নিখোঁজ নৌ-সন্ধিপত্র [ দ্য নেভ্যাল ট্রিটি ] - শার্লক হোমস

        আমার বিয়ের পরের জুলাই মাসটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে শার্লক হোমসের সান্নিধ্যে থেকে পর পর তিনটে চাঞ্চল্যকর কেসে তার অপূর্ব বিশ্লেষণী তদন্ত পদ্ধতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাওয়ার জন্যে। এর মধ্যে প্রথম কেসটির গুরুত্ব বেশি হলেও জনসমক্ষে প্রকাশ করার সময় এখনও হয়নি। তাই শুরু করছি কেসের চমকপ্রদ বিবরণ। বিবিধ চিত্তাকর্ষক ঘটনার দৌলতে মামলাটি বাস্তবিকই অভিনব।
        স্কুলে পড়বার সময়ে পার্সি নামে একটি ছাত্রবন্ধুর সঙ্গে আমার হরিহর আত্মা সম্পর্ক ছিল। বয়স সমান হলেও সে আমার চাইতে দু-ক্লাস এগিয়ে ছিল। পড়াশুনায় অত্যন্ত ভালো, মেধাবী, এককথায় যাকে বলে হিরের টুকরো, তাই শেষ পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছে, বছর বছর গাদাগাদা প্রাইজ পেয়েছে। লর্ড হোল্ডহাস্ট ছিলেন ওর মামা।
        স্কুল থেকে বেরোনোর পর পার্সির সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ ছিল না। তবে শুনেছিলাম নিজের মেধা, কর্মদক্ষতা আর মামার সুপারিশের জোরে বৈদেশিক দপ্তরে এখন সে কেউকেটা।
        এই পার্সি ফেল্পসের কাছ থেকেই হঠাৎ একটা চিঠি পেলাম একদিন।

        প্রিয় ওয়াটসন, ব্রায়ারব্রে, ওকিং
        “বেঙাচি” ফেল্পসকে নিশ্চয় মনে আছে? তুমি ক্লাস থ্রি-তে পড়তে, আমি ক্লাস ফাইভে। মামার মুরুবিয়ানার জোরে বৈদেশিক দপ্তরে কাজ পাওয়ার খবরও নিশ্চয় শুনেছ। নামডাক যশ খ্যাতি যখন তুঙ্গে পৌছেছে, ঠিক সেই সময়ে একটা ভয়াবহ ঘটনার ফলে আমার সর্বনাশ হতে বসেছে।
        ঘটনাটা কী, চিঠির মধ্যে তা লিখব না। শুধু শুনে রাখো, এর ফলে আমি বিছানা নিয়েছি। কয়েক হপ্তা এক নাগাড়ে ব্রেনফিভারে ভুগে মরতে মরতে বেঁচে উঠেছি। এখনও এত কাহিল যে চিঠিটা পর্যন্ত নিজের হাতে লিখতে পারছি না।
        ওপরওলা মনে করেন, এ-ব্যাপারে আর করণীয় কিছু নেই। কিন্তু আমি হাল ছাড়তে রাজি নই। শেষ চেষ্টা করতে চাই। তোমার বন্ধু শার্লক হোমসের সঙ্গে আগে যোগাযোগ করতে পারিনি রোগের প্রকোপে অস্থির ছিলাম বলে। তাকে একবার আমার কাছে নিয়ে আসতে পারবে? তার পরামর্শ একান্ত প্রয়োজন। যত তাড়াতাড়ি পার, তাকে নিয়ে এস।

তোমার অনেকদিনের দোস্ত
পার্সি ফেল্পস

        হোমসকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধের মধ্যে এমন একটা ব্যাকুলতা প্রকট হয়েছে যে আমার স্ত্রীও বললে এখুনি বন্ধুবরের কাছে যাওয়া উচিত। ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে হাজির হলাম বেকার স্ট্রিটের বাসায়।
        হোমস তখন ড্রেসিংগাউন পরেই রাসায়নিক বিশ্লেষণ নিয়ে তন্ময়। আমার দিকে একবার চোখ তুলে তাকিয়ে ফের ডুবে গেল বুনসেন বার্নারের নীলচে শিখায় ফুটন্ত বকযন্ত্র মধ্যস্থ তরল পদার্থটা নিয়ে। কয়েকটা ফোটা একটা কাচনলের মধ্যে তুলে নিয়ে বোতলে রেখে বানাল একটা সলিউশন। একহাতে একটা লিটমাস কাগজ নিয়ে বললে, ভায়া, বড়ো অসময়ে এসেছ। কাগজটা নীল থাকলে শুভ, আর যদি লাল হয়ে যায়— একজনের প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়বে। বলে, লিটমাস ভেজাল সলিউশনে। সঙ্গেসঙ্গে টকটকে লাল হয়ে গেল কাগজটা। যাচ্চলে! যা ভেবেছিলাম শেষকালে তাই হল।’ বলে ডেস্কে বসে খানকয়েক টেলিগ্রাম ফর্ম টেনে নিয়ে দ্রুত হাতে লিখে ছোকরা চাকরকে ডেকে পোস্টাপিসে পাঠিয়ে দিল হোমস।
        তোমার আমার সামনের চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে বসে পড়ে বললে, খুবই মামুলি মার্ডার কেস। এর চাইতে ভালো কেস তোমার মুখে শোনার আশা করছি। ভায়া, তুমি হলে গিয়ে অপরাধের ঝড়ো পেট্রোল পক্ষী— ক্রাইম সংবাদ ল্যাজে বেঁধে উড়ে আসো। বল, কী করতে পারি।
        চিঠিটা এগিয়ে দিলাম। মন দিয়ে পড়ল হোমস। বলল, চিঠি লিখেছেন একজন মহিলা।
        মোটেই না। পুরুষের হাতের লেখা।
        না। অত্যন্ত বিরল চরিত্রের এক মহিলা তোমার বন্ধুর হয়ে এই চিঠি লিখেছেন। সূত্রপাতেই বিষয়টা খুবই চিত্তাকর্ষক। ওয়াটসন, কেসটা আমার কৌতুহল জাগিয়েছে। কালবিলম্ব না-করে তোমার কূটনীতিবিদ বন্ধু এবং তার শ্রুতি লেখিকার সন্দর্শনে রওনা হতে চাই।
        ওয়াটালু স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে এক ঘণ্টার মধ্যেই পৌছে গেলাম ওকিংয়ে। ব্রায়ারব্রে বাড়িটা স্টেশন থেকে মিনিট কয়েকের পথ। কার্ড পাঠানোর পর উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন হৃষ্টপুষ্ট এক ভদ্রলোক। বয়স তিরিশ ছাড়িয়েছে— চল্লিশের কাছাকাছি। আমুদে দুই চোখে আনন্দ নৃত্য করছে অষ্টপ্রহর। গোলগাল দুষ্টু ছেলের মতোই টুকটুকে লাল দু-গাল।
        হইহই করে আমাদের করমর্দন করলেন ভদ্রলোক। খুশি উপচে উঠল চোখে-মুখে কথায় বার্তায়, ‘আঃ বাঁচালেন আপনারা! সকাল থেকে পার্সি বেচারা হাপিত্যেশ করে বসে আছে আপনাদের পথ চেয়ে।’
        আপনাকে এ-ফ্যামিলির কেউ বলে তো মনে হচ্ছে না? হোমসের প্রশ্ন।
        অবাক হয়ে চাইলেন ভদ্রলোক। পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে নীচের দিকে চেয়ে অট্টহেসে বললেন, ‘দারুণ চমকে দিয়েছিলেন। বুদ্ধি বটে আপনার লকেটে J. H. অক্ষর দেখেই ধরেছেন আমি ফেল্পস ফ্যামিলির মানুষ নই। কিন্তু কুটুম হতে চলেছি শিগগিরই। আমার নাম জোসেফ হ্যারিসন। আমার বোন পার্সির হবু বউ। দু-মাস পার্সিকে ও-ই তো সেবা করছে। চলুন, চলুন, ওর ঘরে যাওয়া যাক।
        ফুল দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো একটা ঘরে ঢুকলাম। খোলা জানলা দিয়ে বাগানের মিষ্টি হাওয়া আসছে। জানলার ধারে পাশাপাশি বসে একজন যুবক আর একজন যুবতী। যুবক কঙ্কালসার, শীর্ণ এবং বিলক্ষণ উদবিগ্ন।
        আমাদের দেখেই উঠে দাঁড়াল যুবতী মেয়েটি, পার্সি, আমি আসি।
        হাত ধরে মেয়েটিকে টেনে বসাল পার্সি খুশি উচ্ছল কন্ঠে বললে, ওয়াটসন, তোমাকে যে চেনা মুশকিল! গোফখানা যা বাগিয়েছ। ইনি নিশ্চয় মি. শার্লক হোমস?
