সবুজ সংকেত - কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায়

সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরে অয়ন দেখল কেউ নেই। সব ঘরে তালাবন্ধ। শুধু তার পড়ার ঘরের দরজা খোলা। সে ঘরে এসে চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
      যখন দুপুরে বাড়ি থেকে বেরোয় তখন টেবিলটা ভাল করে গুছিয়ে রেখেছিল, এখন দেখল সব কেমন এলোমেলো। অয়ন তাড়াতাড়ি উঠে একটা মোটা বই টেনে নিল। পচাঁশি পৃষ্ঠা খুলে দেখল তার কুড়ি টাকার নোটটা ঠিকই আছে। তাহলে? টেবিলের ড্রয়ার টেনে দেখল ডাকটিকিটের অ্যালবামটাও জায়গাম তা আছে। এই দুটো ছাড়া তার আদতেও হারাবার মতো কিছু নেই।
      টুইকে বার বার বলা হয়েছে টেবিলে যেন হত না দেয়। সেদিন তো এই নিয়ে ভয়ানক ঝগড়া হয়ে গেল। মা শুধু বোনের দিকে। আর একটু হলেই কান ধরে টেনে দিত। অয়ন সময়মতো পালিয়ে গিয়েছিল।

      টেবিলের ছড়ানো-ছেটানো বইপত্র গুছিয়ে রাখতে রাখতে ভাবল টুই নিশ্চয়ই খুব রেগে আছে। কথা ছিল সিনেমা দেখতে গেলে অয়ন আজ সবাইকে খাওয়াবে। সবাই বলতে তোমা, টুই আর ছোটমাসি। বাবাকে নিয়ে সিনেমা দেখতে সাওয়ার কথা তো ভাবাই যায় না। মনে হয় পৃথিবীর ব্যস্ততম মানুষ।
      আসলে আজই যে কুনালের কাছ থেকে সমস্ত খাতা নিয়ে আসতে হবে এটা সকালের দিকে মনে ছিল না। দুপুরে সবাই যখন গভীর ঘুমে তখন কাউকে কিছু না বলে অয়ন চলে গিয়েছিল। সিনেমাটা সবার সঙ্গে দেখা হল না। তাই বলে গোছানো বইপত্র সব ওলটপালট করে দিয়ে রাগ দেখানো! আজ টুইয়ের সঙ্গে ঝগড়াটা কিছুতেই এড়ানো যাবে না।
      অয়ন চিৎকার করে ডাকল, “রঘুদা, রঘুদা!” কোনো সাড়াশব্দ নেই। সে দোতলার বারান্দার রেলিং থেকে ঝুঁকে চারিদিকে তাকাল। আবার রঘুকে ডেকে নিজের ঘরে এল।
      কুনালের কাছে সমস্ত খাতা ছিল তাই গত সাতদিনে তেমন পড়াশুনা হয়নি। কুনাল দু-একটি বই ছাড়া আর কোনো বই কিনতে পারেনি। ওর বাবা একটি জুট মিলে কাজ করেন। বহুদিন যাবত মিল বন্ধ। কুনালের জন্যে সে সব-কিছু করতে পারে। স্কুলে এবং স্কুলের বাইরে কুনাল ছাড়া অয়নের বন্ধু নেই।
      অয়নের বাবা মাঝে মাঝে বলেন, “এই যে বাড়ি-গাড়ি, অর্থ দেখছ সবই আমার পরিশ্রমে একটু-একটু করে তৈরি। তুমি যেন কখনো এসবের অহংকারে সত্যিকারের মানুষকে চিনতে ভুল কোরো না। আর একটা কথা জেনো, অর্থটাই জীবনের সব নয়।”
      অয়ন আর টুইকে নিয়ে বাবা-মা'ব খুব গর্ব, তাদের মনের মতো করে তৈরি হচ্ছে ছেলে-মেয়ে।
      ঘরের আলো নিবিয়ে টেবিলের আলো জ্বেলে পড়তে বসল অয়ন। অনেকক্ষণ পড়তে পড়তে মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। ঠিক তখনই ঝপ করে আলো নিবে গেল। সে বই বন্ধ করে মুখ তুলল। প্রথমটা বুঝতে পারেনি। তারপর ভাল করে লক্ষ্য করে দেখল তার মুখোমুখি জানলার গ্রিলের ফাঁকে দুটো অদ্ভুত হলুদ আলোর বিন্দু। অয়ন চিৎকার করে বলল, “কে?”
