সাদা সাপ - জার্মানির রূপকথা

        সে অনেকদিন আগেকার কথা। এক রাজা ছিলেন। পাণ্ডিত্যের জন্য দিকে দিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। কোনো কিছুই অজানা ছিল না তার। মনে হত সব-কিছুর গোপন রহস্যের খবর যেন তার কাছে বাতাসে ভেসে আসে। প্রতিদিন ডিনারের পর টেবিল খালি হলে সবাই যখন চলে যেত রাজার বিশ্বাসী ভূত্য নিয়ে আসত একটা ডিশ। সেটা ঢাকা থাকত বলে তার মধ্যে কী যে আছে সে কথা রাজার সেই বিশ্বাসী ভূত্য বা অন্য কেউই জানতে পারত না। কারণ কারুর সামনে রাজা ঢাকনাটা খুলতেন না বা সেটা থেকে খেতেন না। এইভাবে দিন কাটে। একদিন সেই ভূত্য তার কৌতুহল আর চাপতে পারল না। কী আছে দেখার জন্য ডিশটা সে নিজের ঘরে নিয়ে গেল, তার পর দরজায় হুড়কো দিয়ে ঢাকনি তুলে দেখে সেটায় রয়েছে সাদা একটা সাপ। খেতে কেমন দেখার জন্য সাপটা থেকে একটা টুকরো কেটে সে মুখে ভরল। আর সেটায় তার জিভ ঠেকাবার সঙ্গে সঙ্গে জানলার বাইরে সে শুনতে পেল অদ্ভুত নানা ফিসফিসে স্বর। জানলার কাছে গিয়ে সে দেখে কতকগুলো চড়ুই নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করছে—বলাবলি করছে মাঠে আর বনে কে কী করেছিল। সাপের স্বাদ পাবার সঙ্গে সঙ্গে জীবজন্তর ভাষা বোঝবার ক্ষমতা সে পেয়েছিল।
        আর হল কি, সেদিনই রানীর সব চেয়ে ভালো আংটিটা নিখোঁজহয়ে গেল। সন্দেহ পড়ল সেই বিশ্বাসী ভূত্যের উপর, কারণ সব ঘরেই ছিল তার আনাগোনা। রাজা তাকে ডেকে খুব গালিগালাজ করলেন আর বললেন অপরাধ স্বীকার না করলে পরদিন বিচার করে তাকে শাস্তি দেবেন। বার বার সে বলল আংটিটা চুরি সে করে নি। কিন্তু কোনোই ফল হল না। দারুণ উৎকণ্ঠা আর অস্বস্তি নিয়ে উঠোনে সে পায়চারি করতে লাগল। মাথায় তার একমাত্র চিন্তা কী করে এই বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়?
        তির তির করে ছোটো একটা নদী বয়ে যাচ্ছিল। সেখানে দশটা হাঁস বসে বিশ্রাম করতে করতে ঠোঁট দিয়ে নিজেদের পালক আঁচড়াচ্ছিল আর নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল নানা কথা।
        সেই বিশ্বাসী ভূত্য দাঁড়িয়ে পড়ে তাদের কথাবার্তা শুনতে লাগল। তারা বলাবলি করছিল সেদিন সকালে মাঠে ঘুরে বেড়াবার সময় খুব ভালো ভালো খাবার তারা পেয়েছে। এমন সময় একটা হাঁস বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, “আমার পেটের মধ্যে ভারি একটা জিনিস গজ গজ করছে। রানীর জানলার নীচে একটা আংটি পড়েছিল। ভুট্টাদানা ভেবে ভুল করে সেটা গিলে ফেলেছি।
        সেই বিশ্বাসী ভূত্য সঙ্গে সঙ্গে হাসটার গলা মুঠোয় ধরে রান্নাঘরে, এনে রাঁধুনিকে বলল, “এটাকে কোতল কর—খেয়েদেয়ে দিব্যি গোলগাল হয়েছে।”
        রাঁধুনি বলল, “তা যা বলেছ। দেখেই বোঝা যায় খেতে-দেতে এটা কসুর করে নি—রোস্ট হবার জন্যে অনেকদিনই তৈরি হয়ে গেছে।” হাঁসটাকে কেটে রাঁধুনি সেটার নাড়িতুড়ি পরিষ্কার করার সময় রানীর সেই আংটি বেরিয়ে পড়ল।
        সহজেই প্রমাণ হল সেই বিশ্বাসী ভূত্য নির্দোষ। তার প্রতি যে, অবিচার করা হয়েছিল সেটার প্রতিকারের জন্যে রাজা বললেন, সে যা চায় তাই দেবেন আর কথা দিলেন রাজসভার সব চেয়ে বড়ো পদে তাকে বহাল করবেন।
