বিপিনবাবুর চশমা - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

      পলাশপুর রেল স্টেশানে রাত্তির দুটো দশ মিনিটে একটা ট্রেন থামে। অত রাতের ট্রেন বলেই তাতে পলাশপুর থেকে কোনো যাত্রী ওঠে না। কোনো কোনো দিন ট্রেনটা দু’তিন ঘণ্টা লেট করে, আসতে আসতে ভোর হয়ে যায়। কে সারারাত স্টেশানে বসে থাকতে চায়?
      হঠাৎ বিশেষ প্রয়োজনে রতনকে কলকাতায় যেতেই হবে। তাই সে ঐ ট্রেনের টিকিট কিনেছে। বেশি রাত হয়ে গেলে সাইকেল রিকশা পাওয়া যায় না, তাই সে রাত বারোটার মধ্যে স্টেশানে চলে এল। ফাস্ট ক্লাস ওয়েটিং রুমে আর কেউ নেই, বেশ হাত-পা ছড়িয়ে থাকা যায়, ইচ্ছে করলে বইও পড়া যায়।
      এই সময় স্টেশানটাকে ঘুমন্ত মনে হয়। কুলি কিংবা পান-বিড়িওয়ালারাও ঘুমোয়। রতন একখানা বই খুলে পড়ছে। এই সময় দরজা ঠেলে একজন মাঝবয়সী লোক ঢুকল। পাজামা আর পাঞ্জাবি পরা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, মাথায় অল্প টাক।

