সোনা-দাঁতের রহস্য [ দ্য স্টকব্রোকার্স ক্লার্ক ] - শার্লক হোমস


    বিয়ের পরেই আমি প্যাডিংটন জেলায় এক বুড়ো ডাক্তারের পড়ন্ত প্র্যাকটিস কিনেছিলাম। বউকে নিয়ে থাকতামও সেখানে। বেকার স্ট্রিটে যাওয়া শিকেয় উঠেছিল পসার জমাতে গিয়ে। দীর্ঘদিন দেখাসাক্ষাৎ হয়নি শার্লক হোমসের সঙ্গে ।
    জুন মাস। সকাল বেলা। প্রাতঃরাশ সবে শেষ হয়েছে। ব্রিটিশ জার্নাল পড়ছি। এমন সময়ে ঘরে ঢুকল হোমস।
    আমি তো অবাক ওর হঠাৎ আগমন দেখে। ও বলল, ‘ওহে ওয়াটসন, ডাক্তারি করতে গিয়ে গোয়েন্দাগিরি তথ্যবিশ্লেষণী সমস্যায় আগ্রহ এখনও আছে তো?’
    ‘বিলক্ষণ। কাল রাতেই পুরোনো কেসগুলো নাড়াচাড়া করছিলাম।

    ‘আরও কেস চাও?’
    ‘নিশ্চয়।’
    ‘বার্মিংহামে যেতে হবে কিন্তু। রুগি কে দেখবে?’

    ‘প্রতিবেশী ডাক্তার। তিনি ছুটি নিলে তার রুগি আমি সামলাই, আমার রুগিও তিনি সামলাবেন।’
    হেলান দিয়ে চেয়ারে বসে অর্ধনির্মীলিত চোখে আমাকে দেখতে দেখতে হোমস বললে, ‘সর্দি লেগেছিল দেখছি।’
    ‘তা লেগেছিল। কিন্তু এখন তো সেরে গেছে। তুমি জানলে কী করে?

    ‘তোমার চটি দেখে।’

    পায়ের নতুন চটিজোড়ার দিকে অবাক হয়ে তাকালাম। কিন্তু বুঝলাম না চটির সঙ্গে সর্দির কী সম্পর্ক।
    হোমস বললে, ‘চটিজোড়া নতুন, কিন্তু শুকতলা আগুনে ঝলসানো। প্রথমে ভেবেছিলাম বৃষ্টিতে ভিজিয়েছ বলে আগুনের সামনে রেখে শুকিয়েছ। তারপর দেখলাম, ভেতরে সাটা দোকানের লেবেলটা এখনও রয়েছে— তার মানে জলে ভেজেনি। ভিজলে লেবেলও উঠে যেত। জুন মাসে বৃষ্টিবাদলা তো থাকেই। তা সত্ত্বেও শুকনো চটি পরে আগুনের সামনে শুকতলা এগিয়ে দিয়ে যখন বসে ছিলে, তখন বুঝে নিতে হবে সর্দি লেগেছিল তোমার। যাই হোক, চল বেরিয়ে পড়ি। মক্কেলকে গাড়িতে বসিয়ে এসেছি।’
    প্রতিবেশী ডাক্তারকে চিঠি লিখেছিলাম। বউকে সব কথা জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল হোমস।
    বলল,‘তোমার প্রতিবেশী ডাক্তারের বাড়িতে যত রুগি এসেছে, তার চাইতে বেশি রুগি এসেছে কিন্তু তোমার এই বাড়িতে।”
    ‘তা তো আসবেই। আমি যার প্র্যাকটিস কিনেছি, তার পসার অনেক বেশি ছিল যে। বুড়ো হয়ে নিজেই রুগি হয়ে গেলেন বলে প্র্যাকটিস বেচে দিলেন। কিন্তু তুমি তা জানলে কী করে?


