বুড়ো-বুড়ির কচুর মুখি রোপণ - মণিপুরী রূপকথা

    অনেক দিন আগের কথা। পাহাড়ের গা ঘেঁষে বয়ে চলেছে একটি ঝর্ণা, সেই ঝর্ণার ধারে ছিল একটি ছোট্ট গ্রাম। সেই গ্রামের প্রান্তে বাস করত এক বুড়ো-বুড়ি দম্পতি। তারা ছিল নিঃসন্তান। বুড়ো বয়সে তারা তেমন কাজ-কর্মও করতে পারত না। কাছের পাহাড়ে ছিল বন বাঁদরের বাস। ওরা মাঝে মধ্যে বুড়োর পশ্চিমের রবিশস্যের ক্ষেতে বিচরণ করত। আর এটা ওটা ফলমূল খেয়ে ফেলত। বুড়ো তাদের কোনদিন তেমন করে শাসায়নি। বলতে গেলে কলা করল্লার অর্ধেক অংশই তাদের পেটে যেত।
    সামনে কচুর মুখি লাগানোর মৌসুম। বুড়ো-বুড়ি ঠিক করল বাড়ির পিছনে বাঁশঝাড়ের নিকটে এক পোয়া জমিতে এবার ভালভাবে কচুর মুখি লাগাবে। একদিন বুড়ো-বুড়ি দুজনে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে জমি খোদাই করে নিল। পরদিন দ্বিতীয়বারের মত কুপিয়ে জমিকে উর্বর করে তুলল।
    পরদিন বিকেলে জমিতে মুখি কচু লাগাতে গেল বুড়ো-বুড়ি দুজনে । সবেমাত্র এক লাইন কচুর মুখি লাগিয়ে শেষ করেছে। এমন সময় একদল বাঁনর জঙ্গল থেকে বের হয়ে বুড়ো-বুড়ির কাছে এসে কৌতুহলী ভঙ্গিতে ঘিরে বসল।
    সবচেয়ে বয়স্ক বানরটা গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, দাদু, তোমরা কি করছ? বুড়ো-বুড়ি একসঙ্গে বলল, আমরা কচুর মুখি লাগাচ্ছি।
    —কি রকম লাগাচ্ছ?
    —কেমন করে লাগাব আর! লাইন টেনে এক হাত দূরে দূরে ছােট্ট ছােট্ট গর্ত করে কচুর মুখি অংকুরটি মাটির উপরে রেখে লাগাচ্ছি। এরপর মাটি দিয়ে ঢেকে দিচ্ছি।
    বানররা বুদ্ধি এঁটে বলল, ওহ, তাই বল, এ রকম করে লাগালে বড় হতে পুরো দুমাস লেগে যাবে। কচুর মুখি বড় হবার একটা বুদ্ধি আমাদের জানা আছে। যদি জানতে চাও তবে বলতে পারি। একথা শুনে বুড়ো-বুড়ি খুশি হল। তারা উপায়টা জানার জন্য উদগ্ৰীব হয়ে উঠল।
    হ্যাঁ, প্রথমে ভাল করে সিদ্ধ করে মুখির সঙ্গে একটা চ্যাংমাছ, একটা শুটকী মাছ আর এক মুঠো ভাত কাপড়ের টুকরোয় বেঁধে লাগাও। দেখবে এক রাতের মধ্যেই কচুর মুখি তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাবে। কল্পনাও করতে পারবে না দাদু!
