তুষার-কণা আর সাত বামনের গল্প - জার্মানের রূপকথা

        শীতকালের মাঝামাঝি একবার পাখির পালকের মতো তুষারের পাপড়ি ঝরছিল আকাশ থেকে আর এক রানী জানলার পাশে বসে কালো আবলুস কাঠের ফ্রেমের মধ্যে ছুঁচের কারুকাজ করছিল। কাজ করতে করতে বাইরেকার তুষারপাপড়ির দিকে তাকাতে ছুঁচটা তার আঙুলে ফুটে গেল আর তিন ফোটা রক্ত পড়ল তুষারের উপর। তুষারের উপর লাল রক্ত ভারি সুন্দর দেখাচ্ছিল বলে রানী মনে মনে বলল, “তুষারের মতো সাদা আর রক্তের মতো টুকটকে আর মাথায় এই আবলুস কাঠের মতো কালো চুল নিয়ে আমার একটি শিশু থাকলে খুব ভালো লাগত।’
        তার অল্প কাল পরেই তার কোলে এল ছোটো একটি মেয়ে ৷ মেয়েটির গায়ের রঙ তুষারের মতো ধবধবে আর রক্তের মতো টুকটুকে। মাথার চুল আবলুস কাঠের মতো কালো। আদর করে সবাই তাকে ডাকত ‘তুষার-কণা’ বলে। কিন্তু মেয়েটি জন্মাবার পরেই রানী মারা গেল।
        বছর খানেকের মধ্যেই রাজা আবার বিয়ে করলেন। তার দ্বিতীয় বউও খুব সুন্দরী। কিন্তু ভারি অহংকারী আর স্বভাবটাও অত্যন্ত উদ্ধত। তার চেয়ে বেশি সুন্দরী অন্য কাউকে সে বরদাস্ত করতে পারত না। তার ছিল একটা জাদুর আয়না। সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে যখন সে প্রশ্ন করতঃ

 “দেয়াল-আয়না দেয়াল-আয়না, না করে কোনো ছল,
সবার সেরা সুন্দরী কোথায় আছে বল?”

        আয়না উত্তর দিত, “রানী, তুমিই সব চেয়ে সুন্দরী।” এটা শুনে সে তৃপ্তি পেত। কারণ জানত, আয়না সত্যি কথা বলে। এদিকে তুষার-কণা বড়ো হয়ে উঠতে লাগল। আর যত দিন যেতে লাগল ততই রূপ যেন তার লাগল ফেটে পড়তে। যখন তার সাত বছর পূর্ণ হল তখন সে হয়ে উঠল সকালের মতো সুন্দর আর রানীর চেয়েও রূপসী।
        একদিন রানী যখন যথারীতি আয়নাকে প্রশ্ন করেছে:

“দেয়াল-আয়না, দেয়াল-আয়না, না করে কোনো ছল,
সবার সেরা সুন্দরী কোথায় আছে বল?”

আয়না উত্তর দিল:

“রানী তোমার রূপের কণা কেউ কখনো পায় নি,
তুষার-কণার রূপের জুড়ি দেখা কিন্তু যায় নি।”

