চকচকে মণি - লীলা মজুমদার

    উত্তর কলকাতার একটা পুরানো পাড়ার ছাদের নতুন ফ্যাশনেবল ফ্লাটে দেয়ালে গাঁথা যে লোহার সিন্দুকটি আছে, মধ্য-কলকাতার কোনো নামকরা দোকান থেকে সেটাকে ওভাবে নিলামে কেনা ওদের ভুল হয়েছিল। তার কারণ ওর একমাত্র চাবিটাও সঙ্গে ঝোলানো ছিল এবং সব নিলামঘরের যেমন নিয়ম, বিক্রির আগের তিনদিন সেটা সম্ভাব্য ক্রেতাদের সুবিধার জন্য, দোকানে প্রকাশ্যভাবে সাজানো ছিল, যাতে যার ইচ্ছা সে এসে পরখ করে দেখে যেতে পারে। অবিশ্যি উপযুক্ত প্রহরীদের সমক্ষে। সেবার কিছু বেশী সংখ্যায় মূল্যবান আসবাবপত্র একসঙ্গে এসে পড়াতে কয়েকজন অস্থায়ী পাহারাদারদের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। তাদের মধ্যে একটু তৎপর আর ধূর্ত কারো পক্ষে সকলের অলক্ষ্যে মোমের প্যাডে ঐ চাবির দুপিঠের ছাপ তুলে নেওয়া এমন কিছু শক্ত কাজ ছিল না।
    দুঃখের বিষয় কারিগর যতই ওস্তাদ হোক না কেন আর সত্যি কথা বলতে কি মিছিমিছি তো আর কানুকে মাছিমাষ্টার নাম দেয়নি লোকে। মাছির মতো খাড়া দেয়াল বেয়ে তরতর করে পাঁচ-ছয় তলা উঠে পড়া ওর কাছে কিছুই ছিল না। শেখাত না কাউকে। নাক সিটকে বলত, মাছিকে টিকটিকিকে ও-ভাবে উঠতেই বা শিখিয়েছে কে? অনেকের ধারনা ছিল কানুর হাত-পায়ের তেলোর গড়ন অন্য রকম। আবার কেউ কেউ বলত লুকিয়ে লুকিয়ে ও নিশ্চয় হাতে পায়ে কিছু পরে নেয়। ঐ যে রেলগাড়িতে এক রকম তোয়ালে ঝুলোবার হুক বিক্রি করে, সেগুলো দেয়ালে বা দরজায় চেপে দিলে সেটে যায়। তাতে হাল্কা তোয়ালে গামছা বেশ ঝুলিয়ে রাখা যায়। কয়েকদিন পরে কে জানে কেন জিনিসটা আর কাজ করে না। যে কারণেই হোক না কেন, মানুষ মাত্রেই মাঝে মাঝে অপঘাতের বলি হতে পারে। এক্ষেত্রে কানু আপাতদৃষ্টিতে হাজার অলৌকিক ক্ষমতা ধরুকনা কেন, তবু এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে আজ সন্ধ্যায় মাটি থেকে দশ বারো ফুট উঁচুতে থাকতেই কেমন করে তার হাত পা হড়কে, দেয়ালে খামচাতে খামচাতে একেবারে নিচে পৌঁছে গেল। হয়তো কোথাও কিছু জখম হয়ে থাকবে, নিদেন হাড়গোড় ভেঙে কিম্বা সরে গিয়ে থাকতেও পারে, মোট কথা বাড়িটার রকের ওপর পড়েছে তো হাত পা এলিয়ে পড়েই রইল। মনে হল হাত পা যেন আর চলে না ; ঐ রকম আধশোয়া ভাবে এলিয়ে আছে তো এলিয়েই আছে। নড়বার চড়বার ক্ষমতা নেই, কিছু ভাবনা চিন্তা করার শক্তি টুকুও নেই। সুখের বিষয় শক্রপক্ষের হাতে পড়লেও ক্ষতি নেই। মাছিমাস্টার অমন কাচা কাজ করে না। একটা হাতে বাধা মাদুলির মধ্যে যা পোরা যায় না, তার বেশী কোনো হাতিয়ারও নেই। সেকালের পেশাদারদের মতো নেংটি পরে, তেল মেখে হড়হড়ে গা, চিমটি দিয়ে ধরা যায় না এমনি প্রায় —ন্যাড়া মাথা নিয়ে ঠিক যেন বিজ্ঞাপন দিতে দিতে কানু কাজে বেরোয় না। নীল সরু ঠাং প্যান্টালুন রবারের চপ্পল (সেটি অবিশ্যি খুলে রাখা হয়) সামনে পেছনে সমান লম্বা চুল, যে কোনো ভদ্রলোকের ছেলের মতো চেহারা। সে দিক দিয়ে কোনো ভয় নেই।
