বাদামগাছ - জার্মানির রূপকথা

        সে আজ অনেক কাল আগেকার কথা—মনে হয় ডজন দুয়েক বছর আগেকার ৷ এক ছিল ধনী লোক আর তার ছিল এক বউ। বউটি যেমন রূপের তেমনি গুণের। তারা দুজনেই দুজনকে খুব ভালোবাসত। কিন্তু তাদের কোনো ছেলেপুলে না থাকায় বউটি দিনরাত মনের দুঃখে গুমরে-গুমরে থাকত। তবু তাদের সংসারে কোনো শিশু এল না। তাদের বাড়ির সামনে ছিল এক আঙিনা আর সেই আঙিনায় একটা বাদামগাছ। শীতকালে একদিন সেই বউ গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে একটা বাদাম পাড়ল৷ বাদামটার খোসা ছাড়াতে গিয়ে কেটে গেল তার একটা আঙুল। আর সেই আঙুল থেকে টপ্‌টপ্‌ করে রক্ত ঝরল তুষারের উপর। সেই রক্ত দেখে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বউটি বললে, “এই রক্তের মতো লাল আর তুষারের মতো সাদা আমার যদি কোনো সন্তান থাকত—” কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ তার মন আনন্দে ভরে উঠল। তার মনে হল সত্যিই বুঝি তার কোলে শিশু আসবে। তার পর সে চলে গেল বাড়ির মধ্যে। এক মাস কাটল, তুষার গলল। দু মাস পরে পুথিবী হয়ে উঠল সবুজ। তিন মাস পর ফুল ফুটল, পাখিরা উঠল গান গেয়ে। চার মাস পর আঙিনাময় সব গাছে ঘন সবুজ পাতা, ফুলে ফুলে ঢেকে গেল ডালপালা। আঙিনাময় শুধু পাখির ডাকের প্রতিধ্বনি। গাছের ডাল থেকে বৃষ্টির মতো ঝরতে লাগল ফুলের পাঁপড়ি। পাঁচ মাসের মাস বউটি দাঁড়াল গিয়ে সেই বাদামগাছের তলায় আর সুগন্ধের আমেজে আনন্দে কানায়-কানায় ভরে উঠল তার হৃদয়। নতজানু হয়ে বসে ঈশ্বরকে সে জানাল ধন্যবাদ। পঞ্চম মাস শেষ হবার পর গাছে গাছে ফল পেকে রসে ভারী হয়ে লাগল ঝুলতে। আর বউটি হয়ে উঠল আগের চেয়ে শান্ত। সপ্তম মাসে সেই বাদামগাছের ফল এমন আগ্রহ নিয়ে সে খেতে শুরু করল যে, তার মন হয়ে উঠল বিষণ্ণ আর শরীর খারাপ। আট মাসের মাস বরকে সে বলল, “আমি যদি মরে যাই তা হলে ঐ বাদামগাছের তলায় আমাকে কবর দিয়ো।” কথাটা বলে মনে হল সে শান্তি পেয়েছে। আবার সে হয়ে উঠল হাসিখুশি। আর ন মাসের মাস তার কোলে এল এক শিশু—তুষারের মতো সাদা, রক্তের মতো টুকটুকে। শিশুটিকে দেখে তার এত আনন্দ হল যে, আনন্দের আবেগে তার হল মৃত্যু।
        বর তাকে সেই বাদামগাছের তলায় কবর দিয়ে অনেকদিন তার জন্য খুব কান্নাকাটি করল। কিন্তু শেষটায় তার মনের ফুর্তি আবার ফিরে এল—আবার সে বিয়ে করল। এই দ্বিতীয় বউয়ের হল একটি মেয়ে। প্রথম বউয়ের সন্তানটি ছেলে— তুষারের মতো ফরসা আর রক্তের মতো টুকটুকে। দ্বিতীয় বউ তার ছোটো মেয়ের দিকে তাকালে তার মনে হত নিজের মেয়েকে সে খুব ভালোবাসে। কিন্তু ছেলেটির দিকে তাকালে তার মনে কোনো আনন্দ জাগত না। দ্বিতীয় বউ ভাবত ছেলেটি তার মেয়েকে বঞ্চিত করে বাপের সব সম্পত্তি পাবে। এই কথা ভাবতে ভাবতে শেষটায় ছোট্টো ছেলেটিকে সে ঘৃণা করতে শুরু করল। তাকে সে চড়চাপড় মেরে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত। ফলে ছোট্টো ছেলেটি তাকে ভীষণ ভয় পেত। ইস্কুল থেকে ফিরে বুঝতে পারত না কোন নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেওয়া যায়।