        উত্তর শুনে রানী রেগে ক্ষেপে উঠল। হিংসেয় একবার তার মুখ হল হলদে, একবার সবুজ। তার পর থেকে সেই ছোট্টো মেয়েটির দিকে তাকালেই মন তার নিষ্ঠুর হয়ে উঠত, ঘৃণায় ভরে যেত বুক। দিনে রাতে তার শান্তি রইল না। সব সময় হিংসেয় জ্বলেপুড়ে মরে। একদিন এক শিকারীকে ডেকে পাঠিয়ে সে বলল, “এই বাচ্চা মেয়েটাকে বনে নিয়ে যাও। এ আমার দু চক্ষের বিষ হয়ে উঠেছে ৷ একে মেরে ফেলে প্রমাণ হিসেবে এর কলজে অার ফুসফুস আমাকে এনে দেখাবে।”
        রানীর আদেশমতো তুষার-কণাকে নিয়ে গেল শিকারী। বর্শা তুলে তার নিম্পাপ বুকে সেটা যখন সে বিঁধতে যাচ্ছে কেঁদে ফেলে অনুনয় করে মেয়েটি তাকে বলল:
        “শিকারী-ভাই, আমাকে মেরো না। বনের মধ্যে অনেক দুরে আমি চলে যাব। কক্ষনো আর ফিরব না।” তার সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে শিকারীর মায়া হল। সে বলল, “বেশ, দৌড়ে পালাও।”
        শিকারী ভাবল, “বুনো জন্তু নিশ্চয়ই ওকে খেয়ে ফেলবে। তাই আমার মারা না-মারা—দুইই সমান।” কিন্তু নিজের হাতে তাকে না মারার জন্য শিকারীর মনে হল—বুক থেকে যেন পাথরের ভারী একটা বোঝা নেমে গেছে। ঠিক তখুনি পাশ দিয়ে একটা হরিণ-ছানা ছুটে খাচ্ছিল। সেটাকে মেরে তার কলজে আর ফুসফুস নিয়ে গিয়ে রানীকে সে দেখাল। রাঁধুনি সেগুলো নুনে জরিয়ে রাঁধল আর সেই শয়তান রানী সেগুলো খেয়ে ভাবল তুষার-কণার কলজে আর ফুসফুস খেয়েছে।
        এদিকে বেচারা মেয়েটি একলা ঘুরে বেড়াতে লাগল সেই বিরাট বনের মধ্যে। প্রতিটি পাতার আড়াল থেকে সে উঁকি মেরে দেখে কেউ সেখানে আছে কি না। শেষটায় সে ছুটতে শুরু করল তীক্ষ্ণ পাথরের উপর দিয়ে, কাটাঝোপের ভিতর দিয়ে। বুনো জন্তু-জানোয়ার তাকে দেখেও দেখল না। সমস্ত দিন ছুটে-ছুটে সন্ধেয় সে পৌছল ছোট্টো একটি বাড়ির কাছে। বিশ্রাম নেবার জন্য বাড়িটার মধ্যে সে গেল। ভিতরে গিয়ে সে দেখে সব-কিছু পরিষ্কার পরিপাটি করে সাজানো। সেখানে ছিল ছোট্টো একটা টেলিল। তার উপর ধবধবে সাদা টেবিল ঢাকা আর ছোট্টো-ছোট্টো সাতটা প্লেট। প্রত্যেকটি প্লেটের পাশে ছোট্টো-ছোট্টো ছুরি, কাটা আর চামচে। আর ছিল সাতটা ছোট্টো-ছোট্টো গোলাপ। দেওয়ালের পাশে বিছানা পাতা ছোট্টা-ছোট্টো সাতটা খাট। তুষার-কণার খুব ক্ষিদে পেয়েছিল। তাই প্রত্যেকটা প্লেট থেকে একটু-একটু করে রুটি আর মাংস সে খেল। আর প্রত্যেকটি গেলাসে দিল একটু করে চুমুক। তার পর খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল বলে সে গেল শুতে। প্রত্যেকটা বিছানায় শুয়ে-শুয়ে সে দেখল—কোনোটা তার পক্ষে খুব ছোটো, কোনোটা তার পক্ষে খুব বড়ো। কিন্তু সপ্তম বিছানায় শুয়ে সে দেখল সেটা ঠিক তার মাপসই। সেটায় শুয়ে, ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানিয়ে সে পড়ল ঘুমিয়ে।
