কালীচরণের ভিটে - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

        কালীচরণ লোকটা একটু খ্যাপা গোছের। কখন যে কী করে বসবে, তার কোনও ঠিক নেই। কখনও সে জাহাজ কিনতে ছোটে, কখনও আদার ব্যবসায় নেমে পড়ে। আবার আদার ব্যবসা ছেড়ে কাঁচকলার কারবারে নেমে পড়তেও তার দ্বিধা হয় না। লোকে বলে, কালীচরণের মাথায় ভূত আছে। সেকথা অবশ্য তার বউও বলে। রাত তিনটের সময় যদি কালীচরণের পোলাও খাওয়ার ইচ্ছে হয় তো, তা সে খাবেই।
        তা, সেই কালীচরণের একবার বাই চাপল, শহরের ধুলো-ধোয়া ছেড়ে দেশের বাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশে গিয়ে বসবাস করবে। শহরের পরিবেশ ক্রমে দূষিত হয়ে যাচ্ছে বলে রোজ খবরের কাগজে লেখা হচ্ছে। কলেরা, ম্যালেরিয়া, জণ্ডিস, যক্ষ্মা—শহরে কী নেই!

        কিন্তু কালীচরণের এই দেশে গিয়ে বসবাসের প্রস্তাবে সবাই শিউরে উঠল। কারণ, যে গ্রামে কালীচরণের আদি পুরুষরা বাস করত, তা একরকম হেজেমজে গেছে। দু-চারঘর নাচার চাষাভুষো বাস করে।
        কালীচরণদের বাড়ি বলতে যা ছিল, তাও ভেঙেচুরে জঙ্গলে ঢেকে ধীরে ধীরে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। সেই বাড়িতে গত পঞ্চাশ বছর কেউ বাস করেনি, সাপখোপ, ইঁদুর-ছুচো, চামচিকে প্যাঁচা ছাড়া।
        কিন্তু কালীচরণের গোঁ সাঙঘাতিক। সে যাবেই।
        তার বউ বলল, “থাকতে হয় তুমি একা থাক গে। আমরা যাব না।”
        বড় ছেলে মাথা নেড়ে বলল, ‘গ্রাম! ও বাবা, গ্রাম খুব বিশ্রী জায়গা।’
        মেয়েও চোখ বড় বড় করে বলে, ‘গ্রামে কি মানুষ থাকে?’
        ছোট ছেলে আর মেয়েও রাজি হল না। রেগেমেগে কালীচরণ একাই তার সুটকেস গুছিয়ে নিয়ে একদিন বেরিয়ে পড়ল। বলে গেল, আজ থেকে আমি তোমাদের পরস্য পর। আর ফিরছি না।’
        কালীচরণ যখন গাঁয়ে পৌছল, তখন দুপুরবেলা। গ্রীষ্মকাল। স্টেশন থেকে রোদ মাথায় করে মাইলটাক হেঁটে সে গ্রামের চৌহদ্দিতে পৌছে গেল। লোকজন প্রায় দেখাই যায় না। চারদিক খাঁ-খাঁ করছে।
        গোঁয়ার কালীচরণ নিজের ভিটের অবস্থা দেখে বুঝল যে, এ ভিটেয় আপাতত বাস করা অসম্ভব। চারদিকে নিশ্ছিদ্র জঙ্গলে বাড়িটা ঘেরা। আর বাড়ি বলতেও বিশেষ কিছু আর খাড়া নেই। তবু হার মানলে তো আর চলবে না।
        একটা জিনিস এখনো বেশ ভালোই আছে। সেটা হল তাদের বাড়ির পুকুরটা। জল বেশ পরিষ্কার টলটলে, বাঁধানো ঘাট ভেঙে গেলেও ব্যবহার করা চলে। কালীচরণ পুকুরে নেমে হাতমুখ ভালো করে ধুয়ে নিল, ঘাড়ে মাথায় জল চাপড়াল। পুকুরের জলে চিড়ে ভিজিয়ে একডেলা গুড় দিয়ে খেল। তারপর পুকুরপাড়ে কদমগাছের তলায় বসল জিরোতে।
        একটু ঢুলুনি এসে গিয়েছিল। হঠাৎ একটা পাখির ডাকে চটকা ভেঙে চাইতেই সে সোজা হয়ে বসল। তাই তো! চারদিক জঙ্গলে ঢাকা হলেও উত্তর দিকটায় জঙ্গলের মধ্যে একটা সুড়ি পথ আছে যেন মনে হয় লোকজনের যাতায়াত আছে। তাদের বাগানে অনেক ফলগাছ ছিল। হয়তো এখনো সেসব গাছে ফল ধরে, আর রাখাল ছেলেটেলে সেইসব ফল পাড়তে ভেতরে যায়। তাই ওই পথ।
        কালীচরণ বাক্স হাতে উঠে পড়ল। তারপর কোলকুঁজো হয়ে বহুকালের পরিত্যক্ত ভিটের মধ্যে গুড়ি মেরে সেঁধোতে লাগল।
        ভেতরে এসে স্তুপাকার ইট আর ভগ্নস্তুপের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে গেল কালীচরণ। তারপর হাঁ করে দেখতে লাগল চারদিকে।
