রতনদিয়ার ভূত - হিমানীশ গোস্বামী

      এই ঘটনাটা ষাট বছরেরও আগে ঘটেছিল—এখন এর অনেকটাই ভুলে গেছি। যেটুকু মনে আছে বলছি।
      আমরা যখন গ্রামে থাকতাম তখন আমাদের রাজ্যটি এত ছোট ছিল না। এখন থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে এক বাংলা দুটি বাংলা হয়ে যায়। আমাদের বাড়ি ছিল পূর্ববঙ্গের একটি ছোট গ্রামে। গ্রাম ছোট হলে হবে কি তখন ছোট ছোট গ্রামেই হাজারে হাজারে ভূত বাস করত।
      আমাদের গ্রামের নাম ছিল রতনদিয়া। ঐ গ্রামে ভূতদের দমিয়ে রাখার জন্য অন্তত বারোজন গুণিন ছিলেন। ফলে ভূত প্রচুর থাকলেও তারা অত্যাচার করতে ভয় পেত। গুণিনরা দুষ্টু আর বদমাইশ ভূতদের কঠোর শাস্তি দিতেন—কোনও কোনও গুণিন ভূতদের ঝি-চাকর-দারোয়ান করে রাখতেন। খুব লজ্জার কথা হলেও দু’একজন গুণিন পেত্নিদের দিয়ে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করানোর কাজ করাতেন। এছাড়া রান্নার কাজও করিয়ে নিতেন। এটা গুণিনদের করার কথা নয়। যাই হোক এক একজন ছোট গুণিন ষোলটা করে ভূত-পেত্নিকে বেগার খাটাতে পারতেন। আরও বড় বড় গুণিনরা কেউ বত্ৰিশ কেউ চৌষট্টিটা করে ভূত রাখতেন বেগার খাটানোর জন্য। হিন্দু-মুসলমান দুরকম ভূতই গ্রামের বাইরে একটা পোড়ো বাড়ির দখল নিয়ে থাকত। শোনা যায় এই ভূতদের মধ্যে দুজন খ্রিস্টান সাহেব ডাক্তার ভূতও ছিল! মোটামুটি ব্যাপারটা এই যে ভূত বেশি থাকলেও গুণিনদের ভয়ে তারা সভ্যভব্য হয়েই থাকত। আমরাও নিশ্চিন্ত মনে গ্রামে থাকতাম। প্রচুর ভূত আশেপাশে থাকলেও আমরা ভয়ংকর ভূতদের পাল্লায় কখনও পড়িনি।
      ভয়টা কিন্তু ছিলই। তাছাড়া সব ভূত সব সময়েই যে শান্তশিষ্ট হয়ে থাকত তাও নয়। আমাদের গ্রামের এক জামাইকে পইপই করে বলা হয়েছিল সে যেন কক্ষনো রাতের গাড়িতে গ্রামে না আসে। সে জামাই ছিল বেপরোয়া, নাম শ্রীকান্ত চাটুজ্জে, বয়স পঁচিশ, বিজ্ঞান পড়ে পড়ে তার ধারণা হয়েছে ভূত মানুষের মনের সৃষ্টি, ভূত বলে কিছু নেই। তা যেহেতু তাকে বারণ করা হয়েছে রাতের ট্রেনে গ্রামে না আসতে, আসলেও যেন আগে সে খবর দেয় সেই জন্যই শ্রীকান্ত খবর না দিয়ে রাতের ট্রেনেই কলকাতা থেকে কালুখালি রেল স্টেশনে নেমে বেশি সাহস দেখানোর জন্য একাই ছোট সুটকেস একটা ঘাড়ে করে টর্চ জ্বালাতে জ্বালাতে গ্রামের পথ ধরে শ্বশুরবাড়ি চন্দনা নদীর ধারে রামহরি মুখুজ্জের বাড়িতে যাচ্ছিল। রাতটা ছিল আবার অমাবস্যা। অমাবস্যার রাতে ভূতেদের মন কি রকম যেন চনমনে হয়ে যায়। তখন তাদের কালো রক্তে ইয়ার্কি-ফাজলামো করার একটা প্রবণতা হয়। এমনিতে ভালোমানুষ ভূত অমাবস্যার রাত্রে হঠাৎ হয়তো হেসে উঠল খ্যাঁ খ্যাঁ করে। সম্পূর্ণ অকারণ হাসি। কোনও দরকার নেই তবু হাসি! অথবা ইনিয়ে-বিনিয়ে কান্না—যেন কেউ ভীষণ মেরেছে কাউকে। কখনও কুকুরের ডাক, কখনও শেয়ালের ডাক, কখনও ফেউয়ের ডাক। তাছাড়া খটাস বলে একরকম বেড়াল জাতের প্রাণী ছিল, ভীষণ হিংস্র, আর ছিল বাঘডাঁশা! বাঘডাঁশাও এক ধরনের বুনো বেড়াল, অনেকটা বাঘের মতো দেখতে—ভূতেরা বাঘডাঁশার ডাকও ভারী চমৎকার নকল করতে পারত। এ হচ্ছে ভূতদের একরকমের ইয়ার্কি। ডাকলে ভীতু মানুষেরা ভয় পায়, সাহসী মানুষরাও চমকে ওঠে, ছোটরা কেঁদে বাড়ি মাথায় করে, এতেই ভূতেদের আনন্দ! কোনও কোনও বাচ্চা ভয়ে না চেঁচিয়ে চুপ মেরে যায়, তাতে ভূতেরা ভারী রাগ করে। ঐ সব বাড়িতে ভূতেরা ঢিল ছোড়ে।
      ঢ়িল ছুঁড়লে আর সেই সঙ্গে হাউ মাউ খাউ করলে যে-সব বাচ্চা ফুপিয়ে কাঁদে তারা পর্যন্ত গাঁ গাঁ করে চিৎকার করে। অন্য সব রাত্রে ভূতেরা গুণিনদের ভয়ে বিশেষ গোলমাল করে না, কিন্তু অমাবস্যার রাতগুলোতে ভূতদের আড্ডা ইয়ার্কির খানিকটা অনুমতি দেওয়া হয়। এটা ভূতদের অভিভাবক যারা, যেমন ব্রহ্মদৈত্য এবং বড় বংশের ভূত-পেত্নি এরাও মেনে চলেন। ফলে বিচ্ছিরি রকম কাণ্ড বিশেষ ঘটে না।
      যেদিনকার কথা বলছি সে দিনটা ছিল অন্যরকম। দিন না বলে রাত্তির বলাই ভালো। দিনের বেলা ভূতেরা ঘুমোয়, আবার কেউ কেউ দিনের বেলায় মানুষ সেজে গেরস্ত বাড়িতে কাজকর্ম করে কিছু উপরি রোজগারও করত বলে আমি শুনেছি। যাই হোক আমি যা বলছি সে সব সত্যিই আমাদের গ্রামেই ঘটেছিল, তবে আমি নিজের চোখে কিছুই দেখতে পাইনি। যখন ব্যাপারটা ঘটেছিল তখন আমি এমন ঘুমে অচেতন হয়ে ছিলাম যে কিছুই বুঝতে পারিনি। পরে সব শুনেছি। রাত্রেও অনেক নাকি হৈচৈ গোলমাল হয়েছিল, কিছু গোলমাল করেছিল ভূতে, কিছু আবার মানুষে! একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি যে রাতের কথা বলছি সেটা ছিল একটা বিশেষ রাত। ঐ রাতের তিনদিন আগে থেকেই গ্রামের যত গুণিন ছিলেন তারা চার-পাঁচ দিনের জন্য সারা বাংলা গুণিন সমাবেশে
ছিল মহা আনন্দের দিন। বড় বড় অভিভাবক শ্রেণির ভূত, ব্রহ্মদৈত্য এমনকি মামদোরা পর্যন্ত ভূতদের ইয়ার্কি-ফাজলামো একদম পছন্দ করেন না, তাই তারাও খুব উদ্বিগ্ন এই রাতে কি হয় ভেবে। তারা সব যে-যার নিজেদের বাড়ির ভূত ছানাদের আর যুবক ভূতদের সাবধানও করে দিয়েছিলেন যেন সবাই শান্তশিষ্ট থাকে, বেশি ঝামেলা না করে। বিশেষ করে যে-সব ভূত গুণিনদের বেগার খাটে, তাদের মেজাজ এমন তিরিক্ষে যে তাদের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলাও সম্ভব নয়। ইয়ার্কি-ফাজলামোয় তারাই ছিল সবিশেষ পটু।
      যেদিনকার কথা বলছি, সেদিন বড় ভূতেরাও একটা মেলায় গিয়েছিলেন, ফলে ছোট ভূতদের সেদিন হয়েছিল ডবল মজা।
