প্রেতাত্মার উপত্যকা - ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য

    কঙ্কাবতী আর রঙ্কুলাল দুই পিঠোপিঠি ভাইবোন। ছোটবেলা থেকেই ওরা কথায়-কথায় মারামারি করত, আবার আধঘণ্টা পরেই গলাগলি ভাব। রঙ্কুলালই আগে এসে কথা বলত। কারণ, দিদিকে না হলে তার একদণ্ডও চলে না। যেমন, আধ ঘণ্টা পরেই হয়তো এসে বলত, ‘কেন মিছেমিছি আমাকে চটিয়ে দিস? জানিস তো রাগ চণ্ডাল। আর আমরা, ছেলেরা, তো একটু মারকুট্টে হয়েই থাকি। তা তোর লাগেনি তো?’ তারপর ফিসফিস করে বলত, “দিদা তেঁতুলের আচার বানাচ্ছে, আমি দেখে এসেছি। দুপুরে যখন রোদে দেবে তখন মজাসে এক খাবলা তুলে নিয়ে আসব। ওঃ!’ বলেই জিভ দিয়ে ঠোঁটটা একটু চেটে নিত।
    ব্যস, আচারের নাম শুনে কঙ্কাবতী মুহুর্তে গলে জল। বিষ্ণু যেমন নারদের গান শুনে জল হয়েছিলেন প্রায় সেই রকমই আর কি! তারপর ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে চুপ করবার ইশারা করে ফিসফিস করে বলত, ‘হ্যাঁ, দুপুরে, দিদা ঘুমুলে। এখন তো গরমের ছুটি। তোরও ইস্কুল নেই, আমারও নেই।’

    এসব ওদের ছেলেবেলার কাহিনী। এখন ওরা দু’জনেই বড় হয়েছে। শুধু বয়সে নয়, বিদ্যেতেও। লেখাপড়ায় দুজনেই তুখোড়। দু’জনেই ইউনিভার্সিটিতে প্রোফেসারি করছে। তরে ওদের বিষয় এক নয়। রঙ্কুলাল পড়ায় ফিজিক্স অর্থাৎ পদার্থবিজ্ঞান, আর কঙ্কাবতী পড়ায় জুওলজি অর্থাৎ প্রাণিবিজ্ঞান। শুধু পড়ায়ই না, দু’জনেই নিজের-নিজের বিষয়ে গবেষণা করে দেশবিদেশে নাম করেছে। প্রায়ই ওদের ডাক পড়ে দূর-দূরান্তের বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে। ইউরোপের নানা দেশে, আমেরিকায়, কানাডায়, এমন কী দক্ষিণ আমেরিকার অনেক ছোটখাটো রাজ্যেও। আর, মজা, বেশির ভাগ সময়েই ওরা দু’জনে প্রায় একই সঙ্গে এবং একই জায়গায় গিয়ে হাজির হয়। এক জায়গায় না হলেও অন্তত কাছাকাছি জায়গায় , যাতে বক্তৃতা শেষ হলে দু’জনে একসঙ্গে আশপাশের জায়গাগুলো বেড়িয়ে আসতে পারে।
    এই রকমই সেবার ওদের ডাক পড়েছিল উরুগুয়ে ইউনিভার্সিটিতে।
    নতুন ইউনিভার্সিটি। উরুগুয়ের কর্তৃপক্ষ লক্ষ করেছিলেন যে খেলাধূলায়—বিশেষ করে ফুটবল খেলায় ওঁদের ছেলেদের যেমন নামডাক, লেখাপড়ায় তেমনটা হয়নি। দেশকে বড় করতে হলে সব দিক দিয়েই তো তাকে তুলতে হবে। হলই বা সমস্ত দেশটা এই এত্তটুকু, বাহাত্তর হাজার বর্গমাইলের সামান্য একটু বেশি। সমস্ত দেশের জনসংখ্যা একত্র করলে কলকাতা শহরের অর্ধেকও হবে না। কিন্তু তাতে হয়েছে কী? তাই রাজধানী মন্টেভিডিও শহরে তারা একটা নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছেন এবং প্রায়ই দেশবিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞদের এনে সেখানে বক্তৃতার ব্যবস্থা করছেন। এই সূত্রেই এবার ডাক পড়েছে রঙ্কুলাল আর কঙ্কাবতীর। দু'জনকেই অন্তত পক্ষে গোটা-দশেক করে বক্তৃতা দিতে হবে।
    যথাসময়ে নীল আকাশে পাখা মেলে ওদের প্লেন ভেসে চলল এবং যথাসময়ে মণ্টেভিডিওর এয়ারপোটে নেমেও পড়ল।
    নতুন জায়গা। এর আগে ওরা এসব অঞ্চলে আর আসেনি। সমুদ্রের ধারে আধুনিক কেতায় সাজানো-গোছানো সুন্দর শহর। ইউনিভার্সিটির বাড়িটিও সমুদ্রের পাড় ঘেষে তৈরি হয়েছে। ক্লাস করতে-করতেই সর্বদা সমুদ্র চোখে পড়ে। এসব জায়গায় বসে পড়াশোনা করতেও যেমন ভাল লাগে, পড়াতেও তেমনি।
    দেখতে-দেখতে রন্ধুলাল আর কঙ্কাবতী দু’জনেরই দশ-দশটা বক্তৃতা দেওয়া শেষ হল। সবাই তারিফ করল ওদের বক্তৃতার, বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীরা। ওরা অবশ্য বক্তৃতা দিয়েছিল ইংরেজিতেই, কিন্তু সেসব বক্তৃতা সঙ্গে-সঙ্গে দোভাষীদের দিয়ে অনুবাদ করিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকায় বুঝতে কারও কোনও অসুবিধা হয়নি। তারপর দিন-দুই ধরে চলল খানাপিনা এবং এটা-ওটা-সেটা। উরুগুয়ে ইউনিভার্সিটি দরাজ হাতে ওদের বেশ মোটা অঙ্কের একটা করে সম্মানদক্ষিণাও দিয়ে দিলেন।
    রন্ধুলাল বলল, “দিদি, দেশে ফিরবার আগে এ-দেশটা একটু ঘুবে দেখবি না?”
