সিভকা-বুর্কা - রাশিয়ার উপকথা

  এক যে ছিল বুড়ো, তার তিন ছেলে। বড় দুই ছেলে চাষবাস দেখত, মাথা উঁচিয়ে চলত, বেশভূষা করত। ছোট ছেলে বোকা ইভান তেমন কিছ নয়। সারাদিন সে বাড়ীতেই চুল্লীর উপরের তাকে বসে কাটাত। আর মাঝে মাঝে বনে যেত ব্যাঙের ছাতা তুলতে।
  বুড়োর যখন মরবার সময়, তখন একদিন তিন ছেলেকে ডেকে বললে: ‘আমি মরে গেলে পর পর তিন রাত আমার কবরে রুটি নিয়ে আসিস।” 
  মরে গেল বুড়ো। কবর দেওয়া হল তাকে। সেই রাত্রে বড় ভাইয়ের কবরে যাওয়ার পালা। কিন্তু বড় ভাইয়ের আলসেমি লাগে, নাকি ভয় পায়। ছোট ভাই বোকা ইভানকে বলে: ইভান, আজ যদি তুই আমার বদলে বাবার কবরে যাস, তবে তোকে একটা পিঠে কিনে দেব।’
  ইভান তক্ষুণি রাজি। রুটি নিয়ে চলে গেল বাবার কবরে। বসে বসে অপেক্ষা করে। ঠিক রাত দুপারে কবরের মাটিটা দু’ফাঁক হয়ে বুড়ো বাবা বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল : 'কে ওখানে? আমার বড় ছেলে নাকি? বল তো শুনি রুশদেশের খবর? কুকুরেরা কি ডাকছে, নেকড়েরা গজরাচ্ছে, নাকি আমার বাছা কাঁদছে?’
  ইভান বলল, ‘বাবা, এই যে আমি, তোমার ছেলে। রুশদেশ শান্তিতে আছে, বাবা!’
  বুড়ো তখন পেট ভরে রুটি খেয়ে আবার কবরে গিয়ে শয়ে পড়ল। আর ইভান পথে থামতে থামতে ব্যাঙের ছাতা কুড়িয়ে কুড়িয়ে বাড়ী ফিরল।
  বাড়ী ফিরতে বড় ভাই জিজ্ঞেস করল:
  'হ্যাঁ রে, বাবাকে দেখলি?’
  ইভান বলল, ‘হ্যাঁ, দেখেছি।’
  ‘রুটি খেল?’
  ‘হ্যাঁ খেল, পেট পুরে।’
  আর একটা দিন কেটে গেল। সেদিন মেজ ভাইয়ের যাবার পালা। আলসেমি করেই হোক বা ভয় পেয়েই হোক মেজ ভাই বলে: ইভান, তুই বরং আজ আমার বদলে যা, তোকে এক জোড়া লাপতি বানিয়ে দেব।’
  ইভান বলল, ‘বেশ।’
  রুটি নিয়ে ইভান আবার গেল কবরের কাছে। অপেক্ষা করে বসে রইল। ঠিক রাত দুপুরে কবরের মাটিটা দু’ফাঁক হয়ে ইভানের বুড়ো বাবা বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল: ‘কে ওখানে? আমার মেজ ছেলে নাকি? বল তো শুনি রুশদেশের খবর? কুকুরেরা কি ডাকছে, নেকড়েরা গজরাচ্ছে, নাকি আমার বাছা কাঁদছে?”
  ইভান জবাব দিল: ‘আমি তোমার ছেলে, বাবা। রুশদেশ বেশ শান্তিতেই আছে।’
  বুড়ো তখন পেট ভরে রুটি খেয়ে কবরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। পথে থেমে থেমে ব্যাঙের ছাতা কুড়িয়ে কুড়িয়ে বাড়ী ফিরল ইভান। বাড়ী ফিরতে মেজ ভাই জিজ্ঞেস করল: ‘হ্যাঁ রে, রুটি খেল বাবা?’