        একদিন দ্বিতীয় বউ যখন তার ঘরে গেছে তার ছোটো মেয়ে তার কাছে দৌড়ে গিয়ে বলল, “আমাকে একটা আপেল দাও।”
        “এই নে বাছা”, বলে তার মা তাকে দিল একটা বাক্স করে সুন্দর একটা আপেল । বাক্সর ডালাটা খুব ভারী, ডালাটায় ধারাল দাঁত।”
        মেয়েটি বলল, “মা, আমার ছোটো ভাইটিকে একটা আপেল দেবে না?”
        মেয়েটির কথা শুনে দ্বিতীয় বউয়ের মুখ রাগে টকটকে হয়ে উঠল। কিন্তু মেয়েকে সে বলল, “ইস্কুল থেকে ফিরলে তাকে দেব।” কথাটা বলতে বলতে সে দেখল ছেলেটি ইস্কুল থেকে ফিরছে। মেয়ের কাছ থেকে আপেলটা ছিনিয়ে নিয়ে সে বলে উঠল, “তোর ভাইকে এটা দিলে তুই কিন্তু পাবি না।” “এই-না বলে দ্বিতীয় বউ আপেলটা বাক্সয় ভরে ডালা বন্ধ করে দিল। ছোট্টো ছেলেটি দোরগোড়ায় এলে শয়তান বউ নকল মধুর গলায় তাকে বলল, “বাছা, তুই একটা আপেল নিবি?”
        ছেলেটি বলল, “মা । তোমার মুখটা ভয়ংকর রাগী-রাগী দেখাচ্ছে । হ্যা, আমাকে আপেল দাও।”
        বাক্সর ডালাটা তুলে তার সৎমা বলল, "নিবি তো এখানে আয়। —বাক্স থেকে আপেলটা বার করে নে৷” আর ছোটো ছেলেটি আপেল নেবার জন্য যেই-না বাক্সর মধ্যে মাথা ঢুকিয়েছে, অমনি তার সৎমা সজোরে ডালাটা দিল বন্ধ করে। খুষ্ট শব্দ করে ধারাল দাঁতওয়ালা ডালাটা হয়ে গেল বন্ধ। আর সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটির মুণ্ড গড়িয়ে পড়ল আপেলটার পাশে। তার পর সে যা করেছে সে কথা জানাজানি হয়ে যেতে পারে ভেবে বউ পড়ল দারুণ উৎকণ্ঠায় । ড্রয়ার হাতড়ে সে বার করল খানিকটা স্টিকিং প্লাস্টার আর একটা রুমাল। ছেলেটির ধড়ে তার মুণ্ড টা বসিয়ে সে তার গলাটা জড়িয়ে দিল কাপড় দিয়ে যাতে জোড়ের জায়গাটা দেখা না যায়। তার পর দরজার সামনে তাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে আপেলটা তার হাতে রাখল।
        ছোট্টো মেয়েটির নাম মারলিঙ্কা । খানিক পরে রান্নাঘরে গেল সে তার মায়ের কাছে। উনুনের পাশে দাঁড়িয়ে প্রকাণ্ড একটা পাত্রের মধ্যে গরম জল সে নাড়াচ্ছিল।
        মারলিঙ্কা বলল, “মা, দরজার সামনে ভাইটি বসে আছে । মুখটা ভয়ানক ফ্যাকাশে। হাতে একটা আপেল। আমায় সেটা দিতে বললাম। কিন্তু সে কোনো উত্তরই দিল না। তাই আমার গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে উঠল ।”
        তার মা বলল, “আবার যা। এবার সে উত্তর না দিলে তার কান মুলে দিস।”
        তাই মা লিঙ্কা আবার গিয়ে বলল, “ভাইটি, আমাকে আপেলটা দাও।”