    “নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, দেখব না মানে? আবার কবে এদেশে আসব তার ঠিক নেই। একেবাবেই আসব কি না কে জানে?”
    স্থানীয় ট্যুরিস্ট অফিসই সব ব্যবস্থা করে দিলেন। ওদের ছাত্রছাত্রীরা, যারা ইতিমধ্যেই ওদের ভক্ত হয়ে পড়েছিল, তাদেরও কেউ-কেউ বলল, “আমরাও আপনাদের সঙ্গে যাব।”
ওদের মধ্যে দু’চারজন বেশ ইংরেজি বলতে পারত। কিন্তু সকলের জায়গা তো হবে না। কঙ্কাবতী বলল, “দু'জন যেতে পারো। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে।” আর-একটি মেয়ে বেশ চালাক-চতুর। সে বলল, “আমি ঠিক জায়গা করে নেব। আমি তো বেশ রোগা!” তারপর একটি ছেলেকে দেখিয়ে বলল, “ওর মতো হোতকা নই। তা ছাড়া আমি ইংরেজিও জানি। আপনাদের সাহায্য করতে পারব।”
    রন্ধুলাল বলল, “নিয়ে নাও দিদি, ওকেও। স্থানীয় ভাষা না জানার অসুবিধেটা যে সময়-সময় কীরকম বিপজ্জনক হয় তা সেবার কর্ণাটকের ভেতরকার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছিলাম। শহরে তেমন অসুবিধে না হলেও একটু ভেতরে গিয়ে দেখি সেখানকার লোকেরা কেউ না বোঝে ইংরেজি, না হিন্দি। বোঝে শুধু স্থানীয় ভাষা। অগত্য ইশারা-টিশরায় মনের কথা প্রকাশ করতে হয়েছিল। সে এক ভয়াবহ ব্যাপার।” বলেই রন্ধুলাল তার স্বভাবসিদ্ধ হাসিমুখে ঘাড়টা একটু দুলিয়ে নিল। তারপর বলল,“হ্যাঁ, ও-ও চলুক।”
    শেষ পর্যন্ত তাই ঠিক হল। ট্যুরিস্ট অফিস থেকে পাওয়া গেল, একখানা বড় গাড়ি।
    সমুদ্রের ধার দিয়ে সুন্দর বাঁধানো রাস্তা। ধারে-ধারে ছোট-ছোট পাহাড়, বোধহয় চুনা পাথরের। সেগুলিকে পাশ কাটাবার জন্য রাস্তা মাঝে-মাঝে এঁকেবেঁকে চলেছে সাপের মতো। মোটর ছুটেছে দ্রুতবেগে। সবারই চুল উড়ছে বাতাসে। ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়ায় মন-মেজাজও সবার ভাল।
    হঠাৎ সেই রোগা ছাত্ৰীটি, তার নাম রেজিনা, ড্রাইভারকে কী বলল। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিল।
    কঙ্কাবতী জিজ্ঞেস করল, “গাড়ি থামালে কেন?”
    “আসুন, একটু কফি খেয়ে নেই। এখানকার কফি খুব নামকরা। আপনাদের ভাল লাগবে, শরীরটাও তাজা লাগবে। সামনেই ওই যে একটা স্টল রয়েছে।”
    সত্যি,দু’চার কিলোমিটার পর-পরই রাস্তার ধারে সাজানোগোছানো একটা করে স্টল ওদের চোখে পড়ছিল। ওখানে চা, কফি ও অন্যান্য পানীয় তো আছেই, তা ছাড়াও কিছু চকোলেট জাতীয় খাবার সাজানো আছে, সাজানো আছে হরেকরকম ম্যাগাজিন আর খবরের কাগজ।
    শেষের দুটি অবশ্য ওদের কাজে লাগবে না। কেননা, ওখানকার ভাষা এখনও ওদের কাছে প্রায় দুর্বোধ্য। তবে দুচারটে সাধারণ কথা ওরা এর মধ্যেই শিখে নিয়েছে।
    দেখা গেল, সঙ্গী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে রেজিনাই সবচেয়ে চটপটে। চোখেমুখে কথা বলে বটে, কিন্তু ওই সবচেয়ে কাজের।
    সবাই এক কাপ করে কফি খেয়ে আবার গাড়িতে গিয়ে বসল। সত্যি, রেজিনা ঠিকই বলেছিল, কফি খেয়ে শরীর-মন দুটোই বেশ তরতাজা লাগছে। ড্রাইভার এবার গাড়ি ঘুরিয়ে সমুদ্র থেকে দূরে আর-একটা রাস্তা ধরছিল। রেজিনা বলল, “গাড়ি ঘোরাচ্ছেন কেন? আমরা তো সেই দু'হাজার বছর আগেকার রেড ইণ্ডিয়ান সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ দেখতে যাচ্ছি, যা নাকি সম্প্রতি মাটি খুঁড়েবার করা হয়েছে।” তারপর কঙ্কাবতীদের দিকে ফিরে বলল, “দেখলে আপনারা সত্যিই অবাক হয়ে যাবেন। অনেকটা মায়া-সভ্যতার ধবংসাবশেষের মতো। আপনাদের ইণ্ডিয়াতেও শুনেছি মহেনজো-দরোতে এ-রকম পাওয়া গেছে। তবে তা বোধহয় আরও অনেক পুরনো।”
    রঙ্কুলাল সুযোগ পেয়ে মহেনজো-দরো সম্বন্ধে একটু জ্ঞানদান করার চেষ্টা করতে যাচ্ছিল, কঙ্কাবতী ধমক দিয়ে বলল, “এখন থাম তো! দ্যাখ, সমুদ্র কেমন থেকে-থেকে রং পালটাচ্ছে! ও কী,জলের মধ্যে ওটা কী মাথা উঁচু করে রয়েছে?”