        অন্ধকার গভীর হবার পর সেই ছোট্রো বাড়ির কর্তারা ফিরল। তারা সাতটি বামন, পাহাড়ে গিয়েছিল সেখান থেকে খুঁড়ে ধাতু আনতে। তারা তাদের ছোটো-ছোটো সাতটা মোমবাতি জ্বালাল। বাড়িটার মধ্যে আলো হতে তারা দেখে—কেউ সেখানে এসেছিল, জিনিসপত্র যেভাবে সাজিয়েগুছিয়ে রেখে তারা গিয়েছিল সেগুলো আর তেমনটি নেই। প্রথম বামন বলল, “কে আরাম কেদারায় বসেছিল?” দ্বিতীয় বলল, “কে আমার ছোট্টো প্লেট থেকে খেয়েছে?” তৃতীয় বলল, “কে আমার রুটি ভেঙেছে?” চতুর্থ বলল, “কে আমার তরকারি খেয়েছে?” পঞ্চম বলল, “কে আমার কাঁটা নোংরা করেছে?” ষষ্ঠ বলল, “কে আমার ছুরি দিয়ে খেয়েছে?” সপ্তম বলল, “কে আমার গেলাসে চুমুক দিয়েছে?”
        তার পর প্রথম বামন পিছনে তাকিয়ে দেখে তার বিছানায় টোল পড়েছে। সে চেঁচিয়ে উঠলে, “কেউ আমার বিছানায় শুয়েছিল।” তাই শুনে আর সবাইও নিজের নিজের বিছানার কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “আমার বিছানাতেও কেউ শুয়েছিল! আমার বিছানাতেও কেউ শুয়েছিল।” কিন্তু সপ্তম বামন নিজের বিছানার কাছে গিয়ে সেখানে দেখে পরম তৃপ্তির সঙ্গে ঘুমিয়ে রয়েছে তুষার-কণা। আর সবাইকে সে ডাকল। তারা এসে ঘুমন্ত মেয়েটিকে ভালো করে দেখার জন্যে তুলে ধরল নিজের-নিজের মোমবাতি। মেয়েটির অদ্ভুত রূপ দেখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে তারা চেঁচিয়ে উঠল, “কী আশ্চর্য! এরকম রাপ তো দেখা যায় না।” ভারি খুশি হয়ে উঠল তারা। সবাই স্থির করল—তাকে জাগাবে না, যেখানে শুয়ে সেখানেই সে ঘুমুক। সপ্তম বামন পালা করে তার বন্ধুদের বিছানায় শুলো! ঘণ্টায়-ঘণ্টায় সে করল বিছানা বদল। এইভাবে সকাল হল।
        ভোরে তুষার-কণার ঘুম ভাঙল। বামনদের দেখে সে পেল খুব ভয়। কিন্তু বামনরা ছিল দয়ালু আর তাদের স্বভাবটা মিষ্টি। তারা প্রশ্ন করল, “তোমার নাম কী?”
        মেয়েটি বলল, “আমার নাম তুষার-কণা ৷”
        “এখানে এলে কী করে?” আবার তারা প্রশ্ন করল।
        তুষার-কণা তাদের বলল সব কথা—কী ভাবে সৎমা তাকে মেরে ফেলার আদেশ দিয়েছিল, কীভাবে শিকারী তাকে পালাতে দেয় আর কী, ভাবে সমস্ত দিন ছুটতে-ছুটতে সে পৌছয় তাদের ছোট্টো বাড়িতে।
        তার কথা শুনে বামনরা বলল, “আমাদের হয়ে যদি তুমি ঘরসংসার দেখ, রাঁধোবাড়ো, বিছানা পাত, কাপড় কাচ, সেলাই-ফোড়াই কর, আর সব কিছু যদি পরিষ্কার পরিপাটি করে রাখ—তা হলে আমাদের সঙ্গে থাকতে পাবে, কোনো-কিছুর অভাব হবে না।”
        তুষার-কণা বলল, “তোমরা যা বলবে সব-কিছু খুব খুশি হয়েই করব।”
        এইভাবে মেয়েটি থেকে গেল তাদের সঙ্গে ৷ তাদের হয়ে সে ঘর-সংসার দেখে আর তারা পাহাড়ে যায় সোনা আর তামার খোঁজে। প্রতি সন্ধেয় বাড়ি ফিরলে সে তাদের পরিবেশন করে রাতের খাবার। কিন্তু সারাদিন ছোটো মেয়েটি একা থাকে বলে বিজ্ঞ বামনরা তাকে বলল, “তোমার সৎমা সম্বন্ধে সাবধান। খুব সম্ভব শিগগিরই সে জানতে পারবে তুমি এখানে আছ। তাই কাউকে বাড়ির মধ্যে আসতে দিওনা।
        তুষার-কণার কলজে আর ফুসফুস থেয়েছে বলে মনে করে রানী ভাবল, এবার নিশ্চয়ই পৃথিবীর মধ্যে সে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী। তাই তার আয়নার কাছে গিয়ে সে প্রশ্ন করল:

“দেয়াল-আয়না, দেয়াল-আয়না, না করে কোনো ছল,
সবার সেরা সুন্দরী কোথায় আছে বল?”

আয়না উত্তর দিল:

“সবার সেরা সুন্দরী রানী তুমি এখানে,
পাহাড়ের অন্য পারে
সাত বামনের সংসারে
লক্ষগুণ রূপবতী তুষার-কণা সেখানে ৷”

        আয়নার কথা শুনে রাগে রানী থরথর করে কাঁপতে লাগল। কারণ সে জানত আয়না তাকে সত্যি কথাই বলেছে। সে বুঝল শিকারী তাকে ঠকিয়েছে আর তুষার-কণা আছে বেঁচে। রানীর মাথায় তখন শুধু একমাত্র চিন্তা–কী করে তুষার-কণাকে মেরে ফেলা যায়। কারণ পৃথিবীর মধ্যে সব চেয়ে সুন্দরী হতে না পারলে হিংসেয় জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাবে। শেষটায় তার মাথায় একটা ফন্দি এল। হাতে-মুখে কালিঝুলি মেখে সে এমন ভাবে বুড়ি ফেরিওয়ালার পোশাক পরল যে, তাকে চেনা অসম্ভব। এই ছদ্মবেশে হেঁটে পাহাড় পেরিয়ে সে পৌছল সাত বামনের আস্তানায়। তার পর দরজায় টোকা দিয়ে হাঁক দিল, “আমার সওদাগুলো খুব সস্তা-কেউ কিনবে?”
        জানলার পদার ফাঁক দিয়ে উকি মেরে তুষার-কণা বলল, “শুভদিন, বুড়িমা। কী—কী জিনিস তাছে?”
        রানী বলল, “হরেকরকম সুন্দর-সুন্দর ভালো-ভালো জিনিস, বাছা: লেস, রঙিন জামা, এই দেখ ৷" এই—না বলে সিল্কের লেসের চোখধাঁধানো রঙের একটা জামা সে বার করল।
        তুষার-কণা ভাবল, এই ভালোমানুষ বুড়ি বাড়ির মধ্যে এলে কোনো ক্ষতি নেই।’ তাই দরজা খুলে সে কিনল সুন্দর দুটো লেসের জামা।
        বুড়ি বলল, “বাছা, তোর মুখটা ভারি সরল। এখানে আয়, লেসের জামাটা তোকে ভালো করে পরিয়ে দি।”
        তুষার-কণা কোনোরকম সন্দেহ করল না। লেসের জামাটা পরবার জন্য বুড়ির কাছে গিয়ে সে দাঁড়াল। বুড়ি চটপট এমন আঁট করে লেস জড়িয়ে দিল যে, মেয়েটি ভালো করে নিশ্বেস নিতে পারল না। শেষটায় পড়ে গেল, যেন মরে গেছে। “আর তুই সব চেয়ে সুন্দরী নোস” বলে চট্‌পট রানী চলে গেল।
        সন্ধেয় বামনরা ফিরে তুষার-কণাকে মেঝেয় পড়ে থাকতে দেখে খুব ভয় পেয়ে গেল। সে নড়েও না, কথাও বলে না। দেখে মনে হয় মরে গেছে। তাকে তুলে তারা দেখল তার গায়ে খুব আঁট করে লেস জড়ানো হয়েছে। চটপট তারা লেসের জামাটা কেটে ফেলতে তুষার-কণা নিশ্বেস নিতে শুরু করল তার পর ধীরে-ধীরে ফিরে এলে তার জ্ঞান। সব কথা শুনে বামনেরা বলল, “বুড়ি ফেরিওয়ালি আর কেউ নয়— শয়তান রানী এসেছিল ছদ্মবেশে। ভবিষ্যতে সাবধানে থেকো। আমরা বাইরে গেলে কাউকে বাড়ির মধ্যে আসতে দিয়ো না।”
        বাড়ি ফিরেই শয়তান রানী তার আয়নার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করল:

“দেয়াল-আয়না, দেয়াল-আয়না, না করে কোনো ছল
সবার সেরা সুন্দরী কোথায় আছে বল?”