      সন্ধের ট্রেনে গ্রামের শেষ গুণিন গ্রাম ছেড়ে চলে গেলেন শেয়ালদার গাড়িতে চড়ে উত্তরপাড়ার পথে, আর বেগার-খাটা ভূতের দল যেন একেবারে খেপে গেল। তারা সন্ধে থেকেই শুরু করল তাদের নানারকম তাণ্ডব। তারা হা হা হা হা করে কতরকম হাসল আর চিৎকার করল, বাড়িতে বাড়িতে ঢ়িল ছুড়ল—কিন্তু গ্রামের লোকেরাও খুব সাবধান হয়ে রইল। একটুও ভয় না পেয়ে তারা গুণিনদের দেওয়া নতুন পান পাতা তাতে রক্তচন্দনে রাম রাম লেখা, সঙ্গে ঘি মাখানো সলতে দিয়ে বাড়ির চারদিকে সাজিয়ে রেখেছিল বলে ভূতেরা কেউ বাড়িতে ঢুকতে পারল না। ভূতেরা এইসব দেখে রাগে গাঁ গাঁ করতে লাগল, বিচ্ছিরি রকম সব গালাগাল করতে লাগল মানুষের মতো গলায়, চন্দ্রবিন্দু ছাড়া উচ্চারণ করতে লাগল যাতে মানুষেরা রেগে গিয়ে বাড়ির সীমানার বাইরে চলে আসে, তাহলে ভারী ফুর্তি করা যায় তাদের নিয়ে। কিন্তু গুণিনরা সব কথা আগেই গ্রামের সকলকে বলে যাওয়ায় একটা মানুষও বাইরে বেরল না। এতে কার না রাগ হয়! ভূত বলে কি ওদের অনুভূতি নেই? ওদের মধ্যে যারা অণুভূত তারা গেল সবচেয়ে চটে! অণুভূত কি বুঝতে পারলে? একটু ভাবলেই বুঝতে পারবে অণুভূত অর্থাৎ ছোট ভূত। অণু মানে ছোট। কেউ কেউ অবশ্য উপভূতও বলেন ওদের।
      রাত্তির তখন একটা হয়ে গেছে অথচ একটা মানুষ হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে না, এটা তাদের কাছে খুব দুঃখের ব্যাপার বলে মনে হল। তারা মনের দুঃখে রাস্তার উপর নর্দমা থেকে গাদা গাদা কাদা নিয়ে এসে ছুঁড়তে লাগল এদিকে-ওদিকে, এর বাড়ি তার বাড়ি। লোকেরা ভয়ে দরজা-জানলা বন্ধ করে রইল। ভূতেরা দারুণ চিৎকার করে গান গাইতে লাগল—
      একবার বেরিয়ে আয় না বাবুরা তোদের খাই, বিবিরা আয় না বাইরে আমরা তোদের ভাই। সকলে ভয়ে দরজা-জানালা আর খোলে না, গরমে অস্থির হয়। ছোটরা ভয় পেয়ে কেঁদে ওঠে, আর তাই শুনে ভূতদের বাঁদরামি আরও বাড়তে থাকে। কিন্তু ওদের তাতে সুখ নেই। মানুষদের ধরে নানারকম বীভৎস কাণ্ডকারখানা না করলে অণুভূত, মানে ছোট ভূতদের ফুর্তি ঠিক জমে না। তা তারা আস্ত মানুষ হাতে না পেয়ে বড়ই কষ্টে ছিল, এমন সময় রাতের ট্রেনটা কালুখালি স্টেশনে এসে থামল আর জনা বারো লোক ট্রেন থেকে নেমে যে যার বাড়ির দিকে চলল। ভূতের দল লক্ষ করল ওদের মধ্যে সকলেই চেনা লোক, অনেকেই ভূতেদের কেউ কাকু, কেউ বা পিসেমশাই। ওদের ভয় দেখিয়েও অত সুখ নেই। একজন অপরিচিত লোক পেলে তাদের সবচেয়ে ভালো লাগে। এমন সময় দেখা গেল শ্রীকান্ত চাটুজ্জে হাতে সুটকেস—কখনো কাঁধে তুলে নিচ্ছে, অন্য হাতে টর্চ জ্বেলে দিব্যি হনহনিয়ে আসছে!