    উত্তর দিল ফের রেজিনাই, “ও একটা স্পঞ্জের স্তুপ। এখানকার সমুদ্রের জলে প্রচুর স্পঞ্জ দেখা যায়। অনেক সময় সমুদ্রের পাড় ঘেষেও জমে থাকে ওগুলি জলের ওপর মাথা বার করে।”
    কঙ্কাবতী বিজ্ঞের মতো বলল, “হ্যাঁ, স্পঞ্জ তো নানা আকৃতির হতে পারে। আসলে কিন্তু ওরাও একরকম সামুদ্রিক প্রাণী, কিন্তু নড়াচড়া করতে পারে না। ওদের সারা গায়ে অসংখ্য ছিদ্র। তার ভিতর দিয়ে সমুদ্রের জল ক্রমাগত ঢুকছে আর বেরিয়ে যাচ্ছে। সেই জলে থাকে নানারকম খুদে-খুদে সামুদ্রিক পোকা, সেই পোকাগুলোই হচ্ছে ওদের খাদ্য। সমুদ্রের স্রোতই সরবরাহ করার ভার নিয়েছে সেই খাদ্য। নইলে নড়তে-চড়তে না-পারা এই প্রাণীগুলির কী অবস্থাই না হত!”
    রন্ধুলাল বিজ্ঞের মতো বলল, “বিধাতার কী অদ্ভুত বিধান! এই স্পঞ্জগুলির জল শুষে নেবার ক্ষমতাও দারুণ। আমরা তো এতদিন আঙুল ভেজাবার জন্য টেবিলে এই সব স্পঞ্জই ব্যবহার করে এসেছি। তবে সেগুলোর মধ্যে তখন প্রাণ থাকে না এই যা। কিন্তু ঠিক রবারের মতো। টিপলে আঙুল বসে যায়, আবার আঙুল ছেড়ে দিলেই সেই আগের চেহারা। ইংরেজিতে তোমরা যাকে বল “ইলাস্টিসিটি’, ঠিক তাই। অদ্ভুত এদের ইলাস্টিসিটি।”
    কঙ্কাবতী হেসে বলল, “বাংলায় আমরা একে বলি স্থিতিস্থাপকতা। কিন্তু সে ভাষা তো আর তোমরা বুঝবে না!”
    “কী বললেন? স-সটিটিস্স্...” রেজিনা হেসে বলল, “আমরা ওটা উচ্চারণই করতে পারব না।”
    তাকে বাধা দিয়ে এবার একটি ছাত্র প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, ইলাস্টিক হওয়ারও তো একটা লিমিট, মানে সীমা বা মাত্রা আছে। কোনও জিনিসই তো সম্পূর্ণ ইলাস্টিক হতে পারে না!”
    কঙ্কাবতী বলল, “হ্যাঁ, তাই তো জানি। তবে সম্পূর্ণ ইলাস্টিক হলে কী অসম্ভব কাণ্ড ঘটতে পারে তার একটা মজার গল্প আছে।
    “এক বিজ্ঞানী নানা গবেষণার পর এমন একটা জিনিস তৈরি করলেন যা নাকি সত্যি-সত্যিই নিখুঁত ইলাস্টিক। সেই জিনিসটা দিয়ে একজোড়া জুতোর ‘সোল’ তৈরি করালেন তিনি। তারপর পরীক্ষার জন্য নিজেই সেই জুতো পরে আমেরিকার একটা তিরিশতলা বাড়ির জানলা দিয়ে লাফিয়ে পড়লেন, নীচে, রাস্তায়। কিন্তু, যেহেতু তার জুতোর তলাটা নিখুঁত ইলাস্টিক জিনিস দিয়ে তৈরি, তাই রাস্তায় নামা মাত্র সেটা তাকে আবার ঠেলে তুলে দিল তিরশতলা উঁচুতে। সেখানে উঠেই আবার তিনি আপনা-আপনি নেমে এলেন রাস্তায়, সঙ্গে -সঙ্গে আবার তাকে ঠেলে তুলে দিল সেই তিরিশতলার মাথায়। এইভাবে ক্রমাগত চলতে লাগল ওঠা আর নামা। দেখতে-দেখতে রাস্তায় ভিড় জমে গেল, কিন্তু কেউ তার ওঠা-নামা থামাতে পারল না।”
    শেষটা কী হল তা হলে? ভদ্রলোক উদ্ধার পেলেন কী করে?”