        সেই বিশ্বাসী ভূত্য কিন্তু কোনোকিছুই নিল না। শুধু বলল তাকে কিছু টাকাকড়ি আর একটা ঘোড়া দিতে—বাইরের পৃথিবীর খানিকটা সে ঘুরে দেখতে চায়। তার প্রার্থনা রাজা মঞ্জুর করতে সে বেরিয়ে পড়ল। আর ঘুরতে-ঘুরতে একদিন পৌছল একটা নদীর তীরে। সেখানে দেখে মাছ ধরার খাঁচায় তিনটে মাছ আটকা পড়ে খাবি খাচ্ছে। যদিও লোক বলে মাছেরা বোবা, তবু তাদের কাতরানি সে শুনতে পেল। শুনল খাবি খেতে খেতে ওরা বলাবলি করছে—খুব কষ্ট পেয়ে আমাদের মরতে হবে। লোকটা ছিল ভারি দয়ালু। তাই ঘোড়া থেকে নেমে মাছ তিনটেকে সে ছেড়ে দিল। আনন্দে তারা কিলবিল করে উঠে জল থেকে মাথা উঁচিয়ে বলল, “তোমার দয়ার কথা আমরা ভুলব না। আমাদের প্রাণ তুমি বঁচিয়েছ। একদিন তার উপযুক্ত প্রতিদান তোমায় দেব।”
        আবার সে ঘোড়ায় চড়ে যেতে শুরু করল। যেতে যেতে হঠাৎ তার মনে হল পায়ের নীচে বালির মধ্যে থেকে কে যেন কথা কইছে। থেমে গিয়ে সে শুনল পিঁপড়ে- রাজাকে নালিশ জানিয়ে বলতে:
        “মানুষ আর তাদের জন্তদের উচিত আমাদের এড়িয়ে যাওয়া। এই বোকা ঘোড়াটার ভারি ভারি খুরের চাপে আমার প্রজাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে।
        সঙ্গে সঙ্গে সেই বিশ্বাসী ভূত্য ঘোড়াটাকে এক পাশে সরিয়ে নিল আর পিঁপড়ে-রাজা চেঁচিয়ে বলল, “এটা আমাদের মনে থাকবে। একদিন আমাদের কৃতজ্ঞতার প্রমাণ তুমি পাবে।”
        যেতে যেতে পথটা পৌছল এক বনে। সেখানে দেখে একটা মা-দাঁড়কাক আর একটা বাবা-দাঁড়কাক বাসা থেকে তাদের বাচ্চাদের ছুড়ে-ছুড়ে ফেলে বলছে:
        “হতভাগার দল, দূর হ। তোদের আর আমরা পেট পুরে খাওয়াতে পারব না। এখন তো দিব্যি বড়োসড় হয়েছিস। নিজেদের খাবার নিজেরাই জোগাড় করতে পারিস।”
        দাঁড়কাকদের ছানাগুলো মাটিতে গড়ে ডানা ঝাপটাতে-বাগটাতে কেঁদে-কেঁদে বলে চলল, “আমরা অসহায় শিশু। আমরা তো উড়তেই পারি না—কী করে নিজেদের খাবার জোগাড় করব? এখানে পড়ে মরা ছাড়া আমাদের আর উপায় কী?”
        তাদের কান্না শুনে সেই বিশ্বাসী ভৃত্য ঘোড়া থেকে নেমে বর্শা দিয়ে ঘোড়াটাকে মেরে সেটার মৃতদেহটি দিল দাঁড়কাকের ছানাদের খেতে। ছানাগুলো লাফিয়ে-লাফিয়ে এসে মনের আনন্দে ঠোকরাতে ঠোকরাতে বলল, “এটা আমরা ভুলব না। একদিন উপযুক্ত প্রতিদান আমরা দেব।” এর পর থেকে তাকে যাত্রা করতে হল পায়ে হেঁটে । অনেক পথ হাঁটার পর সে পৌছল বড়ো একটা শহরে। সেখানকার পথে অনেক লোকের ভীড়, দারুণ হৈচৈ। আর সেই ভীড়ের মধ্যে এক ঘোড়সওয়ার ঘোষণা করে চলেছে : রাজকন্যে বর খুঁজছে, কিন্তু যে বিয়ে করতে চাইবে তাকে করতে হবে খুব কঠিন একটা কাজ। সেটা না পারলে তার আবেদন গ্রাহ্য করা হবে না। অনেকেই বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই কঠিন কাজটা করতে কেউই পারে নি।
        রাজকন্যের রূপ দেখেই সেই বিশ্বাসী ভৃত্যের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। বিপদের কোনোরকম তোয়াক্কা না করে রাজার কাছে গিয়ে বলল, রাজকন্যেকে বিয়ে করতে সে চায়। সঙ্গে সঙ্গে তাকে সমুদ্রের তীরে নিয়ে গিয়ে তার চোখের সামনে সমুদ্রের মধ্যে ফেলা হল সোনার একটা আংটি। তার পর রাজা তাকে আদেশ দিলেন সমুদ্রের তলা থেকে সেটা কুড়িয়ে আনতে। বললেন, “সেটা না নিয়ে যতবার ভেসে উঠবে ততবারই তোমাকে পাঠানো হবে সমুদ্রের মধ্যে—যতক্ষণ-না ঢেউয়ের তলায় ডুবে মরছ।”
