পগুজব হল, বেশ মানুষটি। আরো এককাপ সর-ভাসা চা খেয়ে উঠে পড়ার আগে বললাম, ‘বানরটা কবে নিতে আসব?’
    ভদ্রলোক এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, ‘এখনই নিয়ে যান।’
    ‘এখনই? আমি?’
    ‘হ্যাঁ, জংবাহাদুর খুবই ভদ্র, বিরক্ত করবে না। বয়স হয়েছে, বানরের হিসেবে রীতিমতো বুড়ো, খুব শান্ত। নিজের চোখেই দেখেন,’ বলে ভদ্রলোক চিৎকার করে ডাকলেন, ‘জংবাহাদুর, এদিকে এস।’
    পর্দার ফাঁক দিয়ে একটা বানরের গম্ভীর মুখ দেখা গেল, আমাকে খানিকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বানরটি আবার পর্দার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায়। আমি ভদ্রলোকের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘আপনাকে নতুন দেখেছে তো, তাই কাপড় পাল্টে আসছে।’
    সত্যি তাই, একটু পরেই একটা লুঙ্গি পরতে-পরতে বানরটা বেরিয়ে এল, হেঁটে হেঁটে আমার সামনে এসে হাত তুলে আমাকে একটা সালাম করে গম্ভীর হয়ে একটা চেয়ারে বসে। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না আমার কি সালামের উত্তর দেয়ার প্রয়োজন আছে কি না।
    ভদ্রলোক বানরটিকে বললেন, ‘জংবাহাদুর, তুমি, এখন এই ভদ্রলোকের সাথে যাবে, বুঝতে পেরেছ?’ বানরটি কী বুঝল জানি না, কিন্তু গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল, যেন সত্যি বুঝতে পেরেছে। ভদ্রলোক আবার বললেন, ‘যাও, শার্ট পরে এস, আর তোমার দড়িটি নিয়ে এস।’
    বানরটি সত্যিই ভদ্রলোকের কথা শুনে চেয়ার থেকে নেমে ভেতরে চলে গেল।
    ভদ্রলোক একটা নিঃশ্বাস ফেলে চুপ করে গেলেন, হঠাৎ আমার তার জন্যে খুব কষ্ট হল, খুব শখের বানর, নিজেই বলেছেন একেবারে নাকি ছেলের মতো, দিয়ে দিতে নিশ্চয়ই তাঁর খুব খারাপ লাগছে। আমি আস্তে আস্তে বললাম, ‘দেখেন, আপনার যদি খুব খারাপ লাগে, থাকুক, আমরা অন্য একটা বানর জোগাড় করে নেব।’
    ভদ্রলোক বললেন, ‘খারাপ তো লাগছেই, এতদিন থেকে আমার সাথে আছে, সে তো প্রায় ঘরের মানুষ, কিন্তু তবু আপনি নিয়েই যান। ছেলেটার শুধু যে জংবাহাদুরের সাথে খাতির তাই নয়, আজকাল তাকে দেখে দেখে বানরের মতো ব্যবহার করা শুরু করেছে।’
    আমি সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, ‘ছোট বাচ্চা যা-ই দেখে তা-ই শেখে, ওর আর দোষ কি? আর আপনি জংবাহাদুরকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না, সফদর আলী তাকে অনেক যত্ন করে রাখবেন। আপনার যখন দেখার ইচ্ছা হবে গিয়ে দেখতে পারেন, ইচ্ছা হলে যখন খুশি বাসায় এনে যত দিন খুশি রাখতে পারেন।’
    ভদ্রলোকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, খুব খুশি হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুব ভালো হয় তাহলে। মাঝে মাঝে বাসায় এনে কয়দিন রেখে ভালো করে খাইয়ে দেব, খুব খেতে পছন্দ করে বেচারা।’
    একটু পরেই জংবাহাদুর একটা শার্ট পরে হাজির হয়, তার মাথায় একটা হ্যাট, হাতে একটা টিনের বাক্স, ভেতরে নিশ্চয়ই তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। তার গলায় দড়ি বাঁধা, দড়ির এক মাথা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ভদ্রলোককে লম্বা একটা সালাম করল। ভদ্রলোক জংবাহাদুরকে তুলে খানিকক্ষণ বুকে চেপে ধরে রেখে নামিয়ে দিলেন, আমি দেখলাম তাঁর চোখে প্ৰায় পানি এসে গেছে। আমি পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে সেখানে আমার বাসার ঠিকানা, অফিসের টেলিফোন নাম্বার লিখে দিলাম। ভদ্রলোককে বললাম, ‘আমাকে ফোন করলেই আমি তাঁর সাথে জংবাহাদুরের দেখা করার ব্যবস্থা করে দেব।’
    জংবাহাদুরকে নিয়ে বের হতেই এই এলাকার লোকজন তার নাম ধরে ডাকাডাকি শুরু করে দেয়, বোঝাই যাচ্ছে সে এই এলাকার অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র। জংবাহাদুরও কাউকে সালাম কাউকে হ্যাট খুলে সম্ভাষণ আবার কাউকে দাঁত বের করে ভেংচি কেটে প্রত্যুত্তর দেয়। আমার একটু অস্বস্তি লাগতে থাকে। তাই প্রথম রিকশাটা পেয়ে দরাদাম না করেই জংবাহাদুরকে নিয়ে উঠে পড়লাম। আমি আগে কখনো পশুপাখি নাড়াচাড়া করি নি, তাই একটু ভয় ভয় করছিল, বানরটা যদি হঠাৎ করে খামচে দেয়?