      লোকটিকে একটু যেন চেনা চেনা মনে হল, কিন্তু কোথায় দেখেছে মনে করতে পারল না রতন। সে আবার বই পড়তে লাগল।
      একটু পরে লোকটি গলা খাকারি দিয়ে রতনের কাছে এসে বসে পড়ে বলল, আমি কি আপনার কাছে একটু বসতে পারি?
      রতন একটা চামড়ার ব্যাগ এনেছে, সেটা তার পায়ের কাছে রাখা। ব্যাগটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে সে বলল, হ্যাঁ, বসুন না!
      যদিও মনে মনে সে একটু অবাক হল। এত বড় ঘর, অনেকগুলি চেয়ার থাকতেও লোকটি তার কাছে এসে বসতে চায় কেন?
      লোকটি বলল, রাত্তির বেলা একা একা থাকতে আমার ভয় করে। আমি বিপিন চৌধুরী, আগে মেমারি কোর্টের জজ ছিলাম।
      এই লোকটি একজন জজসাহেব শুনে রতনের খানিকটা সন্ত্রম হল। জজদের কত ক্ষমতা। ইচ্ছে করলেই মানুষকে জেলে ভরে দিতে, এমনকি ফাঁসিও দিতে পারে।
      যেন রতনের মনের কথাটা বুঝতে পেরেই বিপিন চৌধুরী বললেন, জজের চাকরি বড় বিপদের চাকরি। সেইজন্য আমি তাড়াতাড়ি রিটায়ার করেছি। কিন্তু তবু বিপদ আমাকে ছাড়ছে না।
      রতন কৌতুহলী হয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে রইল। বিপিন চৌধুরী বলল, এ চাকরিতে মানুষকে কত রকম শাস্তি দিতে হয়। অনেক সময় নির্দোষ লোকও শাস্তি পায়, তা অস্বীকার করছি না। উকিলরা এমনভাবে মামলা সাজায় যে মাথা গুলিয়ে যায়। একবার কী হয়েছিল জানো?
      বিপিনবাবু একটা সিগারেট ধরিয়ে প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল, খাবে? রতন দু’দিকে মাথা নেড়ে বলল, আমি খাই না। সিগারেটের ধোয়ার গন্ধও তার খারাপ লাগে। কিন্তু এখন গল্প শোনার লোভে ভদ্রলোকের দিকে চেয়ে রইল।
     বিপিনবাবু বলল, একবার নকুল বিশ্বাস নামে একজন লোকের বিরুদ্ধে মামলা চলছিল। লোকটির খুব শক্তপোক্ত চেহারা। লম্বা। চোখ দুটো দেখলেই ভয় করে। ওর নামে খুনের মামলা। রাগের মাথায় এক বন্ধুকে খুন করে ফেলেছে। তাও খুব বীভৎসভাবে। একটা পাথর দিয়ে ঠুকে মাথাটা একেবারে ছাতু করে দিয়েছে।
      লোকটি অবশ্য অস্বীকার করেছে নিজের দোষ। বারবার বলেছে যে পুরো ব্যাপারটাই সাজানো। মেরেছে অন্য এক বন্ধু, ওর নামে দোষ চাপিয়েছে। এমন কথা তো অনেকেই বলে। সাত জন লোক সাক্ষী দিল নকুলের বিরুদ্ধে। ওর বাড়িতে একটা রক্তমাখা জামাও পাওয়া গেছে। নকুলকে ফাঁসির হুকুম দিতেই হল। তখন নকুল রাগের চোটে কাঠগড়া ধরে ঝাকাতে লাগল। আমার দিকে হিংস্রভাবে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল, জজসাহেব, তুমি আমাকে বিনা দোষে ফাঁসিতে পাঠাচ্ছ? তোমায় আমি ছাড়ব না। একদিন না একদিন ঠিক এসে তোমায় গলা টিপে মারব। আমার হাতেই তুমি মরবে!
      রতন জিগ্যেস করল, লোকটির কি সত্যি ফাঁসি হয়েছিল? অনেক ফাঁসির আসামী তো ছাড়াও পেয়ে যায়।
      বিপিনবাবু বলল, নকুল ছাড়া পায়নি। আপিল করেছিল, সুবিধে হয়নি। এক বছর বাদে নকুলের ফাঁসি হয়ে গেল। কেউ তার ডেডবডি নিতে আসেনি, তাই জেলের লোকরাই পুড়িয়ে ফেলে। নকুল কিন্তু আমার পিছু ছাড়েনি। আমি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে অন্য জায়গায় চলে এসেছি, তাও—
      রতন বলল, তার মানে? সে মরে গেছে, তবু কী করে? 
      বিপিনবাবু বলল, তার আত্মা অন্য মানুষের রূপ ধরে আসে। দু’বার আমার গলা টিপে ধরেছে।
      রতন এবার হেসে উঠে বলল, ভূতের গল্প? আপনি বুঝি ভূতে বিশ্বাস করেন? 
     বিপিনবাবু বিমৰ্ষভাবে বলল, আগে করতাম না। এখন তো বিশ্বাস না করে উপায় নেই। তিনবার সে আমায় আক্রমণ করেছে। অন্য লোকজন এসে পড়ায় বেঁচে গেছি। রাত্তিরে আমি একা একা কোথাও যাই না। নেহাৎ আমার মেয়ের অসুখের খবর পেয়ে—
     রতন বলল, এখানে ভূত আসবে না। আপনার চিন্তার কিছু নেই। বিপিনবাবু হাত দিয়ে পাশে কী যেন খুঁজতে লাগল। আপনমনে বলল, চশমাটা কোথায় গেল? চশমাটা কোথায় রাখলাম?
      রতন বলল, ঐ তো পাশের চেয়ারে রেখেছেন। বিপিনবাবু এবার চশমাটা পেয়ে চোখে লাগিয়ে বলল, চশমা ছাড়া কিছু দেখতে পাই না। একবার নকুল এসে গলা টিপে ধরার পর চোখ দুটো বেশি খারাপ হয়ে গেছে।
      এই সময় আর একজন লোক ঢুকল। রোগা-পাতলা চেহারা। সঙ্গে কোনো মালপত্র নেই। বসল গিয়ে একটু দূরের চেয়ারে।
      বিপিনবাবু ফিসফিস করে বলল, সাবধান! এ হতে পারে। 
      রতন জিগ্যেস করল, আপনার সেই নকুলের বয়স কত ছিল? 
     বিপিনবাবু বলল, বেয়াল্লিশ। 
     রতন বলল, এর তো অনেক কম বয়েস। তিরিশের বেশি না। 
      বিপিনবাবু বলল, তাতে কী! নকুলের আত্মা ওর শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। 
      রতন অবিশ্বাসের হাসি দিয়ে নতুন লোকটির দিকে আড়চোখে তাকাল। নিতান্তই নিরীহ চেহারা। তবে ফাস্ট ক্লাসের যাত্রী বলে মনে হয় না।
