লেজের ঝাপটা খেল কেন তবে? - ননীগোপাল চক্রবর্তী

      একজন লোক তীর্থ করতে যাবে। তার কিছু টাকা ছিল। টাকাটা রাখবে কোথায়? অনেক ভেবেচিন্তে সে ঠিক করল, তার এক বন্ধুর কাছে টাকাটা গচ্ছিত রেখে যাবে।
      বন্ধু বলল, তা রেখে যাও। তোমার টাকা আমার কাছে রাখাও যা, তোমার কাছে রাখাও তাই। ফিরে এসে দরকার মত চাইলেই পাবে।
     অনেকদিন পরে তীর্থ থেকে ফিরে এসে লোকটি তার টাকা ফেরত চাইল বন্ধুর কাছে। বন্ধু তা শুনে যেন গাছ থেকে পড়ল। বলল, সে কি, আমি তো তোমার টাকা ফেরত দিয়ে দিয়েছি।
      বন্ধুর বেইমানিতে লোকটির বড় রাগ হলো। সে নালিশ করল গিয়ে রাজার কাছে।
     রাজা পড়লেন মুস্কিলে। তিনি দেখলেন, ঐ লোকটি যে টাকা রেখেছিল বন্ধুর কাছে, তার কোন সাক্ষী প্রমাণ নেই। যদি রেখেই থাকে, বন্ধুটি যে টাকা ফেরত দিয়েছে, তারও কোন সাক্ষী নেই।
      রাজা ছিলেন মনসার ভক্ত। মনসার মন্দির ছিল একটা তার বাড়ীতে। রাজা বিপদে আপদে পড়লে মনসা তাকে সাহায্য করত।
      রাজা তার পাত্ৰ-মিত্র সভাসদদের নিয়ে অনেক আলোচনা করলেন, কিন্তু ঐ লোকটি অার তার বন্ধুর মধ্যে কে মিথ্যেবাদী তা কেউই বলতে পারল না।
      রাজা সারারাত ভাবলেন, কিন্তু সমস্যার সমাধান হল না। অবশেষে রাজা জানান দিলেন মনসাকে।
      মনসা এক বিরাট বিষধর সাপকে পাঠিয়ে দিলেন। এই সাপের সম্মুখে শপথ করে যে মিথ্যা কথা বলবে, সাপ তাকে এক ছোবলে সেখানেই শেষ করে দেবে। যে মিথ্যা কথা বলবে না, সাপ তাকে ছোবল মারবে না।
      সাপ এল। কুন্ডলী পাকিয়ে রাজসভার মাঝখানটায় সে ফণা তুলে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। লোকে লোকারণ্য। সাপের সেই লকলকে জিহ্বার দিকে তাকিয়ে সকলেরই প্রাণ উড়ে গেল।
       কে মিথ্যেবাদী—ঐ লোকটি, না তার বন্ধু? সকলের মুখেই এক কথা।
      লোকটি সাপের সম্মুখে শপথ করে বলল, সে তীর্থে যাওয়ার আগে বন্ধুর কাছে টাকা গচ্ছিত রেখে গিয়েছিল কিন্তু বন্ধু সে টাকা তাকে ফেরত দেয়নি। সাপ মাথা তুলাতে লাগল। তাকে কিছু বলল না। সকলেই বুঝল, এ ব্যক্তি মিথ্যে কথা বলেনি। ও যে টাকা রেখে গিয়েছিল বন্ধুর কাছে, একথা সত্যি।
      এবার বন্ধুর পালা। হাজার হাজার লোক। উদ্‌গ্ৰীব হয়ে বিচার দেখবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। এবার সাপের ছোবল থেকে ঐ বন্ধুটিকে কেউ বাঁচাতে পারবে না, তা সবাই বুঝে নিল।
      বন্ধুটিরও ভয়ে মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে তখন। অনেকে ভাবল, সে এবার এক দৌড়ে পালিয়ে যাবে সাপের কাছ থেকে।
      কিন্তু পালিয়ে যাবে কোথায়? রাজরোষে পড়লে কারও রক্ষা নেই। রাজা তাকে ধরে হয় ফাঁসী দেবে, না হয় শূলে চড়াবে।
      বন্ধুটি কিন্তু পালাল না। সে ঐ লোকটির কাছে বিদায় নিতে গিয়ে তার পিঠে হাত দিল। তারপর তার হাত ধরে সাপের কাছাকাছি এসে নিজের হাতের লাঠিটা ওকে ধরতে দিয়ে এগিয়ে গেল সাপের কাছে।
      সমস্ত লোক তখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে ভাবছে, সাপের ছোবল খেয়ে এবার মরবে এই শয়তান বন্ধুটি।
     সে শপথ করে সাপের সম্মুখে বলল, আমি টাকা গচ্ছিত রেখেছিলাম সত্যি, কিন্তু সে টাকা ওকে আমি দিয়ে দিয়েছি। সে টাকা অামার কাছে নেই, ওর কাছেই আছে।
      সাপটি ফুলে ফুলে উঠতে লাগল রাগে, কিন্তু তাকে ছোবল মারল না। খুব জোর একটা লেজের ঝাপটা মেরে চলে গেল সভা ছেড়ে।
      সমস্ত লোক অবাক হয়ে গেল। প্রকৃত মিথ্যেবাদীর হদিশ হলো না!
     বন্ধুটি ফিরে এসে লোকটির হাত থেকে তার লাঠিটা নিয়ে বাড়ী যাবে, এমন সময় রাজা বললেন, ওহে, আমার সঙ্গে এক্ষুনি একবার দেখা করে যেও তো।
     সে রাজার সঙ্গে দেখা করলে রাজা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, বাপুহে, তুমি যদি সত্যিই নির্দোষ হবে, তাহলে লেজের ঝাপটা, কেন খেলে বল দেখি!
      লোকটি হাত জোড় করে বলল, মহারাজ, যদি অভয় দেন তা হলে বলতে পারি।
      রাজা বললেন, বল। 
     বন্ধুটি কি বলল, বলতে পারিস তোরা? জিজ্ঞাসা করে চরকা বুড়ী। ছাই পারিস। বল তো, লেজের ঝাপটা খেল কেন?
      তবে শোন। লোকটি বলল, ধর্মাবতার, অামার হাতের লাঠির মধ্যে ওর সে টাকা ছিল। সাপের কাছে যাওয়ার আগে ওর হাতেই দিয়ে গিয়েছিলাম সে লাঠি। শপথ করে আমি মিথ্যে বলিনি। তবে ঐ চালাকীটার জন্যই খেতে হলো লেজের ঝাপটা৷
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য