      হঠাৎ দেখা গেল শ্ৰীকান্ত চাটুজ্জের হাতের টর্চটা তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল অন্তত দশ মিটার। আবার টর্চটা বাই করে বেঁকে গিয়ে রাস্তার ধারের একটা তালগাছে ক্রমাগত পাক খেতে লাগল। এই অসম্ভব কাণ্ড এত অকস্মাৎ ঘটে গেল যে শ্রীকান্ত প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেল! তারপর মনটাকে একটু সুস্থির করার চেষ্টা করল। মনে মনে ভাবল এর নিশ্চয় একটা সঙ্গত কারণ আছে। জগতে তো অসম্ভব কত কাণ্ডই ঘটে, কিন্তু সেগুলোর কোনো না কোনো ব্যাখ্যা আছে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। যেখানে চট করে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না সেখানে আরও ভালো করে দেখতে হয়। অলৌকিক বলে তো কিছু হয় না। যা হয় তা আপাতদৃষ্টিতে যতই আজগুবি এবং অস্বাভাবিক মনে হোক না কেন কোনোটাই অলৌকিক নন। ভাবতে ভাবতে টর্চটা উঠে গেল তালগাছটার মাথায়, সেখানে কিছুক্ষণ ঘুরপাক খেয়ে শো করে নীচে নেমে এসে রাস্তার উপর ধেই ধেই নাচতে লাগল।
      নাঃ, এর তো কোনও মাথামুণ্ডু বোঝা যাচ্ছে না। শ্রীকান্ত চাটুজ্জের মনটা দুর্বল হতে শুরু করেছে। হঠাৎ তার কানের কাছে স্পষ্ট একটা খোনা খোনা কণ্ঠস্বর শুনতে পেল—

ওরে শ্রীকান্ত এই ভবে ক
ত অন্ধকার সে কে কবে
জমাট কালোর রাজ্যে আমরা
তুলে নেব তোর গায়ের চামড়া!! 

      তারপর খিঁ খিঁ করা হাসি। সে হাসি শুনলে হৃদপিণ্ডের ক্রিয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়! শ্রীকান্ত কিন্তু সামলে নিল। কিন্তু তারপর ফের শুরু হল আর এক বিচ্ছিরি করাতচেরা কষ্ঠের গান—

শ্বশুরবাড়িতে তুই এসেছিস রে চাটুজ্জে শ্রীকান্ত 
জামাই অাদরে রাখব তোকে একখান গান গা তো! 

      শ্ৰীকান্ত নিজেও মাঝে মাঝে কবিতা লিখে থাকে, সে দেখল একবার বলছে তুই এসেছিস’ আবার বলছে ‘গান তোঁ! এর সংশোধন দরকার। শ্ৰীকান্ত নিজে এই অদ্ভুত অবস্থাতেও মাথা ঠান্ডা রেখে গাইল—

ওরে তোরা সব অশিক্ষিত, নেই কো তোদের শিক্ষা 
গান বানানো নয়কো সহজ নিতে হবে যে রে দীক্ষা! 

      এবারে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। খানিকক্ষণ সব চুপ। এদিকে ঝিঁঝিঁর দল ডাকছে, দূরে ব্যাঙেরাও ঘ্যাঁ ঘ্যাঁ করছে। প্যাঁচারাও সুযোগ বুঝে বেশ মজাসে গান গাইছে। সে কি গান—কানের পোকারাও পর্যন্ত কান থেকে বেরিয়ে এসে কাঁধের উপর বসে নাচতে শুরু করেছে! এ তো এক মহা মুশকিল হল!
