বড়ো ক্লাউস আর ছোটো ক্লাউসের কথা - হ্যান্স অ্যাণ্ডারসন

        অনেককাল আগে এক গ্রামে একই নামের দুজন লোক থাকত। একজনের ছিল চারটে ঘোড়া, অন্যজনের মোটে একটি। কাজেই দুজনকে আলাদা করে চিনবার জন্য যে লোকটার চারটে ঘোড়া তাকে সবাই বলত বড়ো ক্লাউস আর যার একটি ঘোড়া তাকে বলত ছোটো ক্লাউস।
        সারা সপ্তাহ ছোটো ক্লাউসকে বড়ো ক্লাউসের খেতে লাঙল দিতে হত আর ঘোড়াটি ধার দিতে হত। তার বদলে সপ্তাহে একটি দিন বড়ো ক্লাউস তাকে তার চারটি ঘোড়া ধার দিত; সে দিনটি ছিল রবিবার।
        সেদিন ছোটো ক্লাউসের কী গর্ব! পাঁচ ঘোড়ার মাথার উপর সে চাবুক ঘোরাত আর মনে মনে ভাবত, অন্তত এই একটা দিনের মতো সে পাঁচ ঘোড়ার মালিক! সেদিন গাঁয়ের সবাই সেজেগুজে গির্জা যাবার পথে দেখত ছোটো ক্লাউস তার পাঁচটি ঘোড়া হাঁকাচ্ছে। তার আহ্লাদ দেখে কে? বারে বারে চটাৎ চটাৎ করে শূন্যে চাবুক ঘোরায় আর চীৎকার করে বলে, “কেয়াবাৎ! কেয়াবাৎ! পাচ-পাঁচটা সেরা ঘোড়া আর সবকটি আমার!”

        তাই শুনে বড়ো ক্লাউস বলল,“ও কথা বোলো না। তুমি তো ভালো করেই জান যে মোটে একটা ঘোড়া তোমার। কিন্তু আবার যেই একদল লোক গির্জা যাবার পথে ওর পাশ দিয়ে চলে গেল, ছোটো ক্লাউস সে-সব কথা ভুলে গিয়ে আবার চেঁচিয়ে উঠল, “কেয়াবাৎ! কেয়াবাৎ! পাঁচ-পাঁচটা সেরা ঘোড়া আর সবকটি আমার!”
        তাই শুনে বড়ো ক্লাউস বেজায় রেগে গেল। চটে বলল, “বলিনি তোমাকে মুখ সামলে কথা কইতে? ফের যদি ও কথা বল, তা হলে তোমার ঐ একটা ঘোড়ার কপালে এমনি এক বাড়ি দেব যে সঙ্গে সঙ্গে ওর ভবলীলা সাঙ্গ হবে আর পাঁচ-পাঁচটা সেরা ঘোড়া নিয়ে তোমার জাঁক করাও ঘুচে যাবে!”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “দোহাই, দাদা, আর ও কথা মুখে আনব না, সত্যি আনব না।” সেইরকম ইচ্ছাই তার ছিল, কিন্তু দুঃখের বিষয়, একটু পরে যেই আরো কয়েকজন লোক ঐ পথ দিয়ে যেতে যেতে ওকে দেখে খুশি হয়ে নমস্কার জানাল, ওর এমনি ফুর্তি লাগল যে মনে হল ঐটুকু এক ফালি জমি চযতে পাঁচটা ঘোড়া জুতে আনা চাট্টিখানি কথা নয়। ব্যস্, আর যাবে কোথা, মাথার উপর চাবুকটি ঘুরিয়ে ছোটো ক্লাউস চেঁচিয়ে উঠল, “কেয়াবাৎ! কেয়াবাৎ। পাঁচ-পাঁচটা সেরা ঘোড়া, সবকটি আমার!”