        কিন্তু তখনো চুপচাপ থাকতে দেখে মেয়েটি তার কান মুলে দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে দারুণ আতঙ্কে সে দেখল ভাইয়ের মাথাটা খসে পড়েছে। তাই-না দেখে গলা ছেড়ে সে লাগল চেঁচাতে। তার পর চেঁচাতে চেঁচাতে তার মার কাছে দৌড়ে গিয়ে সে বলল, “মা, মা, ভাইয়ের মুণ্ডটা আমি খসিয়ে ফেলেছি।” বলে ক্ৰমাগত চলল কেঁদে। তার কান্না আর: থামতেই চাইল না।
        তার মা বলল, “মা লিঙ্কা, এটা খুব বিপদের কথা। কিন্তু অমন। হৈ চৈ করিস না। তোর ভাইয়ের কী হয়েছে সে কথা কাউকে জানাতে দেওয়া ঠিক হবে না। আমি তাকে দিয়ে স্টু, বানিয়ে ফেলেছি।” এইনা বলে, তার মা ছেলেটিকে কুচিকুচি করে কেটে সেই গরম জলের পাত্রে ফেলে তাকে দিয়ে স্টু বানায়। আর মারলিঙ্কা তার মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে চলল কেঁদে। সেই পাত্রে ঝরঝর করে ঝরল তার চোখের জল। তাই সেই স্টু -তে নুন দেবার দরকার হল না।
        তার পর বাবা এসে খাবার টেবিলের সামনে বসে প্রশ্ন করল, “আমার ছেলে কোথায়?” তার দ্বিতীয় বউ চামচে করে অনেকটা স্ট্রু তুলল আর মারলিঙ্কা চলল কেঁদে। বাবা আবার প্রশ্ন করল, “আমার ছেলে কোথায়?” তার দ্বিতীয় বউ বলল, “সে গ্রামে গেছে তার দাদামশাইয়ের সঙ্গে  দেখা করতে। কিছুদিন সেখানে থাকবে।”
        “আমাকে না বলেই চলে গেল।”
        দ্বিতীয় বউ বলল, “যাবার জন্যে ভারি সে ঝোঁক ধরেছিল । তোমায় বলতে বলেছে, বেশ কিছুদিন সে ফিরবে না।”
        তার বর বলল, “সে যাওয়ায় আমি খুব দুঃখিত হয়েছি। আমাকে অন্তত বলে যাওয়া উচিত ছিল।” তার পর তৃপ্তি করে খেতে খেতে সে বলল, “মারলিঙ্কা, তুই কাঁদছিস কেন? ভাই নিশ্চয়ই ফিরে আসবে।” আরো খানিক পরে সে বলল, “বউ, ভারি সুন্দর স্বাদ হয়েছে। আমাকে আরো খানিকটা দাও।” দ্বিতীয়বার স্টু নিয়েও তার তৃপ্তি হল না। কারণ যত সে খায়, তার ক্ষিদে ততই বাড়ে। “এমন তৃপ্তি করে কখনো খাই নি”, বলে খেতে খেতে টেবিলের তলায় হাড়গুলো সে ফেলতে লাগল। তার বাবা সব স্টু শেষ করার পর মারলিঙ্কা তার দেরাজের কাছে গিয়ে সিলেকর সব চেয়ে ভালো রুমালটা বার করে টেবিলের তলা থেকে সব হাড় আর ছিবড়েগুলো কুড়িয়ে সেগুলো জড়িয়ে রাখল। তার পর কাঁদতে কাঁদতে সেগুলো নিয়ে গেল আঙিনায়। সেই বাদাম গাছটার তলায় সবুজ ঘাসের উপর সে রাখল পুঁটালিটা আর রাখবার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ মন তার হয়ে উঠল অনেক হালকা, কান্না গেল থেমে। ধীরে ধীরে দুলতে শুরু করল। বাদামগাছটি। তার পর সেটার ডালপালা উঠল আগুনের মতো ঝলসে। আর সেই আগুনের মধ্যে থেকে ভারি চমৎকার গান গাইতে-গাইতে উড়ে গেল সুন্দর একটি পাখি। পাখিটি আকাশের অনেক উঁচুতে ঘুরে ঘুরে উড়ল। আর সেটি চলে যাবার পর বাদামগাছ হয়ে উঠল আগেকার মতো। আর হাড়-জড়ানো সেই রুমালটা হল অদৃশ্য। মারলিঙ্কা মনে শান্তি পেল। এমন খুশি হয়ে উঠল যেন তার ভাই বেঁচে রয়েছে। হাসিমুখে সে আবার বাড়ি ফিরল আর খেল তার রাতের খাবার ।
        পাখিটা উড়ে গিয়ে এক স্যাকরার বাড়ির ছাতে বসে গাইতে লাগল।