    একইভাবে পড়ে থেকে কেমন ঢুল আসছিল আর সঙ্গে কানে একটা একটানা গুনগুন শব্দও পৌঁছচ্ছিল। হঠাৎ কানুর চোখের ঘুম ছুটে গেল। তার সম্বিৎ ফিরে এল। সে চমকে উঠে গেল। অনেককাল পরে তার গলার ধারে কোতরঙ্গে কাটানো ছোটবেলাকার কথা মনে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার কারণটাও মনে পড়ে গেল। স্নানের ঘাটের পাশে সেখানে খানিকটা পোড়ো জমি ছিল, তার পেছনে পুরনো একতলা বাড়িতে একজন স্থানীয় জমিদার অনেকদিন আগে একটা পাঠশালা করে দিয়েছিলেন। সেই পাঠশালাতে কানু পড়ত। পড়ত মানে যেত আসত, বাইরের ফাটা চাতালে অন্যান্য বিখ্যাত লোকেদের মতো অনেক সময় হাঁটু গেড়ে বসেও থাকত, পকেট থেকে গুলতি বের করে অঙ্ক কষতে ব্যস্ত বন্ধুদের কাগজের গুলি কিম্বা নুড়ি মারত। ক্লাসে অংক স্যার হয় দেখেও দেখতেন না, নয়তো এতই অন্যমনস্ক যে কিছুই লক্ষ্য করতেন না। তাঁর শেষটাও ভারি অদ্ভুত। রহস্যজনকভাবে হঠাৎ একদিন অদৃশ্যও হয়ে গেলেন।
    বিশেষ করে সেই দিনের কথাই হয়তো আজ কুড়ি বছর পরে কানুর মনে পড়ল। তার আগের দিন গঙ্গায় বড় বান ডেকেছিল; সে সময় এদিককার ঘাটটাট সব ডুবে যায় ; পরে চাতালে নতুন নতুন ফাটল দেখা যায়। তা সেদিনও কানু ক্লাসে অংকের খাতা না আনার জন্যে চাতালে হাঁটু গাড়ল। কত করে অংক স্যারকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিল যে খাতাটা খুঁজেই পেল না, তা আনবে। অন্যমনস্ক ভাবে ভ্রুকুটি করে স্যার চাতাল দেখিয়ে দিলেন। রোদের তেজ ছিলনা, হাটু গাড়তে ভালোই লাগছিল। হঠাৎ চোখ পড়ল চাতালে একটা নতুন ফাটল ধরেছে আর তার ভিতরে একটা কোনো সাপের কি অন্য জানোয়ারের চোখ কিম্বা কোন মণিমুক্তাও হতে পারে, কেমন যেন সবুজ আলো ছিটোচ্ছে। তার থেকে কানু চোখ ফেরাতে পারছিল না, অথচ দুচোখ ঝলসে যাচ্ছিল, মাথা ঝিমঝিম করছিল মনে হচ্ছিল এক্ষুনি পড়ে যাবে। বোধয় কেমন একটা ঘোর লেগে গেছিল, তারি মধ্যে টের পেল অংক স্যার কখন এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আঙুল দিয়ে একবার সেই সবুজ আলোটার দিকে দেখিয়ে দিয়েছিল কানু, তারপর আর কিছু মনে নেই। অংক স্যারও হাঁকডাক করে সবাইকে ডেকে দিয়ে সেই যে ‘ডাক্তার ডাকতে যাচ্ছি’, বলে চলে গেলেন তারপর বেমালুম অদর্শন হলেন। ডাক্তার এসে যখন ওকে দেখছিলেন কানুকে ততক্ষণে ক্লাসঘরের বেঞ্চিতে শোয়ানো হয়েছে। মুখে