        পরিচয়পর্ব সাঙ্গ হলে চেয়ার টেনে বসলাম। হৃষ্টপুষ্ট ভদ্রলোকটি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। তার সহোদরা পার্সির হাত ধরে বসে রইলেন। মেয়েটি শ্যামা, ঈষৎ স্থূলাঙ্গী এবং খর্বকায়া। কিন্তু কৃষ্ণ কেশ, চামড়ার লাবণ্য আর ইতালীয় চক্ষুপল্লবের দরুন নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়া। পাশেই ঝরা পাতার মতো শুকনো লাগছে পার্সি ফেল্পসকে।
        পার্সি বললে, মি. হোমস অযথা সময় নষ্ট না-করে কাজের কথায় আসছি। ওয়াটসনের মুখে শুনেছেন নিশ্চয় মামার সুপারিশে বৈদেশিক দপ্তরে ভালো কাজ পাই। মামা, মানে লর্ড হোল্ডহাস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রী হওয়ার পর বিশ্বাস করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আমার ওপর ছেড়ে দিতেন, নিজেই সঠিক সিদ্ধান্তনিয়ে প্রতিটি কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করায় আমার ওপর তার অবিচল আস্থা জন্মেছিল। ঠিক এই সময়ে, আমার বিয়ের ঠিক মুখেই, এমন একটা কাণ্ড ঘটে গেল যে আমার ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার।
        আড়াই মাস আগে তেইশে মে মামা আমাকে ওঁর প্রাইভেট রুমে ডেকে দেরাজ থেকে ধূসর রঙের একটা পাকানো কাগজ বার করে বললেন– তোমাকে এবার একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজের ভার দিতে চাই। ইংলন্ড আর ইতালির মধ্যে যে গোপন চুক্তি হয়েছে, এই হল সেই সন্ধিপত্র। খবরটা এতই গোপনীয় যে রাশিয়া বা ফ্রান্সের দূতাবাস এর বিষয়বস্তু জানবার জন্যে মোটা টাকা ছাড়তে রাজি আছে। এর মধ্যেই এ নিয়ে কানাঘুসো আরম্ভ হয়ে গেছে, এগুলো তাই সাবধানে রেখো। তোমার ঘরে দেরাজ আছে তো?
        আছে!
        নকল করবার দরকার হয়েছে বলেই দেরাজ থেকে বার করলাম— নইলে করতাম না। তুমি এর কপি করবে নিজের হাতে— অফিস ছুটি হয়ে যাওয়ার পরেও থাকবে। কাজ শেষ হলে, নকল আর আসল দুটােই দেরাজে চাবি দিয়ে রাখবে। কাল সকালে আমার হাতে দিয়ে যাবে।
        কাগজটা হাতে নিয়ে—
        ‘এক সেকেন্ড।’ বাধা দিল হোমস। এই কথার সময়ে ঘরে আর কে ছিল?
        আমি আর মামা ছাড়া কেউ না।
        ঘরটা কত বড়ো?
        লম্বায় তিরিশ ফুট চওড়ায় তিরিশ ফুট। বেশ বড়ো ঘর।
        আপনারা ছিলেন ঠিক মাঝখানে?
        প্রায় তাই।
        কথা বলছিলেন খাটো গলায়?
        মামা খাটাে গলাতেই কথা বলেন। আমি কিছু বলিনি।
        ‘তারপর?’ চোখ মুদে বললে হোমস।
        মামা হুকুমমতো অফিস ছুটি না-হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম! কেরানি চার্লস গোরোর একটু কাজ বাকি ছিল— সেই ফাঁকে আমি খেয়ে এলাম। এসে দেখলাম সে চলে গেছে। ঝটপট কাজ শেষ করার জন্যে উঠে পড়ে লাগলাম। কেননা, আমার হবু শ্যালক জোসেফ হ্যারিসন তখন শহরেই রয়েছে। এগারোটার ট্রেনে তার ওকিং যাওয়ার কথা। পারলে আমিও একই ট্রেনে ওকিং ফিরব ঠিক করলাম।
        দলিল নিয়ে প্রথমেই গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। দেখলাম, সত্যিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। মামা একটুও বাড়িয়ে বলেননি। বিষয়বস্তু ‘ত্রিশক্তির মিত্রতার’ ব্যাপারে নৌ বিভাগ সংক্রান্ত।
        পড়া শেষ করে কপি করতে বসলাম। বিরাট ডকুমেন্ট। মোট ছাব্বিশটা ভাগে ফরাসি ভাষায় লেখা। ঝড়ের মতো হাত চালিয়েও ন-টা ভাগ লিখতেই রাত ন-টা বেজে গেল। মাথা ঝিম ঝিম করছিল সারাদিন পরিশ্রমের দরুন। ঘুম ঘুম পাচ্ছিল এক পেট খাওয়ার ফলে। তাই ভাবলাম কফি খেয়ে চাঙা হওয়া যাক। সিঁড়ির নীচে একজন দারোয়ান থাকে, আমাদের জন্যে স্পিরিট ল্যাম্প জ্বেলে কফি বানিয়ে দেয়। ঘণ্টা বাজিয়ে ডাকলাম তাকে।
        ঘণ্টার জবাবে ঘরে ঢুকল অ্যাপ্রন পরা বিরাট চেহারার এক স্ত্রীলোক। মুখটা রুক্ষ্ম। বয়স যথেষ্ট হয়েছে। শুনলাম সে দারোয়ানের স্ত্রী। কফি আনতে বললাম তাকে।
        বলে, ফের নকল করতে বসলাম। দুটাে ভাগ কপি করা হয়ে গেল। অথচ কফি এল না দেখে অবাক হয়ে গেলাম। এদিকে ঢুলছি বললেই চলে। ঘুম তাড়াবার জন্যে উঠে পায়চারি করতে করতে ভাবলাম নিজে গিয়ে তাড়া দিই দারোয়ানকে। দরজা খুলে প্যাসেজে এসে দাঁড়ালাম। একটা ম্যাড়মেড়ে আলো জ্বলছিল প্যাসেজে। সেখান থেকে সিঁড়ি ঘুরে চাতালে পৌছেছে। চাতাল থেকে একটা ছোটাে সিঁড়ি ডান দিকে ঘুরে পাশের গলিতে গেছে। এ-সিঁড়ি দিয়ে চাকরবাকর বা তাড়াতাড়ি থাকলে কেরানিরা যাতায়াত করে। মূল সিঁড়িটা চাতাল থেকে সোজা নেমে হল ঘরে পৌছেছে। বাঁ-দিকে থাকে দারোয়ান— তারপরে সদর আর রাস্তা। এই নকশাটা দেখলেই বুঝবেন।
        ভালোই বুঝছি, বললে হোমস।
        আমি ঘর থেকে বেরিয়ে চাতালে নেমে সিঁড়ি বেয়ে হল ঘরে পৌঁছোলাম। দেখলাম, মড়ার মতো ঘুমোচ্ছে দারোয়ান। জ্বলন্ত স্পিরিট ল্যাম্পের ওপর টগবগ করে ফুটছে জলের কেটলি। ধাক্কা মেরে তুলব বলে হাত বাড়াতে-না-বাড়াতেই ঝনঝন করে বেজে উঠল মাথার কাছেই ঘণ্টাটা। ধড়মড় করে উঠে বসল দারোয়ান।
        আমাকে দেখেই থতোমতো খেয়ে বললে, মি. ফেল্পস! দেখুন দিকি কী কাণ্ড! জল গরম করতে দিয়ে ফের ঘুমিয়ে পড়েছি। বলেই বিমূঢ় চোখে ঘণ্টা আর আমার দিকে চাইতে লাগল। ঘণ্টা তখনও কাঁপছে। হতভম্ব মুখে বললে, “আশ্চর্য ব্যাপার তো! আপনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে অথচ ঘণ্টা বাজল কী করে?
        কোন ঘণ্টা?
        আপনি যে-ঘরে কাজ করেছিলেন, এ-ঘণ্টা সেই ঘরের ঘণ্টা।
        শুনেই বুকটা ছাৎ করে উঠল। ঘর খোলা, টেবিলে গোপন দলিল ফেলে এসেছি কফির তাগাদ দিতে। নিশ্চয় কেউ ঘরে ঢুকেছে। পাগলের মতো বেরিয়ে এলাম হল ঘরে— লাফাতে লাফাতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে ঢুকলাম ঘরে। দেখলাম ঘর শূন্য, নকল দলিল যেমন তেমনি পড়ে— উধাও হয়েছে আসল দলিল।
        দু-হাত ঘষে উঠে বসল হোমস। সমস্যাটা নিশ্চয় মনোমতো হয়েছে। মৃদুকণ্ঠে বললে, তখন কী করলেন?
        আমি ধরে নিলাম পাশের সিঁড়ি দিয়ে চোর ঢুকেছিল ঘরে— নইলে আমার চোখে পড়ত।
        ঘরের মধ্যে বা প্যাসেজে কোথাও লুকিয়ে ছিল না তো? আপনি তো বললেন ম্যাড়মেড়ে আলো জ্বলছিল প্যাসেজে।
        অসম্ভব। লুকোনোর জায়গা ওখানে নেই।
        তারপর?
        উর্ধ্বশ্বাসে আমাকে ছুটতে দেখে দারোয়ান আমার পেছন পেছন ওপরে এসেছিল। আমার ফ্যাকাশে মুখ দেখে বুঝলে সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটেছে। দুজনে মিলে ছোটাে সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নেমে এলাম পাশের গলিতে। এদিকের দরজা বন্ধ—কিন্তু তালা দেওয়া নেই। ঠিক এই সময়ে কাছেই একটা গির্জেতে পরপর তিনবার ঘণ্টা বাজল। রাত তখন ঠিক সোয়া দশটা।
        গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আস্তিনে সময়টা লিখে নিল হোমস।
        অন্ধকার রাত। ঝুপঝাপ করে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তার অন্যদিকে একজন কনস্টেবল দাঁড়িয়ে। গাড়িঘোড়া স্রোত বয়ে চলেছে হোয়াইট হলের দিকে। লোকজন কিন্তু নেই।
        হাঁফাতে হাঁফাতে গিয়ে তাকে বললাম, ভীষণ কাণ্ড। পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে একটা দারুণ গুরুত্বপূর্ণ দলিল চুরি হয়ে গেল এক্ষুনি। কাউকে যেতে দেখেছ এদিক দিয়ে?
