স্বর্গের বাগিচা, প্যারাডাইস - হ্যান্স অ্যাণ্ডারসন

    অনেকদিন আগে একজন রাজপুত্র ছিলেন। তার বয়স বেশি ছিল না, কিন্তু তার মেলা ভালো-ভালো বই ছিল। সেসব বইতে যার যা জানবার ইচ্ছা হত, সব পাওয়া যেত। শুধু একটি খবর কোনো বইতে ছিল না। সেটি হল কোথায় গেলে স্বর্গের বাগিচা প্যারাডাইস দেখতে পাওয়া যায়।
    রাজপুত্র যখন খুব ছোটো ছিলেন, সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছেন, তখন তার ঠাকুরমা বলতেন যে স্বর্গের বাগিচার ফুল নাকি ভালো-ভালো পিঠের মতো মিষ্টি ; ফুলের কেশরের স্বাদ চমৎকার ফলের রসের মতো। আর নাকি সেখানে একটা গাছে ইতিহাস ফলে, একটাতে ভূগোল, একটাতে জর্মান ভাষা। যে গাছের ফুল খাওয়া যায়, অমনি সেই বিষয়ে শেখা হয়ে যায়। যত বেশি ফুল খাওয়া যায়, নাকি তত বেশি করে ইতিহাস, ভূগোল, জর্মান ভাষা জানা যায়।
    তখন রাজপুত্র এ-সমস্তই বিশ্বাস করেছিলেন, কিন্তু পরে যখন বয়সের সঙ্গে বিদ্যা-বুদ্ধি বাড়ল, তখন বুঝতে পারলেন যে স্বর্গের বাগিচা প্যারাডাইস একেবারে অন্য জিনিস।
    একদিন রাজপুত্র বনের মধ্যে বেড়াতে গেলেন। একাই গেলেন, কারণ একা বেড়াতেই তার সবচেয়ে ভালো লাগত।
    সন্ধ্যা নেমে এসেছে, এদিকে আকাশে মেঘ জমল। তার পর এমনি বৃষ্টি নামল যেন মনে হল আকাশের সব বাঁধ ভেঙে গেছে। চারদিকে এমনি অন্ধকার যেন ঘোররাতে গভীর কুয়োর ভিতরটা !
    রাজপুত্র এখানে ভিজে ঘাসে পা পিছলে পড়েন, ওখানে শক্ত মাটি থেকে উঁচিয়ে-থাকা স্যাড়া পাথরে হোচট খান। দেখতে দেখতে সব কিছু জলে সপসপ করতে লাগল ; রাজপুত্রের পরনে কাপড়-চোপড়ের একটি সুতোও শুকনো রইল না ।
    শরীরের সব শক্তি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এমন সময় কানে এল অদ্ভুত একটা খস্‌খস্ শব্দ। চেয়ে দেখলেন সামনেই একটা বড়ো গুহার মধ্যে আলো। গুহার মাঝখানে গণগণে আগুন জ্বলছে, তাতে একটা চমৎকার আস্ত হরিণ বালসানো হচ্ছে। আগুনের ধারে এক বুড়ি বসেছিল। বয়স হলেও, দিব্যি লম্বা জোরালো চেহারা, যেন পুরুষমানুষ মেয়ে সেজেছে। বুড়ি একটার পর একটা কাঠের টুকরো নিয়ে আগুনে ফেলছিল। রাজপুত্রকে দেখে ভেকে বলল, “আরো কাছে এসো বাছা, আগুনের সামনে বসে কাপড়-চোপড় শুকাও।”
    রাজপুত্র আগুনের সামনে মাটিতে বসে পড়ে বললেন, “বাবা। এখানে বাতাসের কি জোর!”
    উত্তরে বুড়ি বলল, “আমার ছেলেরা বাড়ি ফিরলে বাতাসের জোর আরো বাড়বে। এটা হল বাতাসদের গুহা। আমার চার ছেলে হল চার বাতাস। আমার কথা বুঝতে পারলে?”
    রাজপুত্র জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার ছেলেরা কোথায়, বুড়ি-মা?”
    বুড়ি বলল, “বোকার মতো প্রশ্নের উত্তর দেবার কোনো মানে হয় না। আমার ছেলেরা যা খুশি তাই করে। মাথার ওপরের ঐ মেঘের সঙ্গে বল খেলে।”
    রাজপুত্র বললেন, “তাই বুঝি? কিন্তু তোমার কথা বলার ধরনটা তো বড়ে কর্কশ, বুড়ি-মা; আমার চেনাজান মেয়েদের মতো তুমি নরম-সরম নও!”
    “হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাদের যে কোনো কাজকৰ্ম্ম নেই। আরে আমার ছেলেগুলোকে সামলাতে হলে কর্কশ না হয়ে করি কি ! অবিশ্যি আমি ওদের ঠিক বাগ মানাই, তা ওরা যতই গো দেখাক-না। দেয়ালে ঐ যে চারটে থলি ঝোলানো দেখছ? তুমি ছোটোবেলায় আয়নার পেছনে লুকোনো লাঠিগাছাকে যেমন ভক্তি করতে, ওরাও ঐ থলিগুলোকে ঠিক তেমনি ভক্তি করে। সবকটাকে একসঙ্গে তেড়েফুঁড়ে দিই থলিতে ভরে। তার পর যতক্ষণ না আমার মরজি হয়, ততক্ষণ ওদের ঐ থলির মধ্যেই বসে থাকতে হয়। এই যে একজন এলেন।”
    এল উত্তুরে বাতাস। সঙ্গে নিয়ে এল হাড়-কাঁপানো শীত। বড়ো-বড়ো শিলা মাটিতে পড়ে লাফাতে লাগল, বরফের কুচি চারদিকে উড়তে লাগল। তার পরনে ছিল ভালুকের চামড়ার তৈরি জামা-পাজামা ; মাথায় সীলমাছের ছালের কানঢাকা টুপি ; দাড়ি থেকে ঝুলছিল লম্বা লম্বা বরফের টুকরো ; জামার কলারের তলা থেকে গড়িয়ে পড়ছিল একটার পর একটা শিলা। রাজপুত্র বললেন, “ভাই, ওভাবে অমনি আগুনের কাছে যেও না, তোমার হাত-মুখে বরফ-লাগা ঘা হয়ে যেতে পারে।”
    হা হা করে হেসে উত্তুরে বাতাস বলল, “বরফ লেগে ঘা হবে! আরে, বরফ লাগলেই তো আমি সবচেয়ে আনন্দ পাই। কিন্তু তুমি কে বট হে সরু-ঠাং ছোকরা? বাতাসদের গুহায় এলেই-বা কি করে?”