  ‘খেল, পেট পুরে খেল।’
  তৃতীয় রাত্তির। সেদিন ইভানের যাবার পালা। ইভান দাদাদের বলল: ‘দু’রাত্তির আমি গেছি। আজ তোমরা কেউ যাও। আমি বাড়ীতে ঘুমিয়ে নিই।”
  দাদারা বলল: ‘সে কী রে ইভান, তোর তো বেশ জানা শোনা হয়ে গেছে, তুই বরং যা।”
  ‘তা বেশ, আমিই যাব।’
  রুটি নিয়ে ইভান চলে গেল। ঠিক রাত দুপুরে কবরের মাটিটা দু’ফাঁক হয়ে ইভানের বুড়ো বাবা উঠে এল। জিজ্ঞেস করল: ‘কে ওখানে? আমার ছোট ছেলে ইভান নাকি? বল শুনি রুশদেশের খবর? কুকুরেরা কি ডাকছে, নেকড়েরা গজরাচ্ছে, নাকি আমার বাছা কাঁদছে?”
  ইভান জবাব দিল: ‘আমি ইভান, বাবা, তোমার ছেলে। রুশদেশ বেশ শান্তিতে আছে।’
  বাপ তখন পেট ভরে রুটি খেয়ে বলল: ‘তুই একমাত্র আমার কথা শুনলি। পর পর তিন রাত্তির আমার কবর  আসতে একটুও ভয় পাসনি। এবার এক কাজ কর, খোলা মাঠে গিয়ে চীৎকার করে ডাকবি: “সিভকা-বুর্কা, যাদুকো লেড়কা, চেকনাই ঘোড়া, সামনে এসে দাঁড়া!” ঘোড়াটা তোর সামনে আসবে, তুই ওর ডান কান দিয়ে ঢুকে বাঁ কান দিয়ে বেরিয়ে আসিস। দেখবি তোর রুপ খুলে যাবে। তারপর ঘোড়ায় চেপে যথা ইচ্ছা তথা যাস।’
  বুড়ো বাবা ইভানকে একটা লাগাম দিল। ইভান লাগামটা নিয়ে বাবাকে ধন্যবাদ দিয়ে পথে পথে ব্যাঙের ছাতা কুড়িয়ে বাড়ী ফিরল। বাড়ী ফিরতেই ভাইয়েরা জিজ্ঞেস করল: “কিরে, বাবার সঙ্গে দেখা হল?’
  ইভান বলল, ‘হল’।
  ‘রুটি খেল?’
  ‘পেট পরে খেল। বললে কবরে আর আসতে হবে না।’
  এদিকে হয়েছে কি, রাজা তখন চারদিকে ঢে’ড়া পিটিয়ে দিয়েছেন — রাজ্যের যত রুপবান, আইবুড়ো, কুমারদের সব তাঁর রাজদরবারে উপস্থিত হওয়া চাই। রাজকন্যা লাবণ্যবতীর জন্যে ওক গাছের বারো খুটির ওপর, বারো কুঁদো দিয়ে এক কোঠা বানান হয়েছে। সেই কোঠার একেবারে ওপরে রাজকন্যা বসে থাকবেন, আর যে ঘোড়ার পিঠে বসে এক লাফে পৌঁছে রাজকন্যার ঠোঁটে চুম খেতে পারবে, রাজা তাকেই অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা লাবণ্যবতীকে দেবেন। তা সে যে ঘরের ছেলেই হোক।
  ইভানের ভাইয়েদের কানেও একথা পৌছতে দেরি হল না। বললে: ‘দেখা যাক ভাগ্য পরীক্ষা করে।’
  তেজী ঘোড়াদলটোকে ওরা বেশ করে যবের ছাতু খাওয়াল। তারপর নিজেরা ফিটফাট পোষাক পরে, বাবরি চুলটি অাঁচড়ে তৈরী হল। ইভান তখন চিমনির পেছনে চুল্লীর তাকে বসে। বলল: ‘আমাকেও সঙ্গে নিয়ে চলো না দাদা, আমিও একবার ভাগ্য পরীক্ষা করে আসি !’
  ‘দুর, হতভাগা, তুই বরং বনে ব্যাঙের ছাতা খুজে বেড়া গে যা, লোক হাসিয়ে দরকার নেই!’
  বড় দু’ভাই তেজী ঘোড়ায় চড়ে টুপি বাঁকিয়ে, চাবকে চালিয়ে, শিস দিতেই — একরাশ ধুলোর মেঘ আকাশে। ইভান তখন বাবার দেওয়া লাগামটা নিয়ে চলে গেল খোলা মাঠে। তারপর বাবার কথামত ডাকলে: ‘সিভকা-বুর্কা, যাদুকা লেড়কা, চেকনাই ঘোড়া, সামনে এসে দাঁড়া!”
