চাষীর চালাক মেয়ে - জার্মানের রূপকথা

        এক সময় এক গরিব চাষীর কোনো জমিজমা ছিল না। থাকার মধ্যে ছিল ছোট্টো একটি কুঁড়েঘর আর এক মেয়ে। মেয়েটি তাই একদিন তার বাবাকে বলল, “আমাদের কিছুটা জমি দিতে রাজাকে বলা দরকার।”
        তাদের অভাবের কথা শুনে রাজা দিলেন বিঘে থানেক জমি। সেখানে বীজ বোনার জন্য চাষী আর তার মেয়ে জমিতে লাঙল দিতে শুরু করল। কাজ যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে তারা দেখে মাটির মধ্যে রয়েছে খাটি সোনার একটা খল।
        চাষী তার মেয়েকে বলল, “রাজা দয়া করে জমিটা দিয়েছেন। তাই এই খলটা তাকে দিয়ে দেওয়া দরকার।”

        তার মেয়ে কিন্তু চাষীর কথায় রাজি না হয়ে বলল, “বাবা, আমরা শুধু খলটাই পেয়েছি। নুড়িটা পাই নি। সেটা খুজে না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের চুপচাপ থাকাই ভালো।”
        কিন্তু মেয়ের কথায় কান না দিয়ে সোনার খল নিয়ে রাজার কাছে গিয়ে চাষী বলল, “মহারাজ, আপনি যে জমি দিয়েছিলেন এটা সেখানে, পেয়েছি। তাই দিতে এলাম।”
        সোনার খল নিয়ে রাজা প্রশ্ন করলেন, “আর কিছু পাও নি?”
        চাষী বলল, “না, মহারাজ।”
        রাজা বললেন, “এবার তোমাকে সোনার নুড়িটা এনে দিতে হবে।”
        চাষী জানাল, সোনার নুড়ি সে পায় নি। কিন্তু রাজা তার কথা বিশ্বাস করলেন না। তাকে হাজতে ভরে বললেন, “ষত দিন না সোনার নুড়িটা বার করে দিচ্ছ ততদিন হাজতে বন্দী থাকবে।” হাজতের দৈনিক বরাদ্দ খাদ্য ছিল শুধু জল আর রুটি। যে-সব শাস্ত্রী সেই জল-রুটি দিয়ে যেত তারা শুনত চাষীকে সব সময় বিড়বিড় করে বলতে, “হায় হায়, মেয়ের কথাগুলো যদি শুনতাম! হায় হায়, মেয়ের কথাগুলো যদি শুনতাম।”
        শাস্ত্রীরা একদিন রাজাকে গিয়ে বলল, “মহারাজ, চাষী ক্ৰমাগত বলে—হায় হায়, মেয়ের কথাগুলো যদি শুনতাম! সে না খায় রুটি, না খায় জল ৷”
        রাজা তাদের বললেন চাষীকে তার কাছে হাজির করতে। চাষীকে - হাজির করা হলে তিনি জানতে চাইলেন, ক্ৰমাগত কেন সে বলে চলে— হায় হায়, মেয়ের কথাগুলো যদি শুনতাম!”
        “মেয়ে তোমাকে কী কথা বলেছিল?”