    বুড়ি বলল, “ও আমার অতিথি। তাতে যদি তোমার আপত্তি থাকে, তা হলে স্বচ্ছন্দে থলিতে ঢুকতে পার। এবার শুনলে তো আমার মনের কথা।”
    ও-ই যথেষ্ট। উত্তুরে বাতাস তখন কোথা থেকে এসেছে, গতমাসটা কিভাবে কাটিয়েছে, এই-সব গল্প বলতে শুরু করল। সে বলল, “আমি উত্তর মেরু থেকে ঘুরে এলাম। রুশ তিমি-শিকারীদের সঙ্গে ঋক্ষ দ্বীপে গেছিলাম। সে যে কী চমৎকার জায়গা কি আর বলব। সেখানকার জমি হল থালার মতো চ্যাপটা, যেন কেউ নাচবে বলে তৈরি। আধগলা বরফের ওপর শ্যাওলা গজিয়ে অমন হয়েছে । তার ওপরে খোঁচা খোঁচ পাথর আর তিমি আর সাদা ভালুকের কংকাল ছড়ানো, দেখায় যেন রাক্ষসদের হাত-পা, তাতে আবার সবুজ ছ্যাৎলা পড়েছে। দেখে মনে হল ওগুলোর ওপর কোনো জন্মে সূর্যের আলো পড়ে নি। আমি মেঘের গায়ে একটু ফুঁ দিলাম, যাতে শিকারীরা ভাঙা জাহাজের টুল তক্তার ওপর তিমি মাছের চামড়া দিয়ে তৈরি কুড়েঘরটিকে দেখতে পায়। কুঁড়ের চালের ওপর একটা জ্যান্ত সাদা ভালুক বসে দাঁত খিঁচোচ্ছিল। সমুদ্রের তীরে খানিক বেড়ালাম, পাখিদের বাসায় উঁকি মেরে দেখলাম ন্যাড়া ন্যাড়া বাচ্চাগুলো ঠোট খুলে এই এত বড়ো হাঁ করে চ্যাঁচাচ্ছে! ওদের ক্ষুদে-ক্ষুদে গলায় একটু করে হাওয়া দিতেই সবাই চুপ করল। দেখলাম জলের তলায় সমুদ্রের ঘোড়াগুলো বিশাল কেঁচোর মতো গড়াগড়ি খাচ্ছে, তাদের মাথাগুলো শুয়োরের মতো, দাঁতগুলো আড়াই হাত লম্বা। তার পর মাছধরা শুরু হল। সমুদ্রের ঘোড়ার বুকে বর্শা বিধঁল, ফোয়ারার মতো ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে সাদা বরফের উপর দিয়ে গড়িয়ে চলল। অমনি মনে পড়ে গেল, এ খেলায় আমাকেও তো যোগ দিতে হবে। আমার জাহাজ হল পর্বতপ্রমাণ বরফের চাই ; তাই দিয়ে শিকারীদের নৌকো ঘিরে ফেললাম। নৌকোর মাঝিদের সে কী শিস্ দেওয়া আর চীৎকার! আমি তার চেয়েও জোরে শিস দিতে লাগলাম ! শেষপর্যন্ত আগে সব মরা তিমি, তার পর নিজেদের বাক্স-প্যাটরা, দড়-দড়ি, বরফের ওপর টেনে ফেলে দিতে ওরা বাধ্য হল। তখন আমি ওদের ওপর নরম বরফের কুচি ঢেলে, ওদের তাড়িয়ে দক্ষিণ মুখে নিয়ে গেলাম, খাক যত ইচ্ছা নোনা জল ! বাছাধনরা আর কখনো ঋক্ষ দ্বীপে আসছে না !”
    বাতাসদের মা বলল, “তার মানে যথেষ্ট কুকর্ম করে এসেছ !”
    উত্তুরে বাতাস বলল, “ভালো কাজ কি করেছি না করেছি, সে আমার নিজের মুখে বলবার নয়, বলবে অন্য লোকে। সে যাই হোক, এই যে আমার পশ্চিম ভায়া এসে হাজির। ওকে আমি সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসি ; ওর গায়ে সাগরের গন্ধ লেগে থাকে, ওর ঠাণ্ডা ভাবটি মানুষকে চাঙা করে তোলে!”
    রাজপুত্র অবাক হয়ে বললেন, “এই কি তবে সেই মৃদুমন্দ পশ্চিম হাওয়া?”
    বুড়ি বলল, “পশ্চিম হাওয়া বটে, তবে আজকাল আর তেমন মৃদুমন্দ নেই। সেকালে ভারি সভ্যভব্য ছিল, কিন্তু অনেক কাল হল সে-সব গেছে।”
    বাস্তবিক পশ্চিম হাওয়া দেখতে বুনো জংলির মতো, ওদিকে মাথায় একটা তুলো-পোরা টুপি আঁটা, যাতে চোটটােট না লাগে। হাতে মার্কিনী বন থেকে কেটে আনা মেহগিনির মুগুর। আমন আর কোথাও হয় না।
    ওদের মা বলল, “তুমি কোথা থেকে এলে, বাছা?” সে বলল, “বাদাবন থেকে। সেখানে গাছের ফাঁকে ফাঁকে কাঁটা লতার ঝোপ, সেখানে ভিজে ঘাসে জোলো সাপ ঘুমোয়, মনে হয় মানুষের সেখানে কোনো কাজ নেই।”
    “তুমি সেখানে কি করলে?”
