মর্গান সাহেবের বাগান - সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

    কি আশ্চর্য।
    শোবার আগে বিছানায় বসে ঢক ঢক করে এক গেলাস জল খেয়ে বালিশে মাথা। সঙ্গে সঙ্গে গভীর ঘুম। শেষ রাতে সুন্দর একটা স্বপ্ন। ঠিক পাঁচটায় চোখ মেলে তাকানো। জানলায় লেগে আছে ভোর। প্রথম পাখির ডাক। রোজ, রোজ, এই আমার অভ্যাস।
    কিন্তু, কি আশ্চর্য।
    কাল আমি গেলাসটা মাথার কাছের ছোট্ট টেবিলটায় রেখেছিলুম, সেটা পুবের জানলার প্যারাপেটে চলে গেল কি করে। ঘরের দরজা বন্ধ। টেবিল থেকে জানলার দূরত্ব অবশ্যই ষোল ফুট। কি জানি বাবা! ভোরের আলোয় পাতলা কাচের গেলাসটায় অদ্ভুত একটা গোলাপী রঙের আভা।
    বিছানা থেকে নেমে দরজাটা পরীক্ষা করলুম। না, ছিটকিনি ভেতর থেকে বন্ধ। আমি না খুলে দিলে ভেতরে কারো আসার সাধ্যি নেই। এইবার গেলাসটার কাছে গেলুম। তলায় মিহি সাদা গুড়োর মতো কি সব পড়ে আছে। পরিষ্কার কলের জল খেয়েছিলুম। খাওয়ার আগে অভ্যাস মতো আলোর দিকে তুলে দেখে নিয়েছিলুম। পরিষ্কার জল। কিছু ছিল না। গেলাসটা যেখানে আছে থাক। হাত দিতে সাহস হচ্ছে না। বরং মনোজকে ডাকি।
    মনোজ আমার শাগরেদ। বয়েস কম, কিন্তু তুখোড় ছেলে। মনোজ আমার সঙ্গে থাকলে, আই ডোন্ট কেয়ার। দরজা খুলে বাইরের দালানে বেরিয়ে অবাক। অজস্র তুলো, রাশি রাশি তুলো ভোরের বাতাসে মেঝেতে ওড়াউড়ি করছে। কাল খুব গরম ছিল। মনোজ গাড়িবারান্দার ছাতে শুয়েছিল। সেই দিকে যেতে যেতে ভাবছি, নিশ্চয় বিরাট বিরাট গেছে। ইঁদুর আছে, এসব তাদেরই কাজ। দুটো ইঁদুরে গেলাসটাকে জানলার কাছে বয়ে নিয়ে গেছে। ইঁদুরের অসাধ্য কিছু নেই।
    মনোজ একটা মাদুরে থান ইট মাথায় দিয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। কাণ্ড দেখ ছেলের! বালিশ কি ছিল না! ধাক্কাধাক্কি করে তুললুম। মনোজ অবাক। বালিশে মাথা দিয়েই শুয়েছিল। থান ইট এল কোথা থেকে! তার মানে, কেউ বালিশটা টেনে নিয়ে মাথার তলায় ইট গুজে দিয়েছে। বালিশটাকে ছিড়ে ফর্দাফাই করে সব তুলো দালানে ছড়িয়ে দিয়েছে।
    কে? কে সেই শয়তান!
    এই অদ্ভুত সুন্দর বাগানবাড়িটা আমার বাবা কিনেছেন। একপাশে ইছামতী নদী। দূরে রেলব্রিজ। এদিকে পাশাপাশি আরো কয়েকটা বাগানবাড়ি। প্রায় সারা বছর বন্ধই পড়ে থাকে। মালিকরা সব ইউরোপ, আমেরিকায়। ওপাশে বিরাট এক শিবমন্দির। মন্দির চূড়ায় রুপোর ধ্বজা বাতাসে ঘুরপাক খায়। অসাধারণ জায়গা।
    কাল গৃহপ্ৰবেশ হয়ে গেল। নিয়ম অনুযায়ী তিন রাত কাটাতে হয়। আমি আর মনোজ এই তিন দিন থাকব। প্রথম রাতের অভিজ্ঞতা তো এই। কোনো মাথামুণ্ডু নেই। ভয় পেলে পাওয়া যায়, কিন্তু কেন পাব! বদমাইশ লোকের কাজ হলে, আজ রাতে তার বরাতে পেটাই। ভূত হলে, আমরা দুজনেই ভূত বিশ্বাস করি না। বিজ্ঞান আর ভূত একসঙ্গে থাকতে পারে না, যেমন, আলো আর অন্ধকার!
