একটি ফুটবল ম্যাচ - নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

    গোলটা আমিই দিয়েছি। এখনও চিৎকার শোনা যাচ্ছে ওদের—থ্রি চিয়ার্স ফর প্যালারাম—হিপ হিপ্‌ হুররে। এখন আমাকে ঘাড়ে করে নাচা উচিত ছিল সকলের। পেট ভরে খাইয়ে দেওয়া উচিত ছিল ভীমনাগের দোকানে কিংবা দেলখোস রেস্তোরায়। কিন্তু তার বদলে একদল পিনপিনে বিতিকিচ্ছি মশার কামড় খাচ্ছি আমি। চটাস করে মশা মারতে গিয়ে নিজের নাকেই লেগে গেল একটা রাম-থাপ্পড়। একটু উ-অাঁ করে কাঁদব তারও উপায় নেই। প্যাচপেচে কাদার ভেতরে কচুবনের আড়ালে মূর্তিমান কানাই সেজে বসে আছি, আর আমার চারিদিকে মশার বাঁশি বাজছে।
    —থ্রি চিয়ার্স ফর প্যালারাম। আবার চিৎকার শোনা গেল। একটা মশা পটাস করে হুল ফোটাল ডান গালে। ধাঁ করে চাঁটি হাকালুম—নিজের চড়ে নিজেরই মাথা ঘুরে গেল। অঙ্কের মাস্টার গোপীবাবুও কখনও এমন চড় হাঁকড়েছেন বলে মনে পড়ল না।
    গেছি-গেছি বলে চেঁচিয়ে উঠতে গিয়ে বাপ-বাপ করে সামলে নিলুম। দমদমার এই কচুবনে আপাতত আরও ঘণ্টাখানেক আমার মৌনের সাধনা৷ সন্ধ্যার অন্ধকার নামবার আগে এখান থেকে বেরুবার উপায় নেই।
    চিৎকার ক্রমশ দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে :থ্রি চিয়ার্স ফর প্যালারাম—হিপ হিপ্‌ হুররে। আমি পটলডাঙার প্যালারাম—পালাজ্বরে ভুগি আর বাসক পাতার রস খাই। কিন্তু পটলডাঙা ছেড়ে শেষে এই দমদমার কচুবনে আমার পটল তোলবার জো হবে—এ-কথা কে জানত।
    আমাদের পটলডাঙা থান্ডার ফুটবল ক্লাবের আমি একজন উৎসাহী সদস্য। নিজে কখনও খেলি না, তবে সব সময়েই খেলোয়াড়দের প্রেরণা দিয়ে থাকি। আমাদের ক্লাব কোনও খেলায় গোল দিলে সাত দিন আমার গলা ভাঙা সারে না। হঠাৎ যদি কোনও খেলায় জিতে যায়—যা প্রায় কোনও দিনই হয় না—তা হলে আনন্দের চোটে আমার কম্প দিয়ে পালাজ্বর আসে।
    সদস্য হয়েই ছিলুম ভালো । গোলমাল বাধল খেলোয়াড় হতে গিয়ে।
    দমদমার ভ্যাগাবন্ড ক্লাবের সঙ্গে ফুটবল ম্যাচ। তিনদিন আগে থেকে ছোটদের ভাঙা হারমোনিয়ামটা নিয়ে আমি ধ্রুপদ গাইতে চেষ্টা করছি। গান গাইবার জন্যে নয়—খেলার মাঠে যাতে সারাক্ষণ একটানা চেঁচিয়ে যেতে পারি—সেই উদ্দেশ্যে। তেতলার ঘর থেকে মেজদা যখন বড় একটা ডাক্তারির বই নিয়ে তেড়ে এল, তারপরেই বন্ধ করতে হল গানটা।