    জংবাহাদুরকে নিয়ে রিকশা করে যাওয়াটা খুব উপভোগ্য ব্যাপার নয়। প্রথমে রিকশাওয়ালা জানতে চাইল আমি কত দিন থেকে বানরের খেলা দেখাই এবং এতে আমার কেমন উপার্জন হয়। আমি তাকে খুশি করার মতো উত্তর দিতে পারলাম না। রাস্তায় লোকজন, বিশেষ করে বাচ্চারা আমাকে “বানরওয়ালা” বলে ডাকতে থাকে।
    রাজারবাগের মোড়ে রিকশার দিকে একটা পাকা কলা ছুটে এল। সময়মতো মাথা নিচু করায় কলাটা আমার মাথায় না লেগে রিকশার পিছন দিকে গিয়ে লাগল। আমি আমার জানা সমস্ত দোয়া-দরুদ পড়তে থাকি। আজ অক্ষত শরীরে শ্যামলীতে সফদর আলীর বাসায় পৌঁছুতে পারলে কাল দুই টাকা দান করে দেব বলে মানত করে ফেললাম।
    ফার্মগেটের কাছে, যেখানে লোকজনের ভিড় সবচেয়ে বেশি এবং যেখানে লোকজন সবচেয়ে বেশি উৎসাহ নিয়ে আমাকে এবং জংবাহাদুরকে ডাকাডাকি করতে থাকে, সেখানে আমাদের রিকশার টায়ার ফেটে গেল। চার বছর আগে আরামবাগে একজন ছোরা দেখিয়ে আমার মানিব্যাগে টাকা এত কম কেন সেটা নিয়ে বিরক্তি প্ৰকাশ করার সময়েও আমি এত ভয় পাই নি। রিকশা থেমে যেতেই আমাদের ঘিরে একটা ছোট ভিড় জমে যায়। তার ভিতর থেকে একজন দুর্ধর্ষ ধরনের বাচ্চা জংবাহাদুরের লুঙ্গির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা লেজ ধরে টানার চেষ্টা করতে থাকে। আমি রিকশার ভাড়া মিটিয়ে আরেকটা খালি রিকশা খুঁজতে থাকি, কিন্তু আমার সমস্ত পাপকর্মের প্রতিফল হিসেবে একটিও খালি রিকশা বা স্কুটার দেখা গেল না। আমি আরেকটা রিকশা না পাওয়া পর্যন্ত এই রিকশা থেকে নামতে চাইছিলাম না, কিন্তু একজন পুলিশ এসে বলল, রাস্তায় বানরের খেলা দেখানো বেআইনি এবং আমি যদি একান্তই খেলা দেখাতে চাই তাহলে আমাকে রাস্তার পাশে খালি জায়গাটায় যেতে হবে। তাকে ব্যাপারটা বোঝানোর আগেই সে আমাকে এবং আমাদের ঘিরে থাকা লোকজনকে ঠেলে-ঠেলে ফাঁকা জায়গাটিতে নিয়ে যায়। আমি কিছু বোঝার আগেই লোকজন আমাদের ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। শুধু তাই নয়, পুলিশটি সামনের লোকজনদের বসিয়ে দিয়ে নিজে একটা সিগারেট ধরিয়ে এক কোনায় দাঁড়িয়ে পড়ে। আমি তখন টপটপ করে ঘামছি, কোনোমতে ভাঙা গলায় বললাম, ‘দেখেন, আমি বানরের খেলা দেখাই না, এটা আরেকজনের বানর—’
    লোকজনের উল্লাসধ্বনিতে আমার কথা চাপা পড়ে যায়, আমার কথায় এত আনন্দের কী থাকতে পারে আমি বুঝতে পারলাম না, তখন আমার জংবাহাদুরের দিকে চোখ পড়ে। সে তার টিনের বাক্স খুলে জিনিসপত্র বের করা শুরু করেছে, একটা সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ম্যাচ দিয়ে সেটা জ্বালিয়ে দু’টি লম্বা টান দিয়ে সে খেলা শুরু করে দেয়। প্রথমে একটা ডুগডুগি বের করে বাজাতে থাকে, তারপর এক কোনা থেকে ছুটে এসে শূন্যে দু’টি ডিগবাজি খেয়ে নেয়। লোকজন যখন হাততালি দিতে ব্যস্ত, তখন সে যে ছেলেটি তার লেজ ধরে টানার চেষ্টা করেছিল তাকে খুঁজে বের করে তার কান ধরে মাঝখানে টেনে এনে গালে প্রচণ্ড চড় কষিয়ে দেয়। লোকজনের উল্লাসধ্বনির মাঝে ছেলেটা প্রতিবাদ করার সাহস পেল না। মুখ চুন করে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ে। এরপর জংবাহাদুরের আসল খেলা শুরু হয়, তার খেলা সত্যি দেখার মতো। বিভিন্ন রকম শারীরিক কসরত, মানুষের অনুকরণ, বিকট মুখভঙ্গি, উৎকট নাচ, কী নেই! শুধু তাই নয়, খেলার ফাঁকে ফাঁকে সে ক্ৰমাগত তার ডুগডুগি বাজিয়ে ভিড় আরো বাড়িয়েই যায়। আমি বোকার মতো মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকি আর প্রাণপণ দোয়া করতে থাকি পরিচিত কেউ যেন আমাকে দেখে না ফেলে। খোদা আমার দোয়া শুনবে, আমার নিজের উপর সেরকম বিশ্বাস ছিল না, তাই যখন ভিড়ের মধ্যে আমাদের অফিসের বড় সাহেবকে আবিষ্কার করলাম, তখন বেশি অবাক হলাম না। খেলা শেষ হতেই জংবাহাদুর তার টুপি খুলে পয়সা আদায় করা শুরু করে, আমি নিষেধ করার সুযোগ পেলাম না। লোকজন পয়সাকড়ি বেশ ভালোই দিল। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি বড় সাহেব একটা আস্ত আধুলি দিয়ে দিলেন। জংবাহাদুর খুচরা পয়সাগুলো রুমালে বেঁধে আমার হাতে ধরিয়ে দেয়। পরে গুনে দেখেছিলাম, মানতের দুই টাকা দেওয়ার পরেও দু’টি অচল সিকিসহ প্রায় সাড়ে তিন টাকা রয়ে গিয়েছিল।