      শ্ৰীকান্ত কিন্তু ভয় পেল না। সে দৃঢ়ভাবে নিজের মনকে শক্ত করে রাখল। কিন্তু একটু পরেই ভূতেদের দল ওর হাত থেকে ছোট সুটকেসটা নিয়ে তার ডালাটা খুলে ফেলল। অন্ধকারেও শ্রীকান্ত বুঝতে পারল সুটকেস খুলে তছনছ করছে কারা! সে এও বুঝতে পারল তার শ্বশুরবাড়ির জন্য অনেক কষ্টে সংগ্রহ করা বিখ্যাত এক মিষ্টিওলার কাছ থেকে আনা কড়াপাকের সন্দেশগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তার জামা-টামা টুথপেস্ট টুথব্রাশ দাঁড়ি কামানোর সরঞ্জাম তোয়ালে এসবও সব ছত্ৰখান হয়ে গেল। শ্রীকান্ত ভাবল এমন তো হওয়ার কথা নয়, সে নিশ্চয় স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্নে তো কত রকম বিদকুটে জিনিস দেখা যায়, এ বোধহয় সেই রকম একটা কিছু হবে। কিন্তু সবটা স্বপ্ন নয়। সে বেশ বুঝতে পারল কিছু একটা ব্যাপার ঘটছে যা স্বাভাবিক নয়।
      এরপরে চারদিকে কচমচ খচমচ আওয়াজ হতে লাগল। সর্বনাশ! মনে হল যেন কড়াপাকের সন্দেশগুলো কেউ কচর-মচর করে খাচ্ছে। এদিকে তার টর্চটা যেটা এতক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরছিল সেটাও স্থির হয়ে পড়ে আছে রাস্তায়। সে আলোতে কতই বা দেখা যায় কিন্তু তবু ঐটুকু আলোতেই সে দেখল তার সুটকেস খোলা, আর তার সব জিনিস কোথায় যে সব হাওয়া হয়ে গেছে!
      তার কান্না পেতে লাগল। সে ভয়ংকরভাবে চিৎকার করে উঠল, ডাকাত ডাকাত! কিন্তু তার চিৎকার করাই সার হল। কে আসবে তাকে সাহায্য করতে? রতনদিয়া গ্রাম তখন চ্যাংড়া ভূতেদের কজ্জায়। ভূতেদের তখন সন্দেশ খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। তারা বলল—
      
ডাকাত তুই কাকে বলছিস ধূর্ত
মজাটা দেখবি হয়ে উঠি যদি মূর্ত। 
এলি কেথা থেকে কোন দেশ থেকে কোন দেশে 
খুশি হনু মোরা তোর আনা কড়াপাক সন্দেশে। 
মারিব না তোরে ধরিব না তোরে কেবল তুলিব শূন্যে 
ধপাস করিয়া ফেলিব মাটিতে মরিবি বাপের পুণ্যে! 

      ওরে বাবা! এ যে সত্যি তাকে কারা যেন ধরে শূন্যে লোফালুফি খেলতে লাগল। সে একবার কাদের ঠান্ডা হাতে পড়ে যায়, আবার অন্য কারা ঠান্ডা হাতে লুফে নেয়। এ তো সাংঘাতিক খেলা এদের। ভূত তা হলে সত্যি আছে—সত্যি আছে! সে ভয়ে চিৎকার করতে লাগল আর বলতে লাগল, বাঁচাও বাঁচাও! ওরে বাবারে মরে গেলাম রে, মেরে ফেলল রে, বাঁচাও বাঁচাও !