        এবার রাগে অন্ধ হয়ে বড়ো ক্লাউস বলে উঠল, “দাঁড়াও তোমার রোগের ওষুধ দিচ্ছি।” এই না বলে প্রকাণ্ড একটা পাথর তুলে ছোটো ক্লাউসের ঘোড়ার মাথায় ছুড়ে মারল। ঐ ভারী পাথর মাথায় লাগামাত্র ঘোড়া বেচারা মরে পড়ে গেল।
        তাই দেখে ছোটো ক্লাউস কেঁদে উঠল, “হায়, হায়, এখন আমার একটাও ঘোড়া নেই!” খুব খানিকটা কেঁদে, তার পর নিজেকে সামলে নিয়ে, ছোটো ক্লাউস মরা ঘোড়ার ছালটা ছাড়িয়ে, বেশ করে হাওয়ায় শুকিয়ে, একটা থলিতে ভরে, থলিটা কাঁধে ফেলে শহরের দিকে চলল। চামড়াটা বেচতে হবে।
        অনেক দূরের পথ, মাঝখানে আবার একটা প্রকাণ্ড ঘন বন। সেখানে পৌছতে-না-পৌছতে ভয়ংকর ঝড় উঠল। সে কী মেঘের ঘনঘটা আর ঝমঝমে বৃষ্টি, তার উপর কালো কালো ঝাউগাছগুলোর বাতাসে সে কী দোল খাওয়া! তাই দেখে ছোটো ক্লাউস বেচারা এমনি ভড়কে গেল যে পথটথ ভুলে একাকার। পথ খুঁজে পাবার আগেই সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামল।
=============================
        অল্প কিছু দূরেই একটা খামারবাড়ি দেখা গেল। জানলার সব খড়খড়ি বন্ধ, কিন্তু র‌্যাক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছিল। ছোটো ক্লাউস এগিয়ে গিয়ে, দরজায় টোকা দিল। চাষী-বৌ এসে দরজা খুলল বটে, কিন্তু ক্লাউস একটু আশ্রয় চায় শুনবামাত্র, দয়া করে বলে দিল, “অন্য জায়গায় চেষ্টা করে, বাপু। এখানে হবে না। কর্তা বাড়ি নেই। তিনি না এলে বাইরের লোককে ঘরে ঢুকতে দেওয়া যায় না।”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “বেশ, তা হলে এই ঝড়-বাদলায় রাতটা আমাকে বাইরে কাটাতে হবে।” তাই শুনে চাষী-বৌ ওর নাকের উপর দড়াম্ করে দরজা বন্ধ করে দিল।
        কাছেই একটা খড়ের গাদা। সেটার আর বাড়ির মধ্যিখানে খড়ের চাল দেওয়া একটা মাচা। তাই দেখে ছোটো ক্লাউস মনে মনে বলল, ঐখানে উঠে পড়া যাক। দিব্যি খাস খাটের মতো হবে। এখন বাড়ির ছাদের ঐ সারসটা না আবার বুদ্ধি করে নেমে এসে আমার পায়ে ঠোকরায়? বাড়ির ছাদে সারসের বাসা। সেখানে সারস পাহারায় দাঁড়িয়ে ছিল, তার চোখে এক ফোটা ঘুম নেই, অথচ বেশ রাত হয়ে গেছিল।
        তার পর ছোটো ক্লাউস আঁকড়ে-মাকড়ে মাচায় উঠে, এপাশওপাশ করে খড়টড় সরিয়ে, নিজের জন্য দিব্যি আরামের একটা ঘুমোবার জায়গা করে নিল। মাচার পাশেই বাড়ির জানলার খড়খড়ি। সেগুলো আবার ভালো করে বন্ধ হয় না। মাচার উপর থেকে ছোটো ক্লাউস বাড়ির ভিতর কি হচ্ছে না হচ্ছে সব দেখতে পাচ্ছিল।
        দেখল মস্ত একটা টেবিলে রুটি, মদ, ঝলসানো মাংস আর মাছভাজা সাজানো রয়েছে। চাষী-বৌ আর গির্জার পাশে গোরস্থানে যে লোকটা কবর খোড়ে, তারা দুজনে টেবিলে বসে আছে। ঘরে আর কেউ নেই। চাষী-বৌ তার অতিথিকে এক গেলাস মদ ঢেলে দিচ্ছিল আর সে ব্যাটা ছুরি দিয়ে বড়ো গোছের এক টুকরো মাছ কেটে নিচ্ছিল; মনে হল মাছভাজা তার ভারি পছন্দ।
        ব্যাপার দেখে ছোটো ক্লাউস মনে মনে বলল, “দেখেছ সব খাবার নিজেদের জন্য রেখেছে! কাজটা তো ভালো নয়। আহ, আমাকে যদি একটুখানি দিত।’ এই ভেবে যতটা পারে জানলার কাছে এগিয়ে মাথা বাড়িয়ে দেখতে লাগল। এবার চোখে পড়ল চমৎকার একটা কেক। আরে, এ যে রীতিমতো ভোজ!
        একটু বাদেই রাস্তা থেকে ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শোনা গেল। চাষী বাড়ি ফিরছে।
        চাষী লোকটা ছিল ভারি অমায়িক, তবে তার একটা বিশেষ দুর্বলতা ছিল যে যারা কবর খোঁড়ে তাদের উপর সে হাড়ে চটা ছিল, তাদের দেখলেই ক্ষেপে উঠত। এদিকে পাশের শহরে যে লোকটা কবর খুঁড়ত, সে আবার চাষীর বৌয়ের আপন মাসতুতো ভাই। দুজনে এক সঙ্গে মানুষ হয়েছিল, তাদের মধ্যে ভারি ভাব ছিল। আজ চাষী বাড়ি থাকবে না জেনেই বেচারা বোনকে দেখতে এসেছিল। বোনও আহ্লাদে আটখানা হয়ে ভাড়ারে যা কিছু ভালো জিনিস ছিল, সব বের করে এনে তাকে পেট ভরে খাওয়াতে বসেছিল।
        এখন ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শুনে দুজনে আঁতকে উঠল। ঘরের কোণে মস্ত একটা খালি সিন্দুক ছিল; চাষী-বৌ ভাইকে বলল, “শিগগির ওর মধ্যে ঢোক।” ভাইও তাড়াতাড়ি সিন্দুকে ঢুকে পড়ল, সে তো ভালো করেই জানত বাড়িতে হঠাৎ একজন কবর-খোঁড়ার লোক দেখলে চাষী ক্ষেপে প্রায় পাগল হবে।
        চাষী-বৌ তখন তাড়াহুড়ো করে মদের বোতল, খাবার জিনিস ইত্যাদি তার পাউরুটি করার তন্দুরে ভরে রাখল। স্বামী যদি ঘরে ঢুকে টেবিলে এত খাবার-দাবার দেখে তা হলেই সে জানতে চাইবে কার জন্য এত আয়োজন!
