মৌমাছিদের রানী - জার্মানের রূপকথা

        এক সময় এক রাজার দুই ছেলে অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে বেরিয়ো পড়ল। কিন্তু বদ-সঙ্গে পড়ে বাজে আমোদ-প্রমোদে মশগুল হয়ে বাড়ি ফিরল না। ছোটো ভাইকে তারা বলত গোবুচন্দ্র! সে বেরুল তার বড়ো ভাইদের খোঁজে। ভাইদের সঙ্গে তার দেখা হতে ভাইরা তাকে নিয়ে অনেক ঠাট্টা-তামাশা করল। বলল, তার মতো হাদাগঙ্গারামকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। বলল, তাদের মতো চালাক-চতুর লোক যে পৃথিবীতে কিছুই করতে পারে নি সেখানে তার মতো লোক কোনো পাত্তাই পাবে না।
        যাই হোক, একসঙ্গে যেতে-যেতে তারা পৌছল এক পিঁপড়ের ঢিবিতে। বড়ো ভাইরা বলল ঢিবিটা ভেঙে পিঁপড়েদের ডিম মুখে নিয়ে চার দিকে ছুটোছুটি করতে দেখলে তারা খুব মজা পাবে। কিন্তু তাদের বোকা ছোটো ভাই বলল, “আহা, বেচারা পিঁপড়েদের কেন মিছিমিছি সর্বনাশ করবে? ঢিবিটা আমি ভাঙতে দেবো না।”

        আরো খানিক গিয়ে তারা পৌছল এক হ্রদে। অনেক হাঁস সেখানে সাঁতার কাটছিল। বড়ো ভাইরা বলল সেখান থেকে দুটো হাঁস নিয়ে ঝলসে খাবে। কিন্তু তাদের বোকা ছোটো ভাই বলল, “আহা বেচারাদের মেরো না। ওদের আমি মারতে দেবো না।”
        আরো থানিক গিয়ে একটা গাছে তারা দেখে মধুতে টুসটুসে একটা মৌচাক। গাছটার গুড়ি দিয়ে মধু গড়িয়ে পড়ছিল। বড়ো ভাইরা বলল গাছের তলায় আগুন জ্বেলে ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছিদের তাড়িয়ে মধু নেবে। কিন্তু তাদের বোকা ছোটো ভাই বলল, “আহা, বেচারী; মৌমাছিদের কেন সর্বনাশ করবে? ওদের আমি পোড়াতে দেবো না।”
        শেষটায় তিন ভাই পৌছল এক দুর্গে। সেখানকার আস্তাবলের ঘোড়াগুলো পাথর হয়ে গিয়েছিল ৷ কিন্তু লোকজন কাউকে দেখা গেল না। সব ঘরগুলো ঘোরার পর তারা পৌঁছল একটা দরজায়। সেটায় ছিল তিনটে হুড়কো। দরজাটার মাঝখানের ছোট্টো ফোকর দিয়ে তাকিয়ে তারা দেখে ঘরের মধ্যে একটা টেবিলের সামনে বসে রয়েছে: ছোটোখাটো একটি লোক। চুলগুলো তার পাকা। তাকে বার দুয়েক তারা ডাকল। কিন্তু মনে হল না তাদের কথা সে শুনতে পেয়েছে। তৃতীয়বার ডাকার পর লোকটা উঠে দরজা খুলে তাদের কাছে এল। কোনো কথা না বলে তাদের সে নিয়ে গেল নানা খাবার-ভরা একটা টেবিলের কাছে। খাওয়া-দাওয়ার পর তাদের সে নিয়ে গেল তিনটে আলাদা আলাদা শোবার ঘরে।
