তিনটি পালক - জার্মানের রূপকথা

        এক সময় ছিলেন এক রাজা। তার তিন ছেলে। বড়ো দুজন চালাক-চতুর। কিন্তু ছোটোটি নিরীহ আর শান্ত। তাই লোকে তাকে বলত হাদাগঙ্গারাম। রাজা বুড়ো হবার পর ভাবতে শুরু করলেন—তাঁর পর কোন ছেলে সিংহাসনে বসবে। একদিন ছেলেদের ডেকে তিনি বললেন, “তোমরা বেরিয়ে পড়ো। আমার জন্যে যে সব চেয়ে সুন্দর গালচে নিয়ে আসতে পারবে, আমার মৃত্যুর পর সেই হবে রাজা।” এইনা বলে তাদের নিয়ে রাজা দুর্গের সামনে গিয়ে ফুঁ দিয়ে তিনটি পালক উড়িয়ে দিলেন। তার পর বললেন, “এই তিনটে পালক যেদিকে যাবে তোমরা তিনজন সেদিকে যেয়ো।” একটা পালক উড়ে গেল পুবে, একটা পশ্চিমে আর তৃতীয়টা সামনের দিকে খানিক গিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তাই এক ভাই গেল পুবে, এক ভাই পশ্চিমে। সামনে খানিক গিয়ে যে পালকটা পড়েছিল বোকা ছোটো ভাইটাকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তারা টিটকিরি দিয়ে হাসল।
        বেচারা বোকা ছোটো ভাই সেখানে বসে মনের দুঃখে কাঁদতে লাগল। কিন্তু কয়েক মিনিট পরে সে দেখে পালকটা যেখানে পড়ে তার কাছেই একটা গুপ্ত দরজা। সেটা খুলে দেখে একটা সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি দিয়ে সে লাগল নীচে নামতে। খানিক নামার পর সে পৌছল আর-একটা দরজার সামনে। সেই দরজায় টোকা দিয়ে সে শুনতে পেল ভিতরে কে যেন গান গাইছে। দরজা খুলতে সে দেখে একটা মস্ত মোটা কোলা ব্যাঙ বসে। আর সেটাকে ঘিরে রয়েছে ছোট ছোটাে আরো অনেক ব্যাঙ।
        মোটা কোলা ব্যাঙ প্রশ্ন করল—কী তার চাই।
        সে বলল, “সব চেয়ে সুন্দর একটা গালচে আমার দরকার।”
        ছোটো একটা ব্যাঙকে কোলা ব্যাঙ বলল বড়ো একটা বাক্স আনতে। ছোটো ব্যাঙ বাক্সটা আনতে মোটা কোলা ব্যাঙ সেটার ডালা খুলে বোকা ছোটো ভাইকে এমন সুন্দর একটা গালচে দিল, পৃথিবীতে যার জুড়ি নেই। কোলা ব্যাঙকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বোকা ছোটো ভাই আবার সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল।
        অন্য দু ভাই ভেবেছিল তাদের ছোটো ভাই এমনই বোকা যে, কিছুই আনতে পারবে না। তাই তারা বিশেষ খোঁজাখুঁজি করল না। প্রথম যে রাখাল-বউয়ের সঙ্গে দেখা তার কাছ থেকে খুব বাজে ধরনের আলোয়ান নিয়ে তারা ফিরল রাজার কাছে। একই সময় সেই নিখুঁত সুন্দর গালচে নিয়ে রাজার কাছে পৌছল তাদের বোকা ছোটো ভাই।
        গালচেটা দেখে অবাক হয়ে রাজা বললেন, “ন্যায়ত আর ধর্মত এরই রাজা হবার কথা।” কিন্তু অন্য দুই ছেলে কিছুতেই রাজার কথা মানতে রাজি হল না। তারা বলল, বোকা লোকের পক্ষে রাজত্ব চালানো অসম্ভব। রাজাকে তারা বলল, আরো শক্ত একটা কাজ দিতে। রাজা বললেন, “আমার জন্যে যে সব চেয়ে সুন্দর আংটি আনতে পারবে সে-ই পাবে রাজত্ব ৷” এই-না বলে তিন ছেলেকে দুর্গের বাইরে নিয়ে গিয়ে ফুঁ দিয়ে আবার তিনি তিনটে পালক উড়িয়ে দিয়ে বললেন, পালকগুলোর পেছন পেছন যেতে।
        আবার বড়ো ছেলেদের একজন গেল পুবে, একজন পশ্চিমে। আর বোকা ছেলেটির পালক সামনে উড়ে গিয়ে পড়ল সেই গুপ্ত দরজাটার পাশে।
        আবার সিঁড়িটা দিয়ে নামতে তার সঙ্গে দেখা হল সেই মোটা কোলা ব্যাঙের। বোকা রাজপুত্তুর বলল, “পৃথিবীর মধ্যে সব চেয়ে সুন্দর আংটির দরকার।”