        “মহারাজ, মেয়ে বলেছিল—খলটা নিয়ে যেয়ো না। নিয়ে গেলে রাজা বলবেন সোনার নুড়ি এনে দিতে।”
        “তোমার মেয়ের যদি অতই বুদ্ধি, তা হলে তাকে এখানে ডেকে পাঠাই।”
        চাষীর মেয়ে রাজসভায় হাজির হলে রাজা বললেন, “তোমার কত বুদ্ধি যাচাই করে দেখছি। একটা ধাঁধা বলি। সেটার উত্তর দিতে পারলে তোমায় আমি বিয়ে করব।”
        চাষীর মেয়ে সঙ্গে সঙ্গে জানাল ধাঁধার উত্তর সে দেবে।
        রাজা বললেন, “আমার কাছে তোমায় আসতে হবে পোশাক না পরে, উলঙ্গ না হয়ে, গাড়িতে না চড়ে, না পথ দিয়ে, না পথের বাইরে দিয়ে।—এটা পারলে তোমায় বিয়ে করব।”
        চাষীর মেয়ে তখন বাড়ি ফিরে তার সমস্ত পোশাক খুলে ফেলল। অতএব তার পরনে কোনো সাজসজা রইল না। তার পর একটা মাছধরা জালে সর্বাঙ্গ নিল ঢেকে-তাই সে রইল না উলঙ্গ অবস্থায়। তার পর একটা গাধা ভাড়া করে মাছ ধরার জালটা তার লেজের সঙ্গে বেঁধে দিলে আর গাধা তাকে টেনে নিয়ে চলল গোরুর গাড়ির চাকার দাগের মধ্যে দিয়ে। তাই সে জন্তুর পিঠে বা গাড়িতে করে গেল না? আর গোরুর গাড়ির দাগকে তো আর পথ বলা যায় না। কিন্তু সেট আবার পথের বাইরেও না। তাই রাজার কাছে সে হাজির হল—না, পথ দিয়ে, না পথের বাইরে দিয়ে।
        রাজা তার বুদ্ধি দেখে মুগ্ধ হলেন। তার পর চাষীকে দিলেন মুক্তি . আর চাষীর মেয়েকে বিয়ে করে রাজত্বের সমস্ত সম্পত্তির ভার তুলে দিলেন তার হাতে।
        কয়েক বছর পরে রাজা একদিন চলেছেন কুচকাওয়াজ দেখতে। কয়েকজন চাষী তখন রাজপ্রাসাদের সামনে তাদের মাল গাড়ি থামিয়ে। কাঠ বিক্রি করছিল। গাড়িগুলোর কয়েকটা টানছিল বলদ, কয়েকটা ঘোড়া। এক চাষীর ছিল তিনটে ঘোড়া আর একটা ঘোড়ার ছিল একটা বাচ্চা। ঘোড়ার বাচ্চাটা ছুটে গিয়ে একটা মালগাড়ির সামনেকার দুটো বলদের মাঝখানে শুয়ে পড়ল। বলদগুলোর যে মালিক সেই চাষী বলল ঘোড়ার বাচ্ছাটা তার! ঘোড়াগুলোর যে মালিক সেই চাষী বলল—তার ঘোড়ার বাচ্চা, অতএব সেটা তার। এই নিয়ে তাদের মধ্যে তুমুল লাঠালাঠি বেঁধে গেল। শেষটায় বিচারের জন্য গেল তারা রাজার কাছে। রাজা বললেন, “ঘোড়ার বাচ্চা যেখানে শুয়ে সেখানেই সেটা থাকবে।” অতএব বলদগুলোর মালিক পেয়ে গেল ঘোড়ার বাচ্চাটা, যদিও আসলে সেটা তার নয়। অন্য চাষী তার ঘোড়ার বাচ্চার শোকে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।
        এই চাষী শুনেছিল রানী খুব দয়ালু। কারণ চাষীর বংশে তার জন্ম। তাই রানীর কাছে গিয়ে মিনতি করে বলল, ঘোড়ার বাচ্চাটাকে ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করতে।
        রানী বলল, “সাহায্য করব। কিন্তু কথা দাও মতলবটা যে আমি দিয়েছি সে কথা কাউকে বলবে না। কাল ভোরে রাজা যখন কুচকাওয়াজ দেখতে বেরুবেন যে রাস্তা দিয়ে তিনি যাবেন সেটার মাঝখানে বড়ো একটা মাছধরা জাল নিয়ে বসে এমনভাবে সেটা ছুড়তে থাকবে যেন নদীতে মাছ ধরছ।” তার পর তাকে শিখিয়ে দিল রাজা প্রশ্ন করলে কী উত্তর দিতে হবে।
        রানীর কথামতো পরদিন ভোরে শুকনো জায়গায় বসে-বসে চাষী করতে লাগল মাছ ধরার ভান। সেখান দিয়ে যাবার সময় সেদিকে তাকিয়ে রাজা তার দূতকে বললেন, “দেখে এসো তো বোকা লোকটা অমন করছে কেন?”