      আলোর বিন্দু দুটো চট কবে সরে গেল। অয়ন চিৎকার করে ডাকল, “রঘুদা, রঘুদা।” কেউ সাড়া দিল না। সে জানে না কোথায় দেশলাই কোথায় কী। আলো আসার অপেক্ষায় চুপ করে বসে রইল।
      অন্ধকার বারান্দায় আবার হলুদ আলোর বিন্দু দুটো দেখতে পেল সে। ছোট সরু পেনসিল টর্চের আলোর মতো দুটো তীব্র আলোর রশ্মি পাশাপাশি চারদিকে ওঠানামা করছে।
      এবার আর বসে থাকা যায় না। অয়ন কোনো শব্দ না করে বেড়াল-পায়ে এগিয়ে গেল। আলো দুটো উলটো দিকে ঘুরে গেল। দেখা যাচ্ছে না। একটা ছায়ামূর্তি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। অয়নের হাত দুটাে অদ্ভুত ভঙ্গিতে ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে গেল। সে কোনো আঘাত করবার আগেই ছায়ামূর্তি ঘুরে গেল, হলুদ আলো দুটো সোজা এসে পড়ল অয়নের গায়ে। সে অবাক হয়ে বলল, “রঘুদা, তুমি!" এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তার গা-হাত-পা কেমন অবশ হয়ে এল। সে সোজা দাঁড়িযে থাকতে পারছে না। বাবান্দার রেলিং ধরে কোনো রকমে টাল সামলে নিল। কিছুতেই সোজা দাঁড়িযে থাকা যাচ্ছে না। হাঁটু মুড়ে বারান্দাতেই ধপ করে বসে পড়ল। সে ভাল কারাটে লড়তে পারে। গায়ের যথেষ্ট জোর। কখনো নিজেকে এমন অসহায় মনে হয়নি। বসে বসেই দেখল রঘু তার বাবার ঘরের তালাবন্ধ দরজাটা অনায়াসে খুলে ফেলল। ‘রঘুর চোখের হলুদ আলোর রশ্মি একবার তালাটার উপরে পড়তেই তালা খুলে নীচে পড়ে গেল।
      ঐ ঘরে অনেক জরুরি কাগজপত্র আছে। বেশ কয়েক মাস ধরে একটা বিরাট অপরাধীচক্র ধরবার জন্য বাবা খুবই চিন্তিত। যাবতীয় নথিপত্র একটা সিন্দুকের মধ্যে বন্ধ। একটা চাবি বাবার কাছে। আর একটা অয়নের কাছে। সেটা এমন এক জায়গায় লুকনো যা কুনাল ছাড়া বাবাকেও জানায়নি সে।
      রঘু কেন বাবার ঘরের তালা খুলবে। আর ওর চোখেই বা এমন হলুদ আলো কেন। রঘুর যখন দশ বছর বয়স তখন বাবা ওকে মেদিনীপুর থেকে নিয়ে আসে। সংসারে ওর কেউ নেই। তখন থেকে প্রায় তিরিশ বছর বয়স হল আজ পর্যন্ত কোনো অবিশ্বাসের কাজ করেছে বলে শোনা যায়নি। অয়নকে রঘু খুব ভালবাসে। একবার ওর উপস্থিত বুদ্ধির জন্য বাবা মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলেন। অয়ন কিছুতেই রঘুব এই কাজের কোনো মানে খুঁজে পেল না।
      উঠে বাধা দেবে তেমন শক্তিও শরীরে নেই। তার খুব কান্না পেয়ে গেল।
     অয়ন হঠাৎ দেখল সামনে সবুজ আলোর রশ্মি। খুব ভয় পেয়ে সে লাফিয়ে উঠতে গেল। খুব সহজেই উঠে দাঁড়াল। একটু আগের কোনো দুর্বলতাই আর নেই। সে দেখল তার সমস্ত গা-হাত-পা সবুজ হয়ে গেছে। যে সবুজ আলো মেঝেতে আছড়ে পড়েছে তা মনে হল তারই চোখ থেকে আসছে। একটু আগে অনেকটা এই ধরনেরই হলুদ আলো সে রঘুর চোখে দেখেছিল।
      রঘুর কথা মনে পড়তেই সে অন্য কিছু ভাববার সময় পেল না। দ্রুত বাবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। সে অনুভব করল কে যেন তার নিজের ভিতর থেকে নির্দেশ দিচ্ছে। সেই অনুযায়ী সে দরজার একটা পাল্লার দিকে তাকাল। দরজার পাল্লাটা শব্দ করে খুলে পড়ে গেল।
      ঘরের ভিতরে ঢুকে দেখল রঘু সিন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে। সিন্দুকটা যেন হলুদ আলোর মধ্যে ডুবে থেকে দাউ-দাউ করে জ্বলছে। অয়ন ঘরে ঢুকতেই হলুদ আলো ধীরে ধীরে স্নান হয়ে এল। সিন্দুক না খুলতে পেরে অয়নের দিকে খরদৃষ্টিতে তাকাল রঘু। চিৎকার করে বলল, “আপনার সবুজ আলো সরিয়ে নিন। আমি সহ্য করতে পারছি না।”
      অয়নের সঙ্গে রঘু কখনো আপনি করে কথা বলেনি। রঘুর কণ্ঠস্বর কেমন যেন ভয়ংকর। কিছুটা এগিয়ে অয়ন বলল, “তুমি বাবার সিন্দুক খুলছ কেন রঘুদা?” 