    “আমি গভীর নদীর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, উঁচু পাথরের ওপর থেকে নীচে আছড়ে পড়েই, কেমন গুড়িগুড়ি ধুলোর মতো হয়ে আবার মেঘের দিকে উড়ে চলেছে, যাতে তার কোলে রামধনু জন্মায়। দেখলাম বুনো মহিষ সীতরে নদী পার হতে গিয়ে কেমন স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে। একঝাক বুনো হাসও ঐ নদীতে সাঁতার দিচ্ছিল। নদী যেখানে ঝাঁপ দিয়ে নেমেছে, ওরা বোধ হয় সেখান থেকেই উড়ে চলে গেল। কিন্তু মহিষটা জলের তোড়ে নীচে পড়ল। তাই দেখে আমার মনটা বড়ো খুশি হল, তাই এমনি ঝড় তুললাম যে আদ্যিকালের ৰিশাল গাছগুলো ভীষণ শব্দ করে মাটিতে আছড়ে পড়ে, ভেঙে খানখান হল!”
    বুড়ি বলল, “আর কিছু কর নি?”
    সে বলল, “মার্কিন দেশের মাঝখানে বিশাল ঘাসজমি আছে, সেখানে একটাও গাছ জন্মায় না ; সেই সাভানাতে তাণ্ডব নাচন নেচে এলাম। বুনো ঘোড়ার পিঠে চাপলাম ; নারকেলগাছ ধরে ঝাঁকানি দিলাম; সব কথা যদি বলি, তোমরা চমকে উঠবে। কিন্তু মনের মধ্যে যা থাকে, তার সবটা কি আর বলা চলে, কি বল বুড়ি-মা?” এই বলে মাকে ধরে সে এমনি ভালুকে আদর করল যে সে বেচারা পড়ে যায় আর কি ! বড়ো জংলি লোকটা।
    তার পর এল দখিন হাওয়া, মাথায় পাগড়ি, গায়ে বেদুইনদের পোশাক উড়িয়ে। এসেই আগুনে কতকগুলো কাঠ চাপিয়ে বলল, “উঃ, এখানে বেজায় শীত। আমার আগে যে উত্তরে হাওয়া হাজির হয়েছে, সেটা বেশ জানান দিচ্ছে।”
    উত্তরে হাওয়া বলল, “উঃ, বড্ডো গরম ! এই আঁচে একটা আস্ত সাদা ভালুক রান্না করা যায়!”
    দখনে হাওয়া বলল, “তুমি নিজেই একটা সাদা ভালুক।”
    মা চটে গেল, “বলি, দুজনেরই কি থলিতে ঢুকবার সাধ হয়েছে নাকি? চুপ করে বসে, এবার বল দিকিনি কোথায় গেছিলে?”
    দখিন হাওয়া বলল, “আফ্রিকাতে, মা। কাফ্রিদের দেশে সিংহ শিকার করে এলাম। ও দেশের উপত্যকায় কী সুন্দর ঘাস গজায়, মা, জলপাইয়ের মতো সবুজ তার রঙ। ন্যু বলে এক জাতের হরিণ সেখানে নেচে বেড়ায়৷ উটপাখির সঙ্গে দৌড় বাজি খেললাম, কিন্তু সে আমার সঙ্গে পারবে কেন ! মরুভূমির হলুদ বালির ধারে গিয়ে পৌঁছলাম ; মনে হল বুঝি সাগরের তলায় নেমেছি ! যাত্রীদের দল দেখলাম, জলের অভাবে কষ্ট পাচ্ছে; শেষ উটটিকে মেরেও তার কুঁজের মধ্যে সামান্য এতটুকু জল পেল! ওদের মাথার উপর রোদ ঝাঁ ঝাঁ করছিল, গরম বালিতে পা পুড়ে যাচ্ছিল ! উঃ ! মরুভূমির যেন শেষ নেই। আমি করলাম কি, বুরো বালিতে গড়াগড়ি দিয়ে বালিগুলোকে একটা প্রকাণ্ড থামের মতো করে পাকিয়ে নিলাম ; তার পর কী নাচই নাচল আমার থামটা! একটা এক-কুঁজওয়াল উট তাই দেখে হকচকিয়ে গেল আর বণিকটা কাফতান টেনে মাথা ঢেকে, আল্লার সামনে যেমন মাটিতে শুয়ে পড়ে, তেমনি করে আমার সামনে শুয়ে পড়ল! সক্কলে বালি চাপা পড়ে গেল; ওদের ওপর একটা বালির বিরাট স্তুপ তৈরি হয়ে গেল! একদিন যদি গিয়ে স্তপটাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিই, ওদের হাড়গোড় বেরিয়ে পড়ে, রোদ লেগে খটখটে সাদা হয়ে যাবে! পরে যখন অন্য যাত্রীরা ঐ পথে যাবে, তারা বুঝতে পারবে তাদের আগেও অন্য লোকে এ-পথে গেছে।”
    শুনে বুড়ি-মা বলল, “তা হলে তুমি খুব খারাপ কাজ করেছ। ঢোক থলির মধ্যে!”
    এই বলে দখিন হাওয়া কিছু টের পাবার আগেই, তার ঘাড় ধরে বুড়ি তাকে থলি বন্ধ করে ফেলল। থলিটা মাটিতে গড়াতে লাগল, অগত্যা বুড়ি তার ওপর চেপে বসল, দখিন হাওয়া তখন বাধ্য হয়ে চুপ করল।
রাজপুত্র বললেন, “বাপরে, কি ছেলে ?” বুড়ি বলল, “যা বলেছ! তবে আমার কথা মেনে চলতেই হয় । ঐ এলেন চার নম্বর !”
    এবার এল পূবের বাতাস, পরনে তার চীনে পোশাক। তার মা বলল, “ওহে, তুমি তা হলে পৃথিবীর ঐ কোণটি থেকে ঘুরে এলে। আমি ভেবেছিলাম, তুমি বুঝি স্বর্গের বাগিচার দিকে যাবে।”
    পুবের হাওয়া বলল, “কাল যাব যে মা, শেষবার গেছিলাম, তার পর কাল একশো বছর পূর্ণ হবে! এখন আসছি চীন দেশ থেকে। ওখানকার একটা চীনে-মাটির মিনারের চারদিকে খুব খানিকটা নেচে, সব ঘণ্টাগুলোকে বাজিয়ে দিলাম! নীচের রাস্তায় দেখলাম কর্মচারীদের এমনি বেত মারা হচ্ছে যে শেষ পর্যন্ত ওদের পিঠেই বেতগুলো টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যাচ্ছে! তবু প্রথম থেকে নবম শ্রেণীর বহু লোক খালি খালি বলছিল, ‘ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, বাবা আমার বড়োই উপকার করলেন? অবিশ্যি ওটা মোটেই তাদের মনের কথা নয়। আমিও ঘণ্টা নেড়ে গান জুড়লাম, ৎসিং—ৎসাং—ৎসু?”