    বুড়ো-বুড়ি ছিল খুবই সরল, তারা একথা বিশ্বাস করল। তারা বলল, বাছা, আমাদের তো ছেলে পিলে নেই যে তাদের উপর ভরসা করব। তোমাদের কথায় আমরা ভরসা পেলাম। আমরা চাই তাড়াতাড়ি কচুর মুখি বড় হােক আর আমরা সকাল সকাল তা খেতে পাই।
    তারা এবাড়ি ওবাড়ি খুঁজে জিনিসগুলো যোগাড় করল। সন্ধ্যার আগেই কচুর মুখি লাগিয়ে বাড়ি চলে গেল।
    রাত গভীর হলে জঙ্গল থেকে এক একটা বড় বনকচু এনে মুখি ক্ষেতের দিকে রওয়ানা দিল বানরের দল। কাপড়ের গাইট খুলে সিদ্ধ মুখি আর শুটকী মাছ ভাত মজা করে খেয়ে ফেলল তারা। খাওয়া শেষ করে বড় বড় বনকচু সারি সারি লাগিয়ে জঙ্গলে প্ৰবেশ করল তারা ; পরদিন ঘুম থেকে ভোরে উঠে কচুক্ষেতে গিয়ে বুড়ো তো অবাক। বুড়িকে ডাকতে ডাকতে বাড়িতে বুড়ো প্রায় দৌড়েই পৌছল। বুড়ি সবকথা শুনে বানরদের বুদ্ধির তারিফ করল। তারা মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুল করল না।
    তারপর বুড়ো কাস্তে হাতে বের হয়ে কাণ্ডসহ কয়েকপিাতা কিছু শাক কেটে বুড়ির হাতে দিয়ে বলল, “আজ মাছ দিয়ে কচু শাকের তরকারি রাঁধ। আমি মাছ ধরতে যাই।”
    বুড়ো একটা সচ্‌ দিয়ে মাছ ধরতে বের হল। বাড়ির পূর্বদিকে হেঁটে গিয়ে জমিনেরর কোণে খুঁজে পেল একটি খাঞ্জা (মাছ চাষের ছোট্ট পুকুর) । বুড়ো সচ্‌ দিয়ে খাঞ্জার সমস্ত পানি ছিটাতে ছিটাতে মাথার ঘাম পায়ে জড়াল কিন্তু কয়েকটি ব্যাঙ ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না।
    ব্যাঙগুলো বুড়োকে উপহাস করে গ্যাং গ্যাং করে লাফাতে লাফাতে পালালো। বুড়ো বলে উঠল, “আকমমৌ নুয়ারলে আরাকমীে চাঙ’ (একবার না পেলেও আবার দেখব।)
    বুড়ো মুখে গান ধরে সচ্‌ কাঁধে তুলে আরও পূর্বদিকে প্রায় দুই কিয়ার জমি পাড় হয়ে আরেকটি খাঞ্জা খুঁজে পেল এবং পানি সেচ করতে লাগল। হাঁটু পানি ছিটিয়ে শেষ করে দেখতে পেল মাত্র কিছু চিংড়ি নড়াচড়া করছে। বুড়ো হয়রান হয়ে পড়েছিল। বেলাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু এখন ও সে মনের মত কোন মাছ পেল না।
    ঈশ্বরেরর নাম স্মরণ করল বুড়ো। এবার আরেকটি খাঞ্জার খোঁজে বেরোল। কিছুদূর উত্তর দিকে হেঁটে খুঁজে পেল একটি বড় খাঞ্জা। ভর দুপুরে বুড়ো পানি ছিটাতে ছিটাতে ঘৰ্মাক্ত হয়ে গেল। কিন্তু এবার তার ভাগ্য প্রসন্ন হল। পানি প্রায় শেষ হলে সে দেখতে পেল একটি বড় মাগুর মাছ খাঞ্জার মাঝখানে লাফালাফি করছে। সে এক লাফে মাগুর মাছটি ধরে সোজা বাড়ির দিকে রওনা দিল।
    বুড়ি মাগুর মাছটি কচুশাক দিয়ে রাঁধল। ইতিমধ্যে বুড়ো নদীতে স্নান করতে গেল। বুড়ি অপেক্ষা করতে পারল না। সারাজীবন সে বুড়োকে খাইয়ে পরে সে খেয়েছে। আজ মাগুর মাছের বড় টুকরোগুলো খাওয়ার লোভ সে সামলাতে পারল না। বড় টুকরোগুলো খেয়ে বাকিটা বুড়োর জন্য রেখে দিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
    বুড়ো খেতে বসে দেখল তার বাটীতে তরকারীর মধ্যে সামান্য দু একটি ছোট মাছের টুকরো রেযেছে। বুড়িকে জিজ্ঞেস করল, “তরকারীর বাটীতে মাছের টুকরো এত কম কেন?”
    এতক্ষণে বুড়ির গলায় খিচুনি ধরে গেছে। এরই মাঝে বুড়োর বকুনী খেয়ে লেপ মুড়ি দিয়ে বলল, “কি জানি, বিড়াল মাছ খেয়েছে মনে হয়!"
    বুড়ো রেগে গিয়ে লাঠি দিয়ে বিড়ালকে মারতে লাগল। বিড়াল কেঁদে বলল, ‘মিয়াই, মিয়াউ, বুড়িয়ে খেয়া মোরে মারানি’ (মেঁউ, মেঁউ, বুড়ি মাছ খেয়েছে আর আমাকে মারলো?)
    একথা জিজ্ঞেস করায় বুড়ি বলল, “তোমাকে না দিয়ে খেতে পারি? কুকুর খেয়েছে হয়তো?"
