এলডার-মার কথা - হ্যান্স অ্যাণ্ডারসন

        অনেকদিন আগে একটি ছোটো ছেলে ছিল; এক দিন পা ভিজিয়ে ঠাণ্ডা লেগে, তার হল জ্বর। এদিকে খটখটে চমৎকার দিন তবু পা যে কি করে ভেজাল, তা কেউ ভেবেই পেল না। ওর মা কাপড়-চোপড় ছাড়িয়ে দিলেন বিছানায় শুইয়ে। তার পর মা ছোটো একটা চা-দানি নিয়ে এলেন, এলডার গাছের ফুল দিয়ে ছেলের জন্য ওষুধ তৈরি হবে। ঠিক সেই সময়, ওদের বাড়ির সব চাইতে উপর তলায় যে বুড়ো থাকত, সে-ও নেমে এল। বেচারি একেবারে একা থাকত, ওর না ছিল একটা বৌ, না ছিল ছেলেপুলে! কিন্তু পাড়া-পড়শীদের ছেলেমেয়েদের বুড়ো বেজায় ভালোবাসত আর তাদের কত যে চমৎকার সব রূপকথা আর গল্প বলত যে দেখলেও ভালো লাগত।

        মা বললেন, “এবার লক্ষ্মী ছেলের মতে ওষুধটা খেয়ে ফেল দিকিনি, তা হলে কে জানে হয়তো একটা গল্প শুনতে পাবে।”
        বুড়ো হেসে মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক তাই, তবে কিনা, এখন নতুন কিছু মনে পড়লে হয়। আচ্ছা, ছেলেটা পা ভেজাল কোথায়?”
        মা বললেন, “কি জানি, কেউ তো ভেবে পাচ্ছে না।” ছেলেটা জিজ্ঞাসা করল, “তা হলে কি গল্প শুনতে পাব না?”
        বুড়ো বলল, “নিশ্চয় পাবে; যদি আমাকে বলতে পার তোমাদের স্কুলে যাবার গলির নালায় কতখানি জল। আগে সেইটে জানা দরকার।”
        ছেলে বলল, “এ আর এমন কি, আমার বুট-জোড়ার অর্ধেক অবধি জল; তাও যদি নালার গর্তটার মধ্যে নামি।”
        বুড়ো বলল, “তাই বলে, ঐখানেই বুঝি জুতো-জোড়া ভিজে গেছিল? তা হলে এবার বোধ হয় গল্প শুনতে চাইব; কিন্তু সত্যি বলছি, আর নতুন গল্প আমার জানা নেই।”
        ছেলেও নাছোড়বান্দা, “তুমি তো এক নিমেষে গল্প বানাও। মা বলেছেন তুমি যে জিনিসের দিকে তাকাও সেটাই রূপকথা হয়ে যায়, তুমি যাতে হাত দাও অমনি সেটা গল্প হয়ে যায়।”
        “ত হয়; তবে ও-সব গল্প এমন কিছু ভালো হয় না। আসল গল্পটা নিজে থেকেই তৈরি হয়। তারা আমার কপালে টোকা দিয়ে বলে ‘এই যে আমরা এসেছি’।”
        ছোটো ছেলেটি বলল, “তা হলে আশা করি এক্ষুণি ওরা এসে তোমার কপালে টোকা দেবে।” ওর মা তাই শুনে খুব হেসে, ছোট্টো চা-দানিতে এলডার ফুলের উপর খানিকটা ফুটন্ত জল ঢেলে দিলেন।
        ছেলেটা বলল, “এবার, গল্প হোক; বলো না একটা!”
