ঋণং কৃত্বা - শিবরাম চক্রবর্তী

    কারো ধার ধারি না, এমন কথা আর যে-ই বলুক আমি কখনওই বলতে পারি না। আমার ধারণা, এক কাবুলিওয়ালা ছাড়া এ-জগতে একথা কেউই বলতে পারে না । অমৃতের পথ “ক্ষুরস্য ধারা নিশ্চিতা; অকালে মৃত না হতে হলে ধার করতেই হবে ।
    ধার হলেও কথা ছিল বরং, কিন্তু তাও নয় । বাড়িভাড়া বাকি, তাও বেশি। না, পাঁচশো টাকা মাত্তর! কিন্তু তার জন্যই বাড়িওয়ালা করাল মূর্তি ধরে দেখা দিলেন একদিন—
    আপনাকে অনেক সময় দিয়েছি, কোনাে অজুহাত শুনছি না। আর—
    ‘ভেবে দেখুন একবার’, আমি তোকে বলতে যাই’ ‘এই সামান্য পাঁচশো টাকার জন্যে আপনি এমন করছেন! অথচ এক যুগ পরে একদিন-আমি মারা যাবার পরেই অবিশ্যি—আপনার এই বাড়ির দিকে লোকে আঙুল দেখিয়ে বলবে, একদা এখানে বিখ্যাত লেখক শ্ৰীঅমুক চন্দ্র বাস করতেন।
    ‘বাস করতেন ! বাস করে আমার মাথা কিনতেন!’ জবাবে তার দিক থেকে যেন ঝাপটা এল—‘শুনুন মশাই, আপনাকে সাফ কথা বলি—যদি আজ রাত্রি বারোটার ভেতর আমার টাকা না পাই তাহলে এক যুগ পরে নয়—কালকেই লোকে এই কথা বলবে।’
    বাড়িওয়ালা তো বলে গেলেন, চলেও গেলেন । কিন্তু এই এক বেলার মধ্যে এত টাকা আমি পাই কোথায়? পাছে ধার দিতে হয়। সেই ভয়ে সহজে কেউ আমার মতো লেখকের ধার ঘেঁষে না। লেখকমাত্রই ধারালো, আমি আবার তার  এক কাঠি—জানে সবাই ।
    হর্ষবর্ধনের কাছে যােব? তাদের কাছে এই ক-টা টাকা কিছুই নয়। কীর্তিকাহিনী লিখে অনেক টাকা তাদের পিটেছি, এখন তাদের পিঠেই যদি চাপি গিয়ে ? তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় যদি এই দায় থেকে উদ্ধার পাই ?
    গিয়ে কথাটা পাড়তেই হর্ষবর্ধন বলে উঠলেন—‘নিশ্চয় নিশ্চয়! আপনাকে দেব না তো কাকে দেব!’
    চমকে গোলাম আমি ! কথাটা যেন কেমনতরো শোনাল ।
    ‘আপনি এমন কিছু আমাদের বন্ধু নন?’ তিনি বলতে থাকেন।
    ‘বন্ধুত্বের কথাই যদি বলেন— ‘ আমি বাধা দিয়ে বলতে যাই ।
    ‘হ্যাঁ, বন্ধুত্বের কথাই বলছি। আপনি তো আমাদের বন্ধু নন । বন্ধুকেই টাকা ধার দিতে নেই, মানা আছে। কেন-না তাতে টাকাও যায়, বন্ধুও যায়।’ তিনি জানান : ‘তবে হ্যা, এমন যদি সে বন্ধু হয় যে বিদেয় হলে বাঁচি—তার হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে তাকে ঐ ধার দেওয়া । তা হলেই চিরকালের মতন নিস্তার!’