মাথায় জলের ছিটা দিতেই সে সুস্থ হয়ে উঠল। কিন্তু মাস্টাররা সকলেই অংকস্যারের খুব নিন্দা করেছিলেন, তা ছেলেরা একটু দুরন্তপনা করেই থাকে, তাই বলে ঠা-ঠা রোদে গরম সানের ওপর হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা। বিশেষ করে ওই ছেলে যখন হাইস্কুলের সমস্কিত মাস্টারের নিজের কে হয়। এসব কথা যখন হচ্ছিল কানু মটকা মেরে পড়েছিল। তাকে ক’দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছিল; তার মধ্যে সে একবার চাতালের সেই নতুন ফাটলটা দেখে এসেছিল। সেখানে কিছু চকচক করছে না, ব্যাঙ ট্যাঙের চোখই হবেও বা। কিন্তু সেই ইস্তক অংক স্যারকে আর কেউ দেখেনি।
    দেখেনি তো দেখেইনি। কাগজে নিখোঁজ বলে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল; তারা কোতরঙ্গে আর চারপাশের সব ছোট শহর-গায়ে যথাসাধ্য তদন্তও করেছিল। কিন্তু যে স্বেচ্ছায় নিশ্চিহ্ন হয় তাকে কি কখনও পাওয়া যায়? নিঃসন্দেহে তিনি স্বেচ্ছায়ই গিয়েছেন, কারণ মেসবাড়ির পাওনা চুকিয়ে ছোট্ট সুটকেস আর বিছানা বেঁধে পাশের অমিয়-ক্যাবিনে এক টাকা দিয়ে পেট ভরে ভাত রুটি আর ঘ্যাট খেয়ে বাস স্টপের দিকে হাঁটা দিতে তাকে নাকি দেখা গেছিল। তবে খবরটা ভুলও হতে পারে, কারণ একেকজন একেকটা বাস স্টপের কথা বলেছিল। নিতান্ত অস্থায়ী ভাবে কাজে এসেছিলেন, ওর নামে কোনো মামলা বা অভিযোগও ছিল না। কোনো পাওনাদারও হামলা দেয়নি। কাজেই দুদিনে সবাই তাকে বেমালুম ভুলে গেল। কানুও এর পরেও এত মাস্টারের কাছে এত বিচিত্র সাজা পেয়েছিল, যে মনের মধ্যে ক্রমে তার চেহারাটাও ফিকে হয়ে গেছিল।
    আজ কেন জানি চোখ বুজে পড়ে থাকতে থাকতে সেই চেহারাটা স্পষ্ট মনে পড়ল। সাদা পাঞ্জাবী, খাটো থান ধুতি পরনে, পায়ে দড়ির তলা কাপড়ের চটি। রোগা, লম্বা অত্যন্ত ফরসা আর কপালের ঠিক মাঝখানে বেশ বড় এবং লম্বাটে একটা আচিল না জরুল। আসলে অতি ভালো মানুষ, তা কানুও তো কম জ্বালায়নি ওকে। সেজন্য হঠাৎ ভারি লজ্জা হল। পিসেমশায়ের সুপারিশে হাই স্কুলের ছয় ক্লাসে ভরতি হয়েছিল। কোনো মতে টেনেটুনে সাত আর আটও ম্যানেজ করেছিল। কিন্তু ঐ অবধি। আট থেকে নয় তিনবার চেষ্টা করেও যখন হলনা, তখন ওর পিসেমশাই রেগেমেগে কান ধরে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। মা-বাপ ছিল না।
    সেই ইস্তক চরে খেয়েছে কানু। তবে মন্দ কাটেনি গত কুড়িটা বছর। প্রথমে পালোয়ানজির আখড়ায় সাগরেদি, তারপর পালোয়ানজির ফ্রেন্ড ওস্তাদজি তার লোহার কারখানায় ওকে চাকরি দিল। লোহার আলমারি, যে কোনো সেফটি তালা-লাগানো সিন্দুক, বাক্স সেফ ওর হাতে পাঁচ মিনিটে ম্যাজিকের মতো নিঃশব্দে খুলে যেত। শেষটা একদিন ওস্তাদজি উল্টে ওর পায়ে গড় করে একশোটি টাকা প্ৰণামি দিয়ে বলল, “আমাদের পেশায় পরস্পরের কাছে মিথ্যা বলতে নেই। তোমাকে কাছে রাখতে আমার ভয় হয়। তোমার জয়জয়ন্তী হক। তবে আমার কাছ থেকে যতটা দূরে সম্ভব থাকবে। সেও আজ বারো বছর হল।
