তিন চরকা-বুড়ি - জার্মানির রূপকথা

        অনেকদিন আগে ছোটো একটি মেয়ে ছিল। বেজায় সে কুঁড়ে। কিছুতেই সুতো কাটতে চাইত না। মা তাকে অনেক বোঝাত-সোঝাত। কিন্তু কোনো কিছুতেই ফল হত না! একদিন তার মার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। দারুণ রেগে মেয়েকে সে খুব মারল। ফলে মেয়েটি লাগল ডাক ছেড়ে কাঁদতে। তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে রানী গাড়ি করে যাচ্ছিলেন। কান্নার শব্দ শুনে গাড়ি থামিয়ে তাদের বাড়িতে গিয়ে মেয়ের মাকে তিনি জিগগেস করলেন—মেয়েকে এমন মার সে মারছে কেন যে তার কান্নার শব্দ পথ থেকেও শোনা যায়? মেয়ের কঁড়েমির কথা বলতে তার মার লজ্জা হল। তাই সে বলল, “দেখুন-না রানীমা—কিছুতেই মেয়েটাকে চরকার কাছ থেকে সরাতে পারি না। সব সময় সে সুতো কাটতে চায়। আমি গরিব মানুষ— অত শণ জোগাই কোত্থেকে?
        রানী বললেন, “সুতোকাটা আমি সব চেয়ে ভালোবাসি। চরকার শুনগুন শুনলেই সব চেয়ে খুশি হই। রাজবাড়িতে তোমার মেয়ে আমার সঙ্গে চলুক। আমার প্রচুর শণ আছে। যত খুশি সে সুতো কাটতে পারবে।”
        মেয়ের মা সানন্দে রাজি হল। রানী মেয়েকে নিয়ে চলে গেলেন। দুর্গে পৌছে মেয়েটিকে উপরতলায় নিয়ে গিয়ে তিনটে ঘর তিনি দেখালেন। ঘরগুলোর মেঝে থেকে ছাত পর্যন্ত সব চেয়ে ভালো শণে ঠাসা। রানী বললেন, “এই-সব শণ দিয়ে আমায় সুতো কেটে দাও। সব শণ শেষ হলে আমার বড়ো ছেলের সঙ্গে তোমার বিয়ে দেব। তুমি গরিব হলেও কিছু আসে-যায় না। তোমার অধ্যবসায় আর পরিশ্রমই যৌতুক হিসাবে যথেষ্ট।"
দেখেশুনে মেয়েটি মনে মনে আঁতকে উঠল। কারণ সে বুঝল প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত সুতো কাটলেও যখন তার তিনশো বছর বয়স হবে তখনো সমস্ত শণ ফুরোবে না। রানী চলে গেলে একলা বসে-বসে সে কাঁদতে শুরু করল। তিনদিন একটি আঙুলও নাড়াল না। তৃতীয় দিন রানী এসে কোনো কাজ হয় নি দেখে অবাক হয়ে গেলেন। কিন্তু মেয়েটি বলল মায়ের বাড়ি থেকে চলে আসার দুঃখের দরুন তখনো সে কাজ শুরু করতে পারে নি।
        কথাটা শুনে রানী সন্তুষ্ট হলেন। কিন্তু যাবার আগে বললেন, “কাল থেকে কিন্তু কাজ শুরু করা চাই।”
        রানী চলে যেতে সে ভেবে পেল না কী করবে? মনমরা হয়ে জানলার কাছে গিয়ে সে দেখে তিন বুড়িকে আসতে। তাদের মধ্যে প্ৰথমজনের পায়ের পাতা বেজায় চওড়া, দ্বিতীয়জনের নীচের ঠোঁট এত বড়ো যে থুতনি পর্যন্ত ঝুলে পড়েছে, আর তৃতীয়জনের একটা হাতের বুড়ো আঙুল ভীষণ মোটা। তারা তিনজন জানলার সামনে উপর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, কী হয়েছে। মেয়েটি তার বিপদের কথা জানাতে তারা বলল তাকে সাহায্য করবে। বলল, “তোমার বিয়েতে আমাদের নেমন্তন্ন করলে আর আমাদের জন্যে লজ্জিত না হয়ে তোমার আত্মীয় বলে পরিচয় দিয়ে তোমার সঙ্গে এক টেবিলে খেতে দিলে, অল্প সময়ের মধ্যেই তোমার হয়ে এই-সব শণ কেটে আমরা সুতো করে দেব।”