আগের মতোই আয়না উত্তর দিল।

“সব সেরা সুন্দরী রানী তুমি এখানে
পাহাড়ের অন্য পারে
সাত বামনের সংসারে
লক্ষগুণ রূপবতী তুষার-কণা সেখানে ৷”

        কথাটা শুনতেই দারুণ রাগে মুখ তার ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কারণ সে বুঝল তুষার-কণা বেঁচে আছে। তার পর আপন মনে বলে উঠল, যাক গে, এবার আরো ভালো করে ফন্দি আঁটব।” রানী জানত অনেক তুকতাক আর ডাইনিদের জাদুমন্ত্র। তাই সে বানাল একটা চিরুনি। তার পর আবার এক বুড়ির ছদ্মবেশ ধরে পাহাড় পেরিয়ে গিয়ে সেই বামনদের বাড়ির দরজায় টোকা দিল।
        “কে আমার সওদা কিনবে? খুব সস্তা,” হাঁক দিল সে। তুষার-কণা উঁকি দিয়ে মুখ বার করে বলল, “তুমি যাও। কাউকে আমি ভিতরে আসতে দেবো না।”
        জানলার দিকে সেই বিষাক্ত চিরুনিটা তুলে ধরে বুড়ি বলল, “এই সুন্দর চিরুনিটা একবার দেখো।”  ছেলেমানুষ তুষার-কণার চিরুনিটা খুব পছন্দ হল। সেটা কেনার জন্য বুড়িকে সে আসতে দিল।
        বুড়ি বলল, “আয় বাছা, তোর চুল ভালো করে আঁচড়ে দি।” তুষার-কণার কোনোরকম সন্দেহ হল না। বুড়িকে তার চুল আঁচড়াতে দিল। আর চিরুনিটা তার চুলে ঠেকতে-না-ঠেকতে অজ্ঞান হয়ে সে ঢলে পড়ল মেঝের উপর।
        বিড় বিড় করে বুড়ি বলল, “এইবার তোর রূপের দফা শেষ।” এই-না বলে চটপট সে সরে পড়ল।
        মেয়েটির কপাল ভালো। কারণ তখন সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে বামনদের। মেঝেয় জ্ঞান হারিয়ে তুষার-কণাকে পড়ে থাকতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে তাদের সন্দেহ হল—সৎমা আবার এসেছিল। তার পর তাদের চোখে পড়ল বিষাক্ত চিরুনিটা। চুল থেকে সেটা তারা বার করে নিতেই তুষার-কণার জ্ঞান এল। আর তার পর সে জানাল সব কথা। তার বামন বন্ধুরা আবার তাকে সাবধান করে দিল—তারা না থাকলে কখনো সে যেন দরজা না খোলে।
        বাড়ি পৌছে আয়নার সামনে দাড়িয়ে রানী প্রশ্ন করল:

 “দেয়াল-আয়না, দেয়াল-আয়না, না করে কোনো ছল,
সবার সেরা সুন্দরী কোথায় আছে বল?”

আগের মতোই আয়না উত্তর দিল:

“সব সেরা সুন্দরী রানী তুমি এখানে
পাহাড়ের অন্য পারে
সাত বামনের সংসারে
লক্ষগুণ রাপবতী তুষার-কণা সেখানে ৷”