    আহা! আমি যদি ওঁর সেই দ্বিতীয় বন্ধু হতাম– মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম ।
    ‘কিন্তু আপনি তো বন্ধু নন, লেখক মানুষ। লেখকরা তো কখনও কারো বন্ধু হয় না ।’
    ‘লেখকদেরও বোধহয় কেউ বন্ধু হয় না । সখেদে বলি ।
    ‘বিলকুল নিৰ্ব্বঞােট! এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে, বলুন?’ তিনি বলেন, ‘আপনি যখন আমাদের আত্মীয়-বন্ধু কেউ নন, নিতান্তই একজন লেখক, তখন আপনাকে টাকা দিতে আর বাঁধা কী? কত টাকা দিতে হবে বলুন?’
    ‘বেশি নয়, শ-পাঁচেক । আর একেবারে দিয়ে দিতেও আমি বলছি না।’ আমি বলি: ‘আজ তো বুধবার। শনিবারদিনই টাকাটা আমি আপনাকে ফিরিয়ে দেব।'
    কথা দিলাম। এ ছাড়া আজ বাড়িওয়ালার হাত থেকে ত্ৰাণ পাবার আর কী উপায়! কিন্তু কথা তো দিলাম, না ভেবেই দিয়েছিলাম কথাটা—শনিবারের সকাল হতেই ওটা ভাবনার কথা হয়ে দাঁড়াল ।
    ভাবতে ভাবতে চলেছি, এমন সময় গোবর্ধনের সঙ্গে মোলাকাত—অকূল পাথরে, চৌরাস্তার মোড়ে ।
    ‘গোবর্ধন ভায়া, একটা কথা রাখবে? রাখো তো বলি।’
    ‘কী কথা বলুন?’
    যদি কথা দাও যে, তোমার দাদাকে বলবে না, তাহলেই বলি।’
    ‘দাদাকে কেন বলতে যাব? দাদাকে কি আমি সব কথা বলি?’
    অন্য কিছু কথা নয়, কথাটা হচ্ছে এই, আমাকে শ-পাঁচেক টাকা ধার দিতে পারো-দিন কয়েকের জন্যে? আজ তো শনিবার? এই বুধবার সন্ধের মধ্যেই টাকাটা আমি তোমায় ফিরিয়ে দেব।
    ‘এই কথা?’ এই বলে আর দ্বিরুক্তি না করে শ্ৰীমান গোবরা তার পকেট থেকে পাঁচখানা একশো টাকার নোট বার করে দিল ।
    টাকাটা নিয়ে আমি সটান শ্ৰীহৰ্ষবর্ধনের কাছে ।
    ‘দেখুন, আমার কথা রেখেছি কি না । দরিদ্র লেখক হতে পারি, কথা নিয়ে খেলা করতে পারি।—কিন্তু কথার খেলাপ কখনও করি না ।’
    হর্ষবর্ধন নীররবে টাকাটা নিলেন।
    আপনি তো ভেবেছিলেন যে টাকাটা বুঝি আপনার মারাই গেল, আমি আর এ-জন্মেও এমুখো হব না । ভাবছিলেন যে,—’
    ‘না না । সে-সব কথা আমি একেবারেই ভাবিনি। টাকার কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। তিনি বললেন, ‘বিশ্বাস করুন, টাকাটা আপনাকে দিয়ে আমি কিছুই ভাবিনি। কিন্তু ফেরত পেয়ে এখন বেশ ভাবিত হচ্ছি।’
    ‘ভাবছেন এই যে, এই পাঁচশো টাকা ফিরিয়ে দিয়ে নিজের ক্রেডিট খাটিয়ে এর পরে আমি ফের হাজার টাকা ধার নেব । তারপরে সেটা ফেরত দিয়ে আবার দু-হাজার চাইব । আর এমনি করে ধারটা দশ হাজারে দাঁড় করিয়ে তারপরে আর এ-ধারই মাড়াব না? এই তো ভাবছেন আপনি? এই ভেবেই তো ভাবিত হয়েছেন, তা-ই না?’
    আমি তাঁর মনোবিকলন করি। তাঁর সঙ্গে বোধহয় আমার নিজেরও!