    “সে আর বোলো না। কয়েকদিন ধরে এই ব্যাপার চলতে লাগল। শেষে—”
    রন্ধুলাল কথাটা শেষ করল, “সে এক ট্র্যাজেডি। উপায়ান্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত ওই বিজ্ঞানীকে গুলি করতে হল। গুলি খেয়ে তিনি কাত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। জুতোর তলাটা আর তখন রাস্তার সংস্পর্শে রইল না। ফলে, তিনি লাফানো থেকে নিষ্কৃতি পেলেন।”
    “কিন্তু গুলি খেয়ে প্রাণে বাঁচলেন কি?”
    “তা কি আর কেউ বাঁচে?” কঙ্কাবতী গম্ভীরভাবে জবাব দিল ।
    মোটর এদিকে ছুটে চলেছে সমানে। হঠাৎ ড্রাইভার গাড়িটাকে তীব্রবেগে বাঁদিকে ঘুরিয়ে দিল, সমুদ্রের ধার দিয়ে যে রাস্তা চলে গেছে তারই থেকে বেরিয়ে-আসা অন্য একটা রাস্তায়।
    রঙ্কুলালের জিজ্ঞাসাসূচক দৃষ্টি দেখেই রেজিনা ড্রাইভারকে প্রশ্ন করল, “হঠাৎ গাড়িটা ওই রাস্তা থেকে সরিয়ে নিলেন যে?”
    ড্রাইভার উত্তরে কী যেন বলল। রেজিনা মন দিয়ে শুনল, তারপর রন্ধুলালদের বুঝিয়ে দিল ব্যাপারটা। “ওদিকে গেলে ওই পাহাড়গুলোর ভেতর দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সে- রাস্তা একদম বন্ধ। আসলে কী জানেন, ওখানে একটা উপত্যকার মতো অদ্ভুত একটা জায়গা আছে। চারদিকে এমন উঁচু-উঁচু পাহাড় দিয়ে ঘেরা যে, ভিতরে ঢোকা অসম্ভব। আর ও-জায়গাটার নামও প্রেতাত্মার উপত্যকা। লোকে বলে ওটা সত্যি-সত্যি ভূতের আস্তানা। ওখানে দিবারাত্র ভূতের কান্না, হাসি আর কত কী তর্জন-গর্জন শোনা যায়। দিনের বেলা ততটা নয়; কিন্তু রাতের দিকে, যখন সমুদ্র ছাড়া আর সব চুপচাপ, তখন সমুদ্রের গর্জন ছাপিয়েও ওই সব শব্দ প্রচণ্ড ভাবে বেড়ে যায়। বহু-বহু বছর ধরে এইরকম চলছে। আমরা ছোটবেলা থেকে এর গল্প শুনে আসছি, আমাদের বাবা-মায়েরাও, এমনকী দাদু-দিদারাও। কিন্তু কেউ কখনও এ-তল্লাটে আসেনি। আর, সত্যি বলতে কী, কেউ কখনও এদিকে আসতেও চায় না। কার দায় পড়েছে শখ করে জেনেশুনে বিপদের মধ্যে মাথা গলাতে? তাই ড্রাইভার গাড়ি ঘুরিয়ে অন্য পথ ধরেছে। ওটা এড়িয়ে গিয়ে পরে আবার সমুদ্রতীরের নিশ্চিন্ত পথ ধরবে।”
    “উঁহু!” সজোরে চেচিয়ে উঠে ড্রাইভারের কাধে হাত দিয়ে গাড়ি থামিয়ে দিল রন্ধুলাল। বলল, “কখনও ভূত দেখিনি। একেবারে ভূতের রাজ্যে এসে স্বচক্ষে ভূত না দেখে যাচ্ছি না। গাড়ি ঘোরাতে বলো। আমরা ওই প্রেতের উপত্যকা দেখে যাব।”
    ড্রাইভারের আতঙ্কিত মুখের দিকে তাকিয়ে কঙ্কাবতী বলল, “ওরা বোধহয় ভয় পাচ্ছে। গাড়িটা না হয় এখানেই থাকুক। চল, আমি আর তুই ঘুরে দেখে আসি জায়গাটা।” রেজিনার দিকে ফিরে বলল, “তোমরা ওই সামনের স্টলে গিয়ে বোসো। বরং আর-একবার চা কি কফিটফি যা হয় খেয়ে নাও, গল্পগুজব করো। আমাদের হয়তো খুব দেরি হবে না। খুব বড় জায়গা বলে তো মনে হচ্ছে না। ধরো, ঘণ্টাখানেক? তবে পায়ে হেঁটে যাব তো, একটু এদিক-ওদিকও হতে পারে। আমাদের দেরি দেখলে ফেলে চলে যেও না যেন আবার!”
    রেজিনার মুখে আতঙ্কের ছায়া ঘনিয়ে উঠল। “না, তা যাব না। কিন্তু আপনারা কি সত্যি ফিরতে পারবেন? ওখানে কয়েকশো বছরের মধ্যে কোনও জীবন্ত মানুষ গেছে বলে শুনিনি। গিয়ে থাকলেও তারা আর ফেরেনি। তা ছাড়া ভেতরে ঢুকলার রাস্তাও নাকি নেই!”