        “আরে, গল্প এলে তো বলব। ওনার ভারি দেমাক; যখন ইচ্ছে হবে, শুধু তখন আসবে। এই, চুপ!” তার পর হঠাৎ বুড়ো বলল, “এই এল বলে! নজর রাখ, ভাই, হাড়িটাতে ঢুকল গিয়ে।”
        ছোটো ছেলেটি তার মায়ের চা-দানির দিকে তাকাল। দেখল ঢাকনিটা আস্তে আস্তে উঠে যাচ্ছে আর এলডার ফুল বেরিয়ে আসছে। কী সুন্দর দেখতে, কী ভালো গন্ধ! দেখতে দেখতে ফুল থেকে মোটা মোটা লম্বা লম্বা ডালপালা গজিয়ে গেল, এমন-কি, চা-দানির নল থেকেও ডালপালা বেরুল! দেখতে দেখতে চারদিক ডালপাতায় ছেয়ে গেল; তবু গাছটা আরো বাড়তে লাগল; বেড়ে বেড়ে শেষটা খাটের পাশে দিব্যি একটা এল্ডার গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রইল। নিখুঁত আস্ত একটা গাছ, তার ডালপালা বিছানার উপর ঝুলে থাকল, পরদা-টরদা সরিয়ে। গাছ ভরা সাদা ফুল, তার কি সুবাস! গাছের ঠিক মধ্যিখানে একজন বুড়ি বসে আছেন, কী কোমল মিষ্টি তাঁর মুখ। অদ্ভূত পোশাক তার গায়ে, এলডার গাছের পাতার মতে সবুজ, তার উপর থোপা থোপা এলডার ফুলের নকশা। দেখে বোঝে কার সাধ্য যে ওটা একটা পোশাক, নাকি সত্যি গাছে সত্যি ফুলপাতা গজিয়েছে।
        ছোটো ছেলেটা জিজ্ঞাসা করল, “ওর নাম কি?”
        বুড়ো বলল, “সেকালের গ্রীস রোমের লোকরা তো ওঁকে “ড্রায়াড’ নামে ডাকত, তার মানে বনদেবী, ও-সব উদ্‌ভুট্টি নাম আমরা বুবি-সুঝি না! জাহাজের নাবিকরা তার চেয়ে ভালো নাম দিয়েছিল, তারা ও কে ডাকত, এলডার-মা বলে। ও নামটি দিব্যি মানায়। এবার ঐ সুন্দর গাছটির দিকে তাকিয়ে আমার কথা শোন দিকি৷”
        “এক সময় ঠিক ঐরকম আরেকটা ফুলে ভরা বড়ো গাছ বিশ্রী এক উঠোনের কোণে গজিয়েছিল। একদিন বিকেলে, সেই গাছতলায় দুজন বুড়ো মানুষ এসে বসল। এক বেজায় বুড়ো নাবিক আর তার বেজায় বুড়ি বৌ তাদের নাতির ছেলে জন্মে গেছিল, শিগগিরই তাদের বিয়ের পর পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হবে, সেদিন উৎসব করার কথা, কিন্তু বিয়ের ঠিক তারিখটি দুজনের মধ্যে কেউ মনে করতে পারছিল না। এলডার-মা ওদের মাথার উপরে গাছের মধ্যে বসে ছিলেন, মুখটা তার ঠিক এইরকম খুশিখুশি। তিনি বললেন, ‘আহা, আমি কিন্তু ঠিক তারিখটি জানি।’ ওরা ও র কথা শুনতেই পেল না, বসে বসে দুজনে সেকালের গল্প করতে লাগল।
        “বুড়ো নাবিক বলল, “কিগো, তোমার মনে নেই সেই যখন আমরা খুব ছোটো ছিলাম, তখন যেখানে এখন আমরা বসে আছি, এই উঠোনটিতেই কেমন দৌড়োদৌড়ি খেলাধুলো করতাম। মনে আছে মাটিতে কাঠি পুঁতে কেমন বাগান করতাম?’
        “বুড়ি বলল, ‘মনে আছে বৈকি। সেই কাঠিগুলোতে আমরা রোজ জল ঢালতাম। কিন্তু মাত্র একটা কাঠির শেকড় গজালো, সেটাই এই এলডার গাছটি! কেমন দিব্যি সবুজ ডালপালা মেলে দেখতে দেখতে এই বড়ো হয়ে গেল আর তারই নীচে আজ আমরা বুড়ো-বুড়িতে বসে আছি।’
        “বুড়ো বলল, “ঠিক তাই! ঐ কোণে বালতিভরা জল থাকত, তাতে আমি নৌকো ভাসাতাম! নিজের হাতে কাঠ কুরে নৌকো বানাতাম; কী খাসা সব নৌকে বল দিকিনি! কিন্তু দেখতে দেখতে আমাকে সত্যিকার নৌকোতে চড়ে সাগর পাড়ি দিতে হল! সে জাহাজগুলো আমারই খেলার নৌকো থেকে বেশ খানিকটা বড়ো ছিল, কি বল গিন্নী?