      এইরকম কতক্ষণ চলল সে শ্ৰীকাস্তের খেয়াল নেই। হঠাৎ একসময় তার মনে হল ভূতেদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিল। তারা তাকে প্রায় আকাশসমান উঁচু থেকে ছেড়ে দিল, আর শ্রীকান্ত মাটিতে পড়তে লাগল। এবার আর রক্ষা নেই। শ্রীকান্ত এত বিপদেও রামনাম করেনি। করলেও কী হত কে জানে, আজকালকার ছোকরা ভূতেরা রামনামের তোয়াক্কা করে না।
      শ্ৰীকান্ত পড়তে লাগল—এর মধ্যে সে শুনতে পেল ইংরিজিতে কারা সব কথা বলছে। তাদেরও নাকি-সুর! বুঝতে না বুঝতে সে মাটির উপর আছড়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল তার হাড়টাড় সব ভেঙে গেল। পরে তার আর জ্ঞানই রইল না।
      একটু একটু জ্ঞান হলে সে দেখতে পেল সে একটা চমৎকার ঘরে শুয়ে আছে। আশেপাশে অনেকগুলো খাট। প্রত্যেক খাটের উপর গদির বিছানা। শ্রীকান্ত বুঝল সে কোনো হাসপাতালে শুয়ে আছে। ভালো হাসপাতাল। শ্রীকান্ত এ-রকম হাসপাতাল দেখেছে। সে দেখতে পেল সাদা রঙের ইউনিফর্ম পরা নার্সরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা আবার মেমসাহেব! শ্ৰীকান্ত একটুখানি নড়াচড়া করতেই একটি নার্স এসে বলল, গুড মনিং সার! শ্রীকান্ত ইংরেজি জানত মোটামুটি। সে বলল, গুড মনিং মিস। এমন সময় একজন মোটাসোটা লম্বা চেহারার সাহেব ডাক্তার এসে তার কাছে একটা ছোট টুল নিয়ে বসলেন। বললেন, কেমন বোধ করছ? শ্রীকান্ত বলল, ভালোই তো মনে হচ্ছে তবে গায়ে বেশ ব্যথা, মাথাতেও ব্যথা খুব। ডাক্তার বললেন, একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। তুমি কোন দেশের লোক, তোমাকে কারা মেরেছিল? শ্রীকান্ত বলল, কোন দেশের লোক মানে? আমি এদেশেরই লোক! ডাক্তার বললেন, এদেশের কোথায় তোমার বাড়ি? শ্রীকান্ত বলল, কলকাতা আমার বাসস্থান। ডাক্তার বললেন, এই দেশটা হচ্ছে ইংল্যান্ড। তুমি লন্ডনের চেয়ারিং ক্রস হাসপাতালে রয়েছ। তাছাড়া অনেকগুলো অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছে। কেউ তোমার নাম জানে না কিছু না, তোমাকে কেউ ভর্তি করায়নি এই হাসপাতালে! একদিন রাত্রে হঠাৎ তোমাকে এই বিছানায় দেখে সকলে অবাক হয়ে যায়। সেও আজ প্রায় দশ দিন হয়ে গেল। তোমার জ্ঞান ছিল না। তোমার হাড়টাড় সব ভাঙা ছিল, কিন্তু কারা সব জোড়া দিয়েছিল, তারপর তারা এখানে এনে ফেলে গিয়েছিল। এই কাজ কারা করেছিল তুমি জান?
      শ্ৰীকান্তর এবার মাথাটা ঘুরে উঠল। এ কি কথা—সে এখন লন্ডনের চেয়ারিং ক্রস হাসপাতালে? অসম্ভব! অসম্ভব! সে আর ভাবতে পারল না, কেমন যেন আচ্ছন্নের মতো হয়ে রইল। সাহেব ডাক্তার বললেন, না, এর সঙ্গে অত কথা বলা বোধহয় ঠিক হয়নি, পরে ভালো করে ভেবে-চিন্তে কথা বলতে হবে। কলকাতার লোক বলছে এ। নামটাও তো জানা যাচ্ছে না, তাহলে কলকাতায় একটা খবর পাঠিয়ে দেওয়া যেত। যাই হোক, এরপর ওর জ্ঞান হলে ওর নাম আর ঠিকানাটা জোগাড় করতে হবে। ডাক্তার নার্সকে কথাগুলো বলে ভ্রু কুঁচকে কি ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে গেলেন।