    ‘সিঁড়ি দেখে। তোমার সিঁড়ি পাশের বাড়ির সিঁড়ির চেয়ে তিন ইঞ্চি বেশি ক্ষয়েছে। গাড়িতে যিনি বসে আছেন, ওঁর নাম মি. হল পাইক্রফট। এসো, আলাপ করিয়ে দিই। কোচোয়ান, জোরসে চালাও— ট্রেন ধরতে হবে।’
    গাড়ির মধ্যে আসীন যুবাপুরুষটি বেশ চটপটে, সুদর্শন। চেহারা দেখে চালাকচতুর বলেই মনে হয়। কিন্তু ঠোটের কোণে বিপদের অশনিসংকেত ঝুলছে। ট্রেনে ওঠার পর জানলাম বিপদটা কী।
    হোমস বললে, ‘মি. পাইক্রফট, সত্তর মিনিট ট্রেনে বসে থাকতে হবে। এই ফাঁকে বরং আপনার মজার ব্যাপারটা ডা. ওয়াটসনকে আর একবার বলুন, কিছু বাদ দেবেন না।’
    হল পাইক্রফট বলতে শুরু করলেন।
    ‘ব্যাপারটা মজারই বটে। যেন আমাকে নিয়ে কেউ দারুণ রগড় আরম্ভ করেছে।
    ‘কক্সন অ্যান্ড উডহাউস’ কোম্পানিতে পাঁচ বছর চাকরি করেছি আমি। হঠাৎ তারা দেউলে হয়ে যাওয়ায় আমার চাকরিটি গেল। মালিক একটা ভালো সুপারিশপত্র দিলেন। তাই নিয়ে সমানে চাকরির দরখাস্ত করে চললাম। জমানো টাকা শেষকালে একদিন ফুরিয়ে এল। এই সময়ে লোম্বার্ড স্ট্রিটের মসন অ্যান্ড উইলিয়ামস-এ একটা কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখে দরখাস্ত ছেড়ে দিলাম। কোম্পানিটি লন্ডন শহরের সবচেয়ে বড়ো শেয়ার-দালালের কোম্পানি। কী কপাল দেখুন, পত্রপাঠ জবাব চলে এল। সামনের সোমবার যেন হাজির হই। চেহারাটা খুবসুরত হলে চাকরি আমি পাবই। কাজকর্ম আগের কোম্পানিতে যা করেছিলাম— সেইরকমই। কিন্তু মাইনে বেশি। পাচ্ছিলাম সপ্তাহে তিন পাউন্ড— এখানে চার পাউন্ড।
    ‘যেদিন চিঠিটা পেলাম, সেইদিনই সন্ধে নাগাদ বাড়ি এল একজন কালো দাঁড়িওয়ালা লোক। চোখও কালো। মাঝবয়েসি। নাম, আর্থার পিনার। পেশায় ফিনান্সিয়াল এজেন্ট। ভিজিটিং কার্ড দেখে জানলাম।’
    ‘ভদ্রলোক বেশ চটপটে। বাজে কথায় সময় নষ্ট করার মানুষ নন। এসেই বললেন, “আপনিই তো মি. হল পাইক্রফট?’
    ‘চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললাম, ’হ্যাঁ।’
    “কক্সন অ্যান্ড উডহাউসে আগে কাজ করতেন?”
    ‘হ্যাঁ।’
    ‘আপনার নাম শুনেছি। কক্সনের ম্যানেজার পার্কার আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।’
    ‘তই নাকি?’
    ‘আপনার স্মৃতিশক্তি কীরকম?’
    ‘খারাপ নয়।


    ‘রোজ সকালে স্টক এক্সচেঞ্জ পড়ি।’
    ‘চমৎকার! চমৎকার! একেই বলে কাজের লোক। বলুন তো, আয়ারশায়ারের কী দর যাচ্ছে?’
    ‘এক-শো পাঁচ থেকে সওয়া পাঁচ।’
    ‘নিউজিল্যান্ড কনসোলিডেটেড?’
    ‘এক-শো চার।’

    “ব্রিটিশ ব্রোকেন হিলস?”