        “বৌ বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। কিন্তু তার আগে স্কুলে গেলাম মনে নেই? তার পর গির্জায় আমাদের কেমন দীক্ষা হল। বেশ মনে আছে দুজনে ভেউ-ভেউ করে কেঁদেছিলাম। তার পর বিকেলে হাত ধরাধরি করে গোল দুর্গের চুড়োয় উঠে দুনিয়া দেখেছিলাম, সারা কোপেনহাগেন শহর, সমুদ্র-টমুদ্র সব। তার পর ফ্রেডারিক্সবার্গে গেলাম, সেখানে খালের জলে রাজা-রানী চমৎকার বজরায় চড়ে বেড়াচ্ছিলেন!’ বুড়ে বলল, ‘অবিশ্ব্যি আমি যে-সব বিশাল বিশাল জাহাজে চড়ে সাগর পাড়ি দিতাম, তার কাছে আমার খেলার নৌকোও যেমন, তোমার রাজা-রানীর ঐ বজরাও প্রায় তাই! কত বছরের পর বছর জাহাজে চড়ে ঘুরতে হয়েছিল আমাকে!’
        “বৌ বলল, ‘হ্যাঁ। তোমার জন্য আমি কি কান্নাটাই-না কাঁদতাম! ভাবতাম নিশ্চয় মরে গেছ, চিরদিনের মতো চলে গেছ, সমুদ্রের তলায় অতল গভীরে কোথায় ডুবে গেছ! কত সময় রাতে উঠে গির্জার চুড়োয় হাওয়া-সংকেতের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, দেখতাম হাওয়া পাল্টাল কি না। বার বার হাওয়া পাল্টাত তবু তুমি ফিরে আসতে না!
        “একদিনের কথা আমি জন্মে ভুলব না। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। যে-বাড়িতে আমি দাসীর কাজ করতাম, সেখানে জঞ্জাল কুড়োবার লোক এসেছিল, আমি জঞ্জালের ঝুড়ি নিয়ে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছিলাম। এমন সময় ডাকওয়ালা এসে আমাকে একটা চিঠি দিল। তোমার চিঠি। তখুনি খাম ছিড়ে চিঠি পড়ে, একবার হাসি, একবার কাঁদি, এমনি আনন্দ হয়েছিল। ঐ চিঠিতে তুমি লিখেছিলে তুমি গরম দেশে গেছ, সেখানে কফির গাছ হয়—না জানি কি অপূর্ব সেই সব দেশ! কত কথাই-না লিখেছিলে, মনে হচ্ছিল সব যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি! এদিকে ঝমঝম করে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে আর আমি জঞ্জালের ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি তো দাঁড়িয়েই আছি! এমন সময় কে জানি পেছন থেকে এসে আমাকে ধরল!—’
        “তাই বটে! আর তুমিও তার কানটা ধরে এমনি কষে প্যাঁচ দিলে, বাপ রে তার কি জ্বলুনি!’
        “বাঃ রে! আমি কি করে জানব তুমি চিঠির সঙ্গে সঙ্গে এসে হাজির হবে! কি ভালোই-না দেখতে ছিলে! অবিশ্যি এখনো তাই আছ। তোমার পকেটে মস্ত একটা হলদে রঙের রেশমী রুমাল, মাথায় একটা নতুন টুপি! কী বাদলাই করেছিল সেদিন, পথঘাট ভেসে গেছিল!’
        “নাবিক বলল, ‘তার পর আমাদের বিয়ে হল, মনে আছে সে কথা? তার পর আমাদের প্রথম ছেলে হল, তার পর মারি, নীলস্, পিটার, হ্যান্স ক্ৰিশ্চান!’ আহ, বল তো কী সুখের কথা যে ওরা সবাই বড়ো হয়ে কেমন লক্ষীমন্ত হয়েছে, কী খাটতে পারে, সবাই ওদের কি ভালোই-না বাসে!’
