হানসেল আর গ্রেথেল - জার্মানের রূপকথা

        প্রকাণ্ড একটা বনের কাছে এক সময় থাকত গরিব এক কাঠুরে, তার বউ আর তার দুই ছেলেমেয়ে। ছেলেটির নাম হান্‌সেল আর ছোট্টো মেয়েটির নাম গ্রেথেল। খাবার-দাবার খুব কমই তাদের কপালে জুটত। সেবার, দেশে যখন দুর্ভিক্ষ, প্রতিদিন রুটিও তারা জোগাড় করতে পারত না। সে-রাতে বিছানায় শুয়ে কাঠুরের চোখে ঘুম নেই। নানা দুশ্চিন্তা তার মনে। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে করুণ স্বরে বউকে সে বলল, "আমাদের বরাতে কী আছে বল দেখি? আমাদেরই খাবার নেই, বাচ্ছা দুটোকে কী করে খাওয়াই?” তার বউ বলল, “কী করতে হবে বলি-শোনো। কাল খুব ভোরে ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমরা বনে যাব ৷ গহন বনের মধ্যে তাদের জন্যে আগুন জালিয়ে, এক টুকরো করে রুটি দিয়ে, সেখানে তাদের রেখে আমরা যাব আমাদের কাজে। তারা কিছুতেই বাড়ি ফেরার পথ খুঁজে পাবে না। আমাদের ঘাড় থেকে বোঝা নামবে।
        কাঠুরে বলল, “না বউ, ওটা আমি পারব না। লোকে প্রাণ ধরে কি নিজের ছেলেমেয়েকে একলা বনে ছেড়ে দিতে পারে? সেখানে তো বুনো জন্তু-জানোয়ার তাদের খেয়ে ফেলবে।”
        তার বউ বলল, “তুমি ভারি বোকা। আমাদের চারজনকেই তা হলে উপোস করে মরতে হবে দেখছি। আমাদের কফিনের কাঠগুলো চাঁচতে-ছুলতে শুরু করে দাও।” ক্ৰমাগত সে ঘ্যানঘ্যান করে চলল। শেষটায় নিমরাজি হল কাঠুরে।
        ক্ষিদেয় ছেলেমেয়েদের পেট চুইচুই করছিল। তাই তারাও ঘুমোতে পারে নি। সৎমার কথাগুলো তাদের কানে এল। আমুরি-ঝুমুরি হয়ে কাঁদতে-কাঁদতে হানসেলকে গ্রেথেল বলল, “আমাদের আর কোনো আশা নেই।”
        হানসেল বলল, “কাঁদিস না গ্রেথেল। আমি দেখছি যাতে ওদের মতলবটা ভেস্তে যায়।” বুড়ো-বুড়ি ঘুমিয়ে পড়লে নিজের ছোট্টো কোটটা গায়ে চড়িয়ে পা টিপে টিপে খিড়কির দরজা দিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। ঝকঝকে জ্যোৎস্নায় বাড়ির সামনের সাদা নুড়িগুলো নতুন টাকা-পয়সার মতো চকচক করছিল। নিচু হয়ে হানসেল সেই নুড়ি তার কোটের পকেটগুলোয় ভরল। তার পর ফিরে এসে গ্রেথেলকে বলল, “দুর্ভাবনা করিস না, বোনটি। শান্ত হয়ে ঘুমো। ভগবান আমাদের সহায় হবেন।” কথাগুলো বলে সেও শুয়ে পড়ল তার ছোট্টো বিছানায়।
        পরদিন ভোরের আলো ফুটতে-না-ফুটতেই ছেলেমেয়েদের ঘুম থেকে তুলে সৎমা তাদের বলল সূর্য ওঠার আগে পোশাক পরে নিতে। বলল, “কাঠকুটো কুড়তে আমাদের সঙ্গে বনে চলো।” তাদের এক টুকরো করে রুটি দিয়ে বলল, দুপুরের আগে সেটা যেন তারা না খায়. কারণ আর কোনো খাবার তারা পাবে না। রুটির টুকরো দুটো গ্রেথেল ভরল তার এপ্রনের মধ্যে। . কারণ হানসেলের পকেটগুলো ছিল নুড়িতে বোঝাই। অল্পক্ষণের মধ্যে তারা যাত্রা করল বনের দিকে। খানিক যেতে-না-যেতে হানসেল দাঁড়িয়ে পড়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল তাদের বাড়ির দিকে। এইভাবে কয়েক পা সে যায় আর থেমে গিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে বাড়িটার দিকে তাকায়। শেষটায় তার বাবা বিরক্ত হয়ে বলল, “হানসেল! বার বার থেমে-থেমে দেখছিস্ কী? পা চালিয়ে চল।”
