তাহলে - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

        গোয়েন্দা বরদাচরণ ভাগনে কঞ্চির ঘাড়ে ভর দিয়ে প্রকাণ্ড আলমারিটার মাথা থেকে ঝুল আর ধুলো মেখে এবং কাঁধে একটা টিকটিকি সমেত নীচে নেমে এসে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘হুঁ’। বরদাচরণের ‘হুঁ’ শুনে গরীব জমিদার বজ্রকুণ্ডল আশার আলো দেখে আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোনো ক্লু পেলে বাবা? বরদাচরণ বেশি কথার মানুষ নন। হামাগুড়ি দিয়ে মস্ত একটা খাটের নীচে ঢুকে বিস্তর কলসী, হাঁড়ি, বাক্স পোটলার ভিড়ে টর্চ ফোকাস করে আবার গম্ভীর গলায় বললেন, ‘হুঁ’। ঠাকুর্দার আমলের দামি সোনার ঘড়িটা যে পাওয়া যাবে এমন আশা বজ্রকুণ্ডলের নেই। পাড়ার গোয়েন্দা বরদাচরণকে পঞ্চাশ টাকা ফি কবুল করে ডেকে এনেছেন নিতান্তই নিজের মনকে প্রবোধ দিতে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “জমিদারির সবই তো গেছে, এখন যে দু একটা দামি জিনিস ছিল তাও একে একে যাচ্ছে। দেখ খুঁজে, যদি পাও তবে সে তোমারই ভাগ্যে।’

        খাটের তলা থেকে বরদাচরণের কোনো সাড়া শব্দ এল না। কাজের সময় বরদাচরণ কখনো অন্যমনস্ক হন না। তার ওপর মক্কেলদের বিশ্বাস না থাক, কিন্তু তার আচার আচরণে শ্রদ্ধা না জেগে পারে না। তার কোনো কিছুই সাধারণ নয়। যেমন, তিনি কখনো নিজের বাড়ি বা অন্য কারো বাড়িতে সদর দরজা দিয়ে ঢোকেন না। গোয়েন্দাদের নাকি ঢুকতে নেই। তাই সর্বদাই তাকে পাঁচিল টপকাতে হয়, ঝোপঝাড় ভাঙতে হয়, পাইপ বেয়ে ছাদে উঠতে হয়। তাঁর তদন্তের পদ্ধতিও আলাদা। চোর বাড়ির উত্তর দিক দিয়ে ঢুকেছিল শুনলে তিনি তদন্ত শুরু করেন দক্ষিণ ধারে।
        যাই হোক আজ নিয়ে দুদিন বজ্রকুণ্ডলের বিশাল পুরোনো ভাঙা বাড়িটায় তিনি তদন্ত চালাচ্ছেন। এ যাবৎ অন্তত পঞ্চাশটা আলমারির মাথায় উঠেছেন, কুড়িখানা খাটের তলায় ঢুকেছেন, সব মিলিয়ে কম সে কম পঁচিশখানা ঘরের সবগুলিই খোঁজা শেষ করে ফেলেছেন। ঘড়ির হদিশ পাননি। আধ ঘণ্টা বাদে আরো ঝুল, আরো ধুলো এবং পকেটে একটা নেংটি ইদুরের বাচ্চা সমেত বেরিয়ে এসে বরদাচরণ আবার বললেন, ‘হুঁ’। কাল থেকে অন্তত একশ বার বজ্রকুণ্ডল ঐ হুঁ শুনেছেন এবং প্রতিবারই আশার আলো দেখেছেন। এবারও দেখে বললেন, ‘কোনো ক্লু?’
        বরদাচরণ একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, আপনি ক্লু চান, না ঘড়ি চান? ক্লু বিস্তর আছে। কিন্তু দরকার তো ঘড়িটার’।
        বজ্রকুণ্ডল স্নান মুখে বললেন, ‘ঘড়িটাই চাই বাবা। অবস্থা তো জানো। নিমে স্যাকরা দুশো টাকায় ঘড়িটা কিনতে চেয়েছিল। ভেবেছিলাম ঘড়িটা বেচে শীতের জন্য একটা লেপ করাব’।
        বরদাচরণ বললেন, ‘হু’। তারপর বাক্যব্যয় না করে একটা বিশাল কাঠের সিন্দুকের ডালা খুলে বিস্তর ছেড়া কাঁথা কানির মধ্যে হাতড়াতে লাগলেন। কঞ্চি বজ্রকুণ্ডলকে চাপা গলায় বলল, জ্যাঠামশাই, আপনি গিয়ে নেয়ে খেয়ে দুপুরে একটু গড়িয়ে নিন। মামা যখন লেগেছে তখন ঘড়ি যদি ইহজগতে থাকে তবে বেরোবেই।”
        ইহজগতেই আছে বাবা। বেশিদুর যায়নি। আমার বজ্জাত নাতি হেমকুণ্ডল, ঘড়িটা পোষা বেড়াল দুয়ার গলায় বেঁধে দিয়েছিল। দুয়া এই বাড়ির বাইরে তো যায়নি। এখানেই কোথাও আনাচে কানাচে এখনো পড়ে আছে। হঠাৎ বরদাচরণ সিন্দুক থেকে মুখ তুলে বললেন, চারহাতি গামছা পাওয়া যাবে?