        মাচা থেকে ছোটো ক্লাউস ভোজ-সামগ্রী লুকিয়ে ফেলার ব্যাপার দেখে, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, “ইস্! কি কাণ্ড!” তাই শুনে চাষী চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কে ওখানে?” এই বলে উপরে তাকিয়েই ছোটো ক্লাউসকে দেখতে পেল। চাষী বলল, “ও কি, ওখানে শুয়ে আছ কেন? এসো, আমার সঙ্গে বাড়ির ভিতরে এসো।”
        ছোটো ক্লাউস তখন বুঝিয়ে বলল যে সে পথ হারিয়েছে, চাষী কি তাকে এক রাত্তিরের মতো আশ্রয় দেবে না? লোকটা ভারি অমায়িক, শুনেই বলল, “সে কী কথা, নিশ্চয়ই দেব। শিগগির এসে আমার সঙ্গে, কিছু খাওয়া-দাওয়া করা যাক৷”
        চাষী-বৌ দুজনকে খুব আদর দেখিয়ে ডেকে নিল। তার পর লম্বা টেবিলটার এক দিকে একটা চাদর পেতে মস্ত এক গামলা জাউ এনে দিল। চাষী তো মহা তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়া শুরু করে দিল, কিন্তু ছোটো ক্লাউস ও-খাবার মুখে তুলতে পারল না। তার কেবলই মনে হচ্ছিল তন্দুরের মধ্যে সেই চমৎকার কেক, মাছ, মাংস পোরা রয়েছে!
        থলির মধ্যে ঘোড়ার চামড়াটা ছিল; থলিটাকে সে নামিয়ে টেবিলের তলায় রাখল। মুখে জাউ রোচে না, কি আর করে, পা দিয়ে থলিটাকে দিব্যি করে মাড়াতে লাগল। মাড়ানির চোটে শুকনো চামড়া থেকে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ বেরুতে লাগল।
        ছোটাে ক্লাউস বলল, “এই, চুপ, চুপ!” যেন থলিটাকেই বলছে। বলেই আবার থলি মাড়াল, তাতে আরো জোরে ক্যাঁচ, ক্যাঁচ শব্দ হল।
        চাষী অবাক হয়ে বলল, “তোমার থলিতে কি?”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “ও কিছু না, ও আমার একটা ক্ষুদে ভেল্কিওয়ালা ও বলছে আমাদের নাকি এই জইয়ের জাউটা খেতে হবে না। ও নাকি ভেল্কি করে আমাদের জন্য ঝলসানো মাংস, মাছভাজা আর কেক তন্দুরের মধ্যে এনে রেখেছে!”
        চাষী বলল, “কি বললে, ভেল্কিওয়ালা? কই, দেখি তো।” এই বলে হুড়মুড় করে উঠে তন্দুর খুলে দেখতে গেল ভেল্কিওয়ালা সত্যি কথা বলেছে কি না। তন্দুর খুলে দেখে ওমা, সত্যিই তো, তন্দুরের মধ্যে মাছ, মাংস, কেক! ভেল্কিওয়ালা তো তার কথা রেখেছে দেখা যাচ্ছে! এদিকে চাষী-বৌ ভয়ের চোটে একটি কথাও বলতে পারল না, তা ছাড়া সেও চাষীর চাইতে কম অবাক হয় নি। কি আর করে, খাবার-দাবারগুলো বের করে স্বামীর আর তার অতিথির সামনে সাজিয়ে দিল আর তারা দুজনে মহানন্দে ভোজ শুরু করল।
        একটু বাদে ছোটাে ক্লাউস আবার থলি মাড়াতে লাগল, আবার ক্যাঁচ কোঁচ শব্দ বেরুল।
        চাষী বলল, “ভেল্কিওয়ালা আবার কি বলে?”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “বলছে ও নাকি ভেল্কি করে আমাদের জন্য তিন বোতল মদ আনিয়েছে। তন্দুরের আড়ালে রয়েছে।” কাজেই চাষী-বৌ বাধ্য হয়ে সেগুলোকেও বের করে আনল। চাষী এক গেলাস মদ ঢালতে ঢালতে ভাবতে লাগল ঐরকম একটা ভেল্কিওয়ালা পাওয়া গেলে তো খাসা হয়।
        শেষটা সে ছোটো ক্লাউসকে বলল, “তোমার ঐ ভেল্কিওয়ালাটি তো বেড়ে। একবার দেখতে ইচ্ছে করছে। দেখা দেবে নাকি? তুমি কি বল?”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “তা, আমি যা বলব ও তাই করবে! কি হে করবে না?” এই বলে থলিটাকে একটু মাড়িয়ে বলল, “শুনলে না? বলছে দেখা দেবে। তবে আগে থাকতেই তোমাকে সাবধান করে রাখছি, কেলে বিটকেল দেখতে। সত্যি কথা বলতে কি, ওকে দেখে কি হবে?”
        “আরে না, না, আমি ঘাবড়াব না। কেমন দেখতে?”