“সৎমা আমায় মেরেছে,
বাবা আমায় খেয়েছে।
মারলিঙ্কা বোনটি
আমার হাড় কুড়িয়ে
সিল্ক-রুমাল মুড়িয়ে
বাদাম তলায়
—রেখেছে।
কুহ-কুহ পিউ-পিউ
আমার মতো সোনার পাখি
কেউ কখনো
—দেখেছে?”

        স্যাকরা তার কারখানায় বসে একটা সোনার হার গড়ছিল। এমন সময় তার ছাতে পাখিটির গান শুনে সে মুগ্ধ হল। তার পর উঠে ঘরের চৌকাঠ পার হতে গিয়ে সে হারিয়ে ফেলল তার কাজের একটা যন্ত্র৷ সেই যন্ত্রটা অন্য লোকের কাছে ধার করে আনার জন্য সে বেরুল পথে । তার পোশাকের উপর ছিল "এপ্রন’ আর হাতে সেই সোনার হারছড়া। পথে তখন রোদ ঝলমল করছিল। পাখিটিকে দেখার জন্য থেমে উপর দিকে তাকিয়ে সে বলল, “ভারি মিষ্টি গান গাইছিস, পাখি। আর একবার গেয়ে শোনাবি?”
        পাখি বলল, “না, এক গান দু বার আমি গাই না। তবে সোনার ঐ হারছড়া দিলে গানটা আবার গাইতে পারি।”
        হারছড়াটা তাকে দিয়ে স্যাকরা বললে, “এই নে । গানটা আর এক বার গেয়ে শোনা।”
        নেমে এসে হারছড়া নিয়ে পাখি আবার গেয়ে উঠল :

“সৎমা আমায় মেরেছে,
বাবা আমার খেয়েছে।
মারলিঙ্কা বোনটি
আমার হাড় কুড়িয়ে
সিল্ক-রুমালে মুড়িয়ে
বাদাম তলায়
—রেখেছে।
কুহ-কুহ পিউ-পিউ
আমার মতো সোনার পাখি
কেউ কখনো
—দেখেছে?”

        গান গেয়ে পাখিটি উড়ে এক মুচির বাড়ির ছাতে বসে গেয়ে উঠল :
“সৎমা আমায় মেরেছে,
বাবা আমার খেয়েছে।
মারলিঙ্কা বোনটি
আমার হাড় কুড়িয়ে
সিল্ক-রুমালে মুড়িয়ে
বাদাম তলায়
—রেখেছে।
কুহ-কুহ পিউ-পিউ
আমার মতো সোনার পাখি
কেউ কখনো
—দেখেছে?”

