যাচ্ছেতাই ডাকাত - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

একটা কালো রঙের গাড়ি জোরে এসে যেই বেঁকলো বাঁদিকে অমনি ধাক্কা লাগলো একটা সাইকেল ভ্যানের সঙ্গে। ভ্যানটা তো উল্টে গেল বটেই, গাড়িটাও ঘুরে গিয়ে উঠে গেল ফুটপাথে। একটা ল্যাম্প-পোস্টের সঙ্গে লেগে গাড়িটার রেডিয়েটার ফেটে জল পড়তে লাগলো ঝরঝর করে।
       এরকম দুর্ঘটনা হলেই রাস্তায় ভিড় জমে যায়। কিন্তু তার আগেই ঝড়ের বেগে গাড়ি থেকে নেমে এলো চারজন লোক। তারা চারজনেই পরে আছে খাঁকি প্যান্ট ও কুচকুচে কালো রঙের শার্ট। মুখে রুমাল বাঁধা। তারা পরপর তিনটে বোমা ফাটালো।
       ঠিক মোড়ের মাথায় পাঁচতলা বাড়ির ছাদে টেনিস বল নিয়ে ফুটবল খেলছিল টোটো আর তার বন্ধুরা। মাঝে মাঝেই বলটা রাস্তায় পড়ে যায়।
       তখন যে বলটা ফেলেছে, সে ছুটে নেমে যায় বলটা আনতে, আর অন্যরা পাঁচিলের কাছে এসে উঁকি দিয়ে রাস্তাটা দেখে।
       সাইকেল ভ্যান আর কালো গাড়িটার ধাক্কা লাগার ঠিক আগের মুহুর্তেই টোটোদের বলটা পড়েছে রাস্তায়। টানটু দৌড়চ্ছে কলটা আনতে, আর টোটোরা সাতজন রয়েছে পাঁচিলের ওপর ঝুঁকে। সেইজন্য ওপর থেকে ওরা সব ব্যাপারটা দেখলো।
       গাড়ি থেকে নেমেই যারা বোমা ছোড়ে, তারা নিশ্চয়ই ডাকাত। তার ওপরে ওদের মুখে আবার মুখোশের মতন রুমাল বাঁধা একজনের হাতে ভোজালি, একজনের হাতে কালো মতন কী যেন, নিশ্চয়ই রিভলভার।
       প্রথম বোমার আওয়াজটা হতেই ওরা সবাই ভয় পেয়ে পেছিয়ে এসেছিল পাঁচিল থেকে। আবার ছুটে ফিরে গেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। পরের দুটো বোমা ফাটার সময় ওরা ভয় পেল না। বরং টোটো তার বন্ধুদের সঙ্গে চোখাচোখি করলো। প্রত্যেকেরই চোখ বড় হয়ে গেছে আর ভুরু উঠে গেছে উঁচুতে। অর্থাৎ সত্যি সত্যি ওরা জ্যান্ত ডাকাতদের দেখেছে। ডাকাতরা সত্যি সত্যি ওদের চোখের সামনে বোমা ফাটাচ্ছে, ঠিক যেমন বইতে পড়া যায়।
       বোমাগুলোর আওয়াজ যেমন সাংঘাতিক, সেই রকমই ধোঁয়া। ওপর থেকে ছোটোদের মনে হলো একটা মেঘ যেন রাস্তা ঢেকে দিয়েছে। তবে ডাকাতরা যে ট্রাম লাইনের মোড়ের দিকে যাচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে ঠিকই। মেঘের তলা থেকে চারজনকে বেরিয়ে আসতে স্পষ্ট দেখতে পেল টোটোরা, তারপর সেখানে আর একটা বোমা ছুড়ে তারা আবার একটা মেঘ তৈরি করলো।
       টোটাে বললো, ইস, ডাকাতরা তো আমাদের বাড়ি অ্যাটাক করলো না? তবে কোন বাড়ি অ্যাটাক করবে বলতো?