        “কেমন আবার হবে? একটা কবর-খোঁড়া লোকের মতোই হবে। তা ছাড়া আর কি!”
        চাষী বলল, “এ্যাঁ! বল কি? কবর-খোঁড়া লোকের মতো? এই মাটি করেছে! আমি যে তাদের দেখতে পারি না, তা জান? সে যাই হোক গে, এতো আর সত্যিকার কবর-খোঁড়া নয়, এ আসলে তোমার ভেল্কিওয়ালা, আচ্ছা তাই সই। আমার যথেষ্ট বুকের পাটা আছে, কিন্তু ব্যাটাকে বেশি কাছে আসতে দিও না, তাই বলে।” ক্লাউস বলল, “দেখি,ভেল্কিওয়ালাকে বলে দেখি, কি বলে।” এই বলে থলি মাড়িয়ে মহা ক্যাঁচ - কোঁচ শব্দ তুলে, কান পেতে শোনার ভান করতে লাগল।
        “কি, বলছে কি?”
        “বলছে যে ঘরের কোণে ঐ সিন্দুকের ভিতরে গিয়ে ও ঢুকবে। তার পর সিন্দুকের ডালা তুললেই ওকে দেখতে পাবে। দেখা হয়ে গেলে, কিন্তু ডালাটা আবার ভালো করে বন্ধ করে দিও, ভাই।”
        “ডালাটা তুলে ধরতে তুমি সাহায্য করবে তো? বেজায় ভারী যে।” এই বলে চাষী সিন্দুকের কাছে গেল। এখন ঐ সিন্দুকটার মধ্যেই চাষী-বৌ তার ভাইকে লুকিয়ে রেখেছিল।
        সে বেচারার যা অবস্থা! হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে, সমস্ত গা কাঁপছে, পাছে ধরা পড়ে যায় এই ভয়ে নিশ্বাস পর্যন্ত ফেলতে পারছে না!
        চাষী তো ডালাটা একটু তুলে, তলা দিয়ে উকি মারল। উকি মেরেই, “উঃফ!” বলে ভয়ে পেছিয়ে এল। “উরি বাবা! দেখলাম ওকে! সত্যি হুবহু আমাদের এই শহরের কবর-খোড়া লোকটার মতো দেখতে–ইস্‌! কী ভীষণ।”
        সে যাই হোক, চাষী আবার টেবিলে এসে বসে, ভয় তাড়াবার জন্য, গেলাসের পর গেলাস মদ খেতে লাগল। তার সাহস ফিরে এল। চাষী কিম্বা তার অতিথি, দুজনার মধ্যে কারও শুতে যাবার কথা মনে হল না। গভীর রাত পর্যন্ত ওরা ঐখানে বসে খাওয়া-দাওয়া গাল-গল্প করল।
        চাষী জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, ঐ ভেল্কিওয়ালাকে আগে কখনো দেখেছিলে?”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “দূর, দূর, আরে তুমি কথাটা না তুললে, ওকে দর্শন দিতে বলার বিষয় আমার মনেই আসত না! ও তো জানেই ও দেখতে ভালো নয়; গায়ে পড়ে লোকের সামনে বেরুতে ওর ভারি সঙ্কোচ। ও আমার সঙ্গে কথা বলে, আমি ওর সঙ্গে কথা বলি, সেই কি যথেষ্ট নয়?”
        চাষী তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, যথেষ্ট বৈকি? তারপর একটু দো-মনা করে আবার বলল, “দেখ, তোমার ঐ ভেল্কিওয়ালাটিকে আমি নিতে চাই। বেচতে আপত্তি আছে? যা দাম বল। পত্রপাঠ এক ঘড়া রুপোর টাকা দিতেও আমার আপত্তি নেই।”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “ও আবার কেমন কথা, ভাই? ওরকম একটা বিশ্বাসী ভালো চাকর, ওকে হাতছাড়া করার কথা আমি কি ভাবতে পারি? দেখ, ওর ওজনের দশগুণ সোনার সমান ওর দাম।”
        চাষী বলল, “না, ভাই, সোনা দেবার তো আমার ক্ষমতা নেই। তবে ওকে নিতে আমার বড়োই ইচ্ছা করছে, অবিশ্যি ওর ঐ বিশ্ৰী চেহারাটা আর দেখতে চাই না।”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “সে ভয় নেই। আর তাই যদি বল ভাই, আমাকে আজ রাতে আশ্রয় দিয়ে যে উপকারটা করলে তোমাকে না দিতে পারি, এমন কিছু ভাবতে পারি না। আচ্ছা, এক ঘড়া রুপোর টাকার বদলে ওকে তোমায় দিয়ে দেব, কিন্তু দেখো ভাই, ঘড়াটা যেন ঠেসে ভরা হয়।”
        চাষী বলল, “সে আর বলতে! তার উপর ফাউ দেব ঐ সিন্দুক। ওটাকে আর বাড়িতে রাখা নয়, ওটা দেখলেই আমার কবর-খোঁড়ার বিকট মুখটা মনে পড়বে।”