        “বুড়ো বলল, ‘আহা, ওদের ছেলেপুলেদের কথাও বল। আমাদের ছেলেমেয়েদের আর নাতি-নাতনিদের কেমন স্বাস্থ্য, তাই বল! কাজেই আমার মনে হচ্ছে, এইরকম সময়ই আমাদের বিয়ে হয়েছিল। এলডার-মা তখন দুজনার মাঝখান দিয়ে মাথা গলিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, গো হ্যাঁ, আজই তোমাদের বিয়ের পর পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হল। ওরা কিন্তু কিছু টের পেল না, ওরা ভাবল ঐ বুঝি পাড়ার কেউ ওদের দেখে মাথা নাড়ছে। ওঁর দিকে ওরা তাকালই না, দুজনে দুজনার দিকে চেয়ে, এ ওর হাত ধরে বসে রইল।
        “কিছুক্ষণ বাদে ওদের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি সবাই উঠোনে বেরিয়ে এল। তারা ভালো করেই জানত আজই ওদের বিয়ের দিন, তাই সবাই মিলে ওদের অভিনন্দন জানাতে এসেছিল। বুড়ো-বুড়ি কিন্তু তারিখটার কথা একেবারে ভুলে গেছিল, অথচ আধ শতাব্দী আগেকার সব ঘটনা তাদের পরিষ্কার মনে ছিল। গাছের ফুলের সুগন্ধে চারদিক ম-ম করছিল, সূর্য ডোবে ডোবে, তার কোমল রোদ এসে বুড়ো-বুড়ির মুখে পড়েছিল, কী মিষ্টি লালচে রোদ সে আর কি বলব! সবচাইতে ছোটো নাতি ওদের চারদিকে ধেই ধেই করে নাচতে লাগল। ফুর্তির চোটে তার সে কী চীৎকার, রাতে কিনা মহী ভোজ হবে, সে যা চমৎকার করে আলু রান্না হচ্ছে। এলডারমাও গাছ থেকে মাথা-টাথা তুলিয়ে ওদের সমান জোর গলায় হৈ-চৈ করতে লাগলেন।”
        বুড়োর গল্প বলা থামলে, ছোটো ছেলেটা বলল, “ও আবার কেমন গল্প? ওকে আমি গল্পই বলি না।” বুড়ো লোকটা ছিল ভালো। সে বলল, “বল না বুঝি? আচ্ছা, তা হলে এলডার-মার মতটাই শোনা যাক।” এলডার-মা বললেন, “না, বাছা, তুমি ঠিকই বলেছ, ওটা ঠিক গল্প নয়। এইবার গল্প শুনতে পাবে। আমি তোমাকে দেখিয়ে দেব কেমন করে রোজকার সাধারণ ঘটনার ভিতর থেকে রূপকথা জন্ম নেয়। আরে তাই যদি না হত, তা হলে আমার এই সুন্দর এলডার গাছটিই-বা কি করে চা-দানির ভিতর থেকে গজাতো?”
        তার পর এলডার-মা ছেলেটাকে বিছানা থেকে তুলে বুকের কাছে নিয়ে বসলেন। ফুলে ভরা ডালপালাগুলো চারদিক থেকে ওদের এমন করে ঘিরে রইল যে মনে হল যেন একটা কুঞ্জবনে বসে আছে। চারদিকে পাতার রাশি কী ঘন, কী সুন্দর তার গন্ধ! তার পর সেই কুঞ্জবনটা ওদের নিয়ে আকাশে উড়ে পড়ল, সে যে কী ভালো লাগল! এর মধ্যে হঠাৎ কখন বুড়ি এলডার-মা একজন রূপসী লাবণ্যময়ী অল্পবয়সী মেয়ে হয়ে গেলেন। এলডার-মার মতোই পোশাক তার গায়ে, তাজা সবুজ রঙের, তার উপর থোপা থোপা সাদা ফুলের নকশা। তবে তার বুকে একছড়া সত্যিকার এলডার ফুল ছিল আর মাথার সোনালি কোঁকড় চুলেও এলডার ফুলের গুছি জড়ানো! বড়ো বড়ো নীল রঙের চোখ, এমন সুন্দর মেয়ে দেখলেও মন খুশি হয়ে যায়। দুজনে দুজনাকে আদর করতেই, মেয়েটি ছেলেটার সমবয়সী হয়ে গেল। কী ভাব দুজনার মধ্যে, কী আনন্দ তাদের!