        পরদিন সকালে সেই ছোট্টোখাটো বুড়ো মানুষটি এসে হাতছানি দিয়ে বড়ো ভাইকে ডেকে নিয়ে গেল এক পাথরের টেবিলের কাছে। দুর্গকে জাদুমুক্ত করার তিনটে কাজের কথা সেখানে ছিল লেখা! প্রথম কাজটা হল; বনের মাঝখানে জলা-জমিতে রাজকন্যের যে হাজারটা মুক্তো পোঁতা হয়েছিল সেগুলো খুঁজে বার করা। যে খুঁজতে যাবে সন্ধের আগে সে যদি সব মুক্তোগুলো খুঁজে না পায় তা হলে সে হয়ে যাবে পাথর। সারাদিন ধরে বড়ো ভাই মুক্তোগুলো খুঁজল—কিন্তু সন্ধের মধ্যে একশোটার বেশি খুঁজে পেল না। তাই টেবিলের লেখা অনুযায়ী সে হয়ে গেল পাথর। পরদিন মেজোভাই গেল মুক্তোর খোঁজে। কিন্তু বড়ো ভাইয়ের মতোই সব মুক্তো সে খুঁজে পেল না। সে পেল মাত্র দুশোটা। তাই সে-ও হয়ে গেল পাথর।
        শেষটায় মুক্তো খোঁজার পালা এল সেই বোকা ছোটো ভাইয়ের। জলা-জমিতে মুক্তোগুলো খুঁজতে সে শুরু করল। কিন্তু কাজটা করা অসম্ভব দেখে একটা পাথরে বসে সে লাগল কাঁদতে। এমন সময় পাঁচহাজার প্রজা নিয়ে হাজির হল পিঁপড়েদের রাজা, যার জীবন সে বাঁচিয়েছিল। মুহুর্তের মধ্যে ক্ষুদে-ক্ষুদে পিপড়েগুলো সব মুক্তো খুঁজে এনে এক জায়গায় জড় করে রাখল।
        দ্বিতীয় কাজটা হল: হ্রদের তলা থেকে রাজকন্যের শোবার ঘরের চাবি তুলে আনা। ছোটো ভাই জলের কাছে আসতে, যে হাঁসদের প্রাণ সে বাঁচিয়েছিল তারা এল সাঁতরে। আর তার পর জলে ডুব দিয়ে তারা তুলে আনল চাবিটা।
        কিন্তু তৃতীয় কাজটাই ছিল সব চেয়ে কঠিন। সেটা এই: যে তিন রাজ কন্যে ঘুমিয়ে রয়েছে তাদের মধ্যে সব চেয়ে ছোটো আর সব চেয়ে সুন্দরীকে হাত দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। তিন রাজকন্যেকেই দেখতে হুবহু একরকম। তাদের মধ্যে একমাত্র যেটা তফাত সেটা এইঃ ঘুমবার আগে বড়ো রাজকন্য খেয়েছিল এক টুকরো মিছরি, মেজো খেয়েছিল এক চোক সিরাপ আর ছোটো খেয়েছিল এক চামচে মধু।
        কিন্তু ছোটো ভাইকে সাহায্য করতে এল মৌমাছিদের রানী, যাকে সে বাঁচিয়েছিল আগুন থেকে। তিন রাজকন্যের মুখের উপর উড়তে লাগল মৌমাছির রানী। তার পর যে-রাজকন্যে মধু খেয়েছিল তার ঠোঁটের উপর নামল সে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে দেখিয়ে দিল ছোটো ভাই।
        দুর্গ হয়ে গেল জাদুমুক্ত। সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার সবাইকার জাদুর ঘুম ভাঙল। যারা পাথর হয়ে গিয়েছিল তারা আবার ফিরে পেল মানুষের দেহ। যে ছোটো ভাইকে সবাই বলত বোকা তার সঙ্গেই বিয়ে হল সব চেয়ে সুন্দরী ছোটো রাজকন্যের আর তার বাবার মৃত্যুর পর সে-ই হল রাজা। তার বড়ো দুভাই বিয়ে করল অন্য দুই রাজকন্যেকে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য