      রঘু চিৎকার করে বলল, “আমার পথ থেকে সরে দাঁড়ান আহবে।” এই বলে সে অয়নকে মারবার জন্য হাত ওঠাল।
      অয়নের সমস্ত শরীর আরো গাঢ় সবুজ হয়ে উঠেছে। সে রঘুকে মারবার জন্য হাত তুলতে গিয়ে ডান পা উপরে তুলে রঘুর মাথায় আঘাত করতে গেল। তার আগেই রঘু সেই মারটা এড়িয়ে কোমরের কাছে এমন এক লাথি মারল যে আয়ন সামলাতে না পেরে ছিটকে বারান্দায় এসে মুখ থুবড়ে পড়ল। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই সে উঠে দাঁড়িয়ে দেখল রঘু এমন একটি মারের ভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসছে যে-মার আটকে পালটা মারবার কৌশল তার জানা নেই। সে বারান্দায় দাড়িয়ে রঘুকে বাইরে নিয়ে আসবার জন্য একটা মারের ভঙ্গি করে আহ্বান জানাল। উত্তেজিত হয়ে বীভৎস মুখের ভঙ্গি করে রঘু এগিয়ে আসতেই সে আচমকা সরে গেল। রঘু বারান্দার রেলিংয়ে আছড়ে পড়তেই একটা মোক্ষম লাথি রঘুর চোয়াল লক্ষ্য করে মারতে ও বসে পড়ল।
      অয়ন অবাক হয়ে গেল। এমন মার সে দিতে পারবে আশা করেনি। ভাবল এটা কেমন করে হল। আরও ভেবে অবাক হল রঘু এই সমস্ত মার শিখল কোথা থেকে!
      এমন সময় রঘু বলল, “আহাব, হয় আজ আপনি থাকবেন, না হয় আমি থাকব।” 
      অয়নের ভিতরে কেমন এক জ্বালা। সে রঘুকে উপরি-উপরি বেশ কয়েকবার মারল। কয়েকটা মার রঘু আটকালেও বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারল না। বারান্দার এককোণে এলিয়ে পড়ল।
      অয়নের চোখের তারা কাঁপছে। তার চোখ থেকে সবুজ আলো যেন জমাট তরল পদার্থের মতো রঘুর সর্বাঙ্গ ঢেকে দিল।
      সমস্ত শরীরটা কেমন পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠেছে অয়নের। চারিদিকটা কেমন ঘুরছে। সে আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। 
      অয়ন চোখ খুলতেই বাবা-মা টুই, ছোটমাসি আর বাবার বন্ধু পুলিশ কমিশনার নীলাঞ্জন অধিকারী একসঙ্গে তার মুখের উপর ঝুঁকে পড়লেন। মা বললেন, “কেমন আছিস অয়ন?”
      অয়ন কথার কোনো জবাব না দিয়ে নিজের হাতদুটো তুলে দেখল। নীলাঞ্জন অধিকারী বললেন, “এতদিনে কারাটে শেখাটা তোমার সার্থক হয়েছে। তোমার তো দেখছি কিছুই হয়নি। বেচারা রঘুকে ওরা বেদম মার মেরেছে।”
      মা বললেন, “কী ভাগ্যি তুই বাড়িতে ছিলি, তা না হলে রঘুকে ওরা মেরে সব নিয়ে যেত।” অয়নের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি আর কাগজপত্তরগুলো বাড়িতে রেখো না।
      বাবা সামান্য হাসলেন। বললেন, “তোমরা সিনেমায় গিয়ে ভাল করেছ। তোমাদের কিছু হয়ে গেলে অনুশোচনার সীমা থাকত না।”
      বাবা-মা'র কথা শুনে অবাক হয়ে অয়ন উঠে বসল। নীলাঞ্জন অধিকারীর দিকে তাকিয়ে বলল, “নীলুকা, তোমার সঙ্গে কথা আছে।”
      বাবা বললেন, “তোমার কথা আমরা পরে শুনব। চলো ও-ঘরে রঘুকে দেখে আসি। ওকে একা ফেলে এসেছি।"
      অয়নকে দেখে রঘু কেঁদে ফেলল। "দাদাবাবু, আমার কী হল। ও দাদাবাবু।” বলে আবার জোরে কেঁদে উঠতেই টুই বলল, “ও রঘুদা, তুমি আর কেঁদো না।”
      মা বললেন, "একটু দুধ খাবে রঘু?” 