  কোত্থেকে কে জানে, ছুটে এল ঘোড়া। তার খুরের দাপে মাটি কাঁপে, নাক দিয়ে আগুন ছোটে, কান দিয়ে ধোঁয়া বেরয়। মাটিতে পা গেঁথে বলে:
  ‘বলো, কী হুকুম!’
  ইভান ঘোড়াটার গলা চাপড়ে নিয়ে তাকে লাগাম পরাল, তারপর তার ডান কান দিয়ে ঢুকে, বাঁ কান দিয়ে বেরিয়ে এল। আর কী আশ্চর্য! অমনি সে হয়ে গেল এক সুন্দর তরণ – কী তার রূপ – সে রূপ বলার নয়, শোনার নয়, কলম দিয়ে লেখার নয়। ঘোড়ার পিঠে চড়ে রাজপুরীর দিকে রওনা হল ইভান। ছুটল ঘোড়া কদমে, কাঁপল মাটি সঘনে, পেরিয়ে গিরি কান্তার, মস্ত সেকি ঝাঁপ তার।
  ইভান এসে পৌছল রাজদরবারে, চারিদিক লোকে লোকারণ্য। বারো খুঁটির ওপর, বারো কুঁদো দিয়ে এক কোঠা। তার চিলেকোঠায় জানলার পাশে বসে আছে রাজকন্যা লাবণ্যবতী।
  রাজা অলিন্দে বেরিয়ে এসে বললেন: ‘তোমাদের মধ্যে যে তার ঘোড়ার পিঠে চড়ে লাফিয়ে উঠে আমার মেয়ের ঠোঁটে চুমু খেতে পারবে, তার সঙ্গেই আমার মেয়ের বিয়ে দেব, আর যৌতুক দেব অর্ধেক রাজত্ব।’
  কুমারেরা সবাই তখন এক এক করে এগিয়ে লাফাল, কিন্তু কোথায় কে, জানলার নাগাল কেউ ধরতে পারল না। ইভানের দুই ভাইও চেষ্টা করলে, কিন্তু অর্ধেকটা পর্যন্ত গেল না। এবার এল ইভানের পালা।
  সিভকা-বুর্কাকে সে কদমে ছুটিয়ে হাঁক পেড়ে, ডাক ছেড়ে লাফ মারলে। কেবল দুটো কুঁদো বাদে সব কুঁদো সে ছাড়িয়ে গেল। ফের আবার ঘোড়া ছুটাল সে । এবারকার লাফে বাকি রইল একটা কুঁদো। ফের ফিরল ইভান, পাক খাওয়ালে ঘোড়াকে, গরম করে তুললে। তারপর আগুনের হলকার মতো এক প্রচণ্ড লাফে জানলা পেরিয়ে রাজকন্যা লাবণ্যবতীর মধুঢালা ঠোঁটে চুম খেয়ে গেল ইভান। আর রাজকন্যাও তার হাতের আংটি দিয়ে ইভানের কপালে ছাপ এঁকে দিল ।
  লোকজনেরা সব ধরো, ধরো!’ করে চেঁচিয়ে উঠল।
  কিন্তু ইভান ততক্ষণে উধাও।
  সিভকা-বুর্কাকে ছটিয়ে ইভান এল সেই খোলা মাঠে। তারপর ঘোড়ার বাঁ কান বেয়ে উঠে ডান দিয়ে বেরিয়ে এল, আর অমনি সে ফের হয়ে গেল সেই বোকা ইভান। সিভকা-বুর্কাকে ছেড়ে দিয়ে সে রওনা হল বাড়ীর দিকে। যেতে যেতে ব্যাঙের ছাতা কুড়িয়ে নিলে। বাড়ী এসে ন্যাকড়া দিয়ে কপালটা বেঁধে চুল্লীর উপরের তাকে উঠে শুয়ে রইল।
  ভাইয়েরাও যথা সময়ে ফিরে এসে বলতে লাগল, কোথায় গিয়েছিল, কী দেখল।
  ‘খাসা খাসা সব জোয়ান, একজন কিন্তু সবার সেরা। ঘোড়ার পিঠে চড়ে এক লাফে উঠে রাজকন্যার ঠোঁটে চুম খেয়ে গেছে। দেখলাম কোথেকে এল, দেখা গেল না কোথায় গেল।”
  চিমনির পিছন থেকে ইভান বলে: ‘আমি নই তো?’