গান শুনে লাফিয়ে উঠে মুচি ঘর থেকে বেরুল। রোদ চোখ-ধাঁধানো ঝলমলে বলে হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে ছাতের দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল, “পাখি, কী সুন্দর মিষ্টি গান রে ” তার পর আবার দৌড়ে বাড়ির মধ্যে গিয়ে সে ডাকতে লাগল, “বউ—অ বউ একবারটি এখানে এসে পাখিটিকে দেখো। কী সুন্দর গাইছে। এমন গান কখনো শুনি নি।”
        তার হাঁক-ডাক শুনে রাস্তায় বেরিয়ে এল তার বউ, ছেলেমেয়ে, চাকর-বাকর আর পাড়া-পড়শি সবাই। তারা দেখে, মুচির বাড়ির ছাতে বসে রয়েছে ভারি সুন্দর একটি পাখি। তার ডানা সবুজ আর লাল। গলায় সোনার হার। চোখদুটো তারার মতো জ্বলজ্বলে।
        মুচি অনুনয় করে বলল, “যে-গানটা গাইলি, আর-এক বার সেগানটা গা।”
        পাখি বলল, “না, বিনা দামে এক গান দু বার গাই না। আগে আমায় একটা উপহার দাও।”
        মুচি বলল, “বউ, গোলাবাড়িতে যাও। সেখানকার তাকে দেখকে এক জোড়া লাল জুতো। সেগুলো নিয়ে এসো।” তার বউ জুতো জোড়া নিয়ে এলে মুচি বলল, “পাখি, এই নে। এবার গানটা আরএক বার গেয়ে শোনা।”
        পাখি নেমে এসে বাঁ পা দিয়ে জুতোজোড়া নিয়ে আবার ছাতে উড়ে গিয়ে বসে গাইতে লাগল :
“সৎমা আমায় মেরেছে,
বাবা আমার খেয়েছে।
মারলিঙ্কা বোনটি
আমার হাড় কুড়িয়ে
সিল্ক-রুমালে মুড়িয়ে
বাদাম তলায়
—রেখেছে।
কুহ-কুহ পিউ-পিউ
আমার মতো সোনার পাখি
কেউ কখনো
—দেখেছে?”

        গান শেষ করে পাখিটি উড়ে গেল। তার বাঁ পায়ে ধরা সোনার হারছড়া, ডান পায়ে লাল জুতোজোড়া। তার পর সে নামল এক জাঁতাকলের সামনেকার বাতাবি লেবুর গাছের ডালে। জাতাকলের মধ্যে কুড়িজন তরুণ ছেলে পাথর কাটছিল। শব্দ হচ্ছিল খুট খুট খটাখট। তাদের হাতুড়ির বাড়িতে শব্দ হচ্ছিল ; তুক ঠুক, ধকধক।
        সেই বাতাবিলেবুর গাছের ডালে বসে পাখিটি গেয়ে উঠল :

“সৎমা আমায় মেরেছে,”
শুনেই একটি ছেলে কান খাড়া করে রইল—
“বাবা অামায় খেয়েছে।”
দুজন ছেলে তখন দাঁড়িয়ে উঠল গান শোনার জন্য—
“মারলিঙ্কা বোনটি”
তখন আরো চারজন ছেলে পাথর কাটা বন্ধ করল—
“আমার হাড় কুড়িয়ে
সিল্ক-রুমাল মুড়িয়ে”
আটজন ছেলে শুধু তখন কাজ করছে—
“বাদাম তলায়”
সাতজন ছেলে তখন হাতুড়ি ঠোকা বন্ধ করল—
“—রেখেছে।”
নজন কাজ বন্ধ করল—
“কুহ-কুহু পিউ-পিউ
আমার মতো সোনার পাখি
কেউ কখনো
—দেখেছে?”