      শ্ৰীকান্তকে চেয়ারিং ক্রস হাসপাতালের রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট করা খালি একটা খাটে পড়ে থাকতে দেখেন নাইট ডিউটির একজন সিনিয়র নার্স রোগীর না ছিল পরিচয়, না ছিল কোনও রিপোর্ট। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন বোধহয় কোনও ইন্ডিয়ান উটকো লোক, থাকবার জায়গার অভাবে লুকিয়ে হাসপাতালে ঢুকেছে। পরে পরীক্ষা করে দেখেন লোকটির সারা গায়ে নানারকম আঘাতের চিহ্ন। লোকটি সম্পূর্ণ অজ্ঞান। তারপর নানা কৌশলে তার এক্স-রে করে দেখা যায় তার অসংখ্য হাড় ভাঙা, তবে সেগুলো সেট করা হয়েছে ঠিক ভাবেই। এটা ভারী আশ্চর্যজনক ব্যাপার বলে তাদের মনে হয়। চামড়া না কেটে, বাইরে থেকে এমন ভাবে হাড় জোড়া দেওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। বিশেষ করে যে-সব হাড় ভেঙে ছোট ছোট টুকরো হয়ে গেছে সেগুলোকে বাইরে থেকে সেট করা যায় না। এই নিয়ে চারদিকে হৈচৈ পড়ে যায়।
      শ্রীকান্তকে বিশেষ রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং তার জন্য একটা মেডিক্যাল টিমও গঠন করা হয়। অনেক বড় বড় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শের পর যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় তাতে সে দ্রুত সেরে উঠতে থাকে। দুদিন আগে তাকে অজ্ঞান অবস্থাতেই দাঁড় করানোও হয়। খবরের কাগজের লোকেরাও এই বিস্ময়কর রোগীকে নিয়ে যথেষ্ট কৌতুহল দেখায়। কিন্তু লোকটির পরিচয় কেউই বার করতে পারে না। কলকাতায় বাড়ি এটা শুনে কলকাতায় খোঁজও করেছিল পুলিশ, কিন্তু পুলিশ ওপর ওপর খোঁজখবর নিয়ে জানিয়েছিল তারা ঠিক ধরতে পারছে না। লোকটির নাম জানলেও একটা চেষ্টা করা যেত। কলকাতা থেকে রোজ কম লোক তো নিরুদ্দেশ হয় না।
      এরপর চলতে লাগল অপেক্ষা আর চিকিৎসা। আস্তে আস্তে শ্ৰীকান্ত প্রায় সম্পূর্ণই সুস্থ হয়ে উঠল। কিন্তু অসুবিধে তারও ছিল। সে তার নিজের নামটাই আর মনে আনতে পারল না! সে কেবল বলত আমার বাড়ি কলকাতা, বাস! এইভাবে চলল আরও দু'মাস। রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ। এক্সরে করে দেখা হয়েছে তার হাড়গুলো সবই বেমালুম জুড়ে গেছে! চামড়ায় যে সব কাটাছেড়ার দাগ ছিল সেগুলো মেলাল না তবে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেল।
      এখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সমস্যা হল একজন সুস্থ-সবল লোককে কোথায় পাঠানো হবে। হাসপাতালে রাখা চলবে না একেবারেই। সুস্থ লোককে হাসপাতালে রাখা যায় না। মানসিক রোগের হাসপাতালে পাঠানো হয়তো যায়, তার স্মৃতিশক্তি ফেরানোর চেষ্টা করা যায়। শ্ৰীকান্ত নিজেও কেমন যেন হয়ে পড়ল। তার নাম কি সে নিজেই জানে না! সে কেবল জানে তার বাড়ি কলকাতা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশেষে স্থির করলেন ওকে জাহাজে করে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সেখানে ওকে নিয়ে গাড়িতে করে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় পাড়ায় পাড়ায় ঘুরিয়ে আনলে তার হয়তো স্মৃতি ফিরে আসতেও পারে। অনেক টাকারও দরকার। সে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে—সব ব্যবস্থা পাকা ।
      যে দিন সকালের ট্রেনে টিলবেরি ডকে যাওয়ার কথা, সঙ্গে একজন যাবে তার সঙ্গে, তার আগের রাত্রে হল এক অদ্ভুত কাণ্ড। হঠাৎ রাত দুটাে নাগাদ কর্তব্যরত নার্স শ্ৰীকান্তর বেডে এসে দেখল রোগী উধাও! খোঁজ খোঁজ! রোগী কোথাও নেই। ভারী আশ্চর্য ব্যাপার। হাসপাতালের দরজা বন্ধ, মেইন গেট বন্ধ, রোগী গেল কোথায়? চাঞ্চল্য পড়ে গেল চারদিকে। পুলিশ নানা সম্ভাব্য এবং অসম্ভাব্য অনেক জায়গা খুঁজেও তার চিহ্ন পেল না!