        সঙ্গে সঙ্গে মোটা কোলা ব্যাঙ বলল সেই বাক্সটা আনতে আর সেটা থেকে ঝলমলে হীরে-পান্না বসানো সুন্দর একটা আংটি বার করল যার জুড়ি পৃথিবীর কোনো স্যাকরা বানাতে পারে না।
        বোকা ভাইটি সুন্দর আংটির খোঁজে গেছে বলে বড়ো দুভাই খুব হাসাহাসি করল। সুন্দর আংটি জোগাড় করার কোনো চেষ্টাই নিজেরা করল না। একটা ঠেলা গাড়ির পুরনো ছোটো চাকা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে সেটার পেরেকগুলো ঠুকে বের করে তারা নিয়ে গেল রাজার কাছে।
        বোকা ভাই তার হীরে-পান্না বসানো সোনার আংটিটা দেখাতে রাজা বললেন, “আমার ছোটো ছেলেই পাবে রাজত্ব।”
        কিন্তু অন্য দুই ছেলে কিছুতেই রাজার কথা মানতে রাজি হল না। তাই শেষটায় রাজা আর-একটা শর্ত করে বললেন—সব চেয়ে সুন্দরী মেয়েকে যে নিয়ে আসতে পারবে সে-ই পাবে রাজত্ব। আবার বাতাসে ওড়ানো হল সেই তিনটে পালক আর আগের মতোই সেগুলো গেল তিন দিকে।
        বোকা ছেলে সোজা সেই মোটা কোলা ব্যাঙের কাছে গিয়ে বলল— পরমা-সুন্দরী একটি মেয়ে দিতে।
        কোলা ব্যাঙ বলল, “পরমাসুন্দরী মেয়েকে পাওয়া অত সহজ নয়। কিন্তু তোমাকে দিচ্ছি।” এই-না বলে সে তাকে দিল পুরনো হলদে একটা গাজর। সেটার মাঝখানে ফাঁপা। গাজরটার সঙ্গে সে জুতে দিল ছটা ইঁদুর।
        বোকা রাজপুত্তুর করুণ গলায় প্রশ্ন করল, “এদের নিয়ে কি করব?”
        কোলা ব্যাঙ বলল, “এটার মধ্যে আমার যে কোনো একটা বাচ্চাকে বসিয়ে দাও।”
        এই-না বলে হাতের কাছে যে বাচ্চাকে পেল তাকে ধরে সে বসিয়ে দিল সেই হলদে গাড়িতে। আর চক্ষের নিমেষে সেই বাচ্চা ব্যাঙ হয়ে গেল পরমা সুন্দরী তরুণী মেয়ে, গাজরটা জুড়িগাড়ি আর ছটা ইঁদুর ছটা ঘোড়া। ছোটো রাজপুত্তুর মেয়েটিকে চুমু খেলো। তার পর গাড়ি হাঁকিয়ে তাকে নিয়ে গেল রাজার কাছে।
        তার অন্য দু ভাই ফিরল পরে। আগের মতোই এবারও তারা কষ্ট করে খোঁজাখুঁজি করে নি। যে চাষী-মেয়েদের সঙ্গে প্রথম দেখা তাদেরই তারা হাজির করল ‘পরমাসুন্দরী’ হিসেবে।
        তাই-না দেখে রাজা ঘোষণা করে দিলেন, “আমার মৃত্যুর পর রাজত্ব পাবে আমার ছোটো ছেলে।”
        কিন্তু বড়ো দু ভাই আপত্তি করে রাজার কান ঝালাপালা করে দিল। তারা বলল, “তোমার রাজত্ব এক হাঁদাগঙ্গারাম শাসন করবে—এটা আমরা বরদাস্ত করব না।” তারা প্রস্তাব করল; যে-ছেলের বউ হলঘরের মধ্যে টাঙানো লোহার চাকার মধ্যে দিয়ে লাফিয়ে যেতে পারবো তাকেই দিতে হবে রাজত্ব। তারা ভেবেছিল, চাষীদের মেয়েরা শক্তসমর্থ আর ডানপিটে গোছের, লাফঝাঁপের কাজ অনায়াসে তারা করতে পারবে। কিন্তু ভদ্র পরিবারের কোমল দুর্বল মেয়ে লাফঝাঁপ করতে গেলে পড়বে মারা।’
        বুড়ো রাজা এই প্রস্তাবে রাজি হলেন। চাষী-মেয়েরা কিন্তু সেই লোহার চাকার মধ্যে দিয়ে এমন আনাড়ির মতো লাফ দিল যে, পড়ে গিয়ে ভাঙল তাদের হাত-পা। কিন্তু বোকা রাজপুত্তুরের সুন্দরী বউ হরিণীর মতো সুন্দর ভঙ্গিতে লাফিয়ে গলে গেল সেই লোহার চাকার মধ্যে দিয়ে। আর তখন কোনো ওজর-আপত্তি খাটল না। বোকা রাজপুত্তুরই পেল রাজমুকুট আর অনেক বছর ধরে বিজ্ঞ আর বিচক্ষণের মতো রাজ-কাজ করল পরিচালনা।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য