    “সে আমরা ঠিক খুঁজে বার করে নেব। কিংবা, দরকার হলে, কিছুটা পাহাড় টপকেই চলে যাব। আমাদের দু’জনেরই পাহাড়ে চড়ার ট্রেনিং নেওয়া আছে।”
    রন্ধুলাল কোনও ব্যাপারে জেদ ধরলে তাকে যে থামানো যায় না তা কঙ্কাবতীর অজানা নয়। সে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। রঙ্কুলালকে ডেকে বলল, “আয় রন্ধু, আয়! আর ওই ঝোলানো ব্যাগটাও সঙ্গে নে। কী জানি, কখন কী দরকার হয়।”
    ব্যাগ বলতে ওদের বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামের ছোট একটা মিনি ল্যাবরেটারি। গ্যাস মাস্ক থেকে শুরু করে অক্সিজেনের বোতল আর এটা-ওটা-সেটা। তবে খুব ভারী নয়। দু’জনে পালা করে বয়ে নিতে যেতে পারবে অনায়াসেই। সকলের আপত্তি অগ্রাহ্য করে ওরা হাটতে শুরু করল। গাড়িটা ধীরে-ধীরে একটু দূরের একটা স্টলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
    সত্যি, এ-এক আশ্চর্য জায়গা। এমনটা ওরা কখনও দ্যাখেনি। এলাকাটা দুৰ্ভেদ্য প্রাচীরের মতো পাহাড় দিয়ে ঘেরা। কোথাও ঢুকবার কোনও পথ আছে বলে মনে হল না। কিন্তু মনে হল, ভেতর থেকে কিছু অস্পষ্ট আওয়াজ যেন ভেসে আসছে। কখনও আর্তনাদ, কখনও অট্টহাসি, কখনও আবার করুণ কান্নার স্বর।
    রন্ধুলাল জোর দিয়ে বলল, “নিশ্চয় ভিতরে ঢুকবার কোনও-না-কোনও পথ আছে। এ তো প্রাকৃতিক ব্যাপার, কেউ বানায়নি। কাজেই নিশ্ছিদ্র এ-কথা আমি মানতে রাজি নই। একটু খুঁজে দেখতে হবে। তাছাড়া ভেতরের ফাঁকা জায়গাটাকে উপত্যকা বলা হলেও মনে হচ্ছে খুবই ছোট। লম্বায় একশো মিটার বা ওইরকম, চওড়াও তার কাছাকাছি।”
    আশ্চর্য, একটু খুঁজতেই দেখা গেল দুটো পাহাড়ের জোড়ের মুখে কয়েকটা বড়-বড় গাছ ঘন-সন্নিবিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখলেই বোঝা যায় গাছগুলির বয়সও নেহাত কম নয়। কিন্তু গাছ গজিয়েছে, তখন একটা ফাটলও নিশ্চয়ই আছে। বোধহয় গাছের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে।
    দু’জনেই গাছে উঠতে ওস্তাদ। রন্ধুলাল ব্যাগটা পিঠে ঝুলিয়ে তরতর করে উঠে পড়ল একটা গাছে। পেছন-পেছন কঙ্কাবতীও।
    সত্যি, যা ভেবেছিল তা-ই। গাছের আড়ালে চাপা রয়েছে একটা সরু ফাটল। চেষ্টা করলে কাত হয়ে তার ফাকা দিয়ে ঢুকে পড়া যায়। খানিকটা কসরত করে ওরাও ঢুকে গেল সেই ফাটলে, তারপর গাছ বেয়েই নেমে পড়ল সেই ফাকা উপত্যকায়।
    তারপরেই ভয়ে ওদের মুখ শুকিয়ে গেল। যে আওয়াজটা বাইরে থেকে এতক্ষণ অস্পষ্ট ভাবে শোনা যাচ্ছিল, এবার তা-ই শোনা যেতে লাগল বিকটভাবে। কী অদ্ভুত শব্দ! যেন একসঙ্গে হাজারটা লোক চেঁচামেচি করছে। কখনও হাসির শব্দ, কখনও গোঙানি। তারই মধ্যে চলেছে দুর্বোধ্য ভাষায় চিৎকার, শাসানি, বহুলোকের একসঙ্গে ঝগড়া।
    “দিদি, ভয় পাচ্ছিস?” ভয়ে-ভয়ে প্রশ্ন করল রন্ধুলাল।
    “না, ভয় কিসের!” ভয়ার্তকণ্ঠে বলল কঙ্কাবতী। তারপরেই হঠাৎ যেন প্রচণ্ড একটা দম নিয়ে বলল, “কিন্তু শব্দই শোনা যাচ্ছে শুধু। বোধহয় পায়ের দুপদুপ আওয়াজও আছে তার মধ্যে, কিন্তু চোখে তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না! নিশ্চয় একটা রহস্য আছে এর মধ্যে।”
    রঙ্কুও যেন এবার একটু দম নিয়ে বলল, “সেইটিই তো উদ্ধার করতে হবে। কী নাম বলল যেন এ-জায়গাটার? গোস্ট ভ্যালি, অর্থাৎ প্রেতাত্মার উপত্যকা? তুই কি প্রেতাত্মা মানিস?”