        হানসেল বলল, “বাবা, আমার সাদা বেড়ালছানাটাকে দেখছি। ছাতে বসে থাবা নাড়িয়ে সে আমাকে বিদায় জানাচ্ছে।”
        সৎমা বলল, “দুর মুখ্যু। ওটা তোর বেড়ালছানা নয়—সকালের রোদ চিমনির ওপর চকচক করছে।” আসলে হানসেল কিন্তু বেড়ালছানাটাকে দেখছিল না—পকেটের নুড়িগুলো ছড়িয়ে যাচ্ছিল।
        বনের মাঝখানে পৌছে তাদের বাবা বলল, “এখানে কাঠকুটো জড়ো কর। আমি আগুন জ্বালিয়ে দেব। তা হলে ঠাণ্ডায় জমে যাবি না।”
        হানসেল আর গ্রেথেল বেশ কিছু কাঠকুটো জোগাড় করে আনল। আগুনের শিখা লকলক করে জ্বলে ওঠার পর সৎমা তাদের বলল, “বাছারা, এখানে শুয়ে বিশ্রাম নে। আমরা আর খানিক গিয়ে কাঠ কেটে আনি। কাঠ কাটা শেষ হলে এখান থেকে তোদের নিয়ে যাব।”
        হানসেল আর গ্রেথেল আগুনের পাশে বসল। দুপুরের খাবার সময় হলে সেই দু টুকরো রুটি বার করে তারা খেল। গাছের উপর কুড়লের কোপ তারা শুনতে পাচ্ছিল। তাই ভাবল বাবা তাদের কাছাকাছি কোথাও রয়েছে। আসলে কিন্তু শব্দটা কুড়লের নয়। সেটা একটা গাছের ডালের শব্দ। কাঠুরে সেটা বেঁধে দিয়েছিল মরা একটা গাছের সঙ্গে। বাতাসের ধাক্কায় সেটা এদিক-ওদিক দুলে গাছটায়। আছড়ে-আছড়ে পড়ছিল। তাই শোনাচ্ছিল যেন কাঠ কাটার শব্দ। , বহুক্ষণ তারা বসে রইল। শেষটায় ক্লান্ত হয়ে পড়ল ঘুমিয়ে। যখন তাদের ঘুম ভাঙল তখন রাত হয়ে গেছে। চারি দিকে ঘুটফুটে অন্ধকার। গ্রেথেল কাঁদতে শুরু করে বলল, “আমরা কখনোই এইবন থেকে বেরুবার পথ খুঁজে পাব না।”
        হানসেল তাকে সাস্তুনা দিয়ে বলল, “একটু সবুর কর। এক্ষুনি চাঁদ উঠবে। চাঁদ উঠলেই পথ চিনতে পারব।”
        খানিক পরেই আকাশে উঠল মস্ত বড়ো গোল একটা চাঁদ। হানসেল তার ছোট্টো বোনটির হাত ধরে নুড়ি ছড়ানো পথ দিয়ে ফিরে চলল। নুড়িগুলোকে সেই চাঁদের আলোয় দেখাচ্ছিল যেন রুপোর নতুন টাকা। সারা রাত হেঁটে ভোরবেলায় তারা পৌছল তাদের বাড়িতে। তারা দরজায় টোকা দেবার পর দরজা খুলে সৎমা তাদের দেখে বলল, “বনের মধ্যে অতক্ষণ ঘুমিয়েছিলি কেন? আমরা ভাবছিলাম—তোরা বুঝি আর ফিরবিই না।”
        ছেলেমেয়েদের ফিরতে দেখে তাদের কাঠুরে-বাবার আনন্দ আর ধরে না। বনের মধ্যে তাদের ছেড়ে আসায় বুক তার দুঃখে-শোকে ভেঙে পড়েছিল। কিছুকাল পরে দুর্ভিক্ষের হাহাকার আবার ছড়িয়ে পড়ল। রাতের বেলা ছেলেমেয়েরা আবার তাদের সৎমাকে বলতে শুনল, “ওগো শুনছ? খাবার বলতে কিছুই তো আর নেই—মাত্র আধখানা রুটি। আর সেটা শেষ হলে আমরা তো কাঙালের চেয়েও কাঙাল!