    মনে মনে কানুও তাই চাইছিল। সে বড়ই উচ্চাভিলাষী। নিজের চেষ্টায় খাসা প্রাইভেট প্রাকটিস গড়ে তুলেছে। গোয়েন্দা বিভাগে তার নাম মাছি মাস্টার, মাছির মতো সে নাকি খাড়া দেয়ালে বেয়ে ওঠা নামা করে, কোনো চিহ্ন রেখে যায় না। এক যদি লক্ষপতির হাহাকারকে চিহ্ন বলে ধরা যায়। গেরস্ত বাড়ির আর খেটে খাওয়াদের দিকে তাকায় না সে। কেউ তাকে দেখেনি, চেনে না। নাম অবধি শোনেনি। যখন লোকে তার আগমন টের পায় তার অনেক আগেই সে নিশ্চিহ্ন। নো পাত্তা এবং সুদূরে। পার্টনার না থাকাতে নিরাপত্তা এবং মানসিক শান্তিও বজায় থাকে। আর্থিক সুবিধাও আছে।
    ই কি জ্বালা। অকেজো অপারগ হয়ে অন্য লোকের রকে শুয়ে শুয়েই বা এতকাল পরে এত কথা মনে পড়ছে কেন? এক রকম বলা যায় তার বা এতকাল পরে এত কথা মনে পড়ছে কেন? এক রকম বলা যায় তার গোটা জীবন কথা। তেমন কোনো উদ্বেগও হচ্ছিল না। এদিকে তো তার সর্বনাশ হতে চলেছে। মাছি মাস্টার হতে হলে —তা নাই বা কেউ তাকে চিনল —রবারের মতো হাত পা আর মাদুলি পোরা সূক্ষ্ম জিনিসগুলোর সদ্ব্যবহার করার ক্ষিপ্রতা চাই। হাড়গোড় জোড়া লাগলেও সে সব যে আর সম্ভব নয়, সে বুদ্ধি কানুর ছিল।
    হঠাৎ চমকে চোখ খুলে চেয়ে ভাবে তবে কি জাগিনি? ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি আর চাঁদ-ডোবার পরেও উত্তর কলকাতার এই অন্ধকার গলিতে এত স্পষ্ট দেখছি কি করে যে সামনে অংক স্যার দাঁড়িয়ে আছেন? কতকাল কারো পায়ের ধুলো নেয়নি কানু। এখন কেন জানি ইচ্ছে হল একটা প্রণাম করে; কিন্তু শরীর যে নড়ে না। অংক স্যার বললেন, ‘হয়েছে, ইচ্ছেই হল সব, ইচ্ছে করাও যা, কাজ করাও তা। এখন চুপ করে শুয়ে থাক। আমি এক্ষুনি আমার লোক নিয়ে আসছি। এই বলে পাশের গলিতে ঢুকে গেলেন। কানুর মনে হল সঙ্গে সঙ্গে গুনগুন শব্দটাও থেমে গেল। তবে ওটা ওর নিজের মাথা ঘোরার শব্দও হতে পারে, যদিও কান বোঁ বোঁ করার মতো নয়। হঠাৎ মনে হল, তবে কি ওটা অংক স্যারের মাথা ঘোরার শব্দ? কিন্তু পল কানু, তাতে ওর মাথা ঘুরবে কেন? কোনো কারখানায় মেশিনের চাকা ঘোরার শব্দও ঐ রকম। অংক স্যার কি তা হলে সত্যি মানুষ নন? ঐ বৈজ্ঞানিকদের তৈরী একটা যন্ত্র মানুষ, ঐ যে কি বলে কাগজে পড়ে ছিল একবার। এই সময় আবার ঘুম পেতে লাগল, তার মধ্যে কানু টের পেল খুব ষন্ডা কারা ওকে তুলে কোল পাঁজা করে পাশের গলিটা দিয়ে