    কিন্তু দমদমে পৌঁছেই একটা ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ শোনা গেল ।
    আমাদের দুই জাঁদরেল খেলোয়াড় ভন্টু আর ঘন্টু দুই ভাই। দুজনেই মুগুর ভাঁজে আর দমাদম ব্যাকে খেলে ৷ বলের সঙ্গে সঙ্গে উড়িয়ে দেয় অন্য দলের সেন্টার ফরোয়ার্ডকে। আজ পর্যন্ত দুজনে যে কত লোকের ঠাং ভেঙেছে তার হিসেব নেই।
    কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওরা পটলডাঙা থান্ডার ক্লাবেরই ঠ্যাং ভাঙল। একেবারে দুটাে ঠ্যাং ভাঙল। একেবারে দুটাে ঠ্যাংই একসঙ্গে।
    কাশীতে ওদের কুট্টিমামা থাকে। তা থাক—কাশি-সর্দি-পালাজ্বর—যেখানে খুশি থাক। কিন্তু কুট্টিমামা কি আর বিয়ে করার দিন পেল না? ঠিক আজ দুপুরেই টেলিগ্রামটা এসে হাজির। আর বিশ্বাসঘাতক ভন্টু আর ঘন্টু সঙ্গে সঙ্গে লাফাতে লাফাতে হাওড়া স্টেশনে। থান্ডার ক্লাবকে যেন দুটাে আন্ডার-কাট ঘুষি মেরে চিৎ করে ফেলে দিয়ে গেল!
    দলের ক্যাপ্টেন পটলডাঙার টেনিদা বাঘের মতো গর্জন করে উঠল। —মামার বিয়ের ঘ্যাট গেলবার লোভ সামলাতে পারলে না। ছোঃ । নরাধম—লোভী—কাপুরুষ । ছোঃ !
    গাল দিয়ে গায়ের ঝাল মিটতে পারে, কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় না। পটলডাঙা থান্ডার ক্লাবের সদস্যরা তখন বাসী মুড়ির মতো মিইয়ে গেছে সবাই। ভন্টু ঘন্টু নেই—এখন কে বাঁচাবে ভ্যাগাবন্ড ক্লাবের হাত থেকে? ওদের দুঁদে ফরোয়ার্ড ন্যাড়া মিত্তির দারুণ ট্যারা। আমাদের গোলকিপার গোবরা আবার ট্যারা দেখলে বেজায় ভেবড়ে যায়—কোন দিক থেকে যে বল আসবে ঠাহর করতে পারে না। ওই ট্যারা ন্যাড়াই হয়তো একগণ্ডা গোল ঢুকিয়ে দিয়ে বসে থাকবে।
    এখন উপায়?
    টেনিদার ছোকরা চাকর ভজুয়া গিয়েছিল সঙ্গে। বেশ গাঁট্টাগোঁট্টা চেহারা—মরামারি বাধলে কাজে লাগবে মনে করেই তাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। টেনিদা কটমট করে খানিকটা তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললে, এই ভজুয়া—ব্যাকে খেলতে পারবি?
    ভজুয়া খৈনি টিপছিল। টপ করে খানিকটা খৈনি মুখে পুরে নিয়ে বললে, সেটা ফির কী আছেন ছোটবাবু?
    —পায়ের কাছে বল আসবে—ধাঁই করে মেরে দিবি। পারবি না?
    —হাঁ। খুব পারবে। বল ভি মারিয়ে দিবে—আদমি ভি মারিয়ে দিবে। —ভজুয়ার চোখে-মুখে জ্বলন্ত উৎসাহ।
    —না না, আদমিকে মারিয়ে দিতে হবে না। শুধু বল মারলেই হবে। পারবি তো ঠিক?