        চাষী তাকে বলল, “আমি মাছ ধরছি।”
        দূত প্রশ্ন করল, “যেখানে জল নেই সেখানে মাছ ধরবে কী করে?”
        চাষী বলল, “দুটো বলদের একটা ঘোড়ার বাচ্চা হতে পারলে এই শুকনো ডাঙায় আমিও পারব মাছ ধরতে।”
        দূত ফিরে গিয়ে রাজাকে জানাল চাষীর উত্তর। চাষীকে তখন ডেকে পাঠিয়ে রাজা বললেন, “এই মতলবটা তোমার মাথায় আসতেই পারে না। কেউ নিশ্চয়ই তোমায় শিখিয়ে দিয়েছে। কে সে—এক্ষুনি বল।” চাষী কিন্তু রাজাকে আসল কথাটা কিছুতেই জানাল না। বার বার বলতে লাগল উত্তরটা তার নিজের। কিন্তু তাকে খড়ের গাদায় ফেলে বেদম প্রহার দেবার পর শেষটায় চাষী কবুল করল, উত্তরটা রানী তাকে শিখিয়ে দিয়েছে।
        রাজা বাড়ি ফিরে তার বউকে বললেন, “তুমি আমাকে ভীষণ ঠকিয়েছ। তাই আর আমার বউ হয়ে এখানে তুমি থাকতে পারবে না। যে-কুঁড়েঘর থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। ষাবার সময় তোমার যেটা সব চেয়ে প্রিয় জিনিস, নিয়ে যেতে পার।”
        রানী বলল, “আদেশ দিলে নিশ্চয়ই আমি ফিরে যাব।” তার পর কড়া ঘুমের ওষুধ দিয়ে সরবত বানিয়ে এনে রাজাকে বলল, শেষ বিদায় নেবার আগে একসঙ্গে সেটা তারা পান করবে। রাজা চক চক করে অনেকটা সরবত খেলেন। রানী কিন্তু সেটা শুধুই ঠোঁটে ঠেকাল। তার পর রাজা ঘুমে ঢলে পড়লে রানী তাকে সুন্দর সাদা একটা কাপড়ে জড়িয়ে, ভৃত্যদের সাহায্যে তাকে ধরাধরি করে ওঠাল জুড়িগাড়িতে। তার পর তাকে নিজেদের ছোট্টো কড়েঘরে এনে শোয়াল নিজের ছোট্টো বিছানায়। সেখানে তিনি ঘুমোলেন পুরো এক দিন আর পুরো এক রাত। ঘুম ভাঙতে অবাক হয়ে তাকিয়ে রাজা বলে উঠলেন, "কী কাণ্ড! কোথায় আমি?” তার পর তিনি ডাকাডাকি করতে লাগলেন তার খাস ভৃত্যদের নাম ধরে। কিন্তু কেউই সাড়া দিল না।
        শেষটায় তার বউ বিছানার পাশে এসে বলল, “আমার রাজা। তুমি বলেছিলে রাজপ্রাসাদ থেকে আমার সব চেয়ে প্রিয় জিনিস নিয়ে আসতে পারি। তোমার চেয়ে প্রিয় আমার কিছুই নেই। তাই তোমাকে নিয়ে এসেছি।”
        তার কথা শুনে রাজার চোখ জলে ভরে উঠল। তিনি বললেন, “রানী, চিরকাল তুমি আমার আর চিরকাল আমি তোমার থাকব।” তার পর তাকে নিয়ে রাজা ফিরলেন তার প্রাসাদে।
        সম্ভবত আজও তাঁরা সেখানে সুখে শান্তিতে বেঁচে আছেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য