ভালোবাসার জয় - জার্মানের রূপকথা

        এক সময় ছিল এক ডাইনি। তার দুই মেয়ে। একজন কুচ্ছিত আর পাজি। তাকেই সে ভালোবাসতো। কারণ সে হল তার নিজের মেয়ে। অন্য মেয়েটি সুন্দরী আর ভালো। তাকে সে দু চক্ষে দেখতে পারত না। কারণ সে হল তার সৎমেয়ে। সৎমেয়েটির ছিল সুন্দর একটা ওড়না। সেটা দেখে অন্য মেয়ের খুব হিংসে হল। তার মায়ের কাছে গিয়ে সে বায়না ধরল—সেটা তার চাই।
        তার মা বলল “শান্ত হ, বাছা। ওটা তুই নিশ্চয় পাবি। তোর সৎবোনের অনেকদিন আগেই মরবার কথা। আজ রাতে সে ঘুমিয়ে পড়লে আমি গিয়ে তার মাথা কাটব। বিছানার পেছন দিকে শুয়ে তাকে সামনের দিকে ঠেলে দিস।”
        এক কোণে দাঁড়িয়ে তাদের কথাবার্তা না শুনলে বেচারি মেয়েটিকে নিৰ্ঘাত মরতে হত। সারাদিন বাড়ি থেকে সে বেরুল না। শোবার সময় হলে তাকে সব শেষে শুতে পাঠানো হল, যাতে বিছানার সামনের দিকে সে থাকে। কিন্তু সৎবোন ঘুমিয়ে পড়ার পর তাকে টপকে গিয়ে মেয়েটি শুলো দেয়াল ঘেঁষে। আর বুড়ি সৎমা ডান হাতে কুড়ল নিয়ে এসে বাঁ হাত দিয়ে হাতড়ে দেখে কেটে ফেলল নিজেরই মেয়ের মাথা।
        সৎমা চলে যেতে মেয়েটি চুপি চুপি উঠে রোলাণ্ডের বাড়িতে গিয়ে দরজায় টোকা দিল। রোলাণ্ডকে সে ভালোবাসত। বাড়ি থেকে বেরিয়ে রোলাণ্ড তার কাছে এলে পর মেয়েটি বলল, “শোনো রোলাণ্ড, আমাদের এক্ষুনি পালাতে হবে। সৎমা আমাকে মারতে চেয়েছিল। কিন্তু অন্ধকারে ভুল করে নিজের মেয়েকেই মেরেছে। ভোর হলেই সেটা সে জানতে পারবে। তখন আর আমাদের নিস্তার থাকবে না।”
        রোলাণ্ড বলল, “আগে গিয়ে তার জাদুর লাঠিটা নিয়ে এসো। নইলে সে পিছু নিলে নিজেদের আমরা বাঁচাতে পারব না।”
        মেয়েটি গিয়ে প্রথমে লাঠিটা নিল। তার পর সৎবোনের কাটা মুণ্ডু নিয়ে তিন ফোটা রক্ত ছড়াল—এক ফোটা বিছানার কাছে, এক ফোটা রান্নাঘরে আর এক ফোটা সিঁড়িতে। তার পর সে আর রোলাণ্ড গেল পালিয়ে।
        পরদিন ভোরে উঠে ওড়নাটা দেবার জন্য ডাইনি তার মেয়ের নাম ধরে ডাকল। কিন্তু সে এল না। “কোথায় আছিস?” সে আবার হাঁক দিল।
        এক ফোটা রক্ত জবাব দিল, “এইখানে, সিঁড়িতে।” ডাইনি বেরিয়ে এল। কিন্তু সিঁড়িতে কাউকে দেখতে না পেয়ে সে আবার হাঁক দিল, “কোথায় আছিস?”
        দ্বিতীয় ফোটা রক্ত জবাব দিল, “এইখানে, রান্নাঘরে।” ডাইনি রান্নাঘরে গেল। কিন্তু কাউকে দেখতে না পেয়ে আবার হাঁক দিল, “কোথায় আছিস?”