    —কেনো পারবে না? কাল রাস্তামে একঠো কুত্তা ঘেউ-ঘেউ করতে করতে আইল তো মারিয়ে দিলাম একঠো জোরসে লাথি। এক লরি যাইতেছিল—লাথ খাইয়ে একদম উসকো উপর চড়িয়ে গেল। বাস্—সিধা হাওড়া টিশন।
    —থাম থাম—মেলা বকিসনি—টেনিদা একটা নিশ্চিন্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল; একটা ব্যাক তো পাওয়া গেল! আর একটা—আর একটা—এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে হঠাৎ চোখ পড়ল আমার ওপরে—ঠিক হয়েছে। প্যালাই খেলবে।
    —আমি ! একটা চীনেবাদাম চিবুতে যাচ্ছিলুম, সেটা গিয়ে গলায় আটকাল।
    —কেন—তুই তো বলেছিলি, শিমুলতলায় বেড়াতে গিয়ে কাদের নাকি তিনটে গোল দিয়েছিলি একাই? সে-সব বুঝি স্রেফ গুলপট্টি?
    গুলপট্টি তো নিঘাত। চাটুজ্যেদের রকে বসে তেলে-ভাজা খেতে খেতে সবাই দুটাে-চারটে গুল দেয়, আমিও ঝেড়েছিলুম একটা। কিন্তু টেনিদা দুবার ম্যাট্রিকে গাড্ডা খেয়েছে, তার মেমোরি এত ভাল কে জানত?
    বাদামটা গিলে ফেলে আমি বললুম, না, না, গুলপট্টি হবে কেন? পালাজ্বরে কাহিল করে দিয়েছে—নইলে এতদিনে আমি মোহনবাগানে খেলতুম, তা জানো? এখন দৌড়োতে গেলে পিলেটা একটু নড়ে—এই যা অসুবিধে।
    –পিলেই তো নড়াবি। পিলে নড়লে তোর পালাজ্বরও সরে পড়বে—এই বলে দিলুম। নে—নেমে পড়—
    রেফারির বাঁশির আওয়াজ। আমি কী বলতে যাচ্ছিলুম, তার আগেই এক ধাক্কায় টেনিদা আমাকে ছিটকে দিলে মাঠের ভেতরে। পড়তে-পড়তে সামলে নিলুম। ভেবে দেখলুম, গোলমাল বেশি বাড়ানোর চাইতে দু-একটা গোল দেওয়ার চেষ্টা করাই ভাল। যা থাকে কপালে ! আজ প্যালারামেরই একদিন কি পালাজ্বরেরই একদিন। খেলা শুরু হল। ব্যাকে দাঁড়িয়ে আছি। ভেবেছিলুম ভজুয়া একাই ম্যানেজ করবে—কিন্তু দেখা গেল, মুখ ছাড়া আর কোনও পুঁজিই ওর নেই। একটা বল পায়ের কাছে আসতেই রাম শট হাঁকড়ে দিলে। কিন্তু বলে পা লাগল না—উলটে ধড়াস করে শুকনো মাঠে একটা আছাড় খেল ভজুয়া। ভাগ্যিস গোলকিপার গোবরা তঙ্কে-তক্কে ছিল—নইলে ঢুকেছিল আর-কি একখানা ! হাই কিক দিয়ে গোবরা বলটাকে মাঝখানে পাঠিয়ে দিলে। রাইট আউট হাবুল সেন বলটা নিয়ে পাই-পই করে ছুটল—ফাঁড়া কাটল এ-যাত্রা।
    কিন্তু ফুটবল মাঠে সুখ আর কতক্ষণ কপালে থাকে ! পরক্ষণেই দেখি বল দ্বিগুণ বেগে ফিরে আসছে আমাদের দিকে—আর নিয়ে আসছে ট্যারা ন্যাড়া মিত্তির ।
    ভজুয়া বোঁ-বোঁ করে ছুটল—কিন্তু ন্যাড়া মিত্তিরকে ছুতেও পারল না। খুট করে ন্যাড়া কাটিয়ে নিলে, ভজুয়া একেবারে লাইন টপকে গিয়ে পড়ল লাইনসম্যান ক্যাবলার ঘাড়ে।