       রণ বললো, নিশ্চয়ই মোড়ের মাথায় যে গয়নার দোকানটা আছে..... টোটো বললো, ঐ দ্যাখ, ছোটকাকা। ট্রাম লাইনের মোড়ের দিক থেকে হেঁটে আসছেন টোটোর ছোটকাকা। বোমার আওয়াজে তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন।
       বাবুল বললো, আরিবাস! এইবার কী হবে দ্যাখ! পুলিশ এসে গেছে। 
       টোটো বললো, দারুণ ফাইট হবে ডাকাত আর পুলিশে। 
       রণ বললো, যদি আমাদের গায়ে গুলি লাগে? আয়, আমরা পাঁচিলের আড়ালে বসে পড়ি।
       অন্য কেউ অবশ্য তার কথা গ্রাহ্য করলো না। বরং দারুণ কৌতুহল নিয়ে দেখতে লাগল আরও ঝুঁকে।
      পাঁচতলার ছাদ থেকে ট্রাম লাইনের মোড় পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যায়। এখান থেকে প্রায় পঁচিশ-তিরিশখানা বাড়ি দূরে। সেখানে পুলিশের গাড়িটা এসেই থেমে গেল। তার থেকে টপাটপ সাত-আটজন পুলিশ নেমে সার বেঁধে দাঁড়ালো। একজন অফিসার রিভলভার সমেত ডান হাত তুলে কী যেন চেঁচিয়ে বললেন, তা শোনা গেল না।
       ডাকাতরা আরও চারটে বোমা ফাটাল পরপর। সেগুলো পুলিশের গায়ে লাগলো, না কার গায়ে লাগলো তা বোঝা গেল না। গোটা রাস্তা ধোঁয়ায় ধোঁয়াকার। তারপর সব চুপচাপ। তার মানে বোমা কিংবা গুলিটুলির শব্দ শোনা গেল না, কিন্তু অনেকের চেঁচামেচি শোনা যেতে লাগলো ঠিকই।
       বাবুল বললো, ডাকাতগুলো নিশ্চয়ই ধরা পড়ে গেছে। টোটো বললো, অত সোজা নয়। ডাকাতরা শেষ পর্যন্ত ফাইট না করে ধরা দেয় না।
       ধোঁয়া একটু কেটে যেতেই দেখা গেল, রাস্তার একদিকে ভিড় করে আছে অনেক লোক। আর একদিক থেকে অশ্বক্ষুরের মতন লাইন করে এগিয়ে আসছে পুলিশরা, মাঝখানে কেউ নেই।
       টোটো বললো, একি! ডাকাতরা কোথায় গেল? 
      বাবুল বললো, ডাকাতগুলো হাওয়া। 
     কারুকে কিছু না বলে টোটো ছুটলো সিঁড়ির দিকে। অন্যেরাও দুর্দাড় করে অনুসরণ করলো তাকে। প্রায় হুড়মুড় করে ওরা নেমে এল নিচে, কিন্তু বাইরে বেরুতে পারলো না।
       ওদের ফ্ল্যাট বাড়ির দরজার কাছে বেশ ভিড়। দারোয়ান ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। কারুকে রাস্তায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না। টানটু গোবেচারা মুখ করে এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বন্ধুদের দেখেই কৈফিয়ৎ দেওয়ার সুরে বললো, দেখ না, আমায় বাইরে যেতে দিল না, তাই বলটা আনতে পারি নি।
       বাবুল দারোয়ানকে বললো, এখন দরজা খুলে দাও না, ডাকাতরা চলে গেছে।
       সব ফ্ল্যাট বাড়িতেই যেমন একজন লোক থাকে যে নিজে নিজেই সকলের গার্জেন হয়ে যায়, এ বাড়িতেও সেরকম আছে রাজেনবাবু। তিনি ধমক দিয়ে বললেন, না, দরজা খুলবো না। বাইরে পুলিশ ফায়ারিং করছে।
       টোটো তার দলের দিকে ইশারা করলো চোখ দিয়ে, অর্থাৎ ছাদে। একটা দমকা হাওয়ার মতন ওরা ফের উঠে এলো ছাদে। পাঁচিলের কাছে এসে উকি মেরে দেখলো, তিনদিকের রাস্তা দিয়ে পিলপিল করে লোক ছুটে আসছে এ পাড়ার দিকে। সেই ভিড়ে পুলিশরা এলোমেলো ভাবে ঘুরছে, কয়েকজন এসে দাঁড়িয়েছে অ্যাকসিডেন্ট করা কালো গাড়িটার পাশে।
       ডাকাতদের কিন্তু সত্যি আর খুঁজে পাওয়া গেল না। তারা যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে।
       রণ বললো, ধুস, কোনো ফাইট-ই দেখতে পেলুম না। শুধু কয়েকটা বোমার আওয়াজ।
        বাবুল বললো, পুলিশগুলো কী রে, গুলি করতে পারলো না? 
