জলের দেবতা এবং ভূত - সমরেশ মজুমদার

    এক গ্রামের প্রান্তে একটি চাষী পরিবার বাস করত। তারা খুব গরিব। নিজেদের কোনো জমিজমা নেই। অন্য মানুষের জমি চাষ করে যা পায় তাই দিয়ে কোনোমতে আধপেটা খেয়ে থাকে। গ্রামের পাশেই বড় নদী। কিন্তু ওই পরিবারের কেউ নদীর কাছে যেত না। কারণ তাদের এক পূর্বপুরুষ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে ডুবে মারা গিয়েছিল। তারপর থেকেই আদেশ জারি হয়েছিল কেউ যেন ভুলেও নদীর কাছে না যায়।
    চাষীর দুই ছেলে। দুজনেই বাবাকে খুব মান্য করে। বাবার সঙ্গে পরিশ্রম করে। কিন্তু একটা ব্যাপারে দুজনের খুব অমিল। বড় ছেলে রোজ রাত্রে খুব ভালো ভালো স্বপ্ন দেখে। ভালো খাবার, ভালো দৃশ্য, সুন্দর ফুল এবং দেবদেবীরা তার স্বপ্নে দেখা দেন। আর ছোট ছেলে স্বপ্ন দেখলেই যাবতীয় খারাপ দেখতে পায়। সে ইতিমধ্যে তার স্বপ্নে গেছে ভূত, শাকচুন্নি, স্কন্ধকাটা ভূত, ব্রহ্মদৈত্য দেখে ফেলেছে। দেখে দেখে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় আর মনে ভয় আসে না।
    সকালবেলায় চাষী কাজ খুঁজতে যাওয়ার সময় বড় ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে, কাল রাত্রে তুই কি স্বপ্ন দেখলি বড় খোকা?
    বড় ছেলে বলল, পবনপুত্র বীর হনুমানকে দেখলাম। তিনি বললেন, বাবা তোমার স্বপ্নে সব দেবতা আসেন, শুধু বরুণদেব ছাড়া। কেন জানো? আমি বললাম, না তো। তখন বীর হনুমান বললেন, তুমি নদীর কাছে থেকেও কখনও নদী দ্যাখোনি, তাই।
    চাষী বলল, স্বপ্নে ওরকম অনেক কিছু শোনা যায় কিন্তু শুনতে নেই। তা হ্যাঁরে ছোট খোকা, কাল তুই কোন ভূত দেখলি?
    ছোট ছেলে বিষগ্ন মুখে বলল, কাল কোনো ভূত-পেত্নিকে দেখতে পাইনি বাবা। তারা নাকি মেছোভূতের বাড়িতে গিয়েছিল।
    ‘একথা তোকে কে বলল?’ চাষী জিজ্ঞাসা করল।
    একটা কানা প্যাঁচা স্বপ্নে উড়ে এল। সে-ই বলল। মেছোভূতের বাড়িতে নাকি সবার নেমন্তন্ন ছিল। নদীর বড় বড় মাছ ধরেছিল জমিদারমশাই, সব মেছোভূত নিয়ে নিয়েছে ওদের খাওয়াবে বলে। কানা প্যাঁচা আমাকে ঠাট্টা করল নেমস্তন্ন পাইনি বলে।
    চাষী বলল, স্বপ্নে অমন কথা অনেকেই বলে কিন্তু কান দিবি না।
    সেদিন কাজ পেল না ওরা। বৃষ্টি না হলে কাজ নেই। কাজ না হলে তো খাবার জুটবে না। খরা শুরু হয়ে গেল। চাষী আর তার ছেলেরা শাকপাতা জঙ্গল থেকে তুলে নিয়ে এসে সেদ্ধ করে খেতে লাগল। একসময় খরার দাপটে গাছের পাতাও শুকিয়ে গেল। চাষীর রাত্রে ঘুম হত না কিন্তু তার ছেলেরা বেশ ঘুমাত। সেদিন সকাল হতে চাষী দেখল বড় ছেলে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। চাষী তাকে কারণ জিজ্ঞাসা করতে সে বলল, কাল রাত্রে স্বপ্নে কোনো দেবতাকে দেখতে পাইনি। কোনো ভালো ফুল বা ভালো দৃশ্য চোখে পড়েনি। শুধু মালো পাড়ার নিবারণকাকা এক ঝুড়ি মাছ নিয়ে চলে গিয়েছিল বিক্রি করতে।
    কথাটা শুনে ছোট ছেলেও বলল, সে কাল রাত্রে নিবারণকাকাকে দেখেছে। কোনো ভূত-পেত্নিদানব নয়। শুধু নিবারণকাক ঝুড়ি থেকে মাছ তুলে কপ কপ করে কাঁচা খেয়ে নিচ্ছিল।
    এসব শোনার পর চাষী ঠিক করল, আর নয়, এখান থেকে ছেলেদের নিয়ে দূরে কোথাও চলে যেতে হবে। কাজের অভাবে খাবার জুটছে না, তার ওপর ছেলেরা যদি শুধু মাছের স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করে তাহলে হয়তো একদিন নদীতে মাছ ধরতে যেতে চাইবে।
    অতএব পোটলা-পুটলি নিয়ে ওরা রওনা হল। গ্রাম ছাড়িয়ে প্রান্তর, প্রান্তর ছাড়িয়ে বন, যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। শেষে খিদে-তেষ্টায় ক্লান্ত হয়ে ওরা একটা বটগাছের নীচে বসে পড়ল। ঠিক তখনই একজন সাধুপুরুষ সেখানে এসে দাঁড়ালেন। তাকে দেখে চাষী প্রণাম করে বলল, বাবা, আমরা কাজ করে পেট ভরাতে চাই। আপনি আমাদের পথ বলে দিন। কোথায় গেলে কাজ পাব?