        আয়নার কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে রানী আবার রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে চেঁচিয়ে উঠল, “তুষার-কণাকে মরতেই হবে। তার জন্যে যদি আমার জীবন যায় তো যাক ৷” তার পর একটা চিলে-কোঠায় গিয়ে সে দরজা বন্ধ করে দিল, যেখানে কেউ যায় না। আর তার পর বানাল একটা আপেল, যেটা কালকূট বিষ। বাইরে থেকে সেটা দেখতে ভারি সুন্দর-লাল টুকটুকে। দেখলেই কামড় বসাতে লোভ হয়। কিন্তু সেটার ছোট্টো একটা টুকরো মুখে গেলেই নিশ্চিত মৃত্যু। আপেল বানিয়ে মুখে রঙ করে সে ধরল চাষী-বউয়ের ছদ্মবেশ। আর তার পর পাহাড় পেরিয়ে পৌছল সেই সাত বামনের বাড়ি। দরজায় টোকা দিতে জানলা দিয়ে মাথা বার করে তুষার-কণা চেঁচিয়ে উঠল:
        কাউকে ভেতরে আসতে দেওয়া বারণ ৷ সাত বামন আমাকে নিষেধ করে দিয়েছে।”
        চাষী-বউ বলল, “দরজা খোলার দরকার নেই। আমি শুধু আমার আপেলগুলো বিলিয়ে দিতে চাই ৷ এই নে, এই আপেলটা তোকে দিলাম।”
        তুষার-কণা বলল, “না, ধন্যবাদ। কিছু নেওয়া আমার বারণ।”
        চাষী-বউ বলল, “বিষের ভয় করছিস? এই দেখ—এটা আমি দু টুকরো করে কাটলাম। তুই ডান-দিকটা খা, আমি খাচ্ছি বাঁ-দিকটা।” আপেলটা এমন নিপুণ ভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে, শুধু সেটার ডান দিকেই ছিল বিষ। টুকটুকে আপেলটা চেখে দেখার লোভ তুষার-কণা সামলাতে পারল না। চাষী বউকে সেটা খেতে দেখে হাত বাড়িয়ে সে নিল বিষাক্ত দিকটা। আর যেই-না তাতে কামড় দেওয়া— সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে মরে পড়ল লুটিয়ে। নিষ্ঠুর চোখে তার দিকে তাকিয়ে হো-হো করে হেসে উঠল রানী। তার পর বলল:
        “তুষারের মতো ধবধবে, রক্তের মতো টুকটুকে গায়ের রঙ আর আবলুস কাঠের মতো কালো চুল! হো-হো-হো! বামনেরা এবার আর তোকে জাগাতে পারবে না।” বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে প্রশ্ন করল:

“দেয়াল-আয়না, দেয়াল-আয়না, না করে কোনো ছল,
সবার সেরা সুন্দরী কোথায় আছে বল?”