    মনোজ বললে, "চা খেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।'
    কালই আমরা দেখেছি, শিবমন্দিরের কাছে ভালো একটা দোকান আছে। সকালে দারুণ আকর্ষণীয় গরম জিলিপি করে, আর লোভনীয় পাঞ্জাবি চা। আমাদের সঙ্গে নতুন একটা মটোর সাইকেল আছে। মনোজ বললে, ‘চাবিটা দাও।”
    মনোজ চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে নীচে থেকে চিৎকার, এ কি গো এক ফোটা তেল নেই! তেল কোথায় গেল?’
    গাড়িটা তালাবন্ধ গ্যারেজে ছিল। কাল বিকেলে আমরা ফুলট্যাঙ্ক তেল ভরেছি। চলেছে মাত্র সাত কিলোমিটার। এইবার মনোজই বললে, ভৌতিক ব্যাপার। এ ছাড়া আর কোনো ব্যাখ্যা নেই। তোমার বিজ্ঞান ফেল মেরে যাবে।’
    আমরা হাঁটতে হাঁটতে শিবমন্দিরের দিকেই চললুম। বাঙালির ছেলে, সকালে চা না খেলে দিন শুরু করা যায়! মন্দিরের পাশ দিয়ে বইছে ইছামতী। ভারী সুন্দর। এই সব বিচ্ছিরি ব্যাপার না ঘটলে, এমন সুন্দর জায়গায়, এই সুন্দর সকালে আমি আর মনোজ দুজনে গলা মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান গাইতুম। গতবার দুর্গাপুজোর ফাংশানে আমরা দুজনে গান গেয়ে দুটো ওয়াটার বট্‌ল পুরস্কার পেয়েছিলুম। সেই বট্‌ল দুটো আমরা এখানে এনেছি।
    মন্দিরে প্রণাম করে, প্রচুর জিলিপি আর চা খেয়ে ঠিক করলুম একেবারে বাজার করে ফিরব। দোকান থেকে একটা ব্যাগ কিনে, যাবতীয় বাজার করে, আবার এক গেলাস করে চা খেয়ে আমরা বাগানে ফিরে এসে হতভম্ব। বিশাল গেটে বিরাট একটা মরচে ধরা তালা লাগানো। দেখলেই মনে হয় তালাটা কমসে কম শ’খানেক বছরের পুরোনো।
    হাতে বাজারের ব্যাগ। ভেতরে সব জিনিসপত্র আমাদের। বিশাল পাঁচিল ঘেরা এই বাগান। বাইরে থেকে বাড়িটা চোখে পড়ার উপায় নেই। মনোজ বললে, “এই বদমাইশিটা আমাদের সঙ্গে কে করলে? নিশ্চয় তৃতীয় আর একজন কেউ আছে!
    আমি বললুম, ছিল। সারারাত ঘাপটি মেরে ছিল, এখন আর নেই। তালা ঝুলিয়ে দিয়ে চলে গেছে।’
    মনোজ বললে, “আমি পাঁচিল টপকে ভেতরে নামছি।’
    পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙবি! ভেতরে পড়লে আমি তোকে বার করব কি করে? পাঁচিলটা কত উঁচু দেখেছিস?
    ভয়ঙ্কর কাশতে কাশতে সাইকেলে চেপে মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক আসছেন। খুব ধীর গতিতে সাইকেল চালাচ্ছেন। আমাদের বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, তিনি নেমে পড়লেন। আমরা কিছু বলার আগেই বললেন, কি তালা?
    আশ্চর্য হয়ে বললুম, হ্যাঁ তালা! আপনি কি করে জানলেন?
    ‘এই অঞ্চলের সবাই জানে ভাই। মর্গান সাহেবের তালা। ভালো করে দেখ, তালার গায়ে লেখা আছে, চাবস, মেড ইন ইংল্যান্ড, নাইনটিন হান্ডেড ওয়ান।’
    ‘ও তো মরচে ধরা ভূতুড়ে তালা!’