    তার মা বলল, “বাবা, কি দুরন্ত ছেলে তুমি ? ভাগ্যিস, কাল স্বর্গের বাগিচায় যাচ্ছ ! ওখানে গেলেই তোমার স্বভাবের উন্নতি দেখা যায়। মনে করে জ্ঞানের ঝরনার জল একটু বেশি করে খেও আর আমার জন্যেও এক শিশি ভরে এনে৷”
    পুবের হাওয়া বলল, “তাই হবে, তাই হবে। কিন্তু দখনে ভায়াকে থলিতে ভরেছ কেন? ওকে বেরুতে দাও মা। ফনিক্স বলে একরকম পাখি আছে, ওর কাছে তার কথা শুনতে হবে। প্যারাডাইসে এক রাজকন্যা থাকেন, একশো বছর পর পর যেই তার কাছে যাই, অমনি তিনি আমাকে ফনিক্স পাখির কথা জিজ্ঞাসা করেন। লক্ষী মাগো, থলিটা একবারটি খোল-না। তা হলে আমি তোমাকে দু পেয়ালা চা দেব ; কী তাজা, কী সবুজ, যেন এইমাত্র গাছ থেকে তোলা হল!”
    মা বলল, “বেশ তাই হবে, চা খাওয়াবে বলে আর তুমি আমার আহ্বরে গোপাল বলে, দিচ্ছি খুলে।” এই বলে বুড়ি থলির মুখ খুলে দিল আর দখিন হাওয়া গুটিগুটি বেরিয়ে এল। অচেনা রাজপুত্রের সামনে এভাবে জব্দ হওয়াতে সে ভারি অপ্রস্তুত।
    দখিন হাওয়া বেরিয়ে এসেই বলল, “এই নাও, রাজকন্যার জন্য তালপাতার পাখা। পৃথিবীর একমাত্র বুড়ো ফনিক্স পাখির কাছে ওটাকে পেয়েছি। দেখ, পাখার ওপর ঠোঁট দিয়ে আঁচড় কেটে ফনিক্স তার জীবন-কাহিনী লিখে রেখেছে। রাজকন্যা নিজেই সে কথা পড়ে দেখতে পারবেন। দেখলাম ফনিক্স পাখি কেমন নিজের বাসায় নিজে আগুন ধরিয়ে দিয়ে, তার মধ্যে বসে হিন্দু বিধবার মতো দেখতে দেখতে পুড়ে গেল। শুকনো ডালপালা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল, আর আগুনধরা বাসা থেকে কী মিষ্টি একটা গন্ধ বেরুল। শেষপর্যন্ত সব জ্বলে পুড়ে খাক্ হয়ে গেল ; বুড়ো ফানিক্স পাখি এক মুঠো ছাই হয়ে গেল। তার পর দেখলাম আগুনের মধ্যে একটা ডিম জ্বলজ্বল করছে। দুম্‌ করে ডিমটা ফেটে একটা বাচ্চ ফীনিক্স উড়ে বেরিয়ে এল। সেই ফনিক্সটাই এখন সব পাখিদের রাজা ; ও ছাড়া পৃথিবীতে আর একটিও ফানিক্স পাখি নেই। তালপাতার পাখায় ফনিক্স ঠুকরে একটা ফুটাে করে দিয়েছে দেখ। ঐভাবেই রাজকন্যাকে সে নমস্কার জানিয়েছে।”
    বাতাসদের মা বলল, “বেশ তা হলে এখন খেতে বসা যাক।” কাজেই সকলে মিলে ঝলসানো হরিণের মাংস খেতে বসল। রাজপুত্র বসলেন পুবের হাওয়ার পাশেই। দেখতে দেখতে দুজনার মধ্যে ভারি ভাব হয়ে গেল ।
    রাজপুত্র জিজ্ঞাসা করলেন, “ও কোন রাজকন্যার কথা হচ্ছিল, ভাই? আর স্বর্গের বাগানটাই-বা কোথায়?”
    পুবের হাওয়া হা হা করে হেসে বলল, “কেন, সেখানে যাবার ইচ্ছা হয়েছে নাকি? বেশ তো, কাল আমার সঙ্গেই উড়ে চলো। তবে তোমাকে একটা কথা বলে রাখা উচিত ; কথাটা হল যে আদম আর ইভের সময়ের পর থেকে কোনো জ্যান্ত মানুষ সেখানে যায় নি। ওদের দুজনকে যখন সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হল, বাগিচাটা একেবারে মাটির তলায় নেমে গেল। কিন্তু এখনো সেখানে তেমনি মিষ্টি রোদ ওঠে, তেমনি মধুর বাতাস বয় আর দেখতেও তেমনি সুন্দর। পরীদের রানী সেখানে ঘর বেঁধেছেন। ওখানে সুখ দ্বীপ আছে, সেখানে মৃত্যুর প্রবেশ নিষেধ, সেখানকার জীবন বড়ো আনন্দের। কাল যদি আমার পিঠে চড়ে বসে, আমি তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব। তাতে বোধ হয় কারও কোনো আপত্তি হবে না। এখন চুপ কর দিকনি, বড়ো ঘুম পাচ্ছে।”
    কাজেই তখনকার মতো যে যার শুতে গেল। ভোরে ঘুম ভাঙতেই, নিজেকে মেঘের অনেক উপরে উঠতে দেখে রাজপুত্র অবাক হলেন না। দেখেন তিনি পুবের হাওয়ার পিঠে চেপে আছেন, সে তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। এত উঁচু দিয়ে তাঁরা ছুটে চলেছেন যে নীচের বন মাঠ নদী সাগর দেখে মনে হচ্ছে যেন মস্ত একটা রঙিন মানচিত্রে আঁকা।
    পুবের হাওয়া বলল, “সুপ্রভাত! আরেকটু ঘুমোলে পারতে। আমাদের নীচেকার চ্যাপ্টা জমিতে দেখবার মতো কিছু নেই, এক যদি গির্জে গুণে আনন্দ পাও। ঐ দেখ-না সবুজ তক্তার ওপর যেন সাদা সাদা খড়ির টুকরো।” ও যাকে তক্তা বলল, সেগুলো আসলে খেত আর মাঠ।
    রাজপুত্র বললেন, “তোমার মা ভাইদের কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই চলে আসাটা আমার ভারি অভদ্রতা হয়েছে।”
    পুবের হাওয়া বলল, “আরে ছিলে তো ঘুমিয়ে, কাজেই ও সব মাপ করা যায়।”
    এবার ওরা আরো বেগে ছুটে চলল, এত বেশি বেগে যে গাছের মাথা তুলে উঠল, ডালপালা পাত থেকে মর্মর ধ্বনি উঠল। যখনই ওরা সাগর হ্রদ পার হয়, জলে বড়ো-বড়ো ঢেউ ওঠে, রাজহাঁসের মতো জাহাজগুলোও যেন জলের মধ্যে মাথা ডোবায় !