        হাত ধরাধরি করে তারা কুঞ্জবন থেকে বেরিয়েই তাদের বাড়ির বাগানে পৌছে গেল সেখানকার ঘাসজমিতে ওদের বাবার লাঠিটাকে দেখতে পেল। দেখে মনে হল লাঠিটারও প্রাণ আছে। ঘোড়ায় চড়ার মতো করে লাঠিটাতে চাপতেই, লাঠির চক্‌চকে হাতলটা একটা ঘোড়ার মাথা হয়ে গেল, কী তার ডাক, কী তেজ, যেন আগুন ছুটছে! ঘোড়ার ঘাড়ের লম্বা কালো চুল বাতাসে উড়তে লাগল, চারটি সরু লম্বা পা বেরুল। নতুন ঘোড়া দেখতেও যেমন, তেমনি তার তেজ; ওদের পিঠে নিয়ে ঘাসজমির চারধারে সে ছুটতে লাগল। সে কী মজা! ছেলেটা বলল, “চল, অনেক দূরে যাওয়া যাক। গত বছর যে সুন্দর বাগান-বাড়িতে গেছিলাম, সেখানে যাওয়া যাক।” তখনো ওরা ঘাসজমির চারদিকেই ঘুরছিল, মেয়েটি খালি বলছিল—সে অবিশ্যি আসলে এলডার-মা ছাড়া কেউ নয়, “এই দেখ, পাড়াগাঁয়ে পৌছে গেলাম। ঐ দেখ কী সুন্দর কুটির। তার ওপর এলডার গাছটি কেমন ঝুঁকে পড়েছে। মোরগটা কেমন ঘুরে ঘুরে মাটি আঁচড়ে, মুরগিদের জন্য খাবার খুঁজছে। দেখ, ওর চলার চালটি দেখ! এবার গির্জার কাছে এলাম। ঐ দেখ পাহাড়ের উপর বড়ে-বড়ো ওকগাছের মাঝখানে গির্জা! এবার কামারের দোকানে পৌঁছলাম; গনগনে আগুন জ্বলছে, নেংটি-পরা লোকগুলো কেমন জোরে হাতুড়ি পিটছে, চারদিকে আগুনের ফুলকি ছুটছে! চল, চল, বাগান বাড়িতে যাই।”
ছোটো মেয়েটি যা বলে, তাই যেন ওদের পাশ দিয়ে ছুটে চলে যায়; ছেলেটা সব দেখতে পায়, অথচ তখনো ওরা ঘাসজমিটার চারদিকেই ঘুরছে! ওখানে একটা পায়ে চলার পথে ওরা খানিক খেলা করল, মাটিতে একটি ছোটো বাগান সাজাল, চুল থেকে একছড়া ফুল নিয়ে মেয়েটি সেই বাগানে পুঁতে দিল, অমনি সেটা গাছ হয়ে বাড়তে লাগল, ঠিক যেমন করে বুড়ো নাবিক আর তার বৌয়ের ছোটোবেলায় লাগানো গাছটি বেড়েছিল।
        তার পর ছোটো মেয়েটি ছেলেটার কোমর জড়িয়ে ধরল, অমনি তারা ডেনমার্ক দেশের উপর দিয়ে উড়ে চলল। বসন্তকাল পূর্ণ হলে গ্রীষ্ম এল, গ্রীষ্ম পেকে হেমন্ত হল, হেমন্ত ক্রমে ফিকে হতে হতে ঠাণ্ডা ফ্যাকাশে শীত দাঁড়াল। ছোটো ছেলের চোখে আর মনে হাজার ছবির ছায়া পড়ল। যেখানেই উড়ে যায় ওরা, এলডার ফুলের মিষ্টি গন্ধ ওদের ঘিরে থাকে। গোলাপ বাগানের ওপর দিয়ে যাবার সময় ছেলেটা গোলাপের সুবাস পায়; বীচ, গাছের তাজা গন্ধ বাতাসের সঙ্গে ভেসে কখনো নাকে আসে; তবু মনে হয় সব গন্ধের সেরা হল ঐ এলডার ফুলের গন্ধ।
        বীচ বনে পৌছে মেয়েটি বলল, “বসন্তকাল কী ভালো! আহা চিরকাল যদি বসন্ত হত!”
