বুড়ো সুলতান - জার্মানির রূপকথা

        এক চাষীর এক বিশ্বস্ত কুকুর ছিল। নাম সুলতান। কুকুরটা বুড়ো হয়েছিল। সব দাঁত পড়ে গিয়েছিল বলে কোনো জিনিস কামড়ে ধরতে পারত না। একদিন চাষী সদর দরজায় বউয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিল। সে বলল, “কাল বুড়ো সুলতানকে গুলি করে মারব। তাকে দিয়ে আমাদের আর কোনো কাজ হবে না।”
        কুকুরটাকে তার বউ খুব ভালোবাসত। তাই সে বলল, “বহু বছর আমাদের সে সাহায্য করেছে। কুকুরটা খুব ভালো আর প্রভুভক্ত। বুড়ো বয়সে আমাদের কোনো কাজে না লাগলেও অনায়াসে ওকে আমরা খেতে দিতে পারি।”
        তার বর বলল, “তুমি বলছ কি? ওটার একটাও দাঁত নেই। চোররা ওকে আর ভয় পায় না। এরকম একটা অকেজো জীবকে পোষার কোনো মানে হয় না। আমাদের যেমন বিশ্বস্তভাবে সেবা করেছে তার বদলে তেমনি খেতে পেয়েছেও প্রচুর।”
        বেচারা কুকুরটা কাছেই রোদে শুয়েছিল। কথাগুলো সে শুনল। কালকেই পৃথিবীতে শেষ দিন ভেবে তার ভারি দুঃখ হল।
        তার ছিল এক ভালো বন্ধু। সে নেকড়ে। সন্ধেয় চুপি চুপি বনে গিয়ে সুলতান তার দুর্ভাগ্যের কথা নেকড়েকে বলল।
        নেকড়ে বলল, “বন্ধু, মন খারাপ কোরো না। তোমাকে সাহায্য করার একটা ফন্দি আমার মাথায় এসেছে। কাল ভোরে তোমার প্রভু বউকে নিয়ে ক্ষেতে যাবে। তাদের বাচ্চাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে তারা। সাধারণত বাচ্চাকে তারা ঝোপের ছায়ায় শুইয়ে রাখ ৷ ঝোপটার পাশে এমনভাবে ঘাপটি মেরে থেকো যেন বাচ্চাকে পাহারা দিচ্ছ। বন থেকে বেরিয়ে বাচ্চাটাকে আমি চুরি করব। আমার উপর তুমি এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বে যেন আমাকে মেরে তাড়াতে চাও। বাচ্চাটাকে মুখ থেকে আমি ফেলে দেব। তখন তাকে তুমি নিয়ে যেও তার বাপ-মায়ের কাছে। তারা ভাববে তার জীবন তুমি বাঁচিয়েছ। তারা নিশ্চয়ই তোমার কাছে খুব কৃতজ্ঞ হয়ে পড়বে—তোমাকে আর গুলি করে মারবে না। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই তারা তোমার সঙ্গে খুব সদয় ব্যবহার করবে।”
        ফন্দিটা সুলতানের মনে ধরল আর সেইমতো কাজ করল সে। নেকড়ের মুখে বাচ্চাকে দেখে আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল চাষী। আর তার পর সুলতান তাকে নিয়ে এলে ভারি খুশি হয়ে সুলতানের মাথায় হাত বুলিয়ে সে বলল, “তোর মাথার এক গাছা লোমও কেউ ছুতে পারবে না । যত দিন বেঁচে থাকবি ততদিন রুটি খেতে পাবি।” বউকে সে বলল, “বাড়ি গিয়ে সুলতানের জন্যে খুব নরম আর কুচিকুচি করে কাটা মাংস আর শাকসবজি দিয়ে মুখরোচক খাবার বানিয়ে দাও, যাতে বেচারার চিবুতে না কষ্ট হয়। বিছানা থেকে আমার বালিশটা বার করে ওকে আরাম করে শুতে দিয়ো।”