        সমুদ্রের তীরে একলা রেথে আসার সময় সুন্দর চেহারার তরুণ সেই বিশ্বাসী ভৃত্যের জন্য সবাইকারই করুণা হতে লাগল। সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে ভাবছে কী করা যায়—এমন সময় দেখে তিনটে মাছ তার দিকে সাঁতরে আসছে—সেই তিনটে মাছ, যাদের প্রাণ সে বাঁচিয়েছিল। মাঝের মাছটার মুখে ছিল একটা ঝিনুক। সমুদ্রের তীরে সেই তরুণের পায়ের কাছে ঝিনুক টা সে রাখল। সেটা কুড়িয়ে নিয়ে সে দেখে—ঝিনুকের মধ্যে রয়েছে সেই সোনার আংটি। মনের আনন্দে সেটা নিয়ে গেল সে রাজার কাছে। ভেবেছিল রাজকন্যের সঙ্গে এবার তার বিয়ে হবে।
কিন্তু রাজকন্যে ছিল ভারি উদ্ধত প্রকৃতির। যখন সে শুনল রাজবংশে তার জন্ম নয় তখন ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে  নিয়ে তাকে দিল দ্বিতীয় একটা কাজ। বাগানে গিয়ে নিজে হাতে ঘাসের উপর দশ বস্তা বালি ছড়িয়ে সে বলল:
        “কাল সকালের আগে বালির সব দানাগুলো লোকটাকে তুলতে হবে। আধখানা দানাও যেন না পড়ে থাকে৷”
        বাগানে বসে সেই তরুণ ভাবতে লাগল এই অসম্ভব কাজটা কী করে করা যায়। কোনো উপায় সে খুঁজে পেল না। মনের দুঃখে ভোরের জন্য সে অপেক্ষা করতে লাগল। জানত তার পর তাকে নিয়ে যাওয়া হবে বধ্যভূমিতে। কিন্তু ভোরের রোদের প্রথম রেখা বাগানে পৌছতেই সে দেখে—তার কাছেই রয়েছে বালিতে ভরা সেই দশটা বস্তা, বালির আধখানা দানাও কোথাও পড়ে নেই। পিঁপড়ে-রাজা হাজারহাজার পিঁপড়ে নিয়ে সমস্ত রাত ধরে কঠিন পরিশ্রম করে বস্তাগুলো ভরে দিয়েছিল।
        রাজকন্যে বাগানে এসে অবাক হয়ে দেখে, যেটাকে তার মনে হয়েছিল অসন্তব—সেই অসম্ভব কাজটাই এই তরুণ করেছে। কিন্তু তখনো তার মনের অহংকার ঘুচল না। সে বলল, “দুটো কঠিন কাজ লোকটা করেছে। কিন্তু তৃতীয় একটা বাকি আছে। জীবনের গাছ থেকে একটা আপেল আমার জন্যে এবার ওকে আনতে হবে।”
        জীবনের গাছ কোথায় যে জন্মায় সে-সম্বন্ধে কোনো ধারণাই সেই তরুণের ছিল না। তবু সেটার খোঁজে সে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু সেটার খোঁজ পাবার কোনো আশাই তার মনে ছিল না। তিন রাজার রাজত্ব পার হবার পর সে পৌছল একটা বনে। সেখানে এক গাছতলায় সে শুয়ে পড়ল ঘুমোবার জন্য। এমন সময় হঠাৎ তার কানে এল ডালপালার মর্মর শব্দ আর সঙ্গে সঙ্গে তার হাতে এসে পড়ল সোনার একটা আপেল। আর সেই তিনটে দাঁড়কাক নেমে এসে তার হাঁটুর উপর বসে বলল, “আমরা দাঁড়কাকের সেই তিনটে ছানা যাদের তুমি উপোস করে মরার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলে। বড়ো হয়ে শুনি তুমি একটা সোনার আপেল খুঁজে বেড়াচ্ছ। সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে আমরা পৌছই। সেখানেই জন্মায় জীবনের গাছ। সেই গাছ থেকে এই সোনার আপেল তোমার জন্যে এনেছি।”
        ভারি খুশি হয়ে জীবনের আপেল নিয়ে সেই তরুণ গেল রাজকন্যের কাছে। রাজকন্যের আর কোনো বলার কথা ছিল না। একসঙ্গে তারা খেল জীবনের সেই আপেল। আর সঙ্গে সঙ্গে ভালবাসায় নম্ন হয়ে এল রাজকন্যের উদ্ধত হাদয়। আর তার পর থেকে সুখে-স্বচ্ছদে বুড়ে বয়স পর্যন্ত রইল তারা বেঁচে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য