    সেদিন সফদর আলীর বাসায় জংবাহাদুরকে পৌঁছে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, জীবনে আর যা-ই করি, কখনো বানর নিয়ে রাস্তায় বের হব না। বানরের খেলা দেখানো নিয়ে উত্তেজনা কমতে-কমতে প্ৰায় সপ্তাহখানেক লেগে গেল। ফার্মগেটের মোড়ে সেদিন আমাকে কত মানুষ দেখছিল তার হিসেব নেই। সবাই বাসায় এসে সেটা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে গেছে। আমি ব্যাপারটি যতই বোঝানোর চেষ্টা করি, কেউ আর বুঝতে চায় না। আমার মা এখনো একটু পরে পরে বলেন, ‘ছি, ছি, ছি, তোর নানা এত খান্দান বংশের লোক, আর তাঁর নাতি আজ রাস্তায় বানরের খেলা দেখিয়ে বেড়ায়!’ অফিসের বড় সাহেবকে নিয়েও মুশকিল, একটু পরে-পরে সবার সামনে আমাকে প্রশংসা করে বলেন, আমার মতো স্বাধীনচেতা মানুষ তিনি নাকি জীবনে দেখেন নি। অফিসের বেতন যথেষ্ট নয় বলে বিকেলে আমার বানরের খেলা দেখিয়ে পয়সা উপার্জনের সৎসাহস দেখে তিনি নাকি মুগ্ধ হয়েছেন। তাঁকে অনেক কষ্ট করেও ব্যাপারটি পুরোপুরি বোঝানো গেল না। বড় সাহেবদের মাথা একটু নিরেট হয়, কোনো কিছু একটা ঢুকে গেলে সেটা আর বের হতে চায় না।
    সপ্তাহখানেক পর আমার সফদর আলীর সাথে দেখা, সফদর আলী হচ্ছেন এমন একজন মানুষ যার মুখ দেখেই মনের কথা পরিষ্কার বলে দেয়া যায়। আজ যেরকম তাঁকে দেখেই বুঝতে পারলাম, তাঁর কাজকর্ম ভালোই হচ্ছে, তিনি তাঁর বানরকে নিয়ে মোটামুটি সন্তুষ্ট। ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, তাঁর চোখের কোনা একটু কুঁচকে আছে, যার অর্থ কোনো একটা কিছু নিয়ে তিনি একটু চিন্তিত। আমাকে দেখে তিনি খুশি হয়ে উঠলেন, হাসিমুখে বললেন, ‘বানর স্ক্রু-ড্রাইভার ধরে কেমন করে জানেন?’
    আমি জানতাম না, তাই তিনি পকেট থেকে একটা স্ক্রু-ড্রাইভার বের করে দেখালেন। ব্যাপারটি তাঁর কাছে এত হাস্যকর যে তিনি কিছুতেই আর হাসি থামাতে পারেন না। আমি চুপ করে বসে রইলাম, কারণ আমিও ঠিক ওভাবে স্ক্রু-ড্রাইভার ব্যবহার করি। তাঁর হাসি একটু কমে এলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার বানরের ট্রেনিং কেমন হচ্ছে?’
    ‘ভালো, বেশ ভালো। প্রথমে একটু অসুবিধে হয়েছিল।’
    ‘কি অসুবিধে?’
    ‘মনোযোগের অভাব, কিছুতেই জংবাহাদুরের মনোযোগ নেই, শুধু গালে হাত দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।’
    ‘আপনার না একটা মনোযোগ বাড়ানোর ওষুধ আছে?’
    সফদর আলী মাথা চুলকে বললেন, ‘হ্যাঁ আছে, কিন্তু সেটা খেতে এত খারাপ যে কিছুতেই জংবাহাদুরকে খাওয়াতে রাজি করাতে পারলাম না।’
    ‘এখন মনোযোগ দিচ্ছে?’
    ‘হ্যাঁ, এক সপ্তাহ পরে গতকাল প্রথম সে মনোযোগ দিয়েছে। হঠাৎ করে মনোযোগ দিল।’
    ‘হঠাৎ করে?’
    ‘হ্যাঁ, হঠাৎ করে। এখনো মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যায়, আবার হঠাৎ করে মনোযোগ ফিরে আসে।’
    বানরের মনস্তত্ত্ব আমার জানা নেই। তাই এক সপ্তাহ অন্যমনস্ক থেকে হঠাৎ করে মনোযোগ দেয়ার পিছনে কী কারণ থাকতে পারে আমি বুঝতে পারলাম না। হয়তো নতুন পরিবেশে অভ্যস্ত হতে সময় নিয়েছে, হয়তো ভেবেছিল একটা সাময়িক ব্যাপার, আবার সে তার আগের বাসায় ফিরে যাবে। হয়তো তার মন খারাপ, বানরের মন খারাপ হতে পারে না এমন তো কেউ বলে নি—
    ‘গুলু গুলু গুলু গুলু—’ আমি হঠাৎ চমকে উঠে শুনি, সফদর আলী আমার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত স্বরে বলছেন, ‘গুলু গুলু গুলু গুলু।’
    থতমত খেয়ে বললাম, ‘কী বললেন?’
    সফদর আলী পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘কি বললাম?’
    আমি ইতস্তত করে বললাম, ‘হ্যাঁ, মানে আপনি কেমন একটা শব্দ করছিলেন না?’