      রঘু কিছু না বলে কাঁদতে লাগল। ওর চোয়ালে, কপালে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা। হঠাৎ ফুপিয়ে কেঁদে বলল, “আমার সর্বাঙ্গে যন্ত্রণা মা।” অয়ন দেখল বঘুর চোখ স্বাভাবিক।
      নীলাঞ্জন অধিকারী বললেন, “তুমি কী যেন বলবে বলেছিলে অয়ন?" 
      অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর বলল, “না, আমার কিছু বলবার নেই।” 
      বাবা বললেন, “ খেমকার লোকজন যে আমার বাড়িতে হামলা করতে পারে এটা একেবারে মাথায় আসেনি।       যাই হোক এবার থেকে আমাদেব আরো বেশি সাবধান হতে হবে। মাঝখান থেকে রঘুদা বেদম মার খেল।”
     নীলাঞ্জন অধিকারী বললেন, “তবু ঘটনাটা অয়নের মুখ থেকে শোনা যাক।" অয়নের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ক’জন এসেছিল? সবাইকে মেরে তাড়িয়ে তবে নিশ্চয়ই তুমি অজ্ঞান হয়েছ। বাহাদুর বটে " বলেই হাঃ হাঃ করে হেসে উঠলেন। হাসি থামিয়ে বললেন, “বলো।”
      অয়ন বলল, “নীলুকা, আমার শরীর ভাল লাগছে না। আজ আর কিছু বলতে পারব না।” 
      “ঠিক আছে ঠিক আছে। আজ তুমি বিশ্রাম করো। আর একদিন তোমার বীরত্বের কাহিনী শোনা যাবে।"
      মা বললেন, “অয়ন, চল, তোকে আর টুইকে খেতে দিই। খেয়েই শুয়ে পড়। আজ আর রাত করে পড়তে হবে না।”
      টুই বলল, “মা, মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষায় দাদা কিন্তু তবে লাড্ডু। পরীক্ষাটা কিন্তু কারাটে দিয়ে পাশ করা যাবে না।"
      মা হাসলেন। অয়ন রেগে গিয়ে বলল, “তোকে মজা দেখাচ্ছি। আমার টেবিলের বইপত্তর এলোমেলো করে দিয়েছিস সিনেমায় যাইনি বলে।”
      টুই বলল, “মা, দেখো, দাদা ঝগড়া করবার জন্য, কেমন মিথ্যে বলা অভ্যাস করছে।” 
     অয়ন চুপ করে গেল। কোনো কথা না বলে খেয়ে উঠে পড়ল। কিছুতেই ঘুম আসছে না। সন্ধ্যা থেকে যা ঘটেছে সব একটু-একটু করে ভাববার চেষ্টা করছে অয়ন। কোনোটাই কিছুতে গুছিয়ে সাজাতে পারছে না। চিন্তা করতে গিয়ে বারবার খেই হারিয়ে ফেলছে। মাঝে-মধ্যে ভাবছে সমস্তটাই মিথ্যা। তাহলে অত মজবুত দরজার একটা পাল্লা ভাঙল কে! রঘুদার চোখের হলুদ আলো, তার শরীরে সবুজ রঙ আর চোখে সবুজ জ্যোতি সব মিথ্যা? একটু আগে রঘুদার চোখ দেখে মনে হল অমন সরল বিশ্বাসী চোখ হয় না। তখনকার রঘুদার ছবি অয়নের চোখের সামনে ভেসে উঠতেই একা ঘরে সে শিউরে উঠল। যা কিছু ঘটেছে সে যাকেই বলতে যাক কোনোভাবেই বিশ্বাস করাতে পারবে কি? রঘুদার কথা বললে কেউ মানতে চাইবে না। তাছাড়া কিছুক্ষণ আগে রঘুকে কাঁদতে দেখে তারও তো চোখে জল আসছিল। মাথা গরম হয়ে উঠছে নানা রকম চিন্তায়।
      অয়ন ঘরের আলোটা জ্বালিয়ে দিল। বাথরুমে গিয়ে চোখে-মুখে-ঘাড়ে জল ছিটিয়ে এসে দেখল বাবা বারান্দার রেলিংকে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাচ্ছেন। বাবা ডাকলেন, “অয়ন।”
      “কী বাবা ?” 