        অবস্থা যাকে বলে গুরুচরণ। একখানা ঘরও আস্ত মনে হচ্ছিল না। এর মধ্যে কোথায় যে রাত্রিবাস করবে সেইটেই হল কথা। কালীচরণের সঙ্গে টর্চ, হ্যারিকেন, লাঠি আছে। ছোট একটা বিছানাও এনেছে সে। রাতটা কাটিয়ে কাল থেকে লোক লাগিয়ে দিলে দিন-সাতেকের মধ্যে জঙ্গল আর আবর্জনা সাফ হয়ে যাবে। রাজমিস্ত্রি ডেকে একটু-আধটু মেরামত করাবে। ভালোই হবে।
        কালীচরণ ঘুরে-ঘুরে বাড়িটা দেখতে লাগল। দক্ষিণ দিকে নীচের তলায় একখানা ঘর এখনও আস্ত আছে বলেই মনে হল কালীচরণের। স্তুপাকার ইট আর আবর্জনার ওপর সাবধানে পা ফেলে কালীচরণ এগিয়ে গেল।
        বেজায় ধুলো, চামচিকের নাদি, আগাছা সত্ত্বেও ঘরখানা আস্ত ঘরই বটে। মাথার ওপর ছাদ আছে, চারদিকে দেওয়াল আছে। জানলা কপাট অবশ্য নেই। একটু সাফসুতরো করে নিলেই থাকা যায়। দরকার একখানা ঝাঁটার।
        তা ঝাঁটাও পাওয়া গেল খুঁজতেই। ঘরের কোণের দিকে পুরোনো একগাছা ঝাঁটা দাঁড় করানো। পাশে একটা কোদাল। তাও বেশ পুরোনো। বোধহয় সেই পঞ্চাশ বছর আগেকার।
        কালীচরণ ঘণ্টাখানেকের মেহনতেই ঘরখানা বেশ সাফ করে ফেলল। গা তেমন ঘামলও না। তারপর ঘরখানার ছিরি দেখে মনে হল, এক বালতি জল হলে হত। কিন্তু বালতি!
        না, কপালটা ভালোই বলতে হবে। ঘর থেকে বেরোতেই ভাঙা সিঁড়ির নীচে চোখ পড়ল তার দু-খানা জংধরা বালতি উপুড় করা রয়েছে। কালীচরণ যেমন অবাক, তেমনি খুশি হল—যখন দেখল, একটা বালতিতে লম্বা দড়ি লাগানো রয়েছে।
        উঠোনের পাতকুয়োটা হেজেমজে যাওয়ার কথা এতদিনে। কিন্তু কপালটা ভালোই কালীচরণের। মজেনি। সে জল তুলে এনে ঘরটা ভালো করে পরিষ্কার করল। তারপর ভাবল, একটা চৌকিটোকি যদি পাওয়া যেত তো তোফা হতো। আর একটা জলের কলসি।
        বলতে নেই, কালীচরণের মনে যা আসছে তাই হয়ে যাচ্ছে আজ। কলসি পাওয়া গেল পাশের ঘরটায়, মুখটা সরা দিয়ে ভালো করে ঢাকা ছিল বলে ভেতরটা এখনো পরিষ্কার। একটু মেজে নিলেই হবে। আর চৌকি নয়, খাটই পাওয়া গেল কোণের দিককার ঘরে। ভাঙা নয় আস্ত খাট। কালীচরণ খাটখানা খুলে আলাদা-আলাদা অংশ বয়ে নিয়ে এসে পেতে ফেলল।
        চমৎকার ব্যবস্থা।
        সন্ধ্যে হয়ে আসতেই কালীচরণ হ্যারিকেন জেলে ফেলল। চিঁড়ে খেয়েই রাতটা কাটাবে ভেবেছিল। কিন্তু সন্ধ্যে হতেই প্রাণটা ভাতের জন্য আকুপাকু করছে। চাল, ডাল, আলু নুন, তেল, সব সঙ্গে আছে। কিন্তু উনুন, কয়লা কাঠ এসব জুটবে কোত্থেকে?
        ভাবতে-ভাবতে কালীচরণ উঠল। সবই যখন জুটেছে, তখন এও বা জুটবে না কেন?
        বাস্তবিকই তাই, ভেতরের বারান্দার শেষ মাথায় যেখানে রান্নাঘর ছিল, সেখানে এখনও একখানা উনুন অক্ষত রয়েছে। ঘরের কোণে কিছু কাঠ, মন দুয়েক কয়লা পড়ে আছে। আর আশ্চর্য, রান্নাঘরে যে বড় কাঠের বাক্স ছিল সেটা তো আছেই, তার মধ্যে কিছু বাসন-কোসনও রয়ে গেছে।
        কালীচরণ দাঁত বের করে হাসল। তারপর গুনগুন করে রামপ্রসাদী গাইতে গাইতে রান্না চড়িয়ে দিল। গরম গরম ডাল ভাত আর আলুসেদ্ধ ভরপেট খেয়ে ঘুমে রাত কাবার করে দিল কালীচরণ।
        সকালবেলা ঘুম ভেঙে বাইরে আসতেই তার মনে হল, বাড়িটা যেন ততটা ভাঙা আর নোংরা লাগছে না। ধ্বংসস্তুপটা যেন খানিক কমে গেছে, নাকি তার চোখের ভুল!