    “সাত থেকে সাড়ে সাত।”

    “শা-বাশ! শা-বাশ! দারুণ বলেছেন; সত্যিই মাথা ঘুরিয়ে দিলেন আমার। আপনার মতো ব্রেনের লোক মসনের খিদমত খাটবেন, এ কি হয়? আপনার স্থান আরও উঁচু জায়গায়। কবে যাচ্ছেন ওখানে?”
    “সোমবার।”


    “কক্ষনো যাবেন না। সোমবার থেকে আপনার চাকরি হয়ে গেল ফ্রাঙ্কো মিডল্যান্ড হার্ডওয়ার কোম্পানিতে; বিজনেস ম্যানেজার। শুধু ফ্রান্সেই এক-শো চৌত্ৰিশটা ব্রাঞ্চ আছে কোম্পানির, ব্রাসেলস আর সানরেমো-র ব্রাঞ্চ তো ধরলামই না।”
    “সে কী ! এ-রকম কোনো কোম্পানির তো নাম শুনিনি।”

    “শুনবেন কী করে ? বাজারে তো শেয়ার ছাড়া হয়নি। ভালো জাতের কোম্পানি বলেই নিজেদের মধ্যে থেকে মূলধন জোগাড় করা হয়েছে। কোম্পানির পত্তন ঘটিয়েছে আমার ভাই হ্যারি পিনার, এইবার ম্যানেজিং ডিরেক্টর হবে। তার আগে চাই একজন চালাকচতুর কাজের লোক। র্পাকারের কাছে আপনার নাম শুনেই দৌড়ে এসেছি। প্রথমটা অবশ্য বেশি দিতে পারব না, বছরে পাঁচ-শো পাউন্ড...”
    “পাঁ-চ-শো পাউন্ড!”
    “এ ছাড়াও শতকরা এক পাউন্ড কমিশন। মাইনে যা পাবেন, কমিশন পাবেন তার বেশি।”
    “কিন্তু লোহালক্কড় সম্বন্ধে আমি তো কিসু জানি না।”
    “বাজারদরটা তো জানেন।”
    “কিন্তু আপনাদের কোম্পানি এক্কেবারে নতুন...”
    “বেশ তো, এই নিন এক-শো পাউন্ড আগাম।”
    “কাজ শুরু করব কখন?” আহ্লাদে গদগদ হয়ে বললাম আমি।

    “কাল দুপুর একটায় বার্মিংহামে ১২৬বি কর্পোরেশন স্ট্রিটে গিয়ে দেখা করুন আমার ভাইয়ের সঙ্গে। চাকরি পাকা করবে সে-ই। দয়া করে এই কাগজটায় লিখে দিন, ‘কম করে পাঁচ-শো’ পাউন্ড মাইনেয় ফ্রাঙ্কো মিডল্যান্ড হার্ডওয়ার কোম্পানিতে বিজনেস ম্যানেজারের চাকরি নিতে আমার ইচ্ছা আছে।'... ঠিক আছে, ওতেই হবে। এবার বলুন, মসনের চাকরির কী হবে?”
    “লিখে জানিয়ে দিচ্ছি চাকরি চাই না।”


    “আরে না, না। ওটি করবেন না। মসনের ম্যানেজার আমাকে বলে কিনা আপনাকে রাস্তা থেকে তুলে এনে ভালো জায়গায় বসাচ্ছে— এর চাইতে ভালো চাকরি আপনাকে কেউ দেবে না। আমিও বাজি ধরে এসেছি, কাজের লোকের কখনো ভালো মাইনের অভাব ঘটবে না।”
    “শুনেই মাথায় রক্ত চড়ে গেল— আচ্ছা বদমাশ লোক তো! জীবনে যার মুখও দেখিনি, তার এতবড়ো কথা? ঠিক আছে, যাব না, চিঠিও লিখব না।”
    বিদায় নিলেন আর্থার পিনার। আনন্দের চোটে অর্ধেক রাত ঘুমোতে পারলাম না। খাম পোস্টকার্ড কেনার পয়সা পর্যন্ত ছিল না— হঠাৎ ট্যাক গরম হয়ে গেল নগদ এক-শো পাউন্ডে। ‘পরের দিন গেলাম বার্মিংহামে। হোটেলে উঠলাম। ঠিকানা খুঁজে একটু আগেই পৌঁছোলাম বাড়িটায়। নীচের তলায় অনেক কোম্পানির নাম লেখা বোর্ড ঝুলছে, কিন্তু ফ্রাঙ্কো মিডল্যান্ড হার্ডওয়ার কোম্পানির নাম কোথাও দেখলাম না। তবে কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করা হল? হতভম্ব হয়ে ভাবছি কী করব, এমন সময়ে হন্তদন্ত হয়ে হাজির হলেন এক ভদ্রলোক। চেহারা আর গলার স্বরের দিক দিয়ে আর্থার পিনারের মতো দেখতে, শুধু যা দাড়ি গোঁফ কামানো— চুলও অতটা কালো নয়।
    ‘এসেই জিজ্ঞেস করলেন, “আপনিই মি. হল পাইক্রফট?”
    “হ্যাঁ।”
    “আমি হ্যারি পিনার। আজ সকালে ভাইয়ের চিঠি পেয়েছি। খুব তারিফ করেছে আপনার।”
    “আপনাদের অফিসটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।”
    “পাবেন কী করে? এই তো দিন সাতেক একটা সাময়িক ডেরা জোগাড় করেছি। এখনও বোর্ড ঝোলানো হয়নি। চলুন।”