        পনেরো মিনিট দাঁড়িয়ে আছি। এর মধ্যে গায়ে শাল জড়ানো ঢাঙামতো একজন স্ত্রীলোক ছাড়া কেউ যায়নি।
        দারোয়ান ঝটিতি বললে, আরে সে তো আমার স্ত্রী। আর কেউ গেছে?
        না।
        আমার হাত ধরে টেনে দারোয়ান বললে, তাহলে সে অন্যদিকে পালিয়েছে।
        আমার কিন্তু খটকা লাগল। অন্যদিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মতলব মনে হল। কনস্টেবলকে জিজ্ঞেস করলাম, কোনদিকে গেছে স্ত্রী-লোকটা?
        অত দেখিনি। তবে খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে হাঁটছিল দেখেছি।
        কতক্ষণ আগে?
        মিনিট পাঁচেক তো বটেই।
        চিৎকার করে দারোয়ান বলে উঠল, খামোক সময় নষ্ট করছেন, মি. ফেল্পস। এ-ব্যাপারে আমার স্ত্রী নেই। তার চেয়ে রাস্তার ওদিকটা খুঁজে দেখলে কাজ দিত। আপনি যখন যাবেন না, আমিই যাচ্ছি।
        বলে যেই ছুটতে যাবে, আমি খপ করে ওর হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলাম, থাকা হয় কোথায়?
        ব্রিক্সটনের ষোলো নম্বর আইভি লেনে। কিন্তু কেন বাজে চিন্তা করছেন মি. ফেল্পস? এখনও সময় আছে, ওইদিকটা দেখে আসতে দিন।
        ভেবে দেখলাম, তাতে ক্ষতি নেই। পুলিশ কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে হনহন করে গিয়ে দেখে এলাম রাস্তার অন্যদিক। কিন্তু গাড়িঘোড়া আর লোকজন ছাড়া কিছুই চোখে পড়ল না।
        অফিসে ফিরে এসে প্যাসেজ পরীক্ষা করলাম। লিনোলিয়াম দিয়ে ঢাকা মেঝেতে পায়ের চিহ্ন থাকা উচিত— কিন্তু সে-রকম কিছুই পেলাম না।
        সন্ধে থেকে বৃষ্টি পড়ছিল? জিজ্ঞেস করল হোমস।
        সাতটা থেকে।
        কিন্তু মেয়েটা আপনার ঘরে ঢুকেছে ন-টা নাগাদ। জলকাদায় ভিজে বুটের ছাপ পড়া উচিত ছিল লিনোলিয়ামে।
        দারোয়ানের ঘরে ঢুকে বুট খুলে চটি পরে এসেছিল।
        ইন্টারেস্টিং। তারপর?
        ঘরটা পরীক্ষা করলাম। মেঝেতে কাপেট পাতা আছে, তাই চোরা দরজা নেই। দেওয়ালেও লুকোনো পথ নেই। তিরিশ ফুট উঁচু দুটাে জানলাই ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। চুনকাম করা কড়িকাঠ। দরজা ছাড়া ঢোকার আর পথ নেই– চোর দরজা দিয়েই এসেছিল।
        ফায়ার-প্লেস দেখেছিলেন?
        ফায়ার-প্লেসের বালাই নেই ঘরে। একটা স্টোভ আছে। তারে বাঁধা ঘণ্টার দড়ি ঝোলে আমার টেবিলের ডান দিকে। তার মানে ঘণ্টা বাজানোর জন্যে তাকে টেবিলের ডান দিকে আসতে হয়েছে। কিন্তু চোরটা কি ঘণ্টা বাজিয়ে চুরি করে? এ কী বিষম সমস্যায় পড়লাম বলুন তো?
        অসাধারণ ঘটনা নিঃসন্দেহে। পোড়া চুরুট, ফেলে-যাওয়া দস্তানা, চুলের কাটা বা ওই জাতীয় কিছু ঘরে পাওয়া গেছে?
        না।
        গন্ধ?
        গন্ধর কথা তো আগে ভাবিনি!
        তামাকের গন্ধ-টন্ধ পাওয়া গেলে তদন্ত করতে সুবিধে হত।
        দেখুন, আমি তামাক খাই না। কাজেই সে-রকম গন্ধ থাকলে নিশ্চয় টের পেতাম। দারোয়ানের স্ত্রী-র হস্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফেরাটা আমার ভালো মনে হয়নি। দারোয়ান অবশ্য বললে, রাত হয়ে গেছে বলেই হয়তো তাড়াতাড়ি করেছে স্ত্রী, জবাবটা সন্তোষজনক— নিছক অজুহাত বলেই মনে হয়েছে। তাই দলিলটা বাড়ি থেকে হাওয়া হওয়ার আগেই হানা দেব ঠিক করলাম।
        আধঘণ্টার মধ্যে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ডিটেকটিভ মি. ফোর্বসকে নিয়ে পৌছে গেলাম দারোয়ানের বাড়ি। দারোয়ানের বড়ো মেয়ে দরজা খুলে বললে, মা এখনও বাড়ি ফেরেনি। আমরা সামনের ঘরে বসলাম।
        মিনিট দশেক পরে সদর দরজার কড়া নড়ে উঠতেই মেয়েটি গিয়ে দরজা খুলে বললে,মা, দুজন ভদ্রলোক তোমার জন্যে বসে রয়েছেন। কথা শেষ হতে-না-হতেই ছুটে যাওয়ার আওয়াজ শুনলাম। মি. ফোর্বস লাফিয়ে উঠে দৌড়ে গেলেন। আমিও পেছন পেছন ছুটলাম। দারোয়ানের স্ত্রী দৌড়ে গিয়ে পেছনের রান্নাঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই আমরাও হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। চোখ পাকিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ অবাক হয়ে গেল দারোয়ানের স্ত্রী। বললে, আরে? মি. ফেল্পস যে!
        মি. ফোর্বস বললেন, পালানোর আগে আমরা কে বলে মনে করেছিলে?
        আমি তো ভাবলাম দালালরা এসেছে। একটা দোকানদারের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছি।
        মি. ফোর্বস বললেন, ওটা কি একটা জবাব হল নাকি? পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে একটু আগেই একটা ডকুমেন্ট লোপাট করে এসেছ বলেই আমরা তোমার পেছনে পেছনে এসেছি। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে চলো- সার্চ করা হবে তোমাকে।
        রান্নাঘরটা পরীক্ষা করে কিন্তু কিছু পাওয়া গেল না। উনুনের মধ্যে দলিলটা যদি ছুড়ে ফেলে দিয়ে থাকে, এই ভেবে উনুনটাই আগে দেখলাম, কিন্তু আধপোড়া কাগজ বা ছাই কিছুই চোখে পড়ল না। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মেয়ে-পুলিশ দিয়ে দারোয়ানের স্ত্রীর দেহ তল্লাশ করেও ডকুমেন্ট পাওয়া গেল না।
        তখনই বুঝলাম কী সর্বনাশ হতে চলেছে। আমার ভবিষ্যৎ তো ঝরঝরে হয়ে গেলই, মুখে চুনকালি পড়ল আমার মামার। চোখের সামনে ভেসে উঠল কীভাবে ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের কাছে অপদস্থ হচ্ছেন মামা আমার এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্যে। মাথা ঘুরে গেল আমার। অস্পষ্টভাবে মনে পড়ে, বহু লোক যেন ‘আহা, আহা করে সহানুভূতি জানাচ্ছিল আমাকে। ওরাই ধরে এনে আমাকে ট্রেনে তুলে দিয়েছিল। একই কামরায় ডক্টর ফেরিয়ার বাড়ি ফিরছিলেন– তিনি আমার ভার নিয়েছিলেন। স্টেশনে পৌছে আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। বাড়ি ফেরার সময়ে পাগলের মতো চেঁচামেচি কান্নাকাটি করেছিলাম।
        ডা, ফেরিয়ারই আমাকে বাড়ি পৌছে দেন। বেশ বোঝা গেল বেশ কিছুদিনের জন্যে বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে আমাকে। আমার অবস্থা দেখে জোসেফ তৎক্ষণাৎ এই খোলামেলা শোয়ার ঘর ছেড়ে অন্য ঘরে চলে যায় এবং ঝটপট বিছানা সাজিয়ে ফেলে। সেই থেকে এই ঘরে ন-সপ্তাহ শুয়ে আছি। দিনরাত সেবা করেছে মিস হ্যারিসন আর একজন নার্স। মাত্র তিনদিন হল স্মৃতিশক্তি পুরোপুরি ফিরে এসেছে। মি. ফোর্বসকে টেলিগ্রাম করে জানলাম, সবরকমভাবে তদন্ত করেও দলিল উদ্ধার করা যায়নি। দলিল চুরি যাওয়ার দিন অফিস ছুটি হয়ে যাওয়ার পর গোরো বলে একজন অল্পবয়েসি কেরানি বাড়তি কাজ করেছিল— আপনাকে বলেছি আগেই। তার ফরাসি নাম এবং বিশেষ ওইদিনেই বাড়তি কাজ করা— এই দুই কারণে পুলিশ তাকেও সন্দেহ করে। কিন্তু সুবিধে করে উঠতে পারেনি। তা ছাড়া, সে চলে যাওয়ার পর আমি দলিল নকলে হাত দিয়েছিলাম। মি. হোমস, এই অবস্থায় আপনিই আমার শেষ ভরসা। দলিল উদ্ধার করতে আপনিও যদি ব্যর্থ হন, আমার মানসম্মান চাকরিও ইতি হয়ে গেল জানবেন।
        দীর্ঘ বক্তিমে শেষ করে এলিয়ে পড়ল পার্সি ফেল্পস। গেলাসে করে ওষুধ খাইয়ে দিলেন মিস হ্যারিসন সম্ভবত চাঙা করার জন্যে। চেয়ারে মাথা হেলিয়ে চোখ বুজে এমনভাবে রইল হোমস যেন কোনো ব্যাপারেই তার আগ্রহ নেই। নতুন লোকের কাছে সেইরকম মনে হলেও এ-লক্ষণ আমি চিনি। অন্তরের অন্দরে ডুব দিয়েছে শার্লক হোমস।
        হঠাৎ বললে, কয়েকটা প্রশ্ন করব। আপনার এই গুরু দায়িত্বর কথা কাউকে বলেছিলেন?