    কিন্তু ভজুয়ার যা খুশি হোক—আমার তো শিরে সংক্রান্তি। এখন আমি ছাড়া ন্যাড়া মিত্তির আর গোলকিপার গোবরার ভেতরে আর কেউ নেই। আর গোবরাকে তো জানি। ন্যাড়ার ট্যারা চোখের দিকে তাকিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকবে—কোন দিক দিয়ে বল যে গোলে ঢুকছে টেরও পাবে না।
    —চার্জ। চার্জ —সেন্টারহাফ টেনিদার চিৎকার: পালা, চার্জ—
    জয় মা কালী! এমনিও গেছি—অমনিও গেছি! দিলুম পা ছুড়ে ! কিমাশ্চর্যম। ন্যাড়া মিত্তির বোকার মতো দাঁড়িয়ে—বলটা সোজা ছুটে চলে গেছে হাবুল সেনের কাছে।
    —ব্রেভো, ব্রেভো প্যালা –চারদিক থেকে চিৎকার উঠল ; ওয়েল সেভড।
    তাহলে সত্যিই আমি ক্লিয়ার করে দিয়েছি। আমি পটলডাঙার প্যালারাম, ছেলেবেলায় টেনিস বল ছাড়া যে কখনও পা দিয়ে ফুটবল ছোঁয়নি—সেই আমি ঠেকিয়েছি দুর্ধর্ষ নাড়া মিত্তিরকে। আমার চব্বিশ ইঞ্চি বুক গর্বে ফুলে উঠল। মনে হল, ফুটবল খেলাটা কিছুই নয়। ইচ্ছে করে এতদিন খেলিনি বলেই মোহনবাগানে চান্স পাইনি ।
    কিন্তু আবার যে ন্যাড়া মিত্তির আসছে ! ওর পায়ে কি চুম্বক আছে। সব বল কি ওর পায়ে গিয়ে লাগবে?
    দুবার অপদস্থ হয়ে ভজুয়া খেপে গিয়েছিল। মরিয়া হয়ে চার্জ করল। কিন্তু রুখতে পারল না । তবু এবারেও গোল বাঁচল। তবে গোবরা নয়—একরাশ গোবর। ঠিক সময়মতো তাতে পা পিছলে পড়ে গেল নাড়া মিত্তির, আর আমি ধাঁই করে শট মেরে ক্লিয়ার করে দিলুম। ওদের লেফট আউটের পায়ে লেগে থ্রো হয়ে গেল সেটা।
    কিন্তু আত্মবিশ্বাস ক্রমেই বাড়ছে। পটলডাঙার থান্ডার ক্লাবের চিৎকার সমানে শুনছি! ব্রেভো প্যালা—শাবাশ ! আরে, আবার যে বল আসে। আমাদের ফরোয়ার্ডগুলো কি ঘোড়ার ঘাস কাটছে নাকি? গেল-গেল করতে করতে ওদের বেঁটে রাইট ইনটা শট করলে—আমার পায়ের তলা দিয়ে বল উড়ে গেল গোলের দিকে।
গো—ও—ও—
    ভ্যাগাবল্ড ক্লাবের চিৎকার। কিন্তু ‘ওল’ আর নয়, স্রেফ কচু । অর্থাৎ বল তখন পোস্ট ঘেঁষে কচুবনে অন্তধান করেছে।
    গোল কিক।
    কিন্তু এর মধ্যেই একটা কাণ্ড করেছে ভজুয়া। বলকে তাড়া করতে গিয়ে শট করে দিয়ে গোল-পোস্টের গায়ে । আর তার পরেই আই-অাই করতে করতে বসে পড়েছে পা চেপে ধরে।
    ভজুয়া ইনজিওর্ড ! ধরাধরি করে দু-তিনজন তাকে বাইরে নিয়ে গেল।
    আপদ গেল ! যা খেলছিল—পারলে আমিই ওকে ল্যাং মেরে দিতুম। গোলপোস্টটাই আমার হয়ে কাজ সেরে দিয়েছে। কিন্তু এখন যে আমি একেবারে একা। ‘একা কুম্ভ রক্ষা করে নকল বুঁদিগড়—’! এলোপাথাড়ি কাটল কিছুক্ষণ। ভগবান ভরসা—আমাকে আর বল ছুতে হল না। গোটা দুই শট গোবরা এগিয়ে এসে লুফে নিলে, গোটা তিনেক সামলে নিলে হাফ-ব্যাকেরা । তারপর হাফ-টাইমের বাঁশি বাজল ।
    আঃ—কোনওমতে ফাঁড়া কাটল এ-পর্যন্ত । বাকি সময়টুকু সামলে নিতে পারলে হয় !