কঙ্কাবতীও ততক্ষণে একটু সামলে নিয়েছে। এবার বিজ্ঞের মতো বলল, “বিজ্ঞানীরা কখনও হাতেনাতে প্রমাণ না পেলে কিছু মানে না।”
    “হ্যাঁ, আজ দেখা যাবে পরখ করে। প্রেতাত্মাদের কণ্ঠস্বর ছাড়া তাদের উপস্থিতির আর কোনও পরিচয় তো পাচ্ছি না। ওরা কি রাত না হলে বার হয় না?”
    ততক্ষণে দু’জনের মনেই বেশ সাহস এসে গেছে। প্রথম দিকের আচমকা ভয়ের ভাবটা কেটে গেছে। ওরা ঘুরে-ঘুরে সমস্ত জায়গাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করে দিয়েছে।
    ভেতরটা একদম জনশূন্য। কিন্তু বেশ বোঝা গেল চিরকাল এমনটা ছিল না। ইতস্তত ছড়ানো বেশ কিছু পরিত্যক্ত বাড়ির ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ল ওদের। কবে, কতদিন আগে এখানে লোকবসতি ছিল কে জানে! তবে বহুদিন যে কেউ এখানে ঢোকেনি তা স্পষ্ট বোঝা গেল। এক জায়গায় দেখা গেল বেশ কিছু উঁচু-উঁচু নারকেলজাতীয় গাছ, যা সমুদ্রের আশপাশে আপনি গজায়।
    “দ্যাখ, দ্যাখ, দিদি, ওই বাড়ির ভাঙা বারান্দায় ওগুলি কী পড়ে আছে! বেশ কয়েকটা খুব মরচে-ধরা তীর আর লম্বা-লম্বা পাখির পালক, যা রেড ইণ্ডিয়ানরা আজও মাথায় পরে। তা হলে এ-জায়গাটায় একসময় রেড ইণ্ডিয়ানদেরই আস্তানা ছিল বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু কোথায় গেল ওরা? কেনই বা গেল?”
    এ-দিকে সেই রহস্যজনক শব্দ কিন্তু সমানে শোনা যাচ্ছে। কঙ্কাবতী বলল, “হাসিকান্না, গোঙানি ছাড়া আর যেসব গোঙানি শুনছিস ওগুলি বোধহয় সেই রেড ইণ্ডিয়ানদেরই ভাষা। অর্থাৎ, ভূত হলে ওরা সব রেড ইণ্ডিয়ান ভূত।”
    ওদের দু’জনকেও কিন্তু একটু জোর দিয়ে কথা বলতে হচ্ছিল, নইলে ওই শব্দের মধ্যে কেউ কারও কথা শুনবে কী করে?
    রঙ্কুলাল বলল, “সময় নষ্ট করে লাভ নেই, চল, ওই পাহাড়ের দেওয়ালটার কাছে যাই, যদি কিছু হদিস মেলে।”
    দু'জনে এগিয়ে এল একটা উঁচু পাহাড়ের দেওয়ালের পাশে। রন্ধু বলল, “দ্যাখ, এখানে মাটিতে কী ভীষণ বালি জমে আছে। সমুদ্রের বালি। তা হলে এক সময় সমুদ্রের জল হয়তো এখানে ঢুকে গিয়ে জায়গাটা ভাসিয়ে দেয়। লোকেদের পালানোর একটা কারণও হতে পারে। সমুদ্র এখন সরে গেছে, কিন্তু লোকজন কেউ আর ফিরে আসেনি।”
    পাহাড় দেখে ওরা আরও অবাক। পাহাড়ের সারা গা জুড়ে কিসের যেন একটা কালচে আস্তর। পাথরের নয়, অন্য কিছুর। রন্ধুলাল কাছে গিয়ে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করল। আঙুল দিয়ে টিপে দেখল, আঙুল সবটা বসে যাচ্ছে কিন্তু ছেড়ে দিতেই আবার যেমন-কে তেমন। ঠিক যেন চটচটে রবারের মতো কিছু দিয়ে মোড়া। রন্ধুলাল ব্যাগ থেকে একটা হাতুড়ি বার করল, যার একদিক বাটালির মতো, অন্যদিক হাতুড়ির মতো, ভূবিজ্ঞানীরা যে ধরনের হাতুড়ি ব্যবহার করেন। পাহাড়ের গায়ে ঠকঠক করে সেই হাতুড়ি চালিয়ে দেখা গেল কালো আস্তরের নীচে রয়েছে সত্যিই পাথর।
    “এঃ, এ তো তো দেখছি চুনা পাথরই বটে সমুদ্রের ধারে ওই রকমই তো হবার কথা। কিন্তু সমস্ত পাথরের গায়ে ওই রকম কালচে রবারের মতো আস্তর এল কোত্থেকে? খুব পুরু মনে হচ্ছে। আধ মিটার তো হবেই, কোনও-কোনও জায়গায় এক মিটারেরও বেশি হতে পারে।”
    “দাঁড়া, আমাকে দেখতে দে।” কঙ্কাবতী এবার ঝোলানো ব্যাগ থেকে একটা পুরু লেন্স বার করে নিয়ে আস্তরগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। “আরে এ তো মনে হচ্ছে স্পঞ্জ। সমস্ত পাহাড়টার গা জুড়ে স্পঞ্জ এসে বাসা বেঁধেছে, তই চটচটে রবারের মতো লাগছে। চল তো, ওই দিকটার পাহাড়গুলো দেখি।