        শেষ ছেলেটি এবার কাজ বন্ধ করে গান শুনে বলল, “ভারি মিষ্টি গান গাইছিলি পাখি। আর-এক বার গেয়ে শোনাবি?”
        পাখি বলল, “না, বিনা দামে এক গান দু বার গাই না। তোমাদের জাঁতা-পাথরটা দিলে আবার আমি গাইব।”
        ছেলেটি বলল, “আবার গাইলে নিশ্চয়ই সেটা দেব।”
        পাখি তখন নেমে এল। জাতাওয়ালা আর সেই কুড়িজন তরুণ পাথরটা ধরাধরি করে তুলল। পাথরের মাঝখানের গর্তে মাথা গলিয়ে মাফলারের মতো সেটা গলায় পরে আবার বাতাবিলেবুর ডালে উড়ে গিয়ে বসে সে গাইতে লাগল : -
“সৎমা আমায় মেরেছে,
বাবা আমার খেয়েছে।
মারলিঙ্কা বোনটি
আমার হাড় কুড়িয়ে
সিল্ক-রুমালে মুড়িয়ে
বাদাম তলায়
—রেখেছে।
কুহ-কুহ পিউ-পিউ
আমার মতো সোনার পাখি
কেউ কখনো
—দেখেছে?”

        গান শেষ হলে তাদের কাছে বিদায় নিয়ে সে উড়ে চলল সোজা তার বাবার বাড়িতে। সোনার হারছড়া তার ডান পায়ে, লাল জুতোজোড়া তার বাঁ পায়ে আর গলায় ঝোলান সেই জাতা-পাথরটা।
        তার বাবা, সৎমা আর মারলিঙ্কা খাবার ঘরে বসে তখন ডিনার খাচ্ছিল।
        বাবা বলল, “কেন জানি না আমার মনটা আজ কেমন যেন হালকা আর ফুর্তি-ফুর্তি লাগছে।”
        সৎমা বলল, “তাই নাকি? আমার কিন্তু লাগছে ঠিক উলটো। মনে হচ্ছে একটা যেন কালবৈশাখী ঘনিয়ে আসছে।”
        মারলিঙ্কার কান্না থামতে চাইল না । আর ঠিক সেই সময় পাখিটি উড়ে এসে বসল তাদের ছাতে।
        বাবা বলল, “আমার ভারি ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে বুঝি কোনো পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হবে।
        তার দ্বিতীয় বউ বলল, “তাই নাকি? আমার তো দাঁতে দাঁতে লেগে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে রক্তে আগুন ধরেছে ” এই-না বলে টেবিল ছেড়ে সে উঠে পড়ল। মারলিঙ্কা আগেই উঠে গিয়েছিল। এক কোণে দাঁড়িয়ে দুই বিনুনি দিয়ে চোখ ঢেকে এমন কান্না সে কাঁদছিল যে, চোখের জলে সপসপে হয়ে ভিজে উঠেছিল বিনুনি দুটো।
        পাখি তখন সেই বাদামগাছে বসে গেয়ে উঠল :

“সৎমা.আমায় মেরেছে,

        গান শুনে সৎমা দু হাতে কান চেপে-- বলল-তার কানের মধ্যে যেন জলপ্রপাতের গর্জন, চোখ দুটো জ্বলছে আর যেন দেখছে সাপের মতো আঁকাবাকা বিদ্যুতের ঝিলিক।

“বাবা আমায় খেয়েছে,”

        লোকটা বলে উঠল, “শুনছ গো। একটা পাখি কী চমৎকার, গাইছে। সূর্য ঝলমল করছে। পাখিটা তার আনন্দ চাপতে পারছে না।”

“মারলিঙ্কা বোনটি”

        মারলিঙ্কা তখন মুখ তুলে চোখ মুছল। তার বাবা বলল, “কাছে গিয়ে দেখতেই হবে পাখিটা কী রকম।” তার দ্বিতীয় বউ চেঁচিয়ে উঠল, “না-না, যেয়ো না। মনে হচ্ছে: সমস্ত বাড়িটা ষেন দাউ-দাউ করে জ্বলছে।”
        কিন্তু তার বর গেল পাখিকে দেখতে আর পাখি গেয়ে চলল :

“আমার হাড় কুড়িয়ে
সিল্ক-রুমালে মুড়িয়ে .
বাদাম তলায়
—রেখেছে।
কুহু-কুহ পিউ-পিউ
আমার মতো সোনার পাখি
কেউ কখনো
—দেখেছে?”