    ‘সিঁড়ি বেয়ে ওপরতলায় দু-ঘরের একটা ফ্ল্যাটে আমাকে নিয়ে গেলেন হ্যারি পিনার। আসবাবপত্রের চেহারা দেখে বুক দমে গেল। ঝকঝকে তকতকে টেবিল চেয়ার আর সারি সারি কেরানি বসে-থাকা অফিসঘরে কাজ করে আমি অভ্যস্ত— এরকম ধূলিধূসরিত দু-খানা চেয়ারওলা একখানা টেবিল আর কিছু লেজার বই সমেত অফিসঘর কখনো দেখিনি।
    ‘হ্যারি পিনার আমার হতভম্ব মুখ দেখে চিন্তাটা আঁচ করে নিয়ে বললেন, “অফিসটা সাজানোর পর্যন্ত সময় পাইনি। রাতারাতি কি সব হয়? কিন্তু টাকা যখন আছে, আস্তে আস্তে সব হবে। বসুন।”
    ‘আমার কাগজপত্র দেখলেন হ্যারি পিনার। বললেন, “চাকরি আপনার পাকা হয়ে গেল। ভাইয়ের পছন্দ আছে দেখছি।”
    “আমার কাজটা কী?”
    “ফ্রান্সের বড়ো গুদামটার চার্জে থাকবেন। আপাতত দিন সাতেক বার্মিংহামে থাকুন— কেনাকাটা তদারক করুন।”
    “কীভাবে?”
    ড্রয়ার থেকে একটা মোটা লাল বই বার করে হ্যারি পিনার বললেন, “এই বইটিতে যাদের পাশে দেখবেন লোহালক্কড়ের কারবারি বলে লেখা আছে, তাদের নাম আর ঠিকানার একটা আলাদা লিস্ট করুন।’
    “কিন্তু এ-রকম লিস্ট তো পাওয়া যায়।”
    ‘সে-লিস্ট সুবিধের নয়। আমাদের কাজে লাগবে না। সোমবার বারোটার মধ্যে লিস্টটা আমাকে এনে দিন। এখন আসুন।
    ‘সাত-পাঁচ কথা ভাবতে ভাবতে মোটা বইখানা বগলে করে হোটেলে ফিরলাম। অফিসের ছিরি দেখে মনটা দমে গিয়েছে ঠিকই, কোম্পানির নামও দেখলাম না— কিন্তু চাকরি তো পাকা হয়ে গিয়েছে, পকেটের আগাম এক-শো পাউন্ড গজগজ করছে। কাজেই রোববার সারাদিন খাটলাম। সোমবার গেলাম এইচ পর্যন্ত নামের লিস্ট নিয়ে। ফাঁকা ঘরে দেখা হল হ্যারি পিনারের সঙ্গে। আমাকে আসতে বললেন বুধবার। বুধবারও কাজ শেষ হল না। শুক্রবার, মানে, গতকাল আবার গেলাম ভদ্রলোকের কাছে। উনি বললেন, এবার বাসন-কোসন বিক্রি করে, তাদের নাম-ঠিকানার একটা লিস্ট যেন জানাই। আরও বললেন, আজকে সন্ধে সাতটার সময়ে যেতে। তাড়াহুড়ো করবার দরকার নেই। সারাদিন খেটেখুটে ঘণ্টা দুয়েক নাচগানের আড্ডায় ফুর্তি করে যাওয়াই ভালো।
    ‘ডা, ওয়াটসন, এই কথাটা বলেই তিনি হেসে উঠলেন। এবং আমি আঁতকে উঠলাম তার দাঁত দেখে। বাঁ-দিকের ওপরের পাটির দুটাে দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণভাবে। এই পর্যন্ত শুনে সোৎসাহে সানন্দে হাত ঘষল শার্লক হোমস। বিস্মিত চোখে হল পাইক্রফটের দিকে চাইলাম আমি।
    উনি বললেন, ‘ডা, ওয়াটসন, লন্ডনে আর্থার পিনার একবার হেসে উঠেছিলেন মসন কোম্পানির চৌকাঠ মাড়াব না শুনে। তখন সোনা দাঁতের ঝিকিমিকি দেখেছিলাম বাঁ-দিকের ওপরের পাটিতে। অবিকল সেই সোনা দাঁত ঝিকমিকিয়ে উঠল হ্যারি পিনারের বাঁ-দিকের ওপরের পাটিতে। এ কী করে হয়? চেহারা আর গলার স্বর একরকম, গোড়া থেকে ধরতে পেরেছিলাম। ভেবেছিলাম সহোদর ভাই বলেই হয়তো মিলটা থেকে গিয়েছে। কিন্তু সোনার দাঁত পর্যন্ত দু-ভাইয়ের একরকম হতে পারে কি? খটকা লাগল। মাথা বোঁ বোঁ করে ঘুরতে লাগল। বেশ বুঝতে পারলাম পরচুলো পরে চেহারা পালটানো হয়েছিল। দাড়ি গোঁফ কামিয়ে পরচুলো ফেলে ভোল ফেরানো হয়েছে। কিন্তু কেন? কেন এই প্রহসন আমার মতো ছাপোষা মানুষের সঙ্গে? ভেবে ভেবে কুলকিনারা না-পেয়ে মি. শার্লক হোমসের কাছে দৌড়ে এসেছি।’
    ঘর নিস্তব্ধ। অপাঙ্গে আমার পানে চাইল র্শালক হোমস।