    সব দিকেই এক ব্যাপার। ক’টি পাহাড়ের গা-ই পুরু স্পঞ্জের আবরণে ঢাকা।
    কঙ্কাবতী বলল, “বুঝেছি। এ-জায়গাটায় সমুদ্রের জলঢুকে পড়ায় লোকজন সব পালিয়েছে। সমুদ্রের জলের সঙ্গে এসেছে স্পঞ্জ। আর, স্পঞ্জের যা নিয়ম, একটা কিছু অবলম্বন পেলেই নিজেদের সেখানে আটকে রাখবে। পাথরগুলো পেয়ে তাদের সুবিধে হয়েছে খুব। তবে এত-এত স্পঞ্জ জমতে নিশ্চয়ই কয়েকশ বছর লাগবার কথা। সেই ফাঁকে চুনা পাথরগুলোও ফাঁক ফোঁকরে ক্রমাগত জমতে-জমতে জায়গাটাকে প্রায় নিশ্ছিদ্র করে ফেলেছে।
    “স্পঞ্জ গুলো কিন্তু সবই মরা!” রঙ্কুলাল বলল।
    “মরা তো হবেই”, কঙ্কাবতী জবাব দিল। “সমুদ্রের জল সরে যাওয়ার পর ওদের তো আর খাবার জোটেনি! অথচ নিজেরাও যে জায়গা ছেড়ে চলে যাবে সে শক্তিও নেই। তাই ওখানেই ধীরে-ধীরে তাদের জীবনাবসান হয়েছে। পড়ে রয়েছে, শুধু রবারের মতো ইলাস্টিক মৃত শরীরগুলো।”
    হঠাৎ রঙ্কুলালের মাথায় চন করে কী যেন একটা সন্দেহ এসে ঢুকল। সে ওখানেই মাটিতে বসে পড়ে কী যেন ভাবতে লাগল গভীর ভাবে—তন্ময় হয়ে। ও যখন কিছু একটা সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করে তখন ঠিক এই রকমই করে।
    “কী হল?” জিজ্ঞেস করল কঙ্কাবতী।
    রন্ধুলাল কোনও উত্তর দিল না। সে যেন তখন বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে কী ভাবছে।
    একটু অপেক্ষা করে কঙ্কাবতী আবার বলল, “কী অমন ভাবছিস বল তো? তোকে নিয়ে আর পারা যায় না!”
    রন্ধুলাল এবার মুখ তুলে বলল, “মনে হয় রহস্যটা বারো আনা উদ্ধার করে ফেলেছি। পাহাড়গুলো কত উঁচু দেখছিস তো? একবার চিৎকার করে বল তো, বন্দেমাতরম।”
    সঙ্গে-সঙ্গে কঙ্কাবতী চেঁচিয়ে উঠল, “বন্দেমাতরম্।” সেই সঙ্গে গলা মিলিয়ে রন্ধুলালও চিৎকার করে উঠল, “বন্দেমাতরম।”
    মনে হল পাহাড়ের গায়ে-গায়ে ধাক্কা খেয়ে ওই শব্দটা ফিরে এল প্রতিধ্বনি হয়ে বারে বারে, চারদিক থেকেই। থামবার নাম নেই। যদিও অন্যান্য ভৌতিক শব্দগুলি থেকে ওটা পৃথক করে খুঁজে বার করা হয়তো কঠিনই, কিন্তু সদ্য-উচ্চারিত বলে শব্দটা একটু জোরেই হওয়াতে তার প্রতিধ্বনিগুলোও খুব জোরে জোরে আসতে লাগল। ওরা কান পেতে লক্ষ করল আর-সমস্ত চেঁচামেচি ছাপিয়ে বারে বারে শোনা যাচ্ছে বন্দেমাতরম্—বন্দেমাতরম—বন্দেমাতরম।
    “পেয়ে গেছি-—পেয়ে গেছি! ইউরেকা!” এবার যেন আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল রন্ধুলাল। এবার সে শব্দটাও প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসতে লাগল চারদিক থেকে।
    “কী পেয়ে গেছিস?” কঙ্কাবতী সাগ্রহে প্রশ্ন করল।
    “শোন বলি। আমার যা সিদ্ধান্ত তা হচ্ছে এই: এ-জায়গাটায় এক সময়ে লোকবসতি ছিল তা তো দেখাই যাচ্ছে। কতদিন আগে কে জানে! কয়েকশো বা কয়েক হাজার বছরও হতে পারে। তারপর সমুদ্রের জল এসে এ-জায়গাটায় ঢুকে পড়ল। চুনা পাথরগুলো বেশির ভাগ হয়তো আগেই ছিল, আবার নতুন করে তাদের কলেবরে বাড়তে লাগল। দেখতে-দেখতে জায়গাটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে দেওয়াল-ঘেরা করে ফেলল সেই পাহাড়। লোকজন, যারা জায়গার মায়া ছেড়ে যেতে চায়নি তারাও ঘরবাড়ি ফেলে পালাতে লাগল। দেখতে-দেখতে জায়গাটা হয়ে গেল জনহীন, পরিত্যক্ত শ্মশানের মতো। এদিকে, এ-জায়গাটাকে তো স্পঞ্জের উপনিবেশ বলছিস। তা তো চোখেও দেখেছি। তোর অনুমানমতো সমুদ্রের জলের সঙ্গে তাই ঢেউয়ে ঢেউয়ে