        তৃতীয় ফোটা রক্ত জবাব দিল, “এইখানে, বিছানায় ঘুমচ্ছি।” তখন সে শোবার ঘরে গিয়ে দেখে তার নিজের মেয়ে নিজেরই রক্তে ভাসছে।”
        ভয়ংকর রেগে ডাইনি গেল জানলার কাছে। সেখান থেকে অনেক দুর পর্যন্ত সে দেখতে পেত। সে দেখল তার সৎমেয়ে রোলাণ্ডের সঙ্গে তাড়াতাড়ি হেঁটে চলেছে।
        ডাইনি বলল, “ওতে লাভ নেই। যত তাড়াতাড়িই হাঁটুক-না-কেন, আমি ওদের ধরে ফেলব।” সে তার মাইল-জুতো পরল। সেটা পরে এক-এক বার পা ফেলে সে ছ মাইল যেতে পারে। দেখতে-দেখতে সে তাদের নাগাল ধরে ফেলল।
        মেয়েটি কিন্তু তাকে আসতে দেখে তার জাদুর লাঠি দিয়ে রোলাণ্ডকে একটা হ্রদ করে দিল আর নিজে হাঁস হয়ে তাতে লাগল সাঁতার কাটতে। ডাইনি তীরে দাঁড়িয়ে রুটির টুকরো ছুড়ে-ছুড়ে চেষ্টা করল হাঁসকে লোভ দেখিয়ে তার কাছে আনতে। হাঁস কিন্তু এল না। তাই সন্ধের সময় হতাশ হয়ে বুড়ি ডাইনি বাড়ি ফিরতে বাধ্য হল। তখন মেয়েটি আর রোলাণ্ড আবার মানুষ হয়ে উঠে হেঁটে চলল সারা রাত। ভোরবেলায় মেয়েটি হয়ে গেল এক বৈঁচি-ঝোপের সুন্দর ফুল আর রোলাণ্ডকে করে দিল বেহালা-বাজিয়ে।
        তার খানিক বাদেই লম্বা-লম্বা পা ফেলে এসে বেহালাবাজিয়েকে ডাইনি বলল, “শোনো বাজনদার, ঐ সুন্দর ফুলটা তুলতে পারি?”
        সে বলল, “নিশ্চয়ই। ততক্ষণ বেহালায় আমি সুর বেঁধে নি।” ফুলটা যে কে ডাইনি সে কথা ভালো করেই জানত। ফুল তোলার জন্য সে যখন ঝোপের কাছে এগুচ্ছে রোলাণ্ড তখন শুরু করল তার বেহালা বাজাতে। আর সেই সুরের তালে-তালে ডাইনি বাধ্য হল একটা জাদুর নাচ নাচতে। যত তাড়াতাড়ি সে বাজায় তত উঁচুতে ডাইনি বাধ্য হয় পা ছুড়তে। শেষটায় ঝোপের কাটায় তার পোশাক গেল ছিড়ে কুটিকুটি হয়ে আর তার সর্বাঙ্গ দিয়ে ঝরতে লাগল রক্ত। রোলাণ্ড কিন্তু বেহালা বাজানো থামাল না। শেষটায় নাচতে-নাচতে ডাইনি মরে পড়ে গেল।
        ডাইনির ভয় যখন আর রইল না রোলাণ্ড তখন বলল, “এবার বাবার বাড়িতে ফিরে আমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করি গে।”
        মেয়েটি বলল, “তুমি না ফেরা পর্যন্ত আমি এখানে অপেক্ষা করব। কেউ যাতে আমায় দেখতে না পায় তার জন্যে আমি হয়ে যাব লাল একটা পাথর।”
        রোলাণ্ড চলে গেল আর একটা মাঠের মধ্যে লাল পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে মেয়েটি করতে লাগল তার জন্য অপেক্ষা। কিন্তু বাড়ি ফিরে অন্য এক মেয়েকে রোলাণ্ড ভালোবেসে ফেলল। তার কথা একেবারে গেল ভুলে।
        বেচারা মেয়েটি বহুদিন ধরে তার জন্য অপেক্ষা করে রইল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোলাণ্ড না ফেরায় মনের দুঃখে এই বলে সে একটি ফুল হয়ে গেল, "এবার কেউ হয়তো আমাকে মাড়িয়ে চলে যাবে।”