    লোকটি ওদের উদ্দেশে বলল, ট্রেন বোধহয় লেট হবে। আপনারা ঘুমিয়ে নিতে পারেন। রতনের অবশ্য ঘুমোবার একটুও ইচ্ছে নেই। সে আবার বই খুলল। নতুন লোকটি একটু পরে বাথরুমে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল। সেদিকে কয়েক পা গিয়ে ঝপ করে পড়ে গেল মাটিতে। মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করতে লাগল।
      মৃগী রুগিদের এরকম হয়। রতন লোকটির কাছে গিয়ে জিগ্যেস করল, কী হল? কী হল আপনার? উত্তর না দিয়ে সে তখনো একরকম শব্দই করে যেতে লাগল। 
      রতন বলল, মুখে-চোখে জল দিতে হবে। 
      সঙ্গে সঙ্গে লোকটির যেন জ্ঞান ফিরে এল। কটমট করছে চোখ দুটো। বিপিন চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল, তুই সেই জজসাহেবটা না? আজ তোকে শেষ করবই আমি। নকুল বিশ্বাস কথার খেলাপ করে না!
      রতন কিছু বোঝার আগেই সে লাফিয়ে উঠে বিপিন চৌধুরীর গলা টিপে ধরল। বিপিন চৌধুরী আর্তকণ্ঠে বলতে লাগল, বাঁচাও! ও ভাই বাঁচাও আমাকে। এ মেরে ফেলবে! 
     রতনের বিস্ময়ের ঘোর কাটতে খানিকটা সময় লাগল। সত্যি সত্যি এরকম হয়! এই নিরীহ চেহারার লোকটার শরীরে নকুল বিশ্বাস নামে একজন খুনির আত্মা ভর করেছে?
      রতন পেছন দিক থেকে লোকটাকে টেনে ছাড়াবার চেষ্টা করল। অমনি লোকটি বিপিন চৌধুরীকে ছেড়ে দিয়ে উল্টোদিকে ফিরে আচমকা এক ধাক্কা মারল রতনকে।
      তাল সামলাতে না পেরে রতন পড়ে গেল মাটিতে। সেই লোকটি রতনের বুকে চড়ে গলা টিপে ধরল।
      বিপিন চৌধুরী এই ফাঁকে দৌড়ে পালাল ঘর থেকে। বুকের ভেতরটা অকুপকু করছে রতনের। এবার সে দারুণ ভয় পেয়ে গেছে। ভূতের সঙ্গে কী করে লড়াই করবে? সে কাতর গলায় বলল, আমায় কেন মারছ? আমি তো কোনো দোষ করিনি।
      লোকটি অমনি হাত আলগা করে বলল, তাই তো! তোমায় কেন মারব? সে ব্যাটা পালাল কোথায়?
      মুক্তি পেয়ে রতন হাঁপাতে লাগল। বাপরে বাপ, খুব জোর বাঁচা গেছে। এ কী সব ভূতুড়ে কাণ্ড!
     দারুণ তেষ্টা পেয়ে গেছে। চামড়ার ব্যাগটায় জলের বোতল আছে। সেই ব্যাগটার দিকে হাত বাড়াতেই আবার সে চমকে উঠল। ব্যাগটা নেই সেখানে। ঘরের মধ্যে কোথাও নেই। তারপর প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে দেখল, মানিব্যাগও নেই।
      তার মানে সবটাই সাজানো, সবটাই অভিনয়। ভূত-টুত কিছু নয়। বিপিন চৌধুরী নামের লোকটা কালো ব্যাগটা তুলে নিয়ে পালিয়েছে। আর ধস্তাধস্তির সময় অন্য লোকটা পকেট থেকে তুলে নিয়েছে মানিব্যাগ।
      মানিব্যাগে বেশি টাকা ছিল না। কালো ব্যাগটায় ছিল পঞ্চাশ হাজার টাকা। শিগগিরই তার দাদার মেয়ের বিয়ে। বাবা সেইজন্য টাকাটা ব্যাঙ্ক থেকে তুলিয়ে রতনের হাত দিয়ে পাঠাচ্ছিলেন। বিপিন চৌধুরী ব্যাঙ্কে ঘোরাঘুরি করে দেখে কে কত টাকা তোলে। রতন যে আজ এই ট্রেনে কলকাতায় যাবে, তাও কোনোরকমে জেনেছে।
      এখন কী হবে? এখন তো ওদের ধরা অসম্ভব। নিশ্চয়ই মিলিয়ে গেছে বাইরের অন্ধকারে। পুলিশকে একটা খবর দিতে হবে। তাতেও কি লাভ আছে কিছু?
      রতনের মনটা খুব ভেঙে গেল। হঠাৎ নজরে পড়ল, মাটিতে বিপিন চৌধুরীর চশমাটা পড়ে আছে। যদি সেটা পুলিশের কোনো কাজে লাগে, সেই ভেবে তুলে নিল চশমাটা। তারপর দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।
      ট্রেন আসার আর দেরি নেই। তাই স্টেশান জেগে উঠেছে। রতন দেখল, এক জায়গায় একটা ছোটখাটো ভিড়। লোকেরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে, মাঝখানে যেন কিছু একটা রয়েছে।
      সে দৌড়ে গেল সেদিকে। আবার চমকে উঠল।
      মাটিতে পড়ে আছে বিপিন চৌধুরী নামের সেই লোকটি। পাশেই তার চামড়ার কালো ব্যাগটা। একজন বলল, এই লোকটি ব্যাগ হাতে নিয়ে ছুটে যাচ্ছিল, একটা পাথরে পা লেগে ছিটকে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। মাথায় চোট লেগেছে খুব। দুজন লোক তার চোখে-মুখে জলের ছিটে দিচ্ছে।
      রতন বুঝল, চশমার ব্যাপারে লোকটা সত্যি কথাই বলেছিল। চোখে ভালো দেখতে পায় না, তাই হোঁচট খেয়েছে।
      একটু পরেই লোকটির জ্ঞান ফিরে এল, চোখ মেলে তাকাল।
      ভিড় ঠেলে একেবারে সামনে গিয়ে রতন চশমাটা দোলাতে দোলাতে বলল, এই যে নকল জজসাহেব, তোমার সত্যিকারের নামটা কী বলো তো?
      লোকটি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল, আমার নাম নকুল বিশ্বাস। আমাকে আর যাই শাস্তি দাও, ফাঁসি দিও না!

গল্পটি পড়া শেষ! গল্পটি কি সংগ্রহ করে রাখতে চাও? তাহলে নিচের লিঙ্ক থেকে তোমার পছন্দের গল্পটি ডাউনলোড করো আর যখন খুশি তখন পড়ো; মোবাইল, কস্পিউটারে কিংবা ট্যাবলেটে।

Download : PDF

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য