    সন্ধ্যায় যখন আঁধার নামল, বড়ো-বড়ো শহরগুলোকে কী অদ্ভুত দেখাতে লাগল। এখানে ওখানে আলো জ্বলছে ; ঠিক যেন এক টুকরো পোড়া কাগজ থেকে আগুনের ফুলকি একটার পর একটা উড়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তার পর সব শেষ।
    রাজপুত্ৰ হাততালি দিয়ে উঠলেন, পুবের হাওয়া বলল, “চুপ, ভাই, চুপ। আমাকে কষে আঁকড়ে ধর, নইলে যদি পড় তো কোনো গির্জার চুড়ে থেকে চ্যাং-দোলা হয়ে ঝুলে থাকবে।”
    তার পর পুবের হাওয়া বলল, “ঐ হিমালয় পাহাড়। এশিয়াতে এত উঁচু পাহাড় আর নেই। দেখতে দেখতে আমরা এবার স্বর্গের বাগিচায় পৌছে যাব।” তার পর তার খানিকটা দক্ষিণমুখো হয়ে চলল ; একটু পরেই নাকে এল মসলার আর ফুলের সুগন্ধ। বুনো ডুমুর আর ডালিম যেখানে সেখানে হয়ে আছে। লতা থেকে লাল সাদা আঙুরের থোপা ঝুলছে। এইখানে নেমে ওরা নরম ঘাসের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। বাতাসকে দেখে ফুলগুলো মাথা নাড়তে লাগল, যেন আদর করে বলছে, “এসো, এসো। ”
    রাজপুত্র বললেন, “এই কি তবে স্বর্গের সেই বাগান?”
    পুবের হাওয়া বলল, “না, না, এখনো নয়। তবে শিগগিরই পৌছব। ঐ যে পাথরের পাহাড় দেখছ, ঐ যে মস্ত গুহা, তার সামনে আঙর লতা বড়ে-বড়ো সবুজ পরদার মতো বুলে রয়েছে? ওরই মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। গায়ে কাপড় জড়িয়ে নাও। এখানে রোদে পুড়ছ, কিন্তু এক পা এগুলেই বরফে জমে যাবে। ঐ যে পাখি গুহার সামনে দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ওর এক ডানায় গ্রীষ্মের তাপ, আর এক ডানায় শীতের হিমঠাণ্ডা।”
    রাজপুত্র বললেন, “স্বর্গের বাগিচায় যাবার এই তবে পথ।”
    ওরা গিয়ে গুহায় ঢুকল। বাবা, সব যেন জমে যায়। তবে বেশিক্ষণের জন্যে নয়। পুবের হাওয়া ডান মেলে ধরল, সে ডানা পবিত্র আগুনের মতো ঝলমল করে উঠল। গহ্বর বলে গহ্বর ! মাথার উপর থেকে অদ্ভুত আকারের প্রকাণ্ড সব পাথরের চাংড়া ঝুলছে, তাদের গা থেকে জল ঝরছে। গুহাপথ কখনো এত সরু যে চার হাত-পায়ে হামা দিয়ে এগুনো ছাড়া উপায় নেই, আবার কখনো এত উঁচু, এত প্রশস্ত, মনে হয় যেন মাথার উপরে খোলা আকাশ।
    রাজপুত্র বললেন, “নিশ্চয়ই আমরা মৃত্যুপথ দিয়ে স্বর্গের বাগিচায় যাচ্ছি।”  কিন্তু পুবের হাওয়া মুখে রা কাড়ল না, আঙুল দিয়ে শুধু সামনে দেখিয়ে দিল, কী সুন্দর নীল আলোর ছটা তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। মাথার উপরের পাথরগুলো ক্রমে যেন কুয়াশার রূপ নিতে লাগল ; শেষে দেখতে হল যেন জ্যোৎস্নামাখা সাদা মেঘ, তেমনি স্বচ্ছ, তেমনি ঝলমলে। নাকে এল মৃদু মধুর বাতাস, পাহাড়ের হাওয়ার মতো নির্মল, পাহাড়তলীর গোলাপের মতো তার সুবাস।
    রাজপুত্র দেখলেন বাতাসের মতো স্বচ্ছ এক নদী বয়ে যাচ্ছে। তাতে সোনালি রুপোলি মাছ সাঁতরে বেড়াচ্ছে; জলের নীচে বেগুনি বান মাছ খেলা করছে, এতটুকু নড়লে চড়লে তাদের গা থেকে নীল আলো ঝলকাচ্ছে। জলের উপর শাপলা ফুলের চওড়া পাতায় রামধনুর রঙ লেগেছে, ফুলটি যেন কমলা রঙের উজ্জ্বল আগুনের শিখা। নদীর উপরে একটা সাঁকো, ঝকঝকে মুক্তোর মতো শ্বেতপাথর দিয়ে তৈরি, তাতে কী অপরূপ সূক্ষ্ম কারিকুরি। সাঁকোর উপর দিয়ে জলটুকু পেরিয়ে মুখ দ্বীপে যেতে হয়। সেইখানেই স্বর্গের বাগিচা।