        ‘গামছা!’ বজ্রকুণ্ডল অবাক হয়ে বলেন, ‘গামছা কী হবে বাবা?
        গলায় দেবো। কটমট করে চেয়ে বরদা বলেন। বজ্রকুণ্ডল দৌড়ে গিয়ে একটা বড় গামছা নিয়ে এসে বলেন, ‘তোমার হলে আমাকে দিও। আমিও গলায় দিয়ে ঝুলে পড়বখন। বরদাচরণ কটমট করে আর একবার চেয়ে জামাকাপড় ছেড়ে গামছাটা পরে ফেললেন টাইট করে। তারপর সোজা গিয়ে হাজির হলেন অন্দরমহলের পুরোনো পুকুরটার ধারে। গভীর পুষ্করিণী। ভাল পাথর দিয়ে বাঁধানো ঘাটের অনেকটাই ভেঙে গেছে বটে, তবু এখনো পৈঠার বাহার কিছুটা অবশিষ্ট আছে। বরদাচরণ কঞ্চি বা বজ্রকুণ্ডলের দিকে দৃকপাত না করে পুকুরে নেমে পড়লেন। বুক ভরে দম নিয়ে সবুজ আভার গভীর জলে ডুব দিলেন। ডুবে একবারে থৈ পেলেন না। মিনিটখানেক বাদে ভেসে উঠে দম নিয়ে আবার ডুব। তারপর আবার। তারপর আবার। পুকুরের পূব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ-বায়ু-অগ্নি-নৈঋৎ-ঈশান কোনো দিক বাদ রাখলেন না। অবশেষে,ঘণ্টা দুই বাদে উঠে হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, ‘একটা শাবল শীগগির।
        বজ্রকুণ্ডল দৌড়ে গিয়ে একটা মস্ত শাবল এনে দিয়ে বললেন, ‘কোনো ক্লু পেলে বাবা?
        বরদাচরণ জবাব না দিয়ে শাবল হাতে পুকুরের পশ্চিম পাড়ে গিয়ে ডুব লাগালেন। ডুবতে ডুবতে যেখানে পা ঠেকল সেখানে দুটো পাথরের চাই দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি। বরদা দুটো পাথরের মাঝখানে শাবলটা ঢুকিয়ে একটা চাড় মারতেই পাথর দুটো সরে গেল। বরদাচরণ ভেসে দম নিয়ে আবার ডুব দিয়ে পাথরের চাইয়ের পিছনে যে জং-ধরা লোহার দরজাটা ছিল সেটার কক্তায় শাবল ঢুকিয়ে আবার চাড় দিলেন। দরজাটা হড়াস করে খুলে গেল। বরদাচরণ আর একবার ভেসে দম নিয়ে খানিকটা ওপরে উঠে দম নেওয়ার মত বাতাস আর পায়ের নীচে জমি পেয়ে গেলেন। খুবই অন্ধকার। শাবলটা দিয়ে চারদিক দেখতে দেখতে এগিয়ে যেতে লাগলেন। সামনে একটা কাঠের দরজা। বেশ পুরু কাঠ। দরজায় মস্ত তালা ঝুলছে। কিন্তু বরদাচরণের হাতে শাবল থাকতে দরজার সাধ্য কি তার গতি রোধ করে? দু মিনিটের মাথায় পাতালের সেই ঘরে ঢুকে বরদাচরণ চারদিক হাতড়ে দেখলেন অন্তত দশ বারোটা লোহার সিন্দুক রয়েছে। বরদাচরণ আপনমনে বললেন, ‘হুঁ’। বরদাচরণের প্রাণের আশা সবাই যখন প্রায় ছেড়ে দিয়েছে সেই সময়ে তিনি ভেসে উঠলেন পাড়ে। বললেন, “পাওয়া গেছে।’
        বজ্রকুণ্ডল সাগ্রহে জিজ্ঞেস করেন, কী বাবা? ঘড়ি, না ক্লু?
        বরদাচরণ মাথা নেড়ে বললেন, না। ক্লুও না, ঘড়িও না। যা পেয়েছি তাতে আমি খুশিও না। তবু লোকজন ডেকে পুকুরের জলটা ছেচে ফেলুন। কাউকে কিছু বলতে যাবেন না।
        পুকুর ছেচে কী পাওয়া যাবে বাবা?