        “ছেলেমেয়ে-দুটোকে যেমন করেই হোক দূর করতে হবে। এবার তাদের নিয়ে যাব বনের এমন একটা গভীর জায়গায়, যেখান থেকে ফেরবার পথ তারা খুঁজে পাবে না। আমাদের প্রাণে বাঁচতে হলে এটা ছাড়া অন্য পথ নেই।”
        দুঃখে শোকে কাঠুরের মন তখন ভেঙে যাচ্ছে। সে ভাবছিল নিজেদের শেষ খুদ-কুড়ো ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ভাগ করে খাবার কথা। কিন্তু তার কোনো কথাই সেই সৎমা কানে তুলল না। ক্ৰমাগত দাঁত খিঁচিয়ে গালি-গালাজ করে চলল সে। কাঠুরে প্রথমবার তার বউয়ের কথা শুনেছিল। তাই দ্বিতীয়বারও তার কথা না শুনে পারল না। ছেলেমেয়েরা জেগেই ছিল। তাই তাদের সৎমার কথাগুলো সব শুনল। তাদের বাবা আর সৎমা ঘুমিয়ে পড়ার পর আগের বারের মতো বিছানা থেকে উঠে পা টিপেটিপে হানসেল আবার গেল নুড়ি কুড়োতে। কিন্তু সৎমা দরজায় কুলুপ এঁটে দিয়েছিল। তাই সে বাড়ির বাইরে যেতে পারল না। তবু তার বোনকে সাত্ত্বনা দিয়ে বলল, “কাঁদিস না গ্রেথেল। ঘুমিয়ে পড়। ভগবান আমাদের সহায় হবেন।”
        খুব ভোরে সৎমা তাদের ঘুম ভাঙাল। প্রত্যেককে দিল এক-এক টুকরো রুটি। কিন্তু আগের চেয়ে এবারের রুটির টুকরোগুলো অনেক ছোটো।
        বনে যাবার পথে হানসেল তার রুটি পকেটের মধ্যে ভেঙে ফেলল আর মাঝে মাঝে থেমে রুটির টুকরোগুলো লাগল মাটিতে ছড়াতে।
        তাদের বাবা বলল, “হানসেল, পেছনে কেন ঘুরঘুর করছিস আর এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিস?”