        অমনি বীচ বনের গাছে গাছে বোল ধরল; গাছের গোড়ায় বুনো ফুলের সে কী মিষ্টি গন্ধ! সবুজ পাতার মাঝখানে ফিকে রঙের মালতী ফুলকে কী সুন্দর দেখাচ্ছিল! কোনো রাজার পুরনো গড়ের পাশ দিয়ে যাবার সময় মেয়েটি আবার বলল, “আহা, বর্ষাকাল কী ভালো!” গড়ের লাল রঙের ছোপ-ধরা দেয়াল, প্রাকারের ছায়া পড়েছে চারধারের পরিখার জলে। মাঠে সবুজ শস্যের খেতে বাতাস লেগে ঢেউ উঠল; খালের ধারে ছোটো-ছোটো হলুদ লাল ফুল ফুটল, ঝোপে-ঝাড়ে বেয়ে উঠল বুনো স্বর্ণলতা আর ছোটো-ছোটো ঘণ্টার মতো দেখতে সাদা সাদা ফুল। সন্ধ্যা হয়ে এল, আকাশে প্রকাণ্ড পূর্ণ চাঁদ উঠল, মাঠের ধারে খড়ের গাদা থেকে সুগন্ধ উঠল।
        ছোটো কন্যে বলল, “হেমন্তকাল বড়ো সুন্দর!” অমনি মনে হল আকাশের গম্বুজ যেন আরো অনেক উঁচু, আরো অনেক বেশি নীল হয়ে গেল। বনে বনে রঙের জাদু লাগল, লাল, সবুজ, হলুদ। ডাকতে ডাকতে পাশ দিয়ে শিকারী কুকুরের দল ছুটে গেল, কাঁটালতায় ঢাকা পাথরের ঢিপির উপর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বুনো পাখি উড়ল, তাদের চীৎকারে কানে তালা লাগল! দূরে সুনীল সুগভীর সাগরের উপর শত শত নৌকোর সাদা পাল দেখা গেল। খামারবাড়ির গোলায় কত বুড়ি, কত মেয়ে, কত ছেলেপুলে জুটে প্রকাণ্ড পিপেতে হপ, ফল ভরতে লাগল; তাই দিয়ে মদ তৈরি হবে। যাদের বয়স কম তারা গান ধরল, বুড়ির গল্প বলতে লাগল, পুরনো সব রূপকথা, পরীদের কথা, জাদুমন্ত্রের কথা। এর চাইতে ভালো গল্প আর কি হতে পারে?
        মেয়েটি বলল, “শীতকাল কী সুন্দর!” অমনি চারদিকের গাছগুলো তুষারের গুঁড়োয় ঢেকে গেল, পায়ের নীচে বরফ কিচ কিচ করে উঠল, আকাশে উল্কাপাত হতে লাগল। সবার বসবার ঘরে বড়োদিনের সাজানো গাছে আলো জ্বালা হল, সকলে উপহার পেল, সবাই বড়ো খুশি হল। পাড়াগাঁয়ে চাষীর কুঁড়েতেও বেহালা শোনা গেল, সবাই টপাটপ, পিঠে পুলি খেতে লাগল। সবচাইতে গরিব যে ছোটো ছেলে তার মুখেও শোনা গেল, আহা, শীতকাল কী সুন্দর!
        সত্যিই, সব কিছু কী সুন্দর। ঐ আমাদের পরীদের মেয়েই ছোটো ছেলেটাকে এত ভালো ভালো জিনিস দেখাল, তখনো তাদের চারদিকে এলডার ফুলের গন্ধ ভুরভুর করছিল।
        তার পর চোখের সামনে নতুন এক দৃশ্য ভেসে উঠল, সাদা ক্রশআঁকা একটি লাল নিশান বাতাসে পতপত করে উড়ছে। এই নিশান উড়িয়েই বুড়ো নাবিক একদিন জাহাজে চড়ে সাগর পাড়ি দিয়েছিল। ছেলেটার মনে হল এখন সেও বড়ো হয়েছে, এবার তাকেও ভাগ্য পরীক্ষা করতে বিশাল পৃথিবীতে বেরিয়ে পড়তে হবে। বিদায় দেবার সময় ছোটো মেয়েটি নিজের বুক থেকে এলডার ফুলটি খুলে তাকে দিল। সে সেটিকে যত্ন করে রেখে দিল, তার উপাসনার গানের বইয়ের পাতার মাঝখানে। বিদেশে যখনি সে বইটি হাতে নিত, অমনি ঐ পাতাটি খুলে যেত, যেখানে স্মৃতি-চিহ্নের ফুলটি রাখা ছিল। যতই ফুলটিকে দেখত, ততই মনে হত ফুলটি যেন আরো তাজা হয়ে উঠছে। ফুলের দিকে তাকালে যেন ডেনমার্কের বীচ বনের মিষ্টি বাতাস নাকে আসত, আগের কালের কত শত মধুর দৃশ্য আপনা থেকেই মনের মধ্যে ভেসে উঠত।