       সুদীপ কম কথা বলে। সে বললো, গুলি করেছিল, ফাটেনি। 
       অজয় বললো, ডাকাতগুলো কোথায় গেল বল তো? নিশ্চয়ই এ পাড়ারই কোন বাড়িতে ঢুকে পড়েছে।
       টোটো বললো, আমাদের দারোয়ানটা ক্যাবলা। আগেই দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। নইলে ডাকাতরা বেশ আমাদের বাড়িতে ঢুকতে পারতো!
      বাবুল বললো, ঐ তিনতলার রাজেনবাবুটার জন্যই তো! নইলে আমরা বেশ কাছ থেকে ডাকাতদের দেখতুম।
       রণ বললো, এ বাড়িতে ঢুকলে যদি আমাদের মারতো?
       টোটো বললো, অত সোজা নয়। আমরা বুঝি মারতে জানি না। দড়াম করে শব্দ হলো ছাদের দরজায়। দুজন পুলিশ ওপরে উঠে এসেছে। তার মধ্যে একজনের হাতে রিভলভার।
       ওদের কিছু জিজ্ঞেস না করেই পুলিশ ঘুরে দেখলো সারা ছাদ। জলের ট্যাঙ্কের তলায় উকি মারলো। তারপর আবার ফিরে যাচ্ছিল, হঠাৎ থেমে গিয়ে একজন বললো, খোকা তোমরা কিছু দেখেছে? কোন বাড়িতে লোক ঢুকেছে, কিংবা কোন দিক দিয়ে পালালো...
       ওদের মধ্যে কে প্রথমে উত্তর দেবে, তাই সবাই সবার মুখের দিকে তাকালো। টোটো ওদের লিডার। কিন্তু পুলিশ এসে প্রথমেই ওদের কিছু জিজ্ঞেস না করে ছাদ খুঁজে দেখছে বলে টোটো চটে গেছে। সে বললো, রাস্তায় দুটো হাইড্রান্টের ঢাকনা নেই। দেখুন, ওর মধ্যেই ঢুকে পড়েছে নিশ্চয়ই।
       একঝাঁক পাখির ডাকের মতন ওরা হেসে উঠলো।
       রিভলভার-হাতে পুলিশ অফিসারটি এবারে এগিয়ে এসে ওদের পাশ দিয়ে উকি মারলো রাস্তায়। অন্য পুলিশটি টোটোর সামনে এসে দাঁড়িয়ে তাকে ভালো করে দেখলো। তারপর বললো, পাকা ছেলে, অ্যাঁ! কোন ক্লাসে পড়ো?
       টোটো বললো, ক্লাস এইট!
       —কোন স্কুল ?
       —বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট।
       —নাম কি তোমার?
       —তিমিরবরণ সেন?
       —তোমরা অনেকক্ষণ থেকে ছাদে আছো?
       —হ্যাঁ।
       —তোমায় থানায় যেতে হবে। তোমাকে স্টেটমেন্ট দিতে হবে!