        “বাবা, আমার পোষা ছোট্টো বন-পায়রাটাকে দেখছি। ছাতে বসে বক-বকম করে সে আমায় বিদায় জানাচ্ছে।”
        সৎমা মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠল, “হাঁদা কোথাকার। বনপায়রা হতে যাবে কেন? সকালের রোদে চিমনির ওপরটা চকচক করছে।”
        তার কথায় কান না দিয়ে হানসেল চুপি চুপি রুটির টুকরো পথে ছড়িয়ে চলল।
        সৎমা তাদের বনের এমন গভীরে নিয়ে গেল যেখানে আগে কখন তারা যায় নি। আবার বেশ বড়ো গোছের আগুন জ্বালানো হলে পর সৎমা তাদের বলল, “তোরা বাছা এখানে থাক। ক্লান্ত হলে খানিক ঘুমিয়ে নিস। কাঠ কাটার জন্যে আমরা এগুচ্ছি। কাজ সারা হলে ...তোদের নিতে আসব।”
        দুপুরের খাবার সময় গ্রেথেল তার রুটির অর্ধেকটা হানসেলকে দিলে, কারণ আসার সময় হানসেল তার রুটির সবটাই টুকরো-টুকরো করে সারা পথে ছড়িয়েছিল। খাওয়া সেরে তারা ঘুমিয়ে পড়ল। সন্ধে পার হয়ে গেল। কিন্তু কেউই তাদের নিতে এল না। যখন তাদের ঘুম ভাঙল তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। ছোটো বোনটিকে সান্তুনা দিয়ে হানসেল বলল, “সবুর কর। একটু পরেই চাঁদ উঠবে। রুটির যে টুকরোগুলো ছড়িয়েছি সেগুলো তখন দেখে-দেখে পথ চিনে বাড়ি ফিরব।”
        কিন্তু চাঁদ ওঠার পর রুটির টুকরোগুলো তারা দেখতে পেল না। কারণ মাঠ-ঘাট-বনের হাজার পাখি সেগুলো খেয়ে ফেলেছিল।
        হান্‌সেল বলল, “ভাবিস না গ্রেথেল। পথ আমরা ঠিকই খুঁজে পাব।” সারা রাত আর পরের সারাটা দিন তারা হাঁটল। কিন্তু তারা না খুজে পেল পথ, না পারল বন থেকে বেরুতে। বেরি-ফল ছাড়া অন্য কোনো খাবার তাদের কপালে জুটল না। ক্ষিদেয় তাদের আধমরা অবস্থা। ক্লান্তিতে পা আর চলতে চায় না। তাই তারা একটা গাছতলায় শুয়ে পড়ল ঘুমিয়ে।
        বাড়ি ছেড়ে বেরুবার পর তৃতীয় দিন সকাল। তখনো তারা গভীর বনের মধ্যে পথ হারিয়ে ঘুরে-ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা বুঝল, কেউ সাহায্য করতে না এলে তাদের মরতে হবে। এমন সময় তারা দেখে ধবধবে সাদা সুন্দর একটা পাখি গাছের একটা ডালে বসে ভারি সুন্দর গান গেয়ে চলেছে। সেই গান শোনার জন্য তারা থামল। গান গাওয়া শেষ হলে ডানা মেলে পাখিটা উড়ল আর তারা চলল সেটার পিছন পিছন। উড়তে-উড়তে পাখিটা এসে বসল ছোটো একটা বাড়ির ছাতে। কাছে গিয়ে তারা দেখে রুটি দিয়ে সেই বাড়িটি বানানো, খড়ের বদলে কেক দিয়ে চালটা ছাওয়া আর জানালাগুলো তৈরি মিছরি দিয়ে। হানসেল বলল, “আয় গ্রেথেল, অনেকদিন পর পেট ভরে খাই। বাড়ির চালটায় আমি কামড় বসাচ্ছি। জানলাগুলো দিয়ে তুই শুরু কর—খুব মিষ্টি লাগবে।”
        উপরে উঠে কেমন স্বাদ দেখবার জন্য হানসেল ছাতের একটা টুকরো ভেঙে মুখে দিল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গ্রেথেল লাগল কুটুকুটু করে সেটায় কামড় দিতে।
        এমন সময় বাড়িটার ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল:

“কুটুর। কুটুর। কুটুর।
কে রে আমার বাড়ি ঠোকরায়?”