        মেয়েটি বলল, “যা-যা বললে নিশ্চয়ই করব । দয়া করে এসে - এখনই কাজ শুরু করে দাও।”
        এই তিন অদ্ভুত বুড়িকে ভিতরে এনে মেয়েটি প্রথম ঘরের মেঝের অনেকটা ফাঁকা করে দিল। সেখানে বসে তারা শুরু করল সুতো কাটতে। প্রথমজন চাকা ঘুরিয়ে টেনে সুতো বার করতে লাগল, দ্বিতীয়জন লাগল সেই সুতো ঠোঁট দিয়ে ভেজাতে, আর তৃতীয়জন সেই সুতো পাকিয়ে টেবিলে রেখে বুড়ো আঙুল দিয়ে লাগল চাপড়াতে— আর তার প্রতিটি চাপড়ের সঙ্গে সঙ্গে মেঝেয় পড়তে লাগল চমৎকার পাকানো সুতোর এক-একটি ফেটি। এই তিন চরকা-বুড়িকে রানীর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখল মেয়েটি, প্রতিদিন রানী এলে তাকে সে দেখায় কতটা সুতো কাটা হয়েছে। রানী দেখেন আর তার খুব প্রশংসা করেন। 
        প্রথম ঘর খালি হলে তারা গেল দ্বিতীয় ঘরে। দ্বিতীয় ঘরের পর তৃতীয় ঘরে। দেখতে দেখতে তিনটে ঘরই খালি হয়ে গেল।
        তার পর তিন বুড়ি মেয়েটির কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় বলল, “আমাদের যে কথা দিয়েছ সেটা কিন্তু ভুলো না। তার ওপরেই নির্ভর করছে তোমার জীবনের সুখ-স্বচ্ছন্দ।”
        রানীকে সেই তিনটে খালি ঘর আর সুতোর বিরাট স্তুপ মেয়েটি দেখাল । রানী তখন বিয়ের আয়োজন করতে শুরু করলেন। বুদ্ধিমতী আর পরিশ্রমী বউ হবে জেনে রাজপুত্রও খুব খুশি। মেয়েটির প্রশংসায় সে পঞ্চমুখ হয়ে উঠল।
        মেয়েটি তখন বলল, “আমার তিনজন আত্মীয় আছে তারা আমার অনেক উপকার করেছে। আমার সুখের দিনে তাদের আমি ভুলতে চাই না। তাদের আমি বিয়েতে নেমন্তন্ন করব। আমার সঙ্গে এক টেবিলে তাদের খাবার অনুমতি দিতে হবে।”
        রানী আর রাজপুত্র রাজি হলেন। বিয়ের দিন সেই তিন চরকাবুড়ি বেজায় হাস্যকর পোশাকে হাজির হল। মেয়েটি ওদের আদর অভ্যর্থনা করে বলল, “এসো, এসো।”
        মেয়েটিকে রাজপুত্র প্রশ্ন করল, “তোমার আত্মীয়দের চেহারা এরকম কুচ্ছিত কেন?” তার পর যে-বুড়ির পায়ের পাতা বেজায় চওড়া তাকে সে জিগগেস করল, “তোমার পায়ের পাতা এরকম চওড়া হল কী করে?”
        সে উত্তর দিল, “গা দিয়ে চাকা ঘুরিয়ে, রাজপুত্তুর, পা দিয়ে চাকা ঘুরিয়ে।”
        রাজপুর দ্বিতীয়জনের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করল, “তোমার তলার ঠোঁট এরকম ঝোলা কেন?"
        সে উত্তর দিল, “ঠোঁট দিয়ে সুতো ভিজিয়ে, রাজপুত্তুর, ঠোঁট দিয়ে সুতো ভিজিয়ে।”
        তার পর তৃতীয়জনকে রাজপুত্র প্রশ্ন করল, “তোমার বুড়ো আঙুলটা এরকম ভীষণ মোটা কেন?”
        সে উত্তর দিল, "সুতো পাকাতে আর সুতো চাপড়াতে গিয়ে, রাজপুত্তর, সুতো পাকাতে আর সুতো চাপড়াতে গিয়ে।"
        আঁতকে উঠে রাজপুত্র বলল, “আমার সুন্দরী বউ জীবনে কোনো দিন আর চরকা ছোবে না।”
        এইভাবে মেয়েটি সুতো কাটা থেকে রেহাই পেল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য