        এমনি করে অনেক বছর কেটে গেল, ছোটো ছেলেটা বুড়ো হয়ে বুড়ো বৌয়ের সঙ্গে একটা ফুলে ভরা গাছের নীচে বসে রইল। তার হাত ধরাধরি করে সেকালের গল্প করতে লাগল, তাদের বিয়ের পর পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হবার কথা বলতে লাগল। মাথায় ফুলের ছড়া পরে, নীল-চোখ ছোটো মেয়েটি গাছের মধ্যে বসে বসে ওদের দিকে মাথা তুলিয়ে বলতে লাগল, “হ্যাঁ, আজই তোমাদের পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হবার দিন।” তার পর নিজের চুল থেকে দু ছড়া ফুল খুলে, তাতে দুবার চুমো খেল। প্রথম চুমো খেতেই ফুলগুলি রুপোর মতো ঝকঝক করতে লাগল; দ্বিতীয় চুমো খেতেই সোনার মতো ঝকঝক করতে লাগল। তার পর যখন সে ফুলের গোছা দুটিকে বুড়ো-বুড়ির মাথায় পরিয়ে দিল, তখন সেগুলো হয়ে গেল দুটি সোনার মুকুট।
        তার পর দুজন রাজা-রানীর মতো মাথায় মুকুট পরে সুগন্ধে ভর গাছতলায় বসে রইল। বুড়ো তখন বৌকে এলডার-মার গল্প বলল। এ গল্প তার নিজের ছোটোবেলায় শোনা। তাদের তখন মনে হতে লাগল যে, গল্পটার অনেক জায়গাই তাদের নিজেদের জীবনের কথার মতো শোনাচ্ছে আর ঐ জায়গাগুলোই সবচাইতে ভালো!
        গাছ থেকে ছোটো মেয়েটি বলল, “ঠিক তাই; কেউ আমাকে ডাকে এলডার-মা, কেউ-বা বলে বনদেবী, কিন্তু আমার আসল নাম হল স্মৃতি। এইখানে গাছের মধ্যে বসে থাকি আর গাছটা কেবলই বাড়তে থাকে; কিছু ভুলি না, সব স্পষ্ট মনে থাকে। এবার দেখি তো সেই ফুলটি এখনো নিরাপদে আছে কি না।”
        বুড়ো নাবিক তখন তার গানের বইটি খুলে দেখল। ঐ তো ফুলটি রয়েছে বইয়ের পাতার মাঝখানে, মনে হচ্ছে যেন এইমাত্র তাকে পেড়ে এনে রাখা হয়েছে। স্মৃতি মাথা দোলাতে লাগল। বুড়ো-বুড়ি মাথায় সোনার মুকুট পরে গাছতলায় বসে রইল। বিকেলের পড়ন্ত রোদের লালচে আভায় তাদের মুখ দুটি রাঙা হয়ে উঠল। দুজনে চোখ বুজল; তারপর— তারপর—তারপর গল্পও ফুরিয়ে গেল।
        ছোটো ছেলেটা খাটে শুয়ে ভাবতে চেষ্টা করল এ কি স্বপ্ন দেখল, নাকি গল্প শুনল। টেবিলের উপর চা-দানি রয়েছে, তাতে গাছপালা কিচ্ছু নেই। ওর বন্ধু সেই বুড়ো গল্পওয়ালাও ঠিক সেই সময়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। চোখ ঘষে ঘুম তাড়াতে না তাড়াতে তাকে আর দেখাই গেল না।
        ছেলেটা বলল, “বাঃ, কি ভালোই যে লাগল, মা, কেমন গরম দেশে বেড়িয়ে এলাম।”
        মা বললেন, “তা বেড়াবে না! দু পেয়ালা কানায় কানায় ভরা গরম সালসে খেলে গরম দেশে যাবে না তো কোথায় যাবে?” এই বলে মা তাকে পা থেকে গলা অবধি ভালো করে ঢেকে ঢুকে দিলেন, পাছে ঠাণ্ডা লাগে। “আমি যতক্ষণ এখানে বসে বুড়োর সঙ্গে তর্ক করছিলাম ওটা গল্প নাকি সত্যি ঘটনা, তুমি ততক্ষণ যা নাক ডাকিয়ে ঘুমুলে বাবা!” ছেলেটা বলল, “এলডার-মা কোথায়?”
        মা বললেন, “চা-দানিতে, আবার কোথায়? থাকুন ওখানে!”
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য