       টোটো সগর্বে বন্ধুদের দিকে তাকালো। আজ সকালে সে কার মুখ দেখে উঠেছে। এতবড় সম্মান দেওয়া হচ্ছে তাকে। এখন তাকে পুলিশের সঙ্গে থানায় গিয়ে ডাকাত ধরার ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে।
       রিভলভার হাতে পুলিশটি বললো, না-না, এইটুকু ছেলেকে থানায় নিয়ে যাবার কী দরকার? যা জিজ্ঞেস করার এখানেই....
       টোটাে খুব বিরক্তভাবে সেই পুলিশটির দিকে তাকালো। এ লোকটা তো বড্ড বোকা। টোটো থানায় যেতে রাজি আছে, তাও বলে কিনা নিয়ে যাবার দরকার নেই। টোটোও জানে, কী করে এদের শায়েস্তা করতে হয়।
       সেই পুলিশটি বললো, তোমরা এখান থেকে ঠিক কী দেখেছে বলো তো?
       টোটো উদাসীন ভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো, আমি ঘুড়ির প্যাঁচ লড়া দেখছিলুম।
       —বোমার শব্দ শুনে রাস্তার দিকে দেখো নি?
       —ওগুলো বোমা বুঝি? আমি তো ভেবেছিলাম কালীপটকা!
       অন্য পুলিশটি বললো, দেখলেন তো কী রকম বিচ্ছ ছেলে? থানায় না নিয়ে গেলে মুখ খুলবে না।
       বাবুল বললো, শুধু ধোয়া দেখেছি।
       সেই পুলিশটি এবার কাঁধ বাঁকিয়ে বললো, তাহলে একজনকে থানায় নিয়ে যাওয়া যাক। এখান থেকে খুব ক্লিয়ার ভিউ পাবার কথা।
       টোটোকে কিন্তু তখুনি থানায় নিয়ে যাওয়া হলো না। একজন পুলিশ তার ছোটকাকাকে বলে গেল টোটোকে নিয়ে তৈরি থাকতে।
       দুঘণ্টা ধরে পাড়ার সমস্ত বাড়ি সার্চ করা হলো। কাগজের লোক এসে ছবি নিল কালো গাড়িটার। সাইকেল ভ্যানটার মালিকের গায়ে একটু আধটু চোট লেগেছে, বেশি ক্ষতি হয়নি। তবে তার ভ্যানের ভেতরের একুশটা মুরগির ডিম ভেঙে নষ্ট হয়ে গেছে। ডাকাতদের বোমার আঘাতেও কেউ আহত হয় নি। ওরা আসলে ধোঁয়ার আড়ালে পালাবার জন্যই বোমা ছুড়েছিল।
       কিন্তু ডাকাতগুলো পালালো কী করে? অন্যদিকে ছিল পুলিশ, আর একদিকে অনেক লোকের ভিড়, সেদিক দিয়ে যে ডাকাতরা পালায় নি, তা সবাই বলেছে এক বাক্যে। কোনো বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। কিন্তু এ পাড়ায় সব ভালো ভালো লোক থাকে, কেউ তো ডাকাতদের আশ্রয় দেবে না। আর, কোনো বাড়ির মধ্যে জোর করে ঢুকে পড়লেও একেবারে উবে যাবে কী করে?