     ‘অ্যায়, এই যে শব্দটি বললে ভূতুড়ে, ওইটাই ঠিক। শ্যামবাবুকে...'
    শ্যামবাবু তো আমার বাবার নাম, আপনি চেনেন?
    তাকে কে না চেনে, অত বড় উকিল! শ্যামবাবুকে জেলা আদালতের আমরা সবাই বারণ করেছিলুম। শুনলেন না। বড় কড়া ধাতের মানুষ। তোমরা শোনো। মর্গান সায়েবের বাবা ছিলেন নীল কুঠিয়াল। জানো নিশ্চয়, উনবিংশ শতাব্দীর সায়েবরা নীলের চাষ করত। মর্গান একটা চটকল করেছিল আরো অনেক সায়েবকে নিয়ে। মর্গান প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লড়াই করেছিল। বীর মর্গানের বউটার চরিত্র ছিল ব্যাড। ভেরি ব্যাড। একদিন রাত্তিরে ফিকে গোলাপী রঙের একটা গেলাসে মদের সঙ্গে সেঁকো বিষ খাইয়েছিল। বদমাইশ মেয়ে। এদের জ্যান্ত কবর দেওয়া উচিত। মেম যদি সুন্দরী হয়, জানবে ডেনজারাস। আজ ডেনজারাস অ্যাজ এ সারপেন্ট।’
    ভদ্রলোক সাইকেলে উঠতে যাচ্ছেন, আমরা বললুম, এ কি, আপনি চলে যাচ্ছেন!'
    ‘আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে বাবা! আমার ইস্কুল বসে গেছে। কাশীর জন্যে দেরি হয়ে গেল।’
    ‘ওষুধ খাচ্ছেন?’
    ‘ওষুধ খাব কেন?’
    ‘এই যে বললেন কাশি!’
    আরে ধুর বাপু! কাশী আমার বড় ছেলের নাম। আমার তিন ছেলে, তিনটেই তীর্থ—কাশী, বৃন্দাবন, মথুরা।
    ‘তাহলে বলে যান আমরা কি করব!’
    ‘কি আবার করবে। আর সবাই যা করেছে! এই তালা ভাঙার সাহস কারো নেই। বংশ নির্বংশ হয়ে যাবে। কে এক খেমকা এই বাগানটা কিনেছিল। তারও এই এক অবস্থা। পয়সার গরমে নিজে লোহা ঢুকিয়ে তালা ভেঙেছিল। সব মরে গেল। তাদের বাড়ির বেড়ালটা পর্যন্ত ডেড।’
    ‘ভাঙা তালাটা আবার এল কি করে!’
    বোকার মতো কোশ্চেন কোরো না। ভূত আর ভগবান, দুটো জগতেই সম্ভব-অসম্ভব বলে কিছু নেই। সবই সম্ভব। যাই হোক, তোমাদের খুব পছন্দ হয়েছে আমার, তাই তালা খোলার উপায়টা বলে যাই। ইছামতীর তীরে, এখান থেকে তিন মাইল দূরে একটা ভাঙা চিমনি দেখতে পাবে। অনেক দূর থেকেই দেখা যাবে। সেটা লক্ষ করে নদীর কূলে গিয়ে দেখবে গাছপালার মধ্যে নির্জন এক সমাধি। পাথরের গায়ে অস্পষ্ট লেখা, জেমস মর্গান। সেই সমাধিতে মোমবাতি দিয়ে, ফুল ছড়িয়ে, প্রার্থনা করবে ভক্তি ভরে—প্লিজ ওপন দি লক। বলবে, আপনার বাগানে থাকার আর চেষ্টা করব না! মার্জনা চাইছি, মার্জনা। ফিরে এসে দেখবে, গেট ইজ ওপন।
    ভদ্রলোক সাইকেলে উঠে একটু এগোতেই আমরা অবাক। কোথায় সেই ভদ্রলোক! সাইকেলের আরোহী শোলার হ্যাট পরা ধবধবে সাদা এক সাহেব। আরোহী সমেত সাইকেল নিমেষে অদৃশ্য।
    মনোজ আবার সেই কথাটা বললে, ভৌতিক’ ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য