    পেটের পিলেট একটু টনটন করছে—বুকের ভেতরও খানিকটা ধড়ফড়ানি টের পাচ্ছি। কিন্তু চারদিক থেকে তখন থাণ্ডার ক্লাবের অভ্যর্থনা: বেড়ে খেলছিস প্যালা, শাবাশ ! এমনকি ক্যাপ্টেন টেনিদা পর্যন্ত আমার পিঠ থাবড়ে দিলে ; তুই দেখছি রেগুলার ফাস্ট ক্লাস প্লেয়ার। নাঃ—এবার থেকে তোকে চান্স দিতেই হবে দু-একবার !
    এতে আর কার পিলে-টিলের কথা মনে থাকে। বিজয়গর্বে দু-গ্লাস লেবুর শরবত খেয়ে নিলুম। শুধু ভজুয়া কিছু খেল না—পায়ে একটা ফেটি বেঁধে বসে রইল গোঁজ হয়ে। টেনিদা দাঁত খিচিয়ে বললে, শুধু এক-নম্বরের বাক্যি-নরেশ! এক লাথসে কুত্তাকো লরিমে চড়া দিয়া! তবু একটা বল ছুঁতে পারলে না—ছোঃ—ছোঃ?
    ভজুয়া দু-চোখে জিঘাংসা নিয়ে তাকিয়ে রইল। আবার খেলা শুরু হল। খোঁড়াতে খোঁড়াতে ভজুয়া আবার নামল মাঠে। আমার কানের কাছে মুখ এনে বললে, দেখিয়ে প্যালাবাবু—ইস্ দফে হাম মার ডালেঙ্গে।
    ভজুয়ার চোখ দেখে আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া। সর্বনাশ—আমাকে নয় তো?
    —সে কী রে। কাকে?
    —দেখিয়ে না—
    কিন্তু আবার সে আসছে ! ‘ওই আসে—ওই অতি ভৈরব হরষে’ ! আর কে? সেই ন্যাড়া মিত্তির। ট্যারা চোখে সেই ভয়ঙ্কর দৃষ্টি ! এবার গোল না দিয়ে ছাড়বে বলে মনে হয় না !
    ক্ষ্যাপা মোষের মতো ছুটল ভজুয়া । তারপরই বাপ বলে এক আকাশ-ফটা চিৎকার! বল ছেড়ে ন্যাড়া মিত্তিরের পাঁজরায় লাথি মেরেছে ভজুয়া, আর ন্যাড়া মিত্তির ঝেড়েছে ভজুয়ার মুখে এক বোম্বাই ঘুষি। তারপর দুজনেই ফ্ল্যাট এবং দুজনেই অজ্ঞান । ভজুয়া প্রতিশোধ নিয়েছে বটে, কিন্তু এটা জানত না যে ন্যাড়া মিত্তির নিয়মিত বক্সিং লড়ে।
    মিনিট-তিনেক খেলা বন্ধ। পটলডাঙার থান্ডার ক্লাব আর দমদম ভ্যাগাবণ্ড ক্লাবের মধ্যে একটা মারামারি প্রায় বেঁধে উঠেছিল—দু-চারজন ভদ্রলোক মাঝখানে নেমে থামিয়ে দিলেন। ফের খেলা আরম্ভ হল। কিন্তু ভজুয়া আর ফিরল না—নাড়া মিত্তিরও না।
    বেশ বোঝা যাচ্ছে, ন্যাড়া বেরিয়ে যাওয়াতে দলের কোমর ভেঙে গেছে ওদের । তবু হাল ছাড়ে না ভ্যাগাবণ্ড ক্লাব । বারবার তেড়ে আসছে। আর, কী হতচ্ছাড়া ওই বেঁটে রাইট-ইনটা ! -
