নিশি কবরেজ - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

        হারানো একটা পুঁথিতে নিশি কবরেজ একটা ভারী জব্বর নিদান পেয়েছেন। গাঁটের ব্যথার যম। তবে মুশকিল হলো পাঁচনটা তৈরি করতে যে পাঁচরকম জিনিস লাগে তার চারটে যোগাড় করা যায়। কিন্তু পাঁচ নম্বরটাই গোলমেলে। পাঁচ নম্বর জিনিসটা হচ্ছে আধ ছটাক ভূত।
        নিশি কবরেজ রাতে খাওয়ার পর দাওয়ায় দাঁড়িয়ে আচমন করছিলেন। ঘুটঘুট্টি অন্ধকার রাত্রি। চারদিক নিঃঝুম। শীতকালের কুয়াশা আর ঠাণ্ডাটাও জেঁকে পড়েছে। আঁচাতে আঁচাতে নিশি কবরেজ পাঁচনটার কথাই ভাবছিলেন। রাজবল্লভবাবু বিরাট বড়লোক! কিন্তু গাঁটের ব্যথায় শয্যাশায়ী। ব্যথাটা আরাম করতে পারলে রাজবল্লভবাবু হাজার টাকা অবধি দিতে রাজি বলে নিজে মুখে কবুল করেছেন। কিন্তু ভূতটাই সব মাটি করলে। আধ ছটাক ভূত এখন পান কোথায়? হঠাৎ নিশি কবরেজের মনে হলো, উঠোনের ওপাশটায় হাঁসের ঘরের পাশটায় কে যেন দাঁড়িয়ে আছে।
        —কে রে? ওখানে কে?
        কেউ জবাব দিল না।
        নিশি কবরেজ জলের ঘটিটা ঘরে রেখে হ্যারিকেন আর লাঠিগাছাটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। দিনকাল ভাল নয়। চোর ছ্যাঁচড়ের দারুণ উপদ্রব। ঘরে কিছু কাঁচা টাকাও আছে। সোনাদানাও মন্দ নেই।
        বাঁহাতে হ্যারকেনটা তুলে ডানহাতের লাঠিটা নাচাতে নাচাতে কয়েক পা এগোতেই উঠোনের ওপাশ থেকে একটু গলা খাকারির বিনয়ী শব্দ হলো। চোরের তো গলা খাকারি দেওয়ার কথা নয়।
        —কে রে? ওখানে কে?
        ওপাশ থেকে খোনাসুরে জবাব এল। ইয়ে, আমি হলুম গে রামহরি— না, না, থুড়ি, আমি হলুম ধনঞ্জয়।
        নিশি কবরেজ আলোটা ভাল করে তুলে ধরে লোকটাকে দেখার চেষ্টা করতে করতে বললেন, রামহরি বা ধনঞ্জয় নামে এ গাঁয়ে আবার কে আছে? কোথা থেকে আসা হচ্ছে শুনি? দরকারটাই বা কী? রুগী দেখতে হলে রাতে বিশেষ সুবিধা হবে না বলে রাখছি। দিনেরবেলা এস।
        কে যেন বলে উঠল, আজ্ঞে ওসব কিছু নয়।
        নিশি কবরেজ লোকটাকে ঠিক ঠাহর করতে পারছেন না। তাঁর চোখের জোর কিছু কম নয়। হ্যারিকেনেও কালি পড়েনি। তবু ভালমতো লোকটাকে দেখতে পাচ্ছেন না। শুধু বুঝতে পারছেন, হাঁসের ঘরের পাশে খুব কালো একটা লম্বাপান ছায়া ছায়া কী যেন।
        নিশি কবরেজ মনে মনে ভাবলেন, এঃ চোখের বোধহয় বারটা বাজল এতদিনে। না, কাল থেকে চোখে তিন বেলা ত্রিফলার জল দিতে হবে। নিশি কবরেজ বললেন, রুগীর ব্যাপার নয় তো এত রাতে চাও কি? চোরটোর নও তো বাপু?
        —আজ্ঞে না, চোর-ডাকাত হওয়ার উপায়ও নেই কিনা। একটা সমস্যা নিয়ে আপনার কাছে এসেছিলুম আজ্ঞে।
        —সমস্যাটা কী?