        না।
        মিস হ্যারিসনকে?
        দায়িত্ব কাঁধে চাপবার একটু পরেই কাজ শুরু করেছিলাম— ওকিং এলাম তো দলিল চুরি যাওয়ার পর।
        আপনার বাড়ির লোকেরা কেউ আপনাকে দৈবাৎ দেখে ফেলেনি তো?
        না।
        ওরা আপনার অফিস চেনেন?
        নিশ্চয়। সবাইকে দেখিয়েছি।
        দারোয়ান লোকটা কীরকম?
        আগে সৈন্য ছিল শুনেছি।
        কোন রেজিমেন্টের?
        ‘কোল্ডস্ট্রিম গার্ডস’ – যদ্দূর জানি।
        ধন্যবাদ।— মি. ফোর্বসের কাছ থেকে বিস্তারিত বিবরণ জেনে নেব’খন, বাঃ, গোলাপটা ভারি সুন্দর তো!
        অকস্মাৎ জানলার ধারে গিয়ে বোঁটাসমেত একটা গোলাপ নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে যেন আবিষ্ট হয়ে গেল শার্লক হোমস। প্রকৃতি সৌন্দর্যে এভাবে কখনো ওকে বিহুল হতে দেখিনি। বন্ধুবরের চরিত্রের আর একটা দিক খুলে গেল সেই মুহুর্তে। দু-আঙুলে গোলাপ ধরে স্বপ্নালু চোখে সেদিকে তাকিয়ে আবেশভরা কন্ঠে ফুল সম্পর্কে কত কথাই-না বলে গেল। বেঁচে থাকার জন্যে রোজ আমাদের অনেক জিনিস দরকার হয় ঠিকই, কিন্তু ফুলের দরকার দরকার হয় তার চেয়েও বেশি কারণে। ফুলের গন্ধ, ফুলের রং জীবনকে সাজিয়ে তোলে, জীবনে আশা আনে।
        স্তম্ভিত হয়ে বক্তৃতা শুনছিল পার্সি আর তার প্রণয়িনী। নিঃসীম নৈরাশ্য প্রকট হয়ে উঠল দুজনেরই চোখে-মুখে, পরমুহুর্তেই মিস হ্যারিসনের তীক্ষ্ণ কন্ঠে মিলিয়ে গেল হোমসের দিবাস্বপ্ন— ফিরে এল মাটির পৃথিবীতে।
        রুক্ষ কন্ঠে বললেন মিস হ্যারিসন, মি. হোমস, রহস্য সমাধানের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন?
        স্বৰ্গ থেকে বুঝি পতন ঘটল শার্লক হোমস। বলল, রহস্য? কেস বড়ো জটিল, বুঝলেন কিনা, তবে কথা দিচ্ছি, মনের মতো সূত্র হাতে এলেই আপনাদের জানাব।
        সূত্র কি আদৌ পেয়েছেন?
        মোট সাতটা সূত্র ও পাওয়া গেছে— তবে তা যাচাই সাপেক্ষ।
        কাউকে সন্দেহ হচ্ছে?
        নিজেকে সন্দেহ হচ্ছে। বোধ হয় একটু তাড়াতাড়িই সিদ্ধান্ত করে ফেলেছি।
        তাহলে লন্ডনে ফিরে গিয়ে সিদ্ধান্ত যাচাই করুন।
        তাই করব ভাবছি, চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে হোমস বললে, অপূর্ব উপদেশ দিয়েছেন। মি. ফেল্পস, ব্যাপারটা সাংঘাতিক প্যাঁচালো— মিথ্যে আশার স্বপ্ন দেখবেন না!
        কিন্তু আপনাকে আবার না-দেখলে যে প্রাণে শান্তি পাব না, সত্যিই কঁকিয়ে ওঠে পার্সি। আমি তো আসছি কালকেই। তবে কী জানেন, ফলাফলটা না-বাচকই হবে।
        হোকগে। আপনাকে তো দেখতে পাব। তবুও জানব, তদন্ত তো চলছে। ভালো কথা, হোল্ডহাস্ট একটা চিঠি লিখেছেন।
        কী লিখেছেন?
        মোদ্দা কথা হল, আমি সুস্থ না-হয়ে-ওঠা পর্যন্ত আমার চাকরি থাকবে কি যাবে— তা নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে না। মোলায়েমভাবেই ইঙ্গিত করেছেন— পাছে ফের ধাক্কা খাই অসুস্থ অবস্থায়।
        ভালোই করেছেন। চলো, ওয়াটসন।
        জোসেফ হ্যারিসন স্টেশন পর্যন্ত এলেন আমাদের সঙ্গে, ট্রেনে চাপবার পর ক্ল্যাপহ্যাম জংশন ছাড়িয়ে না-আসা পর্যন্ত গুম হয়ে বসে রইল হোমস। তারপর আচম্বিতে বলল, নীচের ওই বাড়িগুলো দেখেছ? ঠিক যেন সিসে রঙের সমুদ্রে ইটের তৈরি দ্বীপ।
        ওগুলো ছেলেদের বোর্ডিং স্কুল।
        উহু, ওই হল আগামীকালের ইংলন্ড। উজ্জ্বলতর, সুন্দরতর, বিজ্ঞতর ইংলন্ডের বীজ রয়েছে ওইসব ইটের দ্বীপে। ওয়াটসন, ফেল্পস নিশ্চয় মদ্যপ নন?
        মনে তো হয় না।
        আমারও তাই মনে হয়। বদমাশটা ওকে এমন গাড্ডায় ফেলেছে যে টেনে তোলা মুশকিল। মিস হ্যারিসনকে কেমন লাগল?
        শক্ত ধাতের মেয়ে।
        চরিত্রে একদম ভেজাল নেই। নর্দাম্বারল্যান্ডের লোহার কারবারির একমাত্র মেয়ে। গত শীতে ফেল্পসের সঙ্গে আলাপ এবং প্রণয়। বিয়ের আগে বাড়ি এনে রেখেছিল সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে বলে— দাদাও এসেছে সঙ্গে। তারপরেই দেখ এই বিপত্তি। ভাইবোন দুজনেই আটকে গেল বাড়িতে। আজ সারাদিন তদন্ত নিয়ে ব্যস্ত থাকব।
        আমার ডাক্তারি—
        খেঁকিয়ে উঠল হোমস, তোমার ডাক্তারি আমার কেসের চেয়ে যদি বড়ো বলে মনে হয়—
        আরে গেল যা! আমি বলতে যাচ্ছি ডাক্তারিটা আপাতত মুলতুবি রাখতে পারব। রুগির ভিড় এ সময়ে তেমন থাকে না।
        মুহুর্তে সহজ হয়ে উঠল হোমস। বললে, তাহলে তো ভালোই হল। একসঙ্গে চলো ঝাঁপ দিই তদন্তে।
        কী সূত্র পেয়েছ বলছিলে?
        পেয়েছি ঠিক। কিন্তু বাজিয়ে না-দেখা পর্যন্ত বলতে চাই না। যে-অপরাধের মোটিভ থাকে না, সে-অপরাধের অপরাধীকে পাকড়াও করা চাট্টিখানি কথা নয়। এখানে লাভটাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তবে সে-লাভ কার? ফরাসি রাজদূতের? যে তাদের দলিলটা বিক্রি করবে, তার? না, লর্ড হোল্ডহাস্টের?
        লর্ড হোল্ডহাস্টের কী লাভ?
        অনেক লাভ। কূটনৈতিক কারণে মূল্যবান একটা দলিল কায়দা করে লোপাট করিয়ে দিতে পারলে লাভ কি কম?
        তিনি কিন্তু সে-রকম চরিত্রের মানুষ নন। অতীত অত্যন্ত উজ্জ্বল।
        জানি, জানি, সেইজন্যেই তো তার সঙ্গে আজ একবার মোলাকাত হবে আমার। ভালো কথা, আমি কিন্তু তদন্ত আরম্ভ করে দিয়েছি। ওকিং স্টেশন থেকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে সবকটা সান্ধ্য দৈনিকে এই বিজ্ঞাপনটা ছাপতে বলেছি।
        নোট বইয়ের ছেড়া পাতায় লেখা একটা বিজ্ঞাপনের কপি এগিয়ে দিল হোমস। বিজ্ঞাপনটা এই— “দশ পাউন্ড পুরস্কার।— গত তেইশে মে পররাষ্ট্র দপ্তরের সামনে অথবা কাছাকাছি রাত দশটা পনেরো মিনিট নাগাদ একজন যাত্রীকে যে ঘোড়ার গাড়িটা নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল, তার নম্বর চাই। ২২১বি, বেকার স্ট্রিটে জবাব পাঠান।’
        ‘তার মানে তোমার বিশ্বাস চোর ঘোড়ার গাড়ি চেপে এসেছিল?