    —অফ সাইড। রেফারির হুইসল। আর-একটা ফাঁড়া কাটল। পটলডাঙা ক্লাবের হাফ-ব্যাকেরা এতক্ষণে যেন একটু দাঁড়াতে পেরেছে। আমার পা পর্যন্ত আর বল আসছে না। খেলার প্রায় মিনিট-তিনেক বাকি। এইটুকু কোনওমতে কাটাতে পারলেই মানে মানে বেঁচে যাই—পটলডাঙার প্যালারাম বীরদৰ্পে ফিরতে পারে পটলডাঙায় ।
    এই রে ! আবার সেই বেঁটেটা ! কখন চলে এসেছে কে জান ! এ যে ন্যাড়া মিত্তিরের ওপরেও এক-কাঠি! নেংটি ইঁদুরের মতো বল মুখে করে দৌড়তে থাকে। আমি কাছে এগোবার আগেই বেঁটে কিক করেছে। কিন্তু থাণ্ডার ক্লাব বাঁয়ে শেয়াল নিয়ে নেমেছিল নিঘাত! ডাইভ করে বলটা ধরতে পারলে না গোবরা—তবু এবারেও বল পোস্ট ঘেঁষে বাইরে চলে গেল।
    কিন্তু ন্যাড়া মিত্তিরকে যে-গোবরটা কাত করেছিল—সেটা এবার আমায় চিত করল। একখানা পেল্লায় আছাড় খেয়ে যখন উঠে পড়লুম তখন পেটের পিলেটায় সাইক্লোন হচ্ছে। মাথার ভেতরে যেন একটা নাগরদোলা ঘুরছে বোঁ-বোঁ করে । মনে হচ্ছে, কম্প দিয়ে পালাজ্বর এল বুঝি।
    আর এক মিনিট । আর এক মিনিট খেলা বাকি। রেফারি ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে বারবার। ড্র যাবে নির্ঘাত। যা খুশি হোক—আমি এখন মাঠ থেকে বেরুতে পারলে বাঁচি। আমার এখন নাভিশ্বাস। গোবরে আছড়া খেলে মাথা এমন বোঁ-বোঁ করে ঘোরে কে জানত।
    গোল-কিক। আবছাভাবে গোবরার গলার স্বর শুনতে পেলুম ; কিক কর, প্যালা— শেষের বাঁশি প্রায় বাজল। চোখে ধোঁয়া দেখছি আমি। এইবার প্রাণ খুলে একটা কিক করব আমি ! মোক্ষম কিক। জয় মা কালী—
    প্রাণপণে কিক করলুম। গো—ও-ওল—গো—ও-ও-ল। চিৎকারে আকাশ ফাটার উপক্রম ! প্রথমটা কিছুই বুঝতে পারলুম না। এত জোরে কি শট মেরেছি যে আমাদের গোল-লাইন থেকেই ওদের গোলকিপারকে ঘায়েল করে দিয়েছি?
    কিন্তু সত্য-দর্শন হল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই। গোবরা হাঁ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। আমাদের গোলের নেটের ভেতরেই বলটা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে। যেন আমার কীর্তি দেখে বলটাও হতভম্ব হয়ে গেছে ।
তারপর? তারপর খেলার মাঠ থেকে এক মাইল দূরের এই কচুবনে কানাই হয়ে বসে আছি। দূর থেকে এখনও ভ্যাগাবণ্ড ক্লাবের চিৎকার আসছে ; থ্রি চিয়ার্স ফর প্যালারাম—হিপ্‌ হিপ হুররে।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য