    পুবের হাওয়া রাজপুত্রকে ওপারে বয়ে নিয়ে গেল। রাজপুত্র শুনতে পেলেন সেখানকার ফুল-পাতারা তার ছোটোবেলার বিষয়ে গান গাইছে। কাঁপা-কাঁপা কোমল তাদের গলার সুর, মানুষের গলা তেমন হয় না। রাজপুত্র গাছ দেখলেন, কিন্তু সে কি তালগাছ, নাকি বিশাল জলজ গাছ তা বুঝতে পারলেন না। এত বিশাল, এমন সরস গাছ তিনি আগে কখনো দেখেন নি। লম্বা লম্বা ফুলের মালার মতো কত আশ্চর্য লতা-গুল্ম গাছের চারদিকে ঝুলে আছে। পাখি, ফুল আর নকশার কি অপূর্ব সমাবেশ। তারই কাছে, ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে ঝকমকে পেখম ধরে একঝাঁক ময়ূর। কিন্তু যেই-না রাজপুত্র তাদের গায়ে হাত দিলেন, অমনি বুঝলেন তারা পাখি নয়, গাছ। কলাগাছের মতো একরকম গাছ, তার বড়ো-বড়ো পাতাগুলি ময়ূরের পেখমের মতো জমকাল। জলপাইয়ের ফুলের মতো সুগন্ধি সবুজ ঝোপঝাড়ের উপর দিয়ে বাঘ সিংহ লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা সবাই পোষমানা। ভীরু বুনো ঘুঘু পাখির মুক্তোর মতো উজ্জ্বল সুন্দর পালক; সিংহের কেশরের উপর তারা ডানা ঝাপটাচ্ছে। ভীরু হরিণও সেখানে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ছে, যেন তার বড়ো ইচ্ছা ওদের খেলায় যোগ দেয়।
    এবার এলেন স্বর্গের বাগিচার সেই পরী। তাঁর পরনের কাপড় সূর্যের আলোর মতে উজ্জ্বল; তার মুখের ভাব এত কোমল, যেন কোনো বড়ো সুখী মা তার সন্তানকে নিয়ে আনন্দ করছেন। পরীর বয়স খুব কম, পরী বড়ো রূপসী । র্তার সঙ্গে চলেছে সুন্দরী সখীরা, তাদের ফুলে একটি করে তারা জ্বলজ্বল করছে।
    পুবের হাওয়া তার হাতে ফনিক্স পাখির দেওয়া সেই তালপাতাটি দিল ; আনন্দে তার চোখ দুটি উদ্ভাসিত হল। রাজপুত্রের হাত ধরে তিনি তাকে তার প্রাসাদে নিয়ে গেলেন। সে প্রাসাদের দেয়ালের রঙ হল সূর্যের দিকে মুখ ফেরানো অপরূপ একটি টিউলিপ ফুলের পাপড়ির মতো। প্রাসাদের গম্বুজটি যেন একটি সুন্দর ফুল, তার পাপড়ির আধারের মাঝখানে যতই চেয়ে থাকা যায়, ততই তা গভীর বলে মনে হয়।
    রাজপুত্র জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে শার্শীর ভিতর দিয়ে চেয়ে দেখলেন। ঐ তো জ্ঞানবৃক্ষ দেখা যায়, তার পাশে দাঁড়িয়ে সাপ, আদম, ইভ। রাজপুত্র জিজ্ঞাসা করলেন, “তবে না ওদের এখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল?”
    পরী হেসে বললেন, “ঐ শার্শীর প্রত্যেকটির উপরে কাল সব কিছুর ছাপ রেখে গেছে ; অবিশ্বি আমরা যেমন ছবির মূর্তি দেখে থাকি, এ ঠিক তেমন নয়। বরং বলা যায় এ যেন সত্যিকার জীবনের রূপ। আয়নায় যেমন দেখা যায়, গাছের পাতা নড়ছে, মানুষজন আসছে যাচ্ছে।”
    রাজপুত্র তখন আরেকটা শার্শীর মধ্যে দিয়ে চাইলেন। দেখলেন পুরাণে যেমন ইয়াকুবের স্বপ্নের কথায় লেখা আছে, সেই সিঁড়ি স্বর্গ অবধি উঠে গেছে আর বড়ো-বড়ো ডানা মেলে দেবদূতরা সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করছেন। পরী ঠিকই বলেছেন, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটেছে, তার জীবন্ত ছায়া এই ঘরের শার্শীর মধ্যে ধরা আছে। একমাত্র কালের পক্ষেই এ কাজ সম্ভব।
    আবার হেসে পরী রাজপুত্রকে বিশাল উঁচু একটা সভাঘরে নিয়ে গেলেন। এ ঘরের দেয়ালগুলি যেন স্বচ্ছ ছবি দিয়ে ঢাকা আর সে ছবিতে আঁকা মুখগুলি অপূর্ব সুন্দর। ওর হল হাজার হাজার পবিত্র আত্মা। ওরা হেসে হেসে গান গাইতে লাগল।
    সভাঘরের মাঝখানে প্রকাণ্ড এক গাছ, কী ঘন সবুজ তার ডালপালা। সবুজ পাতার মধ্যে নানান মাপের সোনালি আপেল ঝুলে আছে। এই তো সেই জ্ঞানবৃক্ষ, আদম ইভ যার ফল খেয়েছিলেন। গাছের প্রত্যেকটি পাতা থেকে টকটকে লাল রঙের শিশিরের ফোটা বারছিল, গাছ যেন রক্ত-অশ্ৰু ফেলছে ।
    পরী বললেন, “চলো, নৌকোয় উঠি, শরীর মন তাজা হবে। নৌকো এক জায়গাতেই থাকবে একটুও নড়বে না, শুধু ঢেউয়ের দোলায় দোল খাবে। কিন্তু দেখে মনে হবে যেন পৃথিবীর সব দেশ আমাদের পাশ দিয়ে ভেসে চলে যাচ্ছে।”