       ডাকাতদের সম্পর্কে শোনা গেল কত রকম যে গল্প! কেউ বললো, ওরা চম্বলের ডাকাত। কেউ বললো দিল্লীর। কেউ বললো, ওরা ব্যাঙ্ক-ডাকাত, কেউ বললো, একটু আগে পাঁচটা খুন করেছে।
       একমাত্র টোটোর ছোটকাকাই পুলিশের কাছ থেকে শুনে এসেছে পাকা খবর। ওরা একেবারে নভিস ডাকাত। আর ওদের ভাগ্যটাও খারাপ। ওরা নিউ আলিপুরে একটা ব্যাঙ্কে ডাকাতি করতে ঢুকেছিল, কিন্তু সুবিধে করতে পারেনি। ব্যাঙ্কের কর্মচারী ও পাড়ার লোকেরা ওদের দু’জন সঙ্গীকে ধরে ফেলে। বেগতিক দেখে বাকিরা গাড়িতে উঠে পালাচ্ছিল। কিন্তু কাছেই ছিল একটা পুলিশের গাড়ি। সেই গাড়ি ওদের তাড়া করলো। কলকাতার অনেক রাস্তা ঘুরে শেষ পর্যন্ত এ পাড়াতেই অ্যাকসিডেন্ট করলো ওদের গাড়ি। তারপর যে কী করে ওরা অদৃশ্য হয়ে গেল সেটাই আশ্চর্যের ব্যাপার।
       টোটোদের আর খেলা হলো না। টানটুর সঙ্গে ওরা সবাই মিলে অনেক খুঁজেও আর টেনিস বলটা পায় নি। এত লোকের ভিড়ে কে বলটা নিয়েছে কে জানে? টানটুর খুব মন খারাপ হয়ে গেছে। যার জন্য বল হারায়, তাকেই পরের বলটা কিনে দিতে হয়। বেচারা টানটু, গত সপ্তাহেই ওর আর একটা বল হারিয়েছিল।
       টোটো ভেবেছিল, সে একলা একলা পুলিশের গাড়ি চেপে বীরের মতন থানায় যাবে। পাড়ার সব লোক তাকে দেখবে। সেরকম কিছুই হলো না। পুলিশের গাড়ি চলে গেল আগেই। সন্ধেবেলা ছোটকাকা মিনিবাসে করে টোটোকে নিয়ে গেলেন লালবাজারে।
       বাস থেকে নেমে ছোটকাকা বললেন, কী ঝামেলা পাকালি বল তো? এখন কতক্ষণে ছাড়বে কে জানে? কেন ছাদে খেলতে গিয়েছিলি? তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে পুলিশ আমাকে ধরলো না, আর তোকে ধরলো?
       টোটো গম্ভীর ভাবে বললো, তুমি রাস্তায় থাকলেও তুমি তো কিছু দেখতে পাওনি। আমি সব দেখেছি।
        —তুই দেখেছিস? কী দেখেছিস ?
       —এখন বলবো না, পুলিশ কমিশনারের কাছে বলবো।
       বড় বড় সব পুলিশ অফিসাররা তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। সে এলেই তাকে নিয়ে যাওয়া হবে একটা গোপন ঘরে। সেখানে বড় বড় ফ্লাড লাইট জ্বলছে।
       কিন্তু লালবাজারে অনেক ভিড়। কেউ কাউকে গ্রাহ্য করছে না, ছোটকাকা অনেক খুঁজে খুঁজে অ্যান্টি-ডেকইটি বিভাগে গেলেন। সেখানেও অনেক লোক, তার মধ্যে টোটোদের পাড়ারও কয়েকজন আছে।
       একটা ঘরের মধ্যে কাকে যেন জেরা করা হচ্ছে, আর সবাই অপেক্ষা করছে বাইরে। সকলের বসবারও জায়গা নেই। একটা মাত্র বেঞ্চ, অনেকের সঙ্গে টোটোকেও দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। কতক্ষণ পরে যে তার ডাক আসবে তার ঠিক নেই।
       এক ঘণ্টার বেশি সেখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেটে গেল, আর ছোটকাকা ক্রমেই বিরক্ত হতে লাগলেন। একবার তিনি বললেন, আমার কি ইচ্ছে করছে জানিস, টােটাে? তোকে এখানে জেলে পুরে দিয়ে আমি বাড়ি চলে যাই।
       টোটোর মনের তেজও অনেক কমে গেছে এতক্ষণে। সে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো, বাঃ, আমার কী দোষ?
