দেবদূতের কথা - হ্যান্স অ্যান্ডারসন

    ‘যখনই কোনো লক্ষী ছেলে কি মেয়ে মারা যায়, স্বর্গ থেকে একজন দেবদূত নেমে এসে তাকে কোলে করে, বড়ো-বড়ো সাদা ডানা মেলে, তার সব ভালোবাসার জায়গাগুলো দেখিয়ে আনে। দেবদূত সেই সঙ্গে একমুঠি ফুল তুলে ভগবানের কাছে নিয়ে যায় ; স্বর্গে তারা পৃথিবীর চাইতেও আরো সুন্দর হয়ে ফুটে ওঠে।’
    ছোটো একটি মরা ছেলেকে কোলে নিয়ে স্বর্গে যাবার পথে ভগবানের দেবদূত এ কথা বলেছিল। ছোটাে ছেলেটি যেন স্বপ্নের মধ্যে তার কথা শুনছিল ; দুজনে তখন যে-সব জায়গাগুলিতে ছেলেটি আগে খেলা করত তার উপর দিয়ে উড়ে চলল ; কত সুন্দর ফুলে ভরা বাগান পেরিয়ে গেল তারা।
    দেবদূত বলল, “বল তো কোন ফুল নিয়ে গিয়ে স্বর্গের মাটিতে পুঁতব?”
    সেখানে সুন্দর চিঙ্কণ একটি গোলাপগাছ হয়েছিল, কিন্তু কোনো দুষ্টু, লোক তার গুঁড়ি ভেঙে দিয়েছিল, তাই বড়ো-বড়ো আধ-খোলা কুড়িসুদ্ধ ডালপালাগুলি শুকিয়ে মাটিতে লুইয়ে পড়েছিল। ছেলেটি বলল, “আহা, বেচার গাছ ! ওপারে নিয়ে যাই, স্বর্গে গিয়ে আবার ফুটুক।”
    দেবদূত তখন গোলাপগাছটিকে তুলে নিয়ে, ছেলেটিকে চুমে খেল। ছেলেটিও তার চোখ দুটি অর্ধেক খুলল। বাগান থেকে ওরা অনেক ভালো জাতের ফুল নিল আর সেই সঙ্গে ছোটো নম্র ডেজি ফুল আর একটি বুনো প্যানজি ফুলও নিল। ছেলেটি তখন বলল, “এই তো অনেক হল।” দেবদূতেরও বোধ হয় সেই মত, তবু তখনই সে স্বর্গের দিকে রওনা দিল না।
    তখন রাত নেমেছে ; চারদিকে একেবারে চুপচাপ। ওরা একটা শহরের কাছে থেমে, সবচাইতে সরু রাস্তাগুলোর মধ্যে একটার উপরে আকাশে ভেসে রইল। রাস্তাটার উপরে খড়কুটো, ছাই আর নানারকম আবর্জনা ছড়ানো ছিল। সেদিন কেউ তার পুরনো বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিল ; চারদিকে মাটিতে ছড়ানো ছিল ভাঙা থালা, দেয়ালের পলেস্তারার কুচি, স্যাকড়া, পুরনো টুপির টুকরো, ইত্যাদি, এক কথায় যত রাজ্যের বিশ্ৰী জিনিস ছাড়া আর কিছু নয়।
    আবর্জনার ঢিপির মধ্যে একটা পুরনো ফুলের টবের ভাঙা টুকরোর দিকে দেবদূত দেখাল, টবের ভিতর থেকে একদলা মাটি বাইরে পড়ে গেছিল, একটা শুকনো বড়ো ফুলের গাছের শিকড়ে জড়িয়ে মাটিটুকু দল পাকিয়ে ছিল। ফুলগাছটিতে আর দেখবার কিছু নেই, তাই কেউ ওটাকে পথে ফেলে দিয়েছিল।
    দেবদূত বলল, “ওটাকে সঙ্গে নিয়ে যাই ; উড়তে উড়তে ওর কথা তোমাকে বলছি।”
    তার পর তারা উড়ে স্বর্গের দিকে চলল। যেতে যেতে দেবদূত বলল, “এক সময় ঐ ছোটো সরু গলিটার মধ্যে, মাটির তলায় একটা খুপরি ঘরে একজন রুগ্ন গরিব ছেলে থাকত। খুব ছোটোবেলা থেকেই সে বিছানা থেকে উঠতে পারত না। মাঝে মাঝে যদি-বা লাঠিতে ভর দিয়ে ছোটো ঘরটার মধ্যেই একটু পাইচারি করত, তার বেশি কিছু করতে পারত না। গ্রীষ্মকালে কখনো কখনো মাটির তলায় ঘরটার ছোটাে জানলা দিয়ে সূর্যের কিরণ ভিতরে ঢুকত! সেই সময় যদি উঠে বসে টের পেত তার গায়ে নরম-গরম রোদ পড়েছে, যদি আলোর দিকে তার শুকনো পাতলা কাচের মতো হাত দুখানি তুলে ধরে শিরার ভিতর লাল রক্ত দেখতে পেত, তা হলে সে বলে উঠত, ‘আজ আমি বাইরে বেরিয়েছিলাম! সুন্দর বনভূমির আর তার গ্রীষ্মকালে ঝলমলে সবুজ রঙের সঙ্গে তার কতটুকুই বা পরিচয় ; বীচগাছে নতুন পাতা বেরুলে পাশের বাড়ির ছেলে হয়তো কয়েকটা ডাল এনে দিল, সেইগুলোকে নিজের মাথার উপর তুলে ধরে ছেলেটা ভাবত এই বুঝি সে বীচগাছের ছায়ায় বসে আছে, ঐ বুঝি পাখিরা গান গাইছে, সূর্য চারদিকে রোদ ছড়াচ্ছে।
    “বসন্তকালে একদিন পাশের বাড়ির ছেলেটি তাকে কয়েকটা মেঠো ফুল এনে দিল। তার মধ্যে একটার শিকড় ছিল, কাজেই সেটাকে একটা টবে বসিয়ে বিছানার কাছে, জানলার উপর রাখা হল। যত্ন করে লাগানো হয়েছিল বলে গাছটা বাড়তে লাগল, তার নতুন নতুন ডালপালা বেরুত, বছরে বছরে ফুল ধরত। ঐ একটা ফুলগাছই ছোটো ছেলেটার কাছে একটা বাগানের মতো মনে হত, পৃথিবীতে ঐ তার সামান্য সম্পদ। গাছটাতে সে জল দিত, যত্ন নিত, ঘরের নিচু ছোটো জানলা দিয়ে সূর্যের যতগুলি কিরণ ভিতরে আসত, তার প্রথমটি থেকে শেষটি পর্যন্ত সবগুলি যাতে গাছের গায়ে লাগে, ছোটো ছেলেটার সর্বদা সেদিকে দৃষ্টি ছিল। ফুলগুলোর কী মোলায়েম রঙ, কী সুগন্ধ ! ছেলেটার স্বপ্নের সঙ্গে সেই রঙ আর গন্ধ মিশে যেত, মরবার সময় ঐ ফুলের দিকেই সে ফিরেছিল। একবছর হল ঐ ছেলে স্বর্গে গেছে, এই একবছর ধরে গাছটা ঐ জানলার ধারেই ছিল, তার ফুল পাতা শুকিয়ে গেছিল, সবাই তার কথা ভুলে গেছিল। আজ সেটাকে অন্য আবর্জনার সঙ্গে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। সেই ফুলগাছটাকেই আমরা এক্ষুণি তুলে নিলাম, কারণ কোনো রানীর বাগানের জমকাল ফুলের চাইতে এই সামান্য শুকনো মেঠো ফুল বেশি আনন্দ দিয়েছে।”
    যে ছোটাে ছেলেকে দেবদূত স্বর্গে নিয়ে যাচ্ছিল, সে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি এত কথা কি করে জানলে?”
    দেবদূত বলল, “বলব কি করে জানলাম? আমিই যে ঐ রুগ্ন ছোটো ছেলে ছিলাম, লাঠি দিয়ে হাটতম। আমার নিজের ফুল আমি চিনব না?”
    তখন ছোটো ছেলেটি বড়ো-বড়ো করে চোখ খুলে, দেবদূতের উজ্জ্বল সুন্দর মুখের দিকে চাইল—আর সেই মুহুর্তেই ওরা স্বর্গে পৌছে গেল।
    তার পর মরা ছেলেটিও দেবদূতের মতো ডানা পেল, তার হাত ধরে তার সঙ্গে উড়ে চলল। ঐ সামান্য শুকনো মেঠো ফুলকে কণ্ঠ দেওয়া হল, দেবদূতদের সঙ্গে সেও গান গাইতে লাগল, তারা মহান ভগবানের চারদিকে ঘিরে ছিল, কেউ কেউ তাঁর খুব কাছে, বাকিরা গোল হয়ে কিছু দূরে, তার বাইরে গোল হয়ে আরো দেবদূত, দূৰ্ব থেকে দূরান্তরে তারা রইল, অসীম আনন্দ পর্যন্ত, কিন্তু সকলের উপর সমানভাবে আশীৰ্বাদ ঝরে
পড়ল
    তখন তারা সকলে একসঙ্গে গাইতে লাগল, দেবদূতরা, সেই ছোটো ছেলেটি আর সেই সামান্য শুকনো মেঠো ফুল, যে অন্ধকার সরু গলিতে আবর্জনার মধ্যে পড়েছিল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য