    বলল, মি. আর্থার হ্যারি পিনারের সঙ্গে আমরা দুই বন্ধু দেখা করতে চলেছি।’
    “কিন্তু কীভাবে?’
    ‘চাকরি চাওয়ার অছিলায়, বললেন হল পাইক্রফট।

    ‘ভদ্রলোকের সুরতটা একবার না-দেখলে তার চালাকিটার মানে ধরা যাবে না, বলে জানলা দিয়ে বাইরে শূন্যগর্ভ দৃষ্টি মেলে রইল হোমস— বাকি পথটা মুখ দিয়ে টু শব্দটি বার করতে পারলাম না।
    সন্ধে হয়েছে। বার্মিংহামের পথ বেয়ে চলেছি ফ্রাঙ্কো মিডল্যান্ড হার্ডওয়ার কোম্পানি অভিমুখে।
    হল পাইক্রফট বললেন, ‘আগেভাগে গিয়ে লাভ নেই— ঘরে কেউ থাকবে না।’

    ‘খুবই ইঙ্গিতপূর্ণ ব্যাপার কিন্তু’, বললে হোমস।

    ‘ওই তো উনি যাচ্ছেন চাপা স্বরে বললেন হল পাইক্রফট। দেখলাম, আমাদের সামনে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হাঁটছে সুদর্শন, সুবেশ খর্বকায় এক ব্যক্তি। একটা সান্ধ্য দৈনিক কিনে নিয়ে ঢুকে পড়ল একটা বাড়ির মধ্যে।
    ‘ওই হল কোম্পানির অফিস, বলে আমাদের নিয়ে হল পাইক্রফট টুকলেন ভেতরে। সোজা উঠে গেলাম পাঁচতলায়। আধখোলা একটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নক করলেন পাইক্রফট। ভেতর থেকে গলা শোনা গেল, ‘আসুন।’