ছেলেমেয়েরা উত্তর দিল:
  
“স্বৰ্গ থেকে আসা—
বাতাস। বাতাস। বাতাস।"


        তার পর কোনোরকম ভ্রাক্ষেপ না করে তারা খেয়ে চলল। হানসেল দেখল ছাতটার স্বাদ চমৎকার। সে আর-একটা বড়োসড়ো টুকরো ভেঙে নিল। জানালার একটা শার্শি নামিয়ে বসে-বসে তারিয়ে তারিয়ে খেতে শুরু করল গ্রেথেল ৷ এমন সময় হঠাৎ বাড়িটার দরজা খুলে লাঠিতে ভর দিয়ে নড়বড় করতে-করতে বেরিয়ে এল খুনখুনে এক বুড়ি। তাকে দেখে দারুণ ভয়ে হানসেল আর গ্রেথেলের পা লাগল ঠকঠক করে কাঁপতে। তাদের হাত থেকে খাবার-দাবার মাটিতে পড়ে গেল।
        বুড়ি তার নড়বড়ে মাথা নাড়িয়ে বলল, “বাছারা কে তোদের এখানে আনল? আয়-আয়, ভেতরে আয়। আমার সঙ্গে থাকবি। কেউ, তোদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”
        তাদের হাত ধরে বুড়ি নিয়ে গেল সেই বাড়িটার মধ্যে। তারা দেখে থরে-থরে তাদের জন্য নানা খাবার সাজানো: নানারকম পিঠে-পুলি, চিনির দানা, আপেল আর বাদাম। তার পর তাদের জন্য বুড়ি পেতে দিল ধবধবে ছোট্টো দুটো বিছানা। তাতে শুয়ে পড়ে হানসেল আর গ্রেথেলের মনে হল তারা যেন স্বর্গে এসে পৌচেছে। সেই বুড়ি কিন্তু ভালোমানুষটির ভান করেছিল। কারণ আসলে সে ছিল শয়তান এক ডাইনি। ভালো-ভালো খাবার দিয়ে সে বাড়িটা বানিয়েছিল লোক দেখিয়ে ভুলিয়ে কচি-কচি ছেলেমেয়েদের ধরার জন্য। নিজের আওতায় ভালো করে আনার পর তাদের বধ করে রান্না করে মহানন্দে নিজের ভোজ সে সারত। বুড়ির চোখ দুটো ছিল ক্ষুদে-ক্ষুদে, ফ্যাকাশে-লালচে রঙের। দুরের জিনিস সে দেখতে পেত না। কিন্তু জন্তু-জানোয়ারের মতো ঘ্ৰাণশক্তি ছিল তার খুব তীব্র। অনেক দূর থেকে মানুষের গন্ধ সে পেত। হানসেল আর গ্রেথেল তার বাড়ির কাছে আসতেই শয়তানী চাপা হাসি হেসে আপন মনে সে বলে উঠেছিল, “কচি বাচ্চা দুটোকে আগুনে ঝলসে খাব—ওরা আমার খপ্পর থেকে পালাতে পারবে না।”
        পরদিন ভোরে ছেলেমেয়েদের ঘুম ভাঙার আগে বুড়ি ডাইনি উঠে পড়ল তার পর তাদের গোলাপী গালের দিকে তাকিয়ে বিড় বিড়, করে বলে উঠল, “ভারি রসাল-খাসা খেতে হবে।” তার পর তার শুকনো, চামড়া-কোঁচকানো হাত দিয়ে হানসেলকে ধরে ছোট্টো একটা আস্তাবলের মধ্যে নিয়ে গিয়ে লোহার গরাদের কপাট বন্ধ করে দিল। পরিত্রাহি চীৎকার করতে লাগল হানসেল। কিন্তু কোনো ফল হল না। তার পর সেই ডাইনি গ্রেথেলের কাছে গিয়ে তাকে ঠেলা দিয়ে জাগিয়ে বলল, “এই কুঁড়ে মেয়ে—ওঠ, ওঠ। কুয়ো থেকে জল তুলে এনে ভাইয়ের জন্যে ভালো-ভালো রান্না কর। আস্তাবলের মধ্যে সে আছে ৷ তাকে মোটাসোটা করা দরকার। নাদুস-নুদুসটা হলে তাকে আমি খাব।”