     একটু পরেই দারুণ একটা হৈ-হৈ পড়ে গেল। ছোটাছুটি করতে লাগলো অনেকে। কে যেন বললো, ধরা পড়েছে, ধরা পড়েছে!
        সত্যিই কয়েকজন পুলিশ গোল করে ঘিরে নিয়ে এলো সেই চারজন ডাকাতকে। এখন অবশ্য তাদের পোশাক অন্য। তারা পরে আছে হাফ-প্যান্ট আর গেঞ্জি। এই পোশাকের জন্যই বোধ হয় তাদের বেশ ছোট দেখাচ্ছে। মনে হয় যেন কুড়ি-বাইশ বছরের ছেলে। একজনের বয়স তো আঠারোর বেশি হতেই পারে না।
       ছোটকাকা বললেন, যাক, বাঁচা গেল। আর তো দাঁড়িয়ে কোন লাভ নেই। এবারে বাড়ি যাওয়া যাবে।
       টোটো নিরাশ ভাবে বলল, আমায় কিছু জিজ্ঞেস করবে না? 
      ছোটকাকা ভেংচি কেটে বললেন, ডাকাত ধরা পড়ে গেছে, এখনো কি তুই পুলিশকে সাহায্য করতে চাস নাকি? তুই এখানে দাঁড়া, আমি গল্পটা শুনে আসি কী করে ওরা ধরা পড়লো।
       সেই ঘরটার দরজার কাছে এখন অনেকে ভিড় করেছে। একজন সেপাই চেঁচিয়ে বলছে, হঠ যাও! তবু কেউ সরছে না অবশ্য। ছোটকাকা ঢুকে গেলেন সেই ভিড়ের মধ্যে।
       একটু বাদে ফিরে এসে বললেন জলের মতন সোজা। আমি তাই ভেবেছিলুম, বুঝলি। ওরা ঢুকেছিল চ্যাটাজিদের বাড়িতে। ওদের উঠোনের পেছনে একটা পাঁচিল আছে না? সেটা ডিঙিয়ে ওরা চলে যায় পেছনের বস্তিতে। ও বাড়ির একটা বুড়ি ঝি ওদের দেখেছিল, ভয়ে কিছু বলে নি আগে। বস্তিতেও কিন্তু ওরা থাকে নি। জানে তো পুলিশ বস্তিতেও খুঁজবে। তবে বেশিদূর যেতে সাহস পায় নি। বস্তির সামনেই যে বাজার, তার একটা ঘরে ঢুকে বসেছিল। ডাকাত না ক্যাবলাকান্ত। যাচ্ছেতাই! চল, বাড়ি চল।
       ছোটকাকা টোটোর হাত ধরে সবে মাত্র টেনেছেন এমন সময় টোটো দেখতে পেল সেই রিভলভার হাতে পুলিশটিকে। কাকে যেন ভিড়ের মধ্যে খুঁজছে। এখন অবশ্য তার হাতে রিভলভার নেই, মুখখানিও বেশ খুশি খুশি।
       টোটোকে দেখতে পেয়েই সে এগিয়ে এসে বললো, তোমরা ছাদে টেনিস বল খেলছিলে না? বলটা রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। তারপর খুঁজে পেয়েছিলে?
       টোটো দু’দিকে মাথা নাড়লো। পেছনে লুকানো একটা হাত সামনে এনে পুলিশটি বললেন, এই নাও তোমাদের বল। ডাকাত ছেলেগুলোকে সার্চ করে এই বলটা আমরা পেয়েছি। আজ তো সারাদিনে ওদের কোনো রোজগার হয়নি। তাই ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে ছোট সে রাস্তা থেকে এই বলটা কুড়িয়ে নিয়েছিল। হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ ! ছোকরা নিজে আমার কাছে স্বীকার করেছে, হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ !
       টোটো ছোটকাকার দিকে ফিরে ভারিক্কী চালে বললো, আমার জন্যই ওর ধরা পড়লো কিনা, সেটা দেখলে তো!

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য