    ‘ঢুকলাম তিনজনে। আসবাবহীন ন্যাড়া একটা ঘর। একটিমাত্র টেবিলের ওপর সান্ধ্যদৈনিক মেলে বসে সেই ভদ্রলোক। আমরা ঢুকতেই মুখ তুলে চাইল। দেখলাম নিঃসীম আতঙ্ক, অপরিসীম দুঃখশোক মূর্ত হয়ে উঠেছে মুখের পরতে পরতে। গাল নীরক্ত মরামাছের পেটের মতো তলতলে ফ্যাকাশে। চোখ উদ্ভ্রান্ত— কোটর থেকে যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কল্পনাতীত ভয় যেন তাকে পেঁচিয়ে ধরেছে। হল পাইক্রফটের দিকে চেয়েও যেন তাকে চিনতে পারল না।
    ‘মি. পিনার, আপনার শরীর খারাপ মনে হচ্ছে?’ সবিস্ময়ে বললেন হল পাইক্রফট।


    ‘এরা কে? শুকনো ঠোটে জিভ বুলিয়ে নিয়ে প্রবল চেষ্টায় নিজেকে সামলাতে সামলাতে বললে ভয়ার্ত ভদ্রলোক।
    ‘চাকরির জন্যে এসেছেন। মি. হ্যারিস। মি. প্রাইস।’


    ‘তাই নাকি? বেশ তো, চাকরি নিশ্চয় হবে, ফ্যাকাশে হাসি হাসল মি. পিনার। ‘কী কাজ জানেন বলুন।’
    ‘আমি হিসেবপত্র রাখতে জানি’, বললে হোমস।

    ‘আমি কেরানির কাজে পোক্ত’, বললাম আমি।

    ‘বেশ, বেশ, আপনাদের মতো লোকই আমার দরকার। কিন্তু এখন আসুন। আমাকে একলা থাকতে দিন।’
    চেষ্টা করেও ভদ্রলোক আর সামলাতে পারল না নিজেকে। শেষের দিকে চুরমার হয়ে গেল সংযম।
    দৃষ্টি বিনিময় করলাম আমরা তিনজনে।


    হল পাইক্রফট বললে, “কিন্তু আমাকে আসতে বলা হয়েছে এই সময়ে আরও কাজ দেবেন বলে।’
    ঠিক আছে, অতি কষ্টে সহজ সুরে বলল পিনার। ‘আপনারা তিনজনেই বসুন। আমি মিনিট তিনেকের মধ্যে আসছি।’
    বলে পেছনের দরজা খুলে ঢুকল অন্য ঘরে এবং দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল পেছন থেকে।

    ‘পালাল নাকি ?’ চাপা গলায় বললে হোমস।
    ‘সম্ভব নয়, ও-ঘর থেকে বেরোবার পথ নেই, বললেন পাইক্রফট।
    ‘ঘরে জিনিসপত্র আছে?’
    ‘খালি ঘর।’
    ‘তাহলে ওখানে গেল কী করতে? ভয়ের চোটে পাগল হয়ে গেল নাকি?’
    ‘আমরা যে গোয়েন্দা, তা আঁচ করেছে, বললাম আমি।

    ‘উহু, বললে হোমস। ‘আমাদের দেখে ঘাবড়ায়নি। আগে থেকেই ভয়ে আধখানা হয়ে বসে ছিল। ও কী!”
    আচমকা ঠক-ঠক-ঠক-ঠক আওয়াজ ভেসে এল দরজার ওদিক থেকে। ভয়ে পাগল হয়ে গিয়ে নিজেই দরজা নক করছে নাকি? কিছুক্ষণ পর আবার আওয়াজ হল— ঠক-ঠক-ঠক-ঠক। সেইসঙ্গে একটা চাপা ঘড়ঘড় শব্দ। আবার কাঠের ওপর খটখট আওয়াজ। শক্ত হয়ে গিয়েছিল হোমসের মুখ। ঘড়ঘড়ে আওয়াজটা শুনেই ছিলে-ছেঁড়া ধনুকের মতো ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ল দরজায়। দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে ধাক্কা মারল বন্ধ পাল্লায়। শক্তি প্রয়োগ করলাম আমিও। নিমেষে কবজা থেকে উপড়ে ছিটকে গেল পাল্লা। হুড়মুড় করে ঢুকলাম ভেতরে।
    ঘরে কেউ নেই।