রাশি রাশি জীবন্ত স্পঞ্জও ঢুকে পড়েছিল এখানে এবং চারদিকের পাহাড়ের গায়ে লেপটে নিরাপদ আশ্রয় জোগাড় করে নিয়েছিল। পাহাড়গুলোও বেশ খানিকটা করে তখন জলের তলায় চলে গিয়ে থাকবে। কতদিন এভাবে কেটেছিল কে জানে! তারপর সমুদ্রের জল সরে গেল, স্পঞ্জগুলোও খাদ্যাভাবে মরে গেল, কিন্তু তাদের দেহ পুরু আস্তরের মতো উঁচু পাহাড়গুলোর গায়ে লেপটে রইল। এই স্পঞ্জ তো রবারের মতোই ইলাস্টিক, না হয়তো তার চেয়েও অনেক বেশি। সম্পূর্ণ ইলাস্টিক না হলেও তার কাছাকাছি হতে পারে।
    “এবার আসি শব্দের কথায়। শব্দ তো বাতাসের ঢেউ। কিন্তু কোনও জায়গায় ধাক্কা খেলে তা আবার ঠিক সেইভাবে ফিরে আসতে পারে, যেভাবে তা উঠেছিল। ওকেই তো আমরা বলি প্রতিধ্বনি।
    “চলে যাবার আগে বেশ কিছুদিন ধরে এখানকার বাসিন্দা যেসব আওয়াজ তুলেছিল, কান্না, হাসি, গোঙানি, চিৎকার, চেঁচামেচি, সেগুলোর ঢেউ ওই পাহাড়ের গায়ে লেগে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এসেছে বারে-বারে। এ-পাহাড়ের দেওয়াল থেকে ও-পাহাড়ের দেওয়ালে, আবার সেখান থেকে অন্য পাহাড়ের দেওয়ালে, পাহাড়গুলোর গায়ে প্রায় সম্পূর্ণ ইলাস্টিক স্পঞ্জের আস্তর থাকায় সেগুলো এখনও থামেনি, সমানে ঘুরে-ঘুরে আসছে। পাহাড়গুলো কত উঁচু দেখেছিস তো? তাই তার উপর দিয়েও বেরিয়ে যেতে পারেনি সেই শব্দের ঢেউ। ফলে, দিনের পর দিন সে-শব্দ অবিরাম মুখরিত করে রেখেছে এই উপত্যকাকে। হয়তো আগের তুলনায় শব্দটা একটু ক্ষীণ হয়েছে, কিন্তু থামেনি। তাই নানারকম শব্দ মিশে একাকার হয়ে মনে হচ্ছে যেন একটা জগাখিচুড়ি আওয়াজ, যেন দল বেঁধে একদল অদৃশ্য প্রেতাত্মা ওই সৃষ্টিছাড়া আওয়াজ করে যাচ্ছে! লোকে তো ভয় পাবেই।”
    “কিন্তু আমরা যে ‘বন্দেমাতরম্ বললাম, সেটা ওর সঙ্গে মিশে গিয়ে তেমন জগাখিচুড়ি হল না তো?”
    “আরে, তুই নিজে একজন বিজ্ঞানী হয়ে, হলিই না হয় প্রাণিবিজ্ঞানী, এমন প্রশ্ন করছিস কেন? একটু আগেই তো বললাম, ওটা যে সদ্য-তোলা চিৎকার। ওর জোর তো আগের তুলনায় একটু বেশি হবেই। তাই আগের আওয়াজগুলো ছাপিয়ে, তেমন স্পষ্ট না হলেও বেশ শুনতে পেয়েছি। কিন্তু তার আগে স্বাভাবিক গলায় আরও আস্তে আস্তে যেসব কথা বলেছি সেগুলোরও প্রতিধ্বনি নিশ্চয়ই হয়েছে, কিন্তু ক্ষীণকষ্ঠে বলা হয়েছিল বলে পৃথকভাবে টের পাওয়া যায়নি।”
    কঙ্কাবতী ভাইয়ের পিঠ চাপড়ে বলল, “কী বুদ্ধি রে তোর! আমার ভাই না হলে এমন মাথা কারও খেলে?”
    “যাঃ. বাজে বকিস না। কিন্তু আমাদের তো আবার মণ্টেভিডিওয় গিয়ে, আর একবার বক্তৃতা না দিলে চলবে না। প্রেতাত্মার উপত্যকার সমস্ত রহস্য ফাঁস না করে দিয়ে তো এখান থেকে যাওয়া চলে না। কাল মণ্টেভিডিওয় গিয়ে আমার বক্তব্য অন্তত একটা সাংবাদিক বৈঠক ডেকে বলতেই হবে। তারপর এখানকার বিজ্ঞানীরাও এসে একবার পরীক্ষা করে দেখুন। ওঁদের অন্তত ভূতের ভয় থাকবে না নিশ্চয়ই?”
    কঙ্কাবতী তার ভাইয়ের মাথাটা আর-একবার নেড়ে নিয়ে হাতঘড়ির দিকে তাকাল। বলল, “এখান থেকে বেরোবার সময়ে আবার তো সেই গাছে চড়তে হবে। ভাগ্যিস একটু আঁটসাঁট পোশাক পরে বেরিয়েছিলাম? কিন্তু আর দেরি করা ঠিক নয়। ওরা হয়তো গাড়ি নিয়ে স্টলের কাছে বসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে আর ভাবছে, এতক্ষণে উপত্যকার অশরীরী প্রেতাত্মারা আমাদের ঘাড় মটকে দিল কি না।”
    দু’জনেই খিলখিল করে হেসে উঠল।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য