        আমুরি-ঝুমুরি হয়ে কাঁদতে শুরু করল গ্রেথেল। কিন্তু কোনো ফল হল না। শয়তান ডাইনির আদেশমতো কাজ করতে সে বাধ্য হল।
        হানসেলকে দেওয়া হতে লাগল ভালো-ভালো পুস্টিকর খাবার। কিন্তু গ্রেথেলের বরাতে জুটতে লাগল শুধুই এঁটোকাটা। প্রতিদিন বুড়ি ডাইনি খোঁড়াতে-খোঁড়াতে আস্তাবলের কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে বলে, “হানসেল, তোর একটা আঙুল বাড়িয়ে দে। দেখি কী রকম মোটা হচ্ছিস।” কিন্তু আঙুলের বদলে হানসেল বাড়িয়ে দেয় এক টুকরো হাড়। বুড়ি ডাইনির দুটি খুব ক্ষীণ। তাই হাড়টা ভালো.করে দেখতে পায় না। সেটা টিপে-টিপে পরখ করে, আর হানসেল মোটা হচ্ছে না দেখে অবাক হয়।
        এইভাবে চার সপ্তাহ কাটল। কিন্তু হানসেল যে রোগা, সেই রোগা: বুড়ি ডাইনি আর ধৈর্য ধরতে পারল না। গ্রেথেলকে সে বলল, “শোন, চটপট কুয়ো থেকে জল তোল। হানসেল রোগাই থাক কি মোটাই থাক—কাল তাকে কেটে রান্না করে খাব ৷”
        কুয়ো থেকে জল আনতে-আনতে হাপুস নয়নে কেঁদে চলল গ্রেথেল। তার দু গাল বেয়ে ঝরঝর করে ঝরতে লাগল চোখের জল। মনে মনে সে. প্রার্থনা করে চলল, “হে ভগবান। আমাদের সাহায্য কর। বনের  জানোয়ারেরা আমাদের খেয়ে ফেললে অন্তত এক সঙ্গে আমরা মরতে পারতাম।’
        বুড়ি ডাইনি বলল, “ঘ্যানঘ্যান করিস না। কোনো ফল হবে না।”
        পরদিন ভোরে গ্রেথেলকে আগুন জ্বালিয়ে কেটলিতে জল ভরতে হল। বুড়ি ডাইনি বলল, “প্রথমে আমরা রুটি সেঁকব। চুল্লিতে আঁচ দিয়ে ময়দা মেখে আমি রেখেছি।” গ্রেথেলকে সে পাঠাল রুটি সেঁকবার জায়গায়। চুল্লির চার পাশে আগুনের শিখা তখন লকলক করছে। ডাইনি বলল, “গুড়ি মেরে ভেতরে ঢুকে দেখ—রুটিটা ভেতরে পোরার মতো যথেষ্ট গরম হয়েছে কি না।” তার মতলব ছিল গুড়ি মেরে ভিতরে ঢুকলে চুল্লির দরজা বন্ধ করে আগুনে ঝলসে প্রথমে গ্রেথেলকে খাবার।
        কিন্তু ডাইনির মতলব বুঝতে পেরে গ্রেথেল বলল, "কী করতে হবে। ঠিক বুঝতে পারছি না। কী করে ভেতরে ঢুকব?”