        সেইরকম কথাই হল। ছোটো ক্লাউস চাষীকে শুকনো চামড়াস্থদ্ধ থলিটা দিয়ে দিল আর তার বদলে পেল একটি ঘড়া রুপোর টাকা। তার উপর টাকা আর সিন্দুক বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য, চাষী ওকে একটা এক চাকাওয়ালা ঠেলাগাড়িও দিল।
        তার পর তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, ঠেলাগাড়ি ঠেলতে ঠেলতে ছোটো ক্লাউস রওনা দিল। ঠেলাগাড়িতে সিন্দুক, সিন্দুকে সেই হতভাগা কবর-খোঁড়া লোকটা।
        বনের ওধার দিয়ে একটা চওড়া গভীর নদী বয়ে যাচ্ছিল। তার স্রোতের এমনি জোর যে কেউ সাঁতরে পার হতে পারত না, তাই কিছুদিন আগে একটা পুল তৈরি করা হয়েছিল। পুলের উপর দিয়ে অর্ধেকটা পথ গিয়ে, ছোটাে ক্লাউস হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁড়িয়ে অমনি সিন্দুকের মধ্যে লোকটাকে শুনিয়ে শুনিয়ে জোরে জোরে বলতে লাগল, “আচ্ছা, এই বিরাট ভাঙা-চোরা সিন্দুকটা বয়ে বেড়াবার কোনো মানে হয়? এমন ভারী যে মনে হয় ইট পাটকেল দিয়ে ভর্তি; উঃফ, এটাকে ঠেলে ঠেলে একেবারে ছাপ ধরে গেল। দিই ছুঁড়ে নদীতে ফেলে। নদীর যদি ইচ্ছা হয় তো ওটাকে ভাসিয়ে আমার বাড়ি পৌছে দিক আর যদি ইচ্ছা না হয় তো থাক গে; আমার দরকার নেই।”
        এই-না বলে ছোটো ক্লাউস সত্যি সত্যি সিন্দুকের একদিক তুলে ধরল, যেন এইবার দেবে ফেলে। সিন্দুকের ভিতর থেকে চাষীর-বৌয়ের ভাই আঁতকে উঠল, “কর কি! কর কি! আগে আমাকে বেরুতে দাও, ভাই।”
        ছোটাে ক্লাউস বলল, “ই কি কাণ্ড! সিন্দুকটাকে ভূতে পেল নাকি? তা হলে তো যত তাড়াতাড়ি পাচার করতে পারি, ততই ভালো।”
        কবর-খোঁড়া লোকটা ব্যস্ত হয়ে বলল, “না, না, ভাই, দোহাই তোমার, আমাকে ছেড়ে দাও, তা হলে তোমাকে আরেক ঘড়া টাকা দেব।”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “ও, তাই বুঝি? তা হলে তো অন্য কথা।” এই বলে সিন্দুকটি পত্রপাঠ নামিয়ে, তার ডালা তুলে ধরল। অমনি সেই লোকটা গুটিগুটি বেরিয়ে পড়ে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। আগে সিন্দুকটাকে পা দিয়ে ঠেলে জলে ফেলে, তার পর ছোটো ক্লাউসকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে যেমন কথা হয়েছিল, এক ঘড়া রুপোর টাকা দিল।
        রুপোর টাকা দিয়ে ছোটো ক্লাউসের ঠেলাগাড়ি বোঝাই হয়ে গেল। বাড়ি ফিরে, ঘরে ঢুকে, ঠেলাগাড়ি উলটে মেঝের উপর রুপোর টাকাগুলো ফেলতেই ছোটো-খাটো একটা পাহাড় তৈরি হল। তখন ছোটো ক্লাউস বলল, “মানতেই হবে যে ঘোড়ার চামড়াটা র জন্য ভালো দামই পাওয়া গেছে! দুঃখের বিষয়, বড়ো ক্লাউস যেই শুনবে ঘোড়ার চামড়া বেচে আমি বড়োলোক বনে গেছি, ও তো বেজায় চটে যাবে!”
        তার পর ছোটো ক্লাউস করল কি, বড়ো ক্লাউসের কাছে একটা ছেলেকে পাঠাল, তার দাড়িপাল্লাটা চেয়ে আনতে।
        শুনে বড়ো ক্লাউস তো অবাক, “ও ব্যাটা আবার কি ওজন করতে চায়?” কৌতুহল রাখতে না পেরে সে বুদ্ধি করে দাড়িপাল্লার তলায় বেশ করে খানিকটা কাদা মাখিয়ে দিল। তার পর যখন দাড়িপাল্লা ফেরত এল, বড়ো ক্লাউস দেখল তার নীচে তিনটে রুপোর টাকা আটকে রয়েছে! সে তো বেজায় চমকে গেল, “বলিহারি এ কি কাণ্ড রে বাবা!”
        তখুনি সে ছোটো ক্লাউসের বাড়ির দিকে রওনা দিল। সেখানে গিয়ে মহা তম্বি করতে লাগল, “অত টাকা কোথায় পেলে বল, নয় তো ভালো হবে না।”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “কি মুস্কিল! ঘোড়ার চামড়াটা বেচে পেয়েছি, আবার কোথায় পাব?”