    পরক্ষণেই দেখলাম, পাশে আর একটা দরজা। এক ঝটকায় পাল্লা খুলে ফেলল হোমস। এবং দেখা গেল ফ্রাঙ্কো মিডল্যান্ড হার্ডওয়ার কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে। দরজার হুক থেকে গলায় প্যান্ট আটকানোর ফিতে বেঁধে ঝুলছে— পায়ের কাছে পড়ে কোট আর ওয়েস্টকোট। গোড়ালি লাগছে কাঠের পাল্লায়— আওয়াজ হচ্ছে খট-খট-খট-খট।
    কোমর ধরে শরীরটা ওপরে তুলে ধরলাম আমি। হোমস আর পাইক্রফট খুলে দিল গলার ফাঁস। ধরাধরি করে নিয়ে গেলাম পাশের ঘরে। ফ্যাকাশে মুখে শুয়ে রইল মিনিট পাঁচেক— থেকে থেকে থরথর করে কাঁপতে লাগল রক্তহীন ঠোঁটজোড়া।
    নাড়ি পরীক্ষা করলাম। খুব ক্ষীণ, মাঝে মাঝে মিলিয়ে যাচ্ছে। তবে নিশ্বাস নেওয়া বাড়ছে— চোখের সাদা অংশ দেখা যাচ্ছে।
    বললাম, ‘ভয়ের কিছু নেই। বিপদ কেটে গেছে। কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে মুখে ছিটিয়ে দিলাম, দু-হাত ধরে ওঠানামা করতে লাগলাম শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি আরও স্বচ্ছন্দ করার জন্যে।
    এবার বললে, ‘পুলিশ ডাকা দরকার এখন।'


    ‘কিন্তু আমাকে এসবের মধ্যে টেনে আনা হল কেন বুঝলাম না তো, আমতা আমতা করে বললেন হল পাইক্রফট।
    ‘খুব সোজা কারণে। ওয়াটসন, বুঝেছ?

    ‘না।’

    'আরে ভায়া, মি. পাইক্রফটকে দিয়ে কবুল করিয়ে নিয়েও খুশি হয়নি আর্থার পিনার— লিখিয়ে নিয়েছিল। কেন? না, তার হাতের লেখা দরকার ছিল বলে। এই গেল এক নম্বর।'
    ‘হাতের লেখা নেওয়ার দরকার হল কেন?’

    ‘দু-নম্বর ব্যাপারটা শুনলেই বুঝবে, কেন।

    মি. হল পাইক্রফট কথা দিলেন মসন কোম্পানিতে যাবেন না। যেখানকার ম্যানেজার তাকে দেখেননি— তিনি জানলেনও না হল পাইক্রফট আসছেন না। কাজেই তার নাম নিয়ে যদি একজনকে আসতে হয়— হাতের লেখাটা অন্তত ম্যানেজারের চেনা হওয়া চাই।’
    ‘অ্যাঁ!’ আঁতকে উঠলেন হল পাইক্রফট।


    ‘আপনি দরখাস্ত লিখেছিলেন যে হাতের লেখায়, হুবহু সেই লেখাটি নকল না-করলে আপনার নাম নিয়ে চাকরিতে যোগ দেওয়া একটু মুশকিলের ব্যাপার বই কী। তাই আপনাকে দিয়ে দু-লাইন লিখিয়ে নেওয়া হল এবং সেইভাবে হাতের লেখা মকশো করে মি. হল পাইক্রফট সেজে এমন একটা অফিসে যাওয়া হল যেখানে মি. হল পাইক্রফটকে কেউ দেখেনি।’
    `বলেন কী!’


    ‘আপনি যেন আবার সেখানে গিয়ে না-পড়েন, এই ভয়ে এক-শো পাউন্ড আগাম দিয়ে উড়ো কোম্পানির অফিসে আটকে রাখা হল আপনাকে। বাজে কাজে ধরে রাখা হল যাতে লন্ডন আসতে না-পারেন।’
    ‘কিন্তু একই লোক নিজের ভাই সাজতে গেল কেন?’