      রতনদিয়ায় একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটল এরপরেই। শ্রীকান্তকে পাওয়া গেল তার শ্বশুরবাড়ির একটা ঘরের মধ্যে ভোরবেলায় ঘুমন্ত অবস্থায়। শ্রীকান্তকে ওখানে ঐ ভাবে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে ফের চাঞ্চল্য! সমস্ত গ্রাম দেখতে এল শ্রীকান্তকে। কালুখালি স্টেশন থেকে তাকে নামতে দেখেছে কয়েকজন সেই তিন মাস আগের বিচ্ছিরি ঐ রাত্রে! তারপর পাওয়া গেছে তার ভাঙা সুটকেস, আর ছড়ানো সব জিনিসপত্র। রক্তের ছাপ। ধস্তাধস্তির চিহ্ন। কেবল মানুষটাই হয়ে গেল নিরুদ্দেশ। সর্বত্র নেমে এসেছিল শোকের কুয়াশা! তারপর দিনের পর দিন গেল অথচ শ্ৰীকান্তর হদিস পাওয়া গেল না তখন সকলে ধরেই নিল শ্ৰীকান্তকে ভূতে খেয়েছে! কেননা সে রাত্রে ভূতেদের নানা চিৎকার আর হল্লা শোনা গিয়েছিল, ভূতদের বিচ্ছিরি সব ছড়াও শুনেছিলেন বহু মানুষ। গুণিনরা ফিরে এসে গ্রামের সব ভূতদের জেরা করেও কোনো সদুত্তর পাননি। সকলে একবাক্যে বলেছে, জানি না—
      একটা সত্যি কথা ছোট ভূতেরা সকলে বলেছে, তারা শ্ৰীকান্তকে দেখেছে কিন্তু তাকে কেউ মারেনি। এটা হতেই পারে তারা কেবল তাকে নিয়ে একটু লোফালুফি করেছিল, মারেনি। কিল না ঘুষি না লাঠির আঘাত না, কেবল উঁচু থেকে একবার ধপ করে ফেলে দিয়েছিল। সেটাকে মারা বলা যায় কি? তাছাড়া একটা ব্যাপার তারাও বুঝতে পারেনি, হঠাৎ কোত্থেকে একদল সাদা ধরনের ভূত (সঙ্গে একটু যেন নীল নীল ভাব) এসে মস্তানি করে তাদের হঠিয়ে দিয়েছিল আর মানুষটাকে কোথায় হাওয়া করে দিয়েছিল কেমন করে। ছোকরা ভূতদের ধারণ ঐ অদ্ভুত ভূতেরা লোকটিকে পুরোপুরি খেয়ে নিয়েছে। কিন্তু সে-কথা তারা কাউকে বলেনি।
      বড় ভূতেরা ছোকরা ভূতদের আর বেশি ঘাটাননি। বড় বড় ভূতরাও সেদিন গ্রামে ছিলেন না। সে জন্য ছোকরা ভূতদের জঘন্য সব কীর্তিকলাপ দেখতে পাননি। পরে আন্দাজ করেছিলেন কিন্তু এ নিয়ে বেশি কিছু ঘাটাননি।
      এদিকে আর একটা ব্যাপার ঘটেছিল—শ্ৰীকান্ত চাটুজ্জের সব ঘটনা প্রকাশ হবার পর তাকে নানাভাবে সম্মানিত করা হয়। ওর শ্বশুরবাড়িতে একটা বড় উৎসব হয় গ্রামের প্রথম বিলাতফেরত জামাই বলে। তার আগে ঐ গ্রামের কোনো জামাই বিলেত যায়নি। আর ঐ বিলাতফেরত হবার জন্যই তাকে বেশ বড় রকমের একটা কাজও দেওয়া হয়। শ্রীকান্ত ছিল একজন সামান্য কেরানি। মাসে মাইনে ছিল পঁয়তাল্লিশ টাকা। বড় পদে প্রতিষ্ঠিত করার পর তার মাইনে বেড়ে হল দুশো দশ টাকা! হবে না? বিলাতফেরত যে! তা ঐ সময়ে বিলাতফেরতদের ঐ রকমই সম্মান ছিল।
      এখন সে গ্রামই বা কোথায়, আর ভূতেরাই বা কোথায়!

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য