        শেষ কথাগুলো বলে পাখি সেই সোনার হারছড়া ফেলে দিল।
        সেটা লোকটির গলায় একেবারে মানানসই হয়ে পড়ল। বাড়ির মধ্যে গিয়ে সে বলল, “দেখো, দেখো—সুন্দর পাখিটা আমায় কেমন চমৎকার সোনার একছড়া হার উপহার দিয়েছে।”
        তার বউয়ের মানসিক উত্তেজনা তখন কিন্তু বেড়ে গিয়েছিল । মেঝেয় সে পড়ে গেল। খসে গেল তার মাথার পাতলা টুপি৷ পাখি, গেয়ে চলল:

“সংমা আমায় মেরেছে—”

        সৎমা চেঁচিয়ে উঠল, “দশ গজ তুলো যদি আমার কানে ণ্ড'জতে: পারতাম। আর শুনতে পারছি না।”

“বাবা অামায় খেয়েছে—”

        সৎমা মেঝেয় গড়াগড়ি খেতে লাগল।

“মারলিঙ্কা বোনটি—” !

        মারলিঙ্কা বলে উঠল, “আমিও বাইরে গিয়ে দেখি-পাখি আমায় কিছু দেয় কি না।” এই-না বলে সে বেরিয়ে এল।

“আমার হাড় কুড়িয়ে
সিল্ক-রুমালে মুড়িয়ে”

সেই লাল জুতোজোড়া নীচে ফেলে দিল পাখি।


“বাদাম তলায়
—রেখেছে।
কুহু-কুহু পিউ-পিউ
আমার মতো সোনার পাখি
কেউ কখনো
—দেখেছে?”

        মারলিঙ্কার মন হালকা খুশিতে ভরে উঠল। লাল জুতোজোড়া পরে সে শুরু করে দিল নাচতে। চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে সে বলতে লাগল, “যখন বেরিয়ে আসি তখন ভারি মনমরা হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু এখন আমি-খুশি-খুশি-খুশি। কারণ সোনার পাখি আমাকে দিয়েছে এই সুন্দর জুতোজোড়া।”
        তার মা মেঝে থেকে উঠে চেঁচিয়ে উঠল, “কী অসহ্য গরম। আমি আর সইতে পারছি না। বাইরে বেরিয়ে দেখি ঠাণ্ডা হতে পারি কি না।” কিন্তু যেই-না সে দরজার বাইরে বেরিয়েছে অমনি—দুম। কারণ জাঁতা-পাথরটা পাখি তার মাথায় ছুড়ে ফেলল আর সঙ্গে সঙ্গে সৎমা গেল পড়ে মরে।
        মারলিঙ্কা আর তার বাবা শব্দটা শুনেছিল। ব্যাপারটা কী দেখার জন্য তারা বেরিয়ে এল। বেরিয়ে দেখে চার দিকে ঘন মেঘের মতো ধোঁয়া আর তার মধ্যে লকলক করছে আগুনের শিখা৷ সেই ধোঁয়ার মেঘ আর আগুনের শিখা মিলিয়ে যেতে তারা দেখে—কী আশ্চর্য ! সামনে দাঁড়িয়ে মারলিঙ্কার সেই হারিয়ে-যাওয়া ভাই। এক হাত সে বাড়িয়ে রয়েছে মারলিঙ্কার দিকে, আর-একটি হাত তার বাবার দিকে।
        তারা তিনজনে খুশি হয়ে বাড়ির মধ্যে গেল আর তার পর অনেক ভালো-ভালো খাবার নিয়ে বসল খেতে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য