    রেগে গিয়ে বুড়ো লাঠি দিয়ে কুকুরকে মারতে লাগল। কুকুর কেঁদে বলল, গেউ, গেউ, বুড়িয়ে খেয়া মোরে মারানি! (গেউ, গেউ, বুড়ি মাছ খেয়েছে আর আমাকে মারলো?)
    এরই মাঝে কচুশাকের কেরামতি শুরু হয়ে গেছে। বুড়ো সামান্যই খেয়েছিল। সামান্যতে গলায় খিচুনি শুরু হয়ে গেছে। তবুও আবার বুড়িকে ভালভাবে জিজ্ঞেস করতে হবে ভেবে বুড়ির কাছে গিয়ে দেখতে পেল বুড়িও গলা খিচুতে খিচুতে অস্থির।
    খিচুনির জ্বালায় বুড়ি সব দোষ স্বীকার করল। বুড়ো ভাবল, এখন আর ঝগড়া করে লাভ নেই। আগে এর একটা বিহিত ব্যবস্থা করতে হবে। কিছু পুরনো তেঁতুল আর একগ্লাস পানি পান করে কিছু সময় কাটানোর পর খিচুনি থামল। ধীরে ধীরে দুজনে সুস্থ হয়ে উঠল।
    এবার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বুড়ো-বুড়ি দুজনে পরামর্শ করতে বসল। বুড়ো বলল, আমি তুলসীগাছের তলায় মরার মত শুয়ে পড়ে থাকি, তুমি কাঁদবে। আর বানররা আমাদের কান্নাকাটি শুনে জঙ্গল থেকে বের হয়ে এসে যখন কারণ জিজ্ঞাসা করবে। তখন আমরা ওদের পেট্যাব। পরামর্শ মত কাজ হল। বুড়ো চিৎ হয়ে তুলসী গাছের তলায় শুয়ে রইল আর নিকটে রাখল একটি মজবুত লাঠি। বুড়ি এক টুকরো সাদা কাপড় দিয়ে বুড়োকে ঢেকে দিল আর স্বামীর গুনগান গেয়ে কাঁদতে লাগল।
    বিকেল বেলা প্রতিদিনের মত বানরের দল রবিশস্যের ক্ষেতে বেড়াচ্ছিল। বুড়ির কান্না শুনে দল বেঁধে উৎসুক দৃষ্টিতে দৌড়ে এল। তারা জিজ্ঞেস করল, “দাদী, দাদুর কি হয়েছে?”
    —হায়! তোমাদের দাদু মারা গেছে। এখন আমার কি হবে?
    —আমরাতো আছি। দাদীমা । তোমার সুবিধা-অসুবিধায় আমরা সাহায্য করব।
    থাক সে কথা! আগে তো তার আত্মার সদগতির জন্য আমাদের কান্দতে হয় । তোমরা সকলে মিলে তার জন্য কান্দতে থাক । এতে তোমাদের দাদুর আত্মা স্বৰ্গ লাভ হবে।
    বানরের দল কান্দতে আরম্ভ করল ।
    —আরও নিকটে গিয়ে কাঁদো বাছারা । তোমরা বুড়োর খুব স্নেহের পাত্র ছিলে!
    বানররা জোরে কাঁদতে লাগল । বুড়িও এইকথা বলে কাঁদল যে, দেখ, তোমার সন্তানরা এসেছে। তারা তোমার আত্মার শান্তির জন্য বিলাপ করছে।
    বুড়ো সকল আয়োজন শেষ হয়েছে দেখে আস্তে আস্তে কাপড়ের নিচে লুকানো লাঠিটা বের করে উঠেই এলাপাথাড়ি বানারগুলোকে পেটাতে লাগল। ডুপ! ডাপ! ডপাস! ঠপাস!
    বুড়ি মুগুর দিয়ে, কুকুর মুখ ও নখ দিয়ে, বুড়ো লাঠি দিয়ে ত্রিমুখী আক্রমণ করল । ঘেউ! ঘাউ!
    এরপর কি আর বাঁনরের দল সেখানে দাঁড়ায়। ঠ্যাং ভেঙে, ঘাড় ভেঙে, যে যেদিকে পারে ছুটে পালাল।
    বানরের সর্দারের ঠ্যাং ভেঙে গেছে। কুকুর তার লেজও কামড়ে ছিড়ে দিয়েছে। কোন রকমে দৌড়ে সে জঙ্গলে গিয়ে গর্তে ঢুকল আর বেরোল না।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য