    তিনি বিকল হয়ে বলেন, ‘না না, সে-সব কথা আমি আদৌ ভাবিনি। ভাবছি যে এত তাড়াতাড়ি আপনি টাকাটা ফিরিয়ে দিলেন!! আর এত তাড়াতাড়ি আপনার প্রয়োজন কী করে মিটতে পারে? বেশ, ফের আবার দরকার পড়লে চাইতে যেন কোনো কুণ্ঠা করবেন না।’
    বলাই বাহুল্য! মনে মনে আমি ঘাড় নাড়লাম। লেখকরা বৈকুণ্ঠের লোক, কোন কিছুতেই তাদের কুণ্ঠা হয় না।
    বুধবার দিনই দরকারটা পড়ল আবার। হর্ষবর্ধনের কাছে থেকে টাকাটা নিয়ে গোবর্ধনকে গিয়ে দিতে হল ।
    ‘কেমন গোবর্ধন ভায়া! দেখলে তো, কথা রেখেছি কি না । এই নাও তোমার টাকা-প্রচুর ধন্যবাদের সহিত প্ৰত্যৰ্পিত।”
    বুধবার আবার গোবরার কাছে যেতে হল । পাড়তে হল কথা—‘গোবর্ধন ভায়া, বুধবারে টাকাটা ফেরত দিব বলেছিলাম, বুধবারেই দিয়েছি, দিইনি কি? একদিনের জন্যেও কি আমার কথার কোনো নড়াচড় হয়েছে?’
    ‘এমন কথা কেন বলছেন?’ গোবর্ধন আমার ভণিতা ঠিক ধরতে পারে না ।
    ‘টাকাটা আমার দরকার পড়েছে আবার । ওই পাঁচশো টাকাই-সেইজন্যেই তোমার কাছে এলাম ভাই! এই বুধবারই তোমায় আবার ফিরিয়ে দেব টাকাটা । নিৰ্ঘাত ।’
    এইভাবে হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধন, গোবর্ধন আর হর্ষবর্ধন-শনিবার আর বুধবারের দুধারের টানা-পোড়েনে আমার ধারিওয়াল কম্বল বুনে চলেছি, এমন সময়ে পথে একদিন দু-জনের সঙ্গে দেখা !
    দুই ভাই পাশাপাশি আসছিল। আমাকে দেখে দাঁড়াল। দুজনের চোখেই কেমন যেন একটা সপ্রশ্ন দৃষ্টি
    হয়তো দৃষ্টিটা কুশল-জিজ্ঞাসার হতে পারে, কোথায় যাচ্ছি, কেমন আছি এই ধরনের সাধারণ কোনাে কৌতুহলই হয়তো-বা, কিন্তু আমার তো পাপ মন! মনে হল দু-জনের চােখেই যেন এক তাগাদা!
    ‘হর্ষবর্ধনবাবু, ভাই গোবর্ধন, একটা কথা আমি বলব, কিছু মনে কোরো না—’ বলে আমি শুরু করি : ‘ভাই গোবর্ধন, তুমি প্রত্যেক বুধবার হর্ষবর্ধনবাবুকে পাঁচশো টাকা দেবে। আর হর্ষবর্ধনবাবু, আপনি প্রত্যেক শনিবার পাঁচশো টাকা আপনার ভাই গোবর্ধনকে দেবেন। হর্ষবর্ধনবাবু, আপনি বুধবার, আর গোবর্ধন, তুমি শনিবার-মনে থাকবে তো?’
    ‘ব্যাপার কী?' হর্ষবর্ধন তো হতভম্ব ।—‘কিছুই বুঝতে পারছি না।’
    ‘ব্যাপার এই যে, ব্যাপারটা আমি একেবারে মিটিয়ে ফেলতে চাই । আপনাদের দুজনের মধ্যে আমি আর থাকতে চাই না ।’
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য