নিয়ে চলল। ঘুমের ঘোরে মনে হল কানে আবার গুনগুন শব্দটা আসছে। চোখের পাতায় যেন পাঁচ কিলো ওজন। অনেক কষ্টে চোখ একটু খুলে মনে হল ওদের সঙ্গে সঙ্গে অংক স্যারও চলেছেন আর তার কপালের আচিল থেকে সত্যি একটা স্নিগ্ধ সবুজ আলো বেরুচ্ছে। ওটা কি তবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় গাড়ির হেডলাইটের মতো, যার সাহায্যে নিজের পথ দেখে চলা যায়? নাকি সার্চ লাইটের মতো, যা দিয়ে অন্যের ভিতরটা দেখা যায়। অংক স্যার যাই হন, তার চেলা হতে কানুর আপত্তি নেই। এখন এই হাড়গোড়ের যন্ত্রণাগুলো গেলে বাচা যায়। তার পর আর কিছু মনে নেই।
    অনেক দিন লেগেছিল কানুর সেরে উঠতে, হয়তো মাস খানেক কি তারও বেশী। ততদিনে শীত পড়ে এসেছে। চোখের পাতায় উসুম উসুম গরম লাগাতে চেয়ে দেখে দুরের নীল পাহাড়ের খানিকটা উপর থেকে সূর্য কেমন মিষ্টি রোদ ছড়াচ্ছে। কিন্তু এ সে কোথায় এসেছে । এ তো তার চিরচেনা গঙ্গানদীর তীর ভূমি নয়। বুক ভরে বাতাস নিল কানু। মনে হল প্রাণটা জুড়িয়ে যাচ্ছে।
    শরীরে মনে কেমন একটা আরাম লাগছিল। পাহাড়ে জায়গা হলেও নিশ্চই খুব উঁচু নয়, কই পাহাড়ের মাথায় তো বরফ নেই। পায়ের উপর একটা নরম আলোয়ান পাতা। মনে হচ্ছিল এইভাবে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া যায়। মাছ-মাস্টারের কথা ভেবে হাসি পেল। তার সঙ্গে কানু সোমের কি? অনেক দিন পরে মনে পড়েছিল ওর নিজের নাম কানাইলাল সোম। দূরে পাহারের দিকে চেয়ে ভাবছিল এতদিনে নিশ্চই ঐ পাচতলা বাড়ির মালিকদের বেআইনি রোজগারের জমানো ঐশ্বর্য কোনো নিষিদ্ধ উপা, কোনো নিরাপদ জায়গায় পাচার হয়ে গেছে।
    কিন্তু তার সঙ্গে কানুর কি? সে যে উপায়ে ওদের পাপের ভার লঘু করার চেষ্টা করেছিল সেটাকেও খুব সদুদ্দেশ্য প্রণোদিত কিম্বা আইন সঙ্গত বলা যায় না। তার যে কোনো পরিণামই হোক তাতে কানুর কিছু বলার নেই। তবে কিনা লোকগুলো কি ঐ ভাবেই জীবন কাটাবে? ওদের কি ঐ যে কি বলে হ্যাঁ বিবেক —বলে কিছু নেই? পরে কষ্ট পাবে না তো? এই সব ভাবতে ভাবতে আবার ঘুম পেয়ে গেল। তারি মধ্যে একবার মনে হল ওরা কি খুব সুখী? একটু হাসিও পেল, নিজেও তো এ্যাদ্দিন দিব্যি সুখেই ছিল, এত কথা কখনো মনে আসে নি। তারপর সত্যি করে ঘুমিয়েই পড়ে থাকবে।
    এক সময় চোখ খুলে দেখে সে তখনো সেই ছোট ঘরে আরামে শুয়ে আছে। কোথাও একটা টিমটিমে সবুজ আলো জ্বলছে। তার আলোতে বুঝল অংক স্যার পাশে বসে। সবুজ আলোটা সত্যি সত্যি তার কপালের আঁচিল থেকে বেরুচ্ছে। পরম নিশ্চিন্তে আবার চোখ বুজে নিশ্চিন্ত গলায় কানু বলল, এতক্ষণে বুঝেছি। আমিই বদলে গেছি। ঐ সবুজ আলোর জন্যেই কি দাদা? আপনি কি জাদুকর?