        বড়ো ক্লাউস একেবারে ছা! “বল কি? ঘোড়ার চামড়ার অত দাম কে ভেবেছিল?” তখুনি দৌড়ে বাড়ি গিয়ে নিজের চারটে ঘোড়ার মাথায় বাড়ি দিয়ে মেরে, তাদের ছাল ছাড়িয়ে শহরে গিয়ে পথে পথে সে ফেরি করতে বেরুল।
        “চামড়া চাই, চামড়া চাই, ভালো ভালো চামড়া।” শহরের সব মুচির আর চামড়াওলারা দৌড়ে এসে, দাম জিজ্ঞাসা করতে লাগল।
        বড়ো ক্লাউস বলল, “একেকটার দাম এক ঘড়া রুপোর টাকা।” তারা বলল, “বলি, ক্ষেপলে নাকি? আমরা কি ঘড়ায় ঘড়ায় টাকা গুনি নাকি?
        বড়ো ক্লাউস তবু ডেকে যেতে লাগল, “তাজা চামড়া! কে নেবে ভালো চামড়া!” আর যে আসে তাকেই বলে একেকটা চামড়ার দাম এক এক ঘড়া টাকা।
        শেষপর্যন্ত একজন খদ্দের মহা রেগে বলল, “অসভ্য কোথাকার! এ শুধু আমাদের বোকা বানাবার মতলব!” তখন সবাই মিলে ওকে ঘিরে ভ্যাংচাতে লাগল, “চামড়া চাই! তাজা চামড়া! ভালো চামড়া। ব্যাটা ন্যাকামো করবার জায়গা পায় নি! দে ব্যাটাকে শহর থেকে তাড়িয়ে! নইলে ওর নিজের পিঠের চামড়াই আস্ত থাকবে না” এই বলে অপমান করে ওরা ওকে তাড়িয়ে দিল।
        বড়ো ক্লাউস বিড় বিড় করে বকতে লাগল, “ছোটো ক্লাউসকে এর শোধ দিতে হবে। আজ রাতে ভালো করে ঘুমোস, কারণ সে ঘুম আর ভাঙবে কি না সন্দেহ।”
        এদিকে হয়েছে কি, সেদিন সন্ধেবেলাই ছোটো ক্লাউসের ঠাকুমা মারা গেল। যত দিন বেঁচেছিল বুড়ি ছোটো ক্লাউসের সঙ্গে শুধু রাগমাগ, খারাপ ব্যবহার করত। কিন্তু বুড়ি মরে গেছে দেখে ছোটো ক্লাউসের সত্যি ভারি দুঃখ হল। ঠাকুমাকে তুলে নিয়ে সে নিজের গরম বিছানায় শোয়াল, গরম লেগে যদি বেঁচে ওঠে। নিজে ঘরের কোণে চেয়ারে বসে রাত কাটাবে ঠিক করল, এমন সে হামেশাই করত।
        রাত বারোটার সময়, কুড়ল হাতে বড়ো ক্লাউস ঘরে ঢুকল। খাটটা কোথায় তার জানা ছিল; সটাং সেখানে গিয়ে মরা ঠাকুমার কপালে ভীষণ এক ঘা দিয়ে বলল, “এবার হল তো! আর কখনো আমাকে বোকা বানাতে হবে না!” এই বলে ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরে গেল।
        ছোটো ক্লাউস এদিকে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বলল, “দেখলে কি খারাপ! আমাকে মারবার ইচ্ছা! ভাগ্যিস ঠাকুমা বেচারি আগেই মরে গেছে, নইলে বড়ো ব্যথা লাগত!”
        পরদিন সন্ধেবেলা গাঁয়ের কাছে একটা গলিতে বড়ো ক্লাউসের সঙ্গে দেখা। তাকে দেখে বড়ো ক্লাউস থমকে থেমে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। “সে কি! তুমি মর নি? আমার ধারণা ছিল কাল রাতে তোমায় সাবাড় করেছি!”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “তাই বটে! তুমি বড়ো খারাপ লোক হে, আমাকে মারতে ঘরে ঢুকেছিলে, কিন্তু খাটে আমি শুই নি, ঠাকুমা শুয়েছিল। তাকেই তুমি কুড়লের ঘা মেরেছিলে। তোমার ফাঁসি হওয়া উচিত।”