    বাস্তবিকই তীরের রেখা কেমন সরে সরে যাচ্ছিল দেখতে অদ্ভুত লাগছিল। প্রথমে দেখা গেল বরফে ঢাকা উঁচু অ্যাল্পস্ পাহাড় ; পাহাড়ের শিখরে মেঘমালা, গায়ে ঝাউগাছ। শিকারীর শিঙার বিষণ্ন গম্ভীর সুর শোনা গেল ; নীচের উপত্যকায় রাখালরা মনের আনন্দে গান গাইছে, তাও শোনা গেল।
    তার পরেই নৌকোর উপর এসে পড়ল বটগাছের লম্ব ঝুরি ; কুচকুচে কালো রাজহাঁস পাশ দিয়ে ভেসে চলল; তীরে দেখা অদ্ভুত দেখতে কত জানোয়ার, কত ফুল ; আকাশ ছোঁয়া নীল অ্যাল্পসের পরেই দেখা গেল নব-হল্যাণ্ড দেশ ।
    তার পর শোনা গেল পুরোহিতদের বন্দনা, অসভ্যদের নাচের শব্দ, তার সঙ্গে ঢাকঢোল, কাঠের তুরী। পাশ দিয়ে ভেসে গেল মিশর দেশের আকাশ ছোঁয়া পিরামিড, ধূলোয় লুটিয়ে পড়া থাম, স্ফিঙ্কসের মূর্তি।
    তার পর উত্তর মেরুর বরফের পাহাড়ের উপর দিয়ে মেরুজ্যোতি দেখা গেল। এমন সুন্দর আতসবাজি দেখলেও মানুষে তৈরি করতে পারে না। এ-সব দেখে রাজপুত্রের সে কী আনন্দ! এখানে যেটুকু বলা হল, আসলে তার শত গুণ আশচর্য জিনিস সেদিন তিনি দেখলেন।
    শেষে রাজপুত্র জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি কি চিরকাল এখানে থাকতে পারব?”
    পরী বললেন, “পারবে কি না পারবে, সেটা তোমার নিজের হাতে। আদমের মতো যদি অবাধ্য না হও, তা হলে চিরদিন থাকতে পারবে।”
    রাজপুত্র বললেন, “জ্ঞানবৃক্ষের আপেল আমি ছোব না। ওরই সমান সুন্দর ফল এখানে তো হাজার হাজার রয়েছে।”
    পরী বললেন, “নিজের মনকে পরীক্ষা করো। যদি তেমন মনের জোর না থাকে, তা হলে যে পুবের হাওয়ার সঙ্গে এসেছ, তারই সঙ্গে ফিরে যেও। ও একটু পরেই যাবে, তার পর একশো বছরের মধ্যে আর আসবে না। এখানে সেই একশো বছরকে মনে হবে যেন মাত্র একশো ঘণ্টা। কিন্তু লোভে পড়ার জন্যে, পাপ করার জন্যে অনেক সময় পাবে। রোজ সন্ধ্যায় বিদায় নেবার সময়, আমি তোমাকে বলব, ‘এসো আমার সঙ্গে।’ হাতছানি দিয়ে তোমাকে ডাকব। কিন্তু খবরদার, আমার ডাক শুনো না । আমার সঙ্গে কখনো এসে না। এলে, প্রতি পদে তোমার লোভ বেড়ে যাবে। পায়ে পায়ে তা হলে তুমি যে ঘরে জ্ঞানবৃক্ষ আছে, সেখানে পৌছে যাবে। আমি ঐ গাছের সুগন্ধে-ভরা বোলা ডালপালার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকব। তুমি আমার উপর ঝুঁকে পড়বে, কিন্তু এতটুকু ছোঁও যদি, অমনি স্বর্গের এই সুন্দর বাগিচা মাটির তলায় বসে যাবে, আর তাকে খুঁজে পাবো না।
    তখন তোমার চারদিকে মরুভূমির ধারালো বাতাস বইতে থাকবে, তোমার চুল থেকে হিমশীতল জল ঝরবে, তোমার কপালে লেখা থাকবে শুধু দুঃখ আর দুশ্চিন্তা।”
    রাজপুত্র বললেন, “আমি এখানেই থাকব।”
     পুবের হাওয়া তার কপালে চুমে খেয়ে বলল, “বলবান হও। একশো বছর পরে আবার দেখা হবে। বিদায়! বিদায়!” এই বলে সে দুই বিশাল পাখা মেলে দিল। পাখা থেকে আলোর ছটা বেরুতে লাগল, ফসলকাটার সময়ে যেমন করে বিদ্যুৎ চমকায়, কিম্বা উত্তরে শীতকালে যেমন মেরুজ্যোতি দেখা যায়। বাগানের গাছপালা ফুল সবাই প্রতিধ্বনি করে উঠল, “বিদায়! বিদায়!”
    সারসরা আর পেলিক্যান পাখিরা লম্বা রেশমী ফিতের মতো সারি দিয়ে বাগানের সীমানা পর্যন্ত তার সঙ্গে গেল।
    তার পর পরী বললেন, “এবার আমাদের নাচের পালা শুরু হবে। তার পর যখন সূর্য ডুবতে আরম্ভ করবে, দেখবে তোমার সঙ্গে নাচতে নাচতে আমি তোমাকে ডাকছি, বলছি ‘এসো আমার সঙ্গে? কিন্তু এসো না তুমি৷ একশো বছর ধরে রোজ সন্ধ্যায় এমনি করে তোমাকে ডাকব। রোজ দেখবে তোমার মনের জোর বাড়ছে, শেষটা আমার সঙ্গে যেতে তোমার এতটুকু ইচ্ছা করবে না। আজ সন্ধ্যায় তোমাকে প্রথমবার ডাকব। এই দেখ, তোমাকে সাবধান করে দিলাম?