শেষটায় আয়না উত্তর দিল: “তুমিই রানী সব সেরা সুন্দরী।”
        রানীর হিংসুটে হাদয় তখন হল শান্ত–মানে হিংসুটে হাদয় যতটা শান্ত হতে পারে, ততটা ৷
        সেই সন্ধেয় বামনরা বাড়ি ফিরে দেখে তাদের তুষার-কণা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, নিশ্বেস পড়ছে না, একেবারে মরে গেছে। তাকে তুলে সর্বত্র তারা বিষের চিহ্ন খুঁজল—তার লেসের জামা ছাড়াল, চুল আঁচড়ে দিল, মুখে জল ছিটল, খানিকটা জল গলার মধ্যে চালল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। তাদের আদরের শিশু মরে গিয়েছিল, সে আর বেঁচে উঠল না। তাকে একটি শবাধারে শুইয়ে তার চার পাশে উবু হয়ে বসে সেই সাতটি বামন কাঁদল তিনদিন ধরে। তার পর তারা চাইল তাকে কবর দিতে। কিন্তু তখনো মেয়েটির চেহারা তাজা আর জীবন্ত, তখনো তার গাল দুটি টুকটুকে লাল। তাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে তারা বলাবলি করল, “এত সুন্দর মেয়েকে কালো মাটির নীচে আমরা কবর দিতে পারব না। স্বচ্ছ কাঁচের কফিন বানিয়ে তার মধ্যে একে আমরা শোয়াব, যাতে চার দিক থেকেই দেখা যায়। কফিনের ডালায় সোনার অক্ষরে আমরা লিখে দেব এর নাম আর মেয়েটি যে রাজকন্যে ছিল সেই কথা। তার পর কফিনটিকে রাখব আমরা পাহাড়ের ওপর আর পালা করে এই কফিন আমরা দেব পাহারা।” এই বলে কফিনটিকে তারা রাখল পাহাড়ের উপর আর পাখির দল এল তুষার-কণার জন্যে কাঁদতে—প্রথমে এক পেচা, তার পর এক দাঁড়কাক আর সবশেষে এক পায়রা।
        অনেক অনেক দিন ধরে তুষার-কণা শুয়ে রইল সেই কফিনে। তার চেহারা এতটুকু বদলাল না। তাকে দেখে মনে হয় সে ঘুমিয়ে রয়েছে। তখনো সে তুষারের মতো ধবধবে, রক্তের মতো টুকটুকে আর তার মাথার চুল আবলুস কাঠের মতো কালো।
        তার পর হল কি, একদিন এক রাজপুত্তুর সেই বনে এসে বামনদের বাড়িতে রাতের জন্য আশ্রয় নিল। পাহাড়ের উপর কফিনের মধ্যে রূপসী তুষার-কণাকে শুয়ে থাকতে সে দেখেছিল আর পড়েছিল সোনার অক্ষরের সেই লেখাগুলো। বামনদের সে বলল, “কফিনটা আমায় দাও। তার জন্যে যত মোহর তোমরা চাও আমি দেব।”
        বামনরা কিন্তু উত্তর দিল, “পৃথিবীর সব সোনা দিলেও কফিনটি আমরা দেব না।”
        রাজপুত্তুর বলল, “তা হলে বিনা-পয়সায় কফিনটি আমায় দাও। তুষার-কণাকে না দেখে আমি বাঁচতে পারব না। তোমাদের কথা দিচ্ছি তাকে আমি খুব যত্নে আর সাবধানে রাখব—পৃথিবীতে তার চেয়ে প্রিয় আমার আর কিছু নেই।” এই আন্তরিক কথাগুলো শুনে রাজপুত্তুরের উপর বামনদের খুব মায়া হল। তাই কাচের কফিনটা তারা তাকে দিল উপহার। ভৃত্যদের কাঁধে চাপিয়ে সেই কফিন রাজপুত্তুর নিয়ে গেল। এখন হল কি, যেতে যেতে ভৃত্যরা এক মেঠো লতায় পড়ল হুমড়ি খেয়ে। আর সেই ঝাঁকানিতে বিষাক্ত আপেলের যে-টুকরোটা তুষারকণা কামড়ে ছিল সেটা বেরিয়ে গেল তার গলা থেকে। তার এক মিনিট পরে সে চোখ মেলে তাকাল। আর তার পর কফিনের ডালা তুলে উঠে বসে চেঁচিয়ে উঠল, “আমি কোথায়?”
        তাই-না দেখে রাজপুত্তুরের আনন্দ আর ধরে না। সে বলল, “তুমি আছ আমার সঙ্গে” আর তার পর জানাল বামনদের কাছ থেকে কফিনটা কী ভাবে পেয়েছিল সে। রাজপুত্তুর বলে চলল, “পৃথিবীতে তোমার চেয়ে বেশি কাউকে আমি ভালোবাসি না। আমার সঙ্গে আমার বাবার প্রাসাদে চল—তোমাকে আমি বিয়ে করব।”
        রাজপুত্তুরের সঙ্গে যেতে তুষার-কণা মোটেই আপত্তি করল না। আর তার পর তাদের বিয়ে হয়ে গেল খুব ধুমধাম করে।
        সেই বিয়েতে নেমন্তন্ন করা হয়েছিল তুষার-কণার শয়তান সৎমাকে। বিয়ে বাড়িতে যাবার নতুন পোশাক আর হীরে-জহরতের গয়নাগাটি পরে সে যখন তার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল:

“দেয়াল-আয়না, দেয়াল-আয়না, না করে কোনো ছল,
সবার সেরা সুন্দরী কোথায় আছে বল?”

আয়না তখন উত্তর দিলঃ

“সব সেরা সুন্দরী রানী তুমি এখানে,
লক্ষগুণ রূপবতী নতুন রানী সেখানে ৷”

        কথাগুলো শুনে শয়তান রানী চীৎকার করে অভিশাপ দিয়ে উঠল। উত্তেজনায় উৎকণ্ঠায় কী যে করবে ভেবে পেল না।
        প্রথমে সে বলল বিয়ে বাড়িতে সে যাবে না। কিন্তু যে তরুণী রানীর রূপ তার চেয়ে লক্ষগুণ বেশি তাকে দেখবার অসম্ভব কৌতুহল সে দমন করতে পারল না। তাই সে গেল, আর সেই রাজপ্রাসাদে পা দিয়েই সে চিনতে পারল তুষার-কণাকে। আতঙ্কে বিস্ময়ে স্থির হয়ে সেখানে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার জন্য লোহার একজোড়া চটি চুল্লিতে গনগনে গরম করা হয়েছিল। সাড়াশি করে সেগুলো আনা হল। আর তার পর সেই গনগনে লাল চটি জোড়া পরিয়ে যতক্ষণ না মরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, ততক্ষণ তাকে বাধ্য করা হল নাচতে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য