        নইলে লিনোলিয়ামে বৃষ্টিতে ভেজা জুতোর ছাপ পড়ত— কাদামাটির দাগ থাকত। বৃষ্টিঝরা রাতে ঘোড়ার গাড়ি চেপে এসেছিল বলেই সে-ছাপ পড়েনি।
        তাও তো বটে।
        আমি কিন্তু ধাধায় পড়েছি ঘণ্টা রহস্য নিয়ে। চোর কেন ঘণ্টা বাজাল? নাকি, চুরিতে বাধা দেওয়ার জন্যে কেউ বাজিয়েছিল? এমনও হতে পারে—
        বলেছ চুপ মেরে গেল বন্ধুবর। বুঝলাম, নতুন সম্ভাবনা মাথায় উকি দিয়েছে।
        যাই হোক, লন্ডন পৌছে হোটেলে খানাপিনা করে সোজা গেলাম স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে। হোমস ডিটেকটিভ ফোর্বসকে আগেই খবর দিয়েছিল। খর্বকায় ধূর্ত চেহারার তীক্ষ্ণ-প্রকৃতি কাঠখোট্টা মানুষটা হোমসকে দেখেই যেন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। তিরিক্ষে গলায় বললে, দেখুন মশায়, আপনি লোকটা সুবিধের নন। পুলিশের কাছ থেকে খবর-টবর বার করে নিয়ে মামলা সমাধান করে পুলিশের ঘাড়েই বদনামটা চাপান।
        ঠিক উলটো বললেন, সবিনয়ে বললে হোমস, গত তিপ্পান্নটা মামলার নাম কিনেছেন পুলিশ– মাত্র চারটে মামলায় লোকে জেনেছে এই অধমের কীর্তি। সব খবর রাখেন না আপনার বয়স আর অভিজ্ঞতা কম বলে। কিন্তু ঝগড়া না-করে যদি হাত মেলান আপনার কর্তব্যটা ভালোভাবেই করতে পারবেন বলে আশা করি।
        তৎক্ষণাৎ সুর পালটে ফোর্বস বললে, কিছুই তো বুঝছি না। দু-একটা পয়েন্ট যদি ধরিয়ে দেন তো সুবিধে হয়।
        কদ্দূর এগিয়েছেন আগে বলুন।
        কিছুই এগোইনি। দারোয়ানকে নিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু তার চরিত্র ভালো। ওর বউটা মদ খায়। সন্দেহ তাকেই। তাই মেয়ে-পুলিশ লাগিয়েছিলাম মদের ঘোরে পেট থেকে কথা বার করানোর জন্যে। কিন্তু লাভ হয়নি। বাড়িতে যে-দালালরা হানা দিত তাদের টাকাও মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে।
        টাকাটা এল কোত্থেকে?
        দারোয়ানের পেনশনের পাওনা টাকা থেকে।
        মি. ফেল্পস কফির জন্যে ঘণ্টা বাজালেন। কিন্তু ঘরে ঢুকল দারোয়ানের স্ত্রী। কেন?
        চেয়ারে বসে দারোয়ানের ঘুমটাই অবশ্য তার প্রমাণ। স্বামী স্ত্রী কারোর বিরুদ্ধেই দেখছি কিছু পাওয়া যাচ্ছে না— স্ত্রীর সন্দেহজনক চরিত্রটা ছাড়া! হস্তদন্ত হয়ে ওই রাতে বাড়ি ফেরার কারণটা জিজ্ঞেস করেছিলেন? পুলিশ কনস্টেবল পর্যন্ত লক্ষ করেছিল ওর তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফেরা? কেন?
        অন্যদিনের চেয়ে বেশি দেরি করে ফেলেছিল বলে।
        সে বেরিয়ে যাওয়ার অন্ততপক্ষে মিনিট কুড়ি পরে আপনি পুলিশ ডিটেকটিভকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন অথচ বাড়ি পৌছেছিলেন তার আগে। ব্যাপারটা বলেছিলেন তাকে?
        ও বললে, এক ঘোড়ায় টানা এক্কাগাড়ি বাসের চাইতে আগেই তো পৌছোবে।
        বাড়ি পৌছেই বাড়িতে লোক আছে শুনে রান্নাঘরে ভোঁ দৌড় দিল কেন?
        দালালদের পাওনা মেটানোর টাকা নাকি রান্নাঘরেই ছিল।
        সব প্রশ্নেরই জবাব দেখছি তৈরি। পাশের গলি চার্লস স্ট্রিটে বেরিয়ে কাউকে দেখেছিল কি?
        কনস্টেবল ছাড়া কাউকে নয়।
        এ ছাড়া আর কী করেছেন?
        কেরানি গেরোর পেছনে এই ন-টা সপ্তাহ হাল্লাক করে ঘুরে লাভ হয়েছে কত্তা।
        ঘণ্টা বাজার রহস্য উদ্ধার করেছেন?
        একদম না। কারণটা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না।
        ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে গেল হোমস। সোজা গেল ডাউনিং স্ট্রিটে ইংলন্ডের আগামী প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমানে ক্যাবিনেট মন্ত্রী লর্ড হােল্ডহাস্টের অফিসে। হােমস কার্ড পাঠাল। তলব এল তৎক্ষণাৎ। ফায়ার প্লেসের দু-ধারে দুটাে চেয়ারে বসলাম আমি আর হোমস। মাঝখানে অভিজাত চেহারা নিয়ে ভাবনা-আঁকা মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন বিখ্যাত পুরুষটি। কোঁকড়া চুলে পাক ধরেছে, দীর্ঘ আকৃতির প্রতিটি প্রত্যঙ্গে শান দেওয়া তীক্ষতা যেন ঠিকরে বেরুচ্ছে। বনেদিয়ানা যে তার রক্তে— ধার করা নয়— তা এক নজরেই মালুম হয়।
        মৃদু হেসে বললেন, ‘মি. হোমস আপনার সুনাম আমি শুনেছি। আপনার এখানে আসার একটা কারণই আমার অফিসে ঘটেছে। কে কাজে লাগিয়েছে আপনাকে?
        মি. পার্সি ফেল্পস। বললে হোমস।
        বেচারা ভাগনে। রক্তের সম্পর্ক আছে বলেই ওকে বাঁচানো যাবে না।
        আর যদি ডকুমেন্ট উদ্ধার হয়?
        তাহলে ফলাফল শুভ হবে।
        দলিলটা নকল করার কথা কি এই ঘরে বলেছিলেন?
        হ্যাঁ।
        বাইরে থেকে কেউ শুনেছিল কি?
        অসম্ভব।
        কাউকে জানিয়েছিলেন কি যে দলিল নকল করতে যাচ্ছেন?
        না।
        তাহলে কিন্তু ধরে নিতে হয় চোর কিছুই না-জেনে হঠাৎ ঘরে ঢুকে দলিলটা দেখতে পেয়ে পকেটে করে নিয়ে গেছে।
        আমি এর জবাব দিতে অক্ষম।
        ‘সন্ধিপত্রের বিষয়বস্তু ফাঁস হয়ে গেলে কি সত্যিই সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে?
        মুখ কালো হয়ে গেল লর্ড হোল্ডহাস্টের, তা হবে।
        ‘সে-রকম প্রতিক্রিয়া দেখা হয়েছে কি?
        এখনও টের পাইনি।
        সন্ধিপত্র ফরাসি বা রুশ দূতাবাসে পৌছে গেলে টের পেতেন কি?
        পেতাম।

        আড়াই মাসেও যখন পাননি, তখন কি ধরে নিতে পারি না যে সন্ধিপত্র কোনো দূতাবাসেই পৌছোয়নি?
        চোর কি তাহলে দলিলটা বাঁধিয়ে টাঙিয়ে রাখবে বলে নিয়েছে?