  ভাইয়েরা সে কথা শুনে ভীষণ চটে গেল: বাজে বকিস না, হাঁদা কোথাকার! তার চেয়ে চুল্লীর উপর বসে বসে ব্যাঙের ছাতা গেল।”
  ইভান তখন কপালের পটিটা খুলে ফেলল, যেখানে রাজকন্যা ছাপ মেরেছিল আংটি দিয়ে। সঙ্গে সঙ্গেই কুঁড়েঘরটা আলোয় আলোয় ভরে গেল। ভাইয়েরা ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল: ‘কী, করছিস কী, হাঁদা কোথাকার! ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দিবি যে!”
  পরদিন রাজবাড়ীতে বিরাট ভোজ। পাত্র,মিত্র, জমিদার প্রজা, ধনী গরীব, বুড়ো বাচ্চা – সকলের নেমন্তন্ন।
  ইভানের ভাই দুজনও ভোজে খেতে যাবে বলে তৈরী। ইভান বলল:‘দাদা, আমাকেও তোমাদের সঙ্গে নিয়ে চলো!”
  ‘কী বললি? তোকে নিয়ে যাব? লোকে হাসবে। তার চেয়ে তুই এখানে চুল্লীর উপরে বসে বসে ব্যাঙের ছাতা গেল।’
  দু’ভাই তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে রাজবাড়ীর দিকে চলে গেল। আর পায়ে হেঁটে ইভান গেল ওদের পেছন পেছন। রাজপুরীতে পৌছে দূরে এককোণে বসে রইল ইভান। রাজকন্যা লাবণ্যবতী তখন নিমন্ত্রিতদের প্রদক্ষিণ করতে সুরু করেছে। হাতে তার মধু পাত্র। তা থেকে সে এক এক জনকে মধু ঢেলে দেয় আর দেখে কপালে তার আংটির ছাপ আছে কিনা।
  সকলকে প্রদক্ষিণ করে এল রাজকন্যা, বাদ রইল কেবল ইভান। ইভানের দিকে রাজকন্যা যত এগোয় তত তার বুক দুরদুর করে। ইভানের সারা গায়ে কালি, মাথায় খোঁচা খোঁচা চুল।
  রাজকন্যা লাবণ্যবতী জিজ্ঞেস করে: ‘কে তুমি? কোথা থেকে এসেছো? কপালে তোমার পটি বাঁধা কেন? 
  ইভান বলল, ‘পড়ে গিয়ে কেটে গেছে।’ 
  রাজকন্যা পটি খুলে ফেলতেই সারা রাজপুরী আলোয় আলোয় ভরে গেল। রাজকন্যা চেঁচিয়ে উঠল:
  ‘এ তো আমারই ছাপ, একেই তো আমি বরণ করেছি।’ 
  রাজামশাই কাছে এসে বলেন: ‘কী যতো বাজে কথা, এ যে একেবারে কালিঝুলি মাখা এক হাঁদা!’
  ইভান রাজাকে বললে: ‘রাজামশাই, অনুমতি দিন একবার মুখ ধুয়ে আসি।’
  রাজামশাই অনুমতি দিলেন। ইভান উঠোনে গিয়ে বাবার কথামত হাঁক দিল: ‘সিভকা-বুর্কা, যাদুকা লেড়কা, চেকনাই ঘোড়া, সামনে এসে দাঁড়া !
  অমনি কোত্থেকে কে জানে, ছুটে এল ঘোড়া। তার খুরের দাপে মাটি কাঁপে, নাক দিয়ে আগুন ছোটে, কান দিয়ে ধোঁয়া বেরয়। ইভান তার ডান কান দিয়ে ঢুকে, বাঁ কান দিয়ে বেরিয়ে এল, আর অমনি সে হয়ে গেল সেই রূপবান তরুণ – সে রুপ বলার নয়, শোনার নয়, কলম দিয়ে লেখার নয়। সব লোকে একেবারে আহামরি করে উঠল।
  অমনি সব কথা মিটে গেল, বিয়ের ভোজ চলল ধুমধাম করে।

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
1 মন্তব্য
avatar

দারুণ লাগলো গল্পটা। ধন্যবাদ এত ভাল কালেকশন এর জন্য। ❤❤❤

Balas