    ‘আমি?’ সফদর আলী আকাশ থেকে পড়লেন, ‘আমি শব্দ করছিলাম?’
    ‘হ্যাঁ।’
    ‘কী রকম শব্দ?’
    আমি এদিক-সেদিক তাকিয়ে গলা নামিয়ে তাঁকে অনুকরণ করে বললাম, ‘গুলু গুলু গুলু গুলু।’
    শুনে সফদর আলীর হাসি দেখে কে! পেট চেপে হাসতে হাসতে তাঁর চোখে প্ৰায় পানি এসে গেল। কোনোমতে বললেন, ‘আমি ওরকম শব্দ করেছি? আমার কি মাথা খারাপ হয়েছে যে রেস্টুরেন্টে লোকজনের মাঝে বসে বসে ওরকম শব্দ করব?’
    আমি প্রতিবাদ করতে পারলাম না। সত্যিই তো, এক জন বয়স্ক মানুষ হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই কেন ওরকম একটা জিনিস বলবে? তা হলে কি আমি ভুল শুনেছি? কিন্তু সেটাও তো হতে পারে না, আমি স্পষ্ট শুনলাম। তিনি বললেন—গুলু গুলু গুলু গুলু। আমি ব্যাপারটি নিয়ে বেশি মাথা ঘামালাম না, সবাই জানে বিজ্ঞানীরা একটু খেয়ালি হয়, আর সফদর আলী তো এক ডিগ্রি উপরে।
    সপ্তাহখানেক পরের কথা, রিকশা করে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখি রেসকোর্সের পাশ দিয়ে সফদর আলী হেঁটে যাচ্ছেন, আমি রিকশা থামিয়ে ডাকলাম, ‘সফদর সাহেব।’
    সফদর আলী ঘুরে তাকিয়ে আমাকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, ‘কোথায় যাচ্ছেন?’
    ‘বাসায়।’
    ‘এখনি বাসায় গিয়ে কী করবেন? আসেন হাঁটি একটু। হাঁটলে পা থেকে রক্ত সরবরাহ হয়, খুব ভালো কাৰ্ডিওভাসকুলার ব্যায়াম।’
    কাৰ্ডিওভাসকুলার ব্যায়ামের লোভে নয়, সফদর আলীর সাথে খানিকক্ষণ কথাবার্তা বলার জন্যেই আমি রিকশা থেকে নেমে পড়ি। দু’জন রেসকোর্সের পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকি। চমৎকার হাওয়া দিচ্ছে, বছরের এই সময়টা এত চমৎকার যে বলার নয়। আমি সফদর আলীকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘জংবাহাদুরের কী খবর? কাজকর্মে মনোযোগ দিয়েছে?’
    ‘হ্যাঁ, দিচ্ছে,’ একটু ইতস্তত করে যোগ করলেন, ‘মাঝে মাঝে হঠাৎ করে এখনও অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে, আবার হঠাৎ করে মনোযোগ ফিরে আসে।’
    ‘তাই নাকি?’
    ‘হ্যাঁ। গত সপ্তাহে তাকে সল্ডারিং করা শিখিয়েছি।’
    ‘সত্যি?’
    ‘হ্যাঁ, চমৎকার সল্ডারিং করে।’
    ‘বাহ্‌!’
    ‘এখন সার্কিট বোর্ড তৈরি করা শেখাচ্ছি। আলট্রা ভায়োলেট রে দিয়ে এক্সপোজ করে ফেরিক ক্লোরাইড নিয়ে “এচ” করতে হয়, ঠিকমতো না করলে বেশি না হয়ে কম হয়ে যায়, নানা ঝামেলা তখন।’
    আমি কিছু না বুঝে বললাম, ‘ও, আচ্ছা!’
    ‘ফেরিক ক্লোরাইড জিনিসটা ভালো না, আরেকটা কিছু বের করা যায় কি না দেখতে হবে।’
    আমি এসব রাসায়নিক ব্যাপার কিছুই বুঝি না। আমার এক ভাগ্নে একদিন কথা নেই বার্তা নেই আমার ধোয়া শার্টে লাল রং ঢেলে দিল, আমি তো রেগে আগুন, কিন্তু কী আশ্চৰ্য, দেখতে-দেখতে লাল রং উবে আবার ধবধবে সাদা শার্ট, লাল রঙের চিহ্নমাত্র নেই! আমি তো ভারি অবাক, আমার ভাগ্নে তখন বুঝিয়ে দিল, এটা নাকি কী একটা রাসায়নিক জিনিস, বাতাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে রংটা উবে যায়। আমি তখন আমার ভাগ্নেকে বললাম, আমাকে এক বোতল বানিয়ে দিতে, অফিসে বড় সাহেবের গায়ে ঢেলে মজা দেখাব। আমার সেই ভাগ্নে প্রচণ্ড পাজি, একটা বোতলে খানিকটা লাল কালি ভরে দিয়ে দিল। আমি তো কিছু জানি না, অফিসে গিয়ে সবার সামনে বড় সাহেবের নতুন শার্টে সেই লাল রং ঢেলে দিলাম, এক মিনিট দুই মিনিট করে দশ মিনিট পার হয়ে গেল, রং উবে যাওয়ার কোনো চিহ্ন নেই, বরং আরো পাকা হয়ে বসে গেল। সে কী কেলেঙ্কারি, চিন্তা করে এখনো আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।
    ‘গুলু গুলু গুলু গুলু।’
    আমি চমকে উঠি, সফদর আলী আবার ওরকম শব্দ করছেন! আমি ভান করলাম যেন শুনি নি, চুপচাপ হাঁটতে থাকি। সফদর আলী আবার বললেন, ‘গুলু গুলু গুলু গুলু।’
    আমি তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি সহজ স্বরে বললেন, ‘একটা ব্যাপারে মানুষের চেয়ে বানরের সুবিধে আছে, সেটা হচ্ছে তার পা। মানুষ তার পা দিয়ে কিছু ধরতে পারে না, বানর পারে।’
    আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘আপনি একটু আগে ওরকম শব্দ করছিলেন কেন?’