    অংক স্যার হেসে ফেললেন, না, না, আমি বিজ্ঞানের একজন সামান্য সেবকমাত্র। অল্প স্বল্প গবেষণা করি। জাদু বলে কিছু নেই; লোকে যা বুঝে উঠতে পারে না তাকেই বলে জাদু। কিন্তু আসলে সব আশ্চর্য ব্যাপারের মূলেই আছে হয় বিজ্ঞান, নয়তো লোক ঠকিয়ে পয়সা আদায় করবার জন্য সাজানো খেলা। যারা সৎ লোক, তারা বলেই দেয় এ সব হল গিয়ে ধাঁধার খেলা বা হাত সাফাই আর যারা ঠগ তারা বলে এসব জাদুবলে করি, আমরা জাদুকর।
    তুমি যদি সব জেনেশুনে আমার ছাত্র হও, আমি খুশি হব। আমি যা খুঁজছিলাম কিন্তু পাচ্ছিলাম না, তুমি তা পাইয়ে দিযেছিলে মনে আছে। তাই আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। আর যদি পুরনো জীবনে ফিরে যেতে চাও, তোমার মাদুলীটা যত্ন করে রেখে দিয়েছি, সেটি ফিরিয়ে দেব আর তোমাকেও ছুটি দেব, তবে বড় দুঃখের সঙ্গে। ও—ও একটা ব্যামো। রেডিয়াম দিয়ে ক্যান্সারের চিকিৎসা হয়। নানান প্রাকৃতিক জিনিস দিয়ে, বশীকরণ দিয়ে পাগলামির চিকিৎসা হয়। তোমার ঐ দুষ্কর্ম করার প্রবৃত্তিও তেমনি একটা ব্যামো। ওর-ও ওষুধ খোঁজা হচ্ছে। তোমার খুঁজে দেওয়া মণিটার সাহায্যে তোমার মগজ থেকে উদ্ধার করে তোমার সারা জীবনের ভাবনা চিন্তার ছাপ আমি জেনেছি। মনে হয় যে ব্যামোর কারণ দূর হয়েছে, রোগও সেরে গেছে। আমার কিছু বিশ্বাসী সাহায্যকারী দরকার। তুমি এলে তো কথাই নেই।
    আহ্লাদে গলে গিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদে কানু বলল, “আমি যে আকাট মুখ্য, আমার ৩২ বছর বয়স। মাছিগিরি ছাড়া কিছু জানি না কিন্তু বুঝতে পারছি সে-ও আর চলবে না। হ্যাঁ, আর কিছু টাকা এক জায়গায় পোঁতা আছে। তবে তার এক পয়সাও সৎভাবে রোজগার হয়নি, ভাবলাম যদি আপনার গবেষণার কাজে লাগে তাহলে আমি কৃতাৰ্থ হই। কিন্তু পাপের টাকা কি আপনারা নেবেন? অংক স্যার বললেন, ‘টাকার আবার পাপ পুণ্য কি রে? অসৎ রোজগারের টাকা অসৎ মালিককে সৎকর্মে লাগাতে হয়। তোর ঐ পাচতলা বাড়ির অসৎ মালিক তো তার বাড়িটা আর পাচতলার ঘরের সিন্ধুক ভরা টাকা সব আমাদের দান করেছে। ওখানেই আমাদের বিজ্ঞান গবেষণাগার হবে। তাই তো তোর মাথায় সবুজ আলো ফেলে দেয়াল থেকে পেড়ে আনলাম। কানু বলল, ‘পেড়ে আনলেন দাদা? নাকি আছড়ে ফেললেন, যাতে আমায় সুদ্ধ চিকিচ্ছে করতে পারেন। ঐ সবুজ আলোতে কি তা বললেই মনে শান্তি পাই।
    অংক স্যার বললেন, আজকাল সিলিকন বলে একটা আশ্চর্য যৌগিক পদার্থ বিজ্ঞানের অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়। আগে এর বিষয় প্রায় কোনো বৈজ্ঞানিকই জানত না, তবে আমার ঠাকুরদা স্ফটিক ইত্যাদির সাহায্যে ঐ চকমকিটি তৈরি করেছিলেন; ঐখানে কোতরঙ্গে আমাদের বাড়ি ছিল। ১৮৯৭ সালের বড় ভূমিকম্পে ভেঙ্গে পড়ে। ঠাকুরদা পরিবারে কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তার গবেষণাগারটি খুঁড়েও বের করা যায়নি। এই মণিটি তার তৈরি।
    আগে আমার কপালে সত্যি একটা লম্বা আচিল ছিল। ওটিকে অস্ত্র করে তুলিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর থেকে ঐ রকম একটা ঢাকনিওয়ালা কৌটোতে মণিটা রাখি। দরকারের সময় কপালে বেধে নিই। ঢাকনি ফাঁক করলেই আলো বেরোয়। মস্তিষ্কের ওপর ঐ আলোর কাজ। তুমি ঐ বাড়িতে যাবার আগে মালিকের মাথার গুরুতর রোগ হয়ে ছিল, আমি তার চিকিৎসা করেছিলাম, ঐ মণির সাহায্যে। বলা বাহুল্য সেও একেবারে বদলে গেছে। ঐ বাড়ি ও তার মধ্যে যা কিছু আছে, সব দান করেছে, কে জানে চোরা চালানিও হয় তো তুলে দিয়েছে। এবার বল দুপুরে কি খাবি?
    কানু বলল,‘নলের গুড় দিয়ে আস্কে  পিঠে আর কাউনের চালের পায়েস।’

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য