      “তোমার শরীর খারাপ লাগছে? তোমাকে কেউ বেশি মারতে পারেনি তো?” 
      “ না বাবা! আমি ভাল আছি।” অয়ন এই বলে তার ঘরের দিকে যাবার আগে বলল, “বাবা, রঘু কেমন আছে?”
      "ভাল। ও বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে।” 
      অয়নের বুকের ভিতরটা কেমন এক মমতায় টনটন করে উঠল। সে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে ভাবল খেমকা কোতার লোকজনদের কী কাজ।
      ঘরে ঢুকে দরজ বন্ধ করতেই আলোটা ঝপ কবে নিবে গেল। ঘোর অন্ধকার কেটে ঘরের মধ্যে হালকা সবুজ আলোর আভ ছড়িযে পড়ল। ঘরের দেয়ালে একটা বড় মাপের আযনা টাঙানো আছে। সেদিকে তাকিয়ে দেখল আযনায় সবুজ অক্ষরে লেখা আছে অয়ন। পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল দাঁড়িয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকল অয়ন। লেখাটা ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে মিলিয়ে যেতে অয়ন দেখল একটু-একটু করে আয়নাতে আরো লেখা ফুটে উঠছে।
      কয়েক হাজার আলোকবর্ষ দৃবত্বে থেকেও পৃথিবীকে দখল করার ইচ্ছে আমাদের বহুদিনের। ফুল গাছে ফুটে থাকলে যত সুন্দর দেখায় ঘরে এনে ফুলদানিতে রাখলে আমার তত ভাল লাগে না। তাই একদিন আমি ঠিক করলাম পৃথিবীকে দখল না করে সুন্দর করে সাজিয়ে তুলব। তাই আমার শক্তি প্রয়োগ করে পৃথিবীকে ফুলের মতো ফুটে উঠতে সাহায্য করছি বহু যুগ ধরে। কিন্তু আমার গ্রহে সকলেই আমার সঙ্গে একমত নয়। তারা চায় পৃথিবীতে যারা বুদ্ধিমান প্রাণী তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ক্রমশ গ্রহটাকে নষ্ট করে দিতে। অন্য অনেক দেশেব মতো তোমাদের দেশেও কিছু মানুষের মধ্যে অশুভ বুদ্ধির প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে আমার মতের বিরোধী পঙ্গপাল মোর্চা । তোমার বাবা অনির্বাণ সোম নিজের বুদ্ধি ও দক্ষতায় একটা বিরাট দলকে কিছুদিনের মধ্যেই গ্রেফতার কবতে সক্ষম হবেন। যে দল মানুষের মধ্যে বিভেদ জিইয়ে রেখে একটু-একটু করে নানা অছিলায় এই প্রাণীটিকে নষ্ট করে দেবার জন্য বিরাট চক্রান্ত করছে। আপাত সুখ এদের কাম্য। অনির্বাণ সোম এই চক্রান্তের সমস্ত গোপন কাগজ তার নিজের ঘরে সিন্দুকের মধ্যে রেখেছেন। আমাদের পঙ্গপাল মোর্চা চায় ঐ কাগজ নষ্ট করে চক্রান্তকারীদের মদত দিতে। আমি চাই আমার অনন্ত সৌরজগতের মধ্যে পৃথিবী ফুলের মতো ফুটে থাক। তাই পঙ্গপাল মোর্চা যখন রঘুকে মাধ্যম করে কাগজ নষ্ট করবার চেষ্টা করছিল তখন আমি তোমাকে মাধ্যম করে তা নষ্ট হতে দিইনি। তোমার পড়ার টেবিলে সিন্দুকের চাবি খুঁজতে গিয়ে সব ওলটপালট করেছিল রঘু। অবশ্য ও সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমার সবুজ অভিনন্দন নাও—আহাব।”
      লেখাটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে অয়ন আয়নার কাছে ছুটে গেল। ঘরে ঘন অন্ধকার। কী ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। সে অন্ধকারে আন্দাজ করে হাতড়ে নিজের খাটে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য