        —আজ্ঞে বলে দিতে হবে যে আমি রামহরি, না ধনঞ্জয়।
        নিশি কবরেজ খ্যাঁক করে উঠে বললেন, ইয়ার্কি হচ্ছে? তুমি রামহরি না ধনঞ্জয় তা আমি কি করে বলব? আমি তোমাকে চিনিই না।
        —আজ্ঞে আপনি আমাদের চেনেন—থুড়ি—চিনতেন। আমরা দুজনেই গেলবার ওলাউঠায় মরলুম, মনে নেই? আপনার পাঁচন ফেল মারল।
        নিশি কবরেজ আঁতকে উঠে বললেন, তোমরা? ওরে বাবা!
        —আজ্ঞে ভয় খাবেন না। আমরা ভারি দুর্বল জিনিস।
        নিশি কবরেজ কাঁপতে কাঁপতে বললেন, পাঁচনের দোষ নেই বাবা, সবই কপালের ফের। আমাকে তোমরা মাপ কর।
        —আজ্ঞে সেজন্য আপনাকে আমি দুষতে আসিনি। ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা একটা দেখা দিয়েছে। ভূত হওয়ার পর আমরা সব কেমন যেন ধোঁয়াটে মার্কা হয়ে গেলুম। শরীর-টরীর নেই, তবু কী করে যেন আছি। তা আমরা অর্থাৎ আমি আর ধনঞ্জয়—মানে আমি আর রামহরি—মানে কে যে কোন জন তা বলা মুশকিল—তা আমরা দুজন খুব মাখামাখি করি। খুব বন্ধুত্ব ছিল তো দুজনে। এ ওর শরীরে ঢুকে যাই, ও এর শরীরে মিশে যায়। কিন্তু ওই মাখামাখি করতে গিয়েই কে যে কোন জন তা গুলিয়ে গেছে।
        —বল কী?
        —আজ্ঞে সেই কথাটাই তো বলতে আসা। দুজনে প্রায়ই ঝগড়া লেগে যাচ্ছে। কখনও আমি বলি যে, আমি রামহরি, ও ধনঞ্জয়। কখন ও বলে যে, ও রামহরি আর আমি ধনঞ্জয়।
        নিশি কবরেজ এই শীতেও ঘামছিলেন। হাতের হ্যারিকেন আর লাঠি দুই-ই ঠকাঠক করে কাঁপছে। পেটের ভেতরে গুড়গুড় করছে। মাথা ঘুরছে। কিন্তু হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, গাঁটের ব্যথার পাঁচনটার জন্য আধ ছটাক ভূত লাগবে।
        নিশি কবরেজ এক গাল হাসলেন। তার হাত পায়ের কাঁপুনি বন্ধ হলো। গলা খাকারি দিয়ে বললেন, এ আর বেশি কথা কী? তবে এখন তোমার যেমন বেগুন পোড়ার মতো চেহারা হয়েছে তাতে তো কিছু বোঝবার উপায় নেই। একটু ধৌতি দরকার। বেশি কষ্ট হবে না। একটা পাঁচনের মধ্যে মিনিট দশেক সেদ্দ করে নেব তোমাকে, তাতেই আসল চেহারাটা বেরিয়ে আসবে।
        বটে!—বলে কালো জিনিসটা এগিয়ে এল।
        নিশি কবরেজ আর দেরি করলেন না। নিশুতিরাতেই পাঁচনটা উনুনে বসিয়ে কোমর বেঁধে লেগে গেলেন। ভূতটা সেদ হতে হতে মাঝখানেই মাথা তুলে বলে, হলো?
        নিশি কবরেজ অমনি কাঠের হাতাটা দিয়ে সেটাকে ঠেসে দিতে দিতে বলেন, হচ্ছে হে হচ্ছে। তাড়াহুড়ো করলে কি হয়? তোমার তো আর গায়ে ফোস্কা পড়ছে না হে!
        পাঁচনটা ভোররাতে তৈরি হয়ে গেল। আর আশ্চর্যের বিষয় ভূতের ঝুলকালো রংটাও একটু ফ্যাকাসে মারল। নিশি কবরেজ খুব ভাল করে জিনিসটাকে নিরীক্ষণ করে বললেন, আরে, তুমি তো রামহরি!
        ভূতটা একথায় ভারি খুশি হয়ে বলল, আজ্ঞে বাঁচালেন, ধনঞ্জয়ের কাছে রামহরি গোটা তিনেক টাকা পেত কিনা। ভারি দুশ্চিন্তা ছিল আমার। পেন্নাম হই আজ্ঞে। বলে ভূতটা মিশে গেল।
        নিশি কবরেজ পাঁচনটা বোতলে পুরে নিশ্চিন্ত মনে তামাক খেতে বসলেন, বড্ড ধকল গেছে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য