    সফদর আলী অবাক হয়ে বললেন, ‘কী রকম শব্দ?’
    আমি গলা নামিয়ে বললাম, ‘গুলু গুলু গুলু গুলু।’
    সফদর আলী এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন, যেন আমি পাগল হয়ে গেছি। কিন্তু এবারে কোনো ভুল নয়, আমি স্পষ্ট শুনেছি। আমি কী মনে করে সফদর আলীকে বেশি ঘাঁটালাম না, চিন্তিতভাবে হাঁটতে থাকি। আর্ট কলেজের সামনে এসে আমি একটু অন্যমনস্ক হয়েছি, হঠাৎ শুনি সফদর আলী আবার অদ্ভুত গলার স্বরে বলছেন, ‘মুচি মুচি মুচি মুচি—’
    আমি ভীষণ চমকে উঠলেও ভান করলাম যেন তাঁর কথা শুনতে পাই নি, সফদর আলী বলতেই থাকেন, ‘মুচি মুচি মুচি মুচি।’
    আমি নিঃসন্দেহ হয়ে তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি সহজ স্বরে বললেন, ‘লেজ জিনিসটা আসলে খারাপ নয়। ওটা একটা বাড়তি হাতের মতো। মানুষের লেজ থাকলে মন্দ হত না!’
    আমি বললাম, ‘আপনি জানেন, একটু আগে আপনি বলছিলেন, মুচি মুচি মুচি মুচি।’
    ‘আমি?’
    ‘হ্যাঁ, আপনি।’
    ‘কী বলছিলাম?’
    ‘মুচি মুচি মুচি মুচি।’
    সফদর আলী অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী বলছেন আপনি!’
    ‘হ্যাঁ, আমি শুধু শুধু মিথ্যা কথা বলব কেন?’
    ‘আপনার অফিসের কাজকর্মের চাপ নিশ্চয়ই খুব বেড়েছে,’ সফদর আলী হাসি গোপন করার চেষ্টা করে বললেন, ‘আপনার কয়দিন বিশ্রাম নেয়া দরকার। খুব চাপে থাকলে মানুষের বিভ্রম হয়, কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা গুলিয়ে ফেলে। আপনি বাসায় গিয়ে শুয়ে থাকেন।’
    আমি তাঁর কথার প্রতিবাদ করতে গিয়ে থেমে গেলাম, এর মধ্যে নিশ্চয়ই একটা রহস্য আছে। আমি এখন পুরোপুরি নিশ্চিত যে সফদর আলী নিজের অজান্তে এরকম অদ্ভুত শব্দ করেন। কিন্তু কেন? প্রত্যেকবার তিনি শব্দ করেছেন, যখন আমি একটু অন্যমনস্ক হয়েছি তখন। ব্যাপারটা পরীক্ষা করার জন্যে আমি খানিকক্ষণ তাঁর সাথে কথা বলে আবার অন্যমনস্ক হয়ে যাবার ভান করলাম। আর সত্যি সত্যি তিনি অদ্ভুত শব্দ করা শুরু করলেন। প্রথমে বললেন, ‘গুলু গুলু গুলু গুলু।’ খানিকক্ষণ পরে বললেন, ‘মুচি মুচি মুচি মুচি।’ আমি তবু অন্যমনস্ক হয়ে থাকার ভান করি। তখন হঠাৎ সফদর আলী ছোট ছোট লাফ দিয়ে হাততালি দিতে শুরু করলেন। ঠিক এই সময়ে একজন সামনে দিয়ে আসছিল, রাস্তায় বয়স্ক একজন মানুষ এভাবে লাফ দিচ্ছে দেখলে সে কী ভাববে? আমি তাড়াতাড়ি সফদর আলীর দিকে তাকাই। সাথে সাথে তিনি ভালোমানুষের মতো বললেন, ‘বিবর্তনটা যদি একটু অন্যরকমভাবে হত, তাহলে হয়তো আজ মানুষের জায়গায় বানর পৃথিবীতে রাজত্ব করত, আর মানুষ গাছে গাছে ঘুরে বেড়াত। কী বলেন?’
    আমি তাঁর কথায় সায় দিয়ে কিছু একটা বললাম, কিন্তু আমার মাথায় সফদর আলীর এই আশ্চর্য আচরণের কথা ঘুরতে থাকে। এর ব্যাখ্যা পাই কোথায়? অন্যমনস্ক হওয়ার ভান করে থাকলে তিনি শেষ পর্যন্ত কী করেন দেখার জন্যে আমি একটু অপেক্ষা করি। যখন দেখলাম রাস্তায় আশেপাশে কেউ নেই, তখন আবার আমি অন্যমনস্ক হয়ে যাবার ভান করলাম। খানিকক্ষণের মধ্যেই সফদর আলী আশ্চর্য শব্দ করা শুরু করলেন। প্রথমে বললেন, ‘গুলু গুলু গুলু গুলু।’ তাতে কাজ না হওয়ায় বললেন, ‘মুচি মুচি মুচি মুচি,’ খানিকক্ষণ পর ছোট ছোট লাফ দিতে শুরু করলেন। সাথে হাততালি। আমি তবুও জোর করে অন্যমনস্ক হয়ে থাকার ভান করতে থাকি। তখন হঠাৎ তিনি যেটা করলেন, আমি সেটার জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না। রাস্তায় হাঁটু গেড়ে বসে খানিক দূর হামাগুড়ি দিয়ে গেলেন, তারপর উঠে মুখে থাবা দিয়ে বললেন, ‘লাবা লাবা লাবা লাবা।’
    আমি বিস্ফোরিত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তিনি স্বাভাবিক স্বরে বললেন, ‘কী হল আপনার?’