        যাই হোক, কালীচরণ কিছু জঙ্গল পরিষ্কার করল। ভাবল, নিজেই করে ফেলবে, লোক লাগানোর দরকার নেই।
        দুপুরবেলা কালীচরণ পুরোনো বাগান খুঁজে কিছু উচ্ছে, কাঁকরোল, ঝিঙে, পটল আর কুমড়ো পেয়ে গেল। দিব্যি ফলে আছে গাছে। পাকা আমও রয়েছে। সুতরাং দুপুরে কালীচরণ প্রায় ভোজ খেয়ে উঠল আজ। তারপর ঘুম।
        বিকেলে চারদিক ঘুরে দেখে সে খুশিই হল। অনেকটা জঙ্গল সে নিজে সাফ করে ফেলেছিল। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে, আরও অনেক বেশি আপনা থেকেই সাফ হয়ে গেছে। আবর্জনার স্তুপ প্রায় নেই বললেই হয়। আশ্চর্যের কথা, বাড়িতে আরও কয়েকটা আস্ত ঘর খুঁজে পাওয়া গেল। সেসব ঘরের জানলা দরজাও অটুট। সুতরাং কালীচরণ খুব খুশি। এইরকমই চাই।
        তবে সবটা এইরকমই আপনা-আপনি হয়ে উঠলে ভারি লজ্জার কথা। তাই পরদিন কালীচরণ বাজার থেকে গোরুর গাড়িতে করে কিছু চুনসুরকি, ইট আর কাঠ নিয়ে এল। যন্ত্রপাতি বাড়িতেই পেয়ে গেছে সে, টুকটাক করে বাড়িটা সারাতে শুরু করল।
        মজা হল, বেশি কিছু তাকে করতে হল না। সে যদি খানিকটা দেয়াল গাঁথে আরও খানিকটা আপনি গাঁথা হয়ে যায়। সে এক দেয়ালের কলি ফেরালে, আরও চারটে দেয়ালের কলি আপনা থেকেই ফেরানো হয়ে যায়।
        সুতরাং দেখ-না-দেখ কালীচরণের আদি ভিটের ওপর বাগানওয়ালা পুরোনো বাড়িটা আবার দিব্যি হেসে উঠল। যে দেখে, সে-ই অবাক হয়। কিন্তু মুশকিল হল, এত বড় বাড়িতে কালীচরণ একা। সারাদিন কথা বলার লোক নেই।
        কালীচরণ তাই গ্রাম থেকে গরিব বুড়ো একজন মানুষকে চাকর রাখল। বাগান দেখবে, জল তুলবে, কাপড় কাঁচবে, রান্না করবে। কালীচরণও কথা কইতে পেয়ে বাঁচবে।
        লোকটা দিন-দুই পর একদিন রাতে ভয় খেয়ে ভীষণ চেঁচামেচি করতে লাগল। সে নাকি ভূত দেখেছে।
        কালীচরণ খুব হাসল কাণ্ড দেখে। বলল, দূর বোকা, কোথায় ভূত? কিন্তু লোকটা পরদিন সকালেই বিদেয় হয়ে গেল। বলল, ‘সারাদিন জল খেয়ে থাকলেও এ বাড়িতে আর নয়।’
        কালীচরণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মাত্র। কিছুদিন আবার একা। কিন্তু কাহাতক ভালো লাগে। অগত্য কালীচরণ একদিন শহরে গিয়ে নিজের বউকে বলল, ‘একবার চলো দেখে আসবে। সে বাড়ি দেখলে তোমার আর আসতে ইচ্ছে হবে না।’
        কালীচরণের বউয়ের কৌতুহল হল। বলল, ঠিক আছে চলো। একবার নিজের চোখে দেখে আসি কোন তাজমহল বানিয়েছ।’
        গাঁয়ে এসে বাড়ির শ্ৰীছাদ দেখে কিন্তু বউ ভারি খুশি। ছেলেমেয়েদেরও আনন্দ ধরে না।
        কিন্তু পয়লা রাত্তিরেই বিপত্তি বাঁধল। রাত বারটায় বড় মেয়ে ভূত দেখে চেঁচাল। রাত একটায় ছোট মেয়ে ভূতের দেখা পেয়ে মূৰ্ছা গেল।
        রাত দুটোয় দুই ছেলে কেঁদে উঠল ভূত দেখে। রাত তিনটেয় কালীচরণের বউয়ের দাঁতকপাটি লাগল ভূত দেখে।
        পরদিন সকালেই সব ফরসা। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে শহরে রওনা হওয়ার আগে বউ বলে গেল, আর কখনও এ বাড়ির ছায়া মাড়াচ্ছি না।’
        কালীচরণ আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর আপনমনে বলল, ‘কোথায় যে ভূত, কীসের যে ভূত, সেটাই তো বুঝতে পারছি না।’
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য