    সাধুপুরুষ বললে, বলতে পারি কিন্তু একটা শর্তে। আমি দুটো প্রশ্ন করব, যদি তার ঠিকঠাক জবাব দিতে পার তাহলেই বলব।
    চাষী বলল, আমি মুখ্যু মানুষ, আমি কি করে উত্তর দেব?
    সাধুপুরুষ বললেন, থাক তাহলে।
    তখন বড় ছেলে বলল, বাবা, আমি যদি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি?
    সাধুপুরুষ বললেন, বেশ তো। প্রথম প্রশ্ন হল, কোন ফুল ঝরে না? দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, মৃত্যুকে কে ভয় করে না?
    বড় ছেলে একটু ভাবল। তারপর বলল, উত্তর যদি ভুল হয়?
    ভুল হলে কিছুই পাবে না। তোমরা দুজন দূরে গিয়ে দাঁড়াও। আমি ওর দেওয়া উত্তর তোমাদের সামনে শুনব না।
    চাষী আর তার ছোট ছেলে অনেকটা দূরত্বে গিয়ে দাঁড়ালে বড় ছেলে বলল, প্রথম প্রশ্নের উত্তর আমি জানি। রোজ রাত্রে আমি সুন্দর ফুল দেখি। সেটা কখনও শুকোয় না, ঝরে যায় না। কারণ সে ফুটেছিল স্বর্গের নন্দনকাননে।
    সাধুপুরুষ মাথা নাড়লেন, ঠিক ঠিক। তাই ওর বুকে মধু নেই, গন্ধ নেই। এবার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দাও।
    বড় ছেলে বলল, তার উত্তর আমার জানা নেই প্রভু।
    সাধুপুরুষ বড় ছেলেকে চাষীর কাছে পাঠিয়ে দিয়ে ছোট ছেলেকে কাছে ডাকলেন, তুমি কি প্রশ্ন দুটোর জবাব দিতে পারবে?
    মাথা চুলকে ছোট ছেলে বলল, প্রথম প্রশ্নের জবাব আমি জানি না। তবে দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব হচ্ছে, মৃত্যুকে ভয় পায় না দৈত্য-দানব ভূত-পেত্নি। রোজ রাত্রে তাদের আমি দেখি তো! আর মরার ভয় নেই বলে ওরা ভয় পায় না।
    বাঃ, ঠিক বলেছ।
    এবার চাষীকে ডেকে সাধুপুরুষ বললেন, তোমার দুই ছেলে একটা করে উত্তর ঠিক বলেছে। দুজনের উত্তর জুড়লে দুটো উত্তরই সঠিক। কিন্তু সেটা তো কথা ছিল না। তবু অর্ধেকটা দিয়েছে বলে তোমাকে একটা উপায় বলে দিচ্ছি। তোমরা এখানে মাটি খোঁড়। খুঁড়তে খুঁড়তে বিরাট দীঘি তৈরি কর। সেই দীঘি তোমাদের খাওয়াবে।
    উপদেশ মতো দীঘি তৈরি হল। দীঘিতে প্রচুর মাছ হল। সেই মাছ খেয়ে ওরা দিব্যি ছিল। কিন্তু এক রাত্রে বরুণদেব চলে এলেন বড় ছেলের স্বপ্নে। এসে খুব রাগ করলেন তাকে পুজো না করে দীঘি কাটা হয়েছে বলে। আবার ছোট ছেলে স্বপ্নে দেখল মেছোভূত তিড়িং বিড়িং নাচছে। তাকে বাদ দিয়ে ওরা মাছ খাচ্ছে বলে।
    সকালে সব শুনে চাষী দুটাে বেদি তৈরি করল দীঘির ধারে। একটার ওপর বরুণদেবের মূর্তি এনে বসাল, অন্যটির ওপর মেছোভূতের মূর্তি। একেবারে মুখোমুখি।
    মুশকিল হল, সেই রাত থেকে চাষীর ছেলে দুটোর মন খুব খারাপ, তারা আর স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছে না।


আশ্বিন ১৪০৭
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য