    ‘কেন?’
    ‘এরকম হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন?’
    আমি উত্তরে আর কী বলব? ঠিক করলাম, ব্যাপারটা আজকে তাঁর কাছে চেপে যাব। একটু ভেবে দেখতে হবে রহস্যটা কি। সফদর আলীকে একটা দায়সারা উত্তর দিয়ে তাঁর কাছে বিদায় নিয়ে বাসায় রওনা দিলাম। ফিরে আসার সময় রিকশায় বসে ব্যাপারটা ভেবে দেখার চেষ্টা করি। সফদর আলীর এই অদ্ভুত ব্যবহারের সাথে নিশ্চয়ই বানরটার কোনো সম্পর্ক আছে। বানরটাকে কাজকর্ম শেখানো শুরু করার পর থেকেই এটা শুরু হয়েছে। অন্যমনস্ক হলেই মনোযোগ আকর্ষণের জন্যে তিনি এটা করেন, প্রথম প্রথম বানরটিও নাকি অন্যমনস্ক থাকত। দুটির মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক আছে? নাকি বানরের সাথে থাকতে থাকতে তাঁর স্বভাবও বানরের মতো হয়ে যাচ্ছে? আর অন্য সব ব্যাপারে তিনি আগের মতোই আছেন। কাজেই বেশি পরিশ্রমে পাগলামি দেখা দিচ্ছে, সেটাও তো হতে পারে না। আমি কিছুই ভেবে পেলাম না। আগে নাকি কাপালিকরা বানরকে দিয়ে কী একধরনের সাধনা করত। কে জানে এটি সেরকম কোনো বানর কি না। এর মাঝে জাদুটোনার ব্যাপার আছে কি না কে বলবে। ভেবে-ভেবে আমি কোনো কূল-কিনারা পেলাম না। ভাবনা-চিন্তা করে আমার অভ্যাস নেই, খানিকক্ষণের মধ্যেই তাই মাথা ধরে গেল, বাসায় এসে দুটো অ্যাসপিরিন খেয়ে তবে রক্ষা।
    পরদিন অফিস থেকে বাসায় এসে দেখি আবার টেলিগ্রাম, না-খুলেই বুঝতে পারি এটা সফদর আলীর। সত্যি তাই, ভেতরে লেখা:
    ‘মহা আশ্চর্য ব্যাপার। আপনি ঠিক। আমি বলি, গুলু গুলু গুলু গুলু এবং মুচি মুচি মুচি মুচি। কাওরান বাজার। সন্ধ্যা ছয়টা।’
    তবু ভালো শেষ পর্যন্ত সফদর আলী নিজেই ধরতে পেরেছেন যে, তিনি আশ্চৰ্য-আশ্চর্য সব শব্দ করছেন। একজন মানুষ যখন না জেনে কিছু করে, তার জন্যে তাকে দায়ী করা খুব মুশকিল। কে জানে তিনি বুঝতে পেরেছেন কি না, কেন এরকম করছেন, আমার কৌতূহল আর বাঁধ মানছিল না।
    ঠিক পাঁচটার সময় আমার ছোট ভাইঝি টেবিল থেকে উল্টে পড়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলল। এটি নতুন কোনো ব্যাপার নয়। প্রতি সপ্তাহে না হলেও মাসে অন্তত এক বার করে তার এধরনের কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটে। তাকে নিয়ে দৌড়ালাম ডাক্তারের কাছে, ডাক্তার তার মাথাটা খানিকটা কমিয়ে সেখানে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। তাকে নিয়ে ফিরে আসার আগে জিজ্ঞেস করলাম, তার কেমন লাগছে। সে বলল, তার বেশি ভালো লাগছে না, তবে যদি খানিকটা আইসক্রিম খায় তবে মনে হয় ভালো লাগতে পারে। এরকম একটা সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দেবার পর তাকে আইসক্রিম না খাইয়ে বাসায় আনি কেমন করে? আইসক্রিমের দোকান খুঁজে আইসক্রিম কিনে দিয়ে যখন বাসায় ফিরে এলাম, তখন ছয়টা বেজে গেছে। কাওরান বাজারে যেতে যেতে সন্ধ্যা সাতটা বেজে যাবে। সফদর আলীর সময় নিয়ে বাড়াবাড়ি করার অভ্যাস, কাজেই আজ যে তাঁর সাথে দেখা হবে না তা বলাই বাহুল্য। আমি তবু তাড়াহুড়ো করে বের হলাম। চায়ের দোকানে গিয়ে সত্যিই তাঁকে পেলাম না। দোকানি বলল, খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি নাকি বেরিয়ে গেছেন। তাঁর বাসায় গিয়ে এখন আর লাভ নেই। এরকম সময়ে তিনি কখনো বাসায় থাকেন না। আমি এককাপ চা অর্ডার দিয়ে পুরো ব্যাপারটা ভাবতে বসি। কী হতে পারে ব্যাপারটা? কেন সফদর আলী হঠাৎ করে নিজের অজান্তে এরকম আশ্চর্য শব্দ করা শুরু করেছেন? নিশ্চয়ই বানরটার সাথে একটা সম্পর্ক আছে। হয়তো ব্যাপারটা বুঝতে হলে আগে বানরের ইতিহাসটা জানতে হবে। আমার তখন শান্তিনগরের সেই ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ল, যাঁর কাছ থেকে বানরটা এনেছিলাম, তিনি হয়তো কোনো একটা সমাধান দিতে পারেন। আমি তাড়াতাড়ি করে চা শেষ করে তাঁর বাসায় রওনা দিলাম, কপাল ভালো থাকলে আজকেই তাঁকে পেয়ে যেতে পারি।