        বেশি দামের তালে আছে হয়তো।
        আর দেরি করলে এক পয়সাও পাবে না। মাস কয়েকের মধ্যে চুক্তির বিষয়বস্তু সবাইকে জানানো হবে।
        পয়েন্টটা গুরুত্বপূর্ণ। চোর হয়তো হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায়—
        শান্ত কণ্ঠে হোমস বলে, সে-রকম ইঙ্গিত আমি করিনি। যাক গে, অনেকটা সময় নষ্ট করলাম। এখন আসি।
        দরজা পর্যন্ত এগিয়ে লর্ড হোল্ডহাস্ট বললেন,‘মি. হোমস, চোর যেই হোক না কেন, আমি চাই তাকে আপনি পাকড়াও করুন।
        বাইরে এসে হোমস বললে, ভদ্রলোক খাসা লোক, গরিব হলেও আত্মমর্যাদা সচেতন। বুটে নতুন সুখতলা লাগিয়েছেন দেখেছিলে? যাক ভায়া, তোমাকে আর আটকে রাখব না। কালকে একই ট্রেনে আবার ওকিং যেতে হবে, খেয়াল থাকে যেন।
        পরদিন সকালে দেখা করলাম বন্ধুবরের সঙ্গে। কিন্তু রেড ইন্ডিয়ানদের মতো নির্বিকার হয়ে রইল হোমস। ইচ্ছে করলেই এ-রকমভাবে মুখটা ভাবলেশহীন করতে পারে ও। শুধু শুনলাম, যে-তিমিরে ছিল গতকাল, আজও রয়েছে সেই তিমিরে। গাড়ির নম্বর চেয়ে বিজ্ঞাপনের জবাব আসেনি।
        ওকিং পৌছে দেখলাম গতকালের মতোই প্রণয়িনীকে পাশে নিয়ে বসে আছে পার্সি। তবে চেহারা অনেকটা সতেজ।
        আমাদের দেখেই অভ্যর্থনা জানাল সোল্লাসে। মি. ফোর্বস আর লর্ড হোল্ডহাস্টের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়ে গেছে এবং ভেঙে পড়ার মতো কিছুই ঘটেনি এখনও– হোমসের মুখে এই খবর শুনে খুশি হলেন মিস হ্যারিসন।
        ফেল্পস বললে, এর চাইতে জোরালো খবর আপনাকে দেবার জন্যে বসে রয়েছি।
        উৎসুক হোমস।
        ফেল্পস বললে, একটা নারকীয় ষড়যন্ত্র চলছে আমাকে ঘিরে। কাল রাতের সাংঘাতিক ঘটনাটাই তার প্রমাণ। আমি অজাতশত্রু, অথচ শুধু আমার সম্মান নয়, আমার জীবন নিয়েও টানাটানি চলছে।
        খুলে বলুন।
        আড়াই মাস পর এই প্রথম গতকাল রাতে একা শুয়েছিলাম ঘরে। নার্স রাখিনি, অনেকটা সুস্থ বোধ করছিলাম বলে। অল্প আলো জ্বলছিল ঘরে। রাত দুটাের সময়ে খুটখাট আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। ঠিক যেন ইঁদুরে খুটুর খুটুর করে গর্ত খুঁড়ছে। একটু একটু করে আওয়াজটা বেড়েই চলল। তারপর ধাতুতে ধাতুতে ঠোকাঠুকির চড়া আওয়াজ পেলাম। পর পর দুটো আওয়াজ। ঠিক যেন কাচের শার্সির পাল্লার ফাঁকে সরু মতো কিছু একটা ঢুকিয়ে দিয়ে টেনে বার করে নেওয়া হল।
        তারপর দশ মিনিট চুপচাপ— কোনো শব্দ নেই। লোকটা বোধ হয় খুলতে লাগল জানলার পাল্লা। আমার দুর্বল স্নায়ু আর সইতে পারল না। লাফ দিয়ে গিয়ে এক ঝটকায় খুলে ফেললাম পাল্লা দুটাে। চকিতের জন্যে দেখলাম গোবরাটের নীচে গুটি মেরে বসে একটা লোক— আলখাল্লায় ঢাকা মুখের নীচের অংশ। এর বেশি আর দেখতে পেলাম না— বিদ্যুতের মতো লাফ দিয়ে উধাও হল সে। আমার এই দুর্বল শরীর নিয়ে পেছন নেওয়া সম্ভব নয় বুঝে সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টা বাজিয়ে বাড়ি মাথায় করলাম। সবার আগে ছুটে এল জোসেফ। তারপর সবাই মিলে দেখল, জানলার ঠিক নীচেই পায়ের ছাপ আছে বটে, কিন্তু দিনটা শুকনো থাকার ফলে সে-ছাপ কোনদিকে গেছে— তা ধরা যাচ্ছে না। তবে বাগানের বেড়া এক জায়গায় ভেঙে গেছে— খুব সম্ভব টপকে পালানোর সময়ে ভেঙে পেরিয়ে গেছে। পুলিশকে এখনও কিছু বলিনি। ভাবলাম আপনার মতামত আগে শোনা যাক।
        মক্কেলের এই কাহিনি অসাধারণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করল শার্লক হোমসের ওপর। বসে থাকতে পারল না চেয়ারে। পায়চারি করতে লাগল ঘরময়।
        বলল, চলুন মি. ফেল্পস, আপনাকে নিয়ে বাড়িটা একপাক ঘুরে আসি।
        নিশ্চয়। জোসেফও চলুক সঙ্গে, বলল পার্সি।
        আমি যাব, বায়না ধরলেন মিস হ্যারিসন।
        বাধা দিল হোমস, না। আপনি চেয়ার ছেড়ে নড়বেন না।
        অপ্রসন্ন হলেন মিস হ্যারিসন। চেয়ারে বসে রইলেন। সঙ্গে এলেন তার দাদা জোসেফ হ্যারিসন। চারজনে মিলে লন পেরিয়ে গেলাম পার্সির জানলার তলায়। মাটিতে সত্যিই পায়ের ছাপ রয়েছে— কিন্তু তা এতই আবছা যে কিছু বোঝা যায় না।
        হতাশ হয়ে হোমস বললে, এত ঘর থাকতে চোরের এই ঘরটাই-বা পছন্দ হল কেন বুঝছি না। বসবার ঘর বা খাবার ঘরে ঢুকলেই তো পোয়াবারো ছিল।
        রাস্তার দিক থেকে এই জানলাটাই আগে চোখে পড়ে, বললেন জোসেফ হ্যারিসন।
        বেশ তো, তাহলে এই দরজাটা দিয়ে এলেই তো হত। কীসের দরজা এটা?
        বাইরের কিছু লোক বেসতি করতে এলে এই দরজা দিয়ে আসে। রাত্তিরে তালা ঝোলে।
        আগে কখনো চোর পড়েছিল এ-বাড়িতে?
        কক্ষনো না।
        সিঁধ দিয়ে লাভ হতে পারে, এমনি কিছু কি আছে বাড়িতে?
        সে-রকম মূল্যবান তো কিছু নেই। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে পকেটে হাত পুরে এদিক-ওদিক দেখল হোমস— এ-রকম গা-ঢালা ভাব কিন্তু ওর মধ্যে এর আগে কখনো দেখিনি।
        একবার বললে, “বেড়া ভেঙে চোর পালিয়েছে শুনছিলাম। কোনখানটা?
        পার্সি দেখালে জায়গাটা। ভাঙা টুকরোটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে হোমস বললে, মনে হয় না কাল রাতে এখান দিয়ে কেউ গেছে। কেননা, টুকরোটা পুরোনো। চলুন, আর কিছু দেখবার নেই।
        ভাবী শ্যালকের কাঁধে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে চলল পার্সি। হোমস লম্বা লম্বা পা ফেলে পৌছে গেল অনেক আগেই— পেছনে আমি!
        সারাদিন এ-ঘরে থাকবেন— একদম বেরোবেন না— কোনো অজুহাতেই নয়। ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ।
        অবাক হয়ে গেলেন মিস হ্যারিসন, ‘বেশ, তাই হবে।’
        কথা দিন রাতে শোবার আগে দরজায় তালা দিয়ে নিজের কাছে চাবি রাখবেন।
        পার্সি কোথায় থাকবে তাহলে?
        উনি আমার সঙ্গে লন্ডনে যাবেন।
        আমি একা থাকব এখানে?
        তাঁর ভালোর জন্যেই থাকবেন। কথা দিন— তাড়াতাড়ি।
        ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন মিস হ্যারিসন। প্রায় সঙ্গেসঙ্গে পেছনে শোনা গেল জোসেফ হ্যারিসনের গলা, হাঁ করে কী বসে আছিস ওখানে? আয়, রোদে এক চক্কর দিয়ে যা।
        না, দাদা। বড় মাথা ধরেছে।
        হোমস বললে, মি. ফেল্পস, সিঁধেল চোরের চেয়ে বড়ো হল দলিল চোর। আমার সঙ্গে আপনি লন্ডনে এলে চোর ধরতে সুবিধে হবে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তৈরি হয়ে নিন।
        রাতটা?
        শহরেই কাটাবেন।
        ছুরি হাতে রাতের কুটুম যদি আবার আসে, হতাশ হবে আমাকে না-দেখলে। জোসেফ যাবে তো আমার দেখাশোনা করতে?
        তার কী দরকার? ওয়াটসন, ডাক্তার মানুষ, আপনার ভালোমন্দ ওর ওপর ছেড়ে দিন।
        দুপুরে লাঞ্চ খেলাম খাবার ঘরে। মিস হ্যারিসন অক্ষরে অক্ষরে তামিল করলেন হোমসের নির্দেশ। পার্সির শোবার ঘরে বসে রইলেন— একসঙ্গে খেতেও এলেন না। স্বাস্থ্য ভালো হওয়ার জন্যেই হোক কি ঘটনাপ্রবাহ তরতরিয়ে নতুন খাতে বয়ে যাওয়ার জন্যেই হোক, আনন্দে আটখানা হয়ে খাবার ঘরে একসঙ্গে বসে লাঞ্চ খেল পার্সি। আমি কিন্তু হোমসের আসল উদ্দেশ্যটা ধরতে পারলাম না। কী চায় ও? পার্সিকে মিস হ্যারিসনের কাছ থেকে তফাতে রাখাই কি ওর আসল মতলব?
        চমক সৃষ্টিতে জুড়ি নেই শার্লক হোমসের। স্টেশনে গেলাম তিনজনে— কিন্তু আমাকে আর পার্সিকে ট্রেনে তুলে দেওয়ার পর আচমকা হোমস বললে, তার নাকি এখন লন্ডনে গেলে চলবে না। ওকিংয়ে এখনও কিছুকাজ বাকি। কাল সকালে বেকার স্ট্রিটে ব্রেকফাস্টের টেবিলে ফের দেখা হবে।
        পার্সি তো হতভম্ব। ট্রেন তখন ছেড়ে দিয়েছে। মুখ বাড়িয়ে চিৎকার করে বললে, বাড়িতে খবর দিয়ে দেবেন– কাল রাতে ফিরব। প্রসন্ন কণ্ঠে হোমস পালটা চিৎকার জানিয়ে দিলে, বাড়িতে সে যাচ্ছে না।
        প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে এল ট্রেন। হোমসের অকস্মাৎ থেকে যাওয়া নিয়ে নানারকম জল্পনা-কল্পনা করলাম দুই বন্ধু।
        ফেল্পস বললে, কাল রাতের চোরকে নিয়ে নিশ্চয় তদন্ত করতে চান মি. হোমস। লোকটাকে মামুলি চোর বলতে আমি অন্তত রাজি নই।
        তবে কী?