        সেদিন থেকে সুলতানের কোনো-কিছুর অভাব হত না। কিছুদিন পরে নেকড়ে এসে সৌভাগ্যের জন্য সুলতানকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল, “কিন্তু বন্ধু তোমার প্রভুর মোটা-মোটা ভেড়া মাঝে মাঝে আমি যখন নিয়ে যাব তুমি চোখ বুজে থেকো। আজকাল সেরকম সুযোগ বড়ো-একটা জোটে না।”
        সুলতান বলল, “ভায়া, ওটা ভুলে যাও। প্রভুর স্বার্থ আমাকে দেখতেই হবে।”
        তার কথাটা কিন্তু নেকড়ের বিশ্বাস হল না। তাই সে-রাতেই এসে সে চেষ্টা করল একটা ভেড়া চুরি করতে। কিন্তু বিশ্বম্ভ শিকারী কুকুরটার চীৎকারে চাষীর ঘুম ভেঙে গেল। পালাতে গিয়ে নেকড়ের মাথার লোম গেল শস্য মাড়ানোর কলে আটকে আর গোড়াসুদ্ধ সেগুলো গেল উপড়ে। যাবার সময় সে হেঁকে বলল, “দোস্ত, তুমি ভয়ংকর নেমকহারাম। এর জন্যে তোমায় অনুতাপ করতে হবে।”
        পরদিন সকালে শুয়োরকে দিয়ে নেকড়ে বনের মধ্যে দ্বন্দ্বযুদ্ধে সুলতানকে আহবান জানাল। সুলতানের একমাত্র সহকারী ছিল একটা বেড়াল, যার ছিল তিনটে মাত্র ঠ্যাঙ। বেড়ালকে নিয়ে সুলতান বেরুল বনের দিকে। বেচারা বেড়াল চলল দারুণ খোঁড়াতে খোঁড়াতে ৷ যন্ত্রনায় তার লেজ উঠল খাড়া হয়ে। সহকারীকে নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় নেকড়ে অপেক্ষা করছিল। সুলতানকে আসতে দেখে নেকড়ের মনে হল সে একটা তলোয়ার আনছে—আসলে সেটা কিন্তু বেড়ালটার খাড়া লেজ। তিন পায়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেড়ালটা যেই-না হমড়ি খেয়ে পড়ে তারা ভাবে তাদের দিকে ছোড়বার জন্য বেড়াল বুঝি পাথর কুড়চ্ছে। তাই তারা ভীষণ ঘাবড়ে গেল। বুনো শুয়োরটা চোরের মতো লুকিয়ে পড়ল ঝোপঝাড়ের মধ্যে । নেকড়ে হুড় মুড়িয়ে উঠে পড়ল একটা গাছে। নির্দিষ্ট জায়গায় কাউকে দেখতে না পেয়ে বেড়াল আর কুকুর—দুজনেই অবাক। শুয়োরটা ঝোপের মধ্যে ভালো করে লুকোতে পারে নি—তার কানদুটো বেরিয়ে ছিল ৷ বেড়াল এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, এমন সময় শুয়োর তার একটা কান নাড়াল। বেড়াল ভাবল পাতাগুলোর মধে নিশ্চয়ই একটা ইঁদুর লুকিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে সে কটু করে সেটা দিল কামড়ে। হাউমাউ করে চেঁচিয়ে চার পায়ে দাঁড়িয়ে ছুটতে ছুটতে শুয়োর চেঁচাতে লাগল, “আসল অপরাধী গাছের ওপরে।” বেড়াল আর কুকুর উপর দিকে তাকিয়ে দেখে নেকড়েকে । নিজের কাপুরুষতার জন্য ভীষণ লজ্জা পেল নেকড়ে। তাই গাছ থেকে নেমে সুলতানের সঙ্গে সে আবার ভাব করে নিল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য