    কারণ এই বদমাশদের দলে দুজনের বেশি লোক নেই বলে। একজন গেল মসন কোম্পানিতে আর একজন ভোল পালটে আপনাকে লন্ডন থেকে টেনে এনে আটকে রাখল এখানে। কিন্তু তার সোনা বাঁধানো দাঁতটা দেখিয়ে করল বিপত্তি।— এই পর্যন্ত বেশ পরিষ্কার। কিন্তু বুঝতে পারছি না আমাদের দেখেই হঠাৎ গলায় দড়ি দেওয়ার শখ হল কেন লোকটার।

    'কাগজটা পড়লেই বুঝবেন। আচমকা ভাঙা-ভাঙা স্বর শুনলাম পেছনে। দেখি, মুমূর্ষ ব্যক্তি উঠে বসেছে। মুখের রং ফিরে আসছে। গলায় জড়ানো ফিতেতে উদ্রাস্তের মতো হাত ঘষছে। ‘ঠিকই তো!’ লাফিয়ে উঠল শার্লক হোমস। ‘এ-রহস্যের জবাব তো কাগজের মধ্যেই রয়েছে। আচ্ছা বোকা তো আমি। কাগজটা আগেই দেখা উচিত ছিল।’
    ছো মেরে কাগজটা তুলে নিয়ে মেলে ধরল হোমস। বললে সোল্লাসে, লন্ডনের কাগজ! এই দেখ হেডলাইন। মসন অ্যান্ড উইলিয়ামস কোম্পানিতে নরহত্যা। ডাকাতির চেষ্টা বানচাল। আততায়ী গ্রেপ্তার। ওয়াটসন, জোরে পড়ো, সবাই শুনি।’
    ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। আমি পড়লাম।


    ‘আজ বিকেলে শহরে একটা বিরাট ডাকাতির চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে— কিন্তু একজন নিহত হয়েছে। মসন অ্যান্ড উইলয়ামস কোম্পাণির কাছে গচ্ছিত দশলক্ষ পাউন্ডের শেয়ারের কাগজপত্র লুঠের চেষ্টা হয়। কিছুদিন আগে মি. হল পাইক্রফট এই ছদ্মনামে কুখ্যাত জালিয়াত আর সিন্দুকে চোর বেডিংটন চাকরি নেয় ওই কোম্পানিতে। এরা দু-ভাই পাঁচ বছর জেল খেটে সবে খালাস পেয়েছে। বেডিংটন নাম ভাড়িয়ে চাকরিতে ঢোকার পর সিন্দুক আর স্ট্রংব্রুমের সবকটা তালার নকল চাবি বানিয়ে নেয়।
    ‘রেওয়াজ মাফিক শনিবার বেলা বারোটায় ছুটি পায় কেরানিরা। সেই কারণেই একটা বিশ মিনিটে কার্পেটের থলি হাতে এক ব্যক্তিকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখে পেছন নেয় সাজেন্ট টুসন এবং পথ আটকে এক-শো হাজার পাউন্ড মূল্যের কোম্পানির কাগজপত্র উদ্ধার করে ব্যাগের মধ্যে থেকে। অফিসে ঢুকে দেখা যায়, দ্বাররক্ষকের পিণ্ডি পাকানো দেহ ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে একটা সিন্দুকের মধ্যে। নিহত ব্যক্তির করোটির পেছন দিকটা একেবারে ছাতু হয়ে গেছে। ছুটির পর কিছু ফেলে এসেছে এই অছিলায় অফিস ঘরে ঢুকেছিল বেডিংটন। পেছন থেকে ডান্ডা মেরে খুন করে প্রহরীকে এবং সবচেয়ে বড়ো সিন্দুকটা ভেঙে তাড়াতাড়িতে যা পেয়েছে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে বাইরে। বেডিংটনের সহোদর ভাইটি তার সর্ব কুকর্মে থাকে— কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিরাট এই ডাকাতিতে সে অংশ নেয়নি। পুলিশ অবশ্য তাকে খুঁজছে। বেডিংটন গ্রেপ্তার হয়েছে।’
    উদ্ভ্রান্ত মূর্তিটির পানে দৃকপাত করে শার্লক হোমস বললে, ‘পুলিশকে খবর দিন মি. পাইক্রফট। বেডিংটনের ভাইকে খুঁজে বার করার ব্যাপারে আমরা না হয় একটু সাহায্যই করলাম। ওয়াটসন, মানবচরিত্র দেখেছ? মায়ের পেটের ভাই খুনের অপরাধে ফাঁসির দড়িতে ঝুলবে বুঝতে পেরে মনের দুঃখে নিজেই আগেভাগে ঝুলে পড়ছে ফাঁসিতে!’


গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য