    তার পর পরী তাঁকে নিয়ে গেলেন মস্ত একটা ঘরে, সেটি আগাগোড়া স্বচ্ছ সাদা লিলি ফুলের তৈরি। লিলি ফুলের হলদে কেশরগুলো পাকিয়ে ছোটো-ছোটো সোনালি বীণা হয়ে গেছে। সেই বীণা থেকে বাঁশির মতো মিষ্টি সুর বেরুচ্ছে।

    সূর্য ডুবে যাচ্ছে ; সমস্ত আকাশ যেন খাটি সোনার, বেগনি আবছায়ার মধ্যে লিলি ফুলগুলি অপূর্ব সুন্দর গোলাপ ফুলের মতো জ্বলজ্বল করছে। রাজপুত্র দেখলেন সভাঘরের পিছনের দেয়ালটি খুলে গেল ; জ্ঞানবৃক্ষ দেখা গেল ; কী তার মহিমা, চোখ ঝলসে যায় ! একটা গান ওঁকে যেন ঘিরে রইল, কী মিষ্টি, কী কোমল, যেন ওঁর মার গলার সুরের মতো। মনে হল তিনি ডাকছেন, “বাছা রে, ওরে আমার বাছা রে।”
    তার পর পরী কি সুন্দর ইশারা করে ডাকল, “আমার সঙ্গে এসো, এসো আমার সঙ্গে !” অমনি সব প্রতিজ্ঞা ভুলে রাজপুত্র সেদিকে ছুটে গেলেন, সেই প্রথম রাত্রেই।
    চারদিকের সৌরভ, মসলার সুগন্ধের মতো আরো ঘন হয়ে এল, বীণার সুর আরো মিষ্টি শোনাল। যে ঘরে জ্ঞানবৃক্ষ ছিল, সেখানে মনে হল লক্ষ লক্ষ মাথা নড়ছে আর হাসিমুখে বলছে, “সব জানতে দাও। মানুষই তো পৃথিবীর প্রভু!” আরো মনে হল জ্ঞানবৃক্ষের পাতা থেকে ঐ যে টসটস করে ঝরছে, ও তে রক্তের অশ্র নয়, ও যে উজ্জ্বল লাল তারা !
    কাঁপা কাঁপা গলায় পরী ডাকলেন, “এসো, আমার সঙ্গে এসো!” এই বলে জ্ঞানবৃক্ষের ডাল সরিয়ে, তিনি তার আড়ালে লুকিয়ে পড়লেন।
    রাজপুত্র বললেন, “এখনো পাপ করি নি ; কখনো করবও না!” এই বলে গাছের শাখা সরিয়ে দেখলেন তার আড়ালে পরী ঘুমিয়ে আছেন। এত সুন্দর স্বর্গের কাননের পরী ছাড়া আর কেবা হতে পারে?
    রাজপুত্র ঝুঁকে পড়ে দেখলেন পরীর চোখের পলকের পিছনে অশ্রুর ফোটা থরথর করে কাঁপছে। আস্তে আস্তে বললেন, “তুমি কি আমার জন্য কাঁদছ?” এই বলে চুমো খেয়ে তাঁর চোখের জল মুছিয়ে দিলেন।
    অমনি বজ্রপাতের মতো ভীষণ শব্দ হল, এত জোরে এত গম্ভীরভাবে বাজ কখনো পড়ে না। চারদিকের সব কিছু কি রকম গোলমাল হয়ে গেল, সুন্দরী পরী অদৃশ্য হয়ে গেলেন, অমন ফুলে ফলে ভরা স্বর্গের কানন কত নীচে তলিয়ে গেল, সে যে কত নীচে ! রাজপুত্র দেখলেন রাতের অন্ধকারে বাগানটি ডুবে যাচ্ছে, কিছুক্ষণ অনেক দূরে ছোটাে একটি তারার মতো মিটমিট করতে লাগল ! তার পর তার সারা দেহের মধ্যে দিয়ে সে কী হাড় জমানো শীতের ঢেউ খেলে গেল। তাঁর চোখ বন্ধ হয়ে গেল, কিছুক্ষণ তিনি মরার মতো পড়ে রইলেন।
    যখন রাজপুত্রের জ্ঞান ফিরে এল, তখন মুখের উপর বৃষ্টির ঠাণ্ডা ছাট লাগছে, কপালে তীক্ষ্ন বাতাস বইছে।
    তিনি বলে উঠলেন, “হায়, এ কি করলাম ! আদমের মতো আমিও পাপ করলাম? স্বর্গের কানন পৃথিবীর চেয়েও নীচে নেমে গেল?” চোখ খুলে দেখেন দূরে একটা তারা মিটমিট করছে, সেই তার হারানো স্বর্গের মতো, আকাশের বুকে ঐ হল শুকতারা। রাজপুত্র উঠে দেখেন বাতাসদের গুহার বাইরে সেই বনের মধ্যে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পাশে বাতাসদের মা বসে। দেখে মনে হল বুড়ি খুব চটেছে। এক চড় তুলে সে বলল, “প্রথম রাত্রেই এমন করলে ! যা ভেবেছিলাম ! তুমি যদি আমার ছেলে হতে তো থলিতে ভরতাম !”
    মৃত্যু বলল,“থলির মধ্যেই যাবে।” লোকটা বয়সে বুড়ো কিন্তু দেখতে জোরালো, হাতে একটা কাস্তে, পিঠে দুটি মস্ত ডানা।
    “শেষপর্যন্ত কফিনেই শোবে, তবে এখনো নয়। ওর উপর আমি নজর রাখব, পৃথিবীতে আরো কিছুদিন ঘুরে বেড়াক; পাপের জন্য অনুতাপ করুক। হয়তো ওর উন্নতি হতে পারে, শেষে হয়তো ভালো হয়ে যাবে। তার পর একদিন যখন ও মোটেই আশা করবে না যে আমি আসব, ঠিক সেই সময় এসে ওকে কফিনে শুইয়ে দেব। ওর মগজ আর হৃদয় তখনো যদি পাপে ভরা থাকে, তা হলে ও স্বগের কাননের চেয়েও নীচে নেমে যাবে। কিন্তু ততদিনে যদি ও ভালো হয়, পুণ্যবান হয়, তা হলে আমি কফিনটাকে মাথায় তুলে ঐ দূরে যে তারা দেখা যাচ্ছে, সেখানে চলে যাব। ওখানেও স্বর্গের বাগিচায় ফুল ফোটে। ঐ তারা, ঐ ঝলমল উজ্জ্বল তারায় ও স্থান পাবে, ওখানেই ও চিরকাল থাকবে।”

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য