        রাজনৈতিক খুনে। ঘোর চক্রান্ত চলছে আমাকে ঘিরে। ছুরি হাতে এসেছিল আমাকে খুন করতে। চোর কখনো ছোরা নিয়ে আসে? যে-ঘরে চুরি করার মতো কিছু নেই, সে-ঘরে কেন আসতে চেয়েছিল বুঝতে পারছ না?
        সেটা যে ছুরি, বুঝেছ কী করে? সিধকাঠিও তো হতে পারে।
        না, না, না। স্পষ্ট দেখেছি চকচকে ফলাটা ঝকঝক করছে।
        তুমি যা বললে, হোমস যদি তাই মনে করে থাকে, তাহলে ওর ওকিংয়ে থেকে যাওয়ার কারণটা অন্তত বোঝা যায়। সিঁধেল চোরকে পাকড়াও করে ও হয়তো দলিল চুরির ফয়সালা করতে চায়।
        কিন্তু উনি তো বললেন বাড়িতে যাবেন না।
        হোমসকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। অকারণে কিছু করা ওর ধাতে নেই।
        ট্রেনে এ-প্রসঙ্গে আর কথা হল না। সাত পাঁচ কথায় ভুলিয়ে রাখলাম পার্সিকে। একে অসুস্থ, তার ওপর দলিল হারানোর উদবেগ। তাই হাজার গল্পের স্রোতে ভাসিয়ে দিতে চাইলাম ওর মনের উৎকণ্ঠা, ভবিষ্যতের দুর্ভাবনা। কিন্তু মন বড়ো বিচিত্র বস্তু। বাগে আনা মুশকিল। পার্সি বেচারাও দেখলাম কিছুতেই সহজ হতে পারছে না। বেকার স্ট্রিটে এসেও সেই একই কথায় ফিরে এল বার বার। হোমস কি পারবে দলিল উদ্ধার করতে? কেন সে চুপচাপ রয়েছে? রহস্য সমাধান অসম্ভব জেনেই কি নীরব?
        আমি ওকে পইপই করে বোঝালাম, শার্লক হোমস যখনই মুখে চাবি দেয়, তখনই বরং বুঝতে হবে লক্ষণ শুভ— রহস্য সমাধান হতে আর দেরি নেই। সমাধানের সংকেত যে পেয়ে গেছে, বাজিয়ে না-দেখা পর্যন্ত চুপ করে থাকতে চাইছে।
        যাই হোক, বুঝিয়ে সুঝিয়ে তো শুতে পাঠালাম ওকে— কিন্তু মনে বুঝলাম এত উদ্‌বেগ নিয়ে কখনোই ঘুমোতে পারবে না। আমিও কি ছাই ঘুমোতে পারলাম? আদ্ধেক রাত কেবল এপাশ-ওপাশ করেই কাটিয়ে দিলাম। দুম করে হোমস ওকিং থেকে গেল কেন? কেন সে কথাটা পার্সির পরিবারের কাউকে বলল না? কেন পার্সিকে তার প্রণয়িনীর কাছ থেকে সরিয়ে আনল? কেন ভদ্রমহিলাকে সারাদিন পার্সির ঘরে বসে থাকতে বলল? এক-একটা ‘কেন? এক-একটা দুরমুশের মতো মাথার মধ্যে পিটুনি আরম্ভ করলে কি ঘুম হয়?
        সক্কালবেলা পার্সির ঘরে গিয়ে দেখি তারও এক অবস্থা। চেহারা আধখানা— অনিদ্রায় মুখ আমসি।
        ওর প্রথম প্রশ্নই হল, মি, হোমস ফিরেছেন?
        ফিরবে, ফিরবে, হোমসের কথার নড়চড় হয় না।
        হলও না। ঘড়িতে আটটা বাজার একটু পরেই এক ঘোড়ায় টানা একটা এক্কাবাড়ি এসে দাঁড়াল সদর দরজার সামনে। গাড়ি থেকে নামল শার্লক হোমস। জানলা থেকে দেখলাম বাঁ-হাতে বিরাট ব্যান্ডেজ। মুখ শুকনো আর গম্ভীর।
        ফেল্পস বললে, হেরে এলেন মনে হচ্ছে।
        সত্যি সত্যিই পরাজয়ের চিহ্ন প্রকট হয়েছে শার্লক হোমসের চেহারার মধ্যে।
        বললাম, গোলকধাঁধার চাবিকাঠি তাহলে ওকিংয়ে নেই— লন্ডনে রয়েছে।
        কিন্তু হাতে ব্যান্ডেজ কেন? ফেল্পস যেন কঁকিয়ে উঠল।
        সামান্যই– দোষটা আমার। হুশিয়ার থাকা উচিত ছিল। গুড মনিং মি. ফেল্পস। আপনার এই কেসের মতো জটপাকানো মামলা খুব বেশি হাতে আসেনি আমার।
        জট ছাড়ানো শেষ পর্যন্ত বোধ হয় আর সম্ভব হবে না। তাই না?
        অভিজ্ঞতাটাই-বা কম কী।
        আমি বললাম, ব্যান্ডেজটা কীসের? রোমাঞ্চকর কিছু ঘটেছে মনে হচ্ছে?
        আগে খাওয়া, তারপর কথা। তিরিশ মাইল টাটকা হাওয়া খেতে খেতে এসেছি— পেটে আগুন জ্বলছে। গাড়ির নম্বর চেয়ে বিজ্ঞাপনের আর জবাব এল না দেখছি। যাকগে, সব চেষ্টাই কি আর ফলপ্রসূ হয়।
খাবার আনার জন্যে ঘণ্টা বাজাতে যাচ্ছি, এমন সময়ে চা আর কফি নিয়ে ঘরে ঢুকল মিসেস হাডসন। মিনিট কয়েক পরে নিয়ে এল ঢাকনা দেওয়া খাবারের ডিশ, রাখল টেবিলে। আমরা বসলাম টেবিলের ধারে। হোমস চনমনে খিদে নিয়ে ঝলমলে, আমি উৎসুক, ফেল্পস ম্ৰিয়মাণ।
        ওয়াটসন, তুমি কী নিলে?
        ডিম আর শূকর মাংস।
        অপূর্ব। মি. ফেল্পস, আপনি? কী নেবেন? মুরগি না ডিম?
        ধন্যবাদ। আমার খিদে নেই।
        আরে মশাই, এই পদটা একটু চেখেই দেখুন না।
        ধন্যবাদ। খেতে রুচি নেই।
        দুষ্টুমি নৃত্য করে উঠল হোমসের হীরক উজ্জ্বল দুই চোখে।
        বলল, বেশ, বেশ। তাহলে আমাকে বাড়িয়ে দিন প্লেটটা।
        ঢাকা খুলে প্লেটটা বাড়াতে গিয়ে থ হয়ে গেল পার্সি। ধবধবে সাদা প্লেটের মতোই সাদা মুখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল প্লেটের ঠিক মাঝখানে নীলাভ-ধূসর রঙের পাকানো কাগজটার দিকে। পরক্ষণেই ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে বিস্ফারিত দুই চোখ দিয়ে যেন গিলে নিল কাগজের চেহারাটা। তারপরেই বিকট চেঁচিয়ে উঠে চেয়ার থেকে ছিটকে গিয়ে মাথার ওপর কাগজ তুলে ধরে ধেই ধেই করে নেচে বেড়াতে লাগল ঘরময়। সে কী তাণ্ডব নৃত্য! কিছুক্ষণের মধ্যেই অসুস্থ শরীরে বেদম হয়ে পড়ল অকস্মাৎ উত্তেজনার বিস্ফোরণে। আমরা ধরাধরি করে ওকে টেনে বসিয়ে দিলাম সোফায়— গলায় ঢেলে দিলাম ব্র্যান্ডি।
        কাঁধ চাপড়ে হোমস বললে, ‘আস্তে! আস্তে! আপনাকে চমকে দেওয়াটা নিশ্চয় ঠিক হয়নি। তবে ওয়াটসন জানে, নাটক দেখানোর লোভ আমি সামলাতে পারি না।
        হোমসের হাত জড়িয়ে ধরে চুমু-টুমু খেয়ে সে এক কাণ্ড করে বসল ফেল্পস, ভগবান আপনার ভালো করবেন। আমার মান রাখলেন আপনি।
        সেইসঙ্গে আমার নিজেরটাও রাখলাম। দায়িত্বপূর্ণ কাজে আপনার গাফিলতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ জানবেন রহস্য সমাধানের ব্যাপারে আমার ব্যর্থতা।
        কোটের সবচেয়ে ভেতরের পকেটে দলিলটা গুঁজে রাখতে রাখতে ফেল্পস বললে, কিন্তু পেলেন কী করে?