        ‘ঘড়ি নয়।’ বলে গম্ভীর মুখে শুকনো জামাকাপড় পরতে লাগলেন বরদা। মাছের লোভে জমিদারদের পুকুর ছেচতে অবশ্য অনেক লোক জুটল। দিন দুয়েকের মধ্যে মাছ সমেত জল লোপাট। সন্ধ্যের পর বরদাচরণ বাতি হাতে বজ্রকুণ্ডল আর কঞ্চিকে সঙ্গে নিয়ে পিছল ঘাট বেয়ে নেমে শ্যাওলা আর কাদায় ঢাকা পাথরের দুটো চাইয়ের মুখে এসে দাঁড়ালেন। বুদ্ধি করে চাই দুটোকে জুড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন বরদা। নইলে জল ছেঁচতে এসে লোকে সুড়ঙ্গটার সন্ধান পেত।
        ‘ঐ সিন্দুক গুলোয় আপনার পূর্বপুরুষদের লুকোনো ধনরত্ব আছে। খুলে দেখুন।
        “বলো কী?” বজ্রকুণ্ডল মূৰ্ছা যেতে যেতে সামলে নিলেন। তারপর শাবল আর কুডুলের ঘায়ে একে একেবারোটা সিন্দুক খোলা হল। কোনোটায় মোহর, কোনটায় হীরে জহরত, কোনটায় চাঁদির টাকা, কোনটায় সোনা-রুপোর বাসনপত্র। সে এক কুবেরের ভাণ্ডার। দেখে আত্মহারা হয়ে গেলেন বজ্রকুণ্ডল। আনন্দে কেঁদে ফেলে বললেন, ‘ছেলেবেলা থেকে বড় কষ্টে মানুষ হয়েছি বাবা। জমিদারির ঠাঁটবাট রাখতে গিয়ে কাছা দিতে কোচায় টান পড়ত। এতদিনে ভগবান মুখ তুলে চাইলেন। বরদাচরণ একটা কাঠের সিন্দুকের ডালার ওপর বসে গভীরভাবে ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘হুঁ’। কিন্তু বেড়ালটা বাড়ির বাইরে যায়নি। তা হলে ঘড়িটা...’ বজ্রকুণ্ডল উত্তেজিত গলায় চেঁচিয়ে বললেন, ‘রাখো তোমার ঘড়ি। এই যা পেয়েছি তাতে হাজারটা ওরকম ঘড়ি কেনা যায়।’
        বরদাচরণ কটমট করে বজ্রকুণ্ডলের দিকে একবার চাইলেন। তারপর আবার গভীর ভাবনায় ডুবে গিয়ে আপনমনে বললেন, ‘শেষবার বেড়ালটাকে দেখা গিয়েছিল পুকুরের ধারে, তার আগে ভাঙা নহবৎখানার ছাদে। কিন্তু সেখানেও ঘড়ি নেই। তা হলে...’
        বজ্রকুণ্ডল বরদাচরণের দুখানা হাত ধরে বললেন, ‘আমি তোমাকে দশ লাখ টাকা দেবো। বুঝলে? দশ লাখ; এখন ঘড়ির চিন্তাটা ছাড়ো। বরদাচরণ হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আপনমনে বলতে লাগলেন, তা হলে পুকুরের ধারেও যদি না এসে থাকে তবে বেড়ালটা গিয়েছিল’...বলতে বলতে বরদাচরণ উঠে সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে ভাঙা রসুইখানার দিকে হাঁটা দিলেন। পিছনে বজ্রকুণ্ডল। তিনি বার বার বলতে লাগলেন, ‘ঘড়ি আর চাই না বাবা বরদাচরণ। তোমাকে খুশি হয়ে দশ লাখ দিচ্ছি। বরদাচরণ আনমনে মাথা নেড়ে বললেন, উহুঁ। আমার ফি একশো টাকা। তাও ঘড়ি পেলে।’
        কিন্তু এ টাকায় যে লাখ ঘড়ি কেনা যায়। বরদাচরণ ঠোট উল্টে বললেন, ‘ওসব মোহর সোনা হীরে এই তদন্তে অবাস্তর। ওসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আমার নেই।’ বলে আপনমনে বরদাচরণ বিড়বিড় করতে করতে চারিদিকে ঘুরে বেড়াতে থাকেন, বেড়ালটা আর ঘড়িটা এক সূত্রে বাঁধা। বেড়ালটা বাড়ির বাইরে না গেলে ঘড়িটারও স্বাভাবিক অবস্থায় যাওয়ার কথা নয়। তা হলে…
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য