        বড়ো ক্লাউস বলল,“ও হো, সে কথা বুঝি তুমি বলে বেড়াবে মনে করেছ? উহু, সেটি হচ্ছে না ’ বড়ো ক্লাউসের হাতে ছিল মস্ত একটা ছালা। হঠাৎ ছোটো ক্লাউসের কোমর জাপটে ধরে বড়ো ক্লাউস তাকে দেখতে-না দেখতে ছালার মধ্যে বেঁধে ফেলল। “এক্ষুনি তোমাকে জলে ডুবিয়ে মারব। আমার নামে বলে বেড়ানো বেরুবে!” কিন্তু নদীও অনেক দূরে আর ছোটাে ক্লাউসও খুব হালকা ছিল না। গির্জার পাশ দিয়ে পথ। ভিতরে বাজনা বাজছিল, উপাসনা আরম্ভ হচ্ছিল। লোকজনের ভিড়ের মধ্যে বড়ো ক্লাউস হঠাৎ একটা লোককে দেখতে পেল, তার সঙ্গে ওর বিশেষ দরকার ছিল। বড়ো ক্লাউস ভাবল, ছোটো ক্লাউস তো আর পালাতে পারবে না। কেউ ওকে ছেড়েও দেবে না, কারণ সবাই তো দেখছি গির্জার ভিতরে। একবার ঢুকে লোকটাকে বারান্দায় ডেকে এনে কাজটা সেরে ফেলি।” এই ভেবে ছালাটাকে নামিয়ে রেখে বড়ো ক্লাউস তাড়াতাড়ি গির্জার ভিতরে গেল।
        ছালার ভিতরে বসে বসে ছোটো ক্লাউস বলতে লাগল, “কি মুস্কিল! কি মুস্কিল!” এপাশ ওপাশ নানা কসরৎ করেও বেচারা কোনো সুবিধা করতে পারল না; ছাল-বাঁধা দড়িটা এতটুকু ঢিল দিল না। ঠিক সেই সময় একজন খুত্থুড়ে বুড়ো রাখাল ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিল। তার মাথাটি শনের মুড়ি, হাতে একটা মোটা ডাণ্ডা। লোকটা মস্ত একপাল গোরু বলদ তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তা ঐরকম থুত্থুড়ে বুড়ো তাদের সামলাতে পারবে কেন? একটা বলদ ছুটে গিয়ে ছালাটার সঙ্গে ধাক্কা খেল। ধাক্কা খেয়ে ছালাটা বার দুই গড়াল। অমনি ভিতর থেকে ছোটো ক্লাউস বলে উঠল, “দোহাই তোমার! এই কি আমার মরার বয়স? আমাকে ছেড়ে দাও ভাই।”
বুড়ো রাখাল তাই শুনে বলল, “সে কী! ছালার ভিতর মানুষ নাকি?” অনেক কষ্টে নিচু হয়ে বুড়ো ছালার মুখের দড়ি খুলে দিয়ে বলল, “বলদটা তোমাকে জখম-টখম করে নি তো, ভাই?” ছোটো ক্লাউস যেভাবে ছালা থেকে লাফ দিয়ে বেরুল তাতেই বোঝা গেল ওর একটুও লাগে নি। পথের ধারে একটা শুকনো গাছের গুড়ি ছিল, বেরিয়েই সেটাকে সে খুঁড়ে তুলতে লেগে গেল। তার পর সেটাকে ছালাতে ভরে, ছালার মুখ বেঁধে, বড়ো ক্লাউস সেটাকে যেখানে যেমন ভাবে রেখে গেছিল, ঠিক তেমনি করে রেখে দিল। ততক্ষণে গোরু-বলদ অনেক দূর এগিয়ে গেছিল।
        বুড়ো তখন ছোটো ক্লাউসকে বলল, “এই গোরু-বলদগুলোকে যদি আমার হয়ে গাঁয়ে ওদের আস্তানায় পৌছে দাও, তা হলে বড়ো ভালো হয়। একেবারে ক্লান্ত হয়ে গেছি, তা ছাড়া গির্জায় যেতে বড্ডো ইচ্ছা করছে।”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “তুমি আমার এত উপকার করলে, তোমার জন্য এটুকু করব না?” এই বলে বুড়োর হাত থেকে ডাণ্ডা নিয়ে গোরুর পিছন পিছন চলল।
        একটু পরেই বড়ো ক্লাউস দৌড়তে দৌড়তে ফিরে এসে, ছালাটাকে আবার কাঁধে তুলেই ভাবল, আরে, এটাকে এখন কত হালকা মনে হচ্ছে! একটু বিশ্রাম নিতে পারলে এইরকমই হয়।” এই বলে ট্যাঙস্-ট্যাঙস্ করে সে ছালা কাঁধে নদীরদিকে চলল। সেখানে পৌছে ছালাটাকে ছুঁড়ে জলে ফেলে দিয়ে, চীৎকার করে বলল, “ঠিক হয়েছে, ছোটো ক্লাউস! আর আমাকে ঠকাতে পারবে না।”
        তার পর বড়ো ক্লাউস বাড়ির দিকে ফিরল। মাঝপথে একটা মোড়, সেখানে অনেকগুলো রাস্তা এসে মিলেছে। হবি তো হ, সেই মোড়ে ছোটো ক্লাউসের সঙ্গে দেখা, তার সঙ্গে আবার একপাল গোরু-বলদ!