        কিন্তু হল কি—এক রাখাল মাঠে ভেড়া চরাতে এসে ফুলটিকে দেখে তুলে ঝোলায় ভরে নিয়ে গেল তার বাড়িতে। আর তখন থেকে রাখালের বাড়িতে ঘটতে লাগল নানা অবাক কাণ্ড। সকালে উঠে সে দেখে সংসারের সব কাজ সারা—ঘর ঝাঁট দেওয়া, টেবিল-চেয়ার পালিশ করা, উনুন জ্বালানো আর তাতে জল ফোটানো। দুপুরে ফিরে দেখে তার জন্য সুন্দর-সুন্দর খাবার তৈরি। সে ভেবে পেল না, কী করে এগুলো ঘটছে। কারণ তার বাড়িতে কাউকেই সে দেখতে পেত না। আর ওরকম ছোটো কুঁড়েঘরে কারুর পক্ষে লুকিয়ে থাকা একেবারে অসম্ভব।
        তার সব কাজ হয়ে যেতে দেখে সে খুব খুশি হলেও এক বিজ্ঞ বুড়ির পরামর্শ সে চাইল। বুড়ি বলল, “নিশ্চয় এর পেছনে কোনো জাদু কাজ করছে। কাল সকালে লক্ষ্য কোরো কোনো-কিছু নড়ে কি না। কোনো জিনিস নড়লে সেটার ওপর একটা সাদা কাপড় চাপা দিয়ো। তা হলেই জাদু ধরা পড়বে।”
        বুড়ির পরামর্শ মতো রাখাল কাজ করল। ভোরবেলায় সে দেখল তার থলি খুলে সেই ফুলটিকে বেরিয়ে আসতে। একলাফে সেখানে গিয়ে সেই ফুলের উপর একটা সাদা কাপড় সে চাপা দিল। সঙ্গে সঙ্গে ফুলটি হয়ে গেল এক সুন্দরী মেয়ে আর সে বলল, তার ঘরসংসারের কাজ করছিল সেই ফুল। মেয়েটি নিজের সব কথা তার পর বলল রাখালকে। মেয়েটিকে খুব ভালো লেগেছিল বলে রাখাল তাকে প্রশ্ন করল—তাকে সে বিয়ে করবে কি না। মেয়েটি বলল, “না।” কারণ তাকে ছেড়ে গেলেও রোলাণ্ডকেই সে ভালোবাসত। কিন্তু রাখালকে সে কথা দিল— সে চলে যাবে না আর আগের মতোই করে যাবে তার ঘর-সংসারের কাজ।
        এদিকে এগিয়ে এল রোলাণ্ডের বিয়ের দিন। সেই দেশের প্রথা অনুসারে সব কুমারী মেয়েদের ডাকা হল নতুন বর-বউয়ের জয়গান গাইবার জন্য। খবর শুনে মেয়েটির মন খুব খারাপ হয়ে গেল। বিয়েবাড়িতে যেতে তার ইচ্ছে হল না। কিন্তু অন্য মেয়েরা এসে জোর করে তাকে নিয়ে গেল।
        তার গান গাইবার পালা আসতে মেয়েটি পিছিয়ে গেল। মনে হল তার বুক বুঝি ফেটে যাবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত সে বাধ্য হল গান গাইতে। আর সে গাইতে শুরু করতেই চমকে উঠে রোলাণ্ড চিনতে পারল তার স্বর। যে-সব কথা সে ভুলে গিয়েছিল একে একে সে-সব কথা তার মনে পড়তে লাগল। সে চেঁচিয়ে উঠল, “এই স্বর আমার চেনা। এই আমার আসল বউ। একে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করব না।” মেয়েটির প্রতি ভালোবাসায় আবার তার হাদয় কানায়-কানায় উঠল ভরে।
        এইভাবে রোলাণ্ডের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল সেই মেয়েটির। আর তার পর থেকে দুঃখের হল শেষ আর আনন্দের শুরু।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য