    বাসাটা আবার খুঁজে বের করতে একটু সময় লাগল, এসব ব্যাপারে আমার স্মৃতিশক্তি খুব দুর্বল। দরজার কড়া নাড়তেই ভদ্রলোক এসে দরজা খুলে দিলেন। আমাকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, ‘আরে আসেন, আসেন। কী খবর আপনার? কয়দিন থেকেই ভাবছি জংবাহাদুরের খোঁজ নিই, ভালোই হল আপনি এসে গেলেন।’ তারপর চিৎকার করে ভেতরে বললেন, ‘এই, চা দিয়ে যা বাইরে।’
    আমি ঘরে গিয়ে বসি। ভদ্রতার কথাবার্তা বলতে বলতে বানরের ইতিহাসটা জিজ্ঞেস করার জন্যে সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকি। সফদর আলীর অবস্থাটা এখন তাঁর কাছে গোপন রাখব বলে ঠিক করলাম, শুনে ভদ্রলোক নিশ্চয়ই ঘাবড়ে যাবেন। ভদ্রলোক বেশ কথা বলেন, জংবাহাদুরের খোঁজখবর নিয়ে আবার তাঁর প্রিয় বিষয়বস্তু, মানুষের নামের সাথে চেহারার সামঞ্জস্য নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিলেন। ভেতর থেকে একসময় সর-ভাসা চা এবং সিঙাড়া এল। আমি সিঙাড়ায় কামড় দিয়ে চা তুলে এক চুমুক খেয়েছি, হঠাৎ ভদ্রলোকের ঘরের ভেতর থেকে শব্দ ভেসে এল, ‘গুলু গুলু গুলু গুলু।’
    চমকে উঠে বিষম খেলাম আমি, গরম চা দিয়ে তালু পুড়ে গেল। কিন্তু আমার সেটা নিয়ে ব্যস্ত হবার মতো অবস্থা নেই। কান খাড়া করে রাখি আমি, আর তখন সত্যি আবার শুনলাম, ‘গুলু গুলু গুলু গুলু।’
    আমি চোখ বড় বড় করে ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই শুনলাম, ‘মুচি মুচি মুচি মুচি।’ তারপর হঠাৎ পর্দা ঠেলে বছরখানেকের একটা ফুটফুটে বাচ্চা থপথপ করতে করতে ঘরে এসে হাজির হল। আমাকে অপরিচিত দেখে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ায়। তারপর আবার মুখ হাসি হাসি করে আধো আধো গলায় বলল, ‘গুলু গুলু গুলু গুলু।’
    পুত্রস্নেহে বাবার চোখ কোমল হয়ে ওঠে, তিনি হাত নেড়ে ডাকতেই খুশিতে ছোট ছোট লাফ দিয়ে হাততালি দিতে থাকে, সফদর আলী যেভাবে লাফিয়েছিলেন। বাচ্চাটি এখনো ভালো করে হাঁটতে শেখে নি, তাই টাল সামলাতে না পেরে হঠাৎ পড়ে গেল, পড়ে গিয়েও তার খুশি দেখে কে, সেভাবেই হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল তার বাবার দিকে, ঠিক সফদর আলীর মতো।
    আমি রহস্য ভেদ করতে গিয়ে আরো বড় রহস্যে পড়ে গেলাম। সফদর আলী যেসব অদ্ভুত শব্দ করছেন সেগুলো এই বাচ্চাটির আধো আধো বুলি, যেসব লাফ-ঝাঁপ বা হামাগুড়ি দিচ্ছেন সেগুলো এই বাচ্চাটির নিখুঁত অনুকরণ। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, তিনি এই বাচ্চাটির অস্তিত্বের কথা পর্যন্ত জানেন না! কেমন করে এটা সম্ভব?
    ভদ্রলোকের বাসায় আরো কিছুক্ষণ থাকলাম, কিন্তু আলাপ আর জমল না। কেমন করে জমবে, আমার মাথায় তখন সফদর আলীর কথা ঘুরছে। বাসায় ফিরে আসার সময় রিকশায় বসে আমি পুরো ব্যাপারটি ভাবতে থাকি, ভাবতে ভাবতে মনে হল পুরো মাথাটা ফেটে যাবে, কিন্তু কোনো কূল-কিনারা পেলাম না। বেশি ভাবনা-চিন্তা করে আমার অভ্যাস নেই, চেষ্টা করলে সহজেই মাথা ধরে যায়। খানিকক্ষণ চেষ্টা করে আমি হাল ছেড়ে দিয়ে যেই রিকশাওয়ালার সাথে গল্প শুরু করলাম, ঠিক তক্ষুনি হঠাৎ করে সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে গেল—একেবারে পানির মতো।
    সফদর আলীকে দরকার, তাঁকে পাওয়া মুশকিল বলে আমিও তাঁর কায়দায় তাঁকে একটা টেলিগ্রাম পাঠালাম, তাতে লেখা,
    ‘রহস্য উদ্‌ঘাটন। গুলু গুলু গুলু গুলু কেন? সহজ সমাধান। কাওরান বাজার। সন্ধ্যা ছয়টা।’
    পরদিন সন্ধ্যা ছয়টার সময় কাওরান বাজারে সেই রেস্তরাঁয় গিয়ে দেখি সফদর আলী পাংশু মুখে বসে আছেন, আমাকে দেখে প্রায় ছুটে এলেন, গলা নামিয়ে বললেন, ‘একটা ব্যাপার হয়েছে।’
    ‘কি ব্যাপার?’
    ‘আমার গবেষণা নিশ্চয়ই জানাজানি হয়ে গেছে, আমার পিছনে দেশী-বিদেশী এজেন্ট লেগে গেছে।’
    ‘কীভাবে জানলেন?’