        বড়ো ক্লাউস তো অবাক! “ই কি! সত্যি সত্যি তুমি নাকি? তবে কি শেষপর্যন্ত তোমাকে ডোবাই নি?”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “তা চেষ্টার ক্রটি রাখ নি। তবে তোমাকে সব কথাই খুলে বলি। আমাকে ডুবিয়ে দিয়েছিলে বলে আমি তোমার কাছে বড়োই কৃতজ্ঞ; দেখতেই পাচ্ছ যে তার ফলে আমি কেমন বড়োলোক হয়ে গেছি। অবিশ্যি যখন তুমি আমাকে ছালায় পুরেছিলে তখন বেজায় ভয় পেয়েছিলাম। তার পর পুলের ওপর থেকে যখন আমাকে ঠাণ্ডা জলে ছুড়ে ফেললে, কান ঘেষে বাতাসের সে কী সাঁই সাঁই শব্দ। তখুনি একেবারে তলিয়ে গেলাম, তবে একটুও লাগে নি, কারণ পড়েছিলাম কচি নরম ঘাসের ওপর। অমনি ছালার মুখ খুলে গেল আর অপরূপ রূপসী এক কন্যে আমার হাত ধরে বলল, “তুমিই কি ছোটো ক্লাউস? এই নাও, এই গোরুকটা তোমার জন্য। এই পথে মাইল খানেক এগিয়ে গেলে দেখবে এর চাইতেও বড়ো একপাল গোরু চরছে; সেগুলোও তোমাকে দিলাম।”
        ওর কথায় বুঝলাম যে এই নদীটা হল গিয়ে সাগরবাসীদের একটা রাজপথ গোছের কিছু; ঐ পথে ওরা চলাফেরা করে, গাড়ি হাঁকায়। ঐ পথ ধরে ওরা ডাঙার মধ্যে যেখানে নদীটা মাটি থেকে উঠেছে, সেই অবধি যায় আর ঐ পথেই ফেরে। আহা, জলের নীচের ঐ দেশের মতো সুন্দর দেশ আর হয় না। লোকজনদের সাজ-পোশাকের কী বাহার। আর নালা দিয়ে, বেড়া দিয়ে ঘেরা সব ঘাস জমিতে কত হাজার হাজার গোরু-বলদ চরে বেড়াচ্ছে!”
        বড়ো ক্লাউস জিজ্ঞাসা করল, “তবে তুমি সাত তাড়াতাড়ি জল থেকে উঠে এলে কেন?”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “ওমা, এই যে বললাম সুন্দর মেয়েটি আমাকে বলেছিল ঐ পথ দিয়ে এক মাইল গেলে আরো বড়ো একপাল গোরু পাব। ঐ পথ মানে নদীর তলার ঐ জলপথ, ও তো আর আমাদের ডাঙার পথে চলতে পারে না। এখন নদীটা চলেছে একে বেঁকে, পথটাও তাই লম্বা; তাই ভাবলাম উঠে এসে ডাঙার পথে গেলে তার অর্ধেক হাঁটতে হবে। কাজেই দেখতে পাচ্ছ এই পথেই চলেছি আমার সমুদ্রের গোরুগুলোকে আনতে।”
        বড়ো ক্লাউস বলল, “সত্যি, তোমার কপালটা ভালো। আচ্ছা, আমি যদি নদীর তলায় যাই, আমাকেও কি ও গোরু দেবে মনে কর?”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “সে আমি কি করে বলব।”
        বড়ো ক্লাউস চটে গেল। “তুমি তো আচ্ছা হিংসুটে দেখছি। নিজের জন্যেই ভালো ভালো সমুদ্রের গোরু রাখতে চাও নাকি? শোনো বলি, হয় তুমি আমাকে নদীর ধারে বয়ে নিয়ে গিয়ে জলে ফেলবে, নয়তো আমার বড়ো ছোরাটা দিয়ে তোমাকে শেষ করব। মন ঠিক কর।”
        ছোটো ক্লাউস তখন কাকুতি মিনতি করতে লাগল, “দোহাই, অত রেগো না! তোমাকে ছালায় ভরে কি করে বয়ে নিয়ে যাই তাই বল, যা ভারী তুমি! তবে তুমি যদি নিজে নদীর ধারে হেঁটে গিয়ে, ছালার মধ্যে ঢোক, আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে তোমাকে ঠেলে জলে ফেলে দেব।”
        “কিন্তু মনে রেখ সমুদ্রের গোরু যদি না পাই, ফিরে এসে তোমার দফা শেষ করব, এই আমি বলে রাখলাম।” এ ব্যবস্থায় ছোটো ক্লাউস কোনো আপত্তি করল না। দুজনে তখন হেঁটে নদীর ধারে গেল। গোরুগুলোর তেষ্টা পেয়েছিল, জল দেখেই তারাও প্রাণপণে ছুটতে লাগল, এ ওকে ঠেলে সরিয়ে, সবাই আগেভাগে জল খেতে চায়!
        ছোটো ক্লাউস বলল, “দেখ একবার আমার সমুদ্রের গোরুগুলোর কাণ্ড! জলের নীচে নামবার জন্য দেখছ ওদের কী আগ্রহ!”
        বড়ো ক্লাউস বলল, “তা হতে পারে, কিন্তু আগে আমাকে সাহায্য কর দিকি?” এই বলে একটা বলদের পিঠে ঝোলানো মস্ত ছালা নামিয়ে, তাড়াতাড়ি তার ভিতর ঢুকে বসেই বলল, “আমার সঙ্গে একটা ভারী পাথর পুরেই দাও, নইলে হয়তো তলা অবধি পৌঁছব না।”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “না, না, সে ভয় নেই।” তবু অত করে বলছে যখন, তখন ছালাতে একটা বড়ো পাথর পুরে, ছালার মুখে দড়ি বেঁধে, দিল সেটাকে ঠেলে জলে ফেলে। গুব করে ছালাটা সোজা নীচে তলিয়ে গেল। তখন গোরুর পাল নিয়ে বাড়ি যেতে যেতে ছোটো ক্লাউস বলতে লাগল, “বড়োই ভাবনা হচ্ছে, লোকটা হয় তো তার সমুদ্রের গোরু পাবে না।”
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য