        হোমস তখন মাংস, ডিম, কফি খেয়ে নিয়ে আড় হয়ে বসে পাইপ ধরিয়ে যা বললে তা এই :
        আপনারা তো চলে গেলেন, আমি ফ্রাস্কে চা আর পকেটে স্যান্ডউইচ নিয়ে সন্ধে নাগাদ গিয়ে দাঁড়ালাম আপনার বাড়ির পাশের রাস্তায়।
        রাস্তা ফাঁকা হয়ে-না-যাওয়া পর্যন্ত সবুর করলাম। তারপর বেড়া টপকে ঢুকলাম বাগানে। ফটক দিয়ে এলাম না পাছে কেউ দেখে ফেলে। গাছের আড়ালে গা ঢেকে পৌঁছোলাম আপনার জানলার সামনে রডোডেনড্রন ঝোপের মধ্যে। হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হয়েছে বলে প্যান্টের হাঁটুর এই অবস্থা দাঁড়িয়েছে।
        জানলা খোলা— খড়খড়ি তোলা। দেখলাম টেবিলে বসে বই পড়ছেন মিস হ্যারিসন। রাত সাড়ে দশটায় উঠে পড়লেন। দরজায় চাবি দিয়ে শুতে গেলেন।
        দরজায় চাবি দিল কেন? ফেল্পসের প্রশ্ন।
        আমি শিখিয়ে দিয়েছিলাম বলে। আরে মশাই, আপনার পকেটের ওই কাগজটা কোনো কালেই আপনার পকেটে ফিরে আসত না তার সাহায্য না-পেলে। যাক, বসে রইলাম তো রইলামই। পনেরো মিনিট অন্তর ঘণ্টা বাজতে লাগল দূরের গির্জেতে। দুটাে নাগাদ খিল খোলার আর চাবি ঘোরানোর ক্যাচ ক্যাচ শব্দ কানে এল। চাকরদের যাতায়াতের দরজা খুলে চাদের আলোয় এসে দাঁড়ালেন মি. জোসেফ হ্যারিসন। 
        ‘জোসেফ !’ যেন দম আটকে এল ফেল্পসের।
        মাথায় টুপি নেই, কালো আলখাল্লা দিয়ে ঢাকা মুখের নীচের অংশ— যাতে হঠাৎ দেখলে চেনা না-যায়। দেওয়ালের ছায়া গা ঢেকে পা টিপে টিপে আপনার জানলার সামনে গিয়ে একটা লম্বা ছোরা বার করে ঢুকিয়ে দিলেন খড়খড়ির পাল্লায় ফাঁকে। চাড় মারতেই সরে গেল ছিটকিনি— খুলে গেল পাল্লা।
        খানিকটা তুলে ফেললেন মি. হ্যারিসন। পাইপ মিস্ত্রি গ্যাসপাইপের জোড় ঢাকবার জন্যে কাঠের ব্লক চাপা দেয়। ঠিক সেইরকম একটা চৌকোনা কাঠ তুললেন কার্পেটের তলা থেকে। নীচের রান্নাঘরে গ্যাসের চালান যায় যে T জয়েন্টের মধ্যে দিয়ে, কাঠের টুকরো দিয়ে ঢাকা ছিল সেই জয়েন্টটা। পাকানো কাগজটা খুপরি থেকে তুলে নিয়ে ফের কাঠ-চাপা দিয়ে কার্পেট টেনে দিলেন মি. হ্যারিসন। ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে জানলা গলে এসে পড়লেন আমার দু-বাহুর মধ্যে— স্বাগতম জানানোর জন্যে ঠিক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি।
        কিন্তু জোসেফ লোকটা যে এতটা খারাপ হবে ভাবতে পারিনি। সাংঘাতিক বদমাশ। ছোরা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। দু-বার আছড়ে ফেললাম ঘাসের ওপর— আমার আঙুলের গাট কেটে গেল ছোরার ঘায়ে— তারপর ঘুসি মেরে একটা চোখ প্রায় কানা করে দেওয়ার পর মক্কেল বুঝল এ বড়ো শক্ত ঠাঁই। তাতেও কি হার মানে। একটা চোখেই দেখলাম খুনির চেহারা— পারলে তখনই খুন করে দেয় আমাকে। যাইহোক, বেগতিক বুঝে দলিলটা আমার হাতেদিতে আমিও ছেড়ে দিলাম। অবশ্য আজ সকালে ফোর্বসকে টেলিগ্রামে সব জানিয়েছি। যদি তাড়াতাড়ি যেতে পারে, পাবে জোসেফকে। নইল দেখবে পিঞ্জর শূন্য— পাখি ভাগলবা। তাতে অবশ্য সরকারের লাভ। এ-নিয়ে একটা কেলেঙ্কারি হোক, আপনারা মামা-ভাগনে নিশ্চয় তা চান না।
        ফেল্পস খাবি খেতে খেতে বললে, আপনি বলছেন কী? আড়াই মাস যে দলিলের চিন্তায় শয্যাশায়ী, একই ঘরে তা পড়েছিল অ্যাদ্দিন?
        হ্যাঁ।
        জোসেফ ! শেষকালে জোসেফ ! চোর, বদমাশ, শয়তান!
        চেহারা দেখে কি মানুষ ধরা যায়? জোসেফের বাইরে এক, ভেতরে আর এক। কালকে রাতেই শুনলাম জুয়ো খেলে দেনায় ডুবতে বসেছে। তাই বোনের সর্বনাশ হবে জেনেও এক ঝকমারির মধ্যে নাক গলিয়েছে। স্বার্থ ছাড়া তার কাছে কিছুই বড়ো নয়।
        চেয়ারে এলিয়ে পড়ল ফেল্পস, আমার মাথা ঘুরছে! সব গুলিয়ে দিলেন আপনি।
        হোমস তখন বিশ্লেষণী ভঙ্গিমায় বললে, কেসটায় গোড়া থেকেই মূল সূত্রগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছিল অবাস্তর সূত্রের বাড়াবাড়িতে। আমি বাজে সূত্র বাদ দিলাম, কাজের সূত্রগুলোকে পর-পর সাজালাম। জোসেফকে সন্দেহ করলাম প্রথম থেকেই– কেননা তার সঙ্গেই আপনার এক ট্রেনে ওকিং ফেরার কথা হয়েছিল। সেই রাতে খুবই স্বাভাবিক আপনাকে ডেকে নেওয়ার জন্যে পররাষ্ট্র দপ্তরে সে গেছিল, আপনার অফিস সে চেনে। বিনা নোটিশে তাকে ঘর ছেড়ে দিতে হয়েছে আপনার ওই অবস্থার জন্যে। তারপর যখন শুনলাম, প্রথম যে-রাতে নার্স রইল না ঘরে, সেই রাতেই চোর ঢুকতে চেয়েছিল সেই ঘরেই— তখনই বুঝলাম চোর মহাপ্রভু বাড়ির কেউ হবে— কেননা সব খবর সে রাখে।
        ইস। কী অন্ধ আমি!
        ব্যাপারটা কী হয়েছিল শুনুন। আপনি যখন দারোয়ানের কাছে কফির তাগাদা দিতে ঘরের বাইরে গেলেন, ঠিক সেই সময়ে পাশের গলি চার্লস স্ট্রিট দিয়ে অভ্যেসমতো আপনার অফিসে ঢুকেছিল জোসেফ হ্যারিসন আপনাকে নিয়ে স্টেশনে যাবে বলে। ঘরে ঢুকেই আপনাকে না-দেখে ঘণ্টা বাজিয়েছে— পরমুহুর্তেই চোখ পড়েছে টেবিলের ওপর মহামূল্যবান দলিলটার ওপর। পাক্কা বদমাশ হলেও পলকের মধ্যে বুঝতে পেরেছে এ-জিনিস হাতাতে পারলে লাভ বিস্তর। তাই নকল দলিল ফেলে আসলটা পকেটে নিয়ে তরতরিয়ে নেমে গিয়েছে ছোট সিঁড়ি দিয়ে চার্লস স্ট্রিটে। দারোয়ান যখন অবাক হয়ে আপনাকে জিজ্ঞেস করছে, কে ঘণ্টা বাজাল, তার মধ্যেই ঘটে গেছে এতগুলো ঘটনা।
        ট্রেনে ওকিং ফিরে এল জোসেফ। দলিল পরীক্ষা করে বুঝলে দু-একদিনের মধ্যে কোনো দূতাবাসে পাচার করতে পারলে দু-পয়সা পকেটে আসবে। তাই লুকিয়ে রাখল নিজের ঘরের কার্পেটের তলায়। কিন্তু ভাগ্য বিরূপ। রাত্রে উন্মত্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরলেন আপনি— ওরই ঘরে শোবার ব্যবস্থা হল আপনার, দলিলটা সেই থেকে সরানোর সময় সে পায়নি ঘরে অষ্টপ্রহর লোক থাকায়। নার্স না-থাকায় প্রথম সুযোগেই এল দলিল সরাতে। কিন্তু আপনি জেগে থাকায় তাও হল না। সে-রাতে নিশ্চয় ঘুমের ওষুধ খাননি?
        না।
        জোসেফ কিন্তু ভেবেছিল আপনি খেয়েছেন এবং ঘুমোচ্ছেন। তাই ঠিক করলাম ওকে আর। একটা সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু যাতে সন্দেহ না হয়, তাই সারাদিন মিস হ্যারিসনকে দিয়ে পাহারা দেওয়ালাম। দলিল ওই ঘরেই আছে আঁচ করেছিলাম, কিন্তু কোথায় আছে জানতাম না। সব লাটঘাট করার চেয়ে ওকে দিয়েই খুঁজে বার করতে চেয়েছিলাম। আর কিছু জানবার থাকলে বলুন।
        কিন্তু অত ঝামেলা করে জানলা খোলার চেষ্টা না-করে দরজা দিয়ে এলেই তো হত? জিজ্ঞেস করলাম আমি ।
        সাতজনের শোবার ঘর পেরিয়ে তবে দরজার সামনে পৌছোতে হত। খামোখা ঝুঁকি না-নিয়ে লন পেরিয়ে জানলায় গিয়েছিল সেই কারণেই।
        ছোরা নিয়েছিল কেন? মানুষ খুনের জন্যে নিশ্চয় নয়। জানলা খোলার জন্যে, তাই না? উৎসুক কষ্ঠে শুধোয় পার্সি।
        কাঁধ বাঁকিয়ে হোমস বললে, হলেও হতে পারে। তবে জোসেফ হ্যারিসনের হৃদয় যে খুব একটা দরাজ নয়— আমি তা হাড়ে হাড়ে বুঝেছি।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য