    ‘আমি যে আশ্চৰ্য-আশ্চর্য শব্দ করি সেটা পর্যন্ত জেনে গেছে। আজ একটা টেলিগ্রাম পেলাম, কে পাঠিয়েছে জানি না, লিখেছে রহস্য উদ্‌ঘাটন।’
    আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আপনি বুঝতে পারেন নি, এটা আমি পাঠিয়েছি।’
    ‘আপনি!’ সফদর আলী মনে হল আকাশ থেকে পড়লেন, ‘আপনি রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছেন?’
    ‘হ্যাঁ।’
    তাঁকে দেখেই বুঝতে পারলাম তিনি আমাকে বিশ্বাস করছেন না। কিন্তু সেটা প্রকাশ করলেন না, একটু রেগে বললেন, ‘টেলিগ্রাম করেছেন তো নাম লেখেন নি কেন?’
    ‘আপনিও তো আপনার টেলিগ্রামে নাম লেখেন না।’
    ‘আমি যদি নাম না লিখি সেটা আমার ভুল। আমি একটা ভুল করি বলে আপনিও একটা ভুল করবেন?’
    এর উত্তরে আমি আর কী বলব?
    সফদর আলী খানিকক্ষণ পর একটু শান্ত হয়ে বললেন, ‘রহস্যটা বলেন, তাহলে শুনি।’
    আমি হাসি চেপে বললাম, ‘বানরটাকে আপনি কেমন করে শেখান মনে আছে? পুরস্কার পদ্ধতি। যখনই বানর একটা ঠিক জিনিস করে আপনি তাকে একটা পুরস্কার দেন, একটা কলা বা কোনো একটা খাবার।’
    ‘হ্যাঁ।’
    ‘আসলে একই সময়ে বানরটাও আপনার উপরে পুরস্কার পদ্ধতি খাটিয়ে যাচ্ছে। আপনি যখন ঠিক জিনিসটা করেন বানরও তখন আপনাকে একটা পুরস্কার দেয়। সেটা হচ্ছে তার মনোযোগ। বানরের কাছে কলাটা যত মূল্যবান আপনার কাছে বানরের মনোযোগ ঠিক ততটুকু মূল্যবান। আপনি প্রাণপণ চেষ্টা করেন বানরের মনোযোগের জন্যে, অনেক কিছু করতে করতে যখন হঠাৎ করে ঠিক জিনিসটা করে ফেলেন, বানর তখন পুরস্কার হিসেবে আপনাকে তার মনোযোগ দেয়।’
    সফদর আলী অবাক হয়ে বললেন, ‘ঠিক জিনিসটা কি?’
    ‘সে যেটা শুনতে চায়।’
    ‘কী শুনতে চায় সে?’
    ‘বানরটা যে বাসা থেকে এনেছি, সে বাসায় একটা ছোট বছরখানেকের বাচ্চা আছে, বানরটার সাথে তার খুব বন্ধুত্ব ছিল। বানরটার বাচ্চাটার জন্যে খুব মায়া জন্মেছিল, আপনার বাসায় আসার পর থেকে সে তাকে আর দেখে না। বানরটা নিশ্চয়ই বাচ্চাটাকে খুব দেখতে চাইছিল, তার গলার স্বর শুনতে চাইছিল। কাজেই আপনি যখনি সেই ছোট বাচ্চাটির মতো শব্দ করেন বা তার মতো লাফ দিয়ে হাততালি দেন, হামাগুড়ি দেন—সে খুশি হয়ে আপনাকে তার মনোযোগ দেয়।’
    সফদর আলী অবিশ্বাসের স্বরে বললেন, ‘আপনি কীভাবে জানেন?’
    ‘আমি কাল জংবাহাদুরের মালিকের বাসায় গিয়েছিলাম, বাচ্চাটিকে দেখে এসেছি, বাচ্চাটি কিছু হলেই বলে, গুলু গুলু গুলু গুলু বা মুচি মুচি মুচি মুচি! জংবাহাদুরের মনোযোগের জন্যে এখন আপনিও নিজের অজান্তেই বলেন, গুলু গুলু গুলু গুলু। মুচি মুচি মুচি মুচি।’
    সফদর আলী বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে-আস্তে বললেন, ‘আপনি ঠিকই ধরেছেন, আসলে তা-ই হয়েছে। বানরটাকে মনোযোগ বাড়ানোর ওষুধ খাওয়াতে না পেরে নিজেই একটু চেখে দেখছিলাম, নিজের মনোযোগ তাই বেড়ে গিয়েছিল দশগুণ।’ তাই থেকে সফদর আলী আপন মনে কী একটা ভাবতে-ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন।
    আমি বললাম, ‘এখন যখন কারণটা জেনেছেন, একটু সতর্ক থাকবেন।’
    সফদর আলী আমার কথা শুনলেন বলে মনে হল না। আমি ডাকলাম একবার, কোনো সাড়া নেই। ঠাট্টা করার জন্যে গলা উঁচিয়ে বললাম, ‘গুলু গুলু গুলু।’
    সফদর আলী ঠাট্টা-তামাশা বোঝেন কম, আমার কথা শুনে ভীষণ চমকে উঠে চায়ের কাপ উল্টে ফেললেন, আমার দিকে ঘুরে তাকালেন, আস্তে-আস্তে তাঁর চোখ বড়-বড় হয়ে উঠতে থাকে।
    আমি একটা নিঃশ্বাস ছাড়ি। ঠাট্টা-তামাশা বাড়ানোর একটা ওষুধ বের করতে পারলে মন্দ হত না, ডাবল ডোজ খাইয়ে দেয়া যেত সফদর আলীকে।

পোস্ট করেছেন: Md. Ashiqur Rahman
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য