        বুড়ি ডাইনি খেঁকিয়ে বলল, “গাধা কোথাকার। ফোকরটা তো বেশ বড়ো। এই দেখ—আমি ঢুকছি।”
চুল্লির দরজা খুলে নিজের মাথাটা ভিতরে ঢোকাল সে। সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে ঠেলা দিয়ে ডাইনিকে চুল্লিটার মধ্যে পাঠিয়ে লোহার দরজাটা বন্ধ করে গ্রেথেল ছিটকিনি বন্ধ করে দিল।
        তারস্বরে চেঁচাতে লাগল সেই বুড়ি ডাইনি। কিন্তু তার চীৎকারে কান দিল না গ্রেথেল। সেখান থেকে ছুটে সে পালাল। আর শয়তান বুড়ি ডাইনি মরল দগ্ধে-দগ্ধে পুড়ে।
        আস্তাবলের কাছে দৌড়ে এসে লোহার গরাদের ফটক খুলে গ্রেথেল চেঁচিয়ে উঠল, “হানসেল। আমরা বেঁচে গেছি। বুড়ি ডাইনি মরেছে।” খাচা থেকে পাখি যেরকম বেরোয় সেইরকম এক লাফে আস্তাবল থেকে বেরিয়ে হানসেল তার বোনকে জড়িয়ে ধরল আর তার পর আনন্দে তারা দুজনেই লাগল লাফাতে।
        তখন তাদের আর ভয়ের কোনো কারণ নেই। তাই তারা ডাইনির বাড়িটা তন্নতন্ন করে খুঁজতে শুরু করল আর দেখল বাড়ির মধ্যেকার প্রতিটি কোণে রয়েছে হীরে, মুক্তো, জহরত ভরা নানা সিন্ধুক।
        সেই-সব জহরত পকেটে মুঠো-মুঠো ভরতে-ভরতে হানসেল বলল, “বুড়ির চেয়ে এগুলো অনেক ভালো।” গ্রেথেলও তার কোচড়ে হীরেজহরত ভরে বলল, “আমিও কিছুটা বাড়ি নিয়ে যাব।”
        হানসেল বলল, “এই জাদুর বাড়ি থেকে এবার পালানো যাক ৷” ঘন্টা দুয়েক হাঁটার পর তারা পৌছল বিরাট একটা নদীর তীরে। হানসেল বলল, “এটা পার হওয়া যায় কী করে? আমি তো কোনো সাঁকো-টাকো দেখছি না।”
        গ্রেথেল বলল, “কোনো জাহাজও তো নেই। কিন্তু ঐ দেখো একটা সাদা হাঁস সাঁতার কাটছে। আমি বললে হাঁসটা তার পিঠে করে আমাদের পার করে দেবে।” এই বলে সে চেঁচিয়ে উঠল:
       
“ও ভাই হাঁস। ও ভাই হাঁস।
হান্‌সেল আর গ্রেথেল এখানে দাঁড়িয়ে,
তাদের না আছে পোল না আছে সাঁকো
পার করো তাদের পিঠে নিয়ে।”

        হাঁসটা সাঁতরে আসতে হান্‌সেল তার পিঠে চড়ে গ্রেথেলকে বলল তার পাশে বসতে ৷ গ্রেথেল বলল, “আমাদের দুজনের ভার ও বইতে পারবে না। এক-এক করে আমাদের পার করে দেবে।” হাঁসটা তাই করল। নিরাপদ নদীর অন্য পারে পৌছে হাঁটতে-হাঁটতে তাদের মনে হল বনটা যেন চেনা-চেনা। খানিক পরে দূরে তারা দেখতে পেল তাদের বাবার বাড়ি। পরে বাড়িটা নজরে পড়তেই ছুটতে-ছুটতে গিয়ে বাইরের ঘরে হুডুমুড়িয়ে ঢুকে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের বাবার দু হাতের মধ্যে! সৎমাটা আগেই মরেছিল। গ্রেথেল তার কোঁচড় উজাড় করে হীরে-জহরত ঢেলে দিল আর হান্‌সেল তার পকেটের হীরেজহরত দিল মুঠো-মুঠো করে ছড়িয়ে। এইভাবে তাদের দৈন্যদশা, শেষ হল